কাশ্মীর এখন মৃত্যু উপত্যকা । এইচ এম আব্দুর রহিম

কাশ্মীর এখন মৃত্যু উপত্যকা । এইচ এম আব্দুর রহিমকাশ্মীর এখন মৃত্যু উপত্যকা। পুরো ভারত এবং পুরো বিশ্ব থেকে কাশ্মীরকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে। এখানকার রাস্তাঘাটে এক শ’গজ পর পর সেনা চৌকি ও কাঁটা তারের ব্যারিকেড। রাস্তায় যত না সাধারণ মানুষ তার চেয়ে বহুগুণ সেনাবাহিনী জনসাধারণকে ঘিরে রেখেছে। সম্প্রতি বিবিসির সাংবাদিক শুভ জ্যোতি ঘোষ সরেজমিনে ঘুরে এসে জানিয়েছেন, কাশ্মীর এখন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। কাশ্মীরে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করে রাখা হয়েছে। রাস্তাঘাটে কোন লোকজন চলাচল করছে না। পুরা রাজ্যজুড়ে আছে আড়াই লাখ ভারতীয় সেনা। টানা কারফিউ জারি রয়েছে। দোকানপাট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অনেকের বাড়িতে খাবার ফুরিয়ে গেছে, রেশন ফুরিয়ে গেছে। কেনাকাটার জন্য কেউ সাহস পাচ্ছে না। আবার বের হলেও দোকাটপাট বন্ধ রয়েছে। সেখান অধিবাসীরা চরম উদ্বেগ উৎকণ্ঠার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন।
রাজনীতিবিদদের প্রায় সবাই কারাগারে কিংবা গৃহবন্দী। সেখানকার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আব্দুল্লাহ বা মেহবুবা মুফতির মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদদের সাথে কাউকে দেখা করতে দেয়া হচ্ছে না। বেরামীতে দশ হাজার বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। অনেক রোগী কষ্ট পাচ্ছে। অন্তঃসত্ত্বা মায়েরা চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ। ইন্টারনেট বন্ধ। ল্যান্ডলাইনও কাজ করছে না। অঘোষিত জরুর অবস্থা। এখানকার সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। গত কোরবানির ঈদ তারা করতে পারেননি। ঈদের আনন্দবঞ্চিত হয়েছে। তদুপরি কোরবানি দিতে পারেননি।
১৯৭৫ সালের পর থেকে কাশ্মীরের যে ইতিহাস লেখা হয়েছে তা রক্তের ইতিহাস। কাশ্মিরীরা যে চেয়েছিল স্বাধীনতা না হলে পাকিস্তানের সাথে যোগদান। কিস্তু তারা কোন দিন ভারতের পদানত হতে চাননি। তাই ভারত যখন কাশ্মীরের ওপর তাদের আধিপত্য বিস্তার শুরু তখন কাশ্মীরের জনগণের মধ্যে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ভারতীয়রা হিংস্র হায়েনার মতো তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এ পর্যন্ত এক লক্ষ কাশ্মীরকে হত্যা করে ভারতীয় দখলদার বাহিনী। ১৯৯০ সালে কাশ্মীরে জারি করে প্রেসিডেন্টের শাসন। ভারতীয় বাহিনীর হামলায় এক লক্ষ মুসলমান শহীদ হয়েছেন। অনেকে প্রশ্ন তুলেছে কাশ্মীরে এমন কি ঘটছে তাই ভারত তাদের মৌলিক অধিকার হরণ করে নিলো। তবে ঘটনার এক মাস পর আসল কারণটা জানা গেল। এসব ধারা বাতিলের পূর্বে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে এই মর্মে একটি তথ্য প্রদান করে যে, কাতারে আমেরিকা তালেবানদের সাথে শান্তি চুক্তি হয়ে গেছে। মার্কিনিদের সাথে শান্তিচুক্তি হওয়ার পর তারা এখন কাশ্মীরের দিকে দৃষ্টি ফিরাবে। পরবর্তীতে দেখা যায় ওই গোয়েন্দা তথ্য ছিল ভুল। তারা চিন্তা করে ছিল তালেবানদের আসার আগে কাশ্মীর দখল করে নিতে হবে। এই তথ্য পাওয়ার পর নরেন্দ্র মোদি অতিরিক্ত সৈন্য পাঠাতে থাকে।
এর আগে ভারতের ৫ লক্ষ অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন ছিল। তার পরও মোদি তাদের ওপর ভরসা করতে পারেনি। তিনি ১০ দিনের মধ্যে আরো ৩৮ হাজার সৈন্য পাঠায়। এভাবে ৮০ লক্ষ কাশ্মীরকে দমন করার জন্য ৫ লক্ষ ৩৮ হাজার সৈন্য মোতায়েন করে। অর্থাৎ ১৫ জন মানুষের পিছনে একজন সশস্ত্র সৈনিককে নিয়োগ করা হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এত কম সংখ্যক মানুষকে দমন করার জন্য এত বেশি সৈন্য মোতায়েন করা এক নজিরবিহীন ঘটনা।
উপরোক্ত ঘটনার প্রেক্ষাপটে গত ৫ই আগস্ট ২০১৯ তারিখে ভারতের নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট সরকার ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫(এ) ধারা এ পার্লামেন্টর দুই পক্ষের ভোটে বাতিল করেছে। এর ফলে ভারতের সংবিধানে কাশ্মীরের যে বিশেষ মর্যাদা ছিল তা বাতিল করা হয়েছে এবং কাশ্মীরকে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ এ দু’টি কেন্দ্রীয় শাসিত অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে। তারা এই পদক্ষেপ হঠাৎ করে গ্রহণ করেনি। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী কংগ্রেসের নেতা জওহর লাল নেহরু কাশ্মীরে যে ফ্যাসিস্ট প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন, এর ধারাবাহিকতায় নরেন্দ্র মোদি কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল এবং দুই কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে বিভক্ত করেছেন।
এর ফলে কাশ্মীরকে তারা পরিপূর্ণভাবে গ্রাস করে ভারতের সংবিধান লংঘন করেছেন এবং তাদের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার শিকেয় তুলেছেন। ৩৭০ ও ৩৫ (এ) ধারা এভাবে বাতিল করার পর তারা কাশ্মীরের জনগণের প্রতিরোধ সামাল দেয়ার উদ্দেশ্যে কাশ্মীরে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে সেখানকার স্থানীয় নেতৃবৃন্দদের বন্দী করেছেন এবং কাশ্মীরের সাথে ভারতের অন্যান্য অংশ এবং দুনিয়ার সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন। কাশ্মীরের জনগণের ওপর এক বিশেষ ব্যবস্থা জারি করে রেখেছেন। কিন্তু এই নির্যাতনের সত্ত্বেও কাশ্মীরের জনগণ এখন ভারত সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ নতুন পরিস্থিতি শুরু করেছেন।
জওহর লাল নেহরু কাশ্মীরের গণভোট অনুষ্ঠানের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও পরবর্তী সময়ে গণভোটের সব সম্ভাবনা শেষ করে তাকে একটি ভারতশাসিত অঞ্চলে পরিণত করেছিলেন। পরবর্তীকালে ভারত সরকার কাশ্মীরে যে নীতি কার্যকর করে এসেছে তার ধারাবাহিকতায় নরেন্দ্র মোদির সম্ভব হয়েছে কাশ্মীরকে ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করা। জওহর লাল নেহরু তাদের নৈতিক অসাম্প্রদায়িক অনেক হামবড়া কথাবার্তা সত্ত্বেও মূলত ছিলেন একজন ফ্যাসিস্ট ও সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি। তার নেতৃত্বে কংগ্রেস কাশ্মীরে তাদের সাম্প্রদায়িক নীতি কার্যকর করার যে প্রক্রিয়া শুরু করে ছিলেন, তার অনিবার্য পরিণতিই ঘটেছে নরেন্দ্র মোদি ফ্যাসিস্ট সরকারের পক্ষে বর্তমান পদক্ষেপ গ্রহণে। বিশ্ব সম্প্রদায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল ট্রাম্পকে নিয়ে পড়ে আছে। তিনি বিশ্বের জন্য গণতন্ত্রের জন্য, সংখ্যালঘুদের জন্য কতটা ভয়ঙ্কর, তা নিয়ে বিস্তর বলেছেন, লিখেছেন। ট্রাম্পের বিতর্কিত নানান কর্মকাণ্ড ও কথার তোড়ে অনেক কিছুই আড়ালে চলে যাচ্ছে। এই যেমন এখন ট্রাম্পের চেয়েও বিপজ্জনক এক রাজনীতিক আছেন এই বিশ্বে বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক ও কথিত ধর্মনিরপেক্ষ দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী তিনি। নাম নরেন্দ্র মোদি। অবশ্য অনেক পশ্চিমার কাছে তিনি ‘বাদামিরঙা, শুশ্রুমণ্ডিত ট্রাম্প হিসেবেও পরিচিত। বিশ্বের নজর এখন ট্রাম্পের দিকে থাকায় ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি দলীয় প্রধানমন্ত্রী মোদি অনায়াসে তার ‘লক্ষ্য’ পূরণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। সর্বশেষ তিনি তার হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা কাশ্মীরের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। এখন কাশ্মীরের জনপ্রিয়তা বদলে দেয়ার পালা। নানা দিক দিয়ে ট্রাম্প মোদির মধ্যে মিল আছে। কেউ কেউ এই দুই নেতাকে দুই চোখে দেখেন। তবে বাস্তবতা হলো ট্রাম্পের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ঙ্কর মোদি। ট্রাম্প রক্ষণশীল রিপাবলিকান পার্টি থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন ঠিক, কিন্তু তার অস্থিমজ্জায় দলের মৌলিক আদর্শের উপস্থিতি কম আছে। এ নিয়ে খোদ রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও অস্বস্তি রয়েছে। ট্রাম্পজাত ব্যবসায়ী। ব্যবসা থেকে হুট করে রাজনীতিতে নাম লিখিয়ে প্রেসিডেন্ট বনে গেছেন। তিনি খুবই স্বাভাবিকভাবে ব্যবসার চাইতে রাজনীতি তিনি ভালো বোঝেন। তার হাবভাব মতিগতি দেখলে মনে হয় তিনি দেশ চালাচ্ছেন ব্যবসায়িক মডেলে। মোদির ইতিহাস ট্রাম্পের মতো নয়। তার রক্ত, মাংস, অস্তিমজ্জায় ও মগজে পাকাপাকিভাবে গেঁথে আছে হিন্দুত্ববাদ। হিন্দুত্ববাদ তার ধ্যান-জ্ঞান-চেতনা। প্রার্থনা হিন্দুত্ববাদের চর্চা করতে করতে তিনি ‘সিদ্ধি’ লাভ করে তিনি রাজনীতিতে নেমেছেন। তীর্ণপর্যায়ে হাত পাকিয়ে তিনি নেমেছেন জাতীয় রাজনীতিতে। এখন তিনি দ্বিতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রী। তার কোটি কোটি অনুসারী আছেন। তারা কট্টর হিন্দুত্ববাদী অনুসরণ করেছেন। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে দেওয়ার ক্ষমতা আছে তাদের। ইতোমধ্যে সেই চিহ্ন স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। এদিক দিয়ে ট্রাম্পের চেয়ে মোদি অনেক শক্তিশালী, অনেক প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে।
কাশ্মীর এখন মৃত্যু উপত্যকা । এইচ এম আব্দুর রহিমএ দিক দিয়ে কংগ্রেস ও মোদির মধ্যে কোন মৌলিক পার্থক্য নেই। তারা উভয়ে হিন্দুত্ববাদী নীতির ভিত্তিতে তাদের কাশ্মীরনীতি প্রণয়ন ও কার্যকর করে এসেছেন।
এ প্রসঙ্গে কিছু বলা দরকার। ১৯২৫ সালে আরএসএস প্রতিষ্ঠা করেন গোলওয়ালকার। তার আগে সাভারকার হিন্দুত্ববাদের ওপর প্রথম তথ্য খাড়া করেন। তিনি ভারতের ব্রিটিশ ঔপনিনেশবাদী সরকারকে আখ্যায়িত করেন হিন্দু লেবারেটর বা পরিত্রাতা হিসেবে। তার মতে পুরো মুসলিম শাসন ছিল হিন্দুত্বের ওপর নির্যাতনের ইতিহাস। এ জন্য ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে তার কোনো বক্তব্য ছিল না। উপরন্তু তিনি ছিলেন তাদের এক ধরনের সর্মথক। তবে সন্ত্রাসবাদী আচরণের কারণে ভারতীয় ব্রিটিশ সরকার তাকে কিছু দিন আন্দামানে বন্দী রাখে। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর কংগ্রেস সরকার এ জন্য আন্দামানের সেলুলার জেলে তার সম্মানে ও স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক প্রতিফলক স্থাপন করে। এই ছিল সাভার কারের প্রতি কংগ্রেস সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, গান্ধীর হত্যার পর তার অন্যতম চক্রান্তকারী হিসেবে সরকার তাকে বন্দী করে। আর এসএসকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু অল্প দিন পর তার সাভারকারকে মুক্তি দেয়। এবং আরএসএসের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। শ্যামাপ্রাসাদ ছিলেন হিন্দু মন্ত্রী সভার সভাপতি। তাকে জওহর লাল নেহরু তার সরকারের মন্ত্রী করেন। এর থেকে বুঝার অসুবিধা নেই যে, কংগ্রেস তার ঢাকঢোল পিটানো অসাম্প্রদায়িকতা সত্ত্বেও প্রকৃতপক্ষে হিন্দু মহাসভার বিরোধী ছিল না। অথচ আরএসএস গঠিত হওয়ার আগে থেকে হিন্দু মহাসভায় ১০৪৭ সাল এবং তার পরও হিন্দুত্ববাদের ধারকবাহক। ১৯৯২ সালে আর এসএসের কর সেবকদের দ্বারা বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কোন বিরোধিতা কংগ্রেস সরকার করেনি।
তারা ইচ্ছা করলেই সামরিক বাহিনী বা পুলিশ দিয়ে সে সময় বাবরি মসজিদের এলাকা ঘেরাও রাখতে পারত, তাহলে আর বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা সম্ভব হতো না। এ সময় কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাও পরিস্থিতি মোকাবেলার কোনো চেষ্টা না করে সাড়া দিয়ে তার বাড়ির পুজোর ঘরে কাটান এবং বের হন বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কাজ শেষ হওয়ার পর। এর থেকে বোঝার অসুবিধা নেই যে, শুধু আরএসএসই নয়, কংগ্রেস সরকারও ছিল বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পক্ষে। এখানে মাত্র কয়েকটি উদাহরণ দেয়া হলো, কিন্তু দেখা যাবে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্প্রতিক দলগুলোর প্রতি তাদের নরম দৃষ্টিভঙ্গি।
ইতালির ফ্যাসিস্ট নেতা মুসোলিনি ফ্যাসিবাদকে সংজ্ঞায়িত করতে যেয়ে বলেছিলেন, কোনো দেশে সরকার ও কর্পোরেটগুলোর একীভূত হওয়ার নামই ফ্যাসিবাদ। এখন ভারতে নরেন্দ্র মোদি সরকারের দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে, এই সরকারের সঙ্গে ভারতীয় কর্পোরেট হাউজগুলো যেভাবে একীভূত হয়েছে এমনটা ইতঃপূর্বে আর দেখা যায়নি। যদি কংগ্রেস সরকারও এই কর্পোরেট হাউজলোর সঙ্গে সম্পর্কিত থেকেছে। নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়েই কর্পোরেট হাউজগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত সঙ্গে তার খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপিত হয়। সে কারণেই ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তারা নরেন্দ্র মোদির নির্বাচনে প্রভূত অর্থ সাহায্য করে। সে সময় নরেন্দ্র মোদি যে পরিমাণ অর্থ নির্বাচনের জন্য ব্যয় করে ছিলেন, সেটা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বারাক ওবামার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় যা ব্যয় হয়েছিল তার সমপরিমাণ। আমেরিকা থেকে ভারতে এই অর্থ শক্তির ভূমিকা ছিল আরো অনেক বড়।
২০০২ সাল মোদি ভারতের গুজরাটে মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল তা ছড়ানো হয়েছিল গুজব লুটিয়ে। ঐ বছর ২৭ ফেব্রুয়ারি অযোধ্যা থেকে ট্রেনে করে এক দল হিন্দু সন্ন্যাসী গোধরায় আসছিলো। সেখানে কে বা কারা আগুন ধরিয়ে দিলে ৫৮ জন সন্ন্যাসীর মৃত্যু হয়। রটিয়ে দেয়া হয় মুসলমানেরা আগুন দিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লেগে যায়। উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা মুসলমানদের হত্যা করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। যেখানে মুসলমান পেয়েছে কুপিয়েছে, পুড়িয়েছে, ইট দিয়ে আঘাত করে মাথা থেঁতলে দিয়ে হত্যা করেছে। এমনকি গর্ভবতী মহিলার পেট কেটে বাচ্চা বের করে হত্যা করে। মুসলমানদের বাড়িঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। প্রায় দুই হাজার মুসলমানকে হত্যা করা হয়। অভিযোগ ওঠে, ট্রেনে আগুন দেয়ার নেপথ্যে হিসেবে কাজ করেন নরেন্দ্র মোদি। তদন্তে বিষয়টি ফাঁস হয়। বলা হয় পরিকল্পিতভাবে ঘটনাটি ঘটানো হয় শুধু মুসলমানদের আক্রমণ করার জন্য। এর সাথে তিনি গুজরাটের জনগণের দুরবস্থা এমনভাবে সৃষ্টি করে ছিলেন, যা ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে ভয়াবহ। এই পরিস্থিতি এখনো চলছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ২০০২ সালে ভারতের গুজরাটে এক ভয়ঙ্কর মুসলিম বিরোধী অভিযানে মোদি সরকারের কুচক্রান্তে যে অসংখ্য মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছিল। তার প্রতিক্রিয়া হয়েছিল সারা বিশ্বে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত ছিল নরেন্দ্র মোদি বিরোধী। ২০০২ সালে তিনি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় একবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য ভিসার আবেদন করলে তার আবেদন তারা প্রত্যাখ্যান করে। তারা তাকে কোন ভিসা দেয়নি। বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, নরেন্দ্র মোদিকে ভিসা না দেওয়ার বিরুদ্ধে ভারতের তৎকালীন অসাম্প্রদায়িক কংগ্রেস সরকারের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং সরকারিভাবে প্রতিবাদ করেন। এসব থেকে বুঝার অসুবিধা নেই যে, নরেন্দ্র মোদি হিন্দুত্ববাদী সরকার ভারতে ‘অসম্প্রদায়িক’ কংগ্রেস সরকারেরই পরবর্তী সংস্করণ। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, এর ঠিক পূর্বে নরেন্দ্র মোদি কাশ্মীরের মেহবুবা মুফতির দলের সঙ্গে বিজেপির কোয়ালিশন সরকার গঠন করে ছিলেন।
ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫(এ) ধারা বাতিল করে কাশ্মীরকে ভারতের অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের কাতারে দাঁড় করিয়েছে। আগে ভারতীয়দের জমি কেনা, ব্যবসা বাণিজ্য, শিল্প কারখানা, চাকরি নিষিদ্ধ ছিল। এখন ভারতীয়রা সেখানে জমি কিনতে পারবে। অর্থাৎ এসব ক্ষেত্রে ভারতের অন্যান্য রাজ্যের লোকদের জন্য নানা ধরনের সুযোগ সৃষ্টি করে কাশ্মীরেদের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আরো পিছনে ফেলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তা ছাড়া এ ক্ষেত্রে তাদের একটি বড় চক্রান্ত চলছে। কাশ্মীরে ভারতীয় হিন্দুদের বসতি স্থাপন করে মুসলমানদের সংখ্যালঘুতে পরিণত করা। কর্পোরেট হাউজগুলোর জন্য কাশ্মীরের বড় আকারের বিনিয়োগের পথ পরিষ্কার করা হয়েছে। এটাই স্বাভাবিক, ভারতে এখন সরকারের সঙ্গে কর্পোরেটগুলো একীভূত হয়ে সেখানে তাদের জন্য ব্যাপক লুটপাটের পথ উন্মুক্ত করা হয়েছে। সরকারের সঙ্গে কর্পোরেটগুলো একীভূত হয়ে এখন কাশ্মীরের জনগণের নির্যাতনের পথ পাকাপোক্ত করা হয়েছে। ভারত সরকার এখন হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট সরকারে পরিণত হয়েছে এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply