কথার কথন -সালাহউদ্দীন আইউবী

মানুষের মুখ থেকে উচ্চারিত বোধগম্য শব্দকেই মূলত কথা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অক্সফোর্ড ডিকশনারির ভাষায়- Say something in order to convey information, an opinion or a feeling. কোন ব্যক্তি তার নিজের পরিচয় তুলে ধরেন তার কথাশক্তির মাধ্যমে। কথাই হলো মানবসভ্যতার প্রাথমিক যোগাযোগমাধ্যম। ছোট শিশুর প্রথম কথাটি তার অভিব্যক্তি ব্যক্ত করার একমাত্র উপায়। হাঁটতে শেখার আগেই সকল শিশু কথা বলতে শেখে। শিশুকাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানবজীবনে কথার কোন তুলনা হয় না। মহান আল্লাহ তাআলা স্বয়ং মানুষকে কথা শিক্ষা দিয়েছেন। সূরা আর রহমানে তিনি বলেন ‘(তিনি আল্লাহ) যিনি তোমাদেরকে কথা শিক্ষা দিয়েছেন।’
কথার মাধুর্যতা একজন কুৎসিত কালো মানুষকে প্রিয় করে তোলে। কথার ফুলঝুরি আর কথার মালায় গড়ে তোলা অগ্নিঝরা বক্তব্য কোটি মানুষের হৃদয়ে উত্তাল ঢেউয়ের বন্যা বইয়ে দেয়। হাজারো মানুষ জীবন দিতে প্রস্তুত হয়। আবার সৌন্দর্যের সকল উপকরণের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও কথার কুৎসিত ব্যবহারের কারণে ব্যক্তিটি সকলের কাছে হয়ে যায় ঘৃণিত। কথাই মানুষকে উৎফুল্ল করে, আবার সে কথাই মানুষকে বিষন্ন করে দেয়। কথা যে কাউকে হতাশ করে। আবার কখনোবা আশাবাদী করে তোলে।
সুতরাং যারা সমাজ পরিবর্তন করতে চায়। ঘুণেধরা এই সমাজের আমূল পরিবর্তন আনতে চায়, হতে চায় সমাজ বিপ্লবী। তাদের কথাগুলো হতে হবে শরিয়তের মানদণ্ডে প্রশ্নমুক্ত, সমাজের বিচারে অদ্বিতীয় অন্য যে কারও চেয়ে আকর্ষণীয়। আমাদেরকে রপ্ত করতে হবে সুন্দর করে কথা বলার অভ্যাস। আপনি সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বললে যে কেউ আপনার কথার মূল্য দিতে বাধ্য। ভাবতে পারেন, কথা বলা- এ আর এমন কী! কিন্তু জেনে রাখুন শুধু সুন্দর করে কথা বলার গুণ আপনার ক্যারিয়ারকে নিয়ে যেতে পারে এক অনন্য উচ্চতায়। শিক্ষকের সঙ্গে, অধীনস্থ জনশক্তির সঙ্গে, সাধারণ ছাত্রদের সঙ্গে, ব্যক্তিজীবনে পরিবারের সঙ্গে, ব্যবসায়িক বা কোন উদ্ভাবনী ভাবনা উপস্থাপনের সময়, এমনকি কর্পোরেট দুনিয়ায় বুদ্ধিদীপ্ত কথা আপনার লক্ষ্য অর্জন অনেক সহজ করে দিতে পারে। harvard business review এর তথ্যমতে, যারা পেশাজীবনে প্রাঞ্জলভাবে কথা বলেন তাদের সাফল্য আসে দ্রুত। আবার কথা বলা কিন্তু একটি শিল্পও বটে। সাবলীল কথা বলার গুণচর্চার মাধ্যমে আয়ত্ত করা যায় অনেক কিছু।
সুন্দর ও স্মার্টলি কথা বলা আমাদের ব্যক্তিত্বে আলাদা মাত্রা যোগ করে। ব্যক্তিত্বের মাধুর্যতা বহন করে। আমাদের মনের ভাব ব্যক্ত করার জন্য, ভেতরের অনুভূতি প্রকাশের জন্য কথা বলতে হয়। মনের ভাব; ভেতরের অনুভূতি প্রকাশের জন্য কথা বলার বিকল্প আর কিছু নেই। যান্ত্রিক এই জীবনে প্রতিদিন শত শত মানুষের সাথে ভাব বিনিময় করতে হয় আমাদের। আর এই মানুষগুলো প্রথমেই আমাদের কথা বলার ধরন দেখে আমাদের ব্যক্তিত্বের হিসাব কষে। কথা বলার ধরনের ওপর ভিত্তি করেই তাদের মনে মনে আমাদের চরিত্রের ছোটোখাট একটি প্রতিচ্ছবি তৈরি করে। কেননা ধরুন আপনি সুট বুট দামি পারফিউম গায়ে লাগিয়ে একজনের সাথে উগ্র ভাষায় বা অপ্রীতিকর ভাষায় অথবা রুক্ষ স্বরে কোন আঞ্চলিক ভাষায় কথা বললেন তাহলে ওই ব্যক্তি আপনার সম্পর্কে ভালো ধারণা তো দূরে থাক বরং আপনার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণায় উপনীত হবেন।
সুতরাং আপনার পোশাক-আশাক বা বাহ্যিক দিকটা যতই সুন্দর হোক না কেন আপনি যদি সুন্দরভাবে এবং সুন্দর ভঙ্গিতে কথা না বলেন তাহলে সবই বৃথা হয়ে যাবে। তাই সুন্দর বাহ্যিকতাকে ধরে রেখে এর পাশাপাশি আপনি যদি স্মার্টলি কথা বলেন তাহলে আপনার ব্যক্তিত্ব শতভাগ পূর্ণ হবে। কেননা মানুষকে কনভিন্স করার প্রধান উপায় হলো আপনার কথা। সুন্দর সাবলীল এবং স্মার্টলি কথা দ্বারাই শ্রোতা প্রভাবিত হয়। শুধু যে কোন কাজের ক্ষেত্রে এটা আপনার উপকারে আসবে তা নয়। এই গুণটি আপনার চারিত্রিক গুণাবলিকে করবে আরো সমৃদ্ধময় এবং এই গুণটি রপ্ত করতে পারলে জীবনের দীর্ঘ চলার পথে প্রত্যেকটি ধাপে ধাপে আপনাকে সাহায্য করবে।
হৃদয় নিংড়ানো কথা বলা শিখতে জেনে নিন কিছু উপায়

আমরা আমাদের জীবনে অনেক মানুষকে দেখেছি যারা অনেক জ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের ঠিক মতো প্রকাশ করতে পারে না। এমনকি শিক্ষাজীবনে এমন অনেক শিক্ষকদের দেখেছি যাঁদের পড়া আমরা কিছুই বুঝতাম না । নিঃসন্দেহে তারা অনেক জ্ঞানী কিন্তু ঘাটতি ছিল উপস্থাপনের। সুন্দর করে কথা বলা হচ্ছে একটি আর্ট। স্মার্টনেসের প্রথম শর্ত এটি। অনেকেই দেখা যায় অনেক জ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও উপস্থাপনের ঘাটতি থাকায় কেউ তাকে আগ্রহ দেখায় না। নিজেকে প্রকাশ করতে কে না চায়? সবাই চায় নিজেকে সবচেয়ে সুন্দর করে উপস্থাপন করতে। বাহ্যিক সৌন্দর্যের মধ্যে ভাব প্রকাশের সৌন্দর্য হচ্ছে অন্যতম একটি উপাদান।
অনেকেই আছেন খুব ভালো মনের মানুষ, দেখতেও সুন্দর কিন্তু তিনি ভালো কথা বললেও যিনি শুনছেন তার ভাল লাগে না। শুধুমাত্র কিভাবে সুন্দর করে কথা বলতে হয় তা না জানার কারণে। এ কাজ খুব কঠিন কিছু নয়। নিজের চেষ্টা এবং সামান্য কিছু গাইডলাইনই যথেষ্ট। উপস্থাপন আরও চমকপ্রদ করতে আমরা আজকে জানবো সুন্দর করে কথা বলার কয়েকটি গাইডলাইন।

নিজেকে বিশ্লেষণ করুন:
প্রথমেই নিজেকে বিশ্লেষণ করতে হবে। আপনি কোন বিষয়ে কথা বলছেন, কিভাবে কথাটি শুরু করছেন, কার সঙ্গে কথা বলছেন এবং সাথে সাথে দেখতে হবে আপনার কণ্ঠস্বরটি কেমন। সেটি কি খুব বেশি কর্কশ, খুব মিষ্টি নাকি স্বাভাবিক। যেই বিষয়ে আপনি কথা বলছেন সেই বিষয়ে আপনার দক্ষতা কেমন এটি জানাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিশ্লেষণের ফলাফল কাগজে লিখে রাখাই ভালো। সুন্দর করে কথা বলা পুরোটাই চর্চার ওপর নির্ভরশীল।

আগে শোনার ওপর গুরুত্ব দিন:
কোন একটা আলোচনায় কথা বলতে গেলে আগে শুনতে হবে আগের বক্তারা কে কী বলেছেন। হুট করে কোন মন্তব্য করা বোকামির কাজ। মূল বিষয়টি নিয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করুন। কেউ যদি অনেক সুন্দর করে উপস্থাপন করে তবে তাকে অনুসরণ করা যেতে পারে।
সুস্পষ্ট মতামত প্রয়োগ করুন:
কখনোই এমন কোন কথা বলা উচিত নয় যেটিতে মানুষ খুব বিব্রতবোধ করে কিংবা বিষয়বস্তুর সঙ্গে একদমই খাপ খায় না। অন্যের কথার মাঝে কথা বলাটা অনেকেই পছন্দ করেন না। তবে কথা যদি বলতেই হয় সেটি ভদ্রভাবে বললে সবাই তাতে সাড়া দেবে। যেমন- “Excuse me” বলে বক্তার কথার সাথে যা যোগ করতে চাচ্ছিলেন কিংবা সেই বিষয়ে কোন ব্যক্তিগত মতামতও দেয়া যেতে পারে।

আত্মবিশ্বাসের সাথে বলুন:
যা বলবেন আত্মবিশ্বাসের সাথেই বলবেন। দ্বিধা নিয়ে কিছু বলা উচিত নয়। বক্তাকে দ্বিধান্বিত দেখলে শ্রোতারা বক্তার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। আর যা বলছেন, সেই কথাটি বলার সময় আত্মবিশ্বাসের কারণটিও বলা যেতে পারে।

পরিবেশ পরিস্থিতির দিকে খেয়াল করুন:
পরিবেশ পরিস্থিতি সব সময় এক থাকবে না। সেই পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনা করে কথা বলতে হয়। একটি আলোচনার ক্ষেত্রেও পরিবেশ পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়। কখনো হাসির সময় আসে আবার কখনো কঠোর সময় আসে কিংবা অনেক সময় অনেক গম্ভীর পরিস্থিতি তৈরি হয়। সব পরিস্থিতিতে সব কথা মানায় না। নির্দিষ্ট সময়োপযোগী মন্তব্য করাই ভালো।

মূল বিষয়ের দিকে লক্ষ রাখুন:
কথা বলার সময় মূল বিষয়ের দিকে লক্ষ রাখতে হবে। অনেক সময় কথা বলতে বলতে বক্তার মূল বিষয় থেকে বিচ্যুতি ঘটে। তখন শ্রোতারা খুব বিরক্তবোধ করে। কারণ তারা তাদের মূল্যবান সময় গল্পে নষ্ট করতে চান না। দরকার হলে লিখে রাখতে পারেন যে বিষয়ে কথা বলতে চান। তাহলে বক্তব্যগুলো মূল বিষয়ের মধ্যেই চলে আসবে।

একটু বিরতি দিয়ে কথা বলুন:
কথা বলার সময় একটু বিরতি দিয়ে কথা বললে শ্রোতাদের বুঝতে সুবিধা হয়। বেশি তাড়াতাড়ি কথা বলা খুব বাজে একটি অভ্যাস। এতে শ্রোতাদেরও বুঝতে কষ্ট হয়। বিরতি দিয়ে কথা বললে মূল বিষয়ের ওপর গুরুত্বও দেয়া যায়। অন্যদিকে ধীরগতিতে কথা বললে শ্রোতারা বিরক্তবোধ করে এবং শোনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। সুতরাং, মধ্যবর্তী একটি মাপ বেছে কথা বললে শ্রোতাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া যায়। কথা বলার সময় গুরুত্ব অনুযায়ী কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করা যেতে পারে।

চলিত ভাষায় কথা বলুন:
যে ভাষা সবাই বুঝে সে ভাষায় কথা বলা উচিত । উচ্চারণ শুদ্ধ করলে কথা শুনতেও অনেক ভালো লাগে। সঠিক বাংলা উচ্চারণ করে তাক লাগিয়ে দেয়া যায়। খুব বেশি দরকার পড়লে উচ্চারণের ওপর কিছু কোর্সও করা যেতে পারে।

বলতে হলে পড়তে হবে:
যারা সুন্দর করে কথা বলেন, তারা কিন্তু ব্যক্তিজীবনে অনেক পড়াশোনা করেন। পড়ার বিকল্প নেই। ফিকশন, নন-ফিকশন সব ধরনের বই পড়–ন। নানা ধরনের বই পড়লে নিজের মধ্যে নানা বিষয়ে জ্ঞান ও তথ্য জমা হয়, তাই কথা বলার সময় গুছিয়ে বলে ফেলার শিল্প রপ্ত করা সহজ হয়। যেকোনো মিটিং কিংবা পাবলিক স্পিকিংয়ের ক্ষেত্রে কথা শুরুর আগে শ্রোতা কিংবা যার সঙ্গে কথা বলছেন, তার বা তাদের অনুমতি নিয়ে শুরু করুন। শ্রোতার মনোযোগ ধরে রাখার জন্য সঠিক তথ্য ব্যবহার করে কথা বলুন। খেয়াল রাখবেন, শ্রোতা যা জানেন, তার পুনরাবৃত্তি করা ঠিক নয়। জ্ঞান অর্জনে বই এর বিকল্প নেই। উচ্চারণ শুদ্ধ করতে বই এর কঠিন শব্দগুলো জোরে জোরে পড়ে অনুশীলন করা যেতে পারে।

আঞ্চলিকতা পরিহার করুন:
আমাদের দেশে বেশ কিছু আঞ্চলিক ভাষা প্রচলিত আছে। তার মধ্যে কিছু শুনে তো প্রথমে বোঝার কোন উপায়ই নেই যে সেগুলো বাংলা ভাষা নাকি অন্য কিছু! নিজ নিজ আঞ্চলিক ভাষাকে সম্মান করতে শিখুন। সে ভাষায় কথা বলুন। তবে এটাও খেয়াল রাখবেন তা যেন আপনার কথায় কোনো ছাপ না ফেলে যায়। আপনার কথায় যদি আঞ্চলিক উচ্চারণ ভঙ্গি চলে আসে বা কোন আঞ্চলিক শব্দ ঢুকে পড়ে তবে অফিস, ক্লাসে বা বন্ধুদের সামনে যেখানেই যান, আপনাকে অনেক অসুবিধার সম্মুখীন হতে হবে। বিশেষ করে চাকরির ইন্টারভিউ দেয়ার সময় সর্বাবস্থায় আঞ্চলিক বাচনভঙ্গি পরিহার করুন।

কিছু শব্দের উচ্চারণ সঠিক করুন:
অনেক সময় দেখা যায় আমরা ঠিকঠাক কথা বলছি। কিন্তু কিছু শব্দের বেলায় আমরা সেই ভুল উচ্চারণই করে যাচ্ছি। প্রথমে চিহ্নিত করুন কোন কোন শব্দ উচ্চারণে আপনার সমস্যা হচ্ছে। যেমন, আমরা অনেকেই বলি “কেমন আসেন” “ভাল আসি” । কিন্তু ‘স’ এর জায়গায় যদি ‘ছ’ ব্যবহার করা যায় তাহলে “কেমন আছেন” কথাটা অনেক শ্রুতিমধুর শোনায়। অনেকে ‘প’ এর জায়গায় ‘ফ’ ব্যবহার করেন, অথবা ‘ব’ এর জায়গায় ‘ভ’। উচ্চারণের ক্ষেত্রে এমনটিই হয়ে থাকে। শব্দের উচ্চারণ কিন্তু আপনার কথায় আকাশ পাতাল ফারাক এনে দিতে পারে। তবে পরিবর্তন একদিনে হবে না। আজই প্র্যাকটিস শুরু করুন। দাঁড়িয়ে যান আয়নার সামনে। দেখবেন, একদিন শুদ্ধ উচ্চারণের আইডল হয়ে যাবেন।

মিশ্র ভাষা পরিহার করুন:
অনেকে মনে করেন ইংরেজিতে কথা বলা, হিন্দিতে কথা বলা বেশ একটা ভাবের ব্যাপার। আপনি ইংরেজিতে অবশ্যই কথা বলবেন। কারণ এটা আন্তর্জাতিক ভাষা। তবে তখনই, যখন আপনার দরকার হবে এই ভাষায় কথা বলা। অথবা বন্ধুদের সাথে অনুশীলন করতে পারেন। আপনার উপকারই হবে। কিন্তু বিনা কারণে ইংরেজিতে কথা বলা অন্য একজন বাঙালির সাথে শুধু মাত্র স্মার্টনেস দেখানোর জন্য! এটা বোকামি। তার ওপর আবার একটা বাক্যের অর্ধেক ইংরেজি অর্ধেক বাংলা! আপনি যদি ভেবে থাকেন এভাবে কথা বললে সবাই আপনাকে বেশ স্মার্ট ভাববে, তাহলে আপনার ধারণা ভুল।

বলার আগে চিন্তা করুন:
হুট করে কোন কথা বলে ফেলার চেয়ে বরং একটু সময় চিন্তা করুন আপনি কি বলতে যাচ্ছেন, যেটা বলতে যাচ্ছেন সেটা সম্পর্কে আপনার যথেষ্ট ধারণা আছে কি না এবং আপনার কথায় শ্রোতার কেমন প্রতিক্রিয়া হতে পারে। কথা বলার আগে একটু চিন্তা করার ফলে অনেক বেফাঁস কথা বলার হাত থেকে বেঁচে যাবেন এবং আপনার কথা হয়ে উঠবে অনেক বুদ্ধিদীপ্ত।

শব্দভাণ্ডার বাড়ান
হোক বাংলা কিংবা ইংরেজি, সব ভাষার ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত শব্দ জানা আবশ্যক। এতে করে আপনাকে চিন্তা করতে হবে না যে এই শব্দের পর আপনি অন্য কোন শব্দ ব্যবহার করবেন। আমরা দৈনন্দিন জীবনে যেসব শব্দ ব্যবহার করি, বাংলা অভিধান খুলে তার সমার্থক শব্দগুলো দেখে নিতে পারেন। অথবা এমন অনেক শব্দ খুঁজে নিতে পারেন যেগুলো সাধারণ কথায় আমরা খুব কমই ব্যবহার করি, এবং তা প্রয়োগ করুন উপযুক্ত ক্ষেত্র বুঝে। এতে আপনার কথা যেমন সুন্দর হবে তেমনি শ্রোতার মনে আপনার জ্ঞান সম্পর্কে ভালো ধারণা জন্মাবে।

অঙ্গভঙ্গি
অঙ্গভঙ্গি আপনার কথার মূল্য অনেকগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে সঠিক বডি ল্যাংগুয়েজ। আপনার এক্সপ্রেশন, দাঁড়ানো বা বসার ভঙ্গি, হাত নাড়ানো এসব দিকে মনোযোগ দিন। কোন কিছুই অতিরিক্ত করার দরকার নেই। তবে কথার সাথে যেন অঙ্গভঙ্গি খাপ খায় সে চেষ্টা করুন। অনেকের অভ্যাস থাকে অন্যের সাথে কথা বলার সময় কাঁধে হাত দেয়া, বা বারবার গায়ে খোঁচা দিয়ে নিজের দিকে মনোযোগ ফেরানোর। আপনার যদি এমন কোন অভ্যাস থেকে থাকে, দয়া করে এখনি পরিহার করুন।

অধস্তনদের সাথে উত্তম কথা বলুন:
আপনার চাইতে নিচের পদের লোকদের সাথে যথাযথ আদবের সাথেই কথা বলুন। একজন ব্যক্তি রিকশা চালায় বলেই তাকে তুই করে বলতে হবে, বা বাসার কাজের মানুষটি আপনার থেকে বয়সে বড় হলেও কাজের মানুষ হয়েছেন বিধায় তাকে অপমান করে কথা বলার অধিকার আপনি রাখেন না। যিনি নিজের চাইতে ছোট পদের মানুষদের সাথে ভালো আচরণ করতে পারেন না, তিনি কোনোদিনই একজন ভালো মানুষ হতে পারেন না।

অনর্থক কথা এড়িয়ে চলুন:
অপ্রয়োজনীয় ও ফালতু কথা বলবেন না এবং অন্যদেরকেও বলতে উৎসাহিত করবেন না। বেশি কথা বলাই স্মার্টনেস এর লক্ষণ নয়, বরং পরিস্থিতি মোতাবেক প্রয়োজনীয় কিন্তু জোরদার কথা বলুন। অপ্রাসঙ্গিক কথা বা মন্তব্য জীবনের সব ক্ষেত্রেই আপনার ব্যক্তিত্বকে খাটো করে। নিজেকে ব্যক্তিত্ববান দেখাতে গিয়ে আবার অতিরিক্ত ভাব বা মুড দেখাতে যাবেন না যেন। অতিরিক্ত ভাব দেখালেই কেউ স্মার্ট হয়ে যায় না, বরং স্মার্টনেস কমিয়েই দেয় আপনার আলগা এই ভাব। অপরের কৃতিত্বের জন্য প্রশংসা করতে শিখুন। তাদের অর্জনকে হিংসা করতে যাবেন না। অন্যের কৃতিত্বকে স্বীকৃতি দিতে পারে কেবলই একজন সঠিক ব্যক্তিত্ববান মানুষ।

বক্তৃতার ক্ষেত্রে কৌশলী হোন:
অনেক মানুষের সামনে, মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলার সময় আপনাকে খুবই কৌশলী হতে হবে। শ্রোতাদের চোখে তাকান। তাদের প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে আপনার স্ক্রিপ্ট পরিবর্তন করতে হতে পারে, সে জন্য তৈরি থাকুন। খুব দ্রুত কথা বলছেন কি না, সেটা বুঝতে হলে আগে নিজেই নিজের কথা মুঠোফোনে রেকর্ড করুন। বারবার অনুশীলন করুন।
কথা বলার সময় অবশ্যই বক্তব্য গুছিয়ে নেবেন। অন্তত একটা ছক তৈরি করে নিন। প্রথম মিনিটে কী বলবেন, দ্বিতীয় মিনিটে কী আলোচনা করবেন আর বক্তব্য শেষ করবেন কিভাবে সাজিয়ে নিন।

অপরিচিত মানুষের সাথে
কথা বলার কৌশল
অনেক সময় নতুন কোনো জায়গায় গিয়ে দ্বিধায় পড়তে হয়। নতুন অচেনা মানুষ দেখে কী বলব না বলব, কিভাবে শুরু করব-এই সংশয়ে পড়েন অনেকেই। আপনিই বা কী বলবেন, তা নিয়েও বেশ দুশ্চিন্তায় থাকেন। চুপচাপ থাকা এবং নতুন মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরিতে জড়তা সৃষ্টি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকলিনের লং আইল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক আচরণ বিশ্লেষক নাসরিন জাহান বলেন, ‘খুব সহজে আমরা নতুন-অচেনা মানুষের সঙ্গে গল্প শুরু করতে ইতস্তত বোধ করি। অথচ নতুন মানুষের সঙ্গে গল্প করার দক্ষতা যাদের রয়েছে, তাদের পরিচিতি বেশি থাকে আর পেশাজীবনে দ্রুত সামনে এগিয়ে যেতে পারেন।
হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ-এর জুলাই ২০১৭ সংখ্যার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন পরিবেশে নতুন মানুষের সঙ্গে যারা দ্রুত মিশে যেতে পারেন, টুকরো টুকরো কথা দিয়েই তারা নতুন পরিবেশকে নিজের দিকে নিয়ে আসতে পারেন।
নতুন পরিবেশে কোন কথা দিয়ে শুরু করা যায় বা কিভাবে গল্প শুরু করা যায়, এই বিষয়ের প্রশ্ন গুগলে বেশ খুঁজতে দেখা যায়। কানাডীয় উদ্যোক্তা ও লেখক পল কার্লেটন গল্প জমানোর কিছু উপায় লিখেছেন।

১. নিজেকে দিয়ে শুরু করুন
নিজের কোনো গল্প দিয়ে আপনার কথা শুরু করতে পারেন। রাস্তায় আপনার সঙ্গে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা কিংবা গতকালের বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলা নিয়ে কথা বলে নতুন মানুষকে আপনার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারেন। অনেকে শুরুতেই প্রশ্ন করে নতুনদের সঙ্গে গল্প জুড়ে দিতে চেষ্টা করেন। এ ক্ষেত্রে অনেকেই আপনার সঙ্গে গল্প করতে বা কথা শুরু করতে উৎসাহবোধ করবেন না। তাই নিজের গল্প দিয়েই শুরু করুন।

২. কথা বলার ধরনে মনোযোগ দিন
আপনার কথা যেন বিরক্তিকর মনে না হয়, সেদিকে নজর দিন। আমরা বেখেয়ালে বিরক্তিকর আচরণে কথা বলি, যা অন্যরা ভালোভাবে মেনে নিতে পারেন না। নিজের বন্ধুদের কাছ থেকে জেনে নিন আপনার কথা বলার ধরনে কী কী দুর্বলতা আছে।

৩. কথা বলা শেষ করতে শিখুন
কথা শুরু করে দিয়ে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই আর তা শেষ করতে পারি না। এতে শ্রোতা আপনার ওপর বিরক্ত হন, যা আপনার অগোচরেই হয়। চেষ্টা করুন গল্প শুরু করে গল্প শেষ করতে। যদি নিতান্তই কথা শেষ করতে না পারেন, তাহলে দুঃখ প্রকাশ করে বিদায় নিন।

৪. নতুন কিছু বলুন
গৎবাঁধা গল্প, বেরসিক বিষয়ে আলোচনা এড়িয়ে চলুন। ব্যতিক্রমী গল্পের বিষয় খুঁজে বের করুন, কিংবা কোনো বই থেকে জেনেছেন এমন কোনো অপ্রচলিত গল্প দিয়ে শুরু করুন। কৌতুক বা হাস্যরসের কোনো কথা দিয়ে নতুন পরিচয়ে গল্প না করাই ভালো, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সব কৌতুকই কিন্তু কোনো না কোনোভাবে মানুষ জেনে যায়।

৫. চার বিষয়ে গুরুত্ব
নতুন মানুষের সঙ্গে গল্প জুড়ে দিতে পরিবার, পেশা, বিনোদন আর স্বপ্ন নিয়ে কথা বলুন। নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়কে খেলা হিসেবে কল্পনা করুন। আপনি এই চারটি বিষয় কথা বললে একটি স্তর পাড়ি দেবেন তা কল্পনা করুন। সাধারণ হিসেবে আমরা মানুষ প্রথম পরিচয়ে এই চার বিষয় নিয়ে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। নতুন মানুষকে আগ্রহী করে তুলতে এই চারটি বিষয়ে খেয়াল করুন।

৬. শুনতে থাকুন
যারা মিশুক প্রকৃতির মানুষ, তাদের দিকে খেয়াল করুন। তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শুনতে দারুণ পছন্দ করেন। আপনি যত বেশি মনোযোগী শ্রোতা হবেন, তত বেশি সাধারণ মানুষকে আপনার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারবেন।

৭. চোখের দিকে তাকানো শিখুন
গল্পের সময় আমরা অন্যের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে অস্বস্তিবোধ করি। এ ধরনের আচরণ শ্রোতাকে বিব্রত করে তোলে, তাই চেষ্টা করুন চোখের দিকে তাকিয়ে কথা শুনতে ও বলতে।

৮. অন্যকে গুরুত্ব দিন
আপনি গুরুত্বপূর্ণ, এ বিষয়টি কখনোই আপনার আচরণ ও কথাবার্তায় তুলে ধরবেন না। আপনি যে নতুন মানুষটির সঙ্গে কথা বলছেন, তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন। বিশ্বাস করুন, আপনি যখন অন্যদের গুরুত্ব দিতে শিখবেন, তখন কিন্তু আসলে আপনি আপনার গুরুত্বই বাড়াচ্ছেন।

৯. বেশি কথা না বলাই কিন্তু বেশি!
ধীরে ধীরে গল্প জমাতে খুব কম কথা বলেন যারা, তারাই কিন্তু সফল হন। কম কথা বলাই গল্প জমায় আর ভাব বাড়ায়। কথা কম বলে বেশি প্রভাব বাড়াতে শিখুন।
কম কথা বলতে অভ্যস্তরা
বেশি বুদ্ধিমান!
আচ্ছা, আপনি কি কথা বেশি বলেন? অনেকেই এই প্রশ্নের উত্তরে “না” বলবেন। কারণ সত্যিকার অর্থেই যারা কথা বেশি বলেন তারা কখনো বুঝতেই পারেন না তারা বেশি কথা বলছেন। কথা বেশি বললে অযথা কথা চলেই আসে যা বিরক্তিই বাড়াতে থাকে সামনের মানুষটির মনে। আর এছাড়াও বেশি কথা বলা মানুষের জন্য আরেকটি দুঃসংবাদ রয়েছে। আর তা হচ্ছে, গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, যারা কম কথা বলেন তারা অনেক বেশি বুদ্ধিমান হয়ে থাকেন। এর অর্থ হচ্ছে যারা বেশি কথা বলেন তারা নিজেদের অযথা কথা দিয়ে মানুষকে বিরক্ত তো করছেন ঠিকই, সেই সাথে নিজেকে কম বুদ্ধিমান মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করছেন। কিন্তু ঠিক কী কারণে কম কথা বলা মানুষেরা বেশি বুদ্ধিমান হয়ে থাকেন, তা জানেন কি? চলুন জেনে নেয়া যাক।

১.যারা কথা কম বলেন তারা চিন্তা বেশি করেন। আর অনেক ক্ষেত্রেই কথা কম বলে চুপচাপ থাকার অর্থ হচ্ছে তারা মনে মনে চিন্তা করে চলেছেন। আর গবেষকগণের মতে, এই চিন্তা করার ক্ষমতাটিই কম কথা বলা মানুষকে বুদ্ধিমান করে তোলে।
২.গবেষণায় দেখা যায়, যারা চুপচাপ বেশি থাকেন এবং কথা কম বলতে পছন্দ করেন তারা লেখেন ও পড়েন বেশি। আর এতে তাদের বুদ্ধি ধারালো হতে থাকে। যারা বেশি কথা বলেন তাদের মধ্যেই এই বিষয়টি বেশ কম নজরে পড়ে।
৩.যারা চুপচাপ বেশি থাকেন তাদের মস্তিষ্ক অনেক দ্রুত কাজ করে এবং তারা নিজেকে শান্ত রেখে অনেক কিছু নিয়ে চিন্তা করে কোনো একটি ব্যাপারের ক্ষেত্রে নিজেদের মত প্রকাশ করে থাকেন। আর চিন্তা করে কথা বলার এই বিষয়টিই বুদ্ধিমান মানুষের পরিচায়ক।
৪.চুপচাপ থাকা মানুষ অন্যের কথা শুনে তা থেকে জ্ঞান নেয়ার চেষ্টা করেন এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নতুন কিছু শিখতে নিজেকে প্রস্তুত করে নেন। অপরদিকে কথা বেশি বলা মানুষেরা শুধুমাত্র উল্টো উত্তর ও আরও একগাদা কথা বলার জন্যই মুখিয়ে থাকেন এবং তেমন কিছুই শেখার চেষ্টা করেন না।
৫.কথায় বলে, ‘মুখের কথা বন্দুকের গুলির মতো, একবার ছুটে গেলে ফেরানো সম্ভব নয়’, তাই বুঝে শুনে কথা বলাটা জ্ঞানী ও বুদ্ধিমানের পরিচয় প্রকাশ করে। এক্ষেত্রেও গবেষকগণ নানা জরিপে দেখতে পান, যারা অনেক কম কথা বলেন তারা যতটুকুই কথা বলুক না কেন অনেক ভেবে চিন্তে বলেন। অপরদিকে বেশি কথা বলার মানুষেরা অনেক সময় নিজেরাও জানেন না তারা কি বলছেন। সুতরাং এখানেই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়।

মুমিনের জন্য কথা বলার দিকনির্দেশনা
মানুষের সাথে একজন মুসলিম কিভাবে কথা বলবেন সে বিষয়ে ইসলাম কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম পদ্ধতি প্রণয়ন করে দিয়েছে। সর্বাবস্থায় একজন মুসলিমকে অটুট বিশ্বাস নিয়ে মনে রাখতে হবে যে, তার মুখ দিয়ে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দের জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে। তিনি যদি উত্তম কিছু বলেন, তিনি পুরস্কৃত হবেন। আর তিনি যদি মন্দ কিছু বলেন, তবে সেই মন্দ কথার জন্য তাকে অবধারিতভাবেই শাস্তি ভোগ করতে হবে। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেছেন :
“মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা লিপিবদ্ধ করার জন্য তৎপর প্রহরী তার সাথেই রয়েছে।” (সূরা কাফ : ১৮)
রাসূল (সা) আমাদেরকে সতর্ক করে বলেছেন যে, মুখের কথা খুবই বিপজ্জনক। ইমাম আত-তিরমিযি এবং ইবনু মাজাহ কর্তৃক সংকলিত এবং সহীহ সূত্রে বর্ণিত একটি হাদিসে আল্লাহ্র রাসূল বলেছেন, “বান্দা অনেক সময় এমন কথা বলে যাতে সে গুরুত্ব দেয় না অথচ সেই কথা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে। ফলে আল্লাহ্ তা’আলা এর দ্বারা তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। পক্ষান্তরে, বান্দা অনেক সময় এমন কথাও বলে যাতে সে গুরুত্ব দেয় না অথচ সেই কথা আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে। ফলে সেই কথাই তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে।” (বুখারী; অধ্যায় : ৮, খণ্ড : ৭৬, হাদিস : ৪৮৫)
কাজেই মুখের কথা বিপদের কারণ হতে পারে। আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলের (সা) নির্দেশনা অনুযায়ী ইসলামের সীমারেখার মধ্যে থেকে আমাদেরকে কথা বলা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

মুখের কথা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নিচে কিছু দিকনির্দেশনা দেয়া হলো:
১.কথা বলার উদ্দেশ্য হতে হবে উত্তম এবং কল্যাণকর। যদি উত্তম কথা বলার উদ্দেশ্য বজায় রাখতে না পারেন, তবে চুপ থাকাই আপনার জন্য উত্তম এবং চুপ থাকাটাও একটি উত্তম কাজ। বুখারী এবং মুসলিম কর্তৃক সংকলিত একটি হাদিসে রাসূল (সা) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ্ এবং কিয়ামত দিবসে বিশ্বাস রাখে, সে যেন উত্তম কথা বলে, নয়তো চুপ থাকে।” (বুখারী; খণ্ড : ৮, অধ্যায় : ৭৬, হাদিস : ৪৮২)
২.কথাবার্তায় সত্যবাদী হোন এবং মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকুন। কারণ মুমিন ব্যক্তি সর্বদায় সত্যবাদী যিনি কৌতুক করেও মিথ্যা বলেন না। বুখারী এবং মুসলিমের অন্য একটি হাদিসে রাসূল (সা) বলেছেন, “তোমরা অবশ্যই সত্য কথা বলবে। কারণ সত্য সদ্গুণের দিকে এবং সদ্গুণ জান্নাতের পথে চালিত করে। যে সর্বদা সত্য কথা বলে এবং সত্যকে গুরুত্ব দেয়, আল্লাহ্র নিকট তার নাম সত্যবাদীদের খাতায় লিপিবদ্ধ করা হয়। মিথ্যা থেকে দূরে থাকো। কারণ মিথ্যা পাপের দিকে এবং পাপ জাহান্নামের আগুনের দিকে চালিত করে। যে অনবরত মিথ্যা বলে এবং মিথ্যা বলা ইচ্ছা রাখে, আল্লাহ্র নিকট তার নাম মিথ্যাবাদীদের খাতায় লিপিবদ্ধ করা হয়।” (মুসলিম; খণ্ড : ৩২, হাদিস : ৬৩০৯)
৩.কথাবার্তার মাধ্যমে আল্লাহ্র বিরুদ্ধাচরণ করা যাবে না তা ক্রীড়াচ্ছলেই হোক অথবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই হোক। কারণ আল্লাহ্ অবাধ্য মন্দভাষীকে ঘৃণা করেন। আল্লাহ্ পছন্দ করেন এমন প্রতিটি শব্দের মাধ্যমেই কুফরি করা হয়। যেমন : অশ্লীল ও অশিষ্ট শব্দ ব্যবহার করা, মানুষকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা ইত্যাদি। এ সম্পর্কে সহীহ সূত্রে বর্ণিত একটি হাদিসে নবী (সা) আমাদেরকে সতর্ক করে বলেছেন, “মুমিনগণ কখনো অভিযোগ করে না, অন্যের প্রতি খারাপ ভাষা ব্যবহার করে না, আল্লাহ্র বিরুদ্ধাচরণ করে না এবং নোংরা ভাষায় গাল-মন্দ করে না।” অন্য একটি সহীহ হাদিসে রয়েছে, “মুসলিমের জন্য গালিগালাজ করাই হলো কুফ্র।” জীবিত কোনো মানুষকে গালিগালাজ করা যেমন নিষিদ্ধ, মৃত ব্যক্তিকে গালিগালাজ করাও তেমনিভাবে নিষিদ্ধ। “মৃত ব্যক্তিদের গালমন্দ করবে না; তারা তাদের প্রতিদান পেয়ে গেছে।” অন্য একটি হাদিসে রাসূল (সা) নির্দেশ দিয়েছেন, “মৃতদের ভালো কাজগুলো নিয়ে আলোচনা করো।”
৪.কথা বলার সময় গিবত তথা পরচর্চা থেকে বেঁচে থাকুন। গিবত হলো কোনো মুসলিমের অসাক্ষাতে তার সম্পর্কে অন্য কারও কাছে এমন কিছু বলা যা শুনলে সে কষ্ট পায়। অতএব, পরচর্চা করবেন না। নামিমাহ থেকেও বেঁচে থাকুন। নামিমাহ হলো লোকজনের মধ্যে এমন তথ্য ছড়ানো যা তাদের মধ্যে পারস্পরিক ঘৃণার সৃষ্টি করে। সহীহ সূত্রে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসূল (সা) বলেছেন, “যে ব্যক্তি গুজব ছড়ায় সে কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” যারা নামিমাহ চর্চা করে তাদেরকে গোপনে নিষেধ করুন এবং সেগুলো শোনা থেকেও দূরে থাকুন। অন্যথায়, শুধু শোনার জন্যও আপনি সেই পাপের অংশীদার হবেন।
৫.কথায় কথায় কসম খাওয়া থেকে বেঁচে থাকুন। এই মর্মে সূরা আল-বাকারাতে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেছেন : “আর নিজেদের শপথের জন্য আল্লাহর নামকে লক্ষ্যবস্তু বানিও না।” (আল-বাকারা : ২২৪)
৬.নিজের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পরিসীমার মধ্যে থেকে কথা বলুন। যে বিষয়ে জ্ঞান নেই, সে বিষয়য়ে মতপ্রকাশ করবেন না। সূরা আল-ইসরাতে আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন : “যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই সে বিষয়ের পিছে পোড়ো না।” (আল-ইস্রা : ৩৬)
৭.তদন্ত করে নিশ্চিত না হয়ে শুধু শোনা কথা নিয়ে মানুষের সাথে আলাপ করা যাবে না। কারণ আপনি এমন কিছু শুনতে পারেন যে সত্যও হতে পারে আবার মিথ্যা কিংবা সন্দেহজনক হতে পারে। যা শুনবেন তা-ই প্রচার করলে আপনিও পাপের অংশীদার হবেন। একটি বিশুদ্ধ হাদিস অনুযায়ী, রাসূল (সা) সতর্ক করে বলেছেন : “একজন মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য একটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তা-ই প্রচার করে বেড়ায়।” (সহীহ মুসলিম ১/৮, হাদিস ৫; সুনান আবু দাউদ ২/৬৮১, হাদিস ৪৯৮২)
৮.খেয়াল রাখবেন, মানুষের সাথে আপনার কথাবার্তা এবং আলাপ আলোচনার উদ্দেশ্য যেন হয় সত্যে উপনীত হওয়া। সত্য আপনার মাধ্যমে উন্মোচিত হোক আর অন্য কারও মাধ্যমেই উন্মোচিত হোক, কার দ্বারা উন্মোচিত হলো সেটা বড় করে দেখবেন না। এক্ষেত্রে সত্যে উপনীত হওয়াটাই বড় কথা।
৯.অন্যকে ছোটো করা এবং অন্যের ওপর জয়লাভ করার উদ্দেশ্যে অনর্থক তর্কে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকুন। অকারণে তর্কে লিপ্ত হওয়া বিপথগামিতার লক্ষণ। এ থেকে আমরা আল্লাহ্র কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। এই মর্মে তিরমিযি কর্তৃক সংকলিত একটি হাদিসে রাসূল (সা) বলেছেন, “আল্লাহ্ কাউকে পথ দেখালে সে বিপথগামী হয় না কিন্তু তারা বিনা কারণে তর্কাতর্কিতে লিপ্ত হয়।” আপনি নিজে সঠিক হলেও বিতর্ক পরিহার করুন। আবু দাউদের একটি হাদিসে রাসূল (সা) বলেছেন, “সঠিক হওয়া সত্ত্বেও যে ব্যক্তি বিনা কারণে তর্ক করা বন্ধ করে আমি জান্নাতের সমীপে তার জন্য একটি ঘরের নিশ্চয়তা দিচ্ছি।” (আবু দাউদ; অধ্যায় : ৪১, হাদিস : ৪৭৮২)
১০.আপনার কথা হবে স্পষ্ট, সহজবোধ্য, দুর্বোধ্য শব্দমুক্ত। মানুষকে হেয়প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে কিছু বলা থেকে বিরত থাকুন। কারণ রাসূল (সা) এ ধরনের কথা অপছন্দ করতেন। আত-তিরমিযি কর্তৃক সংকলিত অন্য একটি সহীহ হাদিসে নবী (সা) বলেছেন, “যাদেরকে আমি সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করি এবং যারা কিয়ামতের দিন আমার থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থান করবে, তারা হলো সেইসব যারা অনর্থক কথা বলে এবং যারা অন্যকে ছোট করে এবং যারা কথা বলার সময় নিজেদের (পাণ্ডিত্য) জাহির করে।” (আত-তিরমিযি; হাদিস : ৬৩১)
১১.আপনার কথা হবে শান্ত প্রকৃতির, পরিষ্কার, শ্রুতিমধুর এবং সর্বসাধারণের নিকট বোধগম্য। রাসূল (সা) সকলের বুঝার সুবিধার্থে একটি কথা তিনবার পুনরাবৃত্তি করতেন। তাঁর কথা ছিল সহজ যা সকলেই বুঝতে পারতেন।
১২.কথাবার্তায় আন্তরিক হউন। অযথা কৌতুক করবেন না। কথাবার্তায় হাস্যরস আনতে চাইলে, সেই ভাবে আনুন যেভাবে নবী মুহাম্মদ (সা) তা করতেন।
১৩.অন্যের কথায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করবেন না। কেউ কিছু বলতে চাইলে তা মনোযোগ দিয়ে শুনুন এবং তাকে তার কথা শেষ করতে দিন। তার কথা শোনার পর যদি আপনার পক্ষ থেকে ভালো এবং প্রকৃত অর্থেই প্রয়োজনীয় কিছু বলার থাকে তবে বলুন। শুধু বলতে চাওয়ার স্বার্থেই কথা বলবেন না।
১৪.কথা বলুন আর তর্কই করুন তা করতে হবে উত্তম পন্থায়। এতে করে যেন কারও ক্ষতি না হয়, মানসিকভাবে কেউ যেন আঘাত না পায়, কাউকে খাটো করা না হয় বা তাদের প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রুপ প্রকাশ না পায়। সকল নবীর মাধ্যমেই মানুষকে সুন্দরভাবে কথা বলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) যখন মূসা (আ) এবং তাঁর ভাই হারূনকে (আ) ফির’আউনের কাছে প্রেরণ করেছিলেন, তখন তিনি তাঁদেরকে বলে দিয়েছিলেন, “তোমরা তার সাথে নম্র কথা বলবে। হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।” (সূরা ত্ব-হা : ৪৪) বলাই বাহুল্য যে, আপনি মূসা (আ) এবং হারূন (আ) থেকে উত্তম নন। আর যে লোকটির সাথে কথা বলছেন সেই লোকটিও ফির’আউনের থেকে নিকৃষ্ট নয়।
১৫.অন্যদের কথাবার্তা সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করবেন না, বিশেষ করে যখন দেখবেন যে, তারা যা বলছে তার মধ্যে যেমন ভুল বা মিথ্যা রয়েছে, তেমনি কিছু পরিমাণ সঠিক বা সত্য তথ্যও রয়েছে। কারণ সঠিক অংশটুকুকে প্রত্যাখ্যান করা মোটেও উচিত হবে না, যদিও তা ভুলের সাথে মিশিয়ে উপস্থাপন করা হয়। একইভাবে সত্য অংশটুকুকে প্রত্যাখ্যান করা মোটেও উচিত হবে না, তা মিথ্যার সাথে মিশিয়ে উপস্থাপন করা হলেও। আপনাকে সঠিক ও সত্যটি গ্রহণ করতে হবে এবং ভুল ও মিথ্যাটি ত্যাগ করতে হবে। এটিই হলো ন্যায়বিচার এবং ইনসাফ যা করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন।
১৬.মানুষের সামনে নিজের প্রশংসা করবেন না, নিজেই নিজেকে বাহবা দেবেন না। কারণ এমনটি করা উদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের পরিচায়ক যা করতে আল্লাহ্ তা’আলা আমাদেরকে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, “অতএব তোমরা নিজেদের সাফাই গেয়ো না। তিনিই ভালো জানেন মুত্তাকি কে।” (সূরা আন-নাজ্ম : ৩২)
একজন দায়ী হিসেবে, সাধারণ মানুষের সামনে নিজেকে যথাযথভাবে তুলে ধরা জরুরি। আমরা যদি কোরআন ও হাদিসের নির্দেশনা মেনে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে মৌখিক সাক্ষ্য দানের নিমিত্তে নিজের পরিবর্তনের প্রচেষ্টায় রত হতে পারি তাহলে আমাদের প্রতিটি কথা মানুষকে চুম্বকের মতো দ্বীনের পথে আকৃষ্ট করবে ইনশাআল্লাহ।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, মাসিক প্রেরণা

SHARE

Leave a Reply