এক জীবনের ইশতেহার -ইয়াসিন মাহমুদ

সময়ের সাথে সাথে বদলে যায় মানুষের অভ্যাস। রুচিশীলতা এবং দৃষ্টিভঙ্গি। প্রতিদিন মানুষের দুয়ারে সংযুক্ত হতে থাকে নতুন চিন্তাধারা। ভুলে যাই অনেক অতীত। আবার কেউ কেউ কুড়িয়ে যতনে রাখি ইতিহাস ঐতিহ্য এবং শেকড়ের সন্ধান। আমরা প্রতিদিন ছুটছি জীবনকে সাজানোর কাজে নতুন উপায় আর উপকরণের খোঁজে। কখনো কিছুটা এগিয়ে সফলতার চমক বলে বেড়াচ্ছি। আবার হোঁচট খেয়ে পিছিয়ে পড়ার গল্পটা লুকিয়ে ফেলছি অগোচরে। এভাবেই চলছে জীবনযুদ্ধের খেলা। অহর্নিশ ব্যস্তময় এক পথিকের মতোই আমরা চষে বেড়াই রাস্তাঘাট। অনবদ্য এক গন্তব্যের অনুসন্ধান বোধ হয় আমাদের টার্গেট।
ক্লাসরুম, পরীক্ষা, সার্টিফিকেট এই নিয়ে ছাত্রজীবনের মিশন-ভিশন হয়ে দাঁড়িয়েছে ছাত্র-ছাত্রী বন্ধুদের। পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট এবং ভালো চাকরিই একমাত্র জীবনের পরম পাওয়া এমন স্বপ্নবিলাস হৃদয়জুড়ে। অভিভাবকদের হৃদয়ও মননে একই চিন্তার লালন। একটি ভালো চাকরিই একজন অভিভাবকের একমাত্র চাওয়া-পাওয়া। কতিপয় শিক্ষকেরও এমন ধারণা মাঝে মাঝে লক্ষ্য করা যায়। চাকরির উদ্দেশ্যে পড়াশোনার মানুষটি যখন তাঁর গন্তব্যে ভিড়তে পারে তখন সমাজ সংসার এবং সামাজিকতা উবে যায় তাঁর জীবন থেকে। চাকরি এবং সংসারের মাঝে সময়টা কেটে যায়। পরিবেশের অনেক মানুষের ধারণা তখন বদলে দেয়। সমাজের অনেকের ধারণা থাকে ছেলেটি কিংবা মেয়েটি আমাদের এই সমাজে অনেক অবদান রাখবে। অবশেষে স্বপ্নগুলো অধরা রয়ে যায় বাস্তবতার নির্মম অপঘাতে।
বয়সের সাথে সাথে জীবনের স্তর বিন্যস্ত হয়। শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও বার্ধক্য এমন ক্রমবিকাশে আমাদের জীবনচক্র। শৈশব থেকে শুরু হয়ে বার্ধক্যের মাধ্যমে জীবনাবসান। একেক সময় একেক দায়িত্ব অর্পিত হয় আমাদের কাঁধে। এই দায়িত্ববোধ কেউ এড়িয়ে যেতে পারে না। ছাত্রজীবনের পরেই আসে কর্মজীবন। বয়স বাড়ার সঙ্গে দায়িত্বের পালাবদল ঘটে। বেড়ে যায় দায়িত্ব ভার। পবিত্র কুরআনে আমাদের দায়িত্ববোধ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন : তোমাদের মধ্যে এমন একদল লোক থাকা প্রয়োজন যারা লোকদেরকে কল্যাণের দিকে ডাকবে, ভালো কাজের নির্দেশ দিবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে। আর এরাই সফল। (সূরা আলে ইমরান : ১০৪)
হাদিস শরিফেও আমাদের দায়িত্ব কর্তব্যের ব্যাপারে নির্দেশনা এসেছে: ইবনে উমার রা. বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সা. এরশাদ করেছেন, সাবধান তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেকেই জবাবদিহি করতে হবে। মুসলমানদের যিনি বড় নেতাও দায়িত্বশীল এবং তাকে দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। (বুখারি ও মুসলিম)
শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের বিরাট একটা সময় অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে যারা কাটিয়ে দিই; একদিন বয়সের কাছে সমর্পিত হয়ে নিজেরাও অভিভাবকের আসনে আসীন হই। এ যেন সময়ের অনিবার্য বিধানের এক কৈফিয়ত। প্রতিটি সময় মূল্যবান। প্রতিটি সময়ের দায়িত্ববোধ সম্পর্কিত প্রশ্নবোধক জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হতে হবে আমাদের সবাইকে। প্রত্যেককে পাঁচটি প্রশ্নের জবাব আলোকপাত করতে হবে। এ সম্পর্কে হাদিস শরিফে এসেছে : ইবনে মাসউদ রা. রাসূল সা. হতে বর্ণনা করেছেন- রাসূল সা. বলেছেন- মানুষের পা একবিন্দু নড়তে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তার কাছে পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ না করা হবে-
ষ নিজের জীবনকাল (হায়াত) কোন কাজে অতিবাহিত করেছে?
ষ যৌবনের শক্তি সামর্থ্য কোথায় ব্যয় করেছে?
ষ ধন-সম্পদ কোন পথে উপার্জন করেছে?
ষ ধনসম্পদ কোথায় ব্যয় করেছে?
ষ সে দীনের যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছে সে অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছে? (মুসলিম ও তিরমিজি)

এই পাঁচটি প্রশ্ন সকল বান্দার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। বলা যায় দুনিয়াতে প্রশ্নপত্র দেয়া হয়েছে। কিয়ামতের দিন নতুন করে আবারো এই একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। সেই পরীক্ষার প্রস্তুতি আমাদেরকে এই দুনিয়া থেকে সম্পন্ন করতে হবে। আমাদের উপলব্ধিতে নতুন করে সেই অনুভূতি যুক্ত হোক এই প্রত্যাশা।
আমরা প্রতিদিন ভাবছি। জীবনের প্রত্যাশা-প্রাপ্তির পরিসংখ্যান মিলাচ্ছি। অবশিষ্ট ভগ্নাংশ নিয়ে আবারো অঙ্কের খাতা খুলছি। কভু যেন সেই অঙ্ক আর শেষ হয় না। এভাবেই একদিন জীবনেরই শেষ হয়ে যাবে। জীবনে কী হতে চেয়েছিলাম আর কিবা হলাম এ প্রশ্নে আমরা সবাই দগ্ধ; নিতান্তই জর্জরিত। নিছক মিছে মরীচিকার পিছে ঘোরাঘুরি আর সাময়িক সময় পার। সমাজের দৃষ্টিতে নিজের মূল্যায়ন খুঁজতে গিয়ে আমরা অনেক সময় হতাশ হয়ে পড়ি। কথিত সামাজিক মূল্যায়নে নিজের অবস্থান নিশ্চিতের লড়াইয়ে আগুয়ান হই। অবশেষে আমরা ক’জনই সফল হতে পারি? মানুষে চোখে বড় ডিগ্রি, বড় চাকরিই জীবনের মহামূল্যমান হওয়ায় সমাজ থেকে দিন দিন ভালো মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। গোটা সমাজব্যবস্থার নেতৃত্বে আসছে নষ্টদের কুশীলব। যশ-খ্যাতির প্রতিষ্ঠা লাভে আমরা মরিয়া। কার চেয়ে কত বড় হতে পারি এই প্রতিযোগিতা। আমাদের সমাজব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব বটে। শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্য আজ চাকরি লাভের মিশন তখন চাকরি পাওয়াই তো একজন মানুষের প্রধান লক্ষ্য হবে এটাই স্বাভাবিক। সমাজের এই কুপ্রথার কুপ্রভাব আমাদের ঈমানকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। দুনিয়া পাগল করে গড়ে তোলা হচ্ছে প্রজন্মকে।
রিযিকের ভয়ে আমরা অনেক সময় যাচ্ছে তাই পদক্ষেপ গ্রহণ করি। কী খাবো, কী পরবো, কী হবে আমার এমন ভাবনাই কেবল আমাদেরকে বিভ্রান্তির পথে ধাবিত করে। বাস্তব সমাজের দিকে একটু লক্ষ্য করুন অনেক শিক্ষিত মানুষের কর্মসংস্থান হয় না আবার অনেকে অল্প শিক্ষিত হয়েও অনেক কিছুই করে ফেলছে।
আমার বড় সার্টিফিকেট, বড় চাকরি আমার রিযিকের মাপকাঠি নয়। বরং আল্লাহর প্রতি আমাদের বিশ্বাস ও ভরসাই মূলমন্ত্র। আল্লাহই আমাদের উত্তম রিযিকদাতা। সুতরাং তার প্রতি নির্ভরশীল হওয়াই আমাদের কর্তব্য। একজন বান্দার কাছে মহান আল্লাহর প্রত্যাশা- মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন- “আমি মানুষ ও জিনকে একমাত্র আমার গোলামি বা দাসত্ব করার জন্য পয়দা করেছি।” (সূরা আয যারিয়াত : ৫৬)। আমরা কেউই চিরস্থায়ী রবো না এই ধরাধামে। সবাইকে একদিন চলে যেতে হবে। সেই প্রস্তুতি নেয়া খুবই জরুরি। দুনিয়ার সাময়িক চাকচিক্যের মোহের কাছে যেন আমরা পরাজিত না হই। আমার লেখাপড়া, আমার সার্টিফিকেট যেন কেবল ব্যক্তিগত কিছুদিন একান্ত সুখের উপলক্ষ না হয়। বরং এই সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি আমার যে অনেক দায়িত্ব কর্তব্য রয়েছে সে ব্যাপারেও আমাদেরকে যথেষ্ট আন্তরিক হতে হবে।
লেখক : কবি ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply