কারাগারের দিনগুলো

মুহাম্মদ আতাউর রহমান সরকার

গত সংখ্যার পর

ইতোমধ্যে অনেক সময় অতিবাহিত হয়েছে। কারারুদ্ধ পুরনো কয়েদি ও হাজতিদের সাথে লোহার শিকের মাঝ দিয়ে কথোপকথন, নতুনদের সাথে পরিচিত হওয়াই ছিল আমাদের নিত্যদিনের কাজ।  শুরুতে ২৪ ঘণ্টা আটকিয়ে রাখলেও জেলারের সাথে যোগাযোগ করে প্রতিদিন বিকেলে এক ঘণ্টা আমাদেরকে বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করার সুযোগ দেয়া হয়। আমরা বসে সিদ্ধান্ত নিলাম প্রশাসনের দেয়া এক ঘণ্টার সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগাব। আমাদের সেলটি ভিআইপি হওয়াতে আশপাশের হাজতি ও কয়েদিরা হাঁটতে আসত এখানে। অন্য দিকে রান্নাঘর, কারা মসজিদ ও পাঠাগার আমাদের সেলের পাশে হওয়ায় দুপুরের পর ভিড় লেগে থাকত  সেখানে। সময় সুযোগকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনায় জানতে চেষ্টা করলাম পত্রিকা কিভাবে আনা যায়, কিভাবে অন্যরা সুযোগ সুবিধা নিচ্ছে। আমাদের পাশে দু’টি রুমে হিযবুত তাহরীরের প্রধান সমন্বয়কারী অধ্যাপক মহিউদ্দিন আহমেদসহ ১২ জন। সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীর হলেও কারাগারে অবস্থা ছিল ভিন্ন। সকাল থেকে মাগরিব পর্যন্ত উন্মুক্তভাবে ঘোরাফেরা করা, গোসল, খাবার থেকে শুরু করে সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করতেন তারা। কিন্তু গণতান্ত্রিক  সংগঠন হওয়ার পরও জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের সেখানে অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সব কিছুতে আমরা ছিলাম বঞ্চিত। এরই মাঝে অতিবাহিত হয়ে গেল কিছুদিন। অতঃপর একদিন জানতে পারলাম সুবেদার সাহেবের সাথে সুসম্পর্ক থাকলে সব কিছুই সম্ভব। সুবেদারের সাথে সাক্ষাতের জন্য অনেককে ধরলাম, বললাম সহযোগিতা করুন। কিন্তু শুরুতে কেউ সহযোগিতা করছিল না। এতে হতাশ হলাম না, অপেক্ষা করতে লাগলাম সুবর্ণ সুযোগের। এ ব্যাপারে আমাদের সেলের ফালতু শাহিনকে (সায়দাবাদে পকেট মারতে গিয়ে আটক) কাজে লাগানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু সে জানালো, টাকা দিলে এখানে সবকিছুই মেলে। তার কথায় সত্যি প্রমাণিত হলো। যেখানে আমাদের পাশের রুমে থাকা হাজতি-কয়েদিরা প্রতিজনে ১ ড্রাম পানি দিয়ে গোসল করত, সেখানে ২৪ ঘণ্টা আবদ্ধ অবস্থায় থাকা আল্লাহর দ্বীনের কর্মী ১১ জনকে ২ ড্রাম পানি দেয়া হতো যার পরিমাণ ৬০ কেজি। গোসলের পাশাপাশি কাপড় পরিষ্কার এর মধ্যেই করতে হবে। পানির অভাবে ময়লাযুক্ত কাপড়টি শরীরে থাকা অবস্থায় তার ওপর পনি ঢালা হতো, সাথে লাগানো হতো সাবান। অনেক সময় পানির অভাবে  সাবানযুক্ত কাপড়টিকে রোদে শোকাতে দেয়া হতো। অনেক ভাই গোসল না করেই দুই-তিন দিন কাটিয়ে দিতো। বিষয়টি ছিল কত অমানবিক তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। কারাগারে পানি নিয়ে যুদ্ধ চলে। পানি যেন  সোনার সোহাগা। ২০০০ লোকের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন কারাগারে এখন প্রায় গড়ে ১০ হাজার লোকের অবস্থান। সকাল বেলা হতে পানি নিয়ে দৌড়ঝাঁপ। বিডিআর, জেএমবি ও আমরা (জামায়াত-শিবির) ব্যতীত বাকি সকলকে নির্দিষ্ট ওয়ার্ডের জন্য নির্ধারিত গোসলখানায় ভোরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হতো। তালা খোলার সাথে সাথে কার আগে কে ফোয়ারায় পৌঁছবে ম্যারাথনের মতো প্রতিযোগিতা চলতো। সেখানে পৌঁছার পর কেউ এক মগ, কেউ বা শত মগ পানি ঢালতো শরীরে। পুরাতন হাজতি-কয়েদি, স্বাস্থ্যের অধিকারী ব্যক্তিরা ব্যতীত অন্যরা সেখানে ছিল অনেকটা পেছনে। আবদ্ধ অবস্থায় হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ছাড়া আর কিছু করার নেই। ২৭ সেলে অবস্থানকারী আমিসহ ১১ জন ছিলাম সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত। আমাদের অন্যান্য ভাইদেরকে অন্য সেলে দেয়া হয়, যেখানে তাদের জন্য নির্ধারিত ছিল পানির ফোয়ারা। প্রতিদিন ভোরবেলায় মিয়া সাবরা তাদেরকে ডেকে নিয়ে আসতো। আধা ঘণ্টা সময় দেয়া হতো, এর মধ্যে গোসল শেষ করতে হবে। প্রশাসনের নির্ধারিত সময় শেষ হলে হাঁকিয়ে হাঁকিয়ে রুমে নিয়ে যাওয়া হতো। অনেকের গোসল শেষ হয়নি, কেউ বা কাপড় ধোয়া অবস্থায় ছিল। প্রশাসনের সে দিকে খেয়াল নেই। মানবতা যেন সেখানে নীরবে নিভৃতে কাঁদে।
পানির এত কষ্টে আমাদের সঙ্গী সাথীরা অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেন। আমি তাদেরকে সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী (রহ),  ইখওয়ানুল মুসলিমিনের নেতা সাইয়েদ কুতুব ও ১৯৭১ সাল- পরবর্তী জামায়াত কর্মীদের ওপর বর্বর নির্যাতনের কয়েকটি ঘটনা বর্ণনা করলাম।
সাইয়েদ কুতুবের শিষ্য ইউসুফ আল আযম তার ওপর নাসের বাহিনীর নির্যাতন সম্পর্কে লিখেছেন : সাইয়েদ কুতুবের ওপর বর্ণনাতীত নির্যাতন চালানো হয়। আগুন দ্বারা সারা শরীর ঝলসে দেয়া হয়। পুলিশের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর লেলিয়ে দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থান রক্তাক্ত করা হয়। মাথার ওপর কখনো উত্তপ্ত গরম পানি ঢালা হতো। পরক্ষণে আবার খুবই শীতল পানি ঢেলে শরীর বরফের ন্যায় ঠাণ্ডা করা হতো। পুলিশ লাথি, ঘুষি মেরে একদিক থেকে অন্যদিকে নিয়ে যেত। এমন হয়েছে যে একাধারে ৪ দিন একই চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছে। কোন খানা-পিনা দেয়া হয়নি। তাঁর সামনে অন্যরা পানি পান করতো অথচ তাঁকে এক গ্লাস পানি দেয়া হতো না। সাইয়েদ কুতুবের ওপর এইভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সত্ত্বেও তিনি সময় পেলেই জেলে দাওয়াতি কাজ করতেন। ভাবতেন ইসলামী আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
১৯৭১ সাল থেকে ৭৫ সাল পর্যন্ত তৎকালীন সরকার ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের ওপর যে নির্যাতন করেছে তার চেয়ে আমরা অনেক ভালো আছি। সে সময়ে ফেনী জেলা জামায়াতের নেতা মো: ইলিয়াসকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। ২টি ট্রাক দু’দিকে ছেড়ে তার দু’টি পা’কে ট্রাকের সাথে বেঁধে দেয়া হয়েছিল। ট্রাক ২টি দু’দিকে চলে গেল ১টি আস্ত মানুষকে মাঝ বরাবর ছিঁড়ে ফেলল। নির্মম নারকীয়তার মুখেও ইসলামী আন্দোলন তার লক্ষ্য থেকে একটুও বিচ্যুত হয়নি। তাই আমাদের সকলকে মহান আল্লাহর কাছে সর্বাত্মক সহযোগিতা চাইতে হবে। আল্লাহ আমাদের সবচেয়ে বড় অভিভাবক। হতাশার মাঝে হঠাৎ একটি ঘটনা আজ আমার বড়ই মনে পড়ছে। সুবেদার বেঁকে বসায় বেশি সুযোগ সুবিধা গ্রহণকারী আসামিদের হঠাৎ পানির সঙ্কট দেখা দিলো। এমতাবস্থায় ২৭ সেলের ৪টি রুমে থাকা অন্যরা পরামর্শ করে সুবেদারের সাথে সাক্ষাৎ করার সিদ্ধান্ত নিল। সিদ্ধান্ত মোতাবেক ৪ জন প্রতিনিধি পরদিন সকালে সুবেদারের সাথে সাক্ষাৎ করবে।
ভাগ্যক্রমে আমাকেও ৪ জনের একজন করা হলো। যদিও আমরা শুরু থেকেই সঙ্কটে। কারা বিধি অনুযায়ী প্রাপ্য সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সকলের সমস্যার কথা বিবেচনা করে আমি তাদের সাথে গেলাম। সুবেদারের সাথে বাকি ৩ জন খুব খারাপ ব্যবহার করার কারণে তিনি সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন। আমি ভালো আচরণ দিয়ে তার মন জয় করার চেষ্টা করলাম। সুবেদার সকলের কথায় প্রথমে ক্ষুব্ধ হলেও আমি কথা বলার পরক্ষণেই তিনি সিদ্ধান্ত পাল্টালেন এবং বললেন আগামীকালের মধ্যে সকল সমস্যার সমাধান করা হবে। আমরা খোশ মেজাজে  সেলে ফিরলাম। আমরা আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলাম। ঐদিনকার শিবির প্রতিনিধির ভূমিকায় সেলের অন্যান্যরা খুশি হয়েছিল এবং প্রশাসনের সাথে ঐদিনের পর থেকেই আমাদের একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি হলো। নতুন আশায় সকলে বুক বাঁধলাম এবার হয়তোবা পত্রিকা মিলবে, ২৪ ঘণ্টা বন্দিজীবনের অবসান হবে, পর্যাপ্ত পানি মিলবে। পরদিন সকালে একজন ভাই এসে বললেন, জামিন পাওয়া একজন ভাই তার পত্রিকাটি রেখে গেছেন আপনি চাইলে আগামীকাল থেকে পত্রিকা দিতে পারি, শর্ত হলো জেলার বরাবর দরখাস্ত দিতে হবে। আমি বললাম, যে কোন শর্তে রাজি যদিও কারাগারে জনকণ্ঠ, যুগান্তর ও ডেইলি স্টার ব্যতীত সকল পত্রিকা নিষিদ্ধ। আবার যে পত্রিকাগুলো দেয়া হতো সেখানে সরকারবিরোধী কোন সংবাদ থাকলে তা কেটে রেখে দেয়া হতো। সময় অতিবাহিত হচ্ছে, আমাদের ওপর মানসিক নির্যাতন কমে আসছে। আমরাও মানিয়ে নিতে চেষ্টা করলাম কারাগারের সীমাবদ্ধতাগুলো। ইতোমধ্যে ১৫ দিন অতিবাহিত হয়েছে হঠাৎ করে খবর পেলাম আমাদের কেন্দ্রের কিছু দায়িত্বশীল ভাই গ্রেফতার হয়েছেন বিশেষ করে  কেন্দ্রীয় ছাত্রকল্যাণ সম্পাদক আল মুত্তাকী বিল্লাহ ভাই ও কেন্দ্রীয় ক্রীড়া সম্পাদক মিয়া মুজাহিদুল ইসলাম ভাই। মনটা খারাপ হয়ে গেল। খবর পেলাম কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক সম্পাদক গোলাম মুর্তজা ভাইকে সাদা পোশাকধারী র‌্যাব সদস্যরা গ্রেফতার করেছে অথচ স্বীকার করছে না। আমাদের নামে বরাদ্দকৃত যুগান্তর পত্রিকা পড়ে বেশি কিছু সাংগঠনিক খবর জানতে পারছিলাম না। প্রতিদিন বিভিন্ন ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করতে আসা ভাইদের দেয়া মেসেজই আমাদের ছিল মূল সম্বল। তাদের কাছ থেকে সংগঠনের যাবতীয় খোঁজখবরাদি নিতে পারতাম। কিন্তু হঠাৎ করে আমার সাথে সাক্ষাৎও বন্ধ করে দেয়া হলো। প্রায় ২০-২৫ দিন যাবৎ কাউকে আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে দেয়া হচ্ছে না। এক সপ্তাহ পর পর সাক্ষাতের নিয়ম থাকলেও প্রায় ৩ সপ্তাহ আমাকে সাক্ষাৎ করতে দেয়া হচ্ছে না কেন বিষয়টি জানার জন্য জেলার, সুবেদারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলাম। (চলবে)

লেখক পরিচিতি : কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply