কেজরিওয়ালের দিল্লি জয়

মু. সাজ্জাদ হোসাইন

cs১২০ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত ভারত এখন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ। ভারতের বর্তমান ভোটার সংখ্যা ৮০ কোটির ওপরে। বৃহত্তম ভারতের সংসদ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট- উচ্চকক্ষ এবং নিন্মকক্ষ। উচ্চকক্ষকে বলা হয় লোকসভা এবং নিন্মকক্ষকে বলা হয় বিধানসভা (legislative assembly)। বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের মোট ২৯টি রাজ্য এবং ৭টি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। এ ৭টি অঞ্চলের মধ্যে কেবলমাত্র দিল্লি এবং পুন্ডেচেরিতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দিয়ে শাসনকার্য পরিচালিত হয়। আর বাকি ৫টি অঞ্চলে কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক প্রশাসন দিয়ে শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয়ে থাকে। ভারতের রাজধানী দিল্লিতে কেজরিওয়ালের উত্থান অনেকটা মুম্বাই ফিল্ম স্টারদের মতো। তিনি এলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন। মাত্র কয়েক বছর আগেও কেজরিওয়াল ছিলেন সাধারণ মানুষের কাতারে। অবশ্য এখনও তিনি নিজেকে সাধারণ মানুষ ভাবতেই পছন্দ করেন।
গত ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সালের দিল্লির বিধান সভা নির্বাচনে ndtv বুথ ফেরত একটি জরিপ চালায়। সেখানে তারা প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, কেজরিওয়ালের নেতৃত্বাধীন আম আদমিপার্টি (AAP) যাকে সংক্ষেপে এখন আপ বলা হচ্ছে। বড়জোর ৪২টি আসন পেতে পারে। কিন্তু সবাইকে তাক লাগিয়ে আমআদমি পার্টি সর্বমোট ৭০টির মধ্যে ৬৭টি আসন জিতে নেয় এবং বিজেপি পায় ৩টি আর ১৩ বছর শাসন করা কংগ্রেস নিশ্চিহ্ন হয়। যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নতুন করে ভাবতে এবং গবেষণা করার খোরাক জোগিয়েছে। কংগ্রেস এবং বিজেপিকে করেছে আতঙ্কিত। ৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সর্বমোট ভোট পড়ছে ৬৩.৪৬ শতাংশ। নির্বাচনের আগে মোদির বিজেপি সমর্থিত কিরণ বেদি যিনি আগে জেলপুলিশের অফিসার ছিলেন এবং তার পেশায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাকে নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালায় এবং আশায় বুক বাঁধে যে তিনি বিজয় ছিনিয়ে আনবেন। নির্বাচনে কেজরিওয়ালের মার্কা ছিল ঝাড়–। সাধারণ জনগণ এই প্রত্যাশায় কেজরিওয়ালকে ভোট দিয়েছে যে, তিনি ঝাড়– দিয়ে দিল্লিকে দুর্নীতিমুক্ত করবেন এবং প্রশাসনের সকল প্রকার দুর্নীতি সকল স্তর থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করবেন। অপর দিকে ৬৫ বছর বয়স্কা কিরণ বেদি চেয়েছিলেন জনতার মাঝে পদ্মফুলের সুভাস ছড়িয়ে দিতে। কিন্তু জনগণ সেটা যে গ্রহণ করেনি তা নির্বাচনের ফলাফলেই বোঝা যায়। দিল্লি বিধানসভায় মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল প্রায় এক কোটি তেত্রিশ লাখ।

কে এই কেজরিওয়াল
দিল্লির অষ্টম মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল ছিলেন ভারতের একজন কর অফিসার। তার স্ত্রীও কর বিভাগে কর্মরত ছিলেন। সর্বশেষ যুগ্ম কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন কেজরিওয়াল। এর আগে ভারতের সর্ববৃহৎ কোম্পানি টাটায় চাকরি করতেন তিনি। সরকারি চাকরি করতে গিয়ে কেজরিওয়াল প্রত্যক্ষ করেন প্রশাসনের সব রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্র্নীতি আর ঘুষ কেলেঙ্কারি আর তাতেই বিষিয়ে ওঠে তার মন। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন প্রতিবাদ জানানোর। ২০১১ সালে দিল্লির রামলীলা ময়দানে যখন আন্নাহাজারে দুর্নীতি বিরোধী অনশন করেছিলেন। তখন তিনিও তার সাথে যোগ দেন এবং দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন পরিচালনা করতে থাকেন। মাত্র চার বছর পরে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি সেই রামলীলা ময়দানেই তিনি দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
কেজরিওয়ালের জন্ম ১৯৬৮ সালের ১৬ আগস্ট হারিয়ানা রাজ্যের শিবানীতে। তার দাদা চেয়েছিলেন, কেজরিওয়াল একজন ভালো ডাক্তার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করুক। কিন্তু কেজরিওয়ালের মনে ছিলো ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার বাসনা। তিনি খরগপুর আইআইটি থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ¯œাতক সম্পন্ন করেন। তার পরপরই টাটায় যোগদান করেন। তার পিতাও একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি বিবাহিত এবং দুই সন্তানের জনক। কেজরিওয়াল সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার জন্য এশিয়ার নোবেল পুরস্কার বলে খ্যাত র‌্যামন ম্যাগসাসে পুরস্কার লাভ করেন।

দিল্লি এবং আমআদমি পার্টি
যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত দিল্লি। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্টশতকে এ অঞ্চলে জনবসতির উন্মেষ ঘটে। দিল্লি অঞ্চলে একাধিক প্রাচীন এবং মধ্যযুগীয় সৌধ, প্রতœস্থল ও প্রতœতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষের দেখা মেলে। ১৬৪৯ থেকে ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দিল্লি ছিলো মুঘল সা¤্রাজ্যের রাজধানী। ১৯১১ সালে রাজা পঞ্চম জর্জ পুনরায় দিল্লিতে রাজধানী স্থানান্তর করেন। ১৯২০ এর দশকে পুরনো দিল্লির দক্ষিণে নতুনদিল্লি নামে নতুন এক রাজধানী শহর নির্মিত হয়। স্বাধীনতার পর দিল্লি ভারত সরকারের কেন্দ্রবিন্দু অর্থাৎ রাজধানীতে পরিণত হয়। নয়াদিল্লি মহানগর এবং চার পাশের ১১টি জেলা নিয়ে দিল্লি প্রশাসনিক অঞ্চল গঠিত। এতে সংসদীয় আসন রয়েছে ৭টি।
২০১২ সালের ২৬ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় আমআদমি পার্টি। আন্নাহাজারে এবং কেজরিওয়াল ভারতের সরকারের বিরুদ্ধে ‘India against corruption’ আন্দোলন পরিচালনা করছিলেন দিল্লির রামলীলা ময়দানে। আর সে আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন আন্নাহাজারে।
মিডিয়ার কল্যাণে আন্নাহাজারে নাম বেশ শোনা  গেলেও কেজরিওয়ালের নাম তখন পর্যন্ত মানুষের মাঝে খুব বেশি শোনা যাচ্ছিল না। দুর্নীতিবিরোধী এ আন্দোলনের রাজনৈতিক রূপ দেয়া নিয়ে আন্নাহাজারে এবং কেজরিওয়ালের মধ্যে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়। কেজরিওয়াল চাচ্ছিলেন রাজনৈতিক রূপ দেয়ার মাধ্যমে আন্দোলনকে শক্তিশালী করতে। আন্নাহাজারের ভিন্নমত ছিল। কেজরিওয়াল তাঁর মতাবলম্বীদের নিয়ে ২০১২ সালেই আমআদমি পার্টি গঠন করেন। সবাইকে তাক লাগিয়ে ২৮টি আসন জিতে নেন। অন্য দিকে ’১৩ সালের নির্বাচনে বিজেপি ৩১ আসনে জয় পায়। প্রথম মেয়াদে অর্থাৎ ২৮ ডিসেম্বর ২০১৩ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ পর্যন্ত সর্বমোট ৪৯ দিন ক্ষমতায় থেকে ৫০তম দিনে পদত্যাগ করেন। তার দলের সংখ্যাগষ্ঠিতা না থাকায় বিধানসভায় দুর্নীতিবিরোধী বিল পাস করাতে ব্যর্থ হন এবং তিনি পদত্যাগ করেন।

বিজেপির পরাজয়ের কারণ
ভারতের আরেক ক্যারিসমেটিক নেতা হলেন নরেন্দ্র মোদি। চা-বিক্রেতা থেকে ভারতের মতো পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষমতাধর আসনে বসা রূপকথাকেও হার মানায়। নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় এসেছেন এক বছরও হয়নি। এর মধ্যে রাজধানী অঞ্চলে অরবিন্দ্র কেজরিওয়ালের উত্থান ভাবিয়ে তুলেছে বিজেপির রথী-মহারথীদের। ভারতের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ সুরজিত এস ভালা Daily Indian Express এ বিজেপির পরাজয়ের বেশ কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেন। এর মধ্যে লাভ জিহাদ তথা তরুণ ভারতীয়দের ব্যক্তিগত জীবনে হানা দিয়ে বিজেপি তার জনপ্রিয়তা কমিয়েছে। ঘর ওয়াপাসি অর্থাৎ ধর্মান্তরকরণের মাধ্যমে অন্য ধর্মের লোকজনের হিন্দু ধর্মে নিয়ে আসার ব্যাপারটি, অন্যধর্মের ভোটাররা ভালোভাবে নেয়নি। তারা ভোটের মাধ্যমেই বুঝিয়ে দিয়েছে মোদিদেরকে।
ইহুদি ব্রাহ্মণ বলে পরিচয়দানকারী যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেলডন পোলাক বলেন, মুসলমান শাসকেরা জোর করে ধর্মান্তরিত করলে ভারতে একজন হিন্দুও থাকতো না। কারণ মুসলমান শাসকরা ভারতে প্রায় বারো শ’ বছর ধরে রাজত্ব করেছিলেন।
অর্থনীতি বিশ্লেষক সুরজিত এস ভালা আরো উল্লেখ করেন, সংস্কৃতির মতো একটা ভাষাশিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ গ্রহণ বিজেপির জনপ্রিয়তায় ভাটা এনেছে। সংখ্যালঘুদের জীবনকে অনিরাপদ করে তোলা, বিশেষ করে কয়েকজন নেতার বক্তব্যে যারা হিন্দু নয় তারা হারামজাদা বলার পরও তাদেরকে বরখাস্ত না করা বিজেপির জনপ্রিয়তায় চিড় ধরিয়েছে। হিন্দু জনগণসংখ্যা ৮০% এর ওপরে নেয়ার লক্ষ্যে হিন্দু নারীদেরকে চারসন্তান জন্ম দিতে হবে এমন বক্তব্যও ভালোভাবে গ্রহণ করেনি বলে সুরজিত মনে করেন। আরেকটি বিষয় কেজিরিওয়াল ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছেন, সেটি হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভারত সফরে যখন আসেন তখন মোদি ১০ লাখ রুপি মূল্যমানের কোর্ট পরে বারাক ওবামার সাথে সাক্ষাৎ করতে যান, যা ভারতের মতো একটি গরিব দেশের জন্য মানানসই নয়। অপর দিকে সাধারণ পোশাক পরিহিত কেজরিওয়াল তার প্রচারণায় সেটি বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগান। নির্বাচিত হওয়ার পর কেজরিওয়াল ঘোষণা দেন ‘আমি জনতার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার ঘোষণা দিচ্ছি’ দেখা যাক তার বক্তব্য তিনি কতটা বাস্তবায়ন করতে পারেন। তিনি ঘুষ এবং রাঢ় সংস্কৃতি বন্ধ করার ঘোষণাও দেন। আসলেই তিনি ভারতে হাজার বছর ধরে থাকা জাতিভেদের যে অলঙ্ঘনীয় দেয়াল আছে তা ভাঙতে পারেন কি না দেখা যাবে আগামী পাঁচ বছরে।
লেখক : কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply