একুশের ধারাবাহিকতায় ছাত্রসমাজ

মনির আহমেদ#

Vasaএকে তো ভাষার জন্য এমন আন্দোলনের নমুনা পৃথিবীর কোথাও নেই, তার ওপর অধিকার আদায়ের দাবিতে ছাত্র-জনতার অনন্য প্রতিবাদ; এই দুইয়ের সমন্বয় ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনকে অনেক উঁচুতে স্থান দিয়েছে। আর ‘লাথি মার ভাঙ রে তালা’ গেয়ে স্বাধিকার আন্দোলনের এক চিরন্তন সবক এ দেশের মানুষ এই মহান আন্দোলন থেকেই পেয়েছে। কাজেই, আজো যে কোন আন্দোলন-সংগ্রামের কথা বলতে গেলে আমাদের বারবার একুশের দিকে তাকাতে হয়।
ভাষা আন্দোলন মুখ্যত ছাত্ররাই নেতৃত্ব দিয়েছে। সেই ১৯৪৮ সালের ২৭ নভেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের কাছে তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিএস অধ্যাপক গোলাম আযম বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে প্রথম স্মারকলিপি প্রদান করেন। পরবর্তীতে সদ্য প্রয়াত ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিন, ভাষাসৈনিক আব্দুল গফুররা বলিষ্ঠভাবেই সে সময় ছাত্রনেতা হিসেবে নিজেদের দায়িত্বের আঞ্জাম দিয়েছেন। তারা আমাদের সবক দিয়ে গেছেন কী করে রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে মায়ের ভাষাকে বুকে আগলে রাখতে হয়। সালাম, জব্বর, রফিক, বরকতেরা শিখিয়েছেন কিভাবে ন্যায্য দাবিকে ঘিরে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে আন্দোলনকে চূড়ান্ত লক্ষ্যে নিয়ে যেতে হয়।
’৫২-এর পর থেকে অধিকার আদায়ের চেতনা যেন ছাত্র-জনতার রক্তে মিশে গেছে। যার ফলে পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা যুদ্ধসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্রসমাজকে অনবদ্য ভূমিকা রাখতে দেখা গেছে। যদিও বর্তমান সময়ে ছাত্ররাজনীতিতে ব্যক্তি স্বার্থের কলুষযুক্ত হয়েছে, কিন্তু ভাষা আন্দোলন ও তৎপরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ সব আন্দোলনের অধ্যায়ে ব্যক্তি স্বার্থ চিন্তা কারোর মাথায় এসেছে বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় না। যদিও ছাত্ররাজনীতি নিয়ে আজ নানান বিতর্ক, কিন্তু এই স্বপ্নও অনেক মানুষ দেখেন যে গণতন্ত্র রক্ষা ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ছাত্ররাই নেতৃত্ব দিয়ে যাবে।
একুশের আন্দোলনের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, সে সময় ছাত্ররা সাহস করে সত্য বলার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিল। পাকিস্তানি শাসকদের নির্যাতন, প্রলোভন কোন কিছুই ছাত্র নেতাদের আন্দোলনের চলমান পথ থেকে একচুল বিচ্যুত করতে পারেনি। ফলে রাজপথ বুকের রক্তে ভেসে গেলেও, চলে যায়নি মুখের সাহসী উচ্চারণ।
ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতা পরবর্তীতেও আমরা পরিষ্কার দেখতে পাই। ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্রসমাজ অনবদ্য ভূমিকা রেখেছিল। ছাত্রনেতা আসাদ (শহীদ আমানুল্লাহ আসাদুজ্জামান) আজো গণতান্ত্রিক যে কোন আন্দোলনের প্রেরণা। আইয়ুব শাহীর সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তাঁর জীবন দান ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরেই স্থান পেয়েছে। শুধু ছাত্রনেতা আসাদ নয়, আইয়ুব শাহীর পতন ঘটাতে সে সময় সাধারণ ছাত্ররা যেভাবে রাজপথে নেমে এসেছিল, তা সত্যিই বিস্ময়কর। এমনকি দশম শ্রেণীর ছাত্র মতিউরও বুক পকেটে মাকে লেখা চিরকুট নিয়ে মিছিলে অংশ নিয়েছিল। তাঁর মৃত্যু বাংলার আপামর জনসাধারণকে যেমন কাঁদিয়েছিল, তেমনি মানুষকে নতুন করে আন্দোলনের শপথে বলীয়ান করেছিল।
জাতীয় নেতাদের অনেককেই আইয়ুব সরকার কারাবন্দী করে রেখেছিলেন। কিন্তু আন্দোলনের মাঠ ফাঁকা পড়ে থাকেনি। ছাত্রনেতারা সামনে থেকে এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। গণতন্ত্রকামী মানুষেরা ছাত্রদের সাথে আন্দোলনে সোচ্চার হয়েছিল। মানুষের মনে সে সময় এই বিশ্বাস দৃঢ়ভাবেই ছিল যে ছাত্ররা আন্দোলন করছে মানে সে আন্দোলনের শতভাগ যৌক্তিকতা রয়েছে। কাজেই, আপামর জনসাধারণ আন্দোলনে অংশ নিতে কোন কুণ্ঠা বোধ করেনি। আর সে জন্যই আমরা গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের তালিকায় গৃহবধূ, কৃষক, শ্রমিকসহ নানান পেশার মানুষের উপস্থিতি দেখতে পাই।
আমরা যদি ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের আগের ইতিহাসের দিকেও তাকাই, তাহলেও ছাত্রসমাজের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা দেখতে পাবো। ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে ’৫৮ সালের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলনেও ছাত্রসমাজ বড় ভূমিকা রেখেছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রসমাজের অবদানের কথা অনস্বীকার্য। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ থেকেই সচেতন ছাত্রসমাজ স্বাধীনতার জন্য কাজ করে আসছিল। সে সময়ের ছাত্রনেতা নুরে আলম সিদ্দিকী, আ স ম আব্দুর রবদের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ডাকসুর ভিপি আ স ম আব্দুর রব স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তলন উদ্বোধন করেন। শ্লোগানে-মিছিলে আওয়াজ তুলে ছাত্রসমাজই সারাদেশে মানুষের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জাগরণ তৈরি করেছিল।
প্রয়াত প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ থেকে শুরু করে জাতীয় নেতাদের পথচলার পেছনে আমরা ছাত্রনেতাদের স্পষ্ট ভূমিকা দেখতে পাই। মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র সংগ্রামে ছাত্রসমাজ কৃষক, শ্রমিক, মজুরদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে। ২৫ মার্চের কালো রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের হত্যা করে, তখন বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল, তা সশস্ত্র সংগ্রামকে আরো বেগবান করেছিল। যুদ্ধের ৯ মাসে ছাত্রসমাজ সারা বাংলায় ছড়িয়ে থেকে বাংলার মানুষকে সাহস জুগিয়েছে, সব বাধা মোকাবেলা করে বিজয়ের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানোর স্বপ্নে মানুষকে বিভোর রেখেছে।
১৯৯০ স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলন যে সফলতার মুখ দেখেছিল, এর পেছনে ছাত্রসমাজের সবচেয়ে বড় ভূমিকা রয়েছে। ’৮২ সালে সামরিক বাহিনী থেকে এরশাদ ক্ষমতা দখলের পর থেকেই ছাত্রসমাজ গণতন্ত্রের দাবি নিয়ে রাজপথে সোচ্চার ছিল। এরশাদ রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই একের পর এক ছাত্র হত্যা চালিয়ে যায়। ১৯৯০ এর অক্টোবর মাসে যখন ছাত্রনেতা নাজিমউদ্দিন জেহাদ শহীদ হন, তখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য গড়ে উঠেছিল। এরপর থেকেই স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন সাফল্যের দিকে যাত্রা শুরু করে। ডা: মিলনসহ বেশ ক’জনের শাহাদতের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটে। মূলত ১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলনের সফলতাই বাংলাদেশকে তখন স্বৈরাচার মুক্ত করে।
কেয়ারটেকার সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও ছাত্র-জনতা অপরিসীম ভূমিকা রেখেছে। একদিকে এই সরকারব্যবস্থার রূপকার অধ্যাপক গোলাম আযমের নেতৃত্বে জামায়াত-শিবির যেমন এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের আন্দোলনেও ছাত্ররা ভূমিকা রাখে। যার ফলে আমরা মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এক সুন্দর ব্যবস্থা পাই। এই ব্যবস্থা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।
পরবর্তীতেও আমরা ছাত্রসমাজের কিছু ভূমিকা দেখেছি। কিন্তু অতীতের তুলনায় তা ছিল অনুজ্জ্বল। ছাত্রসংগঠনগুলো হারিয়েছে স্বকীয়তা, লেজুড়বৃত্তিতে ছাত্ররাজনীতি আজ কলুষিত হয়ে পড়েছে। ভাষা আন্দোলনের যে ধারাবাহিকতা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি পরবর্তীতে, আজ তা মনে করে আমাদের আফসোস করতে হয়।
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর জামায়াত ইসলামীর সমাবেশ পণ্ড করতে এসে পল্টন মোড়ে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা যখন জামায়াত-শিবিরের নিরীহ নেতাকর্মীদের ওপর অস্ত্রসহ হামলা চালিয়েছিল, তখনও কিন্তু আমরা এক ঝলক একুশের ধারাবাহিকতা দেখতে পেয়েছি। শহীদ মুজাহিদ, শিপনরা সেদিন জীবন দিয়ে সন্ত্রাসীদের কালো থাবা কী করে প্রতিরোধ করতে হয় তার দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে রেখে গেছেন।
যখন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ জামায়াত নেতৃবৃন্দকে বিচারিক হত্যাকান্ডের ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে, তখন থেকে বাংলাদেশে আমরা ছাত্র-জনতার গণজাগরণ দেখতে পেয়েছি। আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে দেয়া সাজানো রায়ের পর ছাত্র-জনতা সারা বাংলাদেশে যে আন্দোলনের নমুনা পেশ করেছে, তাও ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। শতাধিক ছাত্র-জনতা একই দিনে অবিচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে যেভাবে নিজেদের জীবন দিয়েছেন, তা পাঠ করে ভবিষ্যতের ছাত্র-জনতা আত্মত্যাগের প্রেরণা খুঁজে পাবে।
’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের সময় যেমন দশম শ্রেণীর ছাত্র মতিউর শহীদ হয়েছে, তেমনিভাবে ৩ ডিসেম্বর ২০১২ সাম্প্রতিক সময়ে দিনাজপুরে দশম শ্রেণীর ছাত্র মুজাহিদ শহীদ হয়েছেন। আমার বিশ্বাস, ইতিহাসবিদদের সত্য লেখনীতে একদিন মুজাহিদের নামও মতিউরের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।
’৯১ সালের পর থেকে আমরা একের পর এক গণতান্ত্রিক সরকার দেখতে পেলেও দুঃখজনকভাবে কোন সরকারই ছাত্রসমাজের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়ক হয়ে ওঠেনি। কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ার ধারাবাহিকতা এখনো বজায় রয়েছে। ফলে ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে সঠিক ব্যক্তি উঠে আসছে না। আর সে জন্যই আমরা দেখছি সন্ত্রাসী হওয়া সত্ত্বেও কেউ কেউ ছাত্রসংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে চলে আসছে।
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ছাত্রসমাজ পরবর্তীতে আন্দোলনের যে ধারাবাহিকতা দেখিয়েছে, তা থেকেই বর্তমানে আমাদের প্ররণা নিতে হবে। প্রতিটি আন্দোলন থেকে আমাদের শেখার অনেক কিছুই রয়েছে। কী করে জালিম শাসকের বিরুদ্ধে ভয়হীন হৃদয় নিয়ে দাঁড়িয়ে যেতে হয়, কী করে আন্দোলনে আপামর জনসাধারণকে একত্রিত করতে হয়, এসব আমরা একুশ ও পরবর্তী আন্দোলনগুলো থেকে শিখতে পারি।
ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসের পাঠ আমাদেরকে বলে, একুশের সংগ্রামীরা যুগের পর যুগ মানুষের জয়গান গেয়ে গেছে। একুশ ছাত্রসমাজের মাঝে যে স্বপ্ন ছড়িয়ে দিয়েছে, তা আজো সাধারণ ছাত্রদের মাঝে ছড়িয়ে আছে। কাজেই, বর্তমানের আওয়ামী অপশাসন বিরোধী আন্দোলনে আমাদের একুশের প্রেরণা নিয়েই ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। কোন আন্দোলনই গাছ থেকে পাকা ফল পাওয়ার মতো সহজ নয়। আন্দোলনের পথে অনেক বাধা আসে, সব মাড়িয়েই ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যেতে পারলে একদিন সফলতার দেখা মেলে।
আজ শাসকের নামে যারা শোষক হয়ে বসে আছে, গণতন্ত্র হরণ করে বাকশাল কায়েমের পাঁয়তারা করছে, তাদেরও একুশ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। শোষণ করে ক্ষমতায় টেকা যায় না, এ সত্য ইতিহাসের পাতায় স্পষ্ট প্রতীয়মান। এভাবে শোষণের পথ ধরে হাঁটতে থাকলে শুধু আওয়ামী লীগ নয়, যে কোন শাসকেরই পতন অবধারিত।
সবশেষে বলতে চাই, একুশ থেকেই আমরা জানি- ছাত্র-জনতা সবই পারে। আজকের জালিম শাসক যদি স্বেচ্ছায় মসনদ থেকে সরে না দাঁড়ায়, তাহলে আগামী দিনে ছাত্র-জনতা তাদেরকে চরম শিক্ষা দেবে। শুধু সময়ের ব্যাপার, ছাত্র-জনতার জয় হবেই ইনশাআল্লাহ।
লেখক : কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply