একুশে ফেব্রুয়ারি কী পেয়েছি, কী পাইনি -ড. ফজলুল হক সৈকত

প্রাক-কথন
যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ভাষাই সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি। ভাষিক আপেক্ষিকতাবাদ স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমাদের পারিপার্শ্বিক জগৎকে দেখার বা ভাববার পথ করে দেয় ভাষাচিন্তÍন-প্রক্রিয়া। আর ভাষা আয়ত্তকরণের অগ্রগতি নির্ভর করে পরিজ্ঞান-পদ্ধতি বা চিন্তÍ বিকাশের ওপর। মানবসভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষ তার জন্মলগ্ন থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া ও পরবর্তীকালে চর্চা করা ভাষার প্রতি দাবি আর দায়বদ্ধতার প্রসঙ্গাদি প্রসারিত করেছে। বিস্তৃত হয়েছে ভাষার অধিকার আর মর্যাদাবিষয়ক ভাবনারাজি। অপরাপর সামাজিক মৌলিক অধিকার অর্জন-প্রাপ্তির মতো ভাষার অস্তিত্ব-রক্ষার চিন্তাবলয়ও মানুষকে বিচলিত ও সচেতন রাখে আটপ্রহর। তেমনই এক স্বাভাবিক ভাষাপ্রীতি আর ভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম বাঙালির ঐতিহ্যে যোগ করেছে নবতর ইতিহাস আর অর্জনের সম্ভ্রম। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে বাঙালি আর বাংলাকে পৌঁছে দিয়েছে বিশ্বমানবের বিশেষ অভিনিবেশের মহাসড়কে। বায়ান্নোর ভাষা-আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম সুসংহত স্ফুরণ; বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন ছিল মুখ্যত একটি জাতীয় সংগ্রাম। আর এর মূলকথা ছিল ভাষাগত স্বাতন্ত্র্যচেতনা।

পটভূমির আগের কথা
আমাদের ভাষার ওপরে আক্রমণের ব্যাপারটা আকস্মিকভাবে, পাকিস্তান শাসনকালে, ঘটেছেÑ এমন নয়; আগেও ঘটেছে। বিশশতকের প্রথমদিকে ভারতের জাতীয় ভাষা নির্ধারণ-প্রশ্নে বাংলা ভাষা প্রথম বাধার শিকার হয়। রাজকার্য পরিচালনা এবং জ্ঞানের আদান-প্রদানের জন্য একটি সাধারণ ভাষার প্রয়োজন দেখা দেয়। ভাষাগত উৎকর্ষ, ভাষাব্যবহারকারীর সংখ্যা, সাহিত্য এবং সংস্কৃতির ধারক ও লালনকারী হিসেবে, তখন ভারতে, ১৪৭টি ভাষার মধ্যে বাংলা ছিল অগ্রবর্তী। বাংলার বাইরে বিভিন্ন দিকে তার পরিব্যাপ্তি ছিল, মর্যাদা ছিল; মননের ও কাজের বিচিত্রদিকে অবিভক্ত ভারতে ছিল বাঙালির খ্যাতি। কিন্তু ধর্ম-ব্যবসা-রাজ্যবিস্তার আর জ্ঞানপ্রচারের বাহনরূপে বাংলা ভাষার প্রসারের প্রাসঙ্গিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়- এর বর্ণমালা ও বানানের অস্পষ্টতা-অস্থিতি এবং সহজ-আয়ত্ত নয় বলে। ফারসি-সংস্কৃত-ইংরেজির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় কার্য-পরিচালনায় বাংলা সেদিন তার সম্ভাব্যতা হারিয়েছে কেবল হিন্দি ভাষাব্যবহারকারীদের প্রতিপত্তি ও আধিপত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গিজাত রাজনৈতিক কারণে। কেননা, সে সময় কংগ্রেস নেতারা হিন্দিকে ভারতের জাতীয় ভাষা করার পক্ষে জোরালো ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ববিশ্রুত ব্যক্তিত্ব নোবেল বিজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে বিশ্বভারতীতে অনুষ্ঠিত ভারতের জাতীয় ভাষা কী হওয়া উচিত তা নিয়ে এক সেমিনারে নানা যুক্তি-প্রমাণ উত্থাপনের মাধ্যমে বাংলা ভাষাই যে ভারতের জাতীয় ভাষা হওয়ার যোগ্যতা রাখে তা দৃঢ়তার সাথে তুলে ধরেন নিষ্ঠাবান গবেষক ও বহুভাষাবিদ পন্ডিত ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ডক্টর জিয়াউদ্দীন আহমদ উর্দুকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা উচিত হবে বলে এক প্রবন্ধে মত প্রকাশ করলে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ দৈনিক আজাদে প্রকাশিত তার প্রতিবাদ জানিয়ে বললেন, বাংলাদেশের কোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দু বা হিন্দি ভাষা গ্রহণ করা হলে এটা রাজনৈতিক পরাধীনতারই নামান্তÍর হবে। দেশবিভাগ-পরবর্তীকালে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা-প্রশ্নে রাজনৈতিকভাবে উর্দুকে আরোপ করার অনুপুঙ্খ চেষ্টা চলেছে; এ ছাড়া পূর্ব-পাকিস্তানে আরবি হরফে, অথবা, না-পারলে, নিদেনপক্ষে রোমান হরফে, বাংলা লেখার প্রস্তাবনাও বাংলা ভাষার মর্যাদা এবং অধিকারে আঘাত হেনেছে অনিবার্যভাবে। আর তখন থেকেই চিহ্নিত হতে থাকে বাংলা ভাষার শত্রু-মিত্র।
যে মাতৃভাষার জন্য তৎকালীন পূর্ববঙ্গের জনসাধারণ আন্দোলন করেছিল, আক্ষরিক অর্থে তা মুখের ভাষা ছিল না। কথ্য ভাষার জন্য প্রকৃতপক্ষে এমন আন্দোলনের দরকার হয় না। বাঙালির যদি শুধু ভাষার কথ্য রূপটাই থাকতো, তাহলে আন্দোলন অর্থহীন হতো। পৃথিবীতে এখনও অনেক জাতি-উপজাতি রয়েছে, যাদের গোষ্ঠীগত নিজস্ব ভাষা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের প্রধান ভাষায় ব্যবহারিক কাজকর্ম করতে হয়। তাই বলতে হয়, সমস্যা দেখা দিয়েছিল বাংলা ভাষার লেখ্য রূপ থাকার জন্য, তা-ও আবার তা কি না উর্দুর চেয়ে পুরনো, সর্বোপরি, তার ছিল এমন এক সমৃদ্ধ ইতিহাস, যা পৃথিবীর বহু উন্নত ভাষাতেও বিরল। এমনকি ইসলামি সাহিত্যের বিচারেও তা উর্দুর চেয়ে পিছিয়ে ছিল না। একুশের ভাষা-আন্দোলন তাই লেখ্য বাংলা ভাষার আন্দোলন, যার ওপরে আক্রমণ এসেছিল, এবং যা রক্ষা করতে বাঙালি তরুণদের প্রাণ দিতে হয়েছিল।

পরিপ্রেক্ষিত
একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল ওই একটি দিন কিংবা তারিখকেন্দ্রিক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; একটি জাতির, একটি ভাষার অস্তিত্ব ও মর্যাদার ওপর আসতে-থাকা আঘাতের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ধারাবাহিক-পরিকল্পিত চেতনার যোগফল। হাজার বছরের বাংলার ভাষা-সংস্কৃতির ঐতিহ্য আর বাংলা ভাষাসম্পদের চারিত্র্য রক্ষার অবশ্যম্ভাবী প্রতিবাদের অপর নাম একুশে ফেব্রুয়ারি। ভারত-পাকিস্তানের স্বাধীনতা লাভের পর থেকে বায়ান্ন-পরবর্তী সময়েও চলতে থাকে এই চেতনার বাদ-প্রতিবাদ। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগ এবং পাকিস্তানের স্বাধীনতাপ্রাপ্তির (১৪ আগস্ট ১৯৪৭) অব্যবহিত পরই পূর্ব-পাকিস্তানের (আজকের ‘বাংলাদেশ’ নামক ভূখন্ড) জনগণ উপলব্ধি করেছে তাদের ঘোরলাগা-মেকি রঙমাখা চোখে আঁকা ‘সোনালি স্বপ্নে’র বাস্তবতা। তারা তখন দেখতে শুরু করেছে সামন্তÍবাদ-সাম্রাজ্যবাদের নিষ্পেষণে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, শিক্ষা-ভাষা-সংস্কৃতির স্বাভাবিক বিচরণে প্রতিবন্ধকতা আর গণতন্ত্র নির্বাসনের ইঙ্গিত।
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় পাবলিক সার্ভিস কমিশনের তদানীন্তÍন সচিব মি. গুড ইন ১৯৪৭ সালের ১৫ নভেম্বর তারিখে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার বিষয়াদি সম্পর্কে একটি সার্কুলার প্রেরণ করেন। এ সার্কুলারে ঐ পরীক্ষার জন্য সর্বমোট ৩১টি বিষয় দেয়া হয়, যার মধ্যে ৯টি ছিল ভাষা; এ সকল ভাষার মধ্যে হিন্দি, উর্দু, ইংরেজি, জার্মান, ফরাসি এমনকি মৃতভাষা ল্যাটিন ও সংস্কৃতও স্থান পায়, কিন্তু স্থান পায় না পাকিস্তানের অধিকাংশ জনগণের মাতৃভাষা বাংলা। এ সার্কুলারের উল্লেখ করে অধ্যাপক আবুল কাসেম কলিকাতার দৈনিক ইত্তেহাদ-এ একটি বিবৃতি দেন। ৩০ ডিসেম্বর তারিখে ঐ বিবৃতি এবং এ সম্পর্কে পত্রিকার সম্পাদক আবুল মনসুর আহমদের লেখা এক কড়া সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়। অতঃপর ১৯৪৭ সালের শেষদিকে করাচিতে অনুষ্ঠিত সরকারি শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বা লিংগুয়া ফ্রাংকা করার সুপারিশ করা হয়। এ খবর ঢাকায় পৌঁছার সাথে সাথে ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া পোস্টকার্ড, খাম, মনি অর্ডার ফরম, রেলের টিকিট ও টাকায় কেবল ইংরেজি ও উর্দুর ব্যবহারের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র-শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও সচেতন শিক্ষিতমহলে বিশেষ ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
১৯৪৮ সালে প্রাদেশিক পরিষদে ব্যাপকভাবে আলোচিত হবার পর বাংলা ভাষার বিরোধীরা আন্তÍরিকভাবে না হলেও বাংলা ভাষার রাষ্ট্রভাষা হওয়ার যুক্তি স্বীকার করতে বাধ্য হন। কিন্তু তাদের মনের কথা ছিল অন্যরকম। আধিপত্যবাদী-আগ্রাসী শাসক ইংরেজ যেমন ভারতের জনগণের ভাষাকে উপেক্ষা করে নিজ ভাষাকে এ ভূখন্ডে দিয়েছিল বিশেষ মর্যাদা, নবগঠিত পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীও পূর্ব-পাকিস্তানের জনতার ভাষাকে অবহেলা করে, রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে, চাপিয়ে দিতে চাইল তাদের ভাষা উর্দুকে। তখন বাংলা ভাষার অস্তিত্ব ও মর্যাদা রক্ষার জন্য এবং অন্য অর্থে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সংঘটিত হয়েছে ভাষা-আন্দোলন বা ভাষা-সংগ্রাম। সংখ্যাগুরু হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানের আইন-পরিষদে এবং অন্যত্র বাঙালির প্রভাব হবে উর্দুভাষীর চেয়ে কম- এমনটি সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি সেদিনের বাংলাভাষী মানুষ। এই সংগ্রামের ইতিহাস ও প্রসঙ্গ কেবল আলঙ্কারিক বর্ণনা-ভাষ্য নয়; এর ভেতরে রয়েছে আবেগ আর জাতীয়তা-সংলগ্নতার উর্বর বীজতলা। ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ কিংবা ‘মাগো ওরা বলে,/সবার কথা কেড়ে নেবে/তোমার কোলে শুয়ে/গল্প শুনতে দেবে না’- এইসব উত্তেজক-জনপ্রিয় গান-কবিতায় প্রকাশিত হয়েছে জন্মসূত্রে পাওয়া মায়ের ভাষা ব্যবহার করার অধিকারবোধ। ১৯৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারি, বাঙালি, রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে, প্রাদেশিক বাজেট অধিবেশন চলাকালে, সরকারঘোষিত আন্দোলন-প্রতিরোধক ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে, দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে এবং জীবন উৎসর্গ করে। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য রাজপথে রক্তদান মানব ইতিহাসের এক বিরল ঘটনা। জাতিসত্তার ধারণা বদলে দিতে পারে এমন ঘটনা সব সময় ঘটে না। কিন্তু ১৯৫২’র একুশে ফেব্রুয়ারিতে তেমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। আবহমান বাংলার ইতিহাসে ধূমকেতুর আবির্ভাবের মতো এই ঘটনা বাঙালি জাতিসত্তার ধারণায় নতুন মাত্রা যোগ করে এবং ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চিত করে রাখে এক অমিত সম্ভাবনা। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ সে সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ।
মাতৃভাষার স্বাধিকারচিন্তÍ তখন কেবল ভাষাকেন্দ্রিকই আবদ্ধ থাকেনি; মন-প্রাণ যুক্ত হয়ে মানবগোষ্ঠীর সামগ্রিকতায় উন্নীত হয়েছিল। বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতি-অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎও রাষ্ট্রভাষা-চিন্তÍার অন্তÍর্গত ছিল। এই অলঙ্ঘ্য কারণেই আটচল্লিশ-বায়ান্নোর ভাষা-আন্দোলন। একুশে ফেব্রুয়ারি- প্রতীকে ধারণ করে রেখেছে প্রতিবাদী, সংগ্রামী বাঙালিত্বের অভিযান।

প্রাপ্তি
একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের চূড়ান্তÍ বিজয়ের স্মারক, যা আমাদেরকে অস্তিত্বের গভীর শেকড়ের দিকে তাকাতে বাধ্য করে, যে স্মারক মাতৃভাষা শব্দটিকে দেয় অনন্য তাৎপর্য, মায়ের প্রতি ভালোবাসার মতোই আমাদের আবেগকে উদ্বেলিত করে, সংগ্রামে প্রেরণা দেয়, সঙ্কটে দেয় আশ্রয়। ভাষা-আন্দোলনের এই দিনটি ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে মর্যাদা পায় এবং ১৯৫৬-তে বাংলা ভাষা, উর্দুর পাশাপাশি, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে শাসনতান্ত্রিক স্বীকৃতি লাভ করে। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের (১৯৭১) মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জিত হলে বাংলা একক রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করে। মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার এই দুর্লভ আত্মত্যাগ ও পরম মূল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ইউনেস্কো ১৯৯৯-এর ১৭ নভেম্বর ২১-এ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তÍর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে।
১৯৯৭ সালে ১ জানুয়ারি ‘বহুভাষিক ও বহুজাতিক মাতৃভাষাপ্রেমিক গ্রুপ’ নামে যে সংগঠনটি যাত্রা শুরু করেছিল, সেটিই পরবর্তীকালে ‘মাদার ল্যাংগুয়েজ লাভার্র্স অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নাম ধারণ করে। এবং এই নবনামাঙ্কিত সংগঠনটি একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তÍর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার যাবতীয় সাংগঠনিক-প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ ও দায়িত্ব পালন করে। এতদিন একুশে ফেব্রুয়ারি সাড়ম্বরে কেবল বাংলাদেশে পালিত হতো; আর বাংলাদেশের বাইরে আংশিক-বিচ্ছিন্নভাবে পালিত হতো ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ও ত্রিপুরায়। ২০০০ সাল থেকে জাতিসংঘভুক্ত দেশসমূহে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন হচ্ছে ‘আন্তÍর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে। সারাবিশ্বে উচ্চারিত হচ্ছে বাংলাদেশের নাম, আলোচনার টেবিলে জায়গা পেয়েছে ভাষা-শহীদদের আত্মত্যাগের মহিমা এবং বাঙালির শৌর্য ও বীরত্বের কথামালা। প্রসঙ্গত মনে করা যায়, ‘আন্তÍর্জাতিক মে দিবস’ (শ্রমিক দিবস)-এর কথা। ১৮৮৬-র মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে ঘটেছিল শ্রমিক অভ্যুত্থান; প্রতিদিন ৮ (আট) ঘন্টা কাজের দাবিতে আন্দোলনে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন শ্রমিকরা। ১৮৯০ সাল থেকে দেশে দেশে প্রতি বছর পয়লা মে পালিত হয়ে আসছে। আন্তÍর্জাতিক চরিত্রের ‘মে দিবস’ মূলতই শ্রমিক মানুষের। আর আমাদের মাতৃভাষা বাংলার ক্ষেত্রে বিবেচ্য যে, গুরুত্বে-মাত্রিকতায় সেই পরিধি ব্যাপকতর, বহুধাবিস্তৃত। কেননা, ভাষার সম্পৃক্ততা সব মানুষকে নিয়েই; মানুষের সর্বাঙ্গীণতার ধারক-পরিচায়ক তার ভাষা-সম্পদ। স্বাধিকার-নিশ্চয়তার আরেক নাম মাতৃভাষার অধিকার।
একুশ থেকে আমরা লাভ করেছি ঐতিহ্য পুনর্গঠনের বিষয়-পরিসর। শহীদ মিনারের গঠন, প্রভাতফেরি অনুষ্ঠান বা আলপনার ব্যবহারের মধ্যে তার প্রতিফলন রয়েছে। বিশেষভাবে প্রাচীন কৃষিসংস্কৃতির অন্যতম লোকশিল্প আলপনার যে নবরূপায়ণ এখানে ঘটেছে, তা এক অভিনব আধুনিক সংযোজন। শহীদ মিনারের ভাস্কর্যের মধ্যে ইউরোপীয় কৌশলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশীয় চেতনার মিশ্রণ। প্রভাতফেরির মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে অজ্ঞাত অতীতের খালি পায়ে পরিভ্রমণের স্মৃতি। মূলত একুশের অনুষঙ্গ যে আবহ সৃষ্টি করে, তা নতুনভাবে গড়ে ওঠা এক সমৃদ্ধ আধুনিক জাতিসত্তার গাঠনিক উপাদান, চেতনায় যা সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের পরিচয়বাহী।

আপাত প্রাপ্তির অন্তÍরালে
মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রভাষার অধিকার লাভ এবং পরবর্তীকালে বিশ্বপ্রেক্ষাপটে ‘আন্তÍর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ অভিধাপ্রাপ্তির মধ্যে রয়েছে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি এবং সামাজিক-রাজনৈতিক স্বস্তি। বাংলাভাষী মানুষ মর্যাদা ও স্বস্তির একটি বিশেষ পর্যায়ে উন্নীত হলেও বাংলা ভাষা আজও অযতœ আর অবহেলার পাহাড়সম যন্ত্রণা বহন করে চলেছে। প্রশাসনিক কাজে এবং শিক্ষা ও প্রচারব্যবস্থায় অস্বাভাবিক ইংরেজিপ্রীতি আর বাংলা ভাষার যথেচ্ছ প্রয়োগ আমাদের সমূহ প্রাপ্তির পিঠে এক প্রবল আঘাতের চিহ্ন হিসেবে আজ বর্তমান। বাঙালির ইংরেজিয়ানা এবং ভাবপ্রকাশে জাতিগত হীনমন্যতা কম লজ্জার নয়। প্রায়োগিক-ভাষার অস্থিরতা মানবমনকেও বিচলিত-বিভ্রান্তÍ করছে প্রতিনিয়ত। আর সারা দুনিয়ায় মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে আমাদের অবদানের জয়গান ঘোষিত-প্রচারিত হলেও এই দেশে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা-সংস্কৃতির লালনে আমরা সরকারি ও রাজনৈতিকভাবে ভীষণরকম অমনোযোগী এবং দায় ও দায়িত্ববর্জিত।
ভাষা-আন্দোলন সংঘটিত হবার প্রায় ছয় দশক অতিক্রান্তÍ হলেও, আজও তৈরি হয়নি এর নির্ভরযোগ্য ইতিহাস। সংগ্রামে পুরোভাগে নেতৃত্বে কারা ছিলেন, কতজন প্রাণ দিয়েছেন, কতজন আহত হয়েছেন এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কী?Ñ তার সঠিক হিসাব পাওয়া অন্তÍত কঠিন নয়; আজও জীবিত ও সক্রিয় রয়েছেন বেশ কয়জন ভাষাসৈনিক, রয়েছে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রচেষ্টা; রয়েছে আন্তÍর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট, অন্যান্য গবেষণা-প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্টতা। ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারির সংবাদপত্রের তথ্যানুযায়ী ২১ তারিখে পুলিশের নির্বিচার গুলিতে নিহতের সংখ্যা তিনজন, আহত ৩০০ জন ও গ্রেফতার ১৮০ জন; ২৩ ফেব্রুয়ারির সংবাদপত্রে পরিবেশিত তথ্য থেকে জানা যায়, নিহত পাঁচজন, আহত ১২৫ জন ও গ্রেফতার ৩০ জন; ২৪ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় কর্মপরিষদের সভা থেকে সরকারকে ৭৫ ঘন্টার আলটিমেটাম দিয়ে যে পত্র দেয়া হয়, তাতে ৩৯ জন শহীদ হয়েছেন বলে দাবি করা হয় (এবং ওই সভায় ৫ মার্চ ‘শহীদ দিবস’ পালনের সিদ্ধান্তÍ নেয়া হয়); ২১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৭টায় লেখা একুশের প্রথম কবিতায় মাহবুব উল আলম চৌধুরী বলেছেন- ‘ওরা চল্লিশজন কিংবা আরো বেশি/যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে রমনার রৌদ্রদগ্ধ/কৃষ্ণচূড়ার গাছের তলায়/ভাষার জন্য, মাতৃভাষার জন্য বাংলার জন্য/যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে’; প্রভাত ফেরিতে আবদুল গাফফার চৌধুরীর যে গান আমরা গাই, তাতে তিনি লিখেছেন- ‘ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু-গড়া এ ফেব্রুয়ারী/আমি কি ভুলিতে পারি’। আজকের প্রজন্মের কাছে, বিশ্ববাসীর কাছে, ‘আন্তÍর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ পালনের মাহাত্ম্যকে তুলে ধরতে হলে প্রয়োজন ইতিহাস-অন্বেষা এবং সঠিক তথ্য পরিবেশনের সদিচ্ছা। রাষ্ট্র, সরকারি- বেসরকারি প্রচারমাধ্যম কিংবা বাংলা একাডেমিসহ অন্যান্য গবেষণা-প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় এ দায়িত্ব পালনের দায় গ্রহণ করতে পারে।

ভাষার মর্যাদা
ভাষার প্রায়োগিক পদ্ধতি ও প্রকরণ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বিস্তর; সাহিত্য-শিল্পে এবং দাফতরিক (অফিসিয়াল) ভাষার ক্ষেত্রে আঞ্চলিকতার প্রসঙ্গ নিয়েও কম কথা হয়নি। উপভাষার লালন-সংরক্ষণ সম্বন্ধেও ভাষাবিদগণ ভেবেছেন- ভাবছেন। কিন্তু আমার মনে হয়, আজও, বাংলাভাষা, রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাবার প্রায় ষাট বছর পরও, পায়নি তার যথাযথ সামাজিক মর্যাদার প্রাপ্য ও প্রত্যাশিত আসন। বাংলাভাষার প্রমিত বানান কিংবা যথার্থ উচ্চারণ প্রয়োগে আমাদের অনীহার জায়গাটি যেন ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। প্রচারমাধ্যম-পাঠপুস্তক-পাঠকার্যক্রমসহ সব মাধ্যমেই চলছে ভাষার যথেচ্ছ বানান ও উচ্চারণের প্রবণতাÑ যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এমনকি বাক্যগঠনেও অন্যভাষার অনুকরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় বাংলাভাষা হারাচ্ছে তার সৌন্দর্য ও আভিজাত্য (যেমন: সংবাদপ্রতিবেদন বা অনুষ্ঠান সঞ্চালনের সময় কেউ কেউ বলছেন: ‘…আপনি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছেন?’ বা ‘…বলুন, আপনাকে আমি শুনতে পাচ্ছি’ কিংবা নাটকের কোনো সংলাপে : ‘তোমাকে আমি লাভ করি’ অথবা ‘আমাকে ট্রাস্ট করতে পারো’ ইত্যাদি।)
ভাষাপ্রকাশের মাধ্যমগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বই। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশে পুস্তক প্রকাশনাকে শিল্প খাত হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ায় এবং প্রাসঙ্গিকভাবেই এই ক্ষেত্রে কোনো নীতিমালা না থাকায় বিরাজ করছে ভয়াবহ অরাজকতা। নোটবই প্রকাশের অভয়ারণ্য সৃষ্টির মাধ্যমে জাতির সৃজনশীলতা বিনষ্টের মহাযজ্ঞ তৈরি করা হয়েছে। প্রকাশনা ও বিপণনেও রয়েছে দৃষ্টিগ্রাহ্য অস্বচ্ছতা। বিদ্যালয়ে পাঠাগার প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে আজও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। অভিধান ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং এর সহজলভ্যতাও নিশ্চিত করা যায়নি। বাংলাদেশের বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভুল উচ্চারণে ইংরেজি শেখানোর বিষয়টি একরকম রীতিতে পরিণত হয়েছে। আর দুঃখজনকভাবে, বাংলাভাষার যথার্থ শিক্ষা প্রদানের উপযুক্ত লোক বিদ্যালয়ে নিয়োগ দেওয়া যায়নি। ভাষা বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রাথমিক জ্ঞান পর্যন্তÍ নেইÑ এমন শিক্ষকই সাধারণত বিদ্যালয়ে ভাষা এবং ব্যাকরণের পাঠ দান করে চলেছেন। অবশ্য এর জন্য তিনি দায়ী নন; এর সমূহ দায় শিক্ষাব্যবস্থাপনা ও শিক্ষাপ্রশাসনের। কাঠামোটিকে প্রয়োজন-অনুযায়ী সাজানো হয়নি আজও। বছর বছর বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ছে; নিয়োগ দেয়া হচ্ছে হাজার হাজার শিক্ষক; কিন্তু নিয়োগ দেয়া হচ্ছে না ভাষাশিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত কিংবা প্রশিক্ষিত ভাষাশিক্ষক। সম্প্রতি প্রণীত শিক্ষানীতিতেও এ বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা নেই। সারাদেশে প্রশিক্ষণ চলে বহুভাবে; কিন্তু তার প্রায়োগিক বাস্তবতা নিয়েও রয়েছে নানান প্রশ্ন।
সময়তো অনেক গড়ালো। আর বিলম্ব না করে, আমাদের প্রাণের ভাষা, সংগ্রামে প্রতিষ্ঠিত অহঙ্কারের ভাষাÑ বাংলাকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দিতে আরেকবার বিপ্লবে যোগ দিতে হবে আমাদেরকেই। ভাষার শুদ্ধচর্চা ও লালনকে প্রণোদনা দেবার জন্য যথেষ্টসংখ্যক প্রশিক্ষণ ও চর্চাকেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। এ বিষয়ে জেলা শিল্পকলা একাডেমিকে প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যায়; জেলাপর্যায়ে সরকারি প্রশিক্ষক নিয়োগ করে প্রতিষ্ঠা করা যায় ভাষাশিক্ষা ও প্রশিক্ষণের উপযুক্ত ভুবন। আন্তÍর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটকে ভাষার মর্যাদা-আভিজাত্য-শুদ্ধতা রক্ষাণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিয়ে জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে ভাষাশিক্ষক ও ভাষাপ্রশিক্ষক নিয়োগ দেয়ার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। এর পরিসর বাড়ানো যায় আন্তÍর্জাতিক পরিমন্ডলেও। আর নিয়মিতভাবে ভাষাবিষয়ক গবেষণা ও প্রকাশনাকে উৎসাহিত করাও জরুরি। প্রয়োজনে আন্তÍর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রখ্যাত ভাষাবিদ এবং বহুভাষাবিদ পন্ডিতদের জন্য উচ্চতর ও প্রায়োগিক গবেষণার ক্ষেত্রও তৈরি করতে হবে। চলচ্চিত্র, নাটক, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে ভাষার প্রায়োগিক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রকে প্রসারিত করা যায় (প্রসঙ্গত, ইংরেজি ভাষায় নির্মিত ভিনচি পাওয়েল প্রণীত ও স্টুয়ার্ট অ্যালেন প্রযোজিত ভাষাশিক্ষাবিষয়ক সিরিয়াল ‘মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গুয়েজ’ কিংবা বার্নার্ড শ’ রচিত ও জর্জ কুকার পরিচালিত ম্যুভি ‘মাই ফেয়ার লেডি’-র কথা মনে করতে পারি।) পোস্টার-প্রচারপত্র, টেলিভিশন-রেডিওতে আলোচনা ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজনও নিশ্চয়ই এ ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি, ভাষাপ্রতিযোগিতা আয়োজন করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীসমাজকে ব্যাপকভাবে ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগে অভ্যস্ত করে গড়ে তুলতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে শুদ্ধ বাংলা প্রয়োগের ব্যাপারে আগ্রহ বৃদ্ধির জন্য বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। সরকারের পাশাপাশি এগিয়ে আসতে পারে উন্নয়নভিত্তিক সংস্থা ও ব্যক্তি। বিদ্যালয়ের পাঠক্রমে বানানের প্রমিত নিয়ম ও উচ্চারণের রীতি অন্তÍর্ভুক্ত করতে হবে। (উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়- সম্প্রতি নরসিংদী জেলার কিন্ডারগার্টেন স্কুল অ্যাসোসিয়েশন ত্রিশটি বিদ্যালয়ে প্রমিত বাংলা বানান ও উচ্চারণের নিয়ম পাঠ্য হিসেবে চালু করেছে।) আমরা সকলেই হয়তো মানবো যে, ভিত্তি মজবুত না হলে যেমন ভবন দুর্বল হয়; তেমনই ভাষাশিক্ষার ভিত্তি শক্তিশালী না হলে জাতিগতভাবে ভাষার গৌরব ও মাহাত্ম্য ধসে পড়তে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়পর্যায়ে বাংলাভাষার একটি কোর্স বাধ্যতামূলক করার কথা সাম্প্রতিককালে বারবার উচ্চারিত হয়েছে; অবশ্য এর বাস্তবভিত্তিক প্রয়োগ এখনও বক্তব্য আর কাগজের পাতায় খবরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। অফিস-আদালতে বা কর্মক্ষেত্রে ব্যবহারিক বাংলাভাষার শুদ্ধ প্রয়োগ নিশ্চিত করার জন্য দরকার সরকারি আগ্রহ-উদ্যোগ। সরকারি-বেসরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পণ্যের বিজ্ঞাপনে ভাষাপ্রয়োগের ক্ষেত্রে অসচেতনতা কিংবা ইচ্ছা করে ভাষার অপপ্রয়োগের প্রবণতা পরিহার করতে হবে। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নীতিমালাও গ্রহণ করা যায়।

আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতির লালন
অল্প কিছুকাল আগে, বাংলাদেশে, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষাকে শিক্ষা অর্জনের মাধ্যম করা যায় কি না, সে বিষয়ে সরকারিপর্যায়ে চিন্তÍাভাবনা শুরু হয়েছে। এই চিন্তÍা আগামীতে দেশ ও জাতির উন্নয়ন এবং অগ্রগতির ধারায় নিঃসন্দেহে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ করবে কি না, সে বিষয়ে বিস্তর আলোচনার সুযোগ রয়েছে। এ কথা ঠিক যে, প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার রয়েছে তার মাতৃভাষায় শিক্ষা-অর্জনের। চিন্তÍর প্রাগ্রসরতা এবং ব্যক্তিগত ও জাতিগত স্বাতন্ত্র্যের জন্য প্রত্যেকের মাতৃভাষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। তারা সেসব দেশের আইন-কানুন মেনে নিজেদের সত্তা নিজেদের মধ্যে লালন করে সে দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভেতর স্বাধীন ও স্বাভাবিকভাবে বসবাস করে। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বা উপজাতি সম্প্রদায় অধিকার এবং মর্যাদাবোধের প্রশ্নে কালক্রমে সামনে এগিয়ে আসছে। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে তাদের রয়েছে সমান অধিকার। এটিই স্বাভাবিক। অবশ্য, যেহেতু অফিস ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব পাবার মতো প্রভাব বা পরিস্থিতি তাদের ভাষার অনুকূলে নয়; তাই, কেবল নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্তÍ তারা মাতৃভাষায় লেখাপড়া করলে নিজ ভাষাচর্চা ও লালনের পথ সুগম রাখা যায়। কেননা, পরিচয়ে তারা বাংলাদেশী; এবং সারা দুনিয়ায় এই পরিচয় তাদের অবস্থা ও অবস্থানকে নির্দেশ করার দায়িত্বভার গ্রহণ করতে পারে। তবে, কোনোরকম দ্বিধা বা সঙ্কোচ মনে না রেখে, বাংলাদেশকে, অন্যসব নাগরিকের মতো ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অধিবাসীদেরকে সমানভাবে প্রিয় মাতৃভূমি ভাবতে হবে; বিশ্বাস করতে হবে। আমাদেরকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, প্রতিটি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি রয়েছে। তাদের জীবনধারা, সমাজব্যবস্থা, মূল্যবোধ, ঐতিহ্য, রীতি-প্রথা, আচার-অনুষ্ঠান সবকিছুতেই স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য লক্ষ্য করা যায়। বিষয়টির দিকে নজর রেখে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর চিন্তা ও মননশীলতার বিকাশ ঘটাতে পারলে সবার মাঝে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি এবং ভুল বোঝাবুঝি দূর হওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি উঁচুমানের জাতীয় চেতনার বিকাশ ঘটতে পারে মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভের মধ্য দিয়ে।
বর্তমানে পার্বত্য অঞ্চলে ১১টি নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর ভাষার মধ্যে চাকমা এবং মারমা ছাড়া অবশিষ্ট ৯টি ভাষা- ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চংগ্যা, চাক, বম, লুসাই, পাংখোয়া, থিয়াং এবং খুমি সঙ্কটাপন্ন। ভাষার মর্যাদা ও অধিকারের জন্য আমাদের পূর্বপুরুষরা লড়াই করেছেন; তাদের অর্জন ও স্বীকৃতি সারা দুনিয়ায় প্রভাব ও চিন্তা বিস্তার করেছে। কাজেই আমাদের দায়িত্বও বেশি। আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক অধিকার সংরক্ষণ করা জরুরি। শিক্ষাব্যবস্থায় অবহেলার শিকার হওয়ার কারণে আদিবাসীদের ভাষা মরতে বা হারাতে বসেছে। মাতৃভাষাকে বাদ দিয়ে তারা অন্য ভাষা আয়ত্ত করতে আগ্রহী হয়ে উঠছে অথবা বাধ্য হচ্ছে- প্রায়োগিক জীবনের প্রয়োজনে। আদিবাসীদের ভাষাচর্চা ও গবেষণার জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা ফ্যাকাল্টি প্রবর্তন করা যেতে পারে। সংস্কৃত-পালির মতো সামাজিকভাবে মৃত ভাষা যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়, তবে কেন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জীবিত ভাষা বিষয়ে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়াতো চলতেই পারে। এমনকি উপজাতিদের ভাষার তাত্ত্বিক ও বিষয়ভিত্তিক ব্যাপক গবেষণার দ্বারও প্রসারিত হতে পারে সরকারি-বেসরকারি আগ্রহ-উদ্যোগে। আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে তাদের চিন্তা লালন, চর্চা এবং সৃজনশীলতাকে বিকাশের পথ সুগম করা যায়। সংস্কৃত পালি প্রভৃতি ভাষা যেমন পড়ানো হচ্ছে, তেমনি চলছে ফার্সি ভাষা বিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণার মতো কার্যক্রম। সে বিবেচনায় জীবিত জাতিগোষ্ঠীর সচল ভাষাবিষয়ে পাঠ ও গবেষণা অত্যন্তÍ প্রাসঙ্গিক। ভোটাধিকারের মতো গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষাকে বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাকেন্দ্রের সীমানায় নিয়ে আসতে হবে।

প্রত্যাশা
একুশে ফেব্রুয়ারির মাহাত্ম্য, আজ, বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে আন্তÍর্জাতিক পরিমন্ডলে বিস্তৃতি লাভ করেছে। ফলে ২১-কে নতুনভাবে জানার, উপলব্ধি করার ও বিশ্লেষণের এক বিশেষ ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। নতুন কাল-পরিসরে নিজস্ববলয়ে পূর্বাপর প্রাসঙ্গিকতা চিহ্নিতকরণের চেষ্টা করা যেতে পারে। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চলসমূহে শিক্ষার বাহনরূপে ওইসব জাতির ভাষাকে ব্যবহারের পক্ষে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার; বৈজ্ঞানিক শিক্ষানীতি এবং মানবাধিকারের স্বার্থেই এমনটি বিবেচ্য। সারা দুনিয়ায় কতটি মাতৃভাষা রয়েছে, কতটি ভাষা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় আসীন, কোনো ভাষা রাষ্ট্রীয়-সামাজিক-সাংস্কৃতিক পেষণের শিকার কি-না; শিকার হয়ে থাকলে, তা থেকে উত্তরণের কৌশল ও উদ্যোগ বাস্তবায়ন-প্রচেষ্টা এবং সকল জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষাকে তাদের শিক্ষা ও সাহিত্য শিল্পচর্চার মাধ্যম হিসেবে অগ্রবিবেচ্য রাখার দাবির প্রসঙ্গ, আজ, ‘আন্তÍর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’-এর প্রধান প্রতিপাদ্য হওয়া উচিত। কেবল অন্ধ ইতিহাসচর্চায় আত্মনিমগ্ন না থেকে, যে পরিপ্রেক্ষিতে এই সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছিল, তা মনে রেখে, বাংলা ভাষার সামর্থ্য ও সৌকর্য বৃদ্ধির জন্য বাংলাভাষার স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যাকরণ রচনার উদ্যোগ এবং ভাষা-প্রয়োগে সবধরনের গোঁজামিল-অসমতা-বিভ্রাট-নৈরাজ্য দূর করার চেষ্টা করতে হবে। আর এই প্রচেষ্টার পাশাপাশি পৃথিবীর সকল মাতৃভাষার সঠিক পরিচর্যায় মনোনিবেশ করতে হবে; এবং এ দায় ও দায়িত্বের অনেকটাই বাংলাভাষীর ওপর- স্বাভাবিক ও ঐতিহ্যিক-ঐতিহাসিক কারণেই।

শেষকথা
ভাষাকে বাঁচাতে হলে, ভাষার মর্যাদা ও অধিকারকে সমুন্নত রাখতে গেলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন ভাষা-পরিকল্পনা। আর এর সাথে অনিবার্যভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে সামাজিক-ভাষিক অবস্থিতিবোধ। ভাষার ঐতিহ্যিক স্থৈর্যলাভ ছাড়া জাতীয় সামূহিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। যে ভাষা নতুন অর্থ উৎপাদন করতে সক্ষম, যে ভাষা মানুষের বাসনাকে ধারণ করে, যে ভাষা নতুন-জাগা প্রজ্ঞাকে প্রকাশ করে- চিন্তাস্ত ও যাপনকে মিলাতে পারে, সে ভাষার লালন অত্যন্তÍ প্রাসঙ্গিক। ভাষা, জাতীয়তা এবং রাষ্ট্র কিভাবে পরস্পর অন্বিত হয়ে একটি অনিবার্য পরিণতির দিকে ধাবিত হয়, সে-সম্পর্কে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বা কাঠামো নির্মাণের সুস্থির মনোযোগ ও সময় থেকে আমরা এখনও অনেকটা দূরে অবস্থান করছি। একটি অপরিহার্য অথচ স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণ ও গণ-আন্দোলনের প্লাবন আমরা পেয়েছি, রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে, যোগ হয়েছে রাজনৈতিক কার্যক্রমের তর্কাতীত অনিবার্যতা আর সংস্কৃতি বিকাশের চেতনাপ্রবাহ। এখন দরকার সুস্থিত ভাষা-কাঠামো নির্মাণের আর বিশ্বপরিপ্রেক্ষিতে মাতৃভাষার অস্তিত্ব-রক্ষার সমাজতাত্ত্বিক অধিকারবোধ জাগ্রত রাখার বাস্তব প্রয়াস।
লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply