কল্যাণ রাষ্ট্রগঠনে নবীজির আদর্শ -মাওলানা মুহাম্মদ রুহুল আমিন

আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামিন। আল আ’কিবাতু লিলমুত্তাকিন, ওয়া আ’লা আলিহি ওয়াআসহাবিহি আজমাইন। বিশ্ব নন্দিত নেতা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সা. এই দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মানুষ ও আল্লাহর প্রিয় রাসূল। আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে মানবজাতির হেদায়েতের জন্য তাঁর পক্ষ থেকে যেসব ব্যক্তিকে দুনিয়ায় প্রেরণ করেছেন হুজুর সা. হলেন তাদের অন্যতম। যাকে বলা হয় আশরাফুল আম্বিয়া সকল নবীর সর্দার। নবী-রাসূলগণ দুনিয়ায় আল্লাহর বার্তাবাহক, সমাজে দ্বীন প্রচার করাই ছিল তাঁদের কাজ। ‘দ্বীন’ অর্থ জীবনব্যবস্থা। আল্লাহর বান্দার জন্য আল্লাহর দ্বীন হলো সর্বোত্তম জীবনব্যবস্থা। মহানবীর সা. ওপর নাজিলকৃত আল্লাহর কিতাব ঐশিবাণী মহাগ্রন্থ আল কুরআন ও রাসূলের জীবনাদর্শ কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতিকে পথ দেখাবে। আল্লাহর নবী বলেছেন, “লান তাদিল্লু মা তামাস্সাকতুম বিহিমা কিতাবাল্লাহি ওয়া সুন্নাতি রাসুল” যারা আল্লাহর কিতাব ও তার রাসূলের আদর্শ অনুসরণ করবে তারা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। অতএব, যদি এ দু’টি জিনিস পৃথিবীর মানুষেরা মজবুতরূপে ধারণ করে, তাহলে তারা সঠিক পথ অনুসরণ করে চলতে পারবে। অন্যথায় তারা হবে বিভ্রান্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত। তাই আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহ বা জীবনাদর্শ সঠিক রূপে মেনে চলা প্রত্যেকের ওপর আবশ্যকীয় কর্তব্য। আল্লাহপাক সূরা আহজাবের ২১ নম্বর আয়াতে বলেন, ‘তোমাদের জন্য রাসূলের জীবনে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।’ আল্লাহর হাবিব রাসূল সা. এই দুনিয়ার সেরা মানুষ। তাঁর চরিত্র ছিল সর্বোত্তম। তিনি সকলের আদর্শ। স্বয়ং আল্লাহ তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, ‘তুমি অবশ্যই সর্বোত্তম চরিত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত।’ (সূরা কলম-৪) সমাজের খারাপ অবস্থা ও মানুষের দুর্দশা দেখে মহানবী সা. ব্যথিত হন। শৈশব থেকেই তিনি এ অবস্থার পরিবর্তন সাধনের উপায় নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেন। এ উদ্দেশ্যে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি তাঁর মতো কতিপয় কিশোর-যুবককে নিয়ে ‘হিলফুল ফুজুল’ নামে একটি সংগঠন কায়েম করেন। এ সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সমাজের দুর্বল, নিরীহ, দরিদ্র, বিধবা ও অসহায় নির্যাতিত, নিপীড়িত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত মানুষকে সাহায্য করা, অন্যায়-দুষ্কর্ম প্রতিরোধ করা এবং মানুষে মানুষে সম্প্রীতি ও সমাজে শান্তি এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। নবুওয়ত লাভের আগ পর্যন্ত দীর্ঘ তেইশ বছর তিনি এভাবে সমাজের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করেন। নবুওয়ত লাভের পর তিনি মানুষের কাছে আল্লাহর দ্বীন প্রচার শুরু করেন। নবুওয়তি জিন্দেগির তেইশ বছর তিনি দ্বীন প্রচারের কাজে সর্বাত্মকভাবে নিয়োজিত থাকেন। তিনি মদিনার সকল অধিবাসীকে নিয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখার উদ্দেশ্যে সকলের সম্মতিতে ঐতিহাসিক মদিনা সনদ ঘোষণা করেন। এ সনদের ভিত্তিতেই সেখানে একটি রাষ্ট্র গড়ে ওঠে, যার নেতা নির্বাচিত হন স্বয়ং বিশ্বনবী রাহমাতুললিল আ’লামিন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.। আল্লাহর হাবিব জনাবে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা. ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে সে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। দুনিয়ায় সেটাই প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র এবং বিশ্বের সকল মুসলমানের জন্য একটি আদর্শ ও অনুসরণযোগ্য রাষ্ট্রব্যবস্থা। মহানবী সা. সেখান থেকে সারা দুনিয়ায় ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেন। ফলে ক্রমান্বয়ে সমগ্র বিশ্বে ইসলাম এক বিজয়ী আদর্শরূপে প্রতষ্ঠিত হয়। মহানবী সা. একজন মানুষ এবং আল্লাহর রাসূল। তিনি ছিলেন আদর্শ নেতা ও মানবজাতির মহান শিক্ষক। নবীজি বলেছেন, “বুয়িসতু মুয়াল্লিমান”। আমি প্রেরিত হয়েছি শিক্ষক হিসেবে। তিনি দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন এবং সে দ্বীনের আলোকে নিজের জীবন, পরিবার, সমাজ-রাষ্ট্র ইত্যাদি সব কিছু পরিচালনা করেছেন। রাষ্ট্র পরিচালক, সমরনায়ক, সমাজপতি, বিচারক, নীতিনির্ধারক ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন আদর্শ ব্যক্তি। ব্যক্তিগত জীবনে স্বামীর আদর্শ, সেনাপতির আদর্শ, পিতার আদর্শ, বন্ধুর আদর্শ, প্রতিবেশীর আদর্শ, রাষ্ট্রপতিরও আদর্শ। তাঁর মহান চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ নিখুঁত ও সকলের নিকট প্রশংসনীয়। প্রকৃতপক্ষে তাঁর সান্নিধ্যে যাঁরা এসেছেন, তারা সকলেই তাঁর চরিত্র-মাহাত্ম্যে মুগ্ধ ও অভিভূত হয়েছেন। তলোয়ার হাতে তাঁকে খুন করতে এসেও তাঁর ব্যবহারে, আদর্শে মুগ্ধ হয়ে তলোয়ার ফেলে দিয়ে কালেমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেছেন। তাঁর মহত্ত্ব, উদারতা, ন্যায়পরায়ণতা ও মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে তাঁর প্রচারিত কুরআনের ফায়েজ ও বরকতে হজরত উমরের মতো কঠিন দিলের মানুষও একইভাবে তলোয়ার ফেলে মুসলমান হয়ে শ্রেষ্ঠ মানবিক গুণের অধিকারী হয়েছেন। শত বাধা-বিপত্তি ও বিপদসঙ্কুল পথ পাড়ি দিয়ে অত্যল্পকালের মধ্যে ইসলামকে বিজয়ী আদর্শরূপে প্রতিষ্ঠিত করা এবং দুনিয়ার সকল অন্ধকার ও ভ্রান্ত মতবাদের ওপর আল্লাহর দ্বীনকে চূড়ান্তরূপে বিজয়ী করার জন্য যে দু’টি জিনিস সহায়ক ছিল তার একটি মহাগ্রন্থ আল কুরআন এবং অন্যটি কুরআনের দীপ্ত আলোয় উদ্ভাসিত সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব নবী মুহাম্মদের সা. জীবনাদর্শ।

SHARE

Leave a Reply