ওয়াক্ফ দুনিয়া ও আখেরাতের মুক্তির সেতুবন্ধ -মো: রফিকুল ইসলাম

ইসলামে সম্পদ অর্জন এবং বণ্টন পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। সম্পদ অর্জিত হলে মুসলমানদের তা স্বেচ্ছায় পুনঃবণ্টনের আদেশ দিয়েছে ইসলাম। আল্লাহর নবী হযরত মোহাম্মদ সা.-এর সমর্থন ও উৎসাহে ওয়াক্ফ ব্যবস্থা খুবই জনপ্রিয় ও কল্যাণকর কাজ হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। ইসলামের অর্থনৈতিক ইতিহাস থেকে জানা যায় যাকাত নয়, বরং ওয়াক্ফ প্রতিষ্ঠান সম্পদ বৃদ্ধির বেলায় বেশি পরিচিতি লাভ করেছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীতে অটোম্যান সাম্রাজ্যের রাজস্ব আয়ের এক-তৃতীয়াংশ আসতো ওয়াক্ফ রাজস্ব থেকে। ওয়াক্ফ প্রতিষ্ঠান ইসলামী সভ্যতার একটি সুগঠিত ও সুসংহত অর্জন। আটলান্টিক থেকে প্যাসিফিক পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল ইসলামী বিশ্বের সর্বত্র ওয়াক্ফ স্বগড়িমায় উদ্ভাসিত। এসব দেশের অতি প্রয়োজনীয় ও আকর্ষণীয় স্থাপত্য এবং অত্যন্ত গুরুতপূর্ণ সেবাকর্ম যেমন : শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য কাজ ওয়াক্ফ ব্যবস্থার মাধ্যমে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরিচালিত হচ্ছে।

ওয়াক্ফ পরিচিতি
ওয়াক্ফ একটি স্বেচ্ছাধীন ও স্থায়ী প্রকৃতির দান। মুসলিম সমাজ ও জাতির আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির অন্যতম বিধান এই ওয়াক্ফ ব্যবস্থা। ইসলামের এ বিধানটি সমাজসেবা ও জনকল্যাণের অন্যতম হাতিয়ার, যার কল্যাণ ওয়াক্ফকারী মৃত্যুর পরও অনন্তকাল পর্যন্ত লাভ করতে পারে। মানুষের মৃত্যুর সাথে সাথে তার আমল ও পুণ্যের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। তখন ওয়াক্ফের পুণ্যই একমাত্র তার জন্য খোলা থাকে। এ বিষয়ে আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মদ সা. বলেছেন; মানুষের মৃত্যুর পর তিনটি আমল ছাড়া তার সমুদয় আমল বন্ধ হয়ে যায়। ঐ তিনটি আমল হলো- (১) সাদাকায়ে জারিয়াহ (অব্যাহত দান) (২) উপকারী ইলম (জ্ঞান) (৩) নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করবে। (মুসলিম শরিফ-১৯৯২)

ওয়াক্ফের সংজ্ঞা
ওয়াক্ফ বলতে বোঝায় ‘ঠেকিয়ে রাখা’ বা নিবৃত্ত করা। ওয়াক্ফ এক ধরনের দান যেখানে তহবিল ধরে রাখা হয় এবং তা আল্লাহর ওয়াস্তে নির্দিষ্ট জনকল্যাণে ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশ ওয়াক্ফ আইন ১৯৬২তে ওয়াক্ফের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে “ওয়াক্ফ বলতে কোনো ব্যক্তির দ্বারা স্থাবর কিংবা অস্থাবর সম্পত্তি মুসলিম আইনে স্বীকৃত যে কোনো ধর্মীয়, ধর্মসম্বন্ধীয় অথবা দাতব্য উদ্দেশ্য চিরতরে সোপর্দ করাকে বোঝায়।” ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশও ওয়াকফের একটি সংজ্ঞা প্রদান করেছে “কোন ব্যক্তি কর্তৃক নিজ সম্পত্তি আল্লাহর মালিকানায় সোপর্দ করে তা হতে প্রাপ্ত আয় কোনো ধর্মীয় বা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করার নির্দেশ দেওয়াকে ওয়াক্ফ বলে।” ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মতে, “কোনো বস্তুকে ওয়াক্ফকারীর মালিকানায় রেখে এর উৎপাদন ও উপযোগকে গরিবদের মধ্যে কিংবা যে কোনো কল্যাণকর খাতে দান করে দেওয়াকে ওয়াক্ফ বলে।

ওয়াক্ফের শর্ত
১. ওয়াক্ফ সম্পত্তি চিরস্থায়ী দান করতে হবে।
২. নিঃস্বার্থ দান করতে হবে।
৩. মানবতার কল্যাণে দান করতে হবে।
৪. বিক্রয়, হেবা বা অসিয়াত করা যাবে না।
৫. ব্যক্তি নিজে কোন সুবিধা ভোগ না করা।
৬. ব্যক্তির মৃত্যু হলে উত্তরাধিকারীরা তা দাবি করতে পারবে না।
৭. দান করে ফেরত নেয়া বা দাবি করা যাবে না।
৮. শুধুমাত্র সওয়াবের উদ্দেশ্যে দান করা।

ওয়াক্ফের গুরুত্ব
ওয়াক্ফ দুনিয়ার কল্যাণ ও আখেরাতের সঞ্চয়ের এক ব্যবস্থাপনা। এর মাধ্যমেও জনসেবা নিশ্চিত করে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভ করা যায়। পরোপকারে সম্পদের একটি অংশ দান করার বিষয়ে কুরআনে তাগিদ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন- “তোমরা নামাজ প্রতিষ্ঠা করো, যাকাত আদায় করো এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ (দান করার মাধ্যমে) দিতে থাকো, (মনে রাখবে) যা কিছু ভালো ও উত্তম কাজ তোমরা আগে ভাগেই নিজেদের জন্য আল্লাহর কাছে পাঠিয়ে রাখবে। তাই তোমরা আল্লাহ্র কাছে (সংরক্ষিত দেখতে) পাবে, পুরস্কার ও এর বর্ধিত পরিমাণ হিসেবে তা হবে অতি উত্তম।” (সূরা মুজ্জাম্মিল : ২০)
উক্ত আয়াতে উত্তম ঋণ বা কর্জে হাসানা বলতে আল্লাহর উদ্দেশ্যে দান করাকে বোঝায়। এর দ্বারা ওয়াক্ফ নির্দেশ করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তির সম্পদের অর্জিত বা প্রাপ্ত একটি অংশ দান বা ওয়াক্ফ করার বিষয়ে আল্লাহ্ তায়ালা আরো বলেন “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেরা যা উপার্জন করেছো, যে পবিত্র (সম্পদ) এবং যা আমি জমিনের ভেতর থেকে তোমাদের জন্য বের করে এনেছি তার থেকে (একটি) উৎকৃষ্ট অংশ, (আল্লাহর পথে) ব্যয় করো।” (সূরা বাকারা : ২৬৭)

সম্পদ থেকে দান করার বিষয়ে বিশ্ববাসীদের তাগিদ দিয়ে মহান আল্লাহ আরো বলেন-“যারা স্বীয় ধন সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে, অতঃপর ব্যয় করার পর যে অনুগ্রহের কথা-প্রকাশ করে না এবং কষ্টও দেয় না, তাদেরই জন্য তাদের পালনকর্তার কাছে রয়েছে পুরস্কার এবং তাদের কোনো ভয় নেই, তারা চিন্তিতও হবে না। উল্লেখ্য যে, এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর নবীজির অন্যতম আনসার সাহাবী হযরত আবু তালহা রা. তার সম্পদের কিছু অংশ ওয়াক্ফ করতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। মসজিদে নববী সংলগ্ন বিপরীত দিকে ‘বীরহা’ নামক (বাইরুহা) তার একটি কূপ ছিল। তিনি এটি আল্লাহর রাস্তায় দান করে দেন। আল্লাহর রাসূলের পরামর্শে আবু তালহা বাগানটি স্বীয় আত্মীয়-স্বজন ও চাচাতো ভাইদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। (বুখারি ও মুসলিম)
আল্লাহ পাক দান করার ব্যাপারে যেমন তাগিদ দিয়েছেন, তেমনি সামর্থ্যবান হওয়া সত্ত্বেও যথাসময়ে দান বা ওয়াক্ফ না করার পরিণাম সম্পর্কেও সতর্ক করেছেন। আল্লাহ বলেন : ‘হে মুমিনগণ; তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে। যারা এ কারণে গাফেল হয়, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত। আমি তোমাদেরকে যে রিজিক (ধন-সম্পদ) দিয়েছি, তা থেকে মৃত্যু আসার আগেই ব্যয় করো। অন্যথায় সে বলবে হে আমার রব, আমাকে আরও কিছুকাল অবকাশ দিলে না কেন? তাহলে আমি সাদাকাহ করতাম এবং সৎকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম, প্রত্যেক ব্যক্তির নির্ধারিত সময় যখন উপস্থিত হবে, তখন আল্লাহ কাউকে অবকাশ দিবেন না। তোমরা যা করো আল্লাহও সে বিষয়ে খবর রাখেন। (সূরা মুনাফিকুন : ৯-১১)

বাংলাদেশে ওয়াক্ফের পরিসংখ্যানগত অবস্থা
ওয়াক্ফ এক সময় সারা দুনিয়ার মুসলিম সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সেবা এবং কল্যাণের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। এর উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ বর্তমানে অনেকটা সীমিত হয়ে পড়েছে। ১৯৮৩ সালের এক পরিসংখ্যানের মতে বাংলাদেশের মোট ১,৫০,৯৫৩টি ওয়াক্ফ স্টেট রয়েছে। এর ৯৭,০৪৬টি রেজিস্ট্রিকৃত, ৪৫,৬০৭টি অরেজিস্ট্রিকৃত এবং ৭,৯৪০টি ব্যবহারিক। বাংলাদেশে মোট ২,১৪,৫৭৫.৪৬ একক জমি ওয়াক্ফ আছে। এসব সম্পত্তির ২,০০,৮৪২ একর কৃষিজমি এবং ১৩,৭৩৪ একর অকৃষি জমি। এসব ওয়াক্ফ প্রতিষ্ঠানের (সম্পদের) আয় থেকে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এক হিসেবে দেখা যায়, ওয়াক্ফ প্রশাসন বর্তমানে ১৫০০টি মসজিদ, ৭০০টি মাদ্রাসা, ১০০টি এতিমখানা, ৫টি দাতব্য চিকিৎসালয় এবং নও-মুসলিমদের জন্য কল্যাণ তহবিল পরিচালনা করছে। ১৯৮৩ সালের এক হিসাব অনুয়ায়ী বাংলাদেশে ১,৩১,৬৪১টি মসজিদ রয়েছে, যার মধ্যে ১,২৩,০০৬টি মসজিদ ওয়াক্ফ সম্পত্তির উপর স্থাপিত। ওয়াক্ফ ব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করে তুলতে পারলে এটি দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে বিরাট অবদান রাখতে পারে।

ওয়াক্ফের ধরন
১) জমি
২) ঘর/বাড়ি/দালান/হলরুম
৩) পুকুর (কূপ)/খাল/হাওর
৪) দোকান/মার্কেট
৫) শিল্পকারখানা
৬) ফলবান বৃক্ষ
৭) যানবাহন
৮) নগদ টাকা (ক্যাশ)
৯) বই পুস্তক (লাইব্রেরি)
১০) গবাদিপশু ইত্যাদি।

ক্যাশ (নগদ) ওয়াক্ফের ভিত্তি
ক্যাশ ‘ওয়াক্ফ’ ওয়াক্ফ’র একটি ভিন্নরূপ। আগে দেশে জনসংখ্যা কম থাকার দরুন মানুষ তার জায়গা জমি দিয়ে ওয়াক্ফ করতেন। কিন্তু দিন দিন জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে পরিবারের মধ্যে জমি ভাগ হয়ে যাওয়ার কারণে জমি দিয়ে ওয়াক্ফ করা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় মুসলিম পণ্ডিতগণ ওয়াক্ফ ব্যবস্থাকে ধরে রাখা এবং জনগণকে উৎসাহিত করার জন্য ক্যাশ ওয়াক্ফের একটি পদ্ধতি বা সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। হানাফি মাজহাবের বিশেষজ্ঞ পণ্ডিত জাফর ইবনে আল-হুজাইল ক্যাশ (নগদ) ওয়াক্ফের সংজ্ঞায় বলেন, “ক্যাশ ওয়াক্ফ হলো, ওয়াক্ফ হিসেবে দানকৃত সেই নগদ অর্থ যা বিনিয়োগ করা হয় এবং সেই বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে উৎসর্গ বা সাদাকা করা হয়।” অতএব, ক্যাশ ওয়াক্ফ হচ্ছে সমাজের জনগোষ্ঠীর মাসিক বা এককালীন সঞ্চয়ের একটি অংশ দান করা, যা থেকে অর্জিত আয় দ্বারা বিভিন্ন ধর্মীয়, শিক্ষা ও সমাজ সেবায় বিনিয়োগ করা হয়। ক্যাশ ওয়াক্ফ থেকে অর্জিত আয় স্থাবর সম্পত্তির ওয়াক্ফর মতই বিভিন্ন খাতে ব্যয় করা হয়।

ক্যাশ (নগদ) ওয়াক্ফের পদ্ধতি
দুনিয়ার শান্তি ও পরকালের মুক্তির জন্য ক্যাশ ওয়াক্ফ একটি আধুনিক পদ্ধতি। দেশে দিন দিন জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, সে অনুযায়ী জমি/ভূমি বাড়ছে না। তা ছাড়া পারিবারিক ভাবে ভোগ বণ্টনের কারণে জমির আয়তন দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। তাই জমি দিয়ে আগের মত ওয়াক্ফ করা অনেকটা সংকুচিত হচ্ছে। এ অবস্থায় নিম্ন পদ্ধতিতে ব্যাংকে ক্যাশ ওয়াক্ফ করা যায়।
১) ব্যাংকে ওয়াক্ফ হিসাব খোলার শুরুতে ওয়াকিফ মোট ওয়াক্ফকৃত অর্থের পরিমাণ ঘোষণা দিবে।
২) ঘোষণা মোতাবেক উক্ত টাকা এককালীন অথবা কিস্তিতে ন্যূনতম জমা ১০০০ টাকা (এক হাজার), যা পরবর্তীতে ঘোষিত অর্থের পরিমাণ এ উন্নীত করতে হবে।
৩) ক্যাশ ওয়াকফের উদ্দেশ্য উল্লেখ করতে হবে।
৪) ওয়াক্ফ হিসাবের মুনাফা কে বণ্টন করবে, ব্যাংক না ওয়াকিফ তা উল্লেখ করতে হবে।
৫) ওয়াকিফ কর্তৃক মুনাফা বণ্টিত হলে তা কিভাবে কোথায় বণ্টিত হবে তা উল্লেখ করতে হবে।
৬) মুনাফা বণ্টন মাসিক না বার্ষিক হবে তা আগেই উল্লেখ করতে হবে।
৭) ক্যাশ ওয়াক্ফ জমা ছাপানো রসিদের মাধ্যমে জমা দিতে হবে এবং ঘোষিত টাকার পরিমাণ যখন সম্পূর্ণ জমা হবে, তখন ওয়াক্ফ সনদ ব্যাংক থেকে প্রদান করা হবে।
৮) ওয়াকিফের মৃত্যু হলে ওয়াক্ফ হিসাবে মুনাফা তার নির্দেশিত খাতে/ উদ্দেশ্যে ব্যয় করা হবে। এ ক্ষেত্রে ঘোষিত পরিমাণের চেয়ে কম জমা হয়ে থাকলে মৃতের উত্তরাধিকারীগণ বাকি অংশ জমা দিতে পারবেন।
৯) ওয়াকিফ অথবা তার মৃত্যুতে উত্তরাধিকারী যদি তার হিসাবে তার কিস্তি জমা দিতে ব্যর্থ হন, তবে তিনি/তারা এই মর্মে লিখিতভাবে অনুরোধ জানাবেন যে, তিনি ওয়াক্ফ হিসাবের ঘোষিত পরিমাণের কিস্তিগুলো জমা দিতে অপারগ, তখন ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে যে পরিমাণ টাকা হিসাবে এ পর্যন্ত জমা করা হয়েছে সেই পরিমাণ অর্থের জন্য ক্যাশ ওয়াক্ফ সনদ প্রদান করা হয়।
১০) সময়ের চাহিদা অনুযায়ী ব্যাংক প্রয়োজন বোধে সময়ে সময়ে এই হিসাবের নিয়ম কানুন, পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন, বিয়োজন ও সংশোধন করার অধিকার থাকবে।

ক্যাশ ওয়াক্ফের অবদান
মুসলিম বিশ্বে ওয়াক্ফ বিশেষ করে ক্যাশ ওয়াক্ফের বহুমুখী অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবদান রয়েছে। এমন অনেক অতি প্রয়োজনীয় সেবা রয়েছে যা রাষ্ট্রের পক্ষে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি, অথচ ওয়াক্ফের মাধ্যমে কম খরচে নাগরিকদের কাছে সেই সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। ক্যাশ ওয়াক্ফ এমন একটি পরিহিত দান, যাতে সমাজের স্বচ্ছল ব্যক্তিরাই কেবল অংশ নিতে পারেন তেমনটি নয়, কম আয়ের মানুষ, এমনকি অসচ্ছল ব্যক্তিরাও অংশ নিতে পারেন। ফলে অধিকাংশ লোক ক্যাশ ওয়াক্ফতে অংশ নিয়ে একটি একক তহবিল গঠন হওয়ার ফলে এটি দিয়ে সমাজসেবা বা সামাজিক উন্নয়ন যতটা দ্রুত ও কার্যকর ভাবে করা যায়, সাধারণ ওয়াক্ফতে তা সম্ভব হয় না। ক্যাশ ওয়াক্ফের ফলে দেশের সরকারের তার নাগরিকদের সেবার জন্য যে খরচ হওয়া কথা তা অনেকটা লাঘব হয় এবং সরকার অন্য খাতে তার বাজেট বরাদ্দের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ক্যাশ ওয়াক্ফ যুগ যুগ ধরে মুসলিম বিশ্বের সরকারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রেখেছে। আধুনিক যুগেও ওয়াক্ফের অবদান এতটুকু কমেনি, বরং তার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।

ক্যাশ ওয়াক্ফের কার্যক্রম ও ইসলামী ব্যাংকের ভূমিকা
বাংলাদেশে সাধারণ ওয়াক্ফ চালু থাকলেও ক্যাশ ওয়াক্ফের বিষয়টি এখানে তেমন পরিচিতি লাভ করতে পারেনি। এ দেশে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালুর পর থেকে ক্যাশ ওয়াক্ফের বিষয়টি সামনে আসে। সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক সর্বপ্রথম ১৯৯৭ সালে ক্যাশ ওয়াক্ফ সঞ্চয় প্রকল্প চালু করলেও এই বিষয়টির প্রতি সবচেয়ে গুরুত্ব প্রদান করে দেশের শীর্ষস্থানীয় দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার প্রথম সুদমুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। ইসলামী ব্যাংক ২০০৪ সালে এই ক্যাশ ওয়াক্ফ চালু করে অত্যন্ত সফল ভাবে। ফলে ব্যাংকটির ক্যাশ ওয়াক্ফ সঞ্চয়ের পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং জনগণের মধ্যে ব্যাপক সাড়া লক্ষ করা যাচ্ছে, যা ব্যাংকগুলোর মোট ওয়াক্ফ আমানতের ৭১.২৪ শতাংশ। ইসলামী ব্যাংক “মুদারাবা ওয়াক্ফ ক্যাশ ডিপোজিট হিসাবের মাধ্যমে ওয়াকিফের (দাতা) কাছ থেকে ওয়াক্ফ আমানত গ্রহণ করে এবং এই আমানত বিনিয়োগ (ব্যবসায়) করে যে আয় হয় তা থেকে ব্যাংকের ইচ্ছানুযায়ী বা ওয়াকিফের (দাতার) নির্দেশনা অনুযায়ী শরিয়াহসম্মত কল্যাণে কাজে তা ব্যয় (দান) করে। যেসব খাতে ওয়াক্ফের মুনাফা ব্যয় করা হয় বা ব্যয় করা যাবে, তা হলো-

(ক) পারিবারিক পুনর্বাসন
১) প্রকৃত দারিদ্র্যের অবস্থার উন্নয়ন।
২) প্রতিবন্ধী ও সুবিধাবঞ্চিত লোকদের পুনর্বাসন।
৩) ভিক্ষুক পুনর্বাসন।
৪) অসহায় মহিলাদের পুনর্বাসন।
৫) বস্তিবাসীদের পুনর্বাসন।
৬) এতিম লালন/ পালন।
৭) বেকারদের পুনর্বাসন।

(খ) শিক্ষা ও কৃষ্টি
১) শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা।
২) দক্ষতা উন্নয়নকল্পে শিক্ষার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ।
৩) নারীদের শিক্ষায় উৎসাহিত করা।
৪) শারীরিক শিক্ষা ও খেলাধুলার ব্যবস্থা করা।
৫) ইসলামী কৃষ্টি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং শিল্পকলার উন্নয়ন।
৬) উচ্চ শিক্ষা সম্প্রসারণ করা, শিক্ষা উপকরণে সহায়তা করা।
৭) ত্রাণ ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
৮) বয়স্ক শিক্ষা চালু করা।
৯) স্কলারশিপ চালু করা।

(গ) স্বাস্থ্য চিকিৎসা ও পয়ঃপ্রণালী
১) গ্রাম স্বাস্থ্যসেবা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা।
২) সর্বত্র বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ।
৩) দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য হাসপাতাল, স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠাকরণ।
৪) স্বাস্থ্য পরিচর্যা, স্বাস্থ্যবিষয়ক ও রোগ বিষয়ক গবেষণা করা।

(ঘ) সামাজিক উপযোগিতা সেবা
১. বিতর্কিত বিবাদ/বিষয়সমূহ নিষ্পত্তিকরণ যেমন-গ্রাম্য মামলা, তালাক ইত্যাদি।
২. দুস্থদের আইনগত সহায়তা।
৩. যৌতুকবিহীন বিয়েতে সহায়তা।
৪. রাস্তা-ঘাট রক্ষণাবেক্ষণ এবং বৃক্ষরোপণ।
৫. নওমুসলিমদের পুনর্বাসন।
৬. শান্তিপ্রিয় অমুসলিমদের সহায়তাকরণ।
৭. অসামাজিক কার্যক্রম প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টিকরণ।
৮. জনগণের উপযোগী সেবা সমূহের প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়ন।
৯. মসজিদ, মাদ্রাসা, মক্তব, স্কুল, কলেজ, দাতব্য প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে ট্রাস্ট, ফাউন্ডেশন ইত্যাদি রক্ষণাবেক্ষণ করা।
১০. কবরস্থানের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ।
১১. ঈদগাহ্ সমূহের রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি।
১২. সরাইখানা প্রতিষ্ঠা অর্থাৎ-আগন্তুক বা পথিকদের জন্য নিরাপদ পানি, টয়লেট ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করা।

(ঙ) ইসলামের প্রচার ও প্রসারের ব্যবস্থা করা
ইসলামের প্রচার ও প্রসার অর্থাৎ দাওয়াত দেওয়া একটি ফরজ কাজ। এ বিষয়ে ওয়াক্ফ বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে।
১. ধর্মীয় বিষয়ে গবেষণা করা।
২. কুরআন, হাদিস, ইসলামী সাহিত্য প্রকাশ ও বিতরণ করা।
৩. কুরআন শিক্ষার জন্য পাড়ায় পাড়ায় কুরআন একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা।
৪. চলচ্চিত্র/ফিল্ম তৈরি করা।
৫. ইসলামিক মিডিয়া প্রতিষ্ঠা করা-
(ক) ইলেকট্রনিক মিডিয়া, (খ) প্রিন্টিং মিডিয়া।
৬. ইসলামী গান/সঙ্গীতের ব্যাপক প্রসার করা।
৭. ইসলামী বিষয়ে স্কলারলিপের ব্যবস্থা করা।
৮. দ্বীনের প্রচার ও প্রসারের জন্য (দায়ী) ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ তৈরি করা।
৯. ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের মতবিনিময়ের জন্য সময় সময় সম্মেলনের ব্যবস্থা করা।
১০. ঈমামদের বেতন বৃদ্ধি করে ফুলটাইম ধর্মীয় কাজে নিয়োজিত করা।
১১. আলোকিত মানুষ গড়ার লক্ষ্যে পাড়ায় পাড়ায় পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করা ।
১২. ধর্মীয় বা সামাজিক অবদানের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা করা।
১৩. বে-ওয়ারিশ লাশ দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করা।

ওয়াক্ফ ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন
ওয়াক্ফ ব্যবস্থাকে সময় উপযোগী করে তোলা এবং এর দুনিয়াবি কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির বিষয়ে জনগণকে অধিকতর সচেতন করার লক্ষ্যে ব্যাপক কর্মসূচি ও পন্থা উদ্ভাবন করা
প্রয়োজন যা নিম্নে আলোচনা করা হলো :
১. ওয়াক্ফ ব্যবস্থাকে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা।
২. প্রতিনিয়ত মসজিদের খুতবায় আলোচনা করা।
৩. গণমাধ্যমে এর প্রচার ও প্রসারের ব্যবস্থা করা।
৪. তাফসির ও ওয়াজ মাহফিলে ব্যাপক আলোচনা করা।
৫. এ বিষয়ে মাঝে মাঝে সিম্পোজিয়াম, সেমিনার আয়োজন করা।
৬. ওয়াকিফকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মর্যাদা ও পুরস্কৃত করা।
৭. ওয়াক্ফ ব্যবস্থার বিভিন্ন সফলতা বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত নিয়ে প্রতি বছর প্রতিবেদন প্রকাশ করা।
৮. মসজিদভিত্তিক প্রতিটি এলাকায় ওয়াক্ফ প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ ও সংরক্ষণ করা।
৯. ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে বছরের সুবিধাজনক সময়ে জনগণকে উৎসাহ ও সচেতন করার লক্ষ্যে মাইকিং, পোস্টারিং, র‌্যালি ও আকর্ষণীয় প্রকাশনা প্রকাশ ও বিতরণ ব্যবস্থা করা।
১০. ওয়াক্ফ ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরার জন্য প্রতি বছর রমযান মাসের প্রথম শুক্রবারকে ওয়াক্ফ দিবস হিসেবে পালন করা।
১১. ওয়াক্ফ দিবসকে উদযাপনের জন্য সকল সরকারি, বেসরকারি, বিশেষ করে মহল্লাভিত্তিক মসজিদকেন্দ্রিক ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা।
১২. বাংলাদেশের সকল ইসলামী ব্যাংকগুলোর প্রতি বছর রমযান মাসকে (ক্যাশ) ওয়াক্ফ মাস হিসেবে পালন করা।
১৩. ওয়াক্ফ ব্যবস্থাকে অধিকতর জানা এবং এ বিষয়ে গবেষণার জন্য প্রতি বছর রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কার এবং বিভিন্ন ধরনের ডিগ্রি ও সনদ প্রদান করা।
১৪. সর্বোপরি ওয়াক্ফ ব্যবস্থাকে সার্বজনীন রূপ দেয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা অপরিহার্য।

পরিশেষে একথা অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করা যায় যে, ওয়াক্ফ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের অন্যতম উপায়। এটা মানুষের ব্যক্তি জীবনকেই সফল করে না, বরং তার পরকালীন জীবনেও অফুরন্ত সওয়াবের পাথেয় জোগাড় করে। ওয়াক্ফের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা দরিদ্র, অসহায় ও অক্ষম মানুষের নানাবিধ উপকার সাধন করে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটাতে সাহায্য করে। তাই সম্পদের সামর্থ্যবান লোকদের উচিত ওয়াক্ফের মতো একটি আর্থিক কৌশলের সাথে যুক্ত হয়ে সাদকায়ে জারিয়ার সুবিধা গ্রহণ করা এবং এর মাধ্যমে দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনে এগিয়ে আশা।
লেখক : ব্যাংকার

SHARE

Leave a Reply