কাজী নজরুল ইসলাম শেকড়ের সংগ্রামে লড়াকু সৈনিক -এবনে গোলাম সামাদ

কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) বেঁচে ছিলেন অনেক দিন। কিন্তু তাঁর সাহিত্য-জীবন ছিল মাত্র ২৩ বছর। নজরুল ইসলাম ১৯৪২ সালে গুরুতরভাবে মানসিক রোগে আক্রান্ত হন। হারিয়ে ফেলেন তাঁর সব চিন্তা-শক্তি। বলা যায় তিনি হয়ে পড়েছিলেন কার্যত উন্মাদ। কেন এ রকম ঘটেছিল তা আমরা জানি না। কিন্তু ঘটেছিল। শেখ মুজিবুর রহমান এই অসুস্থ কবিকে নিয়ে আসেন কলকাতা থেকে ঢাকায়। তাঁকে দেন নাগরিকত্ব। কেন শেখ মুজিবুর রহমান এটা করেন সেটা বিশ্লেষণ সাপেক্ষ। মনে হয় তিনি ভাবেন যে, এর ফলে বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদ পাবে উৎসাহ। যার মধ্যে সম্পৃক্ত থাকবে একটা মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবোধ। যেমন থাকতে দেখা যায় কাজী নজরুল ইসলামের লেখা এক পর্যায়ের কবিতা ও গানের মধ্যে:
বাজল কিরে ভোরের সানাই
নিদ মহলের আঁধার পুরে।
শুনছি আযান গগনতলে
অতীত রাতের মিনার চূড়ে ॥
দুইজন বাংলা সাহিত্যে ব্রিটিশবিরোধী লেখার জন্য জেল খেটেছেন। এরা দুইজনই হলেন ধর্মবিশ্বাসে মুসলমান। এদের একজন হলেন সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী (১৮৭০-১৯৩১) আর একজন হলেন কাজী নজরুল ইসলাম (নজর-উল-ইসলাম)। ইসমাইল হোসেন সিরাজী এক বছর জেল খাটেন তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘অনল প্রবাহ’ (১৯০০) লিখবার জন্য। সিরাজী সাহেব জন্মেছিলেন সিরাজগঞ্জে। তাই তিনি নামের শেষে লিখতেন সিরাজী। এর সঙ্গে পারস্যের বিখ্যাত সিরাজ শহরের কোনো যোগাযোগ ছিল না। সিরাজগঞ্জ শহর প্রতিষ্ঠা করেন সিরাজ আলী নামে একজন জমিদার। পরে তা পরিণত হয় বিরাট পাট কেনা-বেচার গঞ্জে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় পাটের গঞ্জ ছিল নারায়ণগঞ্জ। তার পরেই উল্লেখ করতে হয় সিরাজগঞ্জের নাম। সিরাজগঞ্জে বাস করেছেন অনেক সচ্ছল মুসলিম পরিবার। সিরাজগঞ্জ ছিল একটি মুসলিম জনসমষ্টি প্রধান জায়গা।১
সিরাজী সাহেব অনেক বই লিখেছেন। কাব্য, প্রবন্ধ, উপন্যাস। তাঁর গদ্য ছিল খুবই সুসংগঠিত। সিরাজী সাহেবের এসব বই সে যুগে মুসলিম সমাজে সৃষ্টি করেছিল বিশেষ মানসিক জাগরণ। ১৯১৪ সালে বলকান যুদ্ধের সময় সিরাজী যান তুরস্কে। তিনি বলকান যুদ্ধে তুরস্কের সুলতান খলিফার পক্ষ নিয়ে করেন যুদ্ধ। দেশে ফিরে তুরস্ক সম্পর্কে বাংলা ভাষায় লিখেন প্রবন্ধগ্রন্থ। মোস্তফা কামাল পাশা (১৮৮০-১৯৩৮) তুরস্কে ক্ষমতায় আসার পর তিনি হয়ে ওঠেন মোস্তফা কামাল পাশার বিশেষ ভক্ত। আমরা নজরুলের কথা আলোচনা করতে গিয়ে সিরাজীর কথা টানছি। কারণ, নজরুল নিজেই বলেছেন, তাঁর সাহিত্য চর্চার প্রেরণা এসেছিল সিরাজীর লেখা পড়ে। তিনি অকুণ্ঠভাবে সিরাজীর চিন্তা-চেতনা ও লেখার কাছে তাঁর ঋণ স্বীকার করেছেন। নজরুল খেলাফত আন্দোলনের সময় তাতে অংশ নেন। কিন্তু মোস্তফা কামাল ক্ষমতায় আসার পর হয়ে ওঠেন কামালের বিশেষ ভক্ত। কামালকে নিয়ে লেখেন তাঁর একটি বিখ্যাত কবিতা, ‘কামাল পাশা’ নামে। বাংলার মুসলমান ইসলামী আবেগসম্পন্ন হলেও ধর্ম বিশ্বাসের ক্ষেত্রে দেখাতে চাননি অচল গোঁড়ামি। তারা পরিচয় দিয়েছেন অনেক খোলা মনের। গ্রহণ করতে চেয়েছেন আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানকে।
বাংলা গান বাংলা সাহিত্যের অংশ হিসাবেই গড়ে উঠেছে। বাংলা ভাষার কবিরা বাংলায় গান লিখেছেন। দিয়েছেন সুর। এসব গানকে কবিতা হিসাবে পড়েও তৃপ্তি পাওয়া যায়। বাংলা গান, যাকে বলে সাধারণভাবে কথাপ্রধান। আর এক কথায়, কাব্য-সঙ্গীত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) গান লিখেছেন এবং তিনি তাঁর গানে সুর দিয়েছেন। তাঁর গানের সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। তিনি গান লিখেছেন ও সুর দিয়েছেন ৬১ বছর ধরে। প্রতি বছর তিনি গড়ে গান লিখেছেন ও সুর দিয়েছেন প্রায় ৪১টি। অন্য দিকে নজরুলের সাহিত্য-জীবন ছিল মাত্র ২৩ বছর। নজরুলের লেখা ও সুর দেয়া গানের সংখ্যা এখনও নির্ণয় করা যায়নি। তবে এদের সংখ্যা তিন হাজারের কম নয়। বছরে নজরুল লিখেছেন ও সুর দিয়েছেন প্রায় ১৩০টি গানে। গানের ভুবনে নজরুলের অবদান অন্য কবিদের চাইতে কিছু মাত্র কম নয়। নজরুলকে বলা হয় বিদ্রোহী কবি। কিন্তু তাঁর গানে কেবল সামাজিক অন্যায় অবিচার ও বিদেশী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বাণী ধ্বনিত হয়নি। তাঁর গানে রূপ পেয়েছে নর-নারীর ভালোবাসা আবেগ। ধরা পড়েছে নিসর্গ প্রীতি।
নজরুলের সাহিত্য-কৃতী নিয়ে আলোচনা করবার মতো যথেষ্ট জ্ঞান বর্তমান লেখকের নাই। সে চেষ্টাও তিনি তাই করছেন না। তিনি কেবল বোঝাতে চাচ্ছেন যে, কবি নজরুল আমাদের জাতিসত্তা গঠনে রেখেছেন যথেষ্ট প্রভাব। শেখ মুজিব পেরেছিলেন এটা উপলব্ধি করতে। তিনি নজরুলকে ঠিক বাংলাদেশের জাতীয় কবি বলে ঘোষণা করে যাননি। কিন্তু নজরুল যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন রাষ্ট্রিকভাবে তাঁর বাড়িতে (কবি ভবন) ওঠানো এবং নামানো হয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। বাজানো হয়েছে কুচকাওয়াজ সঙ্গীত। এটা প্রায় তাঁকে জাতীয় কবি বলে স্বীকৃতি দেয়ার শামিল বলেই মনে করা চলে।
বাংলাভাষাভাষী অঞ্চলে নজরুলকে নিয়ে এখন যত আলোচনা হচ্ছে, আগে তা হয়নি। ২০০২ সালে পশ্চিমবঙ্গের বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশ করা হয়েছে নজরুলের জীবনী। জীবনীটি লিখেছেন অরুণ কুমার বসু। বইটি ৬১৫ পৃষ্ঠার। বাংলাদেশে নজরুল নিয়ে এমন বিশদ জীবনী এখনও কেউ রচনা করেননি। তবে নজরুলের জীবনের এতসব খুঁটিনাটি ঘটনা তাঁর সাহিত্যকে উপভোগ করবার জন্য জানবার প্রয়োজন পড়ে না। একজন সাহিত্যিকের সাহিত্যকে উপভোগ করতে হলে তাঁর জীবনের সেসব ঘটনাকে অবগত হতে হয়, যা তার সাহিত্য সৃষ্টিকে প্রভাবিত করেছে।
নজরুল জন্মেছিলেন পশ্চিমবঙ্গে। কিন্তু তিনি বিবাহ করেছিলেন পূর্ববঙ্গে। ১৯২১ সালের এপ্রিল-জুন মাসের দিকে নজরুল মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে গ্রন্থ প্রকাশক আলী আকবর খানের সঙ্গে পরিচিত হন। তার সঙ্গেই তিনি প্রথম কুমিল্লার বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়িতে আসেন। আর এখানেই তিনি পরিচিত হন প্রমীলা দেবীর সাথে। পরে যার সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। তবে এর আগে নজরুলের বিবাহ হয় আলী আকবর খানের ভগ্নী নার্গিস আসার খানমের সঙ্গে। কিন্তু আলী আকবর খান দাবি করেন, নজরুলকে থাকতে হবে ঘরজামাই। নজরুল এতে রাজি হন না। ফলে ঐ বিয়ে ভেঙে যায়।২ নজরুল জন্মেছিলেন রাঢ় অঞ্চলে। কিন্তু তাঁর জীবনের একটা বড় অংশ কেটেছে পূর্ববঙ্গে। পূর্ববঙ্গের নিসর্গ ফেলেছে তাঁর কবিতায় ছাপ। নজরুল ভাটিয়ালি সুরে গান বেঁধেছেন। এই সুরের উদ্ভব হয়েছে পূর্ববঙ্গের মাঝি-মাল্লাদের কণ্ঠে।

তথ্যসূত্র
১. বিখ্যাত পাটিগণিত রচয়িতা যাদবচন্দ্র চক্রবর্তী (১৮৫৫-১৯২০) জন্মেছিলেন সিরাজগঞ্জ শহরে। তিনি গণিতে অধ্যাপনা করেন একটানা ২২ বছর আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে। হন ঐ বিশ^বিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার। আলীগড় থেকে অবসর নিয়ে তিনি সিরাজগঞ্জে ফিরেন ১৯১৬ সালে। তিনি সিরাজগঞ্জে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে সিরাজগঞ্জ মিউনিসিপালিটির চেয়ারম্যান হন। কবি রজনীকান্ত সেন (১৮৬৫-১৯১০) জন্মেছিলেন সিরাজগঞ্জের ভাঙ্গাবাড়ি গ্রামে। সেখান থেকে এসে রাজশাহীতে আরম্ভ করেন ওকালতি। সেই সঙ্গে সাহিত্য চর্চা। অর্থাৎ সিরাজগঞ্জ এক সময় হয়ে উঠেছিল এদেশের একটি বিশেষ সংস্কৃতি কেন্দ্র।
২. দ্রষ্টব্য: ড. আবুল আজাদ-এর লিখিত ‘নজরুল জীবনে নারী ও প্রেম’ গ্রন্থ।

লেখক : বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply