এ কোন গণতন্ত্র

রাশেদুল হাসান রানা

csবাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। সংসদীয় গণতন্ত্র যে দেশে চালু আছে। একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো গণতন্ত্র। সভ্য সমাজে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো আজ এগিয়ে যাচ্ছে। গণতন্ত্রের সংজ্ঞা সর্বপ্রথম সম্ভবত ক্লাস এইটে থাকতে পড়েছিলাম আব্রাহাম লিংকনের উক্তির মাধ্যমে। তার পর অনেক বছর কেটে গেছে। স্থানভেদে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা পাল্টেছে। কেউ কেউ রসিকতা করে বলেন, টুঙ্গিপাড়ার গণতন্ত্রের সংজ্ঞা আর বগুড়ার গণতন্ত্রের বা ফেনী রংপুরে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা এক নয়। কেউ আবার বলেছেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সংজ্ঞা কি তামাম দুনিয়ার গণতন্ত্রের চেয়ে আলাদা?
দেশে গণতন্ত্রের নামে কী চলছে? স্বৈরতন্ত্র? লোটপাটতন্ত্র? কেন আজ দেশে বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদছে? কেন প্রশাসন দলীয় স্বার্থে ব্যবহার হচ্ছে? কেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত? কেন মানুষের ভোটের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে? কেনইবা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের নামে ভোটারবিহীন ভোটবিহীন নির্বাচন করে গণতন্ত্রের বারোটা বাজিয়ে দেয়া হচ্ছে? দেশের গণতন্ত্রের নামে চলছে এ কোন তন্ত্র? দেশে কি শেখ হাসিনার গণতন্ত্র চলছে? ১৯৭১ সালে মুক্তি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে রাষ্ট্রটি আমরা পেয়েছিলাম। তা কি দলীয় স্বার্থ বা গোষ্ঠী স্বার্থ রক্ষা করার জন্য? দেশে কার শাসন চলছে আইনের শাসন না এক ব্যক্তির শাসন? স্বাধীনতার আজ ৪৪ বছর অতিবাহিত হলেও আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত গণতন্ত্র এখনও পাইনি।
একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশের শৈশবেই বাকশালের নামে গণতন্ত্রকে হত্যা করতে এ দেশের মানুষ দেখেছে। তারপর বারবার দেশে স্বৈরশাসকদের স্বৈরতন্ত্র নানাভাবে এসেছে এ দেশের মানুষের ওপর জগদ্দল পাথর হিসেবে। বারবারই তা উতরে গেছে পরবর্তীতে গণতান্ত্রিক উপায়ের মাধ্যমে, কিন্তু তবুও গণতন্ত্র কি মিলেছে এ দেশের মানুষের জন্য?
কেউবা বলছে এটাতো হীরক রাজার দেশ। এখানে সবই সম্ভব। হীরক রাজার দেশ আসলে কোথায়? এ পৃথিবীতে সে দেশের অস্তিত্ব কি কেউ কখনও দেখেছে? তাহলে সবসময় সেই দেশটির কথা নানা প্রসঙ্গে আসে কেন? হ্যাঁ, হীরক রাজার দেশে সত্যজিৎ রায়ের একটি অনবদ্য চলচ্চিত্র। রূপকের আশ্রয় নিয়ে চলচ্চিত্রটিতে কিছু ধ্রুব সত্য তুলে ধরা হয়েছে। এটি গুপী গাইন বাঘা বাইন সিরিজের একটি চলচ্চিত্র। এর একটি বিশেষ দিক হচ্ছে মূল শিল্পীদের সকল সংলাপ ছড়ার আকারে করা হয়েছে। তবে কেবল একটি চরিত্র ছড়ার ভাষায় কথা বলেননি। তিনি হলেন শিক্ষক। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে একমাত্র শিক্ষক মুক্তচিন্তার অধিকারী বাদবাকি সবার চিন্তাই নির্দিষ্ট পরিসরে আবদ্ধ। দুর্ভাগ্য আমাদের আমরা হীরক রাজার নিকৃষ্ট শাসনের মধ্যে আছি যেখানে একজন শিক্ষকও তার স্বাধীন মত প্রকাশ করতে পারেন না। যদি পারতেন তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অত্যন্ত সজ্জন এবং সম্মানিত ব্যক্তি ড. এমাজউদ্দীন স্যার কি পেট্রলবোমা মারার মামলার আসামি হন?

নির্বাচনে ভয় কেন?
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো জনগণের অংশগ্রহণে একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। কিন্তু বর্তমানে যারা ক্ষমতায় আছেন তারা নির্বাচনকে প্রচন্ড রকম ভয় পান। আবার নিজেদেরকে গণতান্ত্রিকও দাবি করেন। জনগণের জন্য রাজনীতি জনগণের জন্য সবকিছু করলে নির্বাচনকে ভয় কেন? আসলে তারা তাদের আচরণে নিজেদেরকে এমন জায়গায় নিয়ে গেছেন জনগণ তাদের ভোট দিবেন না এটি তারা শতভাগ নিশ্চিত তাই নির্বাচনকে এত ভয়। আর একটি সুশীলসমাজ তৈরি হয়েছে এখন যারা সবসময় ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে বৈধতা দিয়ে সরকারের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত নিজেরা সুবিধা আদায় করেছেন সেই নাপিতের মতো। কথিত আছে ইয়াহিয়া খানের একজন নাপিত ছিল। সেই নাপিত তার বাসায় এসে চুল কাটাত। যখনই চুল কাটাতে আসত তখনই ইয়াহিয়া খানকে নাপিত বলতো, স্যার নির্বাচন কবে  দেবেন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এডিসি নাপিতকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিতো।
একদিন এডিসি নাপিতকে প্রশ্ন করলেন, তুমি চুল কাটতে এলে সব সময় এই প্রশ্নটি কেন করো? তুমি তো জানো নির্বাচনের কথা বললে তিনি রেগে যান। শুনে নাপিত বললো তাঁকে (ইয়াহিয়া খান) যখনি নির্বাচনের কথা বলি তখনি তার চুল খাড়া হয়ে যায়। এর ফলে আমার চুল কাটতে সুবিধা হয়। আমাদের দেশে সরকারের অবস্থা ঠিক তাই।

৫ জানুয়ারি নির্বাচন : গণতন্ত্রের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে
২০১০ সালে মিসরে পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর ‘ইজিপটস রিয়েল স্টেট অব ইমার্জেন্সি ইজ ইট বিপ্রেস্ড ডেমোক্রেসি’ শিরোনামে এক লেখা লিখেছিলেন দেশটির শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মোহাম্মাদ এল বারাদি। মিসরে আরব বসন্ত ছোঁয়া লাগার ঠিক আগে আগে লেখাটির শুরু, লাইনটি হচ্ছে মিসরে আরও একটি প্রতারণামূলক ও প্রহসনের নির্বাচন হয়ে গেল। এর মূল বিষয় হচ্ছে, তাত্ত্বিকভাবে মিসরের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কী আছে আর বাস্তবে কী হয়? হোসনি মোবারক তখনও ক্ষমতায়, এল বারাদি যা লিখেছেন তা অনেকটা এরকম, ‘তাত্ত্বিক ভাবে মিসরে একটি সংবিধান ও আইন কার্যকর রয়েছে এবং সেখানে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছাই সব, হোসনি মোবারক একজন স¤্রাটের মতোই ক্ষমতা ভোগ করেন তাত্ত্বিকভাবে মিসরে বহুদলীয় ব্যবস্থা রয়েছে কিন্তু বাস্তবে কোন দল গঠন করতে হলে এমন একটি কমিটির কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয় যে কমিটির নিয়ন্ত্রক হচ্ছে ক্ষমতাসীন দল।’
এল বারাদি তার লেখায় আরও লিখেছেন, ‘মিসরে একজন প্রেসিডেন্ট রয়েছেন তাত্ত্বিকভাবে কিন্তু গত ৫০ বছররেরও বেশি সময় ধরে দেশটি পেয়েছে মাত্র তিনজন শাসকের, তিনজনের শাসন পদ্ধতি ও দৃষ্টিভঙ্গিতে হয়তো পার্থক্য রয়েছে, কিন্তু তারা সবাই কর্তৃত্ববাদী ও নিপীড়নমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থারই নিয়ন্ত্রক ছিলেন। ২৯ বছর ধরে দেশ একটি জরুরি অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট সংবিধানে দেয়া জনগণের মৌলিক অধিকারকে সহজেই স্থগিত করতে পারেন। এবং এই অস্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহার হয়েছে। কেউ ভিন্নমত প্রকাশের সাহস দেখালে তা ব্যবহার করে তাকে আটক, নির্যাতন বা কখনও হত্যা করা হয়েছে। এই ধরনের আরও অনেক প্রমাণই এল বারাদি তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন যেগুলো দেখতে তাত্ত্বিকভাবে কার্যকর আছে বাস্তবে নেই।’
পাঠকদের এ কথা নিশ্চয়ই জানা থাকার কথা যে মিসরে ২০১০ সালে এই প্রতারণা ও প্রহসনের নির্বাচনের মাসখানেক পর ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসেই তাহরির স্কয়ারে শুরু হয়েছিল জনতার জাগরণ। যার নেপথ্যে সাহসী ভূমিকা ছিল মুসলিম ব্রাদারহুডের।
৮০০ রও বেশি গণতন্ত্রকামী বিক্ষোভকারীর মৃত্যু দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা গণ-আন্দোলনে স্বৈরশাসক মোবারকের পতন ঘটায়। এরপর যে নির্বাচন হয় তাতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মু. মুরসির (ব্রাদারহুড)। ক্ষমতার একবছর পূর্তি না হতেই মিসরের উদারনৈতিক সেকুলার ও বামধারার রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলন শুরু করে। আর এর সুযোগে আবারও সেনাবাহিনী মুরসিকে অবৈধভাবে ক্ষমতাচ্যুত করে। ক্ষমতা এখন সেনাপ্রধান আবদুল ফাত্তাহু মিসির হাতে। অনেকটা মোবারক স্টাইলে সেই পুরনো কাঠামোতেই ফিরে গেছে মিসর। মিসরের গণতন্ত্রের বারোটা বেজে আছে সেই শুরু থেকে।
বাংলাদেশ মিসর নয়, এখানে গণতন্ত্রে ঘড়ি হয়তো থেমে যায়নি তবে গণতন্ত্রের বারোটা বাজানোর সব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এল বারাদি তার প্রবন্ধে মিসরের যে চিত্র তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের চিত্র তার চাইতে কতটুকু ভালো? এক বছর হলো আমাদের দেশে একটি নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন বলতে যা বোঝায় তার ধারে কাছেও যায়নি।

২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন : মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
একটি স্বাধীন সার্বভৌম গণতান্ত্রিক দেশের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের স্বাধীনতার পর প্রায় অর্ধ শতাব্দী পূরণ হতে চলছে স্বাধীন মতপ্রকাশের সংস্কৃতি আমরা এখনও তৈরি করতে পারিনি। ক্ষমতাসীনদের শিখিয়ে দেয়া কোরাস গাইলে ভালো নইলে টুঁটি চেপে ধরা হবে। আজ মিডিয়ার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কতটুকু আছে। অবশ্য দেশ স্বাধীনের তো দুই বছরের মাথায় বাকশাল কায়েমের মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছিল যা বাকশালের নবরূপে এখন সর্বগ্রাসী। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আজ আফ্রিকা দিতে পারলে আমরা পারছি না। অনেকটা সেন্সরশিপ আরোপের মতো সম্পাদকদের ডেকে নিয়ে ভদ্র ভাষায় ধমক দেয়া হচ্ছে। ঠিক করে দেয়া হচ্ছে কি দেখানো যাবে, কি ছাপানো যাবে, আর কি যাবে না। সাহসী সংবাদিক মাহমুদুর রহমান আজ জেলে। দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি ও একুশে টিভি বন্ধ। আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ। ফ্রন্ট লাইনের মতো জনপ্রিয় টকশো বন্ধ করে দিয়ে ফলাও করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ফেরি করেছেন সরকারি মহল।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ে গত ৫ ডিসেম্বর আফ্রিকার এক যুগান্তকারী রায় এসেছে। রায়টি দিয়েছেন আফ্রিকান কোর্ট অন হিউম্যান অ্যান্ড পিপলস রাইট। অনেকটা ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত। ইউরোপিয়ান কোর্ট অব হিউম্যান রাইটসের আদলে গঠিত আফ্রিকার এই আঞ্চলিক আদালত কাজ শুরু করেন ২০০৪ সালে ২৫ জানুয়ারি।
বুর্কিনা ফাসোর পত্রিকা লা ওরাগণের (বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় প্রলয়) সম্পাদক লোহে ইসা কোনাটের আনা মামলায় আফ্রিকান কোর্ট অন হিউম্যান অ্যাড পিপলস রাইটস রায় দিয়েছেন যে একজন ম্যাজিস্ট্রেট ও সরকারি কৌঁসুলির অবমাননার দায়ে তাঁকে কারাদন্ড ও জরিমানা করা হয়েছে। তার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের জন্য ২০১২ সালের নভেম্বরে মি. কোনাটের এক বছরের করাদন্ড ও প্রায় ১২ হাজার ডলার জরিমানা করা হয়। কারাপ্রন্ডর পরিণতিতে তার প্রকাশনাও বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এখন তাকে তাঁর বন্দীকালীন সময়ের জন্য ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশের পাশাপাশি বুর্কিনা ফাসোকে তার ফৌজদারি আইনে মানহানির বিধান সংশোধনীরও আদেশ দিয়েছেন এই আফ্রিকান কোর্ট। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের সুরক্ষা বিষয় সংগঠন এ প্রতিষ্ঠানগুলো এই রায়কে যুগান্তকারী অভিহিত করে রেখেছেন যে এর ফলে আফ্রিকায় আরও কার্যকরী শক্তিশালী ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যম গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হলো। (সূত্র : ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের ১১ ডিসেম্বর প্রকাশিত বুলেটিন)
নানা ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও সংঘাতপীড়িত আফ্রিকা মহাদেশের সব দেশেই যে এই আদালত প্রতিষ্ঠায় সানন্দে অংশ নিয়েছে তা কিন্তু নয়। তবে ২৭ সদস্যের আফ্রিকান ইউনিয়নের ১৫টি দেশে এর এখতিয়ার মেনে নিয়েছে ইউরোপ ও আফ্রিকায় মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষায় বহুজাতিক আদালতের বা বিচারব্যবস্থার দিকনির্দেশনার যে অগ্রগতি হচ্ছে দুর্ভাগ্যজনকভাবে সার্ক বা আসিয়ানের দেশগুলো সে রকম কোন পরীক্ষা নিরীক্ষায় আজও আগ্রহী হয়নি। আর বাংলাদেশ তো বর্তমান সরকারের সময়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একবারেই শূন্যের কোটায়।

নিরপেক্ষ প্রশাসন
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নিরপেক্ষ প্রশাসন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর আমাদের দেশে প্রায় সবসময় নির্লজ্জভাবে প্রশাসনকে দলীয়করণ করা হয়েছে। বেসামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীগুলো কি সরকারি বাহিনী প্রজাতন্ত্রের বাহিনী না দলীয় ক্যাডার বাহিনী তা  বোঝাই দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ প্রশাসনের প্রায় সকল স্তরেই আত্মীয়করণ, দলীয়করণ, জেলকরণ চলছে অবৈধভাবে নিজেদের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার জন্য।
ব্রিটিশ শাসনামলে তখনকার বাংলায় একটি বিধি চালু ছিল, বিধিটির সংক্ষিপ্ত নাম চড়ষরপব ৎবমঁষধঃরড়হ ড়ভ ইবহমধষ যাকে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হতো চজই হিসেবে এতে বলা হয়েছিল রষষবমধষ ড়ৎফবৎ ংযড়ঁষফ হড়ঃ নব পধৎৎরবফ ড়ঁঃ অর্থাৎ পুলিশকে বলা হয়েছিল বেআইনি নির্দেশ পালন করা চলবে না। পালন করলে পুলিশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হতে পারবে। ব্রিটেন চেয়েছিল এ দেশের জনগণের সাথে বোঝা পড়া করে ক্ষমতা বা রাষ্ট্র চালাতে অথচ তখন আমরা স্বাধীন ছিলাম না ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট ছিলাম। তখনকার পুলিশের অবস্থা ছিল এই। আর একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ পেলাম তখন দেশ হয়ে উঠলো পুলিশি রাষ্ট্রে। তা না হলে একটি স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী কি করে বলতে পারে কঠিন ব্যবস্থা নিন, সব কিছুরই দায়িত্ব আমি নেবো। (প্রথম আলো ২৯ জানুয়ারি ১০১৫)। পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসেছিলেন বন্দুকের নল উঁচু করে। কিন্তু তিনি কখনও পুলিশকে বলেননি ব্যবস্থা নিন দায়িত্ব আমি নেবো।

গণতন্ত্রের নামে লোপাট তন্ত্র
একজন তরুণ বুদ্ধিজীবী সেদিন একটি টকশোতে বলেছিলেন দেশের ক্ষমতাসীনরা এবার এত বেশি লুটপাটে ব্যস্ত যা দেশকে একটি তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত করছে। ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা এতিমের দুম্বার গোশত পর্যন্ত লুট করে নিয়ে গেছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, সাহারা মরুভূমির যদি সন্ধান পান ক্ষমতাসীনরা তাহলে খুব অল্পসময়ে সেখানে বালুর অভাব দেখা দেবে। আমি বলছি না, দেশে আর কখনও লুটপাট হয়নি, কিন্তু এবার সকলকে অতিক্রম করে দেশকে লোপাট তন্ত্রের বাংলাদেশের পরিণত করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক গঠিত ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দলের চেয়ারম্যান লুইমোরেনো ওকাম্পো ৯ জানুয়ারি ২০১৩ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান গোলাম রহমানকে যে ঠিঠি দিয়েছিলেন তাতে ১৯৭২ সালের চোরের খনি থেকে উৎপাদিত পাকা চোরদের কাহিনীই উঠে এসেছে। সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল সাহেব ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিময়ে প্রথমপর্যায়ে থাকা হালাক্রো কোম্পানিকে কাজ না দিয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ে থাকা কানাডিয়ান লাভালিন গ্রুপকে কাজ পাইয়ে দেয়ার অঙ্গীকার করেন। যার পরিণতি সকলেরই জানা
১৯৯৬ এর মতো এবারো শেয়ারবাজার থেকে কোটি টাকা লুট হয়েছে সুকৌশলে। হলমার্কের মতো ভুয়া কোম্পানির নাম ব্যবহার করে সোনালী ব্যাংকের চার হাজার কোটি টাকা লুটে নেয়। একই ব্যাংকের আগারগাঁও শাখা থেকে মেসার্স গ্রীন প্রিন্টার্স নামে গৌতম কুমার লুটে নেয় ৫৫ কোটি টাকা, পূবালী ব্যাংক থেকে ১০৮ কোটি টাকার সরকারি আমানতও আত্মসাৎ করেন বিসমিল্লাহ নামে একটি ভুয়া প্রতিষ্ঠান। জনতাসহ আরও কয়েকটি ব্যাংক থেকে এক হাজার দুইশত কোটি টাকা। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক থেকেও হাতিয়ে নেয়া হয়েছে ৫০০০ কোটি টাকা। বেসরকারি ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে প্রায় ৪০০০ কোটি টাকার অনিয়ম ধরা পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কোটি কোটি টাকার হিসাব মিলাতে পারছে না। দারিদ্র্য বিমোচনের দেশের সর্বাধিক পরিচিত ব্যাংক বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, অগ্রণী, রূপালী কোন ব্যাংকই রেহাই পায়নি এই জালিয়াতির হাত থেকে। ২০১৩ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের অর্থের পরিমাণ বেড়েছে ৬২ শতাংশ বা এক হাজার তিনশত কোটি টাকা। দেশে যেন এক হরিলুটের মহোৎসব চলছে।
এখানেই শেষ নয়, কুইক রেন্টালের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে। সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত বাবুর পিএস ওমর ফারুক তালুকদারকে মন্ত্রীর ঘুষের ৭০ লাখ টাকাসহ ধরিয়ে দেন দেশপ্রেমিক ড্রাইভার আজম খান। আমাদের মাননীয় সরকারপ্রধানের জাতিসংঘ সফরের ব্যয়ের ফিরিস্তি একবার ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল পত্রিকায়। তার পুত্র-কন্যা নাতি-নাতনীসহ ৪০ জনের পারিবারিক সফর হয়েছিল। উঠেছিলেন নিউ ইয়র্কের সবচেয়ে ব্যয়বহুল হোটেল ওয়ালডর্ফ অ্যাসেটারিফ হোটেলে। রাতপ্রতি ৭১৯ ডলারে কয়েকটি সুট ও ৩১৯ ডলারের ২৫টি রুম ভাড়া নিয়ে মাননীয়ার ৬৫তম জন্মদিন পালন করা হয়েছিল। যে সফরে ব্যয় হয়েছিল বাংলাদেশী টাকা ১৫ কোটি টাকা যা বহন করেছিল এ দেশের ১৫ কোটি মানুষ তাদের ঘাম ঝরানো ট্যাক্সের টাকায়।
এসব দেখে মনে হয় ফিলিপাইনের দুর্নীতিবাজ প্রেসিডেন্ট মার্কোসের কথা। মনে হয় যেন দেশের শাসকদের ওপর তার প্রেতাত্মা ভর করেছে।
অনেকের মনে থাকার কথা ফিলিপাইনের দুর্নীতিবাজ প্রেসিডেন্ট মার্কোসের কথা। সে দেশের জনগণ তাকে তার পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্ট একইনো গুপ্তভাবে হত্যা করে ক্ষমতা দখলের জন্য অভিযুক্ত করে থাকে। তারা মনে করেন মার্কোস খুবই ধূূর্ত ছিলেন। ক্ষমতায় এলেই তিনি ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্য নির্যাতন ভীতি প্রদর্শন হত্যা, খুন ও গুমের আশ্রয় নিয়েছিলেন। দেশের সম্পদ লুটে নেয়ার জন্য ব্যবসা বাণিজ্য নিজের পরিবার ও বন্ধু বান্ধব, অনুগত অনুসারীদের সাথে ভাগবাটোয়ারা করেছিলেন এবং প্রচুর অর্থ বিদেশে পাচার করে দিয়েছিলেন। অতিষ্ঠ হয়ে দেশের জনগণ চবড়ঢ়ষব ঢ়ড়বিৎ সড়াবসবহঃ নামে প্রচন্ড আন্দোলন শুরু করে দুর্নীতিবাজ এই রাষ্ট্রপতিকে হাওয়াইতে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছিল। পালিয়ে যাবার সময় তাকে ইউএস কাস্টম এজেন্টরা তার ২৪টি সুটকেসে সোনার ইট, হীরা ও হীরার গয়না আটক করেছিলেন তার মূল্য ছিল বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। তার শাসনামলে ফিলিপাইনকে সবচেয়ে বেশি ঋণগ্রস্ত দেশে পরিণত করেছিলেন। ধারণা করা হয় ফিলিপাইনের রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে মার্কোস একাই সরিয়ে ছিলেন ৫ কোটি বিলিয়ন ইউএস ডলার। সুইজারল্যান্ড সরকার অস্বীকার করলেও পরে ৬৮৪ মিলিয়ন ইউসএ ডলার ফেরত দিয়েছিল। মর্কোস যখন তার স্ত্রীর ইমেলদাসহ হাওয়াইতে পালিয়ে যান তখন রাষ্ট্রপতি ভবনে তার স্ত্রীর দুই হাজার ৭০০ জোড়া জুতা পাওয়া গিয়েছিল।
দেশে আজ যেন তারই প্রতিচ্ছবি। কলকাতায় যেখানে ফ্লাইওভার নির্মাণে কিলোমিটার প্রতি ৪৮ কোটি টাকা, সেখানে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার এর ব্যয় ধরা হয়েছে ২১৪ কোটি টাকা প্রতি কিলোমিটার। এই লুটপাটতন্ত্রের হাত থেকে দেশকে বাঁচানোর জন্য প্রয়োজন একটি ঢ়বড়ঢ়ষব ঢ়ড়বিৎ সড়াবসবহঃ.

কোর্টের বিচারে প্রয়োজন নেই : বিচারে বাণী নিভৃতে কাঁদে
বাংলাদেশের এখন আর কোর্ট বিচারের প্রয়োজন নেই। এ কথা রাস্তার কোন সাধারণ পথচারীর মুখে উচ্চারিত হলে সেটাকে ক্ষোভের বা দুঃখের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ধরে নেয়া যেত। স্বয়ং সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী এ কথা বলেছেন। সরকারের দায়িত্ববান বলে প্রভাবশালী বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গও একই সুরে কথা বলছেন। পাল্লা দিয়ে বলছেন বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানরাও, কেউ কেউ গোষ্ঠীসহ শেষ করে দেয়ার কথা বলছেন।

নাটক : ক্রসফায়ার
আইনজীবী, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি কেউ বাদ পড়ছে না এই ক্রসফায়ার নাটকের হাত থেকে। সবচেয়ে বেশি শিকার ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। সারা দেশের হাজার হাজার বিরোধী নেতা কর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। তার মধ্যে অনেকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। আদালত ছাড়া ন্যায়বিচার হয় না আদালতেই যেখানে ন্যায়বিচার পাওয়া দুর্লভ হয়ে পড়ছে সেখানে কোর্ট ছাড়া বিচারের কী পরিণতি তা সহজেই অনুমান করা যায়।

শাসনতন্ত্র কী বলে?
বাংলাদেশের সংবিধান হলো সর্বোচ্চ আইন। এর সাথে সাংঘর্ষিক কোন কিছুই রাষ্ট্রের মধ্যে থাকতে পারে না। সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে ‘সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, এবং রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।
৩১ ও ৩২ নাম্বার অনুচ্ছেদে বিষয়টি আরও সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে। ৩১ নাম্বার অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহার লাভ যে কোন স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার। সাময়িকভাবে বাংলাদেশের অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষত আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না। যাতে কোন ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে। ৩২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হতে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবে না।
শেষ করতে চাই ইথিওপিয়ার নেতা আদ্দিস আবাবার কথা দিয়ে। যিনি সম্প্রতি আফ্রিকান ইউনিয়নের নেতাদের শীর্ষ বৈঠকে নেতাদের উদ্দেশ করে জনগণের কথা শুনার জন্য আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী জনগণ উদ্বেগ প্রকাশ করে থাকেন যখন তারা দেখেন যে তাদের নেতারা তাদের দায়িত্বের মেয়াদে শেষ হবার পরও ক্ষমতা ছাড়তে চান না। আমি তাদের এই উদ্বেগের অংশীদার।
বর্তমান বাংলাদেশে যে সঙ্কট তা গণতান্ত্রিক সঙ্কট। জনগণ তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চায়, ভোটের অধিকার চায় যা তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছে। তা ফিরিয়ে দিয়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন দিলে এবং তাদের যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে তারা গণতান্ত্রিক নিয়মনীতি মেনে চললেই দেশের কাক্সিক্ষত পরিবেশ ফিরে আসবে। আর এটাই জাতির প্রত্যাশা। অন্যথায় হীরক রাজার দেশের মুভিতে অত্যাচারী রাজার বিরুদ্ধে যে স্লোগান উঠেছিল তাই ভাবতে হবে এ দেশের জনগণকেÑ
‘ধর রশি মারো টান,
রাজা হবে খান খান’।

লেখক : কেন্দ্রীয় কলেজকার্যক্রম সম্পাদক
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply