কুরআনের আলো মুছে ফেলা যায় না

 

يُرِيدُونَ لِيُطْفِئُوا نُورَ اللَّهِ بِأَفْوَاهِهِمْ وَاللَّهُ مُتِمُّ نُورِهِ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَimages
অনুবাদ: তারা তাদের মুখের ফুৎকারে আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ তাঁর নূরকে পূর্ণতাদানকারী। যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে। তিনিই তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্যদ্বীন সহকারে প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি সকল দ্বীনের উপর তা বিজয়ী করে দেন। যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে। (সূরা ছফ-৮-৯)

আয়াতের ব্যাখ্যা:
يُرِيدُونَ لِيُطْفِئُوا نُورَ اللَّهِ بِأَفْوَاهِهِمْ وَاللَّهُ مُتِمُّ نُورِهِ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ
এরা তাদের মুখের ফুঁ দিয়ে আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়। অথচ আল্লাহর ফয়সালা হলো তিনি তাঁর নূরকে পূর্ণরূপে বিকশিত করবেন। কাফেররা তা যতই অপছন্দ করুক না কেন।
পূর্বেই বলা হয়েছে, এ আয়াতটি ৩ হিজরী সনে ওহুদ যুদ্ধের পরে নাযীল হয়েছিল। সে সময় ইসলাম কেবল মদীনা শহরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, মুসলমানদের সংখ্যা কয়েক হাজারের বেশী ছিল না এবং গোটা আরবভূমি দ্বীন ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার জন্য পুরোপুরি সংকল্পবদ্ধ ছিল। ওহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের সাময়িক পরাজয় হয়েছিল, হযরত আমীর হামজার মত বীর সেনানীসহ ৭০জন সাহাবী শাহাদত বরণ করেন। এ যুদ্ধের ফলে মুসলমানদের প্রভাব-প্রতিপত্তি একদিকে যেমন ক্ষুন্ন হয়েছিল, অন্যদিকে ইসলাম বিরোধী গোষ্ঠি ও আশেপাশের গোত্রসমূহ তাদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সাহসী হয়ে উঠেছিল। এরূপ পরিস্থিতিতে মুসলমানদেরকে আল্লাহ বলে দিলেন, আল্লাহর এই ‘নূর’ কারো নিভিয়ে দেয়াতে নিভবে না, বরং পূর্ণরূপে উদ্ভাসিত হবে এবং সারা পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে। এটা একটা স্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী, যা অক্ষরে অক্ষরে সত্যে প্রমাণিত হয়েছে।

ইসলামী আন্দোলনের ভবিষ্যত কি তা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। সে সময়ও কি কেউ তা জানতো? মানুষ তো তখন দিব্যি দেখছিল, এটা একটা নিভু নিভু প্রদীপ যা নিভিয়ে ফেলার জন্য প্রচ- ঝড়ো বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। কিন্তু সে নিভু নিভু আলো সারা আবরকে আলোকিত করে। হযরত ওমর (রা.) এর খেলাফতকালে আরবের গ-ি পেরিয়ে অর্ধ পৃথিবী আলোকিত করে।
বর্তমান সময়ে ইসলামী আন্দোলনের উপর দিয়ে ঝড়ো বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। প্রতিদিনই নির্বিচারে গুলি করে শহীদ করার ঘটনা ঘটছে, অনেককে গুম করে ফেলা হচ্ছে, বাড়ী-ঘর ভাংচুর করা হচ্ছে। এ অবস্থায় যারা নির্যাতন করছে তারা মনে করছে এভাবে অত্যাচার করে ইসলামী আন্দোলনকে বাংলাদেশ থেকে নিঃশেষ করে ফেলা যাবে। আবার অনেকের মনে এই ধারণার উদ্রেক হয়েছে, মনেহয় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশে আর টিকে থাকতে পারবে না; নিঃশেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা আল-কুরআনে ঘোষণা দিয়েছেন ইসলামের নূরকে এই পৃথিবী থেকে কেউ নিভিয়ে দিতে পারবে না। বরং আল্লাহ এ নূরকে জ্বালিয়ে রাখবেন এবং পূর্ণতা দান করবেন।
তবে যারা ইসলামের পতাকাবাহী তাদেরকে এ কঠিন অবস্থায় ঈমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা মাঝে-মধ্যে মু’মিনদের উপর বিপদ-মুসিবত দিয়ে ঈমানের পরীক্ষা গ্রহণ করে থাকেন। আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে-
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ  الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
“আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জানÑমাল ও ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। তাদের উপর যখন বিপদ-মুসিবত আসে তখন বলে, নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। (সূরা আল-বাকারা, ১৫৫-১৫৬)
আল্লাহ তা‘আলা যুগে যুগে সকল নবী-রাসূল এবং তাঁদের উপরে যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকে এই পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের ঈমানকে যাচাই-বাছাই করে নিয়েছেন। আল্লাহ বলেছেন-
أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ  وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ
“মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না? আর আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা করেছি। ফলে আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন, কারা (ঈমানের দাবিতে) সত্যবাদী এবং কারা মিথ্যাবাদী।” (সূরা আনকাবুত, ২-৩)
সূরা আল-বাকারার মধ্যে আল্লাহ আরো স্পষ্ট করে বলেছেন-
أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُمْ مَثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِنْ قَبْلِكُمْ مَسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَزُلْزِلُوا حَتَّى يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَى نَصْرُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ نَصْرَ اللَّهِ قَرِيبٌ
“তোমরা কি ভেবেছ যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে অথচ এখনো তোমাদের নিকট তাদের মত কিছু আসেনি, যারা তোমাদের পূর্বে বিগত হয়েছে। তাদেরকে স্পর্শ করেছিল কষ্ট ও দুর্দশা এবং তারা কম্পিত হয়েছিল। এমনকি রাসূল ও তার সাথী মু’মিনগণ বলেছিল, ‘কখন আল্ল¬াহর সাহায্য (আসবে)’? জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্ল¬াহর সাহায্য নিকটবর্তী।” (সূরা আল-বাকারা, ২১৪)
এ আয়াত যেন ঘোষণা দিচ্ছে, ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের ক্রস ফায়ার, গুম, জেল-জুলুম ও শাহাদতের মাধ্যমে দুনিয়া থেকে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্য বাতিল শক্তি চেষ্টা করবে; কিন্তু তাদের সে চেষ্টা সফল হবে না। কারণ নির্যাতন করে, শহীদ করে, জেল-জুলুম দিয়ে কখনোই ইসলামী আন্দোলনকে পৃথিবী থেকে শেষ করা যায় না। বরং শাহাদতের রক্তের সিড়ি বেয়ে ইসলামী আন্দোলনের ভিত আরো মজবুত হতে থাকে এবং ইসলামী বিপ্লবের পথ আরো প্রসস্ত হতে থাকে। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের কখনো মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে হকের রাস্তা থেকে দূরে সরানো সম্ভব হয় না, কারণ তারা জানে এ রাস্তায় যদি জীবন দেওয়া যায় সে মৃত্যু মৃত্যু নয় তার অপর নাম হচ্ছে জীবন। আল্লাহ বলেন-
وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ يُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتٌ بَلْ أَحْيَاءٌ وَلَكِنْ لَا تَشْعُرُونَ
“যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়, তাদেরকে মৃত বলো না। বরং তারা জীবিত; কিন্তু তোমরা অনুভব করতে পার না।” (সূরা আল-বাকারা, ১৫৪)
আল্লাহ জান্নাতের বিনিময়ে মু’মিনদের কাছ থেকে তাদের জীবন ও মাল ক্রয় করে নিয়েছেন। আল্লাহ বলেন-
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ
“নিশ্চয় আল্লাহ মু’মিনদের থেকে তাদের জান ও মাল ক্রয় করে নিয়েছেন (এর বিনিময়ে) যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত।” (সূরা আত-তাওবা, ১১১)

সত্যিকার ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা আরো জানে তার মৃত্যুর ফয়সালা আল্লাহর খাতায় লেখা না থাকলে কখনো তার মৃত্যু হবে না। আর যদি মৃত্যু লেখা থাকে তাহলে কেউ তাকে বাঁচাতে পারবে না। আল্লাহ বলেন-
لِكُلِّ أُمَّةٍ أَجَلٌ إِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ فَلَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ
“প্রত্যেক উম্মতের রয়েছে নির্দিষ্ট একটি সময়। যখন এসে যায় তাদের সময়, তখন এক মুহূর্ত পিছাতে পারে না এবং এগোতেও পারে না।” (সূরা ইউনূচ, ৪৯)
وَمَا كَانَ لِنَفْسٍ أَنْ تَمُوتَ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ كِتَابًا مُؤَجَّلًا
“আর কোন প্রাণী আল্ল¬াহর অনুমতি ছাড়া মারা যায় না, তা নির্দিষ্টভাবে লিখিত আছে।” (সূরা আলে-ইমরান-১৪৫)
وَلَنْ يُؤَخِّرَ اللَّهُ نَفْسًا إِذَا جَاءَ أَجَلُهَا
“আর আল্লাহ কখনো কোন প্রাণকেই অবকাশ দেবেন না, যখন তার নির্ধারিত সময় এসে যাবে।” (সূরা মুনাফিকুন, ১১)
আল-কুরআন মৃত্যুর ব্যাপারে আরো স্পষ্ট করে বলেছে-
قُلْ لَوْ كُنْتُمْ فِي بُيُوتِكُمْ لَبَرَزَ الَّذِينَ كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقَتْلُ إِلَى مَضَاجِعِهِمْ
“বল, ‘তোমরা যদি তোমাদের ঘরে থাকতে তাহলেও যাদের ব্যাপারে নিহত হওয়া অবধারিত রয়েছে, অবশ্যই তারা তাদের নিহত হওয়ার স্থলের দিকে বের হয়ে যাবে।” (সূরা আলে-ইমরান, ১৫৪)

সুতরাং আল্লাহর রাস্তায় যারা সংগ্রাম করে তাদের এই বিশ্বাস থাকতে হবে, তার মৃত্যু যদি পুলিশের গুলিতে লেখা থাকে তাহলে সেখানেই তার মৃত্যু হবে, আবার যদি মৃত্যু লেখা না থাকে তাহলে কেউ তাকে হত্যা করতে পারবে না। আর যদি তিনি এ পথে শহীদ হয় তাহলে তার জন্য রয়েছে আল্লাহর নিয়ামতে ভরা অনন্ত জান্নাত। কারণ এই দুনিয়ার ভোগসামগ্রী আখেরাতের সফলতার তুলনায় মু’মিনদের কাছে খুবই নগন্য। দুনিয়া ও আখেরাতের তুলনা সম্পর্কে আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
الْآخِرَةِ إِلَّا مِثْلُ مَا يَجْعَلُ أَحَدُكُمْ إِصْبَعَهُ هَذِهِ عَنْ مُسْتَوْرِدًا قاَلَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَاللَّهِ مَا الدُّنْيَا فِي
“হযরত মুসতাওরিদ (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, আল্লাহর শপথ! পরকালের তুলনায় দুনিয়া এতটুকু যে তোমাদের কেউ যদি তার এই আঙ্গুল সমুদ্রে ডুবিয়ে বের করে আনে, অতপর সে দেখবে যে, এই আঙ্গুল কতটুকু নিয়ে ফিরছে।” (সহীহ মুসলিম ও তিরমিযি)

ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা জানে দুনিয়ার জীবন খুবই ক্ষণস্থায়ী, মৃত্যুর পরেই তাদের জীবনের মূল যাত্রা শুরু হবে। এ জন্য মু’মিন পৃথিবীতে ইসলামের স্বার্থে যেকোন পরিণতি ভোগ করতে প্রস্তুত থাকে। এহেন মুত্তাকী অবস্থায় যদি তার মৃত্যু হয় তাহলে তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে লাল গালিচা সংবর্ধনা অপেক্ষা করছে। এ সম্পর্কে আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে-
وَسِيقَ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ إِلَى الْجَنَّةِ زُمَرًا حَتَّى إِذَا جَاءُوهَا وَفُتِحَتْ أَبْوَابُهَا وَقَالَ لَهُمْ خَزَنَتُهَا سَلَامٌ عَلَيْكُمْ طِبْتُمْ فَادْخُلُوهَا خَالِدِينَ
“আর যারা তাদের রবকে ভয় করেছে তাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। অবশেষে তারা যখন সেখানে এসে পৌঁছবে এবং এর দরজাসমূহ খুলে দেয়া হবে তখন জান্নাতের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে, তোমাদের প্রতি সালাম, তোমরা ভাল ছিলে। অতএব স্থায়ীভাবে থাকার জন্য এখানে প্রবেশ কর।” (সূরা যুমার, ৭৩)

আল্লাহ তা‘আলা উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহর নূর বা দ্বীন ইসলামকে পৃথিবীর কেউ নিভিয়ে দিতে পারবে না বলে ঘোষণা দেওয়ার পর পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ বলেন, সে দ্বীনকে পৃথিবীতে বিদ্যমান সকল দ্বীনের উপরে বিজয়ী করার জন্য নবী মুহাম্মদ (সা.) কে পাঠানো হয়েছে। আল্লাহর বাণী-
هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَىٰ وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ
“তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি তাঁর রসূলকে হিদায়াত এবং ‘দ্বীনে হক’ দিয়ে পাঠিয়েছেন যাতে তিনি এ দ্বীনকে অন্য সকল দ্বীনের ওপর বিজয়ী করেন, চাই তা মুশরিকদের কাছে যতই অসহনীয় হোক না কেন।”

এ আয়াতে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর দাসত্বের সাথে অন্যদের দাসত্বও করে থাকে এবং আল্লাহর দ্বীনের সাথে অন্য সব দ্বীন ও বিধানকে সংমিশ্রিত করে, শুধু এক আল্লাহর আনুগত্য ও হিদায়াতের ওপর গোটা জীবনব্যবস্থা কায়েম হোক তারা তা চায় না। যারা ইচ্ছামত যে কোন প্রভু ও উপাস্যের দাসত্ব করতে সংকল্পবদ্ধ এবং যে কোন দর্শন ও মতবাদের ওপর নিজেদের আকীদা-বিশ্বাস, নৈতিকতা এবং তাহযীব-তামুদ্দুনের ভিত্তিস্থাপন করতে চায় তাদের সাথে আপোষ করার জন্য আল্লাহর রসূলকে পাঠানো হয়নি। বরং তাকে পাঠানো হয়েছে এ জন্য যে, তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে যে হিদায়াত ও জীবনব্যবস্থা এনেছেন তাকে গোটা জীবনের সব দিক ও বিভাগের ওপর বিজয়ী করে দেবেন।
সেখানে এমন দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হবে যার গোটা সমাজ তাওহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত। সেখানে নৈতিক চরিত্র, সভ্যতা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, আইন-কানুন, রীতি-নীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি মোটকথা জীবনের প্রতিটি বিভাগের জন্য আকীদা-বিশ¡াস হিসেবে সে সব মূলনীতি মেনে নেওয়া বা চালু করা যা মহান আল্লাহ তাঁর কিতাব ও রাসূল (সা.) এর মাধ্যমে দিয়েছেন। আল্লাহর দ্বীন যেটিকে গোনাহ বলবে আইন সেটিকেই অপরাধ হিসেবে গণ্য করবে, সরকারের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা সেগুলোকে উৎখাত করার চেষ্টা করবে, শিক্ষা-দীক্ষা সেটি থেকে বাঁচার জন্য মন মানসিকতা তৈরী করবে। মিম্বার ও মিহরাব থেকে এর বিরুদ্ধেই আওয়াজ উঠবে, সমাজ এটিকে দোষণীয় মনে করবে এবং জীবিকা অর্জনের প্রতিটি কাজ-কারবারে তা নিষিদ্ধ হবে। অনুরূপভাবে আল্লাহর দ্বীন যে জিনিসকে কল্যাণ হিসেবে আখ্যায়িত করবে আইন তাকেই সমর্থন করবে। গোটা শিক্ষা ব্যবস্থা মন-মগজে সেটিকে বদ্ধমূল করতে এবং চরিত্র ও কর্মে প্রতিফলিত করার চেষ্টা করবে। মিম্বর ও মিহরাব তারই শিক্ষা দিবে, সমাজও তারই প্রশংসা করবে।
ইসলামের এই বিধান পৃথিবীতে যাতে প্রতিষ্ঠিত না হয় সেজন্য ইসলামী বিরোধী শক্তির পক্ষ থেকে আপোষ করার দাওয়াত দেওয়া হবে, এতে রাজি না হলে যুলুম-নির্যাতন করে মুসলমানদের শক্তি খর্ব করার চেষ্টা করবে এর পরেও কোন অবস্থাতেই আপোষ করা যাবে না। কুরাইশদের পক্ষ থেকে রাসূল (সা.) কে আপোষ রফা করার জন্য অনেক চেষ্টা করা হয়েছে, আরবের সবচেয়ে সুন্দরী নারী দিতে চেয়েছে, জবাবে রাসূল (সা.) বলেছেন, আমার একহাতে যদি চন্দ্র এনে দেওয়া হয়, আর অন্যহাতে সূর্য এনে দেওয়া হয় এর পরেও দ্বীন প্রতিষ্ঠার এই কাজ থেকে আমি বিরত হব না। এর পরে তারা যুলুম-নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েছে।
আল্লাহর রাসূল (সা.) তার নবুয়াতের ২৩ বছরে ইসলামের এই পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা বা দ্বীন প্রতিষ্ঠা করার জন্যই চেষ্টা করেছেন। এ চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি এবং তাঁর সাহাবীগণ অসংখ্যবার ইসলাম বিরোধী শক্তির ষঢ়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। শি’বে আবু তালেবে ৩বছর বন্দি জীবন-যাপন করতে হয়েছে, অসংখ্য সাহাবীকে শহীদ হতে হয়েছে, রাত্রের আধাঁরে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করে চলে যেতে হয়েছে। হিজরত করে মদীনায় চলে গিয়েও শান্তিতে থাকতে পারনেনি, হিজরতের পরের বছর মক্কার কফেররা মদীনা আক্রমন করে, রাসূল (সা.) বদর প্রান্তরে তাদের প্রতিরোধ করেন। এর পরের বছর আবার তারা মদীনা আক্রমন করে, রাসূল (সা.) সাহাবীদেরকে নিয়ে উহুদের ময়দানে তাদের প্রতিরোধ করেন, তার ২বছর পর আবার মদীনা আক্রমন করে, রাসূল (সা.) পেটে পাথর বেঁধে পরিখা খনন করে মদীনাকে রক্ষা করেন। এছাড়া খায়বার, হুনাইন, তাবুক অভিযানের মত বড় বড় যুদ্ধ পরিচালনার মাধ্যমে কাফির শক্তির মুকাবেলা করে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করেছেন।

দ্বীন প্রতিষ্ঠার এই দায়িত্ব শুধু মুহাম্মদ (সা.) কেই দেন নাই, এই পৃথিবীর সকল নবী-রাসূলগণকে আল্লাহ তা‘আলা ইকামতে দ্বীনের এ দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আল্লাহ বলেন-
شَرَعَ لَكُمْ مِنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ
“তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনকে বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন; যে বিষয়ে তিনি নূহকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, আর আমি তোমার কাছে যে ওহী পাঠিয়েছি এবং ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে যে নির্দেশ দিয়েছিলাম তা হল, তোমরা দ্বীন কায়েম করবে এবং এ ব্যাপারে বিচ্ছিন্ন হবে না।” (সূরা শুরা, ১৩)

শুধু রাসূল (সা.)ই নয় ইকামতে দ্বীনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণদেরকেও অনেক যুলুম-নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। বর্তমান সময়েও যারা ইকামতে দ্বীনের দায়িত্ব পালন করবেন তাদেরকেউ যুলুম-নির্যাতন সহ্য করতে হবে, শাহাদতের নজরানা পেশ করতে হবে, ঘর-বাড়ী ছাড়া হতে হবে, এর পরেও দ্বীনে হকের রাস্তা থেকে একচুলও সরে যাওয়ার সুযোগ ইসলাম দেয় নাই। জীবন যতক্ষণ থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত জান-মালের বিনিময়ে ইকামতে দ্বীনের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। এ পথেই রয়েছে নিয়ামতে ভরা জান্নাত। আল্লাহ বলেন-
تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ  يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَيُدْخِلْكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ
“তোমরা আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে এবং তোমরা তোমাদের ধনÑসম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা জানতে। তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দিবেন। আর তোমাদেরকে এমন জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন যার তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত। (সূরা আস-সফ, ১১-১৩)

মু’মিন এই চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালাবে ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ এই পৃথিবী থেকে ইসলাম ছাড়া সকল বাতিল জীবন ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে মূলতপাটন না হয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন-
وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ لِلَّهِ
“আর তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর যে পর্যন্ত না ফিতনা খতম হয়ে যায় এবং দ্বীন আল্লাহর জন্য হয়ে যায়।” (সূরা আল-বাকারা, ১৯৩, সূরা আনফাল, ৩৯)

দ্বীন বিজয় হোক আর না হোক এ কাজ চলিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব মু’মিনের। দ্বীন বিজয় হলেও মু’মিন আল্লাহর কাছে প্রতিদান পাবে, আবার বিজয় না হলেও প্রতিদান পাবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন-
فَلْيُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يَشْرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا بِالْآخِرَةِ وَمَنْ يُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيُقْتَلْ أَوْ يَغْلِبْ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا
“সুতরাং যারা আখিরাতের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবন বিক্রয় করে তারা যেন আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করে। আর যে আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করবে অতঃপর সে নিহত হোক কিংবা বিজয়ী হোক, অচিরেই আমি তাকে মহা পুরস্কার দেব।” (সূরা আন-নিসা, ৭৪)

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এ কথা বলা যায়, ইসলামী আন্দোলনের পথ কখনো ফুল বিছানো ছিল না, বরং এ পথ কন্টকাকীর্ণ। তাই শত বিপদ-মুসিবতের মাঝেও ধৈর্য অবলম্বনের মাধ্যমে শাহাদতের তামান্না অন্তরে পোষণ করে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে।

SHARE

Leave a Reply