একটি দেশের অভ্যুদয় এবং বিজয়ের মিছিল আবু মালিহা

১৬ ডিসেম্বর। বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক দিবস। সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে বিজয় দিবস হিসেবে। অঙ্কের হিসাবে অনেক প্রাণের বিনিময়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটলো। যাদের বয়স পঞ্চাশোর্ধ্ব কম-বেশি সবারই স্বাধীনতা লাভের প্রেক্ষাপট বা যুদ্ধকালীন স্মৃতি ভেসে ওঠে। বীভৎস্য ঘটনা ও ক্ষত-বিক্ষত করা এ জাতির কী করুণ দশা সৃষ্টি হয়েছিল বিজয় দিবসের পূর্বক্ষণ পর্যন্ত। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মরিয়া হয়ে এ দেশ দখলে রেখে শাসন করার দুর্দমনীয় ইচ্ছার বিরুদ্ধে এ দেশের জনগণ ক্ষেপে গিয়েছিল অনেক আগে থেকেই। ভারতবর্ষ বিভক্ত হওয়ার পর থেকেই অনেক না পাওয়ার বেদনা এ দেশের জনগণকে ক্ষেপিয়ে তুলেছিল স্বাধিকার অর্জনের লক্ষ্যে এবং সেই চেতনাকে ধারণ করে বিদ্রোহের দানা ধীরে ধীরে পুঞ্জীভূত হয়ে আন্দোলনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। একটি ভ্রান্তি নিরসন করতে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। ৪৭-পরবর্তী যখন পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রটি দু’টি অংশে বিভক্ত হয়ে একটি একক রাষ্ট্র গঠিত হলো। তার একটি অংশ পূর্ব পাকিস্তান অপরটি পশ্চিম পাকিস্তান। তবে এ দু’টির ভৌগোলিক অবস্থান ছিল প্রায় হাজার মাইলের ব্যবধান এবং মাঝখানে বিশাল ভারতের অংশ। বাস্তবতার আলোকে এ দু’টি অংশের গ্যাপ বা ফারাকের কারণে অনেক বিষয়ই দ্বন্দ্ব-সংঘাত বা সমস্যা সৃষ্টির জন্য সহায়ক পরিবেশ ছিল। তথ্য আদান প্রদান থেকে শুরু করে সমস্যায় ও সঙ্কট নিরসনের জন্য রাজনৈতিক যোগাযোগ বা আনুষ্ঠানিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে অনেক ব্যাঘাত সৃষ্টি হতো। না পাওয়ার বেদনা বা অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে এসব বিষয় ছিল বাস্তব সঙ্কট এবং এরও ঐতিহাসিক কূটনৈতিক চাল ছিল বলে ঐতিহাসিকগণ বিভিন্œভাবে মতামত ব্যক্ত করেছেন এবং এ ব্যবধানটুকু সৃষ্টির জন্য তৎকালীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহর লাল নেহরু বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন বলে ইতিহাসের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। লর্ড মাউন্ট ব্যাটন ভারতের অহিংস রাজনীতির জনক করম চাঁদ গান্ধী এবং জওহর লাল নেহরুর বিদ্বেষী মনোভাবের কারণে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের দু’টি অংশের বিশাল ভূ-ভাগের ব্যবধানটিকে মেনে নিতে বাধ্য করেছিলেন। কার্যত জিন্নাহ সাহেব চেয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গ, পাঞ্জাব এবং ভূপালের বিশাল একটি অংশসহ পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের এবং এ ব্যাপারে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন বলে ঐতিহাসিকগণ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এবং এককভাবে জিন্নাহ সাহেবের লড়াইয়ের বিষয়টি নিখুঁতভাবে তুলে এনেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে ইতিহাস লিখতে গিয়ে কেউ কেউ বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য দিয়ে একে ভিন্ন খাতে নেয়ার চেষ্টা করেছেন। যদিও স্বাধীনতা লাভের কারণ হিসেবে ভাষার ব্যবধানকে বড় করে দেখানো হয়েছে যা ইতিহাসের একটি চরম মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নেই। ভারত বিশাল একটি ভূখন্ড। যাতে আছে দেড় শতাধিক ভাষার প্রচলন। তার মধ্যে বাংলা ভাষার জনগণ কোনো অংশেই কম নয়। পশ্চিমবঙ্গ সেই ভাষার ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে আছে। অথচ সীমিত সংখ্যক হিন্দি ভাষাই বর্তমান ভারতের রাষ্ট্রভাষা বা সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃত। ভাষা ব্যবধানের কারণে কোন দেশের স্বাধীনতা লাভ এটা একটি খোঁড়াযুক্তি বই আর কিছু নয়। স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে অন্য অনেক কারণ রয়েছে এবং বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটাই যুক্তিযুক্ত। ভাষার ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র স্বাধীন হওয়া এমন যুক্তি খলনায়কদেরই মুখে শোভা পায়। ভারত এখনও তার হাজারো গোষ্ঠী, অনেক ভাষাভাষী জাতিসহ মজবুতভাবে টিকে আছে এর থেকে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে। এ দেশের জনগণ অত্যন্ত সহজ সরল। তাদের চিন্তা এবং মনমানসিকতায় কূটিলতা বা বক্রনীতির কোনো স্থান ছিল না কখনো। যারা এ দেশের জনগণকে নিয়ে রাজনীতি করেন তারা অনেক প্রতারণার মাধ্যমে অনেক সময় বিভ্রান্ত করতে চান। কিন্তু সহজ সরল জনগণ সে আশায় গুড়েবালি দিয়েছেন অনেক সময়। বর্তমানে এ দেশের জনগণ ঠকে ঠকে অনেক কিছু শিখেছেন। এখন আর আগের মতো প্রতারণা করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের ব্যাপারে আর সুুুুুযোগ দিতে চায় না এ বিষয়টি স্পষ্ট হবার পর রাজনীতিকরাও আরো অনেক কৌশল অবলম্বন করতে চান।
ইতিহাসের অনেক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা বাস্তব হয়েছে যা একটি দেশের কৃষ্টি ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে গিয়েও। তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ আমাদের বাংলাদেশ। সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং ভাষাভাষী ভিন্নতা ছাড়াও আরও অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল এ দু’টি দেশের মধ্যে। ধর্মীয় প্রভাব ছিল তার মধ্যে একটি অন্যতম যোগসূত্র। এ ছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যাপারগুলোতে উদ্ভূত সমস্যার সমাধানের ব্যাপারে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ছিলেন উদাসীন। এতে প্রকৃত অর্থে ক্ষোভ ও বিভেদের সূত্রগুলো ধীরে ধীরে প্রকট আকার রূপ নেয়। যা থেকে ভাষা বিভেদের কারণটিকে শাসনে নিয়ে এসেছে বামপন্থী সূত্রে নানা রাজনৈতিক সংগঠনগুলো। আর এতে ঘৃতাহুতি দিয়েছে দেশ বিভাগের পক্ষের দেশী-বিদেশী এজেন্টরা। এ অমোঘ সত্যটিকে বুঝতে দিতে চায় না এক শ্রেণীর পদলেহী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। যারা উচ্ছিষ্টভোগীদের নিয়ন্ত্রণ করতো তাদের বিশাল গ্রুপটিকে বিভিন্নভাবে মাঠে ময়দানে ছড়িয়ে দিয়ে জনবিভ্রান্তি সৃষ্টিতে সব সময়ই তৎপর থাকতো, যাতে এ দেশের সহজ সরল মানুষকে সহজেই বিভক্তি ঘটিয়ে দেশের অভ্যন্তরে ক্ষোভের দানা সৃষ্টি করা যায়। সেই কাজটি ভালোভাবেই সমাধান করেছিল এ দেশের বিদেশী প্রভুদের খুদ খাওয়া এজেন্টরা। যা একটি জাতির দুর্ভাগ্যের ভবিষ্যৎকে দোরগোড়ায় এনে দিয়েছিল। ইতিহাস ইতিহাসই। তার শিক্ষা মানুষকে হয়তো সঠিক পথ দেখায়, নতুবা বিভ্রান্তির অতলে নিয়ে যায়। আমাদেরকে দ্বিতীয়টিই জেঁকে বসেছিল। যা থেকে এ দেশের রাষ্ট্রীয় সংহতি ও ঐক্য ধরে রাখা সম্ভব ছিল না। আজকে অপ্রিয় সত্য হলো- স্বৈরচেতনার মানসিকতা আমাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। দেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং জনগণের অধিকার ও নিরাপত্তা বলে কোন কিছু নেই। একটি দলের বা নেত্রীর কথাই আইন, তার কথাই আদর্র্শ এবং রাষ্ট্রীয় নীতিমালাও তারই সন্তুষ্টির লক্ষ্যে। বলা বাহুল্য, দেশ এখন সে ভাবেই চলছে। নেই কোন বিরোধী দলের তৎপরতা, তবুও নাকি বিরোধী দল দেশ ধ্বংসের রাজনীতি করছেন। এ সমস্ত অভিযোগ সরকারি মহল অহরহই করে যাচ্ছেন। কারণ প্রচারযন্ত্রের বাক্সগুলো একক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে তাদের কব্জায়। অতএব বিরোধী দলের কথা এখন আর শুনা যায় না!
সে এখন রাজনীতির কথা। বলছিলাম আমাদের বিজয় অর্জনের কথা। স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ। বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু হয়ে থাকতে আমরা যারপরনাই চেষ্টা করছি। যদিও এখন দেশে গণতন্ত্র নেই। আছে রাজতন্ত্রের চেতনায় পরিবারতন্ত্র, শুধু তাই নয়, একক তন্ত্র। বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলো এগিয়ে যাচ্ছে দেশের জনগণকে নিয়ে। আর আমাদের দেশের জনগণকে বাদ দিয়ে স্ট্যালিনীয় কায়দায় দেশকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক শোষণ প্রক্রিয়ার রাষ্ট্রে। অর্থনীতির বারোটা বাজিয়ে দেশের অর্থনীতিকে ঝুলন্ত সেতুতে নিয়ে আটকিয়ে দেয়া হয়েছে। নিজেদের বিলাসবহুল প্রাসাদোপম অট্টালিকা তৈরিসহ একচেটিয়া অর্থনীতির বাজার নিজের দখলে নিয়ে আসার রাজনীতি এখন বাংলাদেশে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। জনগণের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে উৎপাদিত সমস্ত সম্পদ এবং অর্থকে জনগণের সেবায় না লাগিয়ে মন্ত্রী-মিনিস্টারসহ সরকারি মহলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের টাকার কুমির বানানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। অথচ জনগণের প্রতিটি দিনযাপন এখন পীড়ন যন্ত্রণায় অতিবাহিত হচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। ব্যবসা বাণিজ্যের প্রতিনিয়ত ধস। অর্থলগ্নিকারীদের নিরুৎসাহিত হওয়া, বিদেশী বিনিয়োগ না আসা, বিশ্বব্যাংকের অর্থ ফেরত যাওয়া ইত্যাদিসহ নানা প্রকার দুর্নীতির সয়লাবে দেশের এখন কোণঠাসা অবস্থা। অথচ দেশের উন্নয়ন হচ্ছে এ ধরনের সস্তা এবং মুখরোচক প্রশস্তি আর টাকার বিনিময়ে বিদেশ থেকে কত প্রকার পুরস্কার পাওয়ার গুণগানে ব্যস্ত থেকেছে চাটুকার মহল এক নেত্রীর পেছনে। আসমানি বালামুসিবতের চেয়ে এ ধরনের বালা মুসিবত জনগণের জন্য আরো বেশি কষ্টকর। দেশের বিপদ আরো বেশি ঘনীভূত হচ্ছে। বর্তমান সময়কালে আইএস, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম এবং বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর ধুয়া তুলে এ দেশের অবস্থা আরো জটিল করে তুলছে বর্তমান সরকার। এমনকি সরকারি দলের বিভিন্œ দল এবং উপদলের সংঘাত-সংঘর্ষের জেরও তুলে দেয়া হয় বিরোধী দলের ওপর ঢালাও ভাবে। এখন একটাই নীতি ‘ক্ষমতা যার, আইন তার’। মুখে যা আসে তাই আইনে পরিণত করতে হবে। এর অন্যথা হলে নানান ধরনের জঙ্গির তকমা লাগিয়ে দিয়ে জেলে পুরে দিতে হবে নতুবা ক্রসফায়ারে তার বিনাশ সাধন করতে হবে। গুরুতর অজানা আশঙ্কার দেশে পরিণত হয়েছে আমার সোনার বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে বিজয়ের গৌরব ধুলায় লুন্ঠিত হওয়ার আশঙ্কা দিন দিন বেড়েই চলছে।
অস্বীকার করার উপায় নেই, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে সোনার বাংলার রূপ দেখতে চেয়েছিলেন সেই স্বপ্ন আজো অধরাই থেকে গেলো। তিনি জীবিত থাকলে হয়তো আজ লজ্জায় ম্রিয়মাণ হয়ে পড়তেন এই ভেবে যে, এ কোন ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে আটকে গেছে আমার দেশের স্বপ্ন। আমার চরম আকাক্সক্ষার স্বাধীন দেশ। এ বিজয়কে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে কারা উঠে পড়ে লেগেছে। তাঁর সৌভাগ্য এ করুণ দশা তাকে দেখতে হচ্ছে না। হয়তো বা তার আত্মা করুণভাবে কেঁদে উঠছে। হায় আমার সোনার বাংলা।
কিন্তু আমরা যারা এখনো বেঁচে আছি, তারা হয়তোবা এ করুণ আর্তি শুনতে পাচ্ছি না। তবে তারই প্রতিধ্বনিত জনগণের আর্তি শুনতে পাচ্ছি, যে তারা বলছে প্রভু তুমি আমাদের এ জালিম অধ্যুষিত এলাকা থেকে উদ্ধার করো। এ যন্ত্রণা আর জুলুম সইতে পারছি না। আর কতকাল পথ চেয়ে থাকবো… এমন করুণ আর্তনাদ এখন দেশের আকাশে বাতাসে করুণ আর্তনাদ সুরে ভেসে বেড়াচ্ছে। আল্লাহ তুমি সবাইকে সুমতি দাও। আমার স্বাধীন বাংলাদেশকে তোমার রহমতের করুণা ধারা বইয়ে দিয়ে উদ্ধার করো। এ দেশের লক্ষ কোটি প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশের বিজয় গৌরবকে সমুন্নত করে আবালবৃদ্ধবনিতার মুখে হাসি ফোটাবার ভবিষ্যৎ সোনালি প্রভাতের আলো ছড়িয়ে দাও এবং সুখ প্রশান্তির অনাবিল ফল্গুুধারার সমীরণ প্রবাহে সকলের অন্তরকে সিক্ত করে দাও বিজয়ের এ দিনে চিত্তের প্রশান্তিময়তায়। এবং দেশ জনগণের হিরণ¥য় কীর্তিগাথায় যেন থাকে আমার দেশ বহমান নদীর মত চির উচ্ছলতায়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply