করোনা-কাল : রাসূল সা.-এর বিধানেই সোনালি সকাল -আহসান হাবিব ইমরোজ

এক.
করোনা-কালে করণীয়
এপ্রিল ১০, ২০২০।
এখন করোনাকাল। মনে হচ্ছে, গেল শতাব্দীর স্প্যানিশ ফ্লু আর পারমাণবিক বোমার পর এটির ভয়ঙ্কর থাবা ইতিহাসের পাতাকে দুমড়ে দেবে। এ যেন এক ভয়ঙ্কর দাঁতালো ডাইনোসর, জুরাসিক পার্ক থেকে বের হয়ে পৃথিবী নামক পুষ্পিত বাগানকে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে। worldometer এর টালিখাতায় এখন পর্যন্ত যুক্ত হয়েছে ১৫,৩২,৪৩৯ জন সংক্রামিত মানবসন্তানের নাম। আর ৮৯,৭১৬ জন ইতোমধ্যেই উঠে গেছে ডেডলিস্টে, অনেকের ভাগ্যে কফিন কিংবা শেষ অশ্রুবিন্দুও জোটেনি।

ওগো প্রিয় বসুন্ধরা, এমন দৃশ্য তুমি কবে দেখেছো?
পিতা মারা গেছে, কোন মানুষ এমনকি স্বজনরাও সে লাশ ধরতে আসছে না। কান্নার বাঁধভাঙা জোয়ার নিয়ে শিশু-কিশোর বয়সী চার কন্যা পিতার লাশ কাঁধে নিয়েছে।
কিশোর বয়সে আমিও পিতার লাশ কাঁধে নিয়েছিলাম, তাই এর ওজন অনুমান করতে পারি। কিন্তু আমার পিছনে ছিল হাজারো শোকার্ত মানুষ। ওরা শুধু অসহায় চার কন্যা। মনে হয়, ওদের চোখের পানি ভারত মহাসাগরে ফেললে সাগর শুকিয়ে যাবে। ওদের বুকের কষ্টের কাঁপনে হিমালয়ও বিধ্বস্ত হয়ে যাবে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, হায়! পৃথিবীর ব্যবস্থাপনার প্রতি আর কোন আশা নেই, কেবল তাকিয়ে আছি আসমানের অধিপতির দিকে। পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত গায়ক নচিকেতা কবিতা লিখেছেন, মহামারী করোনা তুমি চলে যাও; শুধু ভয়টাকে রেখে যাও। তারা হৃদয়ের গভীর আকুতি প্রকাশ করেছেন। আমরা স্পষ্ট করে সর্বশক্তিমান আল্লাহর দরবারে কেঁদে কেঁদে ক্ষমা চেয়ে বলতেই পারি; ওগো পরম প্রভু যাদের পাপ ও জুলুমে আজ পৃথিবী ভারাক্রান্ত যদি তারা ক্ষমার অযোগ্য হয়; তবে, তোমার আবাবিল কিংবা অদৃশ্যবাহিনী তুমি তাদের উদ্দেশ্যে পাঠাও। অসহায়, নিরন্ন মানবতাকে তুমি হেফাজত করো। মানবতার প্রতি আমাদের গভীর আকুতি; স্টে হোম। স্টে কুল। স্টে সাপোর্ট টু হিউম্যানিটি। স্টে ইন প্রেয়ার।

দুই.
লকডাউনে ঈদ
আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন্ আসমানি তাগিদ
২৫ মে ২০২০। আপনি, আমিসহ পৃথিবীর প্রায় সাড়ে ৭শত কোটি মানুষ লকডাউনে আটকে আছি। এর মাঝেই বাঁকা চাঁদের ফাঁক গলে এলো খুশির ঈদ। করোনার হিসাব দেয়ার ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডোমিটারের (https://www.worldometers.info/coronavirus/) ভাষ্য অনুযায়ী পৃথিবীতে এ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৫৪,২৯,৭২৪ এবং মৃতের সংখ্যা ৩,৪৪,৪৬২ জন। এখনো সে রেখাচিত্র ৮০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে আকাশ পানে উঠছে।
হয়তো আমরা প্রভুর কৃপায়, এখনো কিছুটা ভালো আছি। এজন্য পরম প্রভুর অপার দরবারে শুকর আদায় করছি; তারই সাজানো মহাগ্রন্থ আল কুরআনের সর্বপ্রথম সূরার সর্বপ্রথম শব্দ দিয়ে; ‘আলহামদুলিল্লাহ।’ কিন্তু স্বজনরা অনেকেই আক্রান্ত, পরম করুণাময় আল্লাহ তাদের রক্ষা করুন।
৫১ কোটি বর্গকিলোমিটারের এই বসুন্ধরায় সকল মানুষ, প্রাণ ও প্রকৃতি নিয়ে একটি ৫১বর্তী (একান্নবর্তী) পরিবারের মতোই আমরা বসবাস করছিলাম। হঠাৎ এলো করোনা বা কোভিড-১৯, আমরা বন্দি হয়ে গেলাম স্ব স্ব ঘরে; আর এ ব্যবস্থার পোশাকি নাম লকডাউন।
পৃথিবী ভুলে যায়নি, গাজাকে অবরুদ্ধ করে যখন গড়ে তোলা হলো বিশ্বের সর্ববৃহৎ কারাগার এবং কাশ্মিরের সকল মানুষকে যখন লকডাউনে পাঠনো হলো এই আমরাইতো কোন প্রতিবাদ করিনি। বরং দেশে দেশে ঘোষণা এসেছে ওটা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়; কেউ প্রতিবাদ করলে তার টুঁটি চেপে ধরা হবে।
আজ সারা পৃথিবী লকডাউনে, আমরা কি তিলে তিলে বুঝতে পারছি না ফিলিস্তিনি কিংবা কাশ্মিরিদের কষ্ট? কোথায় সেই দাম্ভিক ও বোবা শয়তানরা? এখনও কি বুঝছে না লকডাউনের মর্ম-ব্যথা? এবারের আকাশের ঈদের চাঁদ কিছুটা মলিন মনে হতেই পারে। কেননা আমাদের প্রিয় কবি বলেছেন; যেখানে মানুষ অধিকার-হারা/ যেখানে জীবন দুখে, শোকে ভরা/ সেখানে আকাশে ঐ ঈদেরই চাঁদ; মেঘেই ঢাকা যে চিরদিন॥
স্কুল-কলেজ, খেলার মাঠ সব বন্ধ। শিশু-কিশোর-তরুণদের অনলাইন স্কুলিংয়ের মাধ্যমে জাগাতে হবে। লকডাউনের শিকার হয়ে প্রতিদিনের দুমুঠো ভাত, চিকিৎসা, কাজও আশ্রয় হারাচ্ছে কোটি কোটি মানুষ। সম্পদশালী-মধ্যবিত্ত সবাইকে হৃদয় উজাড় করে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। হ্যাঁ, এভাবেই দুঃখের ভিতরও সুখ আর ধ্বংসের ভিতরও সৃষ্টির বটবৃক্ষের উত্থান হবে। যদি আমরা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সাথে সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিতে পারি। সবাইকে সাথে নিয়ে মিলেমিশে এক সাথে ঈদ করতে পারি। ঠিক যেমন করে, যুদ্ধে শহীদ হওয়া সাহাবির কান্নারত এতিম সন্তানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন রাসূল সা. শিশুটিকে সান্ত¡না দিয়ে বললেন, ওহে কেঁদো না; তুমি কি খুশি নও যে, আজ থেকে তোমার পিতা মুহাম্মদ সা. এবং মা হচ্ছেন আয়েশা রা.। (আল্লাহু আকবার )
রাসূল সা. আরো বলেছেন, ‘দয়া-ভালোবাসা হচ্ছে ঈমানের নিদর্শন যে দয়ার্দ্র নয় তার ঈমান নেই।’
তাই যদি বুকে রাখতে চাই ঈমানের দৌলত তবে বাঁধতে হবে কোমর এই মানবতার দৌড়ে।
পবিত্র ঈদুল ফিতরের পাশাপাশি আজ ২৫ মে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২১তম জন্মবার্ষিকী। আজ থেকে ৮৯ বছর আগে ১৯৩১ সালের ঈদুল-ফিতরের সময় তিনি তার সর্বপ্রথম ও সর্বাধিক প্রচারিত ইসলামি সঙ্গীতটি রচনা করেন। হৃদয়ের মরচে ধরা ভাঁজে ভাঁজে সে গানটির পরশ বুলালে কেমন হয়?
ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন্ আসমানি তাগিদ।।
তোর সোনা-দানা বালাখানা সব রাহেলিল্লাহ্।
দে জাকাত মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিদ্॥
আজ পড়বি ঈদের নামাজ রে মন সেই সে ঈদগাহে।
যে ময়দানে সব গাজী মুসলিম হয়েছে শহীদ॥
আজ ভুলে যা তোর দোস্ত ও দুশমন হাত মিলাও হাতে।
তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরিদ॥
ঢাল তোর হৃদয়ের তশ্তরিতে শির্নি তৌহিদের।
তোর দাওয়াত কবুল করবে হজরত হয় মনে উম্মীদ।।
যারা জীবন ভরে রাখছে রোজা নিত্য উপবাসী।
সেই গরীব ইয়াতিম মিস্কিনে দে যা কিছু মুফিদ॥
তিন.
করোনা-মুক্তি: নবী মোর পরশমণি, নবী মোর সোনারখনি!!
ওরা ১১ জন। দুঃখিত! এটি চাষী নজরুলের সেই বিখ্যাত সিনেমার নাম নয়। আমার পড়া স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা। তাই তালিকা টাঙিয়ে উৎপীড়ন করবো না। তবে প্রশ্ন হতেই পারে; তাহলে এই ন্যাকামো কেনো? আসলে পুরনো পড়াগুলো টালি করছিলাম। কোথায় কী শিখলাম; এই আরকি। প্রথম নাতে রাসূল সা. শুনেছিলাম, মনে হয় তখন ক্লাস টুতে পড়ি। এখনও কানে অনুরণিত হচ্ছে স্যারের সেই সুমধুর সুর। আর আমাদের মাথা দুলিয়ে তাল মিলানো- নবী মোর পরশমণি, নবী মোর সোনার খনি..। কচি হৃদয়ে আঁকা সেই সুরের মূর্ছনা এখনও অমলিন। করোনা-কাল। লকডাউনে নাকাল বিশ্ব। পরপারের যাত্রী হয়েছে প্রায় ৩,৯৩,২১২ জন, আক্রান্ত হয়ে ৬৭ লক্ষাধিক মানুষ ধুঁকছে। মহাপরাক্রমশালী আমেরিকা, ব্রিটেন যারা সারা পৃথিবীকে নিয়ে এতদিন ছক্কা-পাঞ্জা খেলেছে তাদেরও অবস্থা লেজেগোবরে। আমরা হঠাৎ লকডাউন তুলে নিয়েছি। হাটে-ঘাটে-মাঠে সর্বত্র মানুষের যেন মুক্তির মিছিল। এটি শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর মিছিলে রূপান্তরিত হয় কি না, এ নিয়ে অনেকেই শঙ্কিত। যেকোন পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার সামর্থ্য সাধারণের নেই। কিন্তু সে নিজেকে বদলাতে পারে; পারে তার পরিবার ও পরিবেশকে বদলাতে। আমরা শেষতক সে লড়াইটাতো চালিয়ে যেতে পারি।
গত ১৭ মার্চ আমেরিকার বিখ্যাত নিউজউইক পত্রিকায় একজন মার্কিন অধ্যাপক ক্রেইগ কন্সিডেইন বলেছেন, মুহাম্মদ সা.কে অনুসরণের মাধ্যমে করোনাসহ সকল মহামারী থেকে বাঁচা সম্ভব। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমরা মুসলিম দেশসমূহে বিশ্ব-হাতধোয়া দিবস পালন করি কিন্তু রাসূল সা.-এর অবদানকে স্মরণ করি না। কোভিড-১৯ আমাদের শিখিয়ে গেল ইসলামের মৌলিক শিক্ষা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব। মহান রাসূল সা. ১৪০০ বছর আগে বলেছেন, ‘পরিচ্ছন্নতা হচ্ছে দ্বীনের অর্ধেক।’
মুহাম্মদ সা. আমাদের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে ওজু করার নির্দেশনা দিয়েছেন; প্রতিটি হাত ৩ বার কব্জি এবং ৩ বার কনুই মানে ৬ বার ভালোভাবে ধৌত করতে। তার মানে প্রতিদিন একটি হাত ধৌত করবো প্রায় ৩০ বার। এরপর ৩ বার খাওয়ার আগে-পরে ৬ বার। ২ বার টয়লেটে গেলে আরো ২ বার। সর্বমোট ৩৮ বার। গড়ে প্রতি ৩৮ মিনিট পরপর হাত ধুতে হবে। এ থেকে বুঝা যাচ্ছে একজন একনিষ্ঠ মুসলিম সহজেই যে কোন মহামারী থেকে বাঁচতে পারে। খ্যাতিমানদের স্মরণ করার জন্য হলিউডের ভিতরে হাঁটার রাস্তায় প্রায় ২৬০০ বিশ্বখ্যাত মানুষের নাম সংবলিত পাঁচতারকা টাইলস লাগানো আছে। এই ঈর্ষণীয় অফারটি যখন মুহাম্মদ আলী ক্লেকে দেয়া হলো (আমরা হলেতো ওয়াও, ওয়াও বলে মাটিতে গড়াগড়ি খেতাম), কিন্তু তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বললেন; একটি শর্তে এটি হতে পারে- নামফলক সংবলিত তারকাটি মাটিতে লাগানো যাবে না; বরং মানুষসম উঁচুতে ওয়ালে লাগাতে হবে- কারণ আমার নামে আছে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মানুষ হযরত মুহাম্মদ সা. এর নাম।
এই মোহাম্মদ আলীকে কে না চেনে? তিনবার বিশ্ব-হেভিওয়েট মুষ্টিযুদ্ধে চ্যাম্পিয়ন। তাকে সর্বকালের সেরা অ্যাথলেটদের ভিতর স্থান দেয়া হয়। ১৯৯৬ সালে তার মাধ্যমে আমেরিকায় অলিম্পিক উদ্বোধন হয়। ৩রা জুন ২০১৬ সালে ৭৪ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। তার এ মৃত্যু ১২ ঘণ্টা টুইটারে, ফেসবুকে কয়েকদিন সর্বাধিক আলোচিত বিষয় ছিল। ইএসপিএনসহ বিশ্বের নানা টেলিভিশনে তার কফিনের যাত্রা দীর্ঘসময় সরাসরি সম্প্রচার করে এবং বিশ্বব্যাপী প্রায় একশত কোটি মানুষ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সেটি পর্যবেক্ষণ করে। এরদোগানসহ শত শত বিশ্বনেতা ছুটে গেছেন তার বিদায় বেলায়। কেননা তারই দৃঢ়তায় ২৬০০ মানুষের নামফলকের মধ্যে শুধু তারটিই সম্মানজনকভাবে ওয়ালে স্থাপন করা হয়েছে আর বাকি সব হলিউডের হাঁটার রাস্তায়, পায়ের নিচে। তিনি মুহাম্মদ সা. কে মর্যাদা দিয়েছিলেন পরম প্রভুও তাকে মর্যাদা দিয়েছেন।
৩রা জুন, মাত্র ২ দিন আগেই চলে গেল মোহাম্মদ আলীর বিদায়দিবস। তার মতো সেই ইস্পাত দৃঢ়তায় নবীকে ভালোবেসে ও তার সুন্নাহকে ফলো করে আমরাও কি করতে পারি না করোনা-মুক্তি।
চলুন শৈশবের মতো নিষ্পাপ মন নিয়ে হৃদয়ের ভালোবাসায় গুনগুনিয়ে উঠি জাতীয় কবির হৃদয় থেকে উত্থিত সেই নাতে রাসূল;
নবী মোর পরশমণি
নবী মোর সোনারখনি
নবী নাম জপে (ভালোবাসে, দরুদ পড়ে ও ফলো করে) যেইজন
সেইেতো দোজাহানের ধনী…

চার.
করোনা-বিধান : রাসূল সা.-এর আদর্শই সমাধান
মানুষ তাচ্ছিল্য করে আরেকজনকে বলে- তুমি আমার চুলটাও নড়াতে পারবে না। আজকে কী দুর্ভাগ্য সেই চুল (১০০ মাইক্রোন) থেকে প্রায় ১,০০০ ভাগের একভাগ হচ্ছে নোভেল করোনাভাইরাস (মাত্র .১২ মাইক্রোন) এরা এতই ছোট, চোখে দেখা দূরের থাক, সাধারণ মাইক্রোস্কোপ দিয়েও এদের দেখা সম্ভব নয়। কারণ ১ মাইক্রোন হল এক মিটারের দশ লক্ষ ভাগের একভাগ। আর এরাই কিনা ৫১ কোটি বর্গকিলোমিটারের এই বিশাল পৃথিবীকে যেন ললিপপ বানিয়ে চিবুচ্ছে।
বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মানুষ রাসূল সা.। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন শ্রেষ্ঠ জীবনপদ্ধতি। পূর্বের লেখায় এ নিয়ে কিছু আলোকপাত করেছিলাম। আরো আছে রাসূল সা.-এর শেখানো হাঁচি-কাশির শিষ্ঠাচার। তিনি আরো আমাদের শিখিয়েছেন মহামারী আক্রান্ত এলাকায় না ঢুকতে এবং আক্রান্ত এলাকা হতে বের না হতে।
তার এই নির্দেশ ফলো করতে গিয়ে শয়তানও যাকে দেখে ভয় পায় সেই হযরত ওমর রা. আক্রান্ত এলাকায় না ঢুকে ফিরে যান। আবার আশারায়ে মুবাশশিরার একজন আবু ওবায়দা ইবনুল জাররাহ আক্রান্ত এলাকা ত্যাগ না করে শাহাদাত বরণ করেন।
আমরা কি তাদের চাইতেও বেশি সাহস ও তাকওয়ার পরিচয় দিতে চাই? এটি কী আল্লাহ পছন্দ করবেন? রাসূল সা. ও তার সুন্নাহকে যে ভালোবাসে আল্লাহ তাকে আখেরাতে তো অবশ্যই দুনিয়াতেও আকাশসম মর্যাদা দেন। রাসূলের শানে শতশত নাত লিখে দুখুমিয়া হলেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি। সৈয়দ মুজতবা আলীও লিখতে চেয়েছিলেন মুহাম্মদ সা.কে নিয়ে একটি গ্রন্থ। নিজের ‘নবীজী’ গ্রন্থের মাত্র এক অধ্যায় লিখেই হুমায়ুন আহমদ হলেন খ্যাতিমান।
অ্যাডভেঞ্চার-থ্রিলার লেখক রোমেনা আফাজ বাংলা সাহিত্যে চিরকালীন অবদানের জন্য ২০১০ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জাতীয় পুরস্কার স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে ভূষিত হন। আমরা কি জানি তার ২৫০টি বইয়ের ভিতর একটি বই হচ্ছে রাসূল সা.কে নিয়ে। আজ তার খ্যাতি সারা দুনিয়ায় কারণ তার আমেরিকা প্রবাসী পৌপুত্রী মারিয়ম এবং ফাতেমা তাদের কুরআনের প্রতিভায় নেট দুনিয়ার লাখো-কোটি দর্শকদের খ্যাতি কুড়িয়েছে। একজন সুইডিশ-লেবানিজ মুসলিম মাহের জেইন ছিলেন একজন অ্যারোনেটিকাল ইঞ্জিনিয়ার। লোভনীয় পেশা ও যৌবনের রঙিন হাতছানি বাদ দিয়ে রাসূলের ভালোবাসায় চলে আসেন গানের জগতে, রাসূলের শানে তার গানের ভিউ কী পরিমাণ হতে পারে? মাত্র ৩ থেকে ৪ কোটি। ভাবা যায়?
চলুন রাসূলের জীবনাদর্শ ফলো করার দীপ্ত অঙ্গীকার করি। তার ভালোবাসায় তার সুন্নাহর আলোয় নিজকে রঙিন করি এবং বেসুরো গলায় মাহের জেইনের সাথে সুর মিলাই-
‘ইয়া নবী সালাম আলাইকা’।

করোনা-নিরোধ
রাসূল সা.-এর ঔষধ- করো, করো না ও করুণা
৪ (ফোর)। কিন্তু চার না লিখে ফোর কেন? এটি কি ন্যাকামো, জ্যাঠামো নাকি ফাজলামো?
আসলে এর কিছু মারেফাত আছে বৈকি। নাম্বারের জগৎটা শুধু বিশাল বললে ভুল হবে, এই যেমন সব থেকে বড় নাম্বার Googolplexian- The world’s largest number (অর্থাৎ ১ এর পর ১ লক্ষ শূন্য বসাতে হবে মাত্র; মাত্র বললাম কারণ, সব অঙ্কের শেষে আমার দেশে এটিই লেখার নিয়ম)।
সংখ্যার জগতে এমনকি কোনো সংখ্যা আছে যার সংখ্যা মান এবং এর লেটার বা বর্ণ সংখ্যা হুবহু সমান?
উত্তর : ৪. এই একটিমাত্র সংখ্যা অ্যারাবিক নাম্বারের জগতে (কেন ইংরেজি না বলে অ্যারাবিক বললাম, কেউ কি দয়া করে বলবেন?) যার মান এবং সেটি লিখতে যে লেটারগুলো লাগে তার সংখ্যা (ঋঙটজ) হুবহু সমান। এ ছাড়া হাবলের দুরবিন দিয়ে আতি-পাতি করে খুঁজলেও আর একটি সংখ্যাও পাবেন না। চ্যালেঞ্জ! আর বাংলাতেও এরকম অনেক কিছু সম্ভব, বর্ণমালা কিংবা সংখ্যা নিয়ে সে দায়িত্ব আপনাদের থাকলো। কারণ অ্যাকাডেমিসিয়ানরাতো মহাব্যস্ত, তাই তাদের গবেষণা করার ফুরসত কই?
হঠাৎ চার (৪) নিয়ে এত চেঁচামেচি কেন? যদি বলি, আমার মামাতো ভাই আছে চারজন। বলবেন, এটি একটি খবর হলো নাকি? হ্যাঁ, যদি তাদের কেউ চাঁদ কিংবা মঙ্গলগ্রহে যায়, তবে সেটি অবশ্যই খবর। কিংবা বলি, তাদের নাম সাদী, গালিব, খালিদ এবং মাহদী। বিরক্তের একশেষ হয়ে বলবেন, এই যা শুরু হলো মামাবাড়ির গপপো।
যদি দার্শনিকদের দাদা-গুরু আড়াই হাজার বছর আগের সক্রেটিসের মতো গম্ভীর ঢঙে বলি; আচ্ছা বলুনতো ছেলেদের এইসব সুন্দর নামসমূহ আমাদের ছোট মামা কেন পছন্দ করলেন? আপনি বলবেন, আরে মশাই এত্তোসব ভণিতা রাখুনতো, এটি কে না জানে ইরানের কবি সাদী, মোগল-ভারতের কবি গালিব, রাসূলের শ্রেষ্ঠ সেনাপতি খালিদ আর শেষ-জমানার শ্রেষ্ঠ সংস্কারক ইমাম মাহদীর নামে তাদের নাম।
কিন্তু আমার উত্তরতো তাতে পুরোটা খুঁজে পাই না। ভাবনার গভীরে তলিয়ে যাই, তন্ময়তার ঘোরে। কিন্তু চিন্তার বাউন্ডারি মেলে না।
যেমন, আজ থেকে প্রায় ৮শত বছর আগে জন্ম নেয়া প্রায় ৪ (এখানেও চার!) হাজার কিলোমিটার দূরে ইরান দেশের শেখ সাদী (আরে তার নামেতেও দেখি চার বর্ণ) ভিতর এমনকি ছিল যে মামা তার বড় সন্তানের জন্য সে নামটিই বাছাই করলেন? লক্ষাধিক হতে পারে দেশে সাদী নামের মানুষ। তাদেরটাইবা কেন? যাক বাবা, এতো ভাবনা আপাতত জাম্বিলে জব্দ রেখে কিছু আলোচনা এগোনো যাক।
আমার মতো বোকা কিসিমের মানুষ রাসূলের জীবন এবং মানবতার প্রতি তার নির্দেশনা অধ্যয়ন করে মোটা দাগে ৪টি (আবার চার) জিনিস খুঁজে পেয়েছে।
১. করোনা (সকল মহামারী, দুনিয়া ও আখেরাতের দুর্যোগের হুঁশিয়ারি )
২. করো না (দুনিয়া ও আখেরাতের দুর্যোগ থেকে বাঁচার জন্য যে সব কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশাবলি)
৩. করো (দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের জন্য ভালো কাজের নির্দেশাবলি) এবং
৪. করুণা (দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের শ্রেষ্ঠ-মডেল হিসেবে রাসূলের রাহমাতুল্লিল আলামিন হিসেবে ভূমিকা)
বিশেষ করে করোনা মহামারী নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে। আর এই করোনাকালে বাকি তিনটি সামনে নিয়ে এবার এক এক করে আলোচনা খোলাসা করা যাক।

১. করো না
বলা হচ্ছে আগামী আরও এক-দেড় বছর করোনার ঝুঁকির ভিতরই থাকতে হবে। অন্তত যত দিন যুতসই ভ্যাকসিন বাজারে না আসে, ততোদিনতো বটেই। তারপরও সেই টিকা সবার হাতের নাগালে আসতে তো বেশ কিছু সময় লেগেই যাবে। এই সময়ে আমাদের দৈনন্দিন জীবনাচারে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে লকডাউন তুলে নেওয়ার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাধারণভাবে মানুষের করণীয় ও বর্জনীয় সম্পর্কে নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকার ৬ই জুন ২০২০ (৯ জুন অনলাইনে আপডেটেড) রোনি কেরিন রেবিন (Roni Caryn Rabin) লকডাউন উত্তরণকালে চারটি সি স্মরণ রেখে এগুলো সতর্কভাবে সমন্বয় রাখতে বলেছেন (How to Navigate Your Community Reopening? Remember the Four C’s)।
এই চারটি সি হলো-

১. ক্লোজ কনটাক্ট (ঘনিষ্ঠ যোগাযোগে সতর্কতা )
২. কনফাইনড স্পেসেস (সীমাবদ্ধ পরিবেশের সতর্কতা)
৩. ক্রাউডস (ভিড়ের ব্যাপারে সতর্কতা)
৪. রিয়েলিস্টিক চয়েজেস (বয়স-সুস্থতাভেদে বাস্তবভিত্তিক বাছাই)
(মজার বিষয় হলো এখানেও চার)। আর কেনা জানে এ ৪টির সবগুলোই রাসূলের হাদিস থেকেই নেয়া।
২. করো
প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে গোটা বিশ্ব। এই ভাইরাসের বিষাক্ত ছোবলে যখন দিশেহারা বিশ্বের আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান। ঠিক তখনই রাসূলের হাদিসে বর্ণিত উপায়ে ওষুধ বানিয়ে ব্যাপক সাফল্য পাওয়ার দাবি করেছে সৌদি আরবের গবেষক দল।
সহীহ বুখারী শরিফের হাদিসে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেন, ‘কালিজিরা সকল রোগের ওষুধ কেবল মৃত্যু ছাড়া।’ হাদিসের এই বাণীর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তাই বুভিড নামে একটি ওষুধ তৈরি করেছে মদিনার তাইবাহ ইউনিভার্সিটির অ্যান্টি-কোভিড ট্রিটমেন্ট গবেষক দল। আমেরিকান জার্নাল পাবলিক হেল্থ রিসার্চ এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশ করেছে। http://www.sciepub.com/ AJPHR/abstract/11658 এই ওষুধের মূল উপাদান হলো- কালিজিরা, ক্যামোমিল ও প্রাকৃতিক মধু। গবেষণাপত্র অনুযায়ী, এক ডোজ তাইবুভিডে রয়েছে, এক চা চামচ (২ গ্রাম) কালিজিরা, এক চা চামচ (১ গ্রাম) ক্যামোমিল (এক ধরনের ফুল) চূর্ণ এবং এক চা চামচ প্রাকৃতিক মধু।

খাবারের নিয়ম
এই উপাদানগুলো ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হবে। এরপর ভালোভাবে চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে হবে। উল্লেখ্য, এটা খাওয়ার পর জুস, কমলা ও লেবু খেলে আরও ভালো ফল পাওয়া যাবে। ইনশাআল্লাহ ভবিষতে কালিজিরা নিয়ে আমার এক মজার অভিজ্ঞতা বলবো। সেটি পড়ে নিশ্চয়ই মজা করে বলবেন আরে এ দেখি কালিজিরা নিয়ে এক মহাকাব্য লিখে ফেললেন। আপনাদের ভিতর কবি মধুসূদন থাকলে নিশ্চয়ই কুরুক্ষেত্র বাধাবেন। অবশ্য সবশেষে নিশ্চয়ই আমার এ কথার সাথে সহমত হবেন: কালিজিরা হচ্ছে আমার সেরা ঔষধ আর এর প্রণেতা প্রফেট মুহাম্মদ সা. হচ্ছেন আমার বিশ্বসেরা ডাক্তার।

৩. করুণা (দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের শ্রেষ্ঠ-মডেল হিসেবে রাসূলের রাহমাতুল্লিল আলামিন হিসেবে ভূমিকা)
হ্যাঁ, মনে হয় জব্দ করা জাম্বিলের উত্তরটা শেষতক পেয়েই গেলাম!
এই মহোত্তম রাসূলের শানেইতো শেখ সাদী তার সেই জগদ্বিখ্যাত নাত রচনা করেছিলেন। নানা বর্ণনায় পাওয়া যায় প্রথম তিনটি লাইন শেষ হলে তিনি আর চতুর্থ লাইন মেলাতে পারছিলেন না। রাসূল সা. স্বপ্নে দেখা দিয়ে সাদীকে বলেছেন, ওগো সাদী শেষটা হবে- সাল্লুু আলাইহি ওয়া আলিহি।
সেই নাত লিখেই তিনি হলেন জগদ্বিখ্যাত।
কেন না আমাদের জাতীয় কবি গেয়েছেন;
মুহাম্মাদ এর নাম নাম জপে (দরুদ) ছিলি বুলবুলি তুই আগে
তাই কি রে তোর কণ্ঠেরই গান অমন মধুর লাগে।
ওরে গোলাপ নিরিবিলি নবীর কদম ছুঁয়ে ছিলি
তার কদমের খুশবু আজো তোর আতরে জাগে॥
আসলে রাসূলের খ্যাতি বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ। “আমি আপনার প্রশংসাকে সর্বব্যাপী ছড়িয়ে দেবো।” (সূরা আলাম নাশরাহ-৪ (মজার কথা এখানেও ৪) সুতরাং যে বা যারা রাসূলের গুণ ও সুন্নাহকে প্রচার করলো তারা প্রকারান্তরে আল্লাহর কাজকেই অনুসরণ করলো। তাই সাদীর নামও আজ জগৎময়। এমনকি বাংলার আনাচে কানাচে। মনে হয় কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে।
পরিশেষে, এই করোনাকালে যেন আমরা দৃঢ়ভাবে রাসূলের সুন্নাহকে গভীর ভালোবাসায় অনুসরণ করতে পারি।
যেটি ব্যতিরেকে কোনো বিখ্যাত ওয়ায়েজিন তার ওয়াজ শুরুই করতে পারেন না। চট্টলার প্যারেড গ্রাউন্ড ময়দান, খিলগাঁয়ের সমাজ কল্যাণ, খুলনার শহীদ হাদিস পার্কসহ সারা বাংলার হাজারো মাহফিলের লক্ষ-কোটি জনতার বিগলিত কণ্ঠে গেয়ে ওঠা শেখ সাদীর সেই শ্লোক দিয়েই আজকের যবনিকা টানা যাক।
বালাগাল উলা বিকামালিহি
কাশাফাদ্দুজা বি জামালিহি
হাসুনাৎ জামিয়ু খিসালিহি
সাল্লুু আলাইহি ওয়া আলিহি।
(রাসূল সা.-এর বলে দেয়া চতুর্থ লাইন)
আরে! সবশেষেও দেখছি সেই ৪ (ফোর)। ৪ (ফোর) একদম নাছোড়, হয়েছে সাথে জোড়, একই সাথে দিচ্ছে দৌড়।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply