কোন্ পথে বাংলাদেশ?

ছাত্র সংবাদ ডেস্ক
২০১৩ সালের নভেম্বর চলছে, জাতি ও সমাজ উৎকণ্ঠিত। অতীতেও অনেকবার বাংলাদেশের মানুষ এবং সমাজ এরূপ উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তাপূর্ণ সময়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছে এবং এর জন্য যারা দায়ী, তারা কোনো দিনই এ প্রসঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করেন না। তবে বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি সঙ্কটপূর্ণ এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। দিন যত যাচ্ছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ততই বাড়ছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশ কোন্ পথে এগোচ্ছে? গন্তব্যের শেষ কোথায় প্রিয় মাতৃভিূমির? আসন্ন যে নির্বাচনের ক্ষণ গুনছে দেশবাসী, সে নির্বাচন কি আদৌ হবে? হলেও তা সবার মাঝে গ্রহণযোগ্যতা পাবে তো? জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে তাতে নাকি ২০০৮ সালের নির্বাচনের মতো করে জনমত পাল্টে দিয়ে আরেকটি আঁতাতের সরকার ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হবে? কার ওপর বর্তাবে সে সরকারের দায়িত্ব? আওয়ামী লীগ নাকি তার চেয়েও ভয়ঙ্কর ও আরো বেশি জাতিবিধ্বংসী কোনো পক্ষ? কী ঘটতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ভাগ্যে?
চারিদিকে তার হিসাব-নিকাশ শুরু হয়ে গেছে। আমরা এখানে তার কিছুটা বিশ্লেষণের অবকাশ পাবো।

অস্থিরতা ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫
১৯৭৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর। মানুষ শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে সময় কাটিয়েছিল। কেন? ১৯৭২-এর জানুয়ারির ১০ তারিখ শেখ মুজিব বাংলাদেশে ফেরত এসেছিলেন। সরকারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। সরকারি দল ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। মুক্তিযোদ্ধারা শেখ মুজিবের প্রতি অবিচল ও একনিষ্ঠ ছিল। এতদসত্ত্বেও ১৯৭২-এর অক্টোবরে বিরোধী দল হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিল জাসদ। জাসদ সরকারবিরোধী আন্দোলনে নামে। ১৯৭২ সালে সব ধরনের শিল্প জাতীয়করণ করা হয় এবং সেই জাতীয়করণ করা শিল্পগুলো লুটপাটের মাধ্যমে ধ্বংস হয়। কারণ, জাতীয়করণকৃত শিল্পগুলো পরিচালনার জন্য আন্তরিকতা ও অভিজ্ঞতার ভীষণ অভাব ছিল। ১৯৭৩-৭৪ সালে বাংলাদেশ থেকে বাইরে ও ভেতরে চোরাচালান মহামারী রূপ নেয়। চোরাচালান রোধ করার জন্য সরকারি হুকুমে সীমান্তে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বহু সেনা কর্মকর্তা তখনকার সরকারি দলের নেতাদের রোষানলে পড়েন এবং অনেকেই চাকরি হারান। জাতীয় অঙ্গনে দুর্বলতা ও আন্তর্জাতিক অসহযোগিতার কারণে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ হয় এবং অগণিত মানুষ মারা যায়।
১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের সংবিধানে মারাত্মক রকমের সংশোধনী আনা হয় অর্থাৎ বহুদলীয় গণতন্ত্রের বদলে একদলীয় গণতন্ত্র কায়েম করা হয়। সামরিক বাহিনীসহ সরকারি কর্মকর্তা ও পেশাজীবীদের একমাত্র রাজনৈতিক দলের সদস্য বানিয়ে পুরো সমাজকে একদলীয় রাজনীতিকরণ করা হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার নিমিত্তে জাতীয় রক্ষীবাহিনী নামক একটি নতুন বাহিনী সৃষ্টি করা হয়েছিল, যারা যে কোনো কারণেই হোক না কেন, জনমনে আতঙ্কের কারণ হয়, নিপীড়নকারী হিসেবে পরিচিত হয়। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের পর ধ্বংসপ্রাপ্ত ভৌত কাঠামো, দুর্বল অর্থনীতি ইত্যাদি বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল দুর্নীতি এবং আংশিকভাবে আন্তর্জাতিক অসহযোগিতা। ফলে শেখ মুজিব শত আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও সাফল্যের সঙ্গে দেশ শাসন করতে পারেননি।
১৫ আগস্ট ১৯৭৫ আওয়ামী লীগের কতিপয় জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতার মদদে সেনাবাহিনীর একটি অংশ বিদ্রোহ বা অভ্যুত্থান ঘটায়। ওই ঘটনায় শেখ মুজিব নিহত হন। আড়াই মাস পর, ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ তারিখে সেনাবাহিনীর আরেকটি অংশ ১৫ আগস্টের বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে আরেকটি বিদ্রোহ বা অভ্যুত্থান ঘটায়। ৩ নভেম্বরের বিদ্রোহীরা জেনারেল জিয়াকে গ্রেফতার করেছিলেন। এরূপ ঘন ঘন বিদ্রোহ বা প্রতি-বিদ্রোহের কারণে সেনাবাহিনী তো বটেই, দেশের জনগণও সাংঘাতিক উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ে। এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতেই ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ তারিখে সৈনিকরা একটি বিপ্লব সাধন করে এবং জেনারেল জিয়াকে মুক্ত করে। জেনারেল জিয়ার চেষ্টা ও সাহসিকতায় ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে।
জিয়া হত্যার আগে ও পরে
১৯৭৮ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমান নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান হন। তিনি তার আমলে সংবিধানে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ, সুদূরপ্রসারী ও তাৎপর্যপূর্ণ সংশোধনী আনেন। ১৯৭৫-এর জানুয়ারিতে হারিয়ে যাওয়া বহুদলীয় গণতন্ত্র আবার বহাল করেন। নিজে নতুন দল সৃষ্টি করেন। পুরনো দলগুলো পুনরুজ্জীবিত করেন, যার মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে কোণঠাসা হয়ে পড়া আওয়ামী লীগও পুনরুজ্জীবিত হয়। তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে সেনাবাহিনপ্রধান বানান। ১৯৮০ সাল থেকে সেনাবাহিনীপ্রধান ইশারা-ইঙ্গিতে তার রাজনৈতিক অভিলাষ প্রকাশ করতে থাকেন, তথা ওই সময়ের ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে তার সমালোচনা প্রকাশ করতে থাকেন। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে মুক্তিযোদ্ধা ও অমুক্তিযোদ্ধা বা পাকিস্তান ফেরত অফিসারদের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠেছিল। জিয়াউর রহমান বীরউত্তমের সরকারে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের সংশ্লেষের কারণে তার সমালোচনা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এরূপ প্রেক্ষাপটে ৩০ মে ১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম অঞ্চলের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর বীরউত্তমের নেতৃত্বে একদল সেনা অফিসার এবং তাদের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম ডিভিশনের একটি অংশ বিদ্রোহ বা ক্যু সাধন করে। সেই বিদ্রোহের প্রক্রিয়ায় জেনারেল জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে নিহত হন। বিদ্রোহকারীদের বিচার হয়। অনেকের ফাঁসি হয়, অনেকের জেল হয়।
জিয়া হত্যার পরও সাংবিধানিকভাবেই বিএনপি সরকার চালাতে থাকে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টির চেষ্টা চলে। চূড়ান্ত পর্যায়ে সরকার অদক্ষ, দেশ বিপদে আছে ইত্যাদি অভিযোগে ২৪ মার্চ ১৯৮৪ তারিখে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ একটি রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। তৎকালীন আওয়ামী লীগ এই প্রক্রিয়াকে পরোক্ষভাবে স্বাগত জানিয়েছিল।

এরশাদ আমলের আগমন, প্রস্থান এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো
সামরিক শাসক লে. জেনারেল এরশাদ নিজেকে এবং তার শাসনকে রাজনৈতিক শাসনে পরিণত করতে প্রচেষ্টা নেন। জাতীয় পার্টি সৃষ্টি করেন। সংসদ নির্বাচনের প্রয়োজন ছিল। এই সব কিছুই তিনি করান। তৎকালীন আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি একমত হয়েছিল যে, তারা কেউই এরশাদের জাতীয় পার্টির সঙ্গে নির্বাচনে যাবে না। কারণ, নির্বাচনে গেলেই জাতীয় পার্টি এবং এরশাদের সামরিক সরকার বৈধতা পাবে।
১৯৮৬ সালে সংসদ নির্বাচনটি ঐতিহাসিক ছিল। কারণ, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সরকারকে বৈধতা দেয়। এরশাদ আমলে অনেক ভালো কাজ হয়েছিল; বিশেষত প্রশাসনিক সংস্কার ও উন্নয়ন খাতে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি এরশাদ রাজনৈতিক অঙ্গনের মন জয় করতে পারেননি। অতএব, বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তার বিরুদ্ধে লেগেছিল। ১৮ অক্টোবর ১৯৯০ থেকে এরশাদ সরকারের পতনের লক্ষ্যে আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। হরতাল, ধর্মঘট, আন্তঃনগর বা আন্তঃজেলা যাতায়াত ইত্যাদি ভীষণভাবে বিঘিœত হতে থাকে।
১৮ অক্টোবর ১৯৯০ থেকে ক্রমান্বয়ে অবনতিশীল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে এবং রাষ্ট্রপতিকে সহায়তার নিমিত্তে সেনাবাহিনী ক্রমান্বয়ে নিয়োজিত হচ্ছিল। বিচ্ছিন্ন কয়েকটি স্থানে সেনা সদস্যরা জনগণের আক্রমণের শিকার হয়। জনগণ কর্তৃক সেনা সদস্যকে আক্রমণের কারণ ছিল অনেকটা এরকম- ‘তোমরা কেন স্বৈরশাসক এরশাদকে সমর্থন দিয়ে এখনও টিকিয়ে রাখছ?’ এরূপ পরিস্থিতিতে নভেম্বর ১৯৯০-এর একেবারে শেষদিকে ডাক্তার মিলন নিহত হওয়ার কারণে ঢাকা মহানগরে হঠাৎ করেই আন্দোলন তীব্রতা পায়। সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। কার্ফ্যু বা সান্ধ্য আইন জারি করা হয়। এ প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি এরশাদকে আর ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা সমীচীন কি-না, সেনাবাহিনীর মধ্যে এ প্রশ্ন দেখা দেয়। সেনা কর্তৃপক্ষ নীরব সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, সেনাবাহিনী নিজেদের বিতর্কিত ও জনবিরোধী করবে না। গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনার স্বার্থে ওই আমলের সেনাবাহিনী পরবর্তী তিন মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করে এবং বাংলাদেশে আবার নির্বাচিত সরকার ফিরে আসে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের নবযাত্রায় সরকার গঠন করে বিএনপি।

তত্ত্বাবধায়কের দাবিতে আন্দোলন
১৯৯৪ সালের শেষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি উত্থাপিত হতে থাকে। ১৯৯৫ সালে দাবি জোরালো হয়। আন্দোলন কঠোর হয়। ১৯৯৬ সালের শুরুটা জ্বলন্ত ছিল। আন্দোলনকারীরা ছিল আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতে ইসলামী। আন্দোলনের তীব্রতার ফল হচ্ছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে মোট ১৭৩ দিন হরতাল হয়েছিল, ঢাকা-চট্টগ্রাম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এবং চট্টগ্রাম বন্দর সাময়িকভাবে অচল হয়ে গিয়েছিল।
সরকারে ছিল বিএনপি। ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ নতুন করে বিএনপি সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার পর বিএনপি মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে সংবিধান সংশোধন করে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার অবসান ঘটায়। ১৯৯৬ সালের মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে বিএনপি ক্ষমতা ছেড়ে দেয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়। কিন্তু একটি অঘটন ঘটে। ১৯৯৬ সালের মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস এবং তৎকালীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান লে. জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম বীর বিক্রমের মধ্যে ঘোরতর মতপার্থক্য দেখা দেয়। এই মতপার্থক্যের প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কমান্ডার হিসেবে রাষ্ট্রপতি বিশ্বাস এবং সেনাপ্রধান হিসেবে জেনারেল নাসিম সেনাবাহিনীর ওপর কর্তৃত্ব বহাল বা অব্যাহত রাখতে নিবিড় চেষ্টা করেন। কিন্তু সেনাবাহিনী প্রধানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি অংশ এমন কিছু কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করে যেগুলোকে বিদ্রোহমূলক বা সরকার উৎখাতমূলক বলা যায়।
সেনাবাহিনীর বৃহদাংশ সেনাপ্রধানের হুকুম মানতে অস্বীকার করায় সেনাবাহিনী আনুগত্য ও শৃঙ্খলার আঙ্গিকে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। এরূপ উত্তপ্ত ও বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর দুটি অংশ প্রায় পরস্পরের মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছিল।
যা হোক, বহুমাত্রিক চেষ্টার ফলে বিদ্রোহী অংশ শান্ত হয় এবং সেনাবাহিনী ও দেশে শান্তি ফিরে আসে। ১০ জুন ১৯৯৬ অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থান পায়। তারা সরকার গঠন করে। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ বীর উত্তমের নেতৃত্বাধীন ৩ নভেম্বর ১৯৭৫-এর সেনা বিদ্রোহের মতো লে. জেনারেল নাসিম বীর বিক্রমের নেতৃত্বাধীন ২০ মে ১৯৯৬-এর ঘটনাবলীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে চিন্তাশীল ব্যক্তিদের একটি অংশ মনে করে।

অক্টোবর ২০০৬-এর রাজনৈতিক সাইক্লোন
২০০১ থেকে অক্টোবর ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি ক্ষমতায় ছিল। ক্ষমতা ছাড়ার আগে থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবে এই নিয়ে প্রচণ্ড মতবিরোধ চলছিল। ২৮ অক্টোবর ২০০৬ ঢাকার রাজপথ রাজনৈতিক রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা প্রকাশ্যেই কর্মীদের লগি-বৈঠা হাতে নিয়ে রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ২৮ অক্টোবর ঢাকা মহানগরে যে রক্তাক্ত সংঘর্ষ হয়েছিল, সেই স্মৃতি এখন পর্যন্ত কেউই ভোলেনি। তিন মাস পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তৎকালীন প্রধান লে. জেনারেল মইন ইউ আহমেদের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনী কর্তৃক তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে উৎখাত করা হয় এবং নতুন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সৃষ্টি করা হয়। ২০০৭ সালের প্রথম মাসের ১১তম দিনে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। এই ঘটনাটিকে ওয়ান-ইলেভেন বলা হয়। সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থদের দ্বারা বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার এটা দ্বিতীয় ঘটনা। প্রচুর সংখ্যক সেনা অফিসার জরুরি অবস্থা বাস্তবায়ন এবং একাধিক সংস্কারমূলক ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নে জড়িত হয়ে পড়েন। রাজনৈতিক অঙ্গন তথা রাজনৈতিক নেতাদের ওপর মারাত্মক অত্যাচার নেমে এসেছিল। তুলনামূলকভাবে বিএনপি ও বিএনপিপন্থীরা চাপ ও অত্যাচারের শিকার হয়েছিল বেশি। তখন আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা বলেছিলেন, তাদের আন্দোলনের ফসল ১/১১-এর সরকার।

১/১১-এর দুই বছর
১১ জানুয়ারি ২০০৭ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হয়নি, কিন্তু সদ্য সাবেক রাজনৈতিক সরকার তথা বিএনপির মনোনীত রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে উৎখাত করা হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটা (অর্থাৎ ১/১১) বিএনপির বিরুদ্ধেই বিপ্লব ছিল।

হাসিনার নয়া ফাঁদ
দলবাজ সরকারগুলো সব সময় মনে করে দেশের সাধারণ মানুষ রাজনীতির কূটকচাল তত বোঝে না। তাই এ ধরনের সরকারগুলো ক্ষমতায় থাকার সময় নানা ধরনের চালাকির মাধ্যমে এমন সব পদক্ষেপ নেয়, যা দিয়ে এরা মনে করে জনগণকে বোকা বানানো সম্ভব। এসব কূটচাল চালিয়ে এরা কার্যত ক্ষমতায় টিকে থাকার ব্যর্থ চেষ্টা করে। কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষ এতটা বোকা নয়। এরা ঠিকই বুঝে নেয় কোন্ পদক্ষেপটির সাথে সরকারের অসৎ উদ্দেশ্য জড়িত। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান জোট সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে নানা অজুহাতে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে। এর সাথে সরকারের চরম অসৎ উদ্দেশ্য গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট। এর মাধ্যমে সরকার স্বপ্ন দেখেছে দলীয় সরকারের অধীনে যেনতেন একটি নির্বাচন করে ক্ষমতায় টিকে থাকার। সেজন্য সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন থেকে শুরু করে বিচার ব্যবস্থায়ও চরম দলীয়করণের পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর চালিয়েছে চরম অমানবিক ও অগণতান্ত্রিক দমন-পীড়ন। নানা ধরনের মিথ্যা রাজনৈতিক মামলা দিয়ে সরকার বিরোধীদের কারাগারে পাঠিয়ে চলেছে। রিমান্ডে নিয়ে অবর্ণনীয় নির্যাতন অব্যাহত রেখেছে। হত্যা, গুম ও অপহরণের মতো ঘটনা ঘটানোর অভিযোগ উঠেছে। ভিন্নমতের সংবাদপত্র, অন্যান্য গণমাধ্যম ও টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, যাতে সরকারের অপকর্মের কোনো খবরাখবর ও সমালোচনা জনগণের কানে না পৌঁছতে পারে।
কিন্তু জনগণ সরকারের এসব কর্মকাণ্ডকে কোনোমতেই ভালো চোখে দেখছে না। কারণ, এরা ভালো করেই বোঝে, কেন ১৭৩ দিন হরতাল ও জানমালের ক্ষতি করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার আনল যে আওয়ামী লীগ; আজ কেন প্রবল জনমতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নানা কূটকৌশলে সেই আওয়ামী লীগ নির্দলীয় সরকারব্যবস্থা সংবিধান থেকে তাড়াতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। দেশের সুশীলসমাজ, সব বিরোধী দল ও দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ যেখানে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিরোধিতা করছে, সেখানে কেন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়ে এ সরকার দেশের মানুষকে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। জনগণের বুঝতে অসুবিধা হয় না- সরকার এর মাধ্যমে ক্ষমতা আঁকড়ে থেকে দেশে আবার একদলীয় বাকশাল কায়েম করতে চায়।
সরকার জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) কাটাছেঁড়া করছে দলীয় স্বার্থকে মাথায় রেখে। জাতীয় সংসদের নির্বাচনী আসনের সীমানা যথেচ্ছ বদলানো হয়েছে একতরফাভাবে নির্বাচনের ফল দলের পক্ষে টানার জন্য। এ সম্পর্কিত কোনো আপত্তি আমলে নেয়নি নির্বাচন কমিশন। আমাদের আরপিও-তে নির্বাচনী অসদাচরণের জন্য প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা আগে দেয়া ছিল নির্বাচন কমিশনের হাতে। নির্বাচন কমিশনকে প্ররোচিত করে এই ক্ষমতা আদালতের হাতে ন্যস্ত করার চেষ্টা চলেছে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে। প্রবল সমালোচনার মুখে তা করা থেকে বিরত হতে বাধ্য হয় নির্বাচন কমিশন। যেখানে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশালী করার কথা, সেখানে নির্বাচন কমিশন নিজে প্রস্তাব দেয় নিজের অর্জিত ক্ষমতা আদালতের হাতে ছেড়ে দিতে- কেন এই বৈপরীত্য, তা বোঝা কঠিন কিছু নয়।
প্রধান বিরোধী দলকে ভাঙার অপচেষ্টা হিসেবে নাম-নিশানাহীন বিএনএফ (বাংলাদেশ ন্যাশনাল ফ্রন্ট) নামের দলকে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে নিবন্ধন দেয়ার উদ্দেশ্য যে মহৎ নয়, সেটুকু বোঝার ক্ষমতা রাখে এ দেশের সাধারণ মানুষ। তাই এর প্রতিবাদ এসেছে। এর পরও নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে বিএনএফ এখন একটি নিবন্ধিত দল। একতরফা নির্বাচন হলে তা বিএনপির বিরুদ্ধে একটি মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বিএনপিতে ভাঙন সৃষ্টির অপপ্রয়াস চলবে, এটা নিশ্চিত।
অতি সম্প্রতি ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থে বিরোধী দল ভেঙে একদলীয় নির্বাচনের পথকে সুগম করার আরেকটি অপকৌশলের সূচনা করেছে এ সরকার। এ জন্য সরকার আরপিও আবার সংশোধন করেছে। আগে বিধান ছিল সংসদ নির্বাচনে কেউ কোনো দল থেকে প্রার্থী হতে চাইলে তাকে সংশ্লিষ্ট দলে অন্তত তিন বছর সদস্যপদ থাকতে হবে। এর ফলে যে কেউ কোনো দল থেকে এসে সাথে সাথে অন্য দলে যোগ দিয়ে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। এখন আরপিও সংশোধন করে এই বাধ্যবাধকতা তুলে দেয়া হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, আগামী সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের নেতাদের জন্য দলবদলের সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং এর বাইরে যেকোনো টাকাওয়ালা লোক টাকার খেলা খেলে যখন তখন যেকোনো দলে যোগ দিয়ে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন অবলীলায়। এতে যেমন প্রকৃত রাজনীতিবিদেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তেমনি চলবে হর্স ট্রেডিং, যা সামগ্রিক সুষ্ঠু রাজনীতিকে ব্যাহত করবে। বর্তমান বিরোধী দল দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে না গেলে বিএনপি নেতাকর্মীদের বাগিয়ে এনে নির্বাচন করার দুঃস্বপ্ন থেকেই সরকারের এই অপ-উদ্যোগ।
দখলবাজির ধারাবাহিকতায় ক্ষমতাসীনেরা নগরজুড়ে অসংখ্য বিলবোর্ড দখল করে এ সরকারের কথিত সাফল্যের বয়ান দেয়া শুরু করেছিলেন। এটি করতে গিয়ে প্রবল সমালোচনার মুখে ধরা খেয়ে এখন অন্য কৌশল। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দফতরের নামে এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারের টাকা ঢেলে বিরাট সব বিলবোর্ড বসানো হয়েছে। এগুলোতে বর্তমান সরকারের কৃতিত্বের কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে, যার ফাঁক ও ফোকর সচেতন মানুষের চোখ এড়ায়নি।  বিলবোর্ডে পেট্রোরেল প্রকল্পকে সরকারের মহাসাফল্যরূপে দেখানো হয়েছে। দাবি করা হয়েছে, এর কাজ শুরু হয়ে গেছে। প্রতি সাড়ে তিন মিনিট পরপরই এই ট্রেন ছাড়বে। ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী বহন করা হবে দুই দিকে। এসব জেনে যখন মেট্রোপলিটন সিটিতে মেট্রোরেলে আরামে যাতায়াতের সুখ কল্পনায় অনুভব হবে, তখনই পত্রিকায় দুঃস্বপ্নের মতো একটি সংবাদ। এখনো এ প্রকল্পের জন্য ভূমিই অধিগ্রহণ করা হয়নি! অর্থাৎ সন্তানের জন্মের আগেই তার বিয়ের তোড়জোড়।
কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনের কৃষি সংশ্লিষ্ট একটি অফিসের সামনে বিরাট বিলবোর্ডে খাদ্য উৎপাদনে আওয়ামী লীগ সরকারের মহা সাফল্যের খতিয়ান। এতে বড় বড় হরফে লেখা- ‘দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাই চাল আমদানির প্রয়োজন হয় না।’ এটি বাস্তবতা, অতিরঞ্জন, না অসত্য? আমরা জবাব না দিয়ে শুধু পত্রিকার রিপোর্ট তুলে ধরছি। ডেইলি নিউ এইজ ১৫ অক্টোবর সংখ্যায় একটি খবরের হেডিং Rice imports mark abrupt jump (চাল আমদানির আকম্মিক উল্লম্ফন)। এ রিপোর্টের শুরুটা ছিল এ রকম, “চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে চাল আমদানির পরিমাণ দ্রুত খুব বেড়ে গেছে। কারণ আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে কমে গেছে খাদ্য উৎপাদন। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, কৃষকদের জন্য বৈরী পরিস্থিতির দরুন এটি ঘটেছে। রোববার (১৩ অক্টোবর) বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত ডাটায় জানানো হয়, এবার জুলাই-আগস্ট মাসে এক বছর আগের সময়ের চেয়ে ৩২৪ দশমিক ১২ শতাংশ বেশি চাল আমদানি করা হয়েছে। ২০১২-১৩ সালের জুলাই ও আগস্টে চাল আমদানি বাবদ ৬ দশমিক ২৬ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল। এর বিপরীতে চলতি ২০১৩-১৪ সালের জুলাই-আগস্ট, এই দুই মাসে চাল আমদানিব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ৫৫ মিলিয়ন ডলারে।”
এরূপ নিত্যনতুন মিথ্যাচার করেই যাচ্ছেন আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা ও তার দলের নীতিনির্ধারকেরা। শেখ হাসিনা মুখে কোনো একটা কথা উচ্চারণ করলেই তা লুফে নিয়ে তার প্রচারে লেগে পড়েন তার একান্ত অনুগতরা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি জাতির উদ্দেশে দেয়া তার ভাষণে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। এখানে রয়েছে সরকার পক্ষের এক গভীর কূটকৌশল। এ ধরনের সর্বদলীয় সরকার গঠন করে নির্বাচন সম্পন্ন করে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে বিরোধী দলকে বোকা বানানোর একটি ফাঁদ পেতেছে বর্তমান সরকার। এখন পর্যন্ত বলা হচ্ছে, সরকারি ও বিরোধী দল থেকে সংসদ সদস্য নিয়ে একটি নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা গঠন করা হবে। আর এর প্রধান থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে। শেখ হাসিনা নিজে যেখানে প্রধানমন্ত্রী থাকবেন, সেখানে মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরা নস্যি, সাক্ষীগোপাল বৈ কিছুই হবেন না। এ ধরনের সর্বদলীয় সরকারের নির্বাচন হবে তেমন, শেখ হাসিনা চাইবেন যেমন। তখন দলীয়করণ করা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে তার ইচ্ছার নির্বাচন নির্বিঘেœ করতে কোনো অসুবিধা হবে না। তা তিনি করতে সক্ষম হলে তার পক্ষে ক্ষমতায় টিকে থাকার পথও খুলে যাবে। তখন তার দল জয়ী হলে সবাইকে বলবেন, তিনি সর্বদলীয় একটি সরকারের অধীনে নির্বাচন করে জয়ী হয়েছেন। অতএব নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে, এমনটি বলার কোনো সুযোগ বিরোধী দলের থাকবে না।
কিন্তু শেখ হাসিনার বোঝা উচিত তার প্রস্তাবিত সর্বদলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট নিজের কবর নিজেই খোঁড়ার মতো বোকামি যে করবে, এতটা বোকা বোধ হয় খালেদা জিয়াকে ভাবা ঠিক হবে না। বেগম জিয়া ভালো করেই বোঝেন, শেখ হাসিনার প্রস্তাবিত সর্বদলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার অপর অর্থ শেখ হাসিনার হাতে ব্লাংক চেক তুলে দেয়া। তা ছাড়া প্রস্তাবিত এই সর্বদলীয় সরকারের মন্ত্রিসভায় তার নিজ দল বা জোট থেকে প্রতিনিধি পাঠানোর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জোটে সন্তোষ-অসন্তোষের বিষয়টি মাথাচাড়া দেবে। শুরু হবে জোটের মধ্যে এক ধরনের মানসিক বিভাজন। বেগম জিয়া কোন্ দুঃখে এ কাজটি করতে যাবেন?
আরেকটি বিষয়, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এ দাবিটি যে এরই মধ্যে ্বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বড় ধরনের জনদাবিতে পরিণত হয়েছে, তা বোঝার ক্ষমতাও বিরোধীদলীয় নেত্রী রাখেন। বিএনপির নীতি-আদর্শ সমর্থন করে না, এমন জাতীয় দৈনিকের জনমত জরিপেও দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষ চায় আগামী জাতীয় নির্বাচন হোক নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। এ দেশের সুশীলসমাজ, সব বিরোধী দল, বাম মতাবলম্বী দলগুলো- এরা সবাই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে। অতএব বিএনপি কেন সে জনদাবির পথ ছেড়ে আওয়ামী ফাঁদে পা দেবে? সরকার পক্ষ প্রস্তাবিত তথাকথিত সর্বদলীয় সরকারের অধীনে কেন নির্বাচনে যাবে?
গত ২৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে ফোনে কথা বলেছেন। তখন তিনি বেগম খালেদা জিয়াকে ২৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় গণভবনে আলোচনায় বসার দাওয়াত দিয়েছিলেন বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধান প্রশ্নে সমঝোতায় পৌঁছার জন্য। বলা হয়েছে, তিনি ১৮ দলীয় জোটকে দাওয়াত দেননি, দাওয়াত দিয়েছেন বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ১৮ দলীয় জোটের। সেখানে ১৮ দলীয় জোট নেত্রী হিসেবে বেগম জিয়াকে দাওয়াত না দিয়ে তাকে শুধু বিএনপি নেত্রী হিসেবে দাওয়াত দেয়ার মধ্যে সরকারি দলের একটা চালাকি রয়েছে। এর মাধ্যমে ১৮ দলের মধ্যে একটা বিভাজন সৃষ্টির সূক্ষ্ম কূটকচাল রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তার ফোনালাপে বলেছেন, বেগম জিয়াকে হরতাল কর্মসূচি প্রত্যাহার করে গণভবনে আলোচনায় বসতে। সরকার পক্ষ ভেবেছিল বেগম জিয়া তৎক্ষণাৎ তিন দিনের হরতাল কর্মসূচি প্রত্যাহার করে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া গণভবনের আলোচনার দাওয়াত গ্রহণ করবেন। কিন্তু বেগম জিয়া এর যৌক্তিক জবাবই দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যেহেতু পরদিনই হরতাল এবং হরতালটি আহ্বান করা হয়েছে ১৮ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে, অতএব এককভাবে এ হরতাল প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া যাচ্ছে না। তবে পরবর্তী কোনো সময় প্রধানমন্ত্রী চাইলে আলোচনায় তিনি যাবেন ১৮ দলীয় জোট নেতাদের সাথে কথা বলে।
বেগম জিয়া যদি প্রধানমন্ত্রীর কথামতো এককভাবে হরতাল প্রত্যাহার করে পরদিনই বিএনপি নেত্রী হিসেবে গণভবনে আলোচনার দাওয়াত গ্রহণ করতেন, তবে ১৮ দলীয় জোটে বড় ধরনের অসন্তোষ দেখা দিত। এমনকি তাতে ভাঙন সৃষ্টি হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকত না। অতএব বেগম জিয়া প্রজ্ঞার সাথেই এ দাওয়াতি ফাঁদ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছেন বলতে হবে। সাধারণ মানুষ মনে করে, পরে প্রধানমন্ত্রী চাইলে এ আলোচনার জন্য আবার বেগম জিয়াকে আমন্ত্রণ জানাতে পারেন। আসলে সঙ্কট সমাধানের জন্য আর মাত্র সামান্য ক’টা দিন আমাদের হাতে। এখন যদি আমরা মতলবি কূটকচাল ছেড়ে আলোচনা ও সমঝোতার ব্যাপারে আন্তরিক প্রস্তাব বা উদ্যোগ না নিই, তবে এ সঙ্কট সমাধান হবে না; জাতি মুখোমুখি হবে অনিবার্য এক সঙ্ঘাতের। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে গণতন্ত্র। জাতিকে গুনতে হবে অপূরণীয় ক্ষতি।

উৎকণ্ঠিত কিন্তু দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বাংলাদেশ
এ মুহূর্তে আমাদের চিন্তা ও দুশ্চিন্তা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিয়ে। সাংবিধানিক সঙ্কট নিয়ে। আর এ সঙ্কট কঠিন। সঙ্কটের উৎপত্তি ২০১১ সালের জুন মাসে সংসদ কর্তৃক পঞ্চদশ সংশোধনী আনার মাধ্যমে। সঙ্কট সৃষ্টিতে বর্তমান বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের কোনো ভূমিকা নেই। তারপরও বিরোধী শিবির যথাসম্ভব শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করে সরকারকে বোঝাতে চেষ্টা করেছে যে, তাদের দাবি ন্যায্য এবং তা বাস্তবায়ন করা হোক। বিরোধী শিবিরের দাবিটা এমনই একটা দাবি যেটা মূলত ১৯৯৪-৯৬ সময়ে বর্তমান সরকারি দলেরই দাবি ছিল।

সামগ্রিক দিকগুলো বিশ্লেষণ করলে উৎকণ্ঠিত হওয়া ছাড়া অন্য কোনো কিছু ভাবা যায় না। সাধারণ জনগণ তাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই রাজপথে নেমে পড়েছে। সে দাবি তুলে ধরতে গিয়ে প্রশাসন ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হচ্ছে। পুলিশ-র‌্যাব-বিজিবি এখন আন্দোলন ঠেকাতে ডাণ্ডা ব্যবহার করে না, ব্যবহার করে না টিয়ারসেল বা ফাঁকা গুলি। তারা এখন সরাসরি বিরোধীকণ্ঠকে চিরতরে নিঃস্তব্ধ করে দেয়ার লক্ষ্যে বুকে গুলি করে। ফলে প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও হতাহতের ঘটনা ঘটছে। এমন যদি চলতে থাকে, তাহলে সংলাপের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। প্রশ্ন দেখা দেয় সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে। তাই বর্তমানে একটি প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে- বাংলাদেশ কোন্ পথে ধাবিত হচ্ছে?
তারপরও আমরা আশা রাখতে চাই- শেষ মুহূর্তে সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে একটা সমঝোতা হবে এবং সবার অংশগ্রহণে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ একটা নির্বচান অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে জনগণ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করবে এবং তারা যে দল বা জোটকে সমর্থন করবে তারাই দশম জাতীয় সংসদ গঠন করবে আর এর মাধ্যমে দেশে সার্বিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।
তবে জনমতকে উল্টে দেয়া কিছুতেই সমীচীন হবে না। তাতে দেশ ও জাতির ভাগ্যাকাশে আরো আরো অন্ধকার নেমে আসবে।

SHARE

Leave a Reply