কাজী নজরুল ইসলামের বিশ্বাস -মোশাররফ হোসেন খান

কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) একটি মন্তব্য নিয়ে প্রগতিবাদীরা (?) এবং তার  বাইরের অনেকেই প্রায় সময় বিভ্রান্তিমূলক একটি ধূম্রজাল সৃষ্টি করেন। তথাকথিত প্রগতিবাদীরা সেটা করেন ইচ্ছা করে, অর্থাৎ সাহিত্য থেকে আদর্শ-ঐতিহ্যাশ্রিত বিষয়কে ছেঁটে ফেলে দেয়ার জন্য। কিন্তু তার বাইরের যারা, তারা নজরুলের এই মন্তব্যটি তুলে ধরেন সম্ভবত না বুঝেই। মন্তব্যটি হল-ইবরাহীম খাঁর (১৮৯৪-১৯৭৪) সেই গুরুত্বপূর্ণ, ঐতিহাসিক চিঠির জবাবের এক জায়গায় ১৯২৭ সালে নজরুল লিখেছিলেন :
“ইসলাম ধর্মের সত্য নিয়ে কাব্যরচনা করা চলতে পারে, কিন্তু তার শাস্ত্র নিয়ে চলবে না। ইসলাম কেন, কোন ধর্মেরই শাস্ত্র নিয়ে কাব্য লেখা চলে বলে বিশ্বাস করি না। ইসলামের সত্যিকার প্রাণশক্তি : গণশক্তি, গণতন্ত্রবাদ, সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব ও সমানাধিকারবাদ।
ইসলামের এই অভিনবত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব আমি তো স্বীকার করিই, যারা ইসলাম ধর্মাবলম্বী নন, তারাও স্বীকার করেন। ইসলামের এই মহান সত্যকে কেন্দ্র করে কাব্য কেন, মহাকাব্য সৃষ্টি করা যেতে পারে। আমি ক্ষুদ্র কবি, আমার বহু লেখার মধ্য দিয়ে আমি ইসলামের এই মহিমাগান করেছি। তবে কাব্যকে ছাপিয়ে ওঠেনি সে গানের সুর। উঠতে পারেও না। তাহলে তা কাব্য হবে না। আমার বিশ্বাস, কাব্যকে ছাপিয়ে উদ্দেশ্য বড় হয়ে উঠলে কাব্যের হানি হয়।”
কাজী নজরুলের ওপরের ওই বক্তব্যের, ‘ইসলাম ধর্মের সত্য নিয়ে কাব্যরচনা করা চলতে পারে, কিন্তু তার শাস্ত্র নিয়ে চলবে না’-এই অংশটুকুই কেবল এক শ্রেণীর লেখক, সমালোচক এমনকি বক্তারাও বেশ কৌতুকের সাথে তুলে ধরেন। বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। সুতরাং এ নিয়ে কিছুটা আলোচনা করা জরুরি বলে মনে করছি।
প্রথম কথা হলো, নজরুল ইসলাম ইবরাহীম খাঁর ঐ চিঠিটা পান ১৯২৫ সালে। তার চিঠি পাবার তিন বছর আগেই, ১৯২২ সালে প্রকাশিত হয় নজরুলের সেই ভুবন কাঁপানো কবিতা-‘বিদ্রোহী’। ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশের পরপরই পাঠকদের মধ্যে যে কী পরিমাণ সাড়া পড়ে গিয়েছিলো, বোধ করি সে কথা কারুরই অজানা নেই। একটি কবিতার জন্য যখন পাঠকদের মধ্যেই বিরাজ করে টান টান উত্তেজনা, তখন সেই কবিতা রচয়িতার মধ্যে কী পরিমাণ এবং কতটা আবেগ-উত্তেজনা বেড়ে যেতে পারে-সেটা কল্পনাতীত ব্যাপার।
১৯২৫ সালে, যখন ইবরাহীম খাঁর চিঠি পান নজরুল, তখন নজরুলের পরিচালনায় প্রকাশিত হচ্ছে ‘লাঙল’ পত্রিকা। এ বছরই প্রকাশিত হলো তার-‘পুবের হাওয়া’ (কবিতা), ‘রিক্তের বেদন’ (গল্প), ‘সাম্যবাদী’ (কবিতা), ‘চিত্তনামা’ (কবিতা)। অর্থাৎ মোট চারখানি গ্রন্থ’।
নজরুলের বয়স তখন কত? নজরুল তখন পা রেখেছেন (১৮৯৯-১৯২৫) ছাব্বিশ বছরে। আর বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশের সময় তার বয়স ছিল (১৮৯৯-১৯২২) তেইশ বছর। আমাদের কালেও ঐ তেইশ কিংবা ছাব্বিশ বছর বয়সী যে কাউকেই যুবক বলে অভিহিত করে থাকি। কিন্তু নজরুল বলে কথা, তিনি শুধু যুবকই ছিলেন না, ছিলেন যুবরাজ। সুতরাং তার ভেতর তখন কেবল টগবগ করে ফুটছে তারুণ্যের তেজ। একটু খেয়াল করলেই বুঝা যাবে, তখন-তিনি কী লিখছেন, আর কী ধরনের গ্রন্থ একের পর এক প্রকাশিত হচ্ছে!
১৯২২ সালে, নজরুলের বয়স যখন মাত্র তেইশ বছর, তখনই প্রকাশিত হলো তার সেই বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ’-‘অগ্নিবীণা’। এ বছরই বেরুল ‘ব্যথার দান’ (গল্প) এবং প্রবন্ধগ্রন্থ’-‘যুগবাণী’। ১৯২৩ সালে প্রকাশিত হলো তার প্রবন্ধগ্রন্থ’-‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ এবং কাব্যগ্রন্থ’- ‘দোলনচাঁপা’। ১৯২৪-এ বেরুল ‘বিষের বাঁশী’, ‘ভাঙার গান’ এবং ‘ছায়ানট’। ১৯২৬। এ বছরও বেরুল নজরুলের তিনখানি গ্রন্থ’-‘সর্বহারা’, ‘দুর্দিনের যাত্রী’ এবং ‘ঝিঙেফুল,’ সেই ১৯২৭ সালে, সে বছর প্রকাশিত হলো তার ‘ফনি-মনসা,’ ‘সিন্ধু-হিন্দোল’ এবং ‘বাঁধনহারা’। বলা যায়, নজরুল এই সময়কালে পার হচ্ছেন একের পর এক সাফল্যের পর্বত।
ইবরাহীম খাঁর চিঠি পাবার (১৯২৫-১৯২৭) পর নজরুল কেন জবাব দিতে দু’বছর সময় নিলেন? এ বিষয়টির প্রতি নজরুল গবেষকদের দৃষ্টি দেয়া দরকার। তবে মনে করি, খাঁ সাহেবের চিঠি পাওয়ার পর থেকেই নজরুলের ভেতর একধরনের পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করে। যদিও ১৯২৮ সালে প্রকাশিত হয়-‘জিঞ্জির,’ ‘সঞ্চিতা,’ ‘বুলবুল,’ এবং ১৯২৯ সালে-‘চক্রবাক,’ ‘সন্ধ্যা’ ও ‘চোখের বালি’। তবুও ধরে নেয়া যায়-নজরুলের চিন্তাগত টার্নিংপয়েন্ট হলো-১৯৩০। লক্ষণীয় বিষয় বটে, ১৯৩০ সালে ‘প্রলয়-শিখা,’ ‘নজরুল গীতিকা,’ ‘চন্দ্রবিন্দু,’ ‘মৃত্যুক্ষুধা’ প্রকাশের সাথে সাথে আর একটি-নজরুলের প্রথম অনূদিত গ্রন্থ’ প্রকাশিত হল-‘দীওয়ান-ই-হাফিজ’-এর কাব্যানুবাদ। আর তার এই চিন্তাগত পরিবর্তনের উজ্জ্বল সফল পরিণতি লাভ করেছে, ১৯৩৩ সালে, ‘কাব্য আমপারার’ কাব্যানুবাদের মাধ্যমে। নজরুলের সুস্থাবস্থায়, ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত তার গ্রন্থ’ প্রকাশের এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল।
কিন্তু কথা হলো, ১৯২৭ সালে নজরুল ইসলাম ইবরাহীম খাঁর চিঠির জবাবে যা বলেছিলেন, তখনকার সেই সাহিত্য বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত তিনি স্থির থাকেননি। সেখান থেকে, সেই বিবেচনা থেকে তিনি সরে এসেছিলেন পরিণত এক সুদৃঢ় বিবেচনায়। কাব্য আমপারার ভূমিকাংশের দিকে দৃষ্টি দিলে এই সত্যতার সাথে আমরা আরও বেশি করে পরিচিত হতে পারি। মে, ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত ঐ কাব্য আমপারার ভূমিকায়, নজরুল ইসলাম যেটাকে ভূমিকা না লিখে, লিখেছিলেন- ‘আরজ,’ সেখানে বলছেন :
“আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সাধ ছিল পবিত্র কুরআন শরীফের বাংলা পদ্যানুবাদ করা। সময় ও জ্ঞানের অভাবে এতদিন তা করে উঠতে পারিনি। বহু বছরের সাধনার পর খোদার অনুগ্রহে অন্তত পড়ে বুঝবার মতো আরবি-ফার্সি ভাষা আয়ত্ত করতে পেরেছি বলে নিজেকে ধন্য মনে করছি।
কুরআন শরীফের মতো মহাগ্রন্থের অনুবাদ করতে আমি কখনও সাহস করতাম না বা তা করবারও দরকার হতো না- যদি আরবি ও বাংলা ভাষায় সমান অভিজ্ঞ কোন যোগ্য ব্যক্তি এদিকে অবহিত হতেন।
ইসলাম ধর্মের মূলমন্ত্র-পুঁজি, ধনরত্ন মনি-মাণিক্য সবকিছু-কুরআন মজিদের মনি-মঞ্জুষায় ভরা, তাও আবার আরবি ভাষায় চাবি দেয়া। আমরা বাঙালি মুসলমানেরা তা নিয়ে অনুভক্তি ভরে কেবল নাড়াচাড়া করি।
ঐ মঞ্জুষা যে কোন মণিরতেœ ভরা, তার শুধু আভাসটুকু জানি। আজ যদি আমার চেয়ে যোগ্যতর ব্যক্তিগণ এই কুরআন মজিদ, হাদিস, ফেকা প্রভৃতি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন তাহলে বাঙালি মুসলমানের তথা বিশ্বমুসলিম সমাজের অশেষ কল্যাণ সাধন করবেন। অজ্ঞান-অন্ধকারের বিবরে পতিত বাঙালি মুসলমানদের তাঁরা বিশ্বের আলোক অভিযানের সহযাত্রী করার সহায়তা করবেন। সে শুভদিন এলে আমার মতো অযোগ্য লোকও এ বিপুল দায়িত্ব থেকে সানন্দে অবসর  গ্রহণ করবে।”
নজরুল ইসলাম ‘কাব্য আমপারা’র জন্য যে সকল গ্রন্থের সাহায্য নিয়েছিলেন, সে সবের মধ্যে আছে বাংলা, আরবি, ইংরেজি, ফার্সি ভাষার বহু তাফসির এবং অন্যান্য সহায়ক গ্রন্থাদি। তার অনূদিত এই কাব্য আমপারার প্রতিটি শব্দ প্রয়োগ, অনুবাদ প্রভৃতি যথাযথ কি না সেসব বিবেচনার জন্য মোট বার দিনে, বারটি অধিবেশন বসেছিল। এইসব অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন সেই সময়কার বিখ্যাত সব আলেম-উলামা। তাদের প্রতি নজরুলের শ্রদ্ধাবোধ কেমন ছিল? কিছুটা জানা যাক সেই অধিবেশনে অন্যতম অংশগ্রহণকারী মাহফুজুর রহমানের ভাষায়। তিনি বলছেন:
কবির ‘আমপারা’র বঙ্গানুবাদ নিয়া আলোচনার প্রারম্ভেই ভূমিকাস্বরূপ উপস্থিত সবাইকে সম্বোধন পূর্বক তিনি বলিতে লাগিলেন, তফসীরকারকগণ নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গিতে অনুবাদ করেছেন। কেউ বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে, কেউ দার্শনিক ভিত্তিতে, কেউ ধর্মীয় ভিত্তিতে, কেউ সাহিত্যিক ভিত্তিতে। অবশ্য সকলেই মূলের দিকে সজাগ দৃষ্টি রেখেছেন।
আমার অনুবাদেও আমি মূলের দিকে বিশেষ সজাগ দৃষ্টি রেখে হাত দিয়েছি।…আপনারা লক্ষ্য রাখবেন আরবি শব্দের বাংলা অনুবাদ যথাযথ হয়েছে কি না এবং অর্থের দিক দিয়ে কোন ব্যতিক্রম ঘটেছে কি না। অনুবাদ ঠিক মতো হয়ে গেলে তা বাংলা ভাষায় কাব্যে ফুটিয়ে তুলতে কোনো অসুবিধা নেই।…
আপনাদের পান্ডিত্যের মাপকাঠিতে আরবি ভাষার বাংলা অনুবাদ আমার ‘কাব্য আমপারার’ যেখানে যেখানে আপনারা সংশোধন করার দরকার বলে সর্বসম্মত স্থির সিদ্ধান্ত নেবেন, আমি আনন্দের সঙ্গে তা নিশ্চয়ই মেনে নেবো।”
নজরুল ইসলাম তার এই কাব্য আমপারার ‘আরজ’-এর শেষে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন-‘খাদেমুল ইসলাম’ হিসেবে। আর এটাকে তিনি উৎসর্গ করেন- ‘বাংলার নায়েবে নবী মৌলভী সাহেবানদের/দস্তমোবারকে’।
কল্পনা করা যায়, নজরুল কাব্য আমপারার জন্য কী পরিমাণ পরিশ্রম করেছিলেন! কিভাবে নিজেকে যোগ্য করে তুলেছিলেন! প্রয়োজনীয় আরবি, ফারসি গ্রন্থ ছাড়াও তিনি এই কাজের জন্য সাহায্য নিয়েছিলেন বহু ইংরেজি গ্রন্থেরও। তার ভাষায় :
“আমি এই অনুবাদে যে যে পুস্তকের সাহায্য গ্রহণ করেছি নিচে তার তালিকা দিলাম-
Sales Quran, Moulana Md Alis Auran, Tofsir-i-Hosoiny, Tofsir-i-Baizabi, Tofsir-i-Kabiri, Tofsir-i-Azizi, Tofsir-i-Moulana Abul Hoque Dehlavi, Tofsir-i-Jalalain, etc. এবং মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খান ও মাওলানা রুহুল আমীন সাহেবের আমপারা।”
কাজী নজরুল ইসলাম যখন ‘কাব্য আমপারা’ অনুবাদ করেন এবং তার আরজ-এ যখন এমনি হৃদয় নিংড়ানো, অকৃত্রিম উচ্চারণ করেন তখন তার বয়স ছিল (১৮৯৯-১৯৩৩) চৌত্রিশ বছর। এই ‘আরজ’-এর মাধ্যমে নজরুলের সাহিত্যচিন্তা এবং অন্তর্গত পরিবর্তনটাও লক্ষণীয় বিষয়। এখানেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, নজরুল যৌবনে, আটাশ (১৮৯৯-১৯২৭) বছর বয়সে ইবরাহীম খাঁর চিঠির জবাবে যা বলেছিলেন, তিনিই আবার তার যৌবনোত্তরে (১৮৯৯-১৯৩৩), চৌত্রিশ বছর বয়সে তার সেই বিবেচনাকে অগ্রাহ্য করে নতুন এক কাব্য, দর্শনে প্রবেশ করেছেন।
আমরা জানি, কোনো কবিই সাহিত্য সম্পর্কে কোনো বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত স্থির থাকেন না। একেক সময় মত বা সিদ্ধান্ত ভাঙেন আবার নতুন করে নির্মাণ করেন। নজরুলের চিন্তাগত এবং কাব্যদর্শনের পরিবর্তনও এই ধারাবাহিকতারই অনন্য দৃষ্টান্ত। এবং সেটা বোধ করি একমাত্র নজরুলের পক্ষেই সম্ভবপর ছিল। যাপিত জীবনে যেমন নজরুল এক জায়গায় স্থির ছিলেন না, তেমনি ছিলো না সাহিত্য চিন্তার ক্ষেত্রেও। নিয়ত ভাঙা-গড়াই ছিল তাঁর স্বভাব।
নজরুল ইসলাম অসুস্থ হয়ে পড়েন ১৯৪২ সালে। তখন তার বয়স হয়েছিল (১৮৯৯-১৯৪২) মাত্র তেতাল্লিশ বছর। এরপরও তিনি অসুস্থাবস্থায় বেঁচে ছিলেন (১৮৯৯-১৯৭৬) চৌত্রিশ বছর। তিনি যদি তার জীবনের এই শেষের সুদীর্ঘ চৌত্রিশ বছর সৃষ্টিশীল থাকতে পারতেন, তাহলে ধরে নেয়া যায়, তিনি ‘খাদেমুল ইসলাম’ হিসেবেই তার জীবনকে উৎসর্গ করতেন। কারণ, বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে যে কোনো মানুষেরই প্রজ্ঞা, বুদ্ধি, বিবেচনা, কর্মপদ্ধতি কিংবা চিন্তাগত পরিবর্তন এবং পরিপক্বতা লাভ করে অনেক বেশি। সুতরাং নজরুলও যে ধর্মীয় শাস্ত্র, নিয়ে কাব্যসাহিত্য সৃষ্টি করতেন না-এ কথা বলার আর কোনো অবকাশই থাকছে না।
ইসলাম নিয়ে, ইসলামের মহত্ত্ব নিয়ে, ইসলামের বাহ্যিক এবং অন্তর্গত দিক নিয়ে নজরুল তার কবিতায় এবং গানে যেভাবে উপস্থিত আছেন, বোধ করি ইসলামের ধর্মীয় শাস্ত্র নিয়েও নজরুল সে রকম অমর পঙ্ক্তি রচনা করতে পারতেন। সেই আকাক্সক্ষাও তিনি ব্যক্ত করেছেন তার বিভিন্ন ভাষণে এবং লেখায়। ‘কাব্য আমপারার’ ‘আরজে’ও তার স্বাক্ষর মিলছে। সুতরাং আজকে যারা ‘ধর্মীয় শাস্ত্র নিয়ে কাব্য রচনা চলবে না’-বলে নজরুলের এই মন্তব্য তাদের সপক্ষে যেখানে সেখানে উদ্ধৃতি হিসেবে ব্যবহার করেন, তারা মূলত এটাই বুঝাতে চান যে, ‘নজরুলও যেমন বলেছেন, ইসলাম, এবং ইসলামের ধর্মীয় শাস্ত্র নিয়ে আর যাই হোক সাহিত্য করা চলে না।’ যারা এমনটি মনে করেন, তারা এক দিকে যেমন নিজেরা অজ্ঞতার পরিচয় দেন, অপর দিকে তাদের সেই অজ্ঞতার কারণে নজরুলকেও অহেতুক বিতর্ক ও বিভ্রান্তির মধ্যে টেনে আনেন।
ধর্মীয় শাস্ত্র নিয়ে কি কাব্য সাহিত্য রচিত হতে পারে না? নিশ্চয়ই পারে। এমন দৃষ্টান্ত বিরল নয়। নজরুলেও আছে। কিন্তু সেসব আমরা ভুলে যাই বেমালুম। সাহিত্যে উদারতার স্থান আছে। কিন্তু উদারতা আর উদাসীনতা এক কথা নয়। নজরুলবিবেচনায় আমরা উদারতার চেয়ে উদাসীনতারই আশ্রয় নিয়ে থাকি অনেক বেশি। এটাই সম্ভবত প্রধানতম ক্ষতির কারণ।
আমাদের এটা পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে যে, নজরুল শেষ পর্যন্ত তার ওই বিবেচনায় স্থির থাকেননি। সুস্থাবস্থায় এবং সৃষ্টিশীল থাকলে হয়তোবা নজরুলই আবার দেখিয়ে দিয়ে যেতেন যে কিভাবে ইসলামের শাস্ত্র নিয়ে কালজয়ী কাব্য-সাহিত্য রচিত হতে পারে। সন্দেহ নেই, নজরুল তার পরিণত বয়সে এই আলোকিত বিশ্বাসের ওপরই দাঁড়িয়েছিলেন, স্থির হয়েছিলেন।

একটি বিষয়ে আমাদের খেয়াল রাখা দরকার। সেটা হলো- নজরুলকে বিবেচনা করার সময়, তাকে মূল্যায়নের সময় অবশ্যই তার বয়স, তার পরিবেশ, প্রেক্ষাপট, কাল এবং কালের পরম্পরাকেও আমাদের সামনে রাখতে হবে। তা না হলে নজরুল সংক্রান্ত কোনো বিবেচনাই পূর্ণ, শুদ্ধ কিংবা নির্ভুল হয়ে উঠবে না। এবং সেখানেই অপব্যাখ্যার কালোছায়া নেমে আসার সমূহ সম্ভাবনা দেখা দেবে। যেমনটি হচ্ছে নজরুলের ক্ষেত্রে, প্রায়ই। যতদ্রুত সম্ভব এসব বিভ্রান্তির অবসান হওয়া উচিত বলে মনে করি। মূলত বিশ্বাসের বিভায় ভাস্বর ছিলেন অমর কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
লেখক : কবি; কথাশিল্পী

SHARE

Leave a Reply