কবি আবদুস সাত্তার : তাঁর স্বাতন্ত্র্য

মোশাররফ হোসেন খান..

কবি আবদুস সাত্তার, অনেকটা নীরবেই চলে গেছেন [১ মার্চ, ২০০০]। নীরবে, কিন্তু অভিমানে ক্ষুব্ধ। অভিমানের চেয়েও শেষের দিনগুলোতে তার মুষড়ে পড়া হৃদয়ের অনেকখানি জায়গা দখল করে নিয়েছিল অনিবার্য কিছু বেদনা। আমরা সে সবের সামান্য কিছু জানি, আর যা জানি না, যা তিনি কখনো জানাতেন না-সেইসব বেদনা এবং কষ্টের মাত্রা ছিল অনেক বেশি।
কেন তিনি জর্জরিত হবেন না? কেন হবেন না আহত? তিনি তো নিভৃতচারী, আত্মমগ্ন কিংবা স্বার্থপর কোন কবি ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের সবচেয়ে দায়িত্ববান সামাজিক কবি। কে না জানে যে, তার দ্বারা উপকৃত হননি-এমন লেখকের সংখ্যা অন্তত ঢাকায় খুব কমই ছিল। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, সেই কবি যখন অসুস্থতার মধ্যে বছরের পর বছর একরকম মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন, তখন সেইসব উপকৃত লেখকদের অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ছিলেন যোজন দূরে। পত্রপত্রিকায় যে আবদুস সাত্তারের উপস্থিতি ছিল এক সময় অনিবার্য, সেই আবদুস সাত্তারই–জীবনের শেষ ক’টা বছরে নিজের চোখে দেখে গেলেন তার অনুপস্থিতি এবং কী এক অন্তর্জ¡ালায় পুড়ে পুড়ে দগ্ধ হলেন অবহেলার দুঃসহ আগুনে! যেসব পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখতেন, সেইসব পত্রিকার কর্ণধারদের অধিকাংশই শেষ পর্যন্ত তাঁর দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। কী না হয় আমাদের প্রচার এবং প্রকাশনা মাধ্যমে! দেখছি তো, কত ভেড়াকেও সিংহের আদলে তুলে ধরার প্রচেষ্টার কোনো শেষ নেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের হিসাবের বাইরে চলে গিয়েছিলেন কবি আবদুস সাত্তার! কত অজস্র সাহিত্যসভা, সাহিত্য আড্ডা হয়েছে, লক্ষ্য করেছি-কবি আবদুস সাত্তারের একান্ত বন্ধুজনেরা তাঁর নামটি পর্যন্ত সেখানে নেননি। সেটা ছিল যেন তাঁকে ভুলে যাবার, এড়িয়ে চলার একটি সচেষ্ট এবং সতর্ক প্রয়াস। অসুস্থতার মধ্যে তিনি তাঁর বন্ধুদের সাক্ষাৎ তেমন একটা পাননি, হাতেগোনা দু’ একজনের ছাড়া। এসব কষ্টের কথা তিনি খুব জোরেশোরে ব্যক্ত করতেন না। কেবল নিজের ভেতর নিজেই পুড়তেন। একটি সাক্ষাৎকার আনতে তার বাসায় গেলে তিনি সেই বেদনার একটি ইঙ্গিতবাহী ধারণা দিয়েছিলেন মাত্র, ক্ষোভ ও অভিমানের ধারা ঝরে পড়েছিল তখন তাঁর দুই চোখ বেয়ে।
কিন্তু কেন এমন হবে?
কবি আবদুস সাত্তারের যে অবদান-গবেষণা কিংবা সমগ্র বাংলা সাহিত্যে-তা কি কোনক্রমেই উপেক্ষার বিষয়? অবাক না মেনে উপায় নেই, আজ যখন দেখি-তিনি বাংলা সাহিত্যের কী অসাধারণ কাজগুলো করে গেছেন! তাঁর সেই কাজের পরিধি যেমন ব্যাপক, তার চেয়েও বড় কথা হলো গুরুত্বের দিক দিয়ে সেসব অসামান্য চূড়াস্পর্শী। কী লেখেননি তিনি? সাহিত্যের এমন কোন্ দিক আছে, যা তিনি স্পর্শ করেননি? গবেষণা, কবিতা, প্রবন্ধ, স্মৃতিচারণ, জীবনকথা, অনুবাদ, শিশুসাহিত্য সম্পাদনাÑসকল বিষয়েই ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ। এত বিপুল লেখা-তাঁর সমকালীন আর কোন লেখক লিখেছেন বলে আমাদের জানা নেই। বাংলা, ইংরেজি মিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যাও শতাধিক। অসুস্থ হবার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত আবদুস সাত্তার লেখায় ছিলেন একজন শ্রমিকের মতোই নিরলস। জাত-লেখক বলতে যা বোঝায়, তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থে তাই।
১৯৪৩ সালে, দৈনিক ‘আজাদ’-এর মুকুলের মাহফিলে প্রথম বেরিয়েছিল ছড়া, আর ১৯৪৫ সালে মাসিক ‘মোহাম্মদীতে প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম কবিতা। সেই শুরু। আর থেমে থাকেননি তিনি। ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ-‘বৃষ্টিমুখর’। ‘বৃষ্টিমুখর’ নামটির মধ্যে যে ধরনের নান্দনিক উৎকর্ষ রয়েছে, ঠিক সেই পরিমাণে তাৎপর্যবাহী গ্রন্থের কবিতাগুলোও। ছন্দ এবং সনেটের ক্ষেত্রে আবদুস সাত্তার অতুলনীয়। আবার তাঁর বাহ্যিক ও অন্তর্গত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়গুলোতে তিনি মার্জিত এবং পরিশীলিত। রুচিহীন কোন শব্দ, উপমা কিংবা চিত্রকল্প আবদুস সাত্তারের কবিতাকে স্পর্শ করতে পারেনি। তাঁর এই শৈল্পিক এবং চারিত্রিক দৃঢ়তাও পঞ্চাশের কবিদের থেকে তাঁকে আলাদা এক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।
বলেছি, কবি আবদুস সাত্তার একজন জাত-লেখক। একজন শ্রমিকের মতোই তিনি প্রতিদিন লেখায় ঘাম এবং রক্ত ঝরাতেন। তিনি নিজেই বলতেন, ‘‘প্রতিদিন অন্তত দশ পৃষ্ঠা লিখতে না পারলে আমি সুস্থ থাকতে পারিনে।’’ কিংবা, ‘‘আমাকে কিছু না কিছু লিখতেই হবে এবং লেখার মলম দিয়ে সব রকমের দুঃখের ক্ষত নিরাময় করতে হবে। লেখা আমার অস্থিমজ্জার সঙ্গে জড়িত। আমিই লেখা।’’
কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাঁর চিন্তা এবং বিশ্বাসের স্বচ্ছতা। তিনি কবিতা লিখতেন, আর তাঁর যাত্রা ও কাজ বিষয়ে ছিল স্পষ্ট ধারণা। কবি ও কবিতা সম্পর্কে তাঁর যে মূল্যায়ন-তা বোধ করি আজকের এই অসহিষ্ণু সময়ের জন্য উপলব্ধির বিষয়। পুনর্মূল্যায়নের দাবি রাখে বৈ কি! তিনি বলতেন : ‘‘কবিতা ও জীবন একই জিনিসের দু’রকম উৎসারণ।’’ কিংবা-‘‘কবিতা সৌন্দর্যের প্রতীক। সেই সৌন্দর্য জীবনে আরোপ করতে পারলেই জীবন হয় একটি নিটোল কবিতা।’’ অথবা-‘‘আমি তো পৃথিবীর তাবৎ জ্ঞানী-গুণী মনীষীদের এক একটি উত্তম সৎ-কবিতা বলে মনে করি।’’ কবিদের সম্পর্কে তাঁর চূড়ান্ত বক্তব্য ছিল-‘‘কবিসত্তা ও ব্যক্তিসত্তা যার একই তিনিই সত্যিকার কবি।’’ আর তাঁর নিজের সম্পর্কে মূল্যায়ন ছিল : ‘‘…আমি ভাষার চেয়ে বিষয়গত দিকটাই মুখ্য মনে করে বিষয়গত পরিবর্তনের উপরেই জোর দিয়েছি। বিষয়গত পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে চিরন্তন সত্য কথন এবং সত্য আবিষ্কারের প্রচেষ্টা। সেই সত্য হচ্ছে মানবতার সেতু বেয়ে মহান স্রষ্টার সান্নিধ্যে পৌঁছা।’’
বলা বাহুল্য, কবি আবদুস সাত্তারের সাহিত্য জীবনের প্রচেষ্টা ছিল সেই মহান স্রষ্টার সান্নিধ্যে পৌঁছার। তার একটি কবিতার আকুতি এরকমÑ
মহান আল্লাহর তৈরি এই আমি, আমার এ গায়
একমাত্র সত্যস্থিত আল্লাহর পবিত্র নামাবলি
মানায় কাব্যের নামে এবং এ দেহের কাবায়
আল্লাহ-নামের কাব্য ঝুলিয়ে দৃষ্টির অলিগলি
আলোকে ভরিয়ে যদি করা যায় হৃদয় মহান,
সে হৃদয় কাব্য ঘরে আল্লাহর আসন দীপ্তিমান।’’
[হৃদয়ের কাবাঘর : পবিত্র নামের কাব্যে]
ভাবতে খুব কষ্ট হচ্ছে যে, কবি আবদুস সাত্তার ছিলেন পঞ্চাশের অন্যতম প্রধান কবি, বহু পুরস্কারে যিনি হয়েছিলেন ভূষিত, উপজাতীয় গবেষণা-‘আরণ্য জনপদে [১৯৬৬]-এর জন্য যিনি হয়ে উঠেছিলেন আন্তর্জাতিকভাবে বিখ্যাত, গদ্য, অনুবাদ, শিশুসাহিত্য প্রভৃতিতে যার রয়েছে অসামান্য অবদান-সেই তিনি-কবি আবদুস সাত্তার কী নিদারুণ অবহেলা আর অযতেœর মধ্য দিয়ে চলে গেলেন।
আবদুস সাত্তারের মত এমন প্রাণখোলা, উচ্ছল, কৌতুকপ্রিয়, প্রাণবন্ত কবি কি আমাদের সমাজে খুব বেশি ছিলেন? না কি এখনও আছেন?
কবি আবদুস সাত্তার বেঁচে ছিলেন [১৯২৭-২০০০] তিয়াত্তর বছর। অসুস্থতার বছর কয়টি ছাড়া তিনি বাকি জীবনটাই ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। তাঁর ব্যস্ততার মাধ্যম ছিল মূলত সাহিত্যকর্ম। আজ তিনি সকল ব্যস্ততার ঊর্ধ্বে। তিনি নেই! এই মর্মান্তিক শব্দটি যে কী পরিমাণ কষ্টের, তা প্রকাশেরও ভাষা নেই! মনে পড়ছে, খুব বেশি করে মনে পড়ছে তাঁর একটি কবিতা। তিনি প্রায়ই কবিতাটির অংশবিশেষ আবৃত্তি করে শুনাতেন। কবিতাটি তুলে ধরছি :
আমার এ কর্ম যদি আর্শি হয়, আর সেই আর্শিতে
যদি বা বিম্বিত হই এই আমি, তাহলে আমাকে
কদাকার ভেবে কেউ ঘৃণায় ফিরায় আপনাকে
অন্যদিকে, তাহলে যে ব্যর্থতার ব্রত হবে নিতে।
আর্শি যদি স্বচ্ছ হয়, দেহের কলঙ্ক রূপরেখা
স্পষ্ট হবে সেইখানে এবং সামান্যতম দাগ
অবিকল প্রতিরূপে চিহ্নিত হবেই।
অনুভাগ স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর, দীপ্তিমান হয়ে দেবে দেখা।
আমার এ কর্ম নয়-আমি নিজে আর্শি হতে চাই
এবং সে স্থায়ী হোক সেইখানে কর্মের ঠিকানা;
আমার দর্পণে যদি ফোটে সে কর্মের সব দানা
তবে কি সেখানে আমি দেবো না আলোর রোশনাই?
আমাকে দেখবে কেউ কোনকালে একথা কি ঠিকÑ
যদি না এ কর্ম হয় স্বচ্ছ কোনো আর্শির প্রতীক?

আমাদের আর্শিতে আজ খুব ভাল করে দেখে নিতে পারি নিজেদের চেহারা। সন্দেহ নেই, সেটা করতে পারলে নিজেরাই বুঝে নিতে পারবো-কবি আবদুস সাত্তার এবং আজকের লেখকদের মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়! সান্ত্বনা ঐখানে, তিনি তাঁর জীবন এবং সাহিত্যকর্মে কোনো গোঁজামিল, ফাঁকি কিংবা অতিচালাকির প্রশ্রয় দেননি। আর সেই জন্যই তিনি বিজয়ী।

দুই.
কবি আবদুস সাত্তারকে, তাঁর জীবদ্দশায় তো বটেই, তাঁর মৃত্যুর পরও কেউ কেউ তাঁকে নেহায়েত এক আটপৌরে লেখক বলে বিবেচনা করেন। সন্দেহ নেই, এটা ‘অতি দেখার’ একটি কুফল। যারা অতি দেখতে অভ্যস্ত, তাদের দৃষ্টিতে কেবল নিজেরাই ‘শ্রেষ্ঠ’ এবং ‘মহান’। আর তাদের চারপাশের সবাই ‘গৌণ’ কিংবা ‘মাইনর’। আমাদের দেশের কতিপয় বয়স্ক লেখক-কবি, পণ্ডিত ও সমালোচক তাদের আলোচনা ও লেখায় প্রায়ই একধরনের নেতিবাচক উষ্মা প্রকাশ করে থাকেন। তাদের এই মনোভঙ্গি যতটা না বিশ্লেষণাত্মক, তার চেয়েও অনেক বেশি স্বভাবগত ঈর্ষাপরায়ণতা। লক্ষণীয় বিষয় হল-কবি আবদুস সাত্তারকেও দেখেছি সেইসব হিংসুটে কিংবা ভয়ঙ্কর কিছু কবি-লেখক, সমালোচক দ্বারা আক্রান্ত হতে। সম্ভবত তিনি এটা ভালভাবে জানতেন এবং তাদের বিষাক্ত নখরের থাবায় হয়তোবা জর্জরিত হয়েই একদা উচ্চারণ করেছিলেন : ‘‘আমি আমার জাত-ভাইদের বড় ভয় করি।’’
কী এমন মূল্যায়ন হয়েছে তাঁর সাহিত্যকর্মের? নিন্দুকেরা যাই বলুক না কেন-যুক্তিহীন, গ্রাহ্যহীন কথা যত আকর্ষণীয়ই হোক না কেন, বিনা বিচারে এবং বিনা পরখে তা মেনে নেয়া যায় না। কবি আবদুস সাত্তার তাঁর একটি কবিতায় বলছেনÑ
মাঠের মাঝখান দিয়ে যেতে যেতে / আমার শৈশব
লকলকে পাটের ডগায় / হেসে উঠলো
বিস্তৃত মাঠটা / সারা গাঁয়ে ফসলের চাদর জড়িয়ে
কী আরামে শুয়ে আছে!
[আমার ঘর নিজের বাড়ি]
প্রকৃত অর্থে আবদুস সাত্তারের ক্রমাগত পরিভ্রমণের ছাপ পড়েছে, পরিবর্তন ঘটেছে তাঁর কবিতায়। সেটাই তো দেখি, তিনি শেষ পর্যন্ত সাহিত্যকর্মের যাবতীয় উৎসভূমির কেন্দ্রবিন্দুতে রূপ দিয়েছিলেন মহান স্রষ্টার একমাত্র সন্তুষ্টি এবং মানবতার সীমাহীন জয়গান। মনে হয় না এতে তাঁর কবিতা কোনো রকম রুগ্ন, ক্লিষ্ট কিংবা জরাগ্রস্ত হয়ে উঠেছিল। দুটো কবিতা পাশাপাশি রাখলে আমরা অবাক-বিস্ময়ে লক্ষ্য করবো যে, তাঁর প্রথম এবং শেষদিকের কবিতার মধ্যে বিষয়গত কী পর্বতপ্রমাণ ফারাক, কিন্তু কবিতার অন্তর্গত কিংবা বহির্গত কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন নেই। যেমন ‘বৃষ্টিমুখর’ [প্রথম প্রকাশ : ১৯৫৯, তৃতীয় সংস্করণ : ১৩৮২] থেকে তুলে ধরা যাক ‘মেঘ’ কবিতাটিÑ
এইখানে এসো মেঘ, বাড়ী দরজা খোলা আছে ;
সবাই জেনেছে আমি বিশুষ্ক মরুর প্রতিনিধি।
এখানে আসে না কেউ, প্রতিবার যন্ত্রণায় বিধি
আমাকে তাড়িয়ে দেয় অনন্তর আগুনের কাছে।
আকাশের নীচ দিয়ে না হয় সমুদ্রে চলে যাই, …
সেও তো অনেক দূর, বালির জ্বালায় পা’ ডুবিয়ে
যায় না এগুনো আর; সেই বালি হাওয়ায় উড়িয়ে
এইখানে এসো মেঘ, তোমাকেই স্বাগত জানাই।
‘বৃষ্টিমুখর’ [১৯৫৯] প্রকাশের সাতাশ বছর পর প্রকাশিত তাঁর ‘পবিত্র নামের কাব্য’ [১৯৮৬] থেকে তুলে ধরছি গ্রন্থের প্রথম কবিতা- ‘চাবি’। যেমনÑ
যখন কোরান পড়ি, মনে হয় ডুবে যাই আমি
পুণ্যের সমুদ্রে; আর যে সমুদ্রে অন্য কিছু নেই
অক্ষরের ঢেউ ছাড়া। এমন পবিত্র আর দামি
বাণীর সমুদ্রে নেয়ে যদি আমি সুন্দরের সেই
ঘনিষ্ঠ জ্যোতির কাছে নিতে পারি এই আমাকেই
তবে কি থাকবো আর কোনোদিন পাপের আসামী?
পুণ্য যদি পুণ্য আনে, আলো সে তো আলোক পাবেই
এবং তখন হবে এই সত্তা দৃঢ় মুক্তিকামী।
কোরান সমাপ্ত করে যখন পৃথিবী নিয়ে ভাবি
মনে হয় সব কিছু পবিত্র কোরানে বাঁধা আছে,
এবং সকল শিক্ষা রয়েছে এ কোরানের কাছে।
জ্ঞানের দরজা খোলে একমাত্র কোরানের চাবি।
এবং কোরান যদি করা হয় জীবন-পাথেয়,
সে জীবন থাকবে কি কোনো কালে কারো অবজ্ঞেয়?
আবদুস সাত্তার তাঁর একটি সাক্ষাৎকারে অকপটে স্বীকার করে বলেছেন, ‘‘আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবান্বিত করেছে পবিত্র কুরআন।’’ আর এই কারণেই আমরা আবদুস সাত্তারের কাব্যভাষায় একটি স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর লক্ষ্য করি। অনেকেই প্রগতিশীলতাকে ধারণ করতে চান ‘ধর্মহীনতার’ খোলসে। তাদের ধারণা ‘ধর্মের আশ্রয়ে আর যাই হোক কবিতা হবে না। ধর্ম কবিতাকে কষ্ট করে, পঙ্গু করে।’ … তাদের এই ধারণা যে কতটা ভ্রান্ত এবং হাস্যকর তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এ সম্পর্কে আবদুস সাত্তারের বক্তব্য ছিল স্পষ্ট। তিনি বলতেন : ‘‘আমরা যেখানে শতকরা প্রায় নববই ভাগই গোসল সেরে অজু করে নামায শেষে মুনাজাতে ব্রতী এবং মৃত্যুর পর ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ বলে কাফন শেষে জানাযা সমাপ্ত করে দাফন করতে প্রয়াসী- অতঃপর ফাতেহাখানি কুলখানি করতে উদ্যত সেখানেই আমাদের স্বাতন্ত্র্য এবং এই স্বাতন্ত্র্যই থাকবে আমাদের জীবনে, সাহিত্যে ও ভাষায়।’’
তিনি যথার্থই উপলব্ধি করেছিলেন। বলা যায়, এই স্বাতন্ত্র্যের কারণেই কবি আবদুস্ সাত্তার একশ্রেণীর লেখক-বুদ্ধিজীবী ও প্রচার মাধ্যমের কাছে উপেক্ষিত আছেন।

তিন.
কবি আবদুস সাত্তার-এর বৃিষ্টমুখর প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৯ সালে। আর তাঁর সর্বশেষ কবিতার বই আবদুস-সাত্তার ও অন্যান্য কবিতা প্রকাশিত হয়েছে ১৯৯০ সালে। প্রথম এবং শেষ প্রকাশিত কবিতার বই-এর মাঝখানে একে একে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অন্যান্য গ্রন্থের সাথে আরও অনেক কবিতার বই।
এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় ক্রমাগত উত্তরণ ও পরিবর্তন ঘটেছে আবদুস সাত্তারের কবিতার এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর কবিতা আবেগের খোলস ছেড়ে একটি সুদৃঢ় পরিণত অবস্থানে স্থিত হয়েছে। তাঁর কবিতায় আমরা লক্ষ্য করি চিন্তা এবং আত্মপোলব্ধির এক চিরন্তন দ্যুতি। আবদুস সাত্তারের কবিকণ্ঠ- সে তাঁর নিজস্ব কণ্ঠ। স্বতন্ত্র। কবিতা ছাড়াও আবদুস সাত্তারের সাহিত্যকর্মের পরিধি অনেক বিস্তৃত। তিনি দীর্ঘকাল সম্পাদনা করেছেন। গবেষণামূলক সৃষ্টিতে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত গবেষণাকর্ম ‘আরণ্য জনপদে’ [১৯৬৬] গবেষক আবদুস সাত্তারকেও স্মরণীয় করে রাখার মতো। শিশু-কিশোরদের জন্যেও প্রচুর লিখেছেন। আর তাঁর সৃষ্টির ভেতর একটি বিশাল অংশ দখল করে আছে অনুবাদ। আরবি, ফারসি, তুর্কি, উর্দু, ইংরেজিসহ বেশ কিছু ভাষায় তিনি দক্ষ ছিলেন। আরবি, ফারসি, তুর্কিসহ বিভিন্ন ভাষায় রচিত সাহিত্যকর্ম আবদুস সাত্তার অনুবাদ করেছেন এবং তাঁর পরিমাণও নেহাত কম নয়। এসব অনুবাদের মধ্যে আছে কবিতা, গল্প, নাটক প্রভৃতি।
এ সকল সৃষ্টির বাইরেও আবদুস সাত্তার একাধিক পত্র-পত্রিকা ও সাহিত্য-সাময়িকীতে কলাম লিখেছেন। তাঁর ভেতর কিছু সাহিত্য এবং কিছু স্মৃতিচারণমূলক। ‘স্মৃিতচারণমূলক’ হলেও সে সকল রচনাও শেষ পর্যন্ত সাহিত্যেরই অংশ হয়ে উঠেছে।
আবদুস সাত্তার-তাঁর বহুবিধ কাজের মধ্যে শেষ পর্যন্ত কবিতার সাম্রাজ্যেই প্রোজ্জ্বল হয়ে থাকবেন বলে আমাদের বিশ্বাস। কেননা তাঁর কবিতায় আছে এমন এক সত্যদর্শনের ছোঁয়া, এমন এক জীবন-জিজ্ঞাসার আকর, যাতে করে কেবল তাঁর কণ্ঠকেই সনাক্ত করা যায়। এই স্বতন্ত্র কণ্ঠ সহসা হারিয়ে যাবার মতো নয়।
লেখক : কবি ও সম্পাদক, নতুন কলম ও নতুন কিশোরকণ্ঠ

SHARE

Leave a Reply