এখন লড়াইয়ের সময়

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদানের সময় থেকে বিজয় অর্জন পর্যন্ত আমরা শুধু একটি স্বপ্নকে সামনে নিয়ে এগিয়েছি, বাংলাদেশ স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হবে। পাকিস্তানি শাসকদের শোষণের জিঞ্জির থেকে আমরা মুক্ত হবো। নিজেদের ভালো-মন্দ ভাগ্য আমরা নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করবো। তারপর কেবলই অগ্রযাত্রা। বয়সে নিতান্তই তরুণ ছিলাম। আঠারো। চোখভর্তি স্বপ্ন। এদেশের ভাগ্য সাত কোটি বাংলাদেশী নিজেরাই নির্ধারণ করবে। তখনও পরবর্তী প্রজন্মের কথা চিন্তা করি নাই। আমরাই তখন নতুন বা তরুণ প্রজন্ম। আমরা সে সময়ে আমাদের ভবিষ্যতের কথাই ভেবেছি। চালাকির বুনিয়াদি গণতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে বাংলাদেশে। প্রতি নির্বাচনে জনগণ ভোট দিয়ে যার হাতে খুশি তার হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা অর্পণ করবে। অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় দেশ কেবলই সামনে এগিয়ে যাবে।
সে স্বপ্ন নস্যাৎ হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ২৫ মার্চ রাতেই পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের বন্দিত্ব বরণ করে তিনি পাকিস্তান চলে গিয়েছিলেন। সেখানে পাকিস্তানি সামরিক সরকার রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে তার বিচার শুরু করেছিল। পাকিস্তানি সরকার যাতে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনতে না পারে সে জন্য তিনি তাজউদ্দিন আহমেদের শত পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও কিছুতেই নিজ কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। পাকিস্তান সরকারও দীর্ঘ সাত মাস শুনানিতে তাই শেষ পর্যন্ত শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। শেখ মুজিবুর রহমান সহিসালামতে সুস্বাস্থ্য নিয়েই দেশে ফিরে এসেছিলেন।
স্বাধীনতা যুদ্ধ তিনি দেখেননি। শেখ ফজলুল হক মনিসহ (শেখ মুজিবুর রহমানের প্রভাবশালী ভাগ্নে) আওয়ামী লীগের তরুণ নেতারা বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স তথা মুজিব বাহিনীতে ছিলেন। তারা কেউ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ করেননি। প্রশিক্ষণ নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন কবে ভারতীয় বাহিনী তাদের যুদ্ধের জন্য ময়দানে পাঠাবে। ভারতীয়দের মনোবাঞ্ছা ছিল, যুদ্ধের একেবারে শেষ মুহূর্তে যখন মুক্তিযোদ্ধারা ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়বে, পাকিস্তানি বাহিনী হবে বেসামাল, তখনই তারা বিএলএফকে বিজয় অর্জনের জন্য ময়দানে পাঠাবে। মুক্তিযুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল। ছাত্র-শিক্ষক-পেশাজীবী, কামার-কুমার-জেলে-দিনমজুর কেউ বাদ ছিল না। তাদের সবাই শেখ মুজিবের রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এমনও নয়। দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ তাতে অংশ নিয়েছে। বিএলএফ তথা মুজিব বাহিনী দিয়ে যদি ঢাকা দখল করানো যেতো, তাহলে যুদ্ধের সকল কৃতিত্ব নিতে পারতো বিএলএফ। শেখ মুজিবুর রহমান ফিরে আসুন বা না আসুন এই তাঁবেদারেরাই সরকার গঠন করতো। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানী খুব সঠিকভাবেই ভারতের এ ষড়যন্ত্র উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি খুব সতর্কতার সঙ্গে ভারতের ঐ ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন।
কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন সবাই। ফলে ১৯৭২ সালের মধ্য জানুয়ারিতে শেখ মুজিবুর রহমান যখন লন্ডন হয়ে দেশে ফিরলেন, তখন সকলেই তার ওপর ভরসা করতে চেয়েছিল। বিনা প্রশ্নে মুক্তিযুদ্ধের পরিচালকরা শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্পণ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তাজউদ্দিন আহমদ। তিনি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন অস্থায়ী বা ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এলে তাকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেয়া হয়।
কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই শেখ মুজিবুর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন যে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার ক্ষমতা খুবই সীমিত। কার্যত তার কোনো ক্ষমতাই নেই। কিন্তু মর্যাদার চেয়ে ক্ষমতাকেই বড় করে দেখেছিলেন শেখ মুজিব। ফলে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি প্রেসিডেন্টের পদ ছেড়ে প্রধানমন্ত্রীর পদ দখল করেছিলেন। অথচ তিনি যদি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ইমাম খোমেনির মতো ঊর্ধ্ব মঞ্চে বসে থেকে তাজউদ্দিন আহমদের সরকারকে রাষ্ট্রপরিচালনায় নির্দেশনা দিতে পারতেন, তাহলে বাংলাদেশে কখনই বর্তমান পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটতো না। হয়তো তাকেও বরণ করতে হতো না বেদনাদায়ক জীবনাবসান।
শেখ মুজিবুর রহমান সম্ভবত সেই সম্মানের কথা না ভেবে ভেবেছিলেন যে, তিনি যদি নিজেই রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তাহলে সদ্য স্বাধীন দেশের প্রভূত উন্নয়ন তিনি ঘটাতে পারবেন। পরে প্রমাণিত হয়েছে যে, শেখ মুজিবুর রহমানের এই ধারণা ভুল ছিল। তিনি সর্বময় ক্ষমতাভিলাষী ছিলেন। যেটা প্রধানমন্ত্রী না হয়েও তিনি ভোগ করতে পারতেন। কিন্তু প্রত্যক্ষ ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণের আশা এবং সর্বময় কর্তৃত্ব নিজ নিয়ন্ত্রণে নেয়ার দুর্দম্য আকাক্সক্ষাই তাকে বিপন্ন করে তুলেছিল। কোনো ভিন্ন মত, কোনো সমালোচনাই তিনি সহ্য করতে প্রস্তুত ছিলেন না। কিন্তু সরকারে থাকলে তো সমালোচনা হবেই। ইরানের ইমাম খোমেনির কোনো সমালোচনা ছিল না। কিন্তু সরকারের সমালোচনা ছিল। রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্য তিনি সে সমালোচনা একীভূত করে সরকারকে ধারাবাহিকভাবে পরামর্শ দিয়ে গেছেন। সরকারও নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থে সেসব পরামর্শ উপেক্ষা করেনি। মেনে নিতে বাধ্য ছিল।
অথচ শেখ মুজিবুর রহমান স্বৈরশাসকের ক্ষমতা চেয়েছিলেন। ফলে তিনি ভিন্নমত দলনে হেন কোনো নিকৃষ্ট পথ নেই যা অবলম্বন করেননি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ক্ষমতার মদমত্ততায় রাস্তায়ই বের হতে দেননি। তার আমলে ২৭ হাজার ভিন্নমতের রাজনীতিক খুন হয়েছিল। তার অপশাসনে দেশে দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়েছিল। লাখো মানুষ না খেয়ে পথের কুকুরের মতো মৃত্যু বরণ করেছিল। দুর্নীতি সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছিল। প্রতিদিন সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণে তার সরকার পত্রিকা অফিসে হানা দিয়েছে। ভিন্নমতের সংবাদপত্রের অফিস দখলে নিয়েছে। পত্রিকার গ্যালি ভেঙে দিয়েছে। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতাদের কারাবন্দী করেছে এবং তিনি শেষ পর্যন্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণে কত যে বাজে ব্যবস্থা নিয়েছেন, তার ইয়ত্তা নেই। ক্ষমতা প্রশ্নহীন রাখার জন্য শেখ মুজিবুর রহমান তার গুণগান গাইতে চারটি সংবাদপত্র রেখে বাকি সকল সংবাদপত্র বন্ধ করে দিয়েছিলেন। নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন তার নেতৃত্বাধীন বাকশাল ছাড়া অন্য সকল রাজনৈতিক দল। জারি করেছিলেন বিশেষ ক্ষমতা আইন। বিচার বিভাগকে পদানত করেছিলেন। এর সবই ছিল অন্ধ যাত্রা।
আমরা অনেকেই তখন সতর্ক করেছি, ফিরে আসুন এ পথ থেকে। এ পথ আত্মহননের পথ। শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার তাকেও ভিন্নমত ভেবে যথাসম্ভব দলন করে গেছেন। কিন্তু প্রকৃতি এত জবরদস্তি পছন্দ করে না। প্রকৃতি সরলতা পছন্দ করে। শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারে মাত্র সাড়ে তিন বছরে যবনিকাপাত ঘটেছিল।
এরপর সাধারণ মানুষ আবারও এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। সামনে আর সামনে তাদের সে স্বপ্নও বাস্তবায়িত হয়নি। শেখ মুজিবুর রহমানের ভুল পদচিহ্নে পা রেখে অগ্রসর হচ্ছেন শেখ হাসিনার বর্তমান সরকার। শেখ মুজিবের শাসনকালে এ কথা মনে হয়েছে যে, তিনি সর্বময় ক্ষমতার অভিলাষী। সকল ক্ষমতা চান করায়ত্তে। যদিও তিনি এনায়েতউল্লাহ খানের মতে ছিলেন ভিনদেশী পটুয়াদের হাতে নির্মিত পুতুল। তবু দেশপ্রেম তার ছিল। এদেশের স্বতন্ত্র অস্তিত্বের ব্যাপারে তিনি আপসকামী ছিলেন না। কিন্তু ক্ষমতা সর্বময় করতে যেকোনো কাজ করতে তিনি প্রস্তুত ছিলেন। শেখ মুজিবের তা প্রয়োজন ছিল না। তিনি ইতিহাসে সমালোচনাহীন অমর হয়ে থাকতে পারতেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। ক্ষমতার মদমত্ততায় সেটি চূর্ণ হয়ে গেছে।
শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা এখন রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন আছেন। সর্বময় ক্ষমতা তারও চাই। কিন্তু ইতোমধ্যেই তার দেশপ্রেম প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে। ভারতকে ট্রানজিট-করিডোর দেয়া থেকে শুরু করে ভারতের যূপকাষ্ঠে এখন বাংলাদেশের স্বাধীনতাই বলি দেয়া হচ্ছে। ভারতকে বিনামূল্যে ট্রানজিট-করিডোর দেয়া হয়েছে। ভারতের স্বার্থে শিল্পনীতি, অর্থনীতি, পরিবেশনীতি পরিচালিত হচ্ছে। ভারতকে দিয়ে দেয়া হচ্ছে নৌবন্দরগুলো। ভারতের স্বার্থে হত্যা করা হচ্ছে নদী, উপনদী ও খাল। ভারতের স্বার্থে বা পরামর্শে আয়োজন করা হচ্ছে নানান বিচার আচারের। ভারতের স্বার্থে বিডিআরের নাম পরিবর্তন করে বিজিবি রাখা হয়েছে। ভারতের ব্যবসায়ীদের স্বার্থে টেক্সট বই ভারতে ছাপানো হচ্ছে। বাংলাদেশে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ ও ‘ইনশাআল্লাহ’ বলা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হয়নি বটে, তবে বিরোধী রাজনীতিকদের রাস্তায় বেরুতে পুলিশ ও আওয়ামী বন্দুকবাজরা বাধা দিচ্ছে। এ দিয়ে কী ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করা যায়?
টিপাইমুখে সরকার নিশ্চুপ। ভারতের নদী সংযোগ প্রকল্পে সরকার নিশ্চুপ। তরুণ সমাজকে ভারতীয় মাদকের মরণ ছোবলে ধ্বংস করে দেয়ার চক্রান্তে সরকার নিশ্চুপ। বাংলাদেশের নিজস্ব সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় রক্ষায় সরকার নিশ্চুপ। সর্বক্ষেত্রে ভারতীয় আধিপত্যবাদীদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সরকার সক্রিয়। সরকারের মন্ত্রী-উপদেষ্টারা তাদের সকল বক্তব্যে ভারতীয় দালাল এখন বাংলাদেশ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর প্রথম উপনিবেশ। ভারতের উপনিবেশ। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি অকল্পনীয়। এমনকি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তমও বলেছেন যে, মুক্তিযুদ্ধ করেছেন পাকিস্তানি শাসকদের বদলে ভারতীয় শাসকদের দাসত্ব বরণের জন্য নয়।
কিন্তু বর্তমান সরকার দেশকে দাসে পরিণত করতে যাচ্ছে। অনেকখানি করেও ফেলেছে। তা না হলে তারা তিতাস নদী হত্যা করে তার ওপর দিয়ে ভারতীয় ট্রেইলার চলাচলের জন্য পাকা রাস্তা করতে দিতো না। নদী বন্ধ করে পাকা রাস্তা পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্র সম্ভবত কল্পনাও করতে পারে না। অথচ ভারতীয় তাঁবেদার এই সরকার তা করতে দিয়ে প্রমাণ করেছে যে, এটা ভারতের উপনিবেশ। স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র নয়। আমি এখন প্রবীন প্রজন্ম। নতুন প্রজন্মের কাছে আহ্বান, নিজেদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার স্বার্থে আমাদের মতো যুদ্ধের প্রস্তুতি নিন।
লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক দিনকাল

SHARE

Leave a Reply