এগারোই মার্চ মতিহারে রক্ত ঝরার দিন -আবু তালেব মণ্ডল

জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য সময় রাজশাহী মতিহার সবুজ চত্বর ঘিরে রয়েছে। ১৯৭৯-এর ১২ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। ১৯৮০-এর জানুয়ারিতে আমাদের ক্লাস শুরু হয়। তখন শিবিরের বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন জনাব শাহজাহান চৌধুরী ভাই এবং তারই অনুপ্রেরণায় বলতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। কলেজজীবন থেকেই শিবিরের সাথে সম্পর্ক এবং কলেজে থাকা অবস্থাতেই শিবিরের সদস্য হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসি। শাহজাহান ভাই বললেন শের-ই-বাংলা হলে অ্যাটাচড হতে। পরবর্তীতে শের-ই-বাংলা হলে আবাসিক ছাত্র হিসেবেই দীর্ঘদিন বসবাস করি। ভর্তি হতে এসেই রাত্রিতে দেয়াল লিখনের কাজ পেলাম। সবুজে ঘেরা ক্যাম্পাসে তখনকার নামকরা শিবির নেতাগণ আযম ভাই, আনোয়ার ভাই, মাহবুব ভাই, আব্দুল খালেক ভাই, রফিক ভাই- এদের কথা আজ ভালো মনে পড়ছে। তখন ১২-১৪ জন সদস্য। হাস্যকর বিষয় হলো, যখন বড় বড় দলের খণ্ড খণ্ড বা ছোট ছোট মিছিল হতো, ১০-১২ জন নিয়েই এক বিরাট মিছিল। ছাত্রমৈত্রী, ছাত্রইউনিয়ন ছাত্রলীগ, বিএনপি, জাসদ- এদের এভাবে মিছিল দেখে আমরা মফস্বলের ছাত্ররা হাসাহাসি করতাম। আমাদের এলাকা বা একটা থানাতেও মিছিল হতে হলে ২০০-৩০০ জনশক্তির নিচে কোনো মিছিল দেখিনি, অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে তাই দেখছি। এমনিভাবে বছর না পেরুতেই রাকসু নির্বাচনের ঘোষণা হল। ১৯৮১ সনে রাকসু নির্বাচন। আমাদের প্যানেল দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

শাহজাহান-লতিফ পরিষদ
এই পরিষদের সমাজকল্যাণ সম্পাদক পদে প্রার্থী মনোনীত হয় আল্লাহর এ অধম বান্দা। এই সুবাদে প্যানেলের সাথে সকল হল, ক্যাম্পাস বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই পাশের মেস এমনকি শহরের অলিতে গলিতে ব্যাপক শিবিরের দাওয়াতি কাজ করার সুযোগ পাই আমরা। তাসনীম আলম ভাই তখন রাজশাহী মহানগর এবং এ. বি. এম. সাত্তার ভাই রাজশাহী জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করতেন। তারাও প্যানেলে থাকাতে সারাদিন প্রায় একত্রেই ঘুরতাম । নির্বাচনী হালচাল ও মিটিংয়ের জন্য কেন্দ্র থেকে সাবেক সভাপতি জনাব কামারুজ্জামান ভাই বেশ কয়েক দিন ক্যাম্পাসে থেকে গেলেন। হলে হলে মিটিং। সেই দৃশ্য আজও মনে পড়ে। ছাত্রলীগের প্যানেলে ছানা-রানা, ছাত্রমৈত্রীর বাদশা-হক, শিবিরের শাহজাহান-লতিফ, ছাত্রদলের মর্তুজা-জুয়েল পরিষদ উল্লেখযোগ্য। শাহ মখদুম হলে সাহিত্য সম্পাদক আমাদের প্যানেল থেকে নির্বাচিত হয়। নির্বাচনের আগের রাতের একটি ঘটনা এখনো মনে পড়ে। সারারাত হলে হলে কাজ চলছে। বুথ তৈরি, ভোটার তালিকা দেয়ার জন্য ক্যাম্প তৈরি ইত্যাদি। রাত ১০-১১ টার দিকে মুন্নুজান হলে ক্যাম্প তৈরির জন্য শের-ই-বাংলা হল থেকে তাহের, মশিউরসহ ৪-৫ জন কর্মীকে পাঠালাম। ঘন্টা খানেক পর তারা ফিরে এলেন। বললেন, আমরা মুন্নুজানে ক্যাম্প তৈরি করতে পারবো না। মেয়েরা ব্যঙ্গ করছে। আমাদের ছেলেরা তাদের সাথে ফ্রি মেলামেশা কথাবার্তা বলতে চায় না এ জন্যই তাদের এ কাণ্ড। যখনই আমাদের ভাইয়েরা বাঁশ দিয়ে খুঁটি গাড়তে লাগছে তখনই মেয়েরা কোরাস গাইতে লাগছে- কোন দল, বোবা পার্টি- কথা কয়না ইত্যাদি ইত্যাদি। পরদিন নির্বাচন, সারাদিন নির্বাচনের কাজ চলছে। ফলাফল প্রথম বারের মত আমাদের খারাপ নয়। রাকসুতে কোনো কোনো পদে ২য়, ৩য় স্থান। ছাত্র প্রতিনিধি হিসাবে সিনেটে শাহজাহান ভাই নির্বাচিত হন। শের-ই-বাংলা হল ও জোহা হলে তো ২-১ ভোটের ব্যবধানে আমরা ফুল প্যানেলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি যা অনেকেই চিন্তাও করেনি। এছাড়া হবিবুর, আমীর আলী ও শাহ মখদুম হলেও আমরা ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি।

১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি শিবির প্রতিষ্ঠার পর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু হয়। এ ক্ষেত্রে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ও পিছিয়ে ছিল না। ১৯৭৮ সালে প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। বিশ্ববিদ্যালয়ে মিটিং করার ঐতিহাসিক স্থান আমতলা। পরবর্তীতে প্রশাসনিক ভবনের পশ্চিম চত্বর বা লিচুতলা হয়। ঐ আমতলাতেই শিবিরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ছাত্রসভা ছিল। ছাত্রসভায় হামলা হয়েছিল- আমরা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আসিনি। তবে পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর সে ঘটনার প্রতিক্রিয়া বুঝতে আমাদের অসুবিধা হয়নি। ঐ হামলার শিকার অনেক মুজাহিদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। শুনেছিলাম আমাদের জন্য ১টা বাঁশের লাঠিও ছিল না। আমগাছের ডাল ভেঙে সেদিন মোকাবেলা করা হয়েছিল। ঐ দিনের আহত আব্দুল ওয়াহেদ ভাই (সাবেক এমপি, কুষ্টিয়া) শের-ই-বাংলা হলের পশ্চিম-৪৮ আমার রুম থেকে এমএ পরীক্ষা দিলেন। উনার সাহচর্য পাবার কিছু সুযোগ হয়েছিল। ১৯৭৮-এর ৬ ফেব্রুয়ারির দিনে উনি ময়দান থেকে পিছুটান দিচ্ছিলেন না। চিৎকার করে বলেছিলেন, আমরা সকলেই শহীদ হব তবু শত্রুকে পিঠ দেখাবো না। ইসলামবিরোধী ছাত্রলীগ, জাসদ, বাসদ, ছাত্রইউনিয়ন, ছাত্রমৈত্রী সকলে মিলিত হয়ে ঐ হামলা চালায়। আব্দুল ওয়াহেদ ভাইকে সন্ত্রাসীরা মারছে; তবু তিনি ময়দান থেকে সরছেন না। তখনকার মাদার বখস, আজকের মতিহার হলের গেটে শহীদ মিনারের পূর্ব দিকে মেরে ফেলে রেখে গিয়েছিল আব্দুল ওয়াহেদ ভাইকে। ওরা মনে করেছে মরে গিয়েছে। আজও আল্লাহ তাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন এবং আমাদের সাথেই বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সিনেটে ভূমিকা রাখছেন। যাই হোক রাকসু নির্বাচনের বেশ কয়েক মাস পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চাকসুর নির্বাচন হয়ে গেল। ছাত্রশিবির প্রায় ফুল প্যানেলে বিজয় লাভ করলো।

একজন হিন্দু সদস্যসহ জসিম-গাফফার পরিষদের বিজয়ে সারা দেশে যেন এক আলোড়ন সৃষ্টি হয়ে গেল। ছাত্র আন্দোলনে যেন সর্বত্র আলোচনার বিষয় চাকসু। ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়েও আমাদের নেতৃত্ব পরিবর্তন হয়েছে। সিরাজুল ইসলাম ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি হলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠিকমত অবস্থান করতে পারছিলেন না। একদিকে খুলনায় যাতায়াত, অপরদিকে কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সদস্য হবার কারণে অন্যান্য জেলাতেও সফর থাকতো বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্বে তিনি খুলনা মহানগরীর সভাপতি ছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে ঠিকমত স্টাডি করে উঠতে না উঠতেই বড় ধরনের প্রোগ্রাম। সদস্যদের মধ্যে আলোচনা চলছে চাকসুর ভি.পি.-কে অতিথি করে বিশ্ববিদ্যালয়ে নবাগত ছাত্রদের নিয়ে নবাগত সংবর্ধনা প্রোগ্রাম করতে হবে।
১৯৮২-র মার্চ মাস। মার্চ মাস মানেই রাজনীতির ময়দানের গরম দিনগুলি। ১১ মার্চ। এদিনটি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র আন্দোলনে এক নতুন সংযোজিত অধ্যায়। নবাগত সংবর্ধনা প্রোগ্রাম বাস্তবায়নের জন্য সদস্য বৈঠকে দায়িত্ব বণ্টন হয়ে গেল। যদিও তখন আমি শের-ই-বাংলা হলের সভাপতি।

সেদিন কেন্দ্রীয় মসজিদের গেটের সামনে আমরা একত্রিত হয়ে একযোগে পশ্চিম চত্বরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলাম। ইতোমধ্যেই ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ, ছাত্রমৈত্রীর নেতাকর্মীরা শহীদ মিনারে শপথ নিচ্ছে। আবার এদিকে শিবিরেরও প্রায় শ‘খানেক কর্মী কেন্দ্রীয় মসজিদের আমতলায় হাজির হয়েছে। উভয় পক্ষই বেশ টেনশনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ ও শহীদ মিনার, কেন্দ্রীয় এ দু‘টি প্রতিষ্ঠান। অথচ দুটি প্রতিষ্ঠান আদর্শিকভাবে দুই মেরুর। কিভাবে পরিকল্পনা নিয়ে পাশাপাশি গড়ে উঠলো। আমি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অনেকদিন দেখেছি কেন্দ্রীয় মসজিদে মাগরিবের আজান হচ্ছে, নামাজ হচ্ছে, একই সাথে প্রতিযোগিতা করে শহীদ মিনারে নাচ, গান, বাজনা, শ্লোগান, বক্তৃতা চলছে। এ যেন এক আজব কারখানা বুদ্ধির সাগর, মহাপণ্ডিত বুদ্ধিজীবীগণ। কোন বুদ্ধিতে এ ধরনের দুই বিপরীতমুখী প্রতিষ্ঠান দু’টিকে একত্রে প্রতিষ্ঠা করলেন তা বোধগম্য নয়। কেন্দ্রীয় মসজিদটি শহীদ মিনারের অনেক পূর্বে তৈরি। দু’টি প্রতিষ্ঠান দুই মেরুতে হলে অনেক অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনার হাত থেকে বিশ্ববিদ্যালয় রেহাই পেত। এসব অপরিপক্ব চিন্তার কাজ। ধিক! এমন জ্ঞানপাপীদের কাণ্ডজ্ঞানকে। সিরাজ ভাই (ভার্সিটি সভাপতি) রফিক ভাই, নজরুল ভাই বললেন, এখন আমাদের আর অপেক্ষা করা ঠিক হবে না। কর্মীদের কাছে যাওয়া দরকার। আমরা শের-ই-বাংলা হলের গেট দিয়ে কেন্দ্রীয় মসজিদের আমতলার পূর্ব গেটে ঢুকতে না ঢুকতেই শহীদ মিনারে অবস্থানরত ইসলামবিরোধী মোর্চার পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় মসজিদমুখী নিরীহ নিরস্ত্র শিবির কর্মীদের ওপর শুরু হলো ইটপাটকেলের বৃষ্টি। ওদের ইট কুড়িয়ে শিবির কর্মীরা ওদের প্রতি-উত্তর দিতে শুরু করলো। আমি ঢুকতেই বিরোধীদের একটি ইট আমার কপালে এসে লাগলো। কপাল ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে, চোখের পলকে রক্তে জামা কাপড় ভিজে গেল। রক্ত দেখার পর আমাদের ভাইয়েরা উত্তেজিত হয়ে নারায়ে তাকবির দিয়ে ছুটে চললেন, ধাওয়া করলেন শত্রু পক্ষকে। এ অবস্থায় ধাওয়া করে আমরা ওদেরকে শহীদ মিনার থেকে ক্যাফেটেরিয়া দিয়ে একেবারে সায়েন্স বিল্ডিং পার করে দিলাম। শহীদ মিনারের ফিল্ডে আমাদের দুই ভাই আমাকে ধরে কপালে রুমাল বেঁধে দিলেন। ঐ অবস্থাতে চললাম শ্লোগান দিতে দিতে। নজরুল ইসলাম মিলনায়তনের সম্মুখ দিয়ে আমতলায় চতুর্দিকে নারায়ে তাকবিরের শ্লোগানে মুখরিত। খণ্ড খণ্ড সংঘর্ষ চলছে দীর্ঘ সময় ধরে। ইতোমধ্যে শহর ও কোর্ট এলাকা থেকে বাস ভর্তি হয়ে ছাত্রমৈত্রীর সশস্ত্র কর্মীরা ক্যাম্পাসে এলো। এছাড়াও বিভিন্ন এলাকা থেকে শতশত জঙ্গি তারা একত্রিত করেছে। সিরাজ ভাই পশ্চিম চত্বরের লিচু তলার পাকা করা উঁচু জায়গাটাতে দাঁড়িয়ে সেদিনের সেই ন্যক্কারজনক ঘটনার জন্য ইসলামবিরোধী ছাত্রসংগঠন ও কর্তৃপক্ষকে দায়ী করে বক্তব্য পেশ করছেন। সংবর্ধনা সভায় প্রধান অতিথি হিসাবে বক্তব্য পেশ করার কথা ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবির সভাপতি ও চাকসু ভি. পি. জনাব জসিম উদ্দিন সরকার ভাইয়ের। চাকসুতে কি একটা বিষয় নিয়ে সমস্যা হওয়ায় জসিম ভাই আসতে পারেননি। তার পরিবর্তে এসেছেন তখনকার শিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল জনাব সাইফুল আলম খান মিলন ভাই। তখন কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন এনামুল হক মঞ্জু ভাই (সাবেক কক্সবাজার এম.পি.)। মারামারি চলছে সকাল ৯:৩০ থেকে ১২:৩০ পর্যন্ত। তবুও কর্তৃপক্ষের কোনো শুভবুদ্ধির উদয় হলো না। প্রায় ৫০-এর অধিক শিবির কর্মী রক্তাক্ত হয়েও ময়দানে অবস্থান করছেন। কেউ কেউ অচেতন অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে।
তাদেরকে হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। একবার তাসনীম আলম ভাইকে দেখলাম আমাদের বেশ কয়েকজনকে সাথে নিয়ে বিরোধীদের মোকাবেলা করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির নেতা হিসাবে বেশি পরিচিত ছিলেন লতিফুর রহমান (এমপি) ভাই। কারণ তিনি রাকসুতে জি. এস. হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তাকে এসে একবার প্রক্টর আবার মৈত্রীর শিশির, সাদেক মাঝে মাঝে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে। আলাপ করছেন। তিনি আহাজারি করছেন। কেন পুলিশ ডাকছেন না। কেন আপনারা মারামারি থামাচ্ছেন না। তিনি আবার ফিরে আসছেন ময়দানে। এভাবে আলোচনা ও মারামারি চলছে কিন্তু কোনো ফল নেই। লতিফুর ভাইকে বারবার তারা প্রতারিত করছে। তখনকার প্রক্টর (ভূগোল বিভাগের) জনাব মনিরুজ্জামান ও ভিসি ড. মুসলেম হুদা। সকলে মিলেই তারা এ খেলা খেলছিলেন। এ এক নির্মম পরিহাস! সংঘর্ষে খুবই গুরুতর আহত সাইদুর রহমান, তুষার সিরাজী, মামুন, শহীদ আইয়ুব ও শহীদ সাব্বির ভাইসহ আরো কয়েকজনকে হাতাহাতি করে আমাদের ভাইয়েরা রিক্সায় পাঠিয়ে দিলেন। কাউকে কাউকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাম্বুলেন্সে করে রাজশাহী মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কত ইটপাটকেল আমাদের ভাইদের গায়ে লাগছে তার ইয়ত্তা নেই। লাঠি, হকিস্টিক, রামদা, কুড়াল একেবারে পিঠের ওপরে। যদি এক পা অর্থাৎ একটা ধাপ কোনো মতে পিছে পড়ি তাহলে শতশত আঘাতে জীবন শেষ। খুনের নেশায় তারা ধেয়ে আসছে। আমারও এতই দুর্দশা যে দৌড়াতে পারছি না। সকালেই কপাল কেটেছে। চার ঘন্টা সংঘর্ষে লিপ্ত। পা যেন উঠছে না। কত ইট হাতে, পায়ে, পিঠে লাগছে কিছুই অনুভব করতে পারছি না। বিএনসিসির গেট দিয়ে ঢুকে ছোট প্রাচীরটা পার হতে গিয়ে মনে হলো জীবন বেরিয়ে যাচ্ছে। ২-৩ বার চেষ্টার পরে কোনো রকমে টপকিয়ে পার হলাম। দারুস সালাম মেস থেকে কে যেন আমাকে সাথে করে রিক্সাযোগে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে এলেন। মেডিক্যালে সে কি এক করুণ দৃশ্য! কারো রক্ত দরকার, কত আহত। আর চরম ভিড়। আমাদের ভাইয়েরা আমাকে ধরে নিয়ে গেলেন জরুরি বিভাগে। বেডে সাংবাদিকরা আসছেন, শুভাকাক্সক্ষীরা আসছেন, আন্দোলনের ভাইয়েরা তো আছেনই। ৩টার দিকে মতিউর ভাই কাছে এলেন। জিজ্ঞেস করলাম অবস্থা কী? উনি জানালেন, আমাদের এক ভাই শাহাদাত বরণ করেছেন। আরো ২-৩ জনের অবস্থা সিরিয়াস। কখন যে কি হয় আল্লাহই ভালো জানেন। শহীদ সাব্বিরের মৃত্যুর শোকের ওপর উপচে পড়ল শহীদ আব্দুল হামিদের মৃত্যুর খবর।

শহীদ আব্দুল হামিদের শাহাদাতের ঘটনাবলি শুনলে যে কোনো পাষাণ হৃদয়ও বিগলিত এবং শিহরিত হবে। হত বিহ্বল হয়ে নিজের অজান্তেই চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। ১০ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তেজনার কারণে ১১ মার্চে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে কাজলা গেটে পুলিশ মোতায়েন ছিল। কিন্তু ভিসি ও প্রক্টর মহোদয় এ পবিত্র অঙ্গনে পুলিশ ঢোকার অনুমতি না দিয়ে রক্ত পিপাসু হালাকু খানের মত উল্লাস ভরে অবলোকন করেছেন ঐ নির্মম দৃশ্য। আমাদের নিরীহ ভাইয়েরা ক্লান্ত, শ্রান্ত হয়ে জীবন রক্ষার্থে আশ্রয় নিয়েছিল বিএনসিসি ভবনে। কিন্তু খুনিরা নিরস্ত্র হলো না। খুনের নেশায় ঝাঁপিয়ে পড়ল। রুমের দরজা ভেঙে আমাদের ভাইদের একে একে বাইরে বের করে এনে ইচ্ছে মত মারছে। তৎকালীন ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি শিশির, ছাত্র ইউনিয়নের হেলাল, ছাত্রলীগের ছানা-রানা-আবুল কালাম আজাদ, জল্লাদ শাকু- এদের নেতৃত্বেই চলছে এসব কর্মকাণ্ড। আমাদের প্রিয় আব্দুল হামিদকেও ধরা হয়েছে। অসংখ্য আঘাত তার শরীরে। ইট, হকিস্টিক, রডের বাড়িতে সমস্ত শরীর ক্ষত-বিক্ষত। এরপরও পাষণ্ডরা তাকে ধরে নির্যাতন চালাচ্ছে। আমার প্রিয় ভাই হামিদকে খুনিরা বলছে, তুই যদি শিবির না করিস তবে তোকে ছেড়ে দেয়া হবে। যারা তাকে শহীদ করেছে তাদের এবং যারা এ দৃশ্য দেখেছে তাদের কাছ থেকেই শোনা গেছে এসব করুণ কাহিনী। আব্দুল হামিদ তার প্রতি-উত্তরে বলেছেন, “আমি যে সত্য পেয়েছি, আমি যে আলো পেয়েছি, আমি যে ইসলামের পথ পেয়েছি, ইসলামী ছাত্রশিবির- তা থেকে দূরে থাকতে পারবো না।” এ কথা শোনার সাথে সাথে পাষণ্ডরা আমাদের প্রিয় ভাই আব্দুল হামিদকে শুইয়ে দিয়ে একটা ইটের উপর তার মাথা রেখে আরেকটা ইট দিয়ে তার মস্তক থেঁতলে দেয়। আমাদের প্রিয় ভাই, আল্লাহর প্রিয় গোলাম আল্লাহর জান্নাতে চলে যান। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন। ১৫-২০ দিন পর ভার্সিটিতে এসে যখন এ কথাগুলি শুনি তখন চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি।

আমি এ কথা শোনার পর শিবিরের বিভিন্ন টিসিতে এ ঘটনা বলেছি, তার সাথে এ কথাও বলেছি- খুবাইবকে রা. কাফেররা একটা পিলারের সাথে বেঁধে একের পর এক তীর নিক্ষেপ করেছিল আর বলেছিল, তোর স্থানে মুহাম্মাদ সা:কে বেঁধে আমরা তীর নিক্ষেপ করবো তুই চেয়ে চেয়ে দেখবি। অথবা মুহাম্মদের সা. অনুসারী আর হবি না। প্রতি-উত্তরে সে দিন আল্লাহর প্রিয় বান্দা নবীর অনুসারী খুবাইব রা. একই কথা বলেছিলেন, “বেকুবের দল, আমার পরিবর্তে নবীকে সা. তীর নিক্ষেপ করবি আর আমি চেয়ে চেয়ে দেখবো তা কখনোই সম্ভব নয়; আমার দেহে জীবন থাকতে নয়। আর ইসলাম থেকে দূরে আসা, তাতো চিন্তাও করা যায় না। কাফেররা সেদিন খুবাইবকে রা. তীরের ফলার আঘাতে শহীদ করেছিল। আজও একই কায়দায় আমাদের প্রিয় ভাই আব্দুল হামিদকে শহীদ করলো। ওরা মনে করছে কিছু লোককে শহীদ করলেই একটি আদর্শকে নিশ্চিহ্ন করা যায়। শহীদেরা যে কখনো মরে না এ কথাও ওরা বোঝে।

১২ মার্চ সকাল ১০টার দিকে হন্তদন্ত হয়ে বড় ভাইসহ ৪-৫ জন এলাকা থেকে এসে হাজির। একেবারে ধরে নিয়ে যাবার মত অবস্থা। বাড়িতে যেতে হবে। বৃদ্ধ আব্বা আম্মা কান্নাকাটি করছেন। দায়িত্বশীলদের সাথে আলাপ করে ট্রেনযোগে বেলা ২-৩ টার দিকে বাড়ি পৌঁছলাম। দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হলো, মিছিল, মিটিং, বিক্ষোভ, প্রতিবাদের ঝড়। সারা দেশময় এই নৃশংস ঘটনায় জনগণ বিক্ষুব্ধ। রাজশাহী শহর তো বারুদের মত ফুঁসে উঠলো মিছিল, মিটিং, আর প্রতিবাদ সভায়। ১৪৪ ধারা জারি হলো। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে জনগণের জনসভা, দেয়াল লিখন, পোস্টারে ছেয়ে গেল রাজশাহী মহানগরী। বাড়িতে যাবার একদিন পরেই সংবাদ পেলাম আমাদের প্রিয় ভাই রাজশাহী মহানগরীর শিবিরের অফিস সেক্রেটারি, যিনি তার সুন্দর হাতের তুলিতে আল্লাহ ও তার বান্দাদের অন্তরের কথাগুলি সুন্দর করে দেয়ালে লিখতেন, (১০-৩-৮২) রাতেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেস্টুনের জন্য শিবির অফিসে রাতভর পোস্টার লিখেছেন যে ভাই। এরাতের শেষাংশে শোবার জন্য তার হোস্টেলে এ হতভাগাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ছিলেন সেই প্রতিভাবান আইয়ুব আলীও আমাদের রেখে চলে গেলেন আল্লাহর সান্নিধ্যে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন। ঐ দিনের আঘাতে আরেক ভাই শহীদ আব্দুল জব্বার, রসায়ন বিভাগের ছাত্র ছিলেন। খুব নিরীহ বান্দা। পিতার বড় সন্তান। অনেক আশা আকাক্সক্ষা নিয়ে এসেছিলেন বড় বিদ্বান হতে কিন্তু এই সৈনিক দীর্ঘ ৮ মাস মৃত্যুযন্ত্রণায় ভুগে অবশেষে আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিলেন।

আল্লাহর প্রিয় বান্দা আল্লাহর জান্নাতে পাড়ি জমালেন। শহীদ হবার পর কয়েকবার তার পরিবারের সাথে আমার ঈদ করার সুযোগ হয়েছিল। সন্তানহারা মা বাবার সান্নিধ্য পেয়েছিলাম। ২১ মার্চ শুধু মাকে চুপিসারে বলে রাজশাহী চলে এলাম। ২৪ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র গণজমায়েত। সকালে শহরে গ্রুপ পোস্টারিং চলছে। মিলিটারির গাড়ির বহর রেডিও সেন্টারের দিকে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে রেডিওতে ঘোষণা করা হচ্ছে অযোগ্য আব্দুস সাত্তার সরকারের (বিএনপি) পতন ঘটিয়ে সামরিক প্রধান হুসাইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করেছেন। সামরিক আইন জারি করেছেন। সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে এরশাদ সাহেব ভাষণ দিলেন।

সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আপাতত নিষিদ্ধ ঘোষিত হলো। ভার্সিটি যথারীতি চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বের পরিবর্তন হয়েছে। ১১ মার্চের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সদস্য শাখা ভেঙে দেয়া হয়েছে। তিন মাস কেন্দ্রীয় তত্ত্বাবধানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সদস্য ঈশ্বরদীর জনাব মতিউর রহমান ভাই ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ছয় মাস পর নতুন সেটআপ-এ রাজশাহী জেলা সভাপতি জনাব এ বি এম আব্দুস সাত্তার ভাইকে ভার্সিটির জনশক্তি করে সদস্যদের নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সভাপতি নিয়োগ করা হয়। সেক্রেটারির দায়িত্ব আসেন জনাব লতিফুর রহমান ভাই। সাংগঠনিক সেক্রেটারি হিসাবে আমাকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। এক বছর পর আবার এ বি এম সাত্তার ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। ইতোমধ্যে কেন্দ্রেও অনেকেরই অনেক দায়িত্ব পরিবর্তন হয়েছে।

সাইফুল আলম খান মিলন ভাই কেন্দ্রীয় সভাপতি হয়েছেন। জনাব তাসনীম আলম সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পেলেন। এভাবে সময় গড়িয়ে গেল। বগুড়ার সামরিক আদালতে ১১ মার্চের ভার্সিটির কর্মকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হয়েছে। ছাত্রমৈত্রীর শিশির, ছাত্রলীগের ছানা, রানা, আবুল কালাম আজাদ, ছাত্র ইউনিয়নের হেলালসহ ৭ জনের যাবজ্জীবন ও ১৩ জনের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড হলো। ১৯৮৫তে সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সাথে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ রাজনৈতিক দলসমূহের সংলাপ হলো। সংলাপের একটি শর্ত হিসাবে আওয়ামী লীগ প্রধান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১ মার্চের ঘটনায় সাজাপ্রাপ্ত খুনিদের কারাদণ্ড মওকুফ দাবি আদায় করে। এই হলো এদের ইনসাফ, গণতন্ত্র ও বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা।

১১ মার্চের ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে আমরা আবার যখন আসি তখন ভার্সিটির কর্মচারী, সাধারণ কর্মকর্তা, হলসমূহের বয়-বাবুর্চি, ক্যাফেটেরিয়ার কর্মচারীরা হল মসজিদসমূহের ইমাম-মুয়াজ্জিন, এলাকাবাসী সকলেই আমাদের দেখলে সমবেদনা, কেউ কেউ তো আমাকে ধরে কেঁদেই ফেলেছেন। তাদের অব্যক্ত বেদনা, চাপা দুঃখ ব্যক্ত করতে তারা কোনো ভাষা মুখে আনতে পারেনি। এই ঘটনাতে বড় পাওয়া হলো আমরা অন্যায় করিনি। অহেতুক ইসলাম বিরোধীরাই এ কাজ করলো। এটা আমাদের আর বলার প্রয়োজন হলো না। ওরাই যেন এর বাস্তব সাক্ষী। ক্যাফেটেরিয়ার এক কর্মচারী আমার হাত ধরে কেঁদে কেঁদে যে কথাগুলো বলেছিলেন তা না বললে এঘটনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি বললেন, “১১ মার্চে শাখাওয়াত হোসেন শাকু (পাবনা, চাটমোহর) চাইনিজ কুড়াল হাতে, গলায় ঝুলানো তাবিজ, বীভৎস কালো চেহারা, জামার বোতামগুলি খোলা, দেখলেই মনে হয় জল্লাদ উন্মাদের মত। খুন করে যেন তার পিপাসা নিবৃত্ত হয়নি, তার হাতে পায়ে গায়ে রক্ত। চিৎকার করে বলছে, কোথায় শিবির, কোথায় শিবির! মাতম করছে, আর হাতের চাইনিজ কুড়াল দিয়ে ইট, দেয়াল ও পাকা সড়কের ওপর কোপ মারছে। আপনারা বিএনসিসিতে গেলে দেখতে পাবেন খুনিদের নারকীয় তাণ্ডব।” গিয়েছিলাম সেই ক্যান্টিনে। ছোপ ছোপ রক্ত তখনও যেন তার সাক্ষী দিচ্ছে। কত নৃশংসতার সাথে পাষণ্ডরা আমাদের ভাইদের অত্যাচার, নির্যাতন চালিয়েছে। বিএনসিসি-র দেয়ালে রক্তমাখা হাতের ছাপগুলি দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে ঐ পাশবিকতার সাক্ষ্য বহন করছিল। এত বছর পর সে হাতের ছাপ আর হয়তোবা নেই।

যাক সেসব কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালনের সময় আমি ১৯৮৫-৮৬ সালে হবিবুর ও ১৯৮৬-৮৭ সালে ছিলাম জোহা হলে। একদিন ৯:৩০ টার দিকে ভার্সিটি স্টেশন হোটেলে আমি ও ফখরুল ভাই রাতের খাবারের জন্য গেলাম। হোটেলের বয় ভাতও দিয়ে গেল। ছাত্রলীগের (বাকশাল) সাংগঠনিক সেক্রেটারি সোহাগ ভাতের থালাটা এলোমেলো করে দিয়ে গেল। ফখরুল ভাই রেগে কিছু বলতে চাচ্ছিলেন। ভাবলাম, আমার সাথে কিছু হলেই সকল হলে এখনই গণ্ডগোল শুরু হবে। তাই ফখরুল ভাইকে থামিয়ে দিলাম। এদিকে বিভিন্ন ঝামেলা ও টেনশনের কারণে আমার ফাইনাল ইয়ার পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারিনি। উপরন্তু জামায়াত নেতা জনাব আব্বাস আলী খান সাহেব পাকিস্তানে গিয়ে ডন পত্রিকার সাথে সাক্ষাৎকারে কি যেন বক্তব্য দিয়েছেন। আর যায় কোথায়! সকল হলে সন্ধ্যার পর অতর্কিত জঙ্গি মিছিল শুরু হল। নোটপত্র বের করারও সময় পেলাম না। পাশের রুমে গিয়ে বসে থাকলাম। জঙ্গি মিছিল আমার রুমের কাচের জানালা দরজা ভেঙে চুরমার করে দিয়ে গেল। মানসিক অস্থিরতায় আর পড়াশোনা হলো না।

পরদিন নিজের জানা মতেই পরীক্ষা দিয়ে এলাম। অবশ্য পরীক্ষার ফলাফল একেবারে খারাপ হয়নি। ঐ বছরে কেউ প্রথম শ্রেণী পায়নি, উচ্চতর দ্বিতীয় শ্রেণীতে ৪র্থ হয়েছিলাম। আমার সময় সেক্রেটারি হিসাবে দায়িত্ব পালন করতেন জনাব আব্দুল লতিফ ভাই (যশোর)। তিনি অমায়িক ও মিষ্টভাষী ব্যক্তি ছিলেন। সবার সাথেই আলাপ জমিয়ে নিতে পারতেন। ধীরস্থির অথচ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন। খুব অল্প সময়ে সংগঠনে ভালো অগ্রসর হয়েছেন। ১৯৮২তে আমাদের ভাইদের মারার আসামি হিসাবে জেলহাজতে ছিলেন। জাসদ করতেন। মাথায় ঝাঁকড়া চুল ছিল তার।

তার এক ভাই আলতাব হোসেন সৌদি আরবে চাকরি করতেন। তিনি অবস্থা শোনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে জনাব লতিফুর রহমান ভাইয়ের কাছে চিঠি লিখে তাকে কাছে টানতে অনুরোধ করেছিলেন। তার এ চিঠি সত্যিই কাজে লেগেছিল। জনাব রফিকুল ইসলাম খান ভার্সিটির সাংগঠনিক সেক্রেটারি। সাহসী ব্যক্তি। সম্ভবত চর এলাকার আবহাওয়া এবং পরিবেশ এভাবে মানুষকে প্রতিকূল পরিবেশে সংগ্রামী করে তোলে। তার কথাবার্তা ও ভূমিকার মাধ্যমে তার সাহসিকতার পরিচয় পেতাম দৃষ্টিতে সে খুব সম্ভাবনাময় ছিল।

দায়িত্বশীল গড়ে তুলবার জন্য দায়িত্বশীলের সাহচর্য খুবই ফলদায়ক। বিশ্ববিদ্যালয় বিদায়ের সময় কেন জানি বলেছিলাম লতিফ হলের আসলাম ভাই শহীদ হবে। কথা সত্য হয়ে গেল। ওর আচার আচরণ কথাবার্তা আমাকে ভাবিয়ে তুলতো, সর্বত্র সে দাওয়াতি কাজ করতো। একদিন সে আমাকে বলছে, “লতিফ হলের এমন কোনো বেড নেই, যে বেডে আমি বসিনি এবং দাওয়াত দেইনি। সে অন্য দলের নেতা হোক অথম অমুসলিম হোক।” অকুতোভয় নিবেদিতপ্রাণ আসলাম ভাই। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শফিক গণিত বিভাগের ছাত্র। মতিহার হলে থাকতো। একদিন আমের সময় ওর আম্মার কাছ থেকে আমার জন্য হলে আম নিয়ে এসেছে। বড় ফজলি আম ৪-৫টা।

আমরা সবাই মিলে খেলাম। অথচ আল্লাহর সে সব গোলাম আমাদের পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আমাদের আগেই আল্লাহর রেজামন্দি হাসিল করে চলে গেছেন। ৮৫-৮৬ সেশন শুরু হলো। জনাব লতিফুর রহমান ভাই ছাত্রজীবন শেষ করে কাপড় জিনিসপত্র নিয়ে একেবারে চলে যাচ্ছেন। উনাকে বিদায় জানাতে উনার রুমে গেলাম। কয়েকদিন পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের এ গুরুদায়িত্ব আল্লাহর এ অধম বান্দার ওপর এসেছে। উনি শেষ কথাটি আমাকে যা বললেন তা আজও স্মরণীয়। তাহলো, “তালেব ভাই, বহু দিন যাবৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু দায়িত্ব পালন করেছেন কিন্তু মূল সভাপতির দায়িত্ব আরো গভীর, আরো দুঃসহ, আরো কঠিন। যখনই আপনার কাছে কোনো কর্মী আসবেন, আপনি মনটা শক্ত করে নেবেন। আপনি মনে করবেন কোনো দুঃসংবাদ অথবা কোনো সমস্যা নিয়েই তিনি এসেছেন। তার সমাধান আপনাকেই করতে হবে। দুঃখের সংবাদই সব সময় আপনার জন্য।

সুখের কোনো সংবাদ আপনার কাছে হয়তো কম আসবে। মনটাকে এইভাবে তৈরি করে নিলে দায়িত্ব পালন করা সহজ হবে।” পরিশেষে একটি কথা বলেই শেষ করছি। তাহলো বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল দায়িত্ব যিনিই পালন করবেন তাকে অন্তত তিন-চার বছর পূর্ব থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের জনশক্তি হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে হবে, কাজ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ খুব ক্রিটিক্যাল। যখন তখন হঠাৎ করেই অর্থাৎ ১০ মিনিটেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত ফুঁসে ওঠে। বারুদের মত জ্বলে ওঠে। এ অবস্থা বুঝতে একটু সময় লাগে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে বড় বড় দায়িত্ব পালন করলেও হঠাৎ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন করা যায় না। এ বিষয়টা বর্তমান দায়িত্বশীলদের বিবেচনায় রেখে কাজ করতে হবে। লেখার শুরুতেই বলেছি আমার জীবনের এক উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে রয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো সংবাদে আমার এতটাই ভালো লাগে যা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। তেমনি দুঃখের কোনো সংবাদও হৃদয়কে আহত করে চরমভাবে। আল্লাহ যেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের সকল পর্যায়ের জনশক্তিদের হেফাজতে রাখেন। আমিন।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply