কথা ও কাজে ভারসাম্য রাখুন, কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী হোন -মুহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত

জীবন পরিচালনায় মানুষকে অনেক কাজ করতে হয়। মানুষের জীবনের সাথে কাজের সম্পর্ক চাকার মতো। এ জন্য মানুষের জীবনকে চাকার সাথে তুলনা করা হয়েছে। কারণ চাকা যেমনিভাবে ঘুরে তেমনিভাবে অনেক কাজ একজন মানুষের জীবনে ঘুরপাক খায়। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও সাংগঠনিক কত কাজইতো মানুষকে প্রাত্যহিক জীবনে করতে হয়। এসব কাজ করার ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারার ওপরই নির্ভর করে সফলতা। মানুষের জীবনচলার পথে হাজারো কাজের মধ্যে এমন কিছু মৌলিক কাজ আছে যেগুলোতে ভারসাম্য রক্ষা করা অতীব জরুরি। তার মধ্যে সর্বাগ্রে প্রয়োজন কথা ও কাজের ভারসাম্য রক্ষা করা। কারণ কথা ও কাজের ভারসাম্যহীনতা গোটা জীবনটাকেই বিফল ও মর্যাদাহীন করে দেয়।
কথা বলা আর কাজ করা দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। কথা বলা মানে কাজ করা নয় বরং এ দুয়ের মাঝে পার্থক্যও অনেক বিস্তর। শুধু তা-ই নয়, কথা বলা আর কাজ করার মাধ্যমে সাফল্য অর্জন করার মধ্যেও অনেক পার্থক্য আছে। শুধু কথা বলেই কাজের সাফল্য অর্জিত হয় না। কোনো কথা বললে, কিংবা কোনো কাজের জন্য মনোভাব প্রকাশ করলেই যে কাজ হয়ে যাচ্ছে এরূপ মনে করারও কোনো কারণ নেই। আমরা অনেককেই দেখি কথায় খুব পণ্ডিত কিন্তু কাজের বেলায় আমড়া কাঠের ঢেঁকি। তাই কথার পাণ্ডিত্য দিয়ে সাফল্য অর্জিত হয় না বরং কাজের মাধ্যমেই সম্ভব সাফল্য অর্জন। আমরা যদি কথা দিয়েই সব কিছু জয় করতে চাই তাহলে ক্ষণস্থায়ী কিছু ফল হয়তো মিলতে পারে কিন্তু সাফল্য আমাদের নাগালের বাইরেই থেকে যাবে যদি কাজ করা না হয়।
সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি হলো কথায় ও কাজে ভারসাম্য রক্ষা করা। কথা এবং কাজের মধ্যে যার ভারসাম্য নেই সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রেও তিনি থাকেন ভারসাম্যহীন। ভারসাম্যহীনতা সফলতার পরিবর্তে ব্যর্থতার ধ্বনি শোনায়। কথা-কাজসহ জীবনের বিভিন্ন মৌলিক বিষয়ের ভারসাম্যহীনতা সফলতার সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দেয়। চাই সেটা কথা ও কাজের মধ্যে কিংবা জীবনাচরণের অন্য কোনো মৌলিক বিষয়ে হোক না কেন। পৃথিবীতে এমন অনেক ব্যক্তি আছেন যারা নিজেদেরকে সফল এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মনে করেন এবং লোকজনও তাদেরকে সফল মানুষ বলেই ভাবে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে দেখা যায় তাদের কথা ও কাজের ভারসাম্যহীনতা তাদেরকে অতিদ্রুত পতনের গহবরে নিয়ে যায়। কথা ও কাজের ভারসাম্যহীনতা যেমন একজন ব্যক্তিকে পতনের গহবরে নিক্ষেপ করে তেমনি সম্পদের ভারসাম্যহীন খরচ একজন বিত্তশালীকে দেউলিয়া করে দেয়। ঠিক তেমনিভাবে ভারসাম্যহীন খাওয়ার কারণে স্বাস্থ্যের হানি হয়, ভারসাম্যহীন আচরণের কারণে মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়। আর এটিতো সবারই জানা আমাদের সমাজে ভারসাম্যহীন কথাবার্তা যে বলে তাকে সবাই পাগল বলে। সমাজে পাগলের অবস্থান আমাদের সবারই জানা।
আমাদের সমাজে এমন অনেকেই আছেন যারা কথার খই ফোটাতে জানেন কিন্তু প্রকৃত সত্য তার বিপরীত। এসব লোকের কথায় মনে হয় তারা যেন মানবতার কল্যাণের দূত। তারাই একমাত্র মানুষের কল্যাণকামী। তাদের কথাগুলো মনে হয় যেন বিজ্ঞজনের মতো। কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে এদের আচরণ মোনাফেকদের মতো। এরা জনসম্মুখে মানবতার কথা বলে, মনুষ্যত্বের প্রতি আবেগ আর দরদ দেখায়, বিপরীতে এরা নিজেদের স্বার্থ হাসিলে অত্যাচারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। এদের প্রসঙ্গে হজরত ওমর (রা) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, উম্মতের মধ্যে ঐ সমস্ত মোনাফেক লোকের ব্যাপারে ভয় হচ্ছে, যারা বিজ্ঞজনের মতো কথা বলে আর অত্যাচারীর মতো কাজ করে। (বায়হাকি)
ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থার নাম। মুসলিম জাতিকে আল্লাহ পাক ভারসাম্যপূর্ণ জাতি (উম্মাতান ওয়াসাতান) হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে এ প্রসঙ্গে এসেছে, আর এভাবেই আমরা তোমাদের একটি মধ্যমপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা দুনিয়ার লোকদের জন্য সাক্ষী হতে পার। আর রাসূল সাক্ষী হবেন তোমাদের ওপর। (সূরা বাকারা : আয়াত ১৪৩) মানবতার ধর্ম ইসলামের বিধানে তাই কথা দিয়ে তা ভঙ্গ করা তথা কথা ও কাজে ভারসাম্যহীনতার কোনো সুযোগ নেই। শুধু ইসলাম কেন, পৃথিবীর কোনো ধর্মই কথা ও কাজের মিল না থাকাকে সমর্থন করে না। ওয়াদা বরখেলাপ, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং কথা দিয়ে কথা না রাখা প্রতারকের কাজ। আর প্রতারণা কোনো ধরনের ধর্মই সাপোর্ট করে না। পবিত্র কুরআনে ওয়াদা পালনের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কুরআনে এসেছে, আর সত্যপরায়ণ তারাই যারা ওয়াদা দিয়ে তা পূর্ণ করে। (সূরা বাকারা : আয়াত ১৭৭) কুরআনে আরো এসেছে, এবং প্রতিশ্রুতি পালন করবে, প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে কিয়ামতের দিন অবশ্যই কৈফিয়ত তলব করা হবে। (সূরা বনি ইসরাইল : আয়াত ৩৪)
কথা ও কাজে ভারসাম্যহীনতাকে সরাসরি মিথ্যাই বলা চলে। ইসলামের দৃষ্টিতে মিথ্যা একটি মারাত্মক অপরাধ বা কবিরা গুনাহ। আর মিথ্যা মোনাফেকিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত। সমাজে যিনি সাফল্য পেতে চান তার চরিত্রের পাশে যদি মোনাফিক শব্দটি থাকে তাহলে তার অর্জিত সাফল্যও ধ্বংস হয়ে যেতে বাধ্য। হাদিসে রাসূলে (সা) মোনাফিকের ৩টি লক্ষণ উল্লেখ করা হয়েছেÑ ১. যখন সে কথা বলে মিথ্যা বলে ২. ওয়াদা করলে বরখেলাপ করে এবং ৩. আমানতের খিয়ানত করে। (বোখারি শরিফ)
সমাজে এ রকম কিছু ব্যক্তি আছেন যারা কথা ও কাজে ভারসাম্য রাখেন না এবং হরহামেশা মিথ্যা বলেন। আবার কেউ তাকে মোনাফেক উপাধিও দেয় না। তখন এরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন আর ভাবেন তাদের থেকে চালাক দুনিয়াতে আর কেউ নেই। তারা ভাবেন তাদের কথা ও কাজের ভারসাম্যহীন এই আচরণ কেউ কখনো ধরতে পারবে না। কিন্তু এসব লোকের জেনে রাখা উচিত তাদের সম্পর্কে সবাই বেখবর নন। তাদের ব্যাপারে অনেক মানুষই জানেন। এসব মানুষের মন থেকে কখনো তাদের প্রতি ভালোবাসা কিংবা শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হয় না। আর দুনিয়ার জীবনে পার পেলেও পরকালীন জীবনে তাদের শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। কারণ আর কেউ তাদের আচরণ না বুঝুক কিন্তু মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তো তাদের ঠিকই দেখছেন। যারা নিজেরা যা বলে তা করে না, তাদের প্রতি আল্লাহর রয়েছে প্রচণ্ড ক্রোধ। এ প্রসঙ্গে মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে ঈমানদারগণ, তোমরা যা বল তা নিজেরা কর না কেন? আল্লাহর নিকট অত্যন্ত ক্রোধ উদ্বেগকারী ব্যাপার এই যে, তোমরা যা বল তা বাস্তবে কর না। (সূরা সফ : আয়াত ২)
অগনিত শ্রোতার সামনে খুব সহজেই শ্রুতিমধুর বক্তব্য উপস্থাপন করা যায়। কখনো জ্বালাময়ী বক্তব্য দিয়ে অগনিত শ্রোতাকে উদ্বেলিত করা যায়। আবার কখনো মনোমুগ্ধকর যুক্তিনির্ভর বক্তব্য দিয়ে উপস্থিত শ্রোতাকে বিমোহিত করা সহজ। কিন্তু নিজের জীবনে তা বাস্তবায়ন করাটাই আসল বিষয়। শ্রোতাদের উদ্দেশে যে নসিহত বা বক্তব্য উপস্থাপন করা হলো তা কতটুকু বক্তা তার নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন। যিনি বক্তা তিনি যে কথাগুলো শ্রোতাদের সামনে উপস্থাপন করলেন তা যদি বক্তার বাস্তব জীবনেই অনুপস্থিত থাকে তাহলে এ বক্তব্যের সার্থকতা কোথায়। বরং কাল কিয়ামতের ময়দানে এসব বক্তাকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। হজরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, আমি মিরাজের রাত্রে কিছু লোক দেখেছি যাদের ঠোঁট আগুনের কাঁচি দ্বারা কাটা হচ্ছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে জিবরাইল, এসব লোক কারা? তিনি বললেন, আপনার উম্মতের ঐ সব বক্তা, যারা মানুষকে সৎ কাজের নির্দেশ দিত এবং নিজেরা সে কাজ করতে ভুলে যেত (মেশকাত)। এ প্রসঙ্গে মহাগ্রন্থ আল কুরআনে বলা হয়েছে, তোমরা লোকদের যে কাজ করার নির্দেশ দাও, তা তোমরা নিজেরা করতে ভুলে যাও। (সূরা বাকারা : আয়াত ৪৪)
পৃথিবীতে যারা সফল, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত তারা কখনো কথার খই ফুটিয়েই এ পর্যায়ে উপনীত হননি। বরং তারা কথার চেয়েও কাজ করেছেন বেশি। কথা ও কাজের মধ্যে ভারসাম্য রেখে জীবন পরিচালনা করেছেন। কথা বলে অন্যকে দিয়ে কাজ করানোর চাইতে নিজেদের কাজ নিজেরাই করা বেশি শ্রেয়। সমাজসংগঠনে তিনিই শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন যিনি তার অধীনস্থকে কাজের নির্দেশ দেয়ার আগে নিজেই কাজে নেমে পড়েন এবং অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত হন। এসব ব্যক্তি সবার ভালোবাসার পাত্রে পরিণত হন। আসুন আমরাও কথা এবং কাজে ভারসাম্য রক্ষা করি, কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী হই।
লেখক : সম্পাদক

SHARE