একত্ববাদ ও ক্ষণভঙ্গুর বহুত্ববাদ -হেলাল আনওয়ার

উহারা প্রচার করুক হিংসা বিদ্বেষ আর নিন্দাবাদ
আমরা বলিব সাম্য শান্তি এক আল্লাহ জিন্দাবাদ।
– কাজী নজরুল ইসলাম

মানব সৃষ্টির আদিতে যে বহুবিধ তাত্ত্বিক তথ্যাবলি বিজ্ঞান আমদানি করেছিলো তার বহুলাংশ ইতোমধ্যেই অসার প্রমাণিত হয়েছে। বিজ্ঞানের এসব অনুমানভিত্তিক গবেষণা কখনো বস্তুনিষ্ঠ হিসেবে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং যুগ থেকে যুগান্তরে সময়ের পালাবদলে তা কেবল মানুষের অনিষ্টতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের উদার ও খেয়ালপ্রসূত চিন্তা-চেতনার ভীমরতি এই পৃথিবীকে বশ করতে পারেনি। সেজন্য পৃথিবী যেমন তার আপন গতি থেকে বিন্দুমাত্রও বিচ্যুত হয়নি তেমনি কালের গহবরে বিলীন হয়েছে ঐসব গবেষকের কল্পনাপ্রসূত ভাবনাগুলো।
মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির অনুকূলে যে বিষয়টি গবেষকদের দিকজ্ঞানশূন্য করে দিচ্ছে তাহলো ধর্মীয় দ্বিধা-দ্বন্দ্ব। একত্ববাদ নাকি বহুত্ববাদ তা তারা আজো নির্ণয় করতে ব্যর্থ হয়েছে। কখনো কখনো স্ববিরোধী বক্তব্য দিয়ে নিজেদের চিন্তার অপরিপক্বতার পরিচয় তুলে ধরেছেন।
একত্ববাদ ও বহুত্ববাদ সম্পর্কে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করার আগে বহুত্ববাদীদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে আলোচনা করা প্রয়োজন বলে বোধ করি।
বহুত্ববাদ হলো অনেকের অংশীদারিত্বে কোনো মতবাদ সুপ্রতিষ্ঠিত করার সম্মিলিত প্রয়াসকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা। যেখানে সকলের কল্যাণ সাধনই হবে মুখ্য। কার্লমার্কস, হেগেল, লেনিন, মাওসেতুংসহ আরো অনেকে এ ধরনের মতবাদ প্রচার আর প্রসারের জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।
মূলত এদের সকলের উদ্দেশ্য হলো আমিত্বকে প্রাধান্য দিয়ে নিজের কর্তৃত্বকে প্রতিষ্ঠা করা। আর একত্ববাদের উদ্দেশ্য হলো অন্তসারশূন্য সকল কর্তৃত্বকে অপসারণ করে এক আল্লাহর কাছে মাথা নত করা। যেখানে খেয়ালির কোনো আশ্রয় বা প্রশ্রয় নেই। নেই কারোর কোনো প্রভুত্ব। সেখানে সকল ক্ষমতার উৎস একমাত্র মহান আল্লাহ। যিনি আসমান ও জমিনের একমাত্র স্রষ্টা। রাব্বুল আলামিন বলেন, বলো (হে রাসূল) আল্লাহ এক। তিনি পূত ও পবিত্র। তিনি কারোর জন্ম দেননি এবং কারোর কাছ থেকে জন্ম নেননি। এবং তার সমকক্ষ আর কেউ নেই। (সূরা এখলাস)
এক দ্বান্দ্বিক সমীকরণকে সামনে নিয়ে একত্ববাদ ও বহুত্ববাদের দীর্ঘ বিতর্কের ইতি টানাই হলো আজকের লেখনীর মূল উদ্দেশ্য।
একত্ববাদের শাব্দিক বিশ্লেষণ এভাবে দেয়া যেতে পারে যে, এক সত্তার অধীনে যারা নিজেদের সমর্পণ করে, একক স্রষ্টার প্রতি যাদের অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস আছে। যারা তাদের ভালো এবং মন্দের ব্যাপারে এক আল্লাহর ইচ্ছাকে যথেষ্ট বলে স্বীকার করে এবং তার নৈকট্য পাওয়ার আশায় নিজের ভালোবাসা আর ঘৃণার প্রতি সতর্ক থাকে। মূলত তারাই হলো একত্ববাদের অনুসারী।
আর যারা বহু স্রষ্টা বলে বিশ্বাস করে, এবং সকল শক্তির উৎসমূল হিসেবে মানুষ বলে বিশ্বাস বা প্রচার করে, ভালো এবং মন্দের মালিক মানুষ বলে বিবেচনা করে তারাই মূলত বহুত্ববাদের ধ্বজাধারী। একত্ববাদকে আল কোরআনের পরিভাষায় আত তাওহিদ এবং বহুত্ববাদকে আশ শিরক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কোরআন ও হাদিসের আলোকে এ দুটি শব্দের বিশ্লেষণ যেভাবে এসেছে তা তুলে ধরার প্রয়াস করবো।
পবিত্র আল কোরআনের পরিভাষায় আত তাওহিদ হলো মুমিন বা মুসলমানের মূলমন্ত্র হলো কালেমায়ে তায়্যেবা। অর্থাৎ লাইলাহা ইল্লাল্লাহ। এখানে কালেমাকে যদি দু’টি ভাগে বিভক্ত করা হয় তাহলে প্রথম অংশটা এরকম হবে লা ইলাহা যার অর্থ হলো নেই কোনো ইলাহ। আর ইলাহ শব্দের অর্থ হলো-লর্ড, অভিভাবক, গার্ডিয়ান, মাতব্বর, নির্দেশক ইত্যাদি। পবিত্র আল কোরআনে শব্দটি নানাভাবে একাধিক বার ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন- সূরা আল আনআমে ও সূরা আন নাসে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ইলাহুন্নাস অর্থাৎ তিনি মানুষের ইলাহ বা অভিভাবক। তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য অভিভাবক প্রেরণ করো। আল্লাহ সেসব মানুষের অভিভাবক যারা ঈমান এনেছে। অর্থাৎ আল্লাহ, তিনি ছাড়া আর কোনো মাতব্বর নেই। তিনি চিরঞ্জীব এবং চিরস্থায়ী।
ইসলামের পরিপূর্ণ শুদ্ধতা ও আকিদার পরিশুদ্ধতার জন্যে তাওহিদের প্রতি বিশ্বাস অপরিহার্য। তাওহিদের আকিদায় পরিশুদ্ধতা না থাকলে সে ঈমান মূল্যহীন হয়ে যায়। আর আমলগত দিক থেকে একেবারে শূন্য হয়ে পড়ে। মনে রাখা প্রয়োজন যে পুরো ইসলামই তাওহিদের ওপর নির্ভরশীল। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, আর আল্লাহ তোমাকে ক্লেশ দান করলে তিনি ছাড়া তা মোচনকারী আর কেউ নেই; আর তিনি তোমাদের কল্যাণ করলে তবে তিনিই তো সর্ব বিষয়ে শক্তিমান। তিনি আপন বান্দাদের ওপর পরাক্রমশালী, তিনি প্রজ্ঞাময়, জ্ঞাতা। বলো, সাক্ষ্য প্রদানে সর্বশ্রেষ্ঠ কি? বলো, আল্লাহ আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী এবং এই কোরআন আমার নিকট প্রেরিত হয়েছে যেন তোমাদেরকে এবং যার নিকট তা পৌঁছাবে তাদেরকে এদ্বারা আমি সতর্ক করি; তোমরা কি এ সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহও আছে? বলো, আমি এ সাক্ষ্য দেই না। বলো, তিনি একক ইলাহ এবং তোমরা যে শরিক করো তা থেকে আমি নির্লিপ্ত। (সূরা আনয়াম : ১৭-১৯)
মনে রাখতে হবে যে বান্দার সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ একমাত্র আল্লাহর নিকট। তিনি চাইলে ভালো কিংবা মন্দ করতে পারেন। এই বিশ্বাস মনে জাগ্রত থাকার নামই হলো তাওহিদ। অনুরূপভাবে সূরা আম্বিয়ার ২২ নং আয়াতে মহান রাব্বুল আলামিন বলেন, যদি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে আল্লাহ ব্যতীত বহু ইলাহ থাকতো, তবে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত। অতএব, তারা যা বলে তা থেকে আরশের অধিপতি আল্লাহ পবিত্র মহান।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ আরো বলেন, বলো, তাদের কথামতো যদি তার সাথে আরো ইলাহ থাকতো, তবে তারা আরশের অধিপতির প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার উপায় অন্বেষণ করতো। তিনি পবিত্র, মহিমান্বিত এবং তারা যা বলে তা থেকে তিনি বহু ঊর্ধ্বে। (বনি ইসরাইল : ৪২-৪৩)
মহান রব আরো বলেন, ( তুমি) বলো, তোমাদের শরিকদের মধ্যে এমন কে আছে যে (মানুষকে) সঠিক পথ দেখাতে পারে, (তুমি) বলো, (হাঁ) আল্লাহ তায়ালাই ( তাদের ) সঠিক পথ দে াতে পারেন; যিনি সঠিক পথ দেখান তিনি অনুসরণের বেশি যোগ্য, না সে ব্যক্তি ( বেশি যোগ্য ) – যে নিজে কোনো পথের সন্ধান পায় না- যতোক্ষণ না তাকে পথের সন্ধান দেয়া হয়, তোমাদের এ কি হলো, কেমন ধরনের ফযসালা করো তোমরা ? (সূরা ইউনুস : ৩৫)
আল্লাহ বলেন, নিশ্চই আল্লাহ সর্বশক্তিমান। আল্লাহ স্বীয় জ্ঞান দ্বারা সকল বস্তুকে পরিবেষ্টন করে আছেন। (সূরা তালাক : ১২)
কুফর হলো- কোরআন যে সব বিষয়ে ঈমান আনার তাগিদ দেয় সেসব বিষয়ে অস্বীকার করাকে মূলত কুফরি বলে। কাফিরগণ তাগুতকেই তারা তাদের অভিভাবক বলে মনে করে। আল্লাহ বলেন, আর যারা কাফির তাগুত তাদের অভিভাবক, এরা তাদেরকে আলো থেকে অন্ধকারে নিয়ে যায়। ওরাই জাহান্নামি, সেখানে তারা স্থায়ী হবে। (সূরা বাকারা : ২৫৭)
পবিত্র আল কোরআনের বহু স্থানে কাফিরদের সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। সেই সাথে মুশরিকদের সম্পর্কেও। মূলত আমার আলোচনা হলো বহুত্ববাদ নিয়ে। অর্থাৎ মুশরিকদের নিয়ে।
এক ইলাহকে অস্বীকার করে অন্য কোনো বস্তুকে কল্যাণকর মনে করাকে শিরক বলে। আর মূলত যারা শিরক করে তারাই হলো মুশরিক। আল্লাহ ভিন্ন অন্য কাউকে ইহজীবনের কাম্য বস্তুগুলি পাওয়ার আশু ব্যবস্থাগুলিকেই তারা উপাসনা বলে মনে করে থাকে। সম্পদ লাভের আশায় লক্ষ্মীপূজা, বিদ্যা লাভের আশায় সরস্বতী পূজা, মনের মতো পতি পাওয়ার আশায় শিব লিঙ্গ পূজা- এ জাতীয় মনের বাসনা পূরণের আশায় এ সকল পূজা করা হয়।
মূলত এসব পূজা বা উপাসনা করে তাদের মনে শান্তি বা স্বস্তি কোনোটায় আসতে পারে না। আবার অনেক বাসনা পূজারি আছে। যারা বিভিন্ন পুতুলের পূজা করে থাকে। তারা মনে করে এরা তাদের ইহকালীন স্বার্থ উদ্ধারে সাহায্য করবে। আসলে এগুলো তাদের ভ্রান্ত ধারণা।
বর্তমান আধুনিক যুগে এক শ্রেণীর মানুষ মনে করে যে ধর্ম পালন করা মানে অলস সময় পার করা। মূলত মানুষের সামগ্রিক কল্যাণ লাভের একমাত্র উপায় হলো-এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে একমাত্র তার দাসত্ব গ্রহণ করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এক আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল হওয়ার পরিবর্তে দৃশ্য-অদৃশ্য বহু প্রকার গায়রুল্লাহর পূজায় মানবজাতি লিপ্ত।
মনে রাখতে হবে-মুশরিকরা হয় বস্তুবাদী আর মুনাফিক হয় সুবিধাবাদী। সুতরাং বহুত্ববাদীরা যেমন হয় সুবিধাবাদী আবার তেমন হয় বস্তুবাদী। বর্তমান বিশ্ব সমাজব্যবস্থা যতই উন্নতির পথে ধাবিত হচ্ছে ততই যেন তলিয়ে যাচ্ছে অধর্মের অতল গহবরে। আর যেখানেই রয়েছে অধর্ম সেখানেই রয়েছে সংঘাত, মারামারি আর বিশৃঙ্খলা। বস্তুবাদীরা যে যার মতো ভিন্ন ভিন্ন বস্তুকে উপাসনা করে। তাই কারোর সাথে কারোর কোনো মিল নেই যেমন বাহ্যিকভাবে তেমনি অভ্যন্তরীণ ভাবে। একে অপরের সাথেও দ্বান্দ্বিক মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
তাই একত্ববাদ ছাড়া দেশ, জাতি আর সমাজে কোনোভাবেই শান্তি আসতে পারে না। পবিত্র আল কোরআনের বহু স্থানে এ বিষয়ে মানুষকে সতর্ক করে ভয় দেখানো হয়েছে। যাতে করে মানুষ গোমরাহির পথকে অবলম্বন না করে। পরকালীন ভয়াবহ শাস্তির ভয়ও তাদের দেখানো হয়েছে।
বস্তুত একত্ববাদ হলো সফলতার সঠিক পথ আর বহুত্ববাদ হলো বিশৃঙ্খলার পথ। আমাদের সমাজজীবন ও ব্যক্তিজীবন এমনকি পারিবারিক জীবনে শান্তি আনতে হলে একত্ববাদের কোনো বিকল্প নেই। পরিশেষে কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলি-
আবু বকর ওসমান ওমর আলী হায়দার
দাড়ি যে এ তরণীর নাই ওরে নাই ডর
কান্ডারী এ তরীর পাকা মাঝি মাল্লা
দাড়ি মুখে সারি গান লা শরীক আল্লা।
সুতরাং শরিকহীন একত্ববাদই ইহকালীন মুক্তি এবং সফলতার চাবিকাঠি। আল্লাহ আমাদের সকলকে একত্ববাদের অনুসারী হওয়ার তাওফিক দান করুন।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply