একুশ শতকের মুজাহিদ । মোঃ নাজমুস সাদাত

ইসলামী আন্দোলন ও তার ইতিহাসে মুজাহিদ শব্দটি অত্যন্ত পরিচিত এবং গৌরবের। ইসলামী আন্দোলনের প্রতিটি কর্মী জানবাজ মুজাহিদ হতে চায়। মুজাহিদদের বীরত্বগাথা ইতিহাস প্রেরণা জোগায় এ আন্দোলনের প্রতিটি নেতা-কর্মীকে। যিনি জিহাদ করেন অর্থাৎ আল্লাহর কালিমার বিজয় ও প্রতিষ্ঠা সাধনের লক্ষ্যে যিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা, কষ্ট-ক্লেশ ও ত্যাগ স্বীকার করেন তিনি মুজাহিদ। তবে সাধারণত আমরা মনে করি ইসলামের দুশমনদের বিরুদ্ধে যিনি প্রতিরোধ গড়ে তোলেন বা ইসলামকে বিজয়ী করার জন্য জান-মাল দিয়ে সংগ্রাম করেন তিনি মুজাহিদ। ইসলামের প্রাথমিক যুগে একজন মুজাহিদের অন্যতম যে বৈশিষ্ট্য ছিল তা হলো -তিনি ঈমানের শক্তিতে বলীয়ান হবেন, জান ও মাল আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করবেন এবং যুদ্ধের ময়দানে বাতিল শক্তিকে সাহসিকতার সাথে মোকাবেলা করবেন। ঐ সময়ে একজন মুজাহিদকে যুদ্ধকৌশলের পাশাপাশি তলোয়ার চালানো, ঘোড়দৌড়, তীর ছোড়া বা বর্শা নিক্ষেপে দক্ষ এবং সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হতো। আবার এ সময়ে আরেকটি দলকে যুদ্ধ সরঞ্জাম প্রস্তুত ও নির্মাণে ব্যস্ত থাকতে হতো।
কালের পরিক্রমায় রাষ্ট্রের কাঠামো ও ধরনে নানা পরিবর্তন এসেছে। সুতরাং ইসলাম প্রচার ও প্রসারের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন হয়েছে। ফলে বর্তমান যুগে একজন মুজাহিদের কাজ ও বৈশিষ্ট্য- ইসলামের প্রাথমিক যুগের থেকে স্বাভাবিকভাবেই ব্যতিক্রম হবে।
এক সময় ছিল রাজা-বাদশাহ বা সুলতানদের শাসন। সেখানে নেতৃত্ব বা ক্ষমতার পরিবর্তনের জন্য পেশিশক্তিই ছিল প্রধান মাধ্যম। আর তাই মুজাহিদদের প্রস্তুতিও ছিল অনুরূপ। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোতে জনগণের সমর্থন-শাসক পরিবর্তনের বা শাসনপদ্ধতি পরিবর্তনের সবথেকে বড় নিয়ামক।
আবার আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোতে রাষ্ট্র বেসামরিক লোকদের যুদ্ধাস্ত্র উৎপাদন ও সংরক্ষণের অনুমোদন দেয় না। ফলে পেশাদার সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে ক্ষমতার পরিবর্তন করা, কোন দল বা গোষ্ঠীর পক্ষে বর্তমান সময়ে অনেক কঠিন বা প্রায় অসম্ভব (এখানে মূলত রাষ্ট্রের অধীনে থেকে যে সকল ইসলামী দল বা দলের মুজাহিদরা ইসলামী সমাজ কায়েমে চেষ্টারত আছেন তাদের কথা বলা হচ্ছে)। রাষ্ট্রশক্তি যেখানে হেলিকপ্টার, যুদ্ধবিমান, ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্রসহ আধুনিক সমরাস্ত্র ব্যবহার করবে সেখানে বেসামরিক কোন দল বা গোষ্ঠীর মুজাহিদদের পক্ষে মামুলি অস্ত্র দিয়ে তাদের মোকাবিলা বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। আধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রশক্তি আপনার তথ্য ও অবস্থান জেনে সুনির্দিষ্টভাবে আঘাত করবে, আর আপনি অন্ধের মত যুদ্ধ করে তাদের সাথে পেরে উঠবেন তা অবাস্তব। আধুনিক যুগে রাষ্ট্রকাঠামোকে বিবেচনা করে তাই বর্তমান কালের মুজাহিদদের জিহাদের প্রস্তুতিও ভিন্ন হবে।
এখন আমরা দেখব আধুনিক রাষ্ট্রে ইসলামী সমাজ বিনির্মাণে একজন মুজাহিদের প্রস্তুতি কেমন হতে পারে? গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে যেখানে নির্বাচনব্যবস্থা আছে সেখানে অধিকাংশ জনগণকে ইসলামের পক্ষে আনতে পারলে নির্বাচনের মাধ্যমে জয় লাভ করা যায়। নির্বাচনে জয় লাভ করে সংবিধান সংশোধন বা পরিবর্তনের মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এক্ষেত্রে জনগণের সমর্থন লাভ করাটা অতীব জরুরি। জনগণ বলতে এখানে রাষ্ট্রের সকল শ্রেণীর নাগরিকদের সমর্র্থন বুঝানো হচ্ছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সরকারি চাকরিজীবী- প্রশাসনে কর্মরত ব্যক্তি, আইন-শৃঙ্খলা ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য; সাংবাদিক ও মিডিয়াকর্মী, আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিককর্মী সবার সমর্থন প্রয়োজন। তাহলে একুশ শতকের মুজাহিদদের কাজ হচ্ছে সকল সেক্টরের মানুষদের সমর্থন আদায় করা। আর ইসলামী সমাজের প্রতি মানুষের সমর্থন আদায় করার জন্য প্রয়োজন গোটা সমাজ ব্যবস্থাকে ইসলামীকরণ। অর্থাৎ শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্প, মিডিয়া, সমাজসেবাসহ সামাজিকীকরণের যে উপাদানগুলো আছে সেগুলোকে ইসলামীকরণ করা। আর এ সকল সেক্টরে কাজ করা, সেক্টরগুলোকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার জন্য প্রয়োজন সেক্টরভিত্তিক দক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ, যারা তাদের এ যোগ্যতাকে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য কোরবানি করবে। অর্থাৎ ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন দক্ষ ইসলামপন্থী- শিক্ষাবিদ, খ্যাতিমান সাহিত্যিক ও সাংবাদিক, বিখ্যাত অভিনেতা ও নির্মাতা, সমাজসেবক ইত্যাদি। আর এসকল দক্ষ মানুষই হচ্ছেন একুশ শতকের মুজাহিদ।
অপর দিকে একুশ শতকের ইসলামবিরোধী শক্তিরা ইসলামকে আক্রমণ করছে সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতিতে। তারা সরাসরি ধর্মযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ছে কম। বরং তারা সামাজিকীকরণের উপাদানগুলোকে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিচ্ছে। তারা অপসংস্কৃতির মাধ্যমে মুসলিম প্রজন্মকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে ফেলছে। তাদের অপকৌশলে মুসলমানদের শত্রু- আজ আর অমুসলিমরা নয়, বরং আমরা মুসলমানরা নিজেরাই নিজেদের শত্রু। তারা শক্তি প্রয়োগ করে আজ আর মুসলমানদের দাসত্ব আদায় করছে না বরং তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সমৃদ্ধ সভ্যতার কাছে মুসলিমরা আত্মসমর্পণ করেছে। সুতরাং একুশ শতকের জাহেলিয়াতকে মোকাবিলা করা আমাদের জন্য আরো বেশি চ্যালেঞ্জিং। আমাদের কর্মকৌশলকে ঢেলে সাজাতে হবে নব্য জাহেলিয়াতকে মোকাবিলা করার মতো যোগ্য মুজাহিদ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে।
শুধু রাজপথে শ্লোগান দিয়ে একুশ শতকের মুজাহিদ অর্থাৎ যোগ্য- ওয়ায়েজিন, আলেম, কবি, সাহিত্যিক, বিচারক বা বিসিএস ক্যাডার তৈরি সম্ভব নয়। অস্ত্র চালনার চেয়ে আজ বড় প্রয়োজন কলম চালানোর। তীর ও বর্শা নিক্ষেপকের চেয়ে আজ বেশি প্রয়োজন যোগ্য বিতার্কিকের। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দিকে ঢিল ছোড়ার থেকে বেশি প্রয়োজন যোগ্যতার বলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীতে যোগদান করে বন্দুকের নলটিকে নিজের করে নেয়া। অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার থেকে বেশি প্রয়োজন সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ সাধন। ঘোড়া চালানো থেকে বেশি প্রয়োজন আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে পারদর্শী হওয়া। আম-জনতা হয়ে অন্যায়-অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদের থেকে অধিক কার্যকর হয় তারা যে পদাধিকার বলে এ অনিয়ম করে সে পদের নিয়ন্ত্রক জায়গাগুলোতে নিজেকে নিয়ে যাওয়া। যেমনÑ আধুনিক যুগে আপনি বেসামরিক নাগরিক হয়ে সেনাবাহিনীকে মোকাবিলা করতে পারবেন না। কিন্তু মেধার যোগ্যতায় আপনি সেনাবাহিনীতে চাকরি নিয়ে সেনাবাহিনীকেই আপনার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে পারেন। তবে এ জন্য সেনাবাহিনীর অফিসার পদে আবেদন করার জন্য আপনাকে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় (সমমান) কমপক্ষে এ প্লাস পেতে হবে। আপনি পুলিশ ও বিচারকদের ভূমিকায় অনেক ক্ষুব্ধ। প্রতিবাদ করে তাদের সাথে পেরে উঠছেন না। তবে আপনার সামনে সুযোগ আছে বিসিএস/বিজেএস পরীক্ষায় সেরাদের সেরা হয়ে পুলিশ অফিসার কিংবা বিচারক হওয়ার।
আপনি দ্বীন কায়েমের জন্য জীবন ও অর্থকে উৎসর্গ করতে চান? তবে সৎ সাংবাদিকতার জীবন বেছে নিন। পুলিশ সদস্য হয়ে সততার এবং দায়িত্বানুভূতি নিয়ে কাজ করুন। সুস্থধারার সাংস্কৃতিক কর্মী হয়ে অপসংস্কৃতির চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করুন। এখানে অর্থ নেই, নেই জীবনের সমৃদ্ধি, আছে শুধু জীবনের ঝুঁকি। কিন্তু ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের জন্য জগৎখ্যাত মুজাহিদ খালিদ বিন ওয়ালিদের মতো ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। এরকম অনেক পেশা আছে-যেগুলো ইসলামী সমাজ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। কিন্তু সে পেশাগুলোতে সততার এবং সাহসিকতার সাথে কাজ করলে জীবনে সুখ-সমৃদ্ধি আসে না। ফলে ইসলামপন্থীদের সে পেশাগুলোতে আমরা কম দেখি। অথচ আমরা জানবাজ মুজাহিদ হওয়ার স্বপ্নে বিভোর।
আপনি ইসলামী আন্দোলনের মুজাহিদ হতে চান? তাহলে পড়ালেখা করুন, অধ্যবসায় করুন, গবেষণা করুন, পরিশ্রম করুন এবং প্রতিযোগিতার দৌড়ে পরাজিত করুন তাগুতি শক্তিকে। আজ একবিংশ শতাব্দীর লড়াই তলোয়ারে নয় কলমে, একবিংশ শতাব্দীর জিহাদ রাজপথে বা কুরুক্ষেত্রে নয় বরং মগজে ও গবেষণাগারে। আজ ইসলামী আন্দোলনের মুজাহিদ হিসেবে বিসিএস চাকরিতে আপনার অকৃতকার্য হওয়া, বাতিলের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার থেকে কোন অংশে কম নয়। আপনার থেকে তাগুতি শক্তি জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা ও নিত্য-নতুন আবিষ্কারে এগিয়ে থাকা মানে আপনি ইসলামকে পিছিয়ে দিলেন।
বর্তমানে সামাজিকীকরণের উপাদানগুলোর নিয়ন্ত্রণ ইসলামবিরোধী শক্তিদের হাতে রয়েছে। অথচ লক্ষ লক্ষ মুজাহিদ এখনও জীবিত আছে। শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণ করছে আজ তাগুতি শক্তিরা। অথচ তাদের থেকে সংখ্যায় এগিয়ে থেকেও আমরা যুদ্ধের এ ময়দানে সম্পূর্ণ পরাজিত। ইসলামী সংস্কৃতির ওপর আমাদের দেশে নির্মিত কোনো ভালো মানের নাটক-সিনেমা বা গল্প-উপন্যাস এখনও আমরা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারিনি। অথচ একজন মানুষকে চিন্তা-চেতনা ও আদর্শে প্রকৃত মুসলিম বানাতে এগুলোর অবদান আমরাও স্বীকার করি।
ইসলামী আন্দোলনের মুজাহিদদের ঘুম তাড়াতে হবে, একবিংশ শতাব্দীর চাহিদার আলোকে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। একুশ শতকের মুজাহিদদের হতে হবে যুগের শ্রেষ্ঠ আলেম, তাদের হতে হবে জগৎখ্যাত বিজ্ঞানী, দার্শনিক, কবি, সাহিত্যিক, নির্মাতা-অভিনেতা বা সাংবাদিক। মেধার শাণিত ধারায় পৌঁছাতে হবে প্রতিটি সেক্টরে। আধুনিক সভ্যতার নিয়ন্ত্রক শক্তিগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করে তুলতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন অধ্যবসায়ের, প্রয়োজন অক্লান্ত পরিশ্রমের। আমাদের প্রতিপক্ষরা যেভাবে যুগের পরিক্রমায় আধুনিক পদ্ধতিতে ইসলামের প্রতি আঘাত হানছে, আমাদের প্রতিরোধ ও পাল্টা আক্রমণ তার থেকেও আধুনিক পদ্ধতিতে করতে হবে। আমাদের জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ যেন বৃথা না যায়। বরং একবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুজাহিদ হয়ে যেন আমরা নিজেদের জান ও মালকে সঠিক ও কার্যকর উপায়ে কোরবানি দিতে পারি সে প্রস্তুতি আমাদের নিতে হবে। আধুনিক জাহেলিয়াতের মোকাবিলা করে ইসলামকে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে তাই প্রয়োজন একদল জানবাজ ‘একুশ শতকের মুজাহিদ’।

লেখক: কলামিস্ট ও শিশু সাহিত্যিক

SHARE

Leave a Reply