কারাস্মৃতির অন্তরালে

ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম

পৃথিবীতে বর্তমান বলে কিছু আছে- এটা নিয়ে দার্শনিক মহলে বিতর্ক খুব একটা কম নয়। তাদের যুক্তি, বর্তমান শব্দটি উচ্চারণ করতে করতে তা নিজেই যখন অতীত হয়ে যায়, তাহলে বর্তমান বলতে কিছু আছে কি? সে হিসেবে একটু আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাটাই এখন স্মৃতি। আর মানুষের গোটা জীবনটাই স্মৃতির খাঁচায় আবদ্ধ। কিন্তু মানুষ তার জীবনের সকল স্মৃতি ধরে রাখে না। আমরা যেমন ভালো গানের ফিতা বারবার শুনি এবং সংরক্ষণ করে রাখি যুগ যুগ ধরে। কারণ তাতে আছে প্রাণ, আছে হাসি আর বেদনার সংমিশ্রণ, যা মানুষের মনকে আন্দোলিত করে মানুষ ঘুরে ফিরে আসে তার কাছে। সময় পেলেই তা বারবার নেড়েচেড়ে দেখে। কারাগার তেমনই ব্যতিক্রম স্মৃতিফ্রেমে আবদ্ধ এক ডায়েরি, যেখানে আছে হাসি ও বেদনার অনেক ঘটনা। নিজেকে মাপার দাঁড়িপাল্লা। নিজেকে আবিষ্কারের সুন্দর পাঠশালা। আত্মপর্যালোচনা করে এখান থেকে খুঁজে পায় শক্তি আর প্রেরণা। রচনা করে বিশ্বাসের পাহাড়। আবিষ্কার করে এগিয়ে যাওয়ার দুরন্ত সাহসের রাজপথ। ক্ষণিকের জীবনযুদ্ধে মানুষ এভাবেই এগিয়ে চলে।
হৃদয়ের সবটুকু আবেগ দিয়ে আল্লাহর ইবাদতের উত্তম জায়গা। জ্ঞান আহরণের জন্যও কারাগার ভালো জায়গা। দাওয়াতি কাজের ভালো ক্ষেত্র। কারণ ভালো এবং খারাপ সব শ্রেণীর শীর্ষ ব্যক্তিরাই এখানে ঘুরে ফিরে আসেন। পৃথিবীর শীর্ষ ও মহৎ ব্যক্তিদের কারো-ই কারাবাস থেকে রেহাই পাওয়ার ইতিহাস নেই। প্রায় প্রত্যেককেই অনেক নোংরা অভিযোগে অভিযুক্ত করার ইতিহাস-ই আমরা প্রত্যক্ষ করি। কারাগার উম্মতে মুহাম্মদ (সা)-এর জন্য একটি উত্তম সুন্নাত।
আমাদের প্রিয় নবী মহাম্মদ (সা)-এর কারাবরণের বর্ণনা এভাবেই দিয়েছেন প্রখ্যাত লেখক নঈম সিদ্দিকী তাঁর ঐতিহাসিক সিরাত গ্রন্থ মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ (সা) বইতে-
‘‘ইসলামের অগ্রগতি ও বড় বড় প্রভাবশালী ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণের দৃশ্য দেখে দিশাহরা হয়ে ওঠে প্রতিপক্ষ। নবুওয়তের সপ্তম বছরের মহররম মাসে মক্কার সব গোত্র ঐক্যবদ্ধ হয়ে বনু হাশেম গোত্রকে বয়কট করার চুক্তি সম্পাদন করলো। চুক্তিতে স্থির করা হলো যে, বনু হাশেম যতক্ষণ মুহাম্মদ (সা)-কে আমাদের হাতে সমর্পণ না করবে এবং তাকে হত্যা করার অধিকার না দেবে, ততক্ষণ কেউ তাদের সাথে কোন আত্মীয়তা রাখবে না, বিয়ে শাদির সম্পর্ক পাতাবে না, লেনদেন ও মেলামেশা করবে না এবং কোন খাদ্য ও পানীয় দ্রব্য তাদের কাছে পৌঁছাতে দেবে না। আবু তালেবের সাথে একাধিকবার কথাবার্তার পরও আবু তালেব রাসূল (সা)-কে নিজের অভিভাবকত্ব থেকে বের করতে প্রস্তুত হননি। আর তার কারণে বনু হাশেমও তার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে পারেনি। এই কারণে হতাশ হয়ে তারা ঐ চুক্তি সম্পাদন করে। গোত্রীয় ব্যবস্থায় এ সিদ্ধান্তটা ছিল অত্যন্ত মারাত্মক এবং চূড়ান্ত পদক্ষেপ। সমগ্র বনু হাশেম গোত্র অসহায় অবস্থায় ‘শিয়াবে আবু তালেব’ নামক উপত্যকায় আটক হয়ে গেল। এই আটকাবস্থার মেয়াদ প্রায় তিন বছর দীর্ঘ হয়। এই সময় তাদের যে দুর্দশার মধ্য দিয়ে কাটে তার বিবরণ পড়লে পাষাণও গলে যায়। বনু হাশেমের লোকেরা গাছের পাতা পর্যন্ত চিবিয়ে এবং শুকনো চামড়া সিদ্ধ করে ও আগুনে ভেজে খেতে থাকে। অবস্থা এত দূর গড়ায় যে, বনু হাশেম গোত্রের নিষ্পাপ শিশু যখন ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাঁদতো, তখন বহু দূর পর্যন্ত তার মর্মভেদী শব্দ শোনা যেত। কোরাইশরা এসব কান্নার শব্দ শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেত। সমগ্র বনু হাশেম গোত্র একমাত্র ইসলামী আন্দোলনের নেতার কারণে এহেন বন্দিদশায় নিক্ষিপ্ত হলো। বয়কট এমন জোরদার ছিল যে, একবার হজরত খাদিজার ভাতিজা হাকিম বিন হিযাম তার ভৃত্যকে দিয়ে কিছু গম পাঠিয়ে দিচ্ছিলেন। পথিমধ্যে আবু জাহেল তা দেখে গম ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলো। ঠিক এ সময় আবুল বুখতারিও এসে গেল এবং তার মধ্যে একটু মানবিক সহানুভূতি জেগে উঠলো। সে আবু জাহেলকে বললো, আরে ছেড়ে দাও না। এ ছাড়া হিশাম বিন আমরও লুকিয়ে লুকিয়ে কিছু গম পাঠাতো।”
এভাবেই পৃথিবীর সর্বশেষ শ্রেষ্ঠ মহামানব মুহাম্মদ (সা)-এর ওপর হয়েছিল অবর্ণনীয় জুলুম ও নির্যাতন। সহ্য করতে হয়েছে কারাবরণ, দেশান্তর, এমনকি হত্যার মতো জঘন্য কাজটিও সংঘটিত হয়েছে আল্লাহর মনোনীত এই ব্যক্তিদের কারো কারো জীবনে। কিন্তু তারা প্রত্যেকেই ছিলেন তাদের দায়িত্ব পালনে সদা অটল ও অবিচল। পৃথিবীর সকল শক্তি তাদের টলাতে পারেনি এক ইঞ্চি জমিন থেকে।
কিন্তু কেউ ইচ্ছা করলেই কারাগারে যেতে পারে না। আবার কেউ যেতে না চাইলেও তাকে আসামি হিসেবে যেতে বাধ্য করা হয়। আবার অনেক টাকা পয়সা থাকলেও কারাগারে ভ্রমণ করা যায় না। এরকম এক রম্যগল্প শুনছিলাম, ‘এক রাজাকে বিভিন্ন অভিযোগে বারবার গ্র্রেফতার হতে হয়। কিন্তু রাজা মশাইয়ের সমস্যা একটাই, তিনি তার ব্যক্তিগত চাকর ছাড়া এক পা-ও চলতে পারেন না। আবার ইচ্ছা করলেই তো চাকরকে কারাগারে নেয়া যায় না। এবার রাজা আর চাকর মিলে সিদ্ধান্ত নিলো এরপর গ্রেফতার করলে দু’জন মিলেই কারাগারে একসাথে যাবে। কিন্তু অভিযোগ তো রাজার বিরুদ্ধে কিন্তু চাকরকে কিভাবে নেয়া যায়? চাকর বুদ্ধি আঁটলো, রাজা মশাই আপনার সাথে আমার কারাগারে যাওয়ার একটাই পথ। আপনাকে যখন পুলিশ গ্রেফতার করতে আসবে তখন আমি ইচ্ছা করে পুলিশকে একটা ধাক্কা দেবো। আর তখন এই অপরাধে পুলিশ আমাকেও গ্রেফতার করবে, কারাগারে দু’জনে একসাথে থাকবো। রাজা মশাই বললেন, বাহ! খুব চমৎকার বুদ্ধি। এভাবেই রাজা মশাই তার চাকরকে সাথে না রাখতে পারার সমস্যার সমাধান করলেন। অবশ্য আওয়ামী লীগের সময়ে দু’জন আসতে চাইলে রাজার চাকরের মতো আর ধাক্কা লাগে না। আওয়ামী লীগ এখন কাউকে গ্রেফতার করতে গেলে একা নিয়ে আসে না বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের সন্তান, জামাতা, আত্মীয়স্বজন গ্রেফতারের ঘটনা অহরহ ঘটছে।
কারাগারের বর্ণনা আর কী দেবো। আওয়ামী লীগের শাসনামলে গোটা বাংলাদেশটাই কারাগারের মতো। দ্রব্যমূল্যের ঊর্র্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি প্রতিনিয়ত যেভাবে হচ্ছে তাতে কারাগার এর তুলনায় একেবারে খারাপও বলা যায় কি? দেশ যেভাবে দুর্ভিক্ষের দিকে এগোচ্ছে তাতে গরিব মানুষেরা কারাগারে অন্তত বিনামূল্যে কিছু খাবার পাচ্ছে তো ?
মজার ব্যাপার হলো পুলিশ গ্রেফতার করে মানুষের মধ্যে ভীতি সৃষ্টির জন্য কিন্তু গ্রেফতারের পর পুলিশভীতি অনেকের মধ্যে আর মোটেই থাকে না। কারণ কারাগার আর আদালত থানা পুলিশের সাথেই তো তার অবস্থান। এতে অনেকেই হয়ে যায় আরো দুর্ধর্ষ। আবার অনেকের মধ্যে এসে যায় অনেক পরিবর্তন। যদিও ব্যক্তিকে পরিশুদ্ধ করার এখানে খুব একটা ভালো ব্যবস্থা নেই। অথচ ব্যক্তিকে ভালো করার এখানে রয়েছে অনেক সুযোগ। অবশ্য আর কিছু না হোক অনেক মানুষকে নামাজ, রোজা আর মহাগ্রন্থ আল কুরআন পড়া শিখিয়েছি আমরা। অনেকেই সত্য পথের সন্ধান পেয়েছেন। এ জন্য হজরত ইউসুফ (আ) কারাগারকে তার জন্য উত্তম জায়গা হিসেবে বেছে নিলেন।
অন্যায়ভাবে যাদের আসামি করা হলো আবার তাদের অনেকের চারিত্রিক প্রভাব ও আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের ওপর পড়ে। কারণ তারাও তো আমাদের মতো মানুষ। যতই ওপরের নির্দেশ আর চাকরি রক্ষার তাড়নায় কাজ করুক না কেন, বিবেকবোধ আছে প্রতিটি মানুষের মধ্যে। ন্যায় এবং অন্যায় উপলব্ধির চেতনা আছে অনেকের মধ্যে। ক্ষমতার রঙিন চশমা পরে শাসকগোষ্ঠী কখনো তা উপলব্ধি করে না।
আওয়ামী লীগ আমাদের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে অন্যায়ভাবে আটক রেখে, ইসলামী আন্দোলনের পক্ষে সে অর্জনটি করিয়ে দিচ্ছে। আমি নিজে অনেক কারারক্ষী, আসামিকে বলতে শুনেছি যে, আপনাদের নিজামী সাহেব, সাঈদী সাহেবের সাথে আজ দেখা হয়েছে, আজ থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছি নামাজ পড়বো, কুরআন পড়বো। একজনকে পেলাম হাউ মাউ করে কাঁদছে আর বলছে ভাই আমি খুব অপরাধী কিন্তু আজ আমি ধন্য সাঈদী হুজুরের সাথে মোসাফাহ করেছি। আর সিদ্ধান্ত নিয়েছি কোনো অপরাধ করব না। আওয়ামী লীগ মানুষের এ আবেগকে কোন আইন দিয়ে মোকাবেলা করবে?
আওয়ামী লীগ মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে কিন্তু কাজে স্বৈরাচারী। বিশ্বাসে বাকশাল আর চরিত্রে ফ্যাসিস্ট। বাংলাদেশের শাসনক্ষমতায় বর্তমান মহাজোট সরকার তাদের অপকর্ম ঢাকতে আজ ফ্যাসিস্ট নীতিকে ক্ষমতায় টিকে থাকার একমাত্র বাহন হিসেবে গ্রহণ করেছে। আর এই সরকারের অন্যতম ফ্যাসিস্ট নীতি হলো, জেল-জুলুম নির্যাতন আর মামলাবাজি। বিপরীত মতের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর জুলুম নির্যাতন চালানো। এ জন্য তারা ব্যবহার করছে রাষ্ট্রীয় যন্ত্রকে। বিরোধী মতের কণ্ঠরোধ করতে কথায় কথায় রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা এ সরকারের অন্যতম হাতিয়ার। অবশ্য আওয়ামী লীগের এ চরিত্র অতীব পুরনো। আওয়ামী লীগই বাংলাদেশে একমাত্র দল যারা বাকশালী চরিত্র থেকে এক ইঞ্চিও সরে দাঁড়ায়নি। আজ স্বাধীনতার ৪০ বছর পার হলেও আওয়ামী লীগের চরিত্রের খুব একটা উন্নতি ঘটেনি। তাদের আজকের কার্যক্রম যেন পুরনো দিনের প্রতিধ্বনি-ই মাত্র।
তাইতো বিদেশী সাংবাদিক অ্যান্থনি ম্যাসকার্নহাস তাঁর ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘বাংলাদেশ : লেগ্যাসি অব ব্লাড’-এর ৪৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন এভাবে- ‘১৯৭৩ সাল। স্বাধীনতার দ্বিতীয় বছর। আওয়ামী লীগের দুর্নীতি, কালোবাজারি, চোরাচালান আর রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে গণ-অসন্তোষ, রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির সৃষ্টি করলো। শেখ মুজিব তাঁর রক্ষীবাহিনী আর সশস্ত্র রাজনৈতিক কর্মীদের দিয়ে তা প্রতিহত করছিলেন। পক্ষে-বিপক্ষে চতুর্দিকে কেবল অস্ত্র আর অস্ত্রের ঝন্-ঝনানি। সাধারণ মানুষের মধ্যে করুণ নিরাপত্তাহীনতা। সেই সময় মাত্র ৬টি জেলা থেকে ১৯৭৩ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে কেবল রাজনৈতিক হত্যার সংখ্যা ২০০০ অতিক্রম করে। আওয়ামী লীগ বরাবরই বাংলাদেশকে তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে মনে করত। এ জন্য তার পরিবার বা দলের সমালোচনা বা বিরুদ্ধাচরণকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলে মনে করতো।’
আজও আওয়ামী লীগ সেই রাষ্ট্রদ্রোহিতার পুরনো হাতিয়ার ব্যবহার করে বিরোধী দলকে দমন করে চলছে। আমার মত একজন ক্ষুদ্র নাগরিকও সেই রাষ্ট্রদ্রোহিতার আওয়ামী অক্টোপাস থেকে রেহাই পাইনি। ২০১০ সালের ২৮ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত হয় ২০০৬ সালে লগি-বৈঠাধারীদের আঘাতে শহীদদের স্মরণে আলোচনা সভা। যা আজও ইতিহাসের পাতায় পল্টন ট্র্যাজেডি, মানবাধিকার লঙ্ঘন দিবস, লগি-বৈঠার তাণ্ডব দিবস, আওয়ামী বর্বরতা দিবস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। পৃথিবী যতদিন অবশিষ্ট থাকবে সম্ভবত ২৮ অক্টোবরের নৃশংস হত্যাকাণ্ড ইতিহাসের সবচেয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট দলিল হয়ে থাকবে, যা আমাদের জাতীয় জীবনে একটি কালো অধ্যায়ের সংযোজন। কিন্তু আওয়ামী লীগ এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের বিচার করেনি। উল্লেখ্য, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনের ওই লগি-বৈঠাধারীদের তাণ্ডবের শিকার হয়ে আমিও সেই দিন গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছি। দীর্ঘ ৯ মাস স্বাভাবিক জীবন যাপন থেকে বঞ্চিত ছিলাম। আবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের ওই আলোচনা সভায় উপস্থিত থেকে আজও রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলার আসামি আমরাই। হায়রে! এই বুঝি এ পৃথিবীর নিষ্ঠুর বাস্তবতা!
বরং ২৮ অক্টোবরের লগি-বৈঠাধারীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মামলা থাকলেও তা রাজনৈতিক বিবেচনায় বাদ দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে সরকারের নব্য বাকশালী চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ-ই মাত্র।
আমিসহ মোট আটজনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের একটি আদালতে দায়ের করা হয় রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা। আমি ছাড়া বাকি সবাই জাতীয় শীর্ষ নেতা। আমার মতো একজন নগণ্য বান্দাকে শামিল করা হয় রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার এক নম্বর আসামি হিসেবে। বাকি আসামিরা হলেন- জনাব মকবুল আহমদ, এ টি এম আজহারুল ইসলাম, শফিউল আলম প্রধান, আব্দুল লতিফ নেজামী, শেখ শওকত হোসেন নিলু, শামীম আল-মামুন ও আনোয়ারুল হক প্রমুখ।
আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সরকারকে উৎখাতের জন্য উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান।
এ মামলায় আমরা সকলেই মহামান্য হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন লাভ করে যথারীতি হাজিরা প্রদান করে আসছিলাম। এ কথা সকলেরই জানা, আওয়ামী লীগ কখনই বিপরীত মতকে সহ্য করে না। ইতোমধ্যে গত ২০ জুন চট্টগ্রাম আদালতে হাজির হলে আদালত আমার জামিন না মঞ্জুর করে আমাকে জেলহাজতে পাঠান। আর এ মামলায় আমাকে চার মাস কারাবরণ করতে হলো। কিন্তু এ মামলার মেরিট এতই দুর্বল যে ইতোমধ্যে মহামান্য হাইকোর্ট আমাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে এই মামলার কার্যকারিতা স্থগিত করে দিয়েছেন। এ হলো আমাদের বিচারব্যবস্থার অবস্থা। বিচারের আগেই যেন সাজা, চরিত্র হনন সবই চলে এখানে। কারাগারে এ রকম বিনা বিচারে বছরের পর বছর আটক আছে হাজার হাজার নিরীহ নিরপরাধ মানুষ। এর আদৌ নেই কোন সমাধান। আমাদের দেশের অধিকাংশ মামলার অবস্থা আজ নাসির উদ্দীন হোজ্জার গল্পের মতো। গল্পটি অনেকেই জানেন। নাসির উদ্দীন হোজ্জা একদিন তার সাগরেদের নিকট এক গ্লাস পানি চাইলেন। সাগরেদ যখন পানি আনতে যাচ্ছে তখন নাসির উদ্দীন হোজ্জা তাকে ডেকে কোন কথা ছাড়াই মুখে জোরে একটি থাপ্পড় কশলেন। নাসির উদ্দীন হোজ্জার এমন আচরণে উপস্থিত সবাই হতবাক! কী ব্যাপার? ভয়ে ভয়ে একজন বললো, হুজুর আমরা কি জানতে পারি আপনার সাগরেদ পানি না দিতেই কেন তাকে আপনি থাপ্পড় দিলেন, কী বেয়াদবি করলো সাগরেদ। নাসির উদ্দীন হোজ্জা বললেন, ‘আরে না ও কোন বেয়াদবি করেনি। কিন্তু ওকে থাপ্পড় মারলাম এই জন্য যে, আমি জানি আমার সাগরেদ আমাকে পানি দিতে গিয়ে গ্লাসটি ভেঙে ফেলবে এবং সে পালিয়ে যাবে। আমি তাকে শাস্তি দিতে পারবো না। এ জন্য সাগরেদকে থাপ্পড়টা গ্লাস ভাঙার আগেই দিয়ে নিলাম। তখন সবাই হো হো করে হেসে উঠল।’
ব্রিটিশদের গোলামি আইনে মানুষকে বিচারের আগেই কারাগারে আটক, রিমান্ডের নামে নির্যাতন, মনগড়া অভিযোগ তুলে চরিত্র হনন সবই চলে এখানে।
যাক আমার গ্রেফতারের নির্দেশে আমাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দ খুব মর্মাহত হলেন। সবারই চোখে মুখে আমি বেদনার ছাপ অনুভব করলাম। ভারপ্রাপ্ত আমীরে জামায়াত, আজহার ভাই, প্রধান ভাই, নিলু ভাই এসে সবাই আমাকে জড়িয়ে ধরে সাহস জোগালেন। সালাতুল জোহর এবং আসর আদালত কাস্টডিতেই আদায় করলাম। এর মধ্যে দুপুরের খাবার দেয়া হলো তাও সেরে নিলাম। শিবিরের চট্টগ্রাম দুই মহানগরীর সভাপতি ইসমাইল ভাই ও দেলোয়ার ভাই খুব বেশি পেরেশান হয়ে গেলেন আমাকে তাদের চট্টগ্রাম থেকে গ্রেফতার করাতে। সাবেক এমপি শাহজাহান চৌধুরী ভাইও খুব সমবেদনা জানালেন আদালত কাস্টডিতে এসে। এদিকে মহানগরীর সেক্রেটারি মাসরুর ভাই আর কেন্দ্রের আলমগীর ভাই তো এক পায়ে খাড়া। পড়ন্ত বিকেলে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে। আমাকে একজন কারা পুলিশ নিয়ে যান কারা মেডিক্যাল ওয়ার্ডে। আমাকে জানানো হয় আপনি এখানেই থাকবেন। সালাতুল মাগরিব এখানেই আদায় করলাম। মজার ব্যাপার মেডিক্যালে যাওয়ার সাথে সাথে ওখানের সবাই বললো আপনার গ্রেফতারের খবর আমরা কয়েকবার টেলিভিশনে দেখেছি। কারাগারে বিটিভি ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। ঘণ্টা দুয়েক পর এক কারারক্ষী এসে বলল, আমার সাথে চলুন। আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো সাধারণ আসামিদের সাথে আমদানিতে। অবশ্য আমদানির কষ্ট আমার জানা আছে। কারণ চট্টগ্রাম কারাগারে প্রথম হলেও কারাজীবনে দ্বিতীয়বার। এর আগে রাজশাহীর কেন্দ্রীয় কারাগার দিয়ে জেলজীবনের উদ্বোধন। আমদানির এক পাশে বসে পড়লাম। নোংরা ও দুর্গন্ধ না যতটুকু কষ্ট দিচ্ছে তার থেকে বেশি, কষ্ট অশ্লীল ভাষা প্রয়োগের কারণে। এটা ওখানকার খুব সাধারণ নিয়ম। আমি এশার নামাজ আদায়ের জন্য অজু করতে গিয়ে দেখি পানি নেই। খুব অপরিষ্কার কিছু পানি দিয়ে অজু সেরে নামাজ আদায় করলাম। নামাজ শেষে আল্লাহর দরবারে দোয়া করলাম। খাবারের জন্য খিচুরি দেয়া হচ্ছে। তাকানোর সাথেই মনে হলো পেট পুরো হয়ে গেলো। আমি বললাম, না আমি খাবো না। ইতোমধ্যে আমদানির দায়িত্বে থাকা কয়েদি তার বেডেই আমাকে নামাজের এবং রাতে ঘুমানোর ব্যবস্থা করে দিলো। এতে কিছুটা স্বস্তি পেলাম। সে আমাকে বললো স্যার আপনি কি চাকরি করেন? আমি বললাম, আমি সোনার বাংলা পত্রিকার সহকারী সম্পাদক। এ কথা শুনে সে বলল, স্যার আপনি তো সাংবাদিক পত্রিকায় লেখেন, এ জন্যই আপনাকে মেডিক্যালে থাকতে দেয়নি কারণ ওখানে অনেক দুর্নীতি আর অনিয়ম হয়, যদি আপনি আবার পত্রিকায় লেখেন-টেকেন। এভাবে সে তার খাবার ভাত আমাকে খেতে দেয়। আর আজ থেকে ১১ বছর আগের রাজশাহী কারাগারের সেই আমদানির স্মৃতির সাথে মেলাতে মেলাতে ঘুমিয়ে পড়ি…    (চলবে)
লেখক : সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি
ও সহকারী সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা
mrkarim_80@yahoo.com

SHARE

Leave a Reply