এসো আত্মগঠনে মনোযোগী হই -ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান

আত্ম মানে নিজ। নিজকে গড়াই পৃথিবীতে আমাদের পাঠানোর উদ্দেশ্য। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে সূরা মূলকে বলেছেন-
“তিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন, যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।” (সূরা আল মুল্ক : ২)
আল্লাহ আরো বলেন, “ইকরা কিতাবাকা কাফা বি-নাফসিকা ইয়াওমা আলাইকা হাসিবা” অর্থ : আজকে পাঠ কর তোমার আমলনামা; তোমার হিসাবের জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট। তাঁরপরেও কি আমরা নিজেকে সচেতন করবো না (?) প্রকৃত অর্থে যাঁরা জ্ঞানী তারা তাদের মূল জায়গার আবাসস্থল সুন্দর করার জন্য দুনিয়াকে কাজে লাগায়। কারণ আখিরাতে কে সফল কার আমল বিফলে যাবে তা ব্যক্তির ওপরেই নির্ভর করবে। পৃথিবীতে আমরা কেউ ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার বা বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করলাম। এগুলোই কি শুধু সফলতা (?) সফলতা তখনই প্রযোজ্য হবে যখন এগুলো আমার আল্লাহর দেয়া বিধান অনুযায়ী আমি এই কাজগুলোকে পরিচালনা করতে পারব।

আত্মগঠন কী

আত্ম মানে ‘নিজ’। ইংরেজিতে যাকে বলে Self, Soul, Spirit. . গঠন মানে ‘তৈরি করা’। ইংরেজিতে যাকে বলে Make, Form, Figure, Shape, Framing, Molding, Building-up. আত্মগঠন মানে নিজেকে গঠন। নিজেকে গঠন মানে নিজেকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে, সে উদ্দেশ্য সাধন করার জন্য যে যোগ্যতা দরকার, তা তৈরি করা। এক কথায় আল্লাহর খলিফা হিসাবে দায়িত্ব পালন করতে যে ধরনের যোগ্য লোক প্রয়োজন, সে ধরনের যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ হিসাবে গড়ে তোলাই আত্মগঠন।
আত্মগঠন কেন?

– নিজের পরিচয় জানার জন্য।
– নিজের ¯্রষ্টাকে জানার জন্য।
– নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে অবগতির জন্য।
– আল্লাহর খলিফার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য।
– দায়ী ইলাল্লাহর দায়িত্ব পালনের জন্য।
– মানবতার জন্য নিজেকে সত্যের সাক্ষ্য হিসাবে উপস্থাপনের জন্য।
– সৎ কাজের আদেশ অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকার যোগ্যতা অর্জনের জন্য।
– সর্বোপরি মানবতার কল্যাণের জন্য।
আত্মগঠন কিভাবে?

১. জ্ঞানার্জন :
জ্ঞান অর্জন প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
“পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন।
সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্তপিণ্ড থেকে।
পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহান দয়ালু।
যিনি কলমের সাহায্য শিক্ষা দিয়েছেন।
তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানতো না।” (সূরা আলাক : ১-৫)

জ্ঞান অর্জনের কথা বলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাই গাইডলাইন ছাড়া ছেড়ে দেননি। এখানে সেটাই বলা হচ্ছে সকল জ্ঞান অর্জন করা যাবে না, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার নির্দেশ অনুযায়ী জ্ঞান অর্জন করতে হবে। তাহলে আমি আপনি দুনিয়া ও আখেরাতে সফলকাম হতে পারবো। আর আসলে প্রকৃত জ্ঞানী এরাই।
ক. দৈনন্দিন জীবনের করণীয় বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি জানা।
খ. ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলন সম্পর্কে জানা।
গ. বর্তমান দুনিয়া ও অতীত দুনিয়া সম্পর্কে জানা।
ঘ. দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক পলিসি সম্পর্কে অবগত হওয়া।
ঙ. নিজের সমমানের লোকদের দ্বীন বুঝাতে কমপক্ষে যতটুকু জ্ঞান দরকার, ন্যূনতম সেটুকু অর্জন করা।
চ. যারা সফল হয়েছে তাদের জীবনী সম্পর্কে জানা।
ছ. সফল মানুষ খোলাফায়ে রাশেদিনের ইতিহাস জানা।
ঝ. বর্তমান বিশ্বের সমসাময়িক বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা।

২. আল্লাহর সাথে সম্পর্ক :

আল্লাহর সাথে সম্পর্কের জন্য কিছু নীতি বা পদ্ধতি অনুস্মরণ করতে হয়-
ক. পরিপূর্ণ নিয়মানুবর্তিতার সাথে ইসলামের মৌলিক ইবাদতসমূহ পালন করা।
খ. নফল ইবাদতসমূহ নিয়মিতভাবে পালন। বিশেষ করে তাহাজ্জুদ, নফল রোজা ও দান খয়রাত করা।
গ. সার্বক্ষণিক আল্লাহর স্মরণের জন্য মাসনুন দোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা।
ঘ. মহব্বতের সাথে আল্লাহর রাসূল সা.-এর প্রতি নিয়মিত দরুদ পাঠ করা।
ঙ. আত্মীয়তার হক রক্ষা করা।
চ. প্রতিবেশী ও নিকটাত্মীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করা।
ছ. সকল মাখলুকাতের সাথে ইনসাফপূর্ণ আচরণ করা

৩. দাওয়াত ইলাল্লাহ :

এজন্য প্রয়োজন-
ক. নিজ, নিজ আহালকে জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করা
খ. নিয়মিত আল্লাহর দেওয়া বিধান নিয়ম-কানুনগুলো মানুষের কাছে প্রচার করা
গ. আল্লাহর বিধানের প্রচারের কাজ করতে গিয়ে নিজেকে শাহাদাত আলান নাস হিসেবে উপস্থাপন করা
ঘ. একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার মানুষের টার্গেট মনের মধ্যে গেঁথে ফেলা। এবং নিজের যাবতীয় কার্যক্রম তাদেরকে কেন্দ্র করে পরিচালনা করা
ঙ. কথা ও কাজের মিল রাখা
চ. মানুষের বিপদ আপদে এগিয়ে আসা
ছ. সব সময় মানবতার কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা লালন করা
ঝ. আপনি যে আদর্শের দাওয়াত দিচ্ছেন আপনি প্রথমে সে আদর্শের মূর্ত প্রতীক হবেন।
৪. আত্মসমালোচনা :
আত্মসমালোচনার জন্য প্রয়োজন-

ক. একটি সময় নির্ধারণ করা।
খ. আল্লাহ তায়ালাকে এমনভাবে হাজির নাজির মনে করা, যাতে নিজের মনের উপর এমন প্রভাব পড়ে যে, আপনি তা উপলব্ধি করতে পারেন।
গ. নিজের জন্য গত ২৪ ঘণ্টা সময়ের নির্ধারিত পরিকল্পনা কী ছিল তা মনের আয়নায় নিয়ে আসা।
ঘ. গত ২৪ ঘণ্টার কৃতকর্মের একটি ছবি মনের পর্দায় উপস্থাপন করা এবং কাজগুলো যাচাই বাছাই করা।
ঙ. স্বীয় আত্মগঠনের জন্য যা পড়া ও যা করা দরকার ছিল তা করেছি কি না, তা খতিয়ে দেখা।
চ. স্বীয় সাংগঠনিক পরিকল্পনা ও দায়িত্ব বাস্তবায়নে যা করার কথা ছিল, তার কতটুকু করতে পারলাম, তা খতিয়ে দেখা।
ছ. পারস্পরিক মুয়ামেলাতে আপত্তিকর কিছু করলাম কি না তা খতিয়ে দেখা।
জ. পুরো তৎপরতার একটি যোগফল দাঁড় করানো যে, সফলতার পাল্লা ভারী, না বিফলতার পাল্লা ভারী।
ঝ. সফলতার পাল্লা ভারী হলে মাবুদের শুকরিয়া আদায় ও আগামীতে আরো করতে পারার জন্য তাওফিক কামনা। আর বিফলতার জন্য আল্লাহর নিকট তওবা করা এবং তাৎক্ষণিকভাবে সফলতার লক্ষ্যে কাজ শুরু করে দেয়া।
ঞ. আল্লাহর নিকট বিনীতভাবে দোয়া করা।

৫. হিজরত করা :

হিজরত হচ্ছে-
ক. দুনিয়ার জীবনে অনেক প্রয়োজনীয় জিনিস কেবল দ্বীনদারির জন্য ত্যাগ করা বা ত্যাগের মনমানসিকতা তৈরি করা।
খ. গোনাহ ও সীমালঙ্ঘনমূলক কাজ থেকে বিরত থাকা।
গ. সংগঠনের কাজে ক্ষতির সৃষ্টি করে এমন কর্ম, যদিও তা করা জায়েজ আছে, তবুও তা থেকে বিরত থাকা।
ঘ. পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট করে এমন আচরণ থেকে বিরত থাকা।
ঙ. মানবতার কল্যাণের জন্য দুনিয়ার সকল লোভ লালসা থেকে বিরত থাকা।
৬. মৌলিক মানবীয় গুণ অর্জন :

দুনিয়াবাসীর নেতৃত্ব দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় গুণাবলি অর্জন করা। যেমন-
ক. পরিশ্রমপ্রিয়তা
খ. কষ্টসহিষ্ণু
গ. আত্মসংযমী
ঘ. বিপদে দৃঢ়তা
ঙ. সময়ানুবর্তিতা
চ. শৃঙ্খলা
ছ. সত্যবাদিতা
জ. ত্যাগের মানসিকতা
ঝ. অল্পতে তুষ্ট
ঞ. ভোগে নয় ত্যাগে অভ্যস্ত হওয়া
ট. নীতিবান হওয়া
ঠ. নিজ আদর্শের প্রতি অবিচল থাকা
ড. আদর্শ বাস্তবায়নের সকল কিছুকে উপেক্ষা করা

সর্বোপরি আমাদের জানা উচিত আমাদেকে কেন পাঠানো হলো (?) প্রকৃত অর্থে আমি এসেছি একা আবার যাবো একা, মাঝে অনেক সম্পর্কের সাথে জড়িয়ে যাওয়া। এই সম্পর্কে জড়াতে গিয়ে আমরা আমাদের মূল কাজ ভুলে যাই। এখানে সার্থক হবে যখন আমরা জান্নাতে যেতে পারবো। চূড়ান্ত জান্নাতে তারাই যেতে পারবে যারা তাদের লক্ষ্যকে জানতে পেরেছে এবং সফলভাবে তাদের উদ্দেশ্য জানতে পেরেছে; তাদের আসল আত্মাকে চিনতে পেরেছে। কিয়ামতের দিন কোন বনি আদম সন্তানের পা এককদমও নড়তে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তাকে পাঁচটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস না করা হবে।

১. নিজের জীবনকাল সে কোন কাজে অতিবাহিত করেছে?
২. যৌবনের শক্তি-সামর্থ্য কোথায় ব্যয় করেছে?
৩. ধন-সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে?
৪. কোথায় তা ব্যয় করেছে?
৫. এবং সে যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছে সে অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছে? (তিরমিজি)

তাই আজ আমাদের উপলব্ধির বিষয় হলো আমরা যতই ডিগ্রি অর্জন করি না কেন? যতই যোগ্যতা অর্জন করি না কেন? কোন যোগ্যতাকেই আত্মগঠন বলা যায় না। যদি কেয়ামত দিবসে আমরা আল্লাহ তায়ালার কাছে আমাদের হিসাব পেশ করতে না পারি। আমাদের তখনই এসব অর্জন সফলকাম হবে, যখন আমরা আল্লাহর চূড়ান্ত ফায়সালায় কামিয়াবি হবো।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক

SHARE

Leave a Reply