কোভিড-১৯ একটি ইসলামী ব্যবস্থাপত্র- প্রফেসর মো: রফিকুল ইসলাম

ইতিহাসের ভয়াবহতম দুঃসময় অতিক্রম করছে বনি আদম। সারা বিশ্ব কার্যত অচল। জালিম-মাজলুম, পুণ্যাত্মা-পাপিষ্ঠ, ধার্মিক-অধার্মিক, আস্তিক-নাস্তিক সবাই প্রকৃতির জেলখানায় বন্দি। যারা প্রতিপক্ষকে অন্তরীণ করে নিজে স্বাধীনতার সুখ আস্বাদন করেছে- তারাও স্বেচ্ছা বন্দিত্ব বরণ করতে বাধ্য হয়েছে। সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, ফিলিস্তিন ও কাশ্মিরের লক্ষ-লক্ষ মানুষকে যারা ক্রীতদাসে পরিণত করেছে তাদের সকল প্রযুক্তি প্রহরণ-মারণাস্ত্র অকার্যকর বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। অসহায়ত্ব এবং বিভীষিকার চূড়ান্ত রূপ যে কী এবং কেমন হতে পারে  তা ঈড়ারফ-১৯ এর কল্যাণে বিশ্ববাসী কিঞ্চিৎ উপলব্ধি করতে পারছে। পরীক্ষা নিরীক্ষায় কোনো রোগী পজিটিভ হলেই চিরচেনা পৃথিবীটা মুহূর্তেই হয়ে যাচ্ছে কাল-কালান্তরের অচেনা। আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু-স্বজনসহ সকল আপনজন ক্ষণেক ব্যবধানেই আক্রান্তকে বৈরী ও অস্পৃশ্য জ্ঞান করে আত্মরক্ষায় ত্রস্তপদে করছে ত্রাহি-ত্রাহি। ধর্মবেত্তাগণ এ বিষাদময় দৃশ্যকে তাদের ধর্মালোচনার উপাদেয় এবং অনিবার্য অনুষঙ্গরূপে গ্রহণ করেছেন- প্রতিতুল্য করছেন ইয়াওমে মাহশার বা হাশর দিবসের সঙ্গে। বনি আদমের এ মহা বিপর্যয়কে গত ১১ মার্চ ২০২০ তারিখে বিশ্বমহামারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে জাতিসংঘের স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিষ্ঠান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। আমাদের প্রিয় মাতৃভ‚মি বাংলাদেশও এক ভয়ঙ্কর শঙ্কায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ পৃথিবীর স্বর্গোপম দেশগুলো যেভাবে শ্মশানে পরিণত হয়েছে। আমাদের তো সে তুলনায় ঢাল তলোয়ার কিছুই নেই, কী হবে আমাদের? ভীত-সন্ত্রস্ত চিত্তে মেকি সাহসে যদিও কেউ কেউ বলেছে- আমরা করোনার চেয়েও শক্তিশালী; কিন্তু মানুষ হালে পানি পাচ্ছে না, বলছে “দাম্ভিক! আহাম্মক কোথাকার!!” হে পাক পরওয়ারদেগার আমরা এ আহাম্মক আর দাম্ভিকদের দলভুক্ত নই। আমাদেরকে তুমি ক্ষমা কর। রক্ষা কর। মানবজাতির এহেন ক্রান্তিকালে সকল দাম্ভিকতা ছাড়তে হবে। বস্তুজাত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ধৈর্য ও আনুগত্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে হবে বিশ্ব চরাচরের মহান প্রভুর শাশ্বত বিধানের প্রতি। তবেই এড়ানো যাবে কর্মদোষের অমোঘ ভবিতব্য। কিন্তু সেটি কিভাবে? সেটি কি ইসলামের নামে আবেগ ও কুসংস্কারের বেসাতি করে? নাকি কুরআন, সুন্নাহ ও ইসলামের সোনালি ঐতিহ্যিক উৎসোৎসারিত প্রায়োগিক ও বিজ্ঞানঘনিষ্ঠ নীতিমালার স্বরূপ সাধন করে? আসুন দেখি এ ধরনের বিপর্যয় মোকাবেলায় ইসলামের ব্যবস্থাপত্র ও প্রতিরক্ষা নীতি কী। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিষয়টির একটি সুরাহা হওয়া প্রয়োজন। এ ধরনের আজাব, দুর্যোগ-দুর্বিপাকে মানবজাতির, বিশেষত মুসলমানদের কী করণীয়, সে বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহর আলোক-নির্দেশনা আছে কিনা, সেই অভিজ্ঞান লাভ করাই সময়ের দাবি।
এ দুর্দিন মোকাবেলা করার জন্য ইসলাম আমাদেরকে প্রথমত কয়েকটি অতিজাগতিক ও একান্ত মনস্তাত্তিক কার্যসূচি বাস্তবায়নের কথা বলে-
১. এ সময়ে আমাদের যাপিত জীবনের দৈনিকতায় রাসূলের সুন্নাহকে প্রাধিকার দেয়া এবং অধিকহারে মহামহিম আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। কারণ আল-কুরআনে ঘোষিত হয়েছেÑ আল্লাহ এমন নন যে তুমি তাদের মধ্যে থাকা অবস্থায় তিনি তাদেরকে শাস্তি দিবেন। আবার তিনি এমনও নন যে তারা ক্ষমা প্রার্থনায় নিরত থাকা অবস্থায় তিনি তাদেরকে শাস্তি দিবেন। (সূরা আল-আনফাল : ৩৩)
২. এ বিপদ থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য আরেকটি অনিবার্য পন্থা হলো- ধৈর্য এবং সালাতের মাধ্যমে মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা এবং সর্বাঙ্গীণভাবে জীবনকে আল্লাহ অভিমুখীকরণে সচেষ্ট থাকা, আল্লাহ তায়ালা বলেন- হে মু’মিনগণ ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে তোমরা সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। মু’মিনদের উপরে বিপদ আপতিত হলে তারা বলে আমরা তো আল্লাহরই জন্য এবং নিশ্চিতভাবে তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী। (সূরা আল-বাকারা : ১৫৩, ১৫৬)
৩. এ সময় আমাদেরকে অধিক হারে সৎকর্ম করতে হবে কারণ সৎ কর্মপরায়ণরাই প্রকৃত অর্থে সফলকাম, আল্লাহ তায়ালা বলেন- সকল মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত, কিন্তু যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে তারা নয়। (সূরা আসর : ২-৩) তিনি আরো বলেন- সৎকর্ম অবশ্যই অসৎকর্মকে অপহত করে দেয়। তোমার প্রতিপালক এমন নন যে, তিনি অন্যায়ভাবে জনপদ ধ্বংস করবেন অথচ এর অধিবাসীরা পুণ্যবান। (সূরা হুদ : ১১৪, ১১৭) এবং সৎকর্মশীলদের প্রার্থনা আল্লাহর দরবারে কবুল হয়, যেমন আল্লাহ তায়ালা যাকারিয়া (আ)-এর দু’আ কবুলের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন- আমি তাঁর আহবানে সাড়া দিয়েছিলাম, কারণ তাঁরা সৎকর্মের প্রতিযোগিতা করতো। (সূরা আল-আম্বিয়া : ৯০)
৪. এ ছাড়া এই দুঃসময়ে অধিক হারে সংগোপনে দান-সদকা করলে দুরবস্থা থেকে মুক্তির প্রত্যাশা করা যায়, নবীজি (সা.) বলেন- সংগোপনে দান-সদকা প্রভুর সংক্ষুব্ধতাকে প্রশমিত করে। (ত্বাবারানি, আল-মু‘জামুল কাবির, হাদিস নং ৭৯৩৯) প্রকাশ্যে দানের বিষয়টি আমরা ব্যবহারিক কর্মপ্রক্রিয়ার মধ্যে আলোচনা করবো।
৫. এ দুর্বিষহ অবস্থায় নৈরাশ্য ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না করে স্বাস্থ্যসহায়ক প্রয়োজনীয় উপায় অবলম্বন সাপেক্ষে যথার্থ অর্থেই মহান রাব্বুল আলামিনের উপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- যে আল্লাহর উপরে নির্ভরশীল, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। (সূরা ত্বালাক : ৩) আল্লাহ তাঁর উপর নির্ভরশীলদের পছন্দ করেন। (সূরা আলে ইমরান : ১৫৯) একমাত্র আল্লাহর ওপরই ভরসা রাখতে হবে, তিনিই আমাদেরকে এ কঠিন বিপদ থেকে মুক্তি দিবেন, প্রকৃত প্রস্তাবে তিনিই সকল দুঃখ ক্লেশ থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। (সূরা আল-আন‘আম : ৬৪)
এতদ্ব্যতীত কুরআন-হাদিসের দৃষ্টিকোণে কিছু ব্যবহারিক কর্মবিধানের অনুগম্য হওয়াটাও আমাদের জন্য অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে প্রধান প্রশ্ন হলো- এ রকম মহামারীতে বাসগৃহের বাইরে যাওয়া, এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে গমনাগমন, এমনকি সালাত আদায়ের নিমিত্ত মসজিদে প্রবেশসহ অন্যান্য সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানাদিতে সান্বিত হওয়া ন্যায়ানুগ বা বৈধ কিনা? এমনতর নানাবিধ জিজ্ঞাসার বিহিত করতে কুরআন-সুন্নাহর বক্তব্য বিশ্লেষণ অগ্রগণ্য হলে রাষ্ট্রকে তার অপত্যতুল্য নাগরিকদের জীবন রক্ষার্থে এত চড়া মূল্য দিতে হতো না। কারণ বাংলাদেশের প্রথিতযশা ওলামায়ে-কেরাম এবং ইসলামভাবাপন্ন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কমিটি সূচনালগ্নেই গঠিত হলে এবং সেখানে ঈড়ারফ-১৯ এর জীবনধারা ও সংক্রমণ ক্ষমতা বিশ্লেষিত হলে, আমাদের দেশের ওলামায়ে-কেরাম কুরআন-হাদিসের কালোত্তীর্ণ আলোকদর্শনে সময়োপযোগী সিদ্ধান্তটি সূচনালগ্নেই দিতে পারতেন এবং আমাদের জনগণের কাছেও কুরআন-সুন্নাহর শাশ্বতিকতা সমুদ্ভাসিত হতো। ফলে খুব সহজেই কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী এ ক্রান্তিকালে বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষদেরকে মসজিদসহ সকল প্রকার সভা-সমাবেশ ও লোকসমাগম থেকে বিরত রাখা সম্ভবপর হতো। যুগপথ এ সময়ে ইসলামের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ‘ঘরে থাকো’ অন্যান্য ক্ষেত্রেও কার্যকর করা সহজতর হতো। কারণ শিক্ষিত-অশিক্ষিত, অভিজাত-ইতর, বুর্জোয়া-প্রলেতারিয়া সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে তখন এই ভাব-প্রবণতা ক্রিয়াশীল থাকতো যে ইবাদতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও যেহেতু ইসলামী শরিয়াহ সমবেত হতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে তাহলে ‘ঘরে থাকা’ ইবাদতেরই নামান্তর। ঈড়ারফ-১৯ এর চরিত্র সম্পর্কে সম্যক অবগত না হওয়ায় কতিপয় বাগ্মী আলেম প্রথম দিকে বিচ্ছিন্ন কিছু বক্তব্য দিয়েছেন যা ঈড়ারফ-১৯ সদৃশ মহামারী সৃষ্টিকারী রোগ-জীবাণু সংশ্লেষে কুরআন-সুন্নাহর বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। ফলে বাংলাদেশের ইসলামী জ্ঞানে সাতিশয় দুর্বল মানুষেরা ধর্মাবেগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ভেবেছেন-বারবার হাত ধুলেই তো করোনা থেকে সুরক্ষিত থাকা সম্ভব, তাহলে দিনে অন্তত পাঁচবার অজু করছি, করোনা আমাকে স্পর্শ করতে পারবে না। এমনই বার্তা দিয়েছিলেন মাওলানা সাহেবরা। অথচ ঈড়ারফ-১৯ ভাইরাসটির শরীরের উপরিভাগ যে চর্বিযুক্ত প্রোটিন সহযোগে আবৃত তা সাবান ব্যতিরেকে অন্য কিছু দ্বারা ভাঙে না। এবং এটি মাটি, মেঝে ও যেকোনো শূন্যস্থানে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা জীবিত থাকতে পারে, এবং হাঁচি-কাশি ও বাতাসে ভেসে তিন থেকে ছয় ফুট পর্যন্ত স্থানান্তরিত হওয়ার সক্ষমতা রাখে। নির্ধারিত দূরত্বসীমা না মেনে যারাই আক্রান্ত সকাশে মিলিত হবেন তারা সবাই সমাক্রান্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রাখেন। এবং ভাইরাসবাহী শরীর ন্যূনপক্ষে চৌদ্দ দিন পর্যন্ত কোনো প্রকার লক্ষণ প্রকাশ নাও করতে পারে, এবং এই ছল-প্রতারণার দিনগুলোতেই এটি অযুত সরলপ্রাণ মানুষের মধ্যে বিস্ফারিত হতে পারে। উপরিউক্ত আলেমগণের কাছে এই বার্তা থাকলে তারা স্বকপোলকল্পিত আবেগঘন বক্তব্য প্রদান থেকে নিশ্চয়ই বিরত থাকতেন।
এ কথা সর্বজনবিদিত যে রাসূল (সা.) এর জীবৎকালে কোনো মহামারীর প্রাদুর্ভাব হয়নি। কিন্তু এতদসত্তে¡ও মহামারী কেন আসে এবং যে-কোনো ছোঁয়াচে রোগ ও মহামারীর সর্বাত্মক সংক্রমণে কী করণীয়, সে ব্যাপারে তিনি স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন এবং তাঁর সাহাবিগণের সুস্পষ্ট বক্তব্য ও কর্ম থেকেও পরবর্তী উম্মাহ তদৃশ সমস্যায় আলোকদিশা পেতে পারে, যা শরিয়াতের দলিল হিসেবে সর্বতোভাবে গ্রহণীয়। এছাড়াও ইজমা ও কিয়াসের রাজদুয়ার তো ওলামায়ে-কেরামের সামনে তা-কিয়ামত উন্মুক্ত। অনাগত অনন্ত কালের যেকোনো সমস্যায় ঔদার্য ও অভিযোজ্যতার কারণেই ইসলাম শ্রেষ্ঠত্বের আসনে কালের সারথি হিসেবে শশ্বৎ সমাসীন। তাই বর্তমান মহা দুর্যোগ থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদেরকে কুরআন-সুন্নাহ নির্দেশিত কিছু বাস্তব ও বিজ্ঞান ঘনিষ্ঠ কর্মতৎপরতা গ্রহণ করতে হবে-
১. ইসলামের মৌলিক নীতি হলোÑ জীবনকে স্বেচ্ছায় ধ্বংসাভিমুখে নিপাতিত করবার অধিকার আল্লাহ তায়ালা কাউকে দেননি- তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না। (সূরা আল-বাকারা : ১৯৫) এবং মু’মিনদেরকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে তোমরা নিজেরাই নিজেদেরকে হত্যা করো না। (সূরা আন-নিসা : ২৯) তা ছাড়া রাসূল (সা.) এর সমাজ-দর্শনতাত্তিক বিখ্যাত উক্তি ‘লা দ্বারারা ওয়া লা দ্বিরারা’ অনিষ্টকারক হবো না, অনিষ্টাচরিতও হবো না। (সুনানু ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২৩৪০) তাহলে আল-কুরআন ও হাদিসের এই মৌলিক নীতি অনুযায়ী ঈড়ারফ-১৯ এর চরিত্র বৈশিষ্ট্য সর্বসমক্ষে প্রকাশিত হবার পরে কোনো মু’মিনের পক্ষে স্বীয় বাসগৃহের বাইরে যাবার সুযোগ আছে বলে অনুমিত হয় না। মহামারীকালে স¦গৃহে অবস্থানের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে রাসূল (সা.) এর হাদিসেও আয়েশা (রা) এর মহামারী সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তরে রাসূল (সা.) বলেন- নিশ্চয়ই মহামারী এক আজাব। একান্ত আল্লাহর ইচ্ছায়ই এটি কারো উপরে আপতিত হয়। যুগপৎ এটি মু’মিনদের জন্য রহমত। যদি মহামারীকালে কোনো মু’মিন ধৈর্য ও প্রতিদানের আশায় আল্লাহ নির্ধারিত তাকদিরে অবিচল আস্থা রেখে স্বগৃহে অবস্থান করে, অবশ্যই সে শহিদের মর্যাদায় অভিষিক্ত হবে। (সুনানু আহমাদ, হাদিস নং ২৪৯৪৩) অধিকন্তু সূরা নিসার উদ্ধৃত আয়াতাংশের বক্তব্য ও সর্বোপরি নবীজির সমাজ-দর্শন অনুযায়ী এই আপৎকালে মু’মিনদের মসজিদে গিয়ে সমভিব্যাহারে সালাত আদায়ের বিষয়টিও মীমাংসিত। যেহেতু নৈর্ব্যক্তিকভাবে সবাই শঙ্কাগ্রস্ত এবং যে কেউ যে কারো দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা বিদ্যমান, অতএব একজন মু’মিন অপর মু’মিনের কষ্টের কারণ বা হন্তারক হতে পারে না। তা ছাড়া জীবন রক্ষা করা ফরজ, আর জামায়াতে সালাত আদায় করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। তাই শরয়ী হুকুমের গুরুত্ব বিচারে এ বিপদকালে মসজিদে না যাওয়াই যুক্তিযুক্ত। এ ক্ষেত্রে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের অনেকেই ধর্মাবেগে আপ্লুত হতে পারেন, ভাবতে পারেন ঈমান আর তাওয়াক্কুলের দৃঢ়তা থাকলে কোনো মুসল্লির করোনায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা নাই। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে এই বিষয়গুলোতে একজন মু’মিনের দায়িত্ব হলো রাসূল (সা.) ও সাহাবিদের দিকে দৃষ্টিপাত করা। রাসূল (সা.) দুর্যোগের সময় মুয়াজ্জিনকে আযানের সাথে ‘সাল্লু ফি রিহালিকুম’ যার যার আবাস স্থলে সালাত আদায় কর। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৬৬৬) অর্থাৎ দুর্যোগ-দুর্বিপাকে মসজিদে না যাওয়ার অনুমতি নয় শুধু, নির্দেশনাও রয়েছে। আবার ঈমান আর তাওয়াক্কুল ঠিক থাকলে কোনো মুসল্লি মহামারীতে আক্রান্ত হবে না মর্মে কথাটিও সর্বৈব অলীক এবং আবেগজাত, কেননা আঠার হিজরিতে প্রাদুর্ভূত সিরিয়ার ‘আমাওয়াস’ মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত ও বদর-উহুদে অংশগ্রহণকারী প্রথম শ্রেণির অনেক সাহাবিসহ প্রায় ত্রিশ হাজার মুসলিম প্রাণ হারিয়েছিলেন। তন্মধ্যে হারিস ইবনে হিশাম, শুরাহবিল ইবনে হাসনাহ, আবু উবায়দা ইবনুল র্জারাহ, ফজল ইবনে আব্বাস ইবনে আবদিল মুত্তালিব, মুয়াজ ইবনে জাবাল, ইয়াযিদ ইবনে আবি সুফিয়ান, আবু জানদাল ইবনে সুহায়েল এবং কা‘ব ইবনে ‘আসেম (রা.) প্রমুখ অন্যতম। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃ: ১০৬-১১০) এ কথা সর্বতোভাবে স্বীকৃত যে একজন অতি সাধারণ সাহাবির ঈমান ও তাওয়াক্কুলের সাথেও কিয়ামত পর্যন্ত তৎপরবর্তী কোনো মানুষের ঈমান ও তাওয়াক্কুল প্রতিতুল্য হতে পারে না। তাছাড়া ইসলামে তাওয়াক্কুলের অর্থ হলোÑ সাধ্যমত উপায়-উপকরণ, রসদ-পাথেয় ও প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণপূর্বক আল্লাহর প্রতি ভরসা করা। রাসূল (সা.) এর প্রবাদপম উক্তি ‘কায়্যিদহা ওয়া তাওয়াক্কাল’ আগে উট বাঁধো তারপর তাওয়াক্কুল কর। (মুসতাদরাক আল-হাকেম, হাদিস নং ৬৬১৬) তা ছাড়া মক্কায় রাসূল (সা.) ও সাহাবিদের জীবন সংকটাকীর্ণ হয়ে উঠলে, তিনি বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নিয়ে মদিনায় হিজরত করেন। পথিমধ্যে সাওর গুহায় আশ্রয় গ্রহণকালে শ্বাপদসংকুল গুহাভ্যন্তরে সঙ্গী আবু বকর (রা) প্রথমে প্রবেশ করেন; ক্ষতিকর কীট-পতঙ্গ, সাপ-বিচ্ছুর দংশনে যদি দংশিত হতেই হয়, তাহলে তিনিই দংশিত হবেন, রক্ষা করবেন প্রাণাধিক প্রিয় নবীজিকে। (আখবারু মাক্কা, ২য় খণ্ড, পৃ: ২০২) ইত্যাকার প্রভ‚ত দৃষ্টান্ত বিদ্যমান, যদ্বারা প্রতীত হয় তাওয়াক্কুল ও তাকদির অর্থ প্রচেষ্টাহীনভাবে নিজেকে আল্লাহর তরে সমর্পণ নয়। বিখ্যাত তাবে‘য়ি মুসলিম ইবনে ইয়াসার বলেন- কোনো কর্ম সম্পাদনকালে উদাহরণ হিসেবে তাকেই গ্রহণ কর, যে মনে করে কর্মই তার সফলতার সোপান; এবং তাওয়াক্কুলকালে দৃষ্টান্ত হিসেবে তাকেই গ্রহণ কর, যে মনে করে বিধিলিপির বাইরে কোনো কিছুই ঘটা সম্ভব নয়। (মুসান্নাফু আবি শাইবা, ১৪শ খণ্ড, পৃ: ৪৫) সুতরাং এই প্রকৃতির অযৌক্তিক আবেগ প্রশ্রিত না হলে দিল্লির তাবলিগি মারকাযে সাতজন মুসল্লির মৃত্যুজনিত প্রশ্নবাণে মুসলিম উম্মাহ আক্রান্ত হতো না। তাছাড়া আমাদের দেশেও করোনাক্রান্ত হয়ে প্রথম শাহাদাত বরণ করেছেন প্রফেসর ইসলাম গণি। ধারণা করা হয় তাঁর আক্রান্ত হওয়ার পশ্চাতেও মসজিদ কেন্দ্রিকতা ক্রিয়াশীল ছিল। তাই এ অনৈসলামিক আবেগ অবশ্যই পরিত্যাজ্য। এখন প্রশ্ন হলো- তাহলে মসজিদ কি বন্ধ থাকবে? না, বন্ধ থাকবে না; গত ২০ মার্চ থেকে মাসজিদুল হারাম এবং মাসজিদুন নাবি অবাধ ও অবারিত নেই, তাই বলে কি সেখানে ‘সালাত বিল জামায়াহ’ বন্ধ আছে? না, অবশ্যই বন্ধ নেই। ঠিক তদ্রুপ দৃঢ় ঈমান ও একনিষ্ঠ তাওয়াক্কুলের অধিকারী সুনির্দিষ্ট কতিপয় মুসল্লি ন্যূনাধিক স-ইমাম তিন থেকে দশজন যাঁরা নিজেদেরকে আল্লাহর ওয়াস্তে সংক্রমণের ঝুঁকিমুক্ত রাখবেন; পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করবেন। এঁরা ব্যতিরেকে অন্য সকলেই নিজ নিজ ঘরে ইবাদত করবেন। রমজান সমাসন্ন, তাই তারাবিহ এবং অন্যান্য ইবাদাতের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অবলম্বন বিধেয়।
ঈদৃশ পরিস্থিতিতে সঙ্গনিরোধ ব্যবস্থাই যে ধন্বন্তরি নবী মুহাম্মাদ (সা.) এর বক্তব্য তারই ইঙ্গিতবাহী। তিনি বলেন- শ্বাপদসম ভয়ে কুষ্ঠরোগী থেকে দূরে অবস্থান কর। (সহীহ বুখারি, হাদিস নং: ৫৭০৭) ইবনে আবি আওফা (রা) থেকে এই মর্মে আরো একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে- কুষ্ঠরোগীর সাথে কথা বলার সময় কম পক্ষে এক বর্শা থেকে দুই বর্শা পরিমাণ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। (‘উমদাতুল ক্বারি, ২২শ খণ্ড, পৃ: ৬১৮) অপর এক হাদিসে রাসূল (সা.) বলেন- রোগাক্রান্ত উটকে সুস্থ উটের সাথে মিশ্রিত করো না। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৫৭৭৪) মহানবী (সা.) এর বক্তব্যের সমর্থনে একটি ব্যবহারিক ক্রিয়াও পাওয়া যায়। হযরত জাবের (রা) বলেন- সাকিফের প্রতিনিধিদলে একজন কুষ্ঠরোগী ছিল। লোকটি বাই‘আত গ্রহণ করতে এসেছিল। রাসূল (সা.) কোনো এক সংবাদ-বাহকযোগে বলে পাঠান ‘তুমি ফিরে যাও’। তোমার বাই‘আত আমি গ্রহণ করলাম। (ইমাম বায়হাকি, আস-সুনানুস সাগির, হাদিস নং: ২৫১৫) ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর (রা) এর একটি বাস্তব নির্দেশনা থেকেও আমরা সংক্রমণগ্রস্ত থেকে দূরত্ব বজায় রাখার ব্যবস্থাপত্র পাই তিনি বাইতুল্লাহ ত্বাওয়াফরত জনৈক কুষ্ঠরোগগ্রস্ত নারীর পার্শ্বাতিক্রম করছিলেন, অতঃপর তাকে বললেন- হে আল্লাহর বান্দি, মানুষকে কষ্ট দিয়ো না। তুমি বাড়িতে অবস্থান কর, সেটিই তোমার জন্য কল্যাণকর। (মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হাদিস নং: ৮৪০) উপর্যুক্ত হাদিস এবং প্রয়োগবাস্তবতা থেকে অনুমিত হয় যে, সংক্রামক ব্যাধির ক্ষেত্রে পারস্পরিক বিযুক্তিই এর বিস্ফারণ রোধ করতে সর্বাতিশয় ফলপ্রদ হতে পারে।
বিশিষ্ট সাহাবি আমর ইবনুল ‘আস (রা) এর একটি বাস্তব কর্মনীতির সমঞ্জস প্রতিফলনই বোধ করি আজকের কোয়ারেন্টিন বা সঙ্গনিরোধ ব্যবস্থা। তিনিই প্রথম রাজ্যাধিপতি হিসেবে মহামারীর ব্যাপক বিস্তার রোধকল্পে যুগান্তকারী এক ভাষণের মাধ্যমে এই বাস্তবমুখী কর্মনীতি ঘোষণা করেন। মহামারীর প্রকোপ শতভাগ তিরোহিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি সকলকে শহরের পার্শ্ববর্তী সানুদেশে পরস্পর ব্যবহিত হয়ে অবস্থানের নির্দেশ দেন। নির্দেশানুযায়ী বিচ্ছিন্নভাবে অধিত্যাকায় কিছুকাল অবস্থানান্তে পরিদৃষ্ট হলো- নবীভ‚তভাবে আর কেউ আক্রান্ত হয়নি। মহামারী সম্পূর্ণরূপে বিদূরিত হলে সানুদেশে স্বতঃপ্রব্রাজিত সকলকে নিয়ে তিনি শহরে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে খলিফা উমর (রা) আমর ইবনুল ‘আস (রা) এর এই বিমৃশ্য কর্মনীতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেননি। (আল-বেদায়া ওয়ান-নেহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃ: ১০৬-১১০; আল-কামেল ফিত-তারিখ, ২য় খণ্ড, পৃ: ৩৭৭-৩৭৮)
মহামারীর ভয়াবহ চারিত্র্য-বৈশিষ্ট্য অনুধাবনপূর্বক নবীজি (সা.) শুধু সঙ্গনিরোধ নয়, দিয়েছেন আরো বাস্তবানুগ সিদ্ধান্ত, তিনি বলেছেন- মহামারী হলো আল্লাহর আজাবের নিদর্শন। এ মহামারীযোগে তিনি তাঁর বান্দাদের কষ্ট দেন, পরীক্ষা করেন। তোমরা কোনো মহামারীগ্রস্ত এলাকার সংবাদ শ্রুত হলে, সেখানে প্রবেশ করবে না; আর তোমাদের বাসভ‚ম যদি মহামারীক্রান্ত হয়, তাহলে তোমরা সেখান থেকে পলায়নপর হবে না। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৫৯০৭)
খলিফাতুল মুসলিমিন উমর (রা) মহামারী আক্রান্ত সিরিয়ায় প্রবেশ না করে, উপকণ্ঠ ‘র্সাগ’ থেকে মদিনায় প্রত্যাগমনের চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে আবু উবায়দা ইবনুল র্জারাহ বলে ফেললেন- আপনি কি আল্লাহর তাকদির থেকে পলায়মান হতে চান? উত্তরে উমর (রা) সেই প্রবাদসম যুগান্তকারী কথাটি বললেন- ‘নার্ফিরু মিন ক্বাদারিল্লাহি ইলা ক্বাদারিল্লাহ’ হ্যাঁ, আমি আল্লাহর এক তাকদির থেকে অপর তাকদিরের দিকে যেতে চাই। একটা প্রত্যাদাহরণ টেনে উমর (রা) বলেন- ধরো তুমি একটা উট চড়ানোর জন্য কোনো এক উপত্যকায় গেলে, সেখানে দু’টি চারণক্ষেত্র আছে একটি ঊষর, অপরটি শাদ্বল। তোমার নৈর্বাচনিক ক্ষমতায় তুমি শাদ্বলটিকে বেছে নিলে, এমন নৈর্বাচনিকতায় তুমি কি আল্লাহর তাকদিরকে অস্বীকার করলে? নিশ্চয়ই নয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৫২৮৮; আল-কামিল ফিত-তারিখ, ২য় খণ্ড, পৃ: ৩৭৭-৩৭৮)
পৃথিবীর অপরাপর দেশের মতো আমাদের দেশেও হোম কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশানের পাশাপাশি নবক্রান্তি ও বিস্ফারণ প্রতিরোধে বিভিন্ন জেলা গমনাগমনরুদ্ধ বা লকডাউন করা হচ্ছে, যাতে করোনাক্রান্ত জেলার মানুষ করোনাহীন জেলায়, করোনাহীন জেলার মানুষ করোনাক্রান্ত জেলায় প্রবেশ করতে না পারে। এই ক্রান্তিকালে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, মসজিদের ইমাম, আলেম-ওলামা ও মিডিয়া যদি একযোগে ইসলামের এই বাস্তবানুগ, প্রায়োগিক ও নান্দনিক কর্মনীতিকে জনগণের হৃদয়ঙ্গম করাতে সমর্থ হয়, তাহলে আমাদের সেনা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা-বাহিনীকে এতটা গলদঘর্ম হতে হবে না। নারায়ণগঞ্জের মতো অন্য কোনো জেলা থেকে প্রাণভয়ে পলায়মান অবস্থায় আর কাউকে গ্রেফতারও হতে হবে না। কুরআন-সুন্নাহর পিযুষ পানে মৃত্যুকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করার দুঃসাহসী প্রত্যয়ে দেশের প্রতিটি মানুষ প্রশান্ত হৃদয়ে সুস্থিত হবেন স্ব-স্ব আবাসস্থলে।
২. একটি সাধারণ দর্শন মনে রাখতে হবে। প্রশ্নাতীত মানব কল্যাণের জন্য গৃহীত সকল ইতিবাচক কর্মপ্রক্রিয়াই ইসলামিক কর্মপ্রক্রিয়া হিসেবে পরিগণিত। তাই ঈড়ারফ-১৯ প্রতিরোধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক নির্দেশিত এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কর্তৃক উপদিষ্ট সকল নিয়মকানুন আমাদেরকে ইসলামিক নিয়মকানুন মনে করেই অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করতে হবে। তন্মধ্যে মুখে মাস্ক ব্যবহার করা, নির্দিষ্ট বিরতিতে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, নিতান্ত প্রয়োজনে ঘরের বাইরে গেলে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা এবং ঘন-ঘন নাক, মুখ ও চোখ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকা। তথাপি আক্রান্ত হলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণের পাশাপাশি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রশান্ত চিত্তে ধৈর্য, সালাত ও সাধ্যমত দান-সদকা সহযোগে আল্লাহর সাহায্য ও কৃপা প্রার্থনা করতে হবে। হাঁচি-কাশি দেয়ার সময় রুমাল-টিস্যু ব্যবহার করা তথা সুন্নাহ-অনুবর্তী হওয়াÑ কারণ নবীজি (সা.) যখন হাঁচি দিতেন তখন তিনি হাত অথবা পরিহিত বস্ত্রাংশ ব্যবহার করে মুখ ঢেকে নিতেন। (সুনানু আত-তিরমিযি, হাদিস নং ২৭৪৫) স্মর্তব্য যে, তাকদিরে মৃত্যুর অমোঘ ফয়সালা থাকলে আবু উবায়দা ইবনুল র্জারাহ, মু‘য়াজ ইবনে জাবাল, আব্দুর রহমান ইবনে ‘আওফ (রা) ও তৎসঙ্গীয় অন্যান্যদের সাথে শাহাদাতের অনন্য মর্যাদায় অভিষিক্ত হলে মু’মিনের চূড়ান্ত অভিপ্সাই বরং পূর্ণ হবে।
৩. সংক্রামক ব্যাধির ব্যাপারে রাসূল (সা.) এর “লা-‘আদওয়া,’ ‘সংক্রামক বলে কিছু নেই” নঞর্থক বক্তব্যটিও বেশ কয়েকটি হাদিসে পরিলক্ষিত হয়। তন্মধ্যে আবু হুরায়রা (রা) কর্তৃক বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদিসটি প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে বক্তব্যকে অপেক্ষাকৃত শানিত ও প্রামাণিক করেছে। তিনি বলেন- রাসূল (সা.) বলেছেন সংক্রামক ব্যাধি বলে কিছু নেই। এমন সময় একজন বেদুইন বললÑ হে আল্লাহর রাসূল, চারণক্ষেত্রে যে সুস্থ সবল উটটি বন্য হরিণের মতো দুরন্ত, সেটির সাথে যখন কোনো চর্মরোগাক্রান্ত উটের ঘনিষ্ঠতা হয়, তখন সেটিও চর্মরোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। তাহলে কেন এমন হয়? প্রত্যুত্তরে রাসূল (সা.) প্রাশ্নিক-ভঙ্গিতে বলেন- তাহলে কোনো প্রকার সংক্রমণ ছাড়াই প্রথমটি কিভাবে আক্রান্ত হয়েছিল? (সহিহ বুখারি, ইফাবা, হাদিস নং ৫২৪৭) রাসূল (সা.)এর এ বক্তব্যের সমর্থনে অপর হাদিসে একটি বাস্তব কর্মেরও প্রমাণ পাওয়া যায় রাসূল (সা.) জনৈক কুষ্ঠরোগীর হাত ধরে নিয়ে এসে নিজের খাঞ্চায় একসঙ্গে খেলেন। বললেন খাও আল্লাহর নামে, তাঁর উপরে দৃঢ় বিশ্বাস ও নির্ভরতার সাথে। (সুনানু আবি দাউদ, হাদিস নং ৩৯২৫) রাসূল (সা.)এর সংক্রমণ সংশ্লিষ্ট পূর্বোল্লিখিত সদর্থক বক্তব্য এবং এই নঞর্থক বক্তব্যের মধ্যে অগ্রগণ্যতা নির্ণয় অথবা এতদুভয়ের মধ্যে যৌক্তিক ও বৌদ্ধিক সমন্বয় সাধন সময়ের দাবি। সহিহ বুখারির বিখ্যাত ভাষ্যকার আল্লামা বদরুদ্দিন ‘আইনি বলেন জাহেলি যুগের সমাজ-সংস্কারে একটি ভ্রান্ত বিশ্বাস সর্বাত্মক রূপ পরিগ্রহ করেছিল, তারা মনে করতো কিছু রোগ-ব্যাধি স্বভাবগতভাবেই সংক্রামক। এই ব্রাত্য সমাজকে একটি বিশ্বাসগত নির্ভরতায় প্রসিক্ত করতেই রাসূল (সা.) বললেন “লা-‘আদওয়া,” অর্থাৎ কোনো রোগেরই স্বভাবগত সংক্রমণ-সক্ষমতা নেই। এটির নিয়ন্তা হলেন আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন। আর কুষ্ঠ বা সংক্রামক রোগী থেকে দূরে থাকবার বিষয়টি কার্য-কারণের সাথে সম্পৃক্ত। আল্লাহ তায়ালা পারস্পরিক মিশ্রণ ও মেলামেশাকে সংক্রমণের কারণ বানিয়েছেন। কারণ সংঘটনে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফলাফল সংঘটিত হওয়াটাই আল্লাহর কার্যনীতির অনুগম্য। (‘উমদাতুল ক্বারি, ২২শ খণ্ড, পৃ: ৬১৮) সহিহ বুখারির অপর প্রখ্যাত ভাষ্যকার আল্লামা ইবনু হাযার ‘আসক্বালানিও উপর্যুক্ত বক্তব্যের সাথে সহমত পোষণ করেন। উপরন্তু তিনি বলেন সংক্রমণের অস্তি-নাস্তি বিষয়ক বক্তব্যটি প্রেক্ষাপটের বৈভিন্ন্যে বিচার করলে একটি অবিসংবাদী সমাধানে পৌঁছা সহজতর হয় সেটি হলো “লা-‘আদওয়া,’ সংক্রমণ বলে কিছু নেই” বক্তব্যটির উদ্দিষ্ট ছিল সুদৃঢ় ঈমান ও নিবিড়-নিবিষ্ট তাওয়াক্কুলের অধিকারী শ্রোতৃবৃন্দ, যারা স্বয়ংক্রিয়-সংক্রমণ-শক্তির ধারণাকে দুর্নিবার মানসিক দৃঢ়তায় হৃদয় থেকে সমূলে উপড়ে ফেলতে সক্ষম। যারা যুগপৎ অন্যান্য কুসংস্কার অন্তঃকরণ থেকে বিতাড়নের মাধ্যমে বস্তুতান্ত্রিকতার অসহায়ত্ব থেকে মুক্তিলাভের আনন্দে বিজয় বৈজয়ন্তি উড়াতে সক্ষম হয়েছিল। আর সংক্রমণ থেকে দূরত্ব বজায় রাখা বিষয়ক বক্তব্যটির উদ্দিষ্ট ছিল অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও অসম্পন্ন তাওয়াক্কুলের অধিকারী শ্রোতৃমণ্ডলী, যাতে দুর্বল ঈমানদার সংক্রমণ সংলগ্নতায় সম্ভাব্য সংক্রমণাক্রান্ত হওয়ার ফলে সংশয়াকীর্ণতা ও দোদুল্যমানতায় আবিষ্ট হওয়ার সুযোগ না পায়। যেহেতু দুর্বল ঈমানের অধিকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে মূল ও কারণের মধ্যে প্রভেদ নির্ণায়ক শক্তিটি অপুষ্ট, তাই যেকোনো সংক্রমণ সংলগ্নতা তার মহামূল্যবান ঈমানের জন্য ভয়ঙ্কররূপে অনিষ্টকর হতে পারে। যেটি কোনোভাবেই শরিয়াহ বিধায়কের বাঞ্ছা নয়। তাঁর এই দ্বৈত বক্তব্য ও কর্ম উপর্যুক্ত উভয় ধারার ঈমানদারের জন্য সান্ত¡না ও প্রবোধস্বরূপ। পরিশেষে আল্লামা ‘আসক্বালানি বলেন যে-সকল বিষয়ে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা বিদ্যমান, হেকমতে-রব্বানি যা থেকে সাবধানতা অবলম্বন করতে অনুমোদন দিয়েছেন, দুর্বল ঈমানদারদের তার নিকটস্থ হওয়াই বাঞ্ছনীয় নয়। কিন্তু পরম সত্য ও দৃঢ় ঈমানের ধ্বজাধারী সাধকের জন্য বিষয়টি নৈর্বাচনিক। হাদিসের সংক্রমণ-সদর্থক বক্তব্যটি সংখ্যাগুরু মানুষের জন্য, ঈমানের মান বিবেচনায় যারা সাধারণত দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে থাকে। তাদের ন্যূনমাত্রার ঈমানটুকুর ঈপ্সিত সুরক্ষার জন্যই সংক্রামকরোগীর উপান্তবর্তী না হতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। (ফাতহুল বারি, ১০ম খণ্ড, পৃ: ১৫৮)
উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা সংখ্যাগুরু দুর্বল মু’মিনদেরকেও ন্যূনকল্পে রোগাক্রান্ত মা-বাবা, সন্তান-সন্ততি, ভাই-বোনসহ অন্যান্য নিকটাত্মীয়-পরমাত্মীয়দের সামিপ্যে অয়োময় ঈমানের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করার সানুনয় অনুরোধ জানাই। ভীত-সন্ত্রস্ত ও অস্থিরমতি না হয়ে আল্লাহর প্রতি অগাধ, অকৃত্রিম আস্থায় তাদের প্রতি মানবিক ও হৃদ্যিক আচরণ করার পরামর্শ দেই। টাঙ্গাইলের সখিপুরের ঘটনা ঈমানদার বাংলাদেশের পরিচয় বহন করে না। আমরা এমনতর কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই না। পাষণ্ড স্বামী, সন্তানের এহেন জান্তব আচরণের পশ্চাতে কী কী অনুঘটক ক্রিয়াশীল ছিল এবং এখনও ক্রিয়মাণ আছে তার অনুসন্ধিৎসায় আমাদেরকে এখনই আত্মনিয়োগ করতে হবে। নইলে ইত্যাকার আরো যে সব অমানবিক ঘটনা ইতোমধ্যেই সংঘটিত হয়েছে এবং আরো হতে যাচ্ছে, সেগুলো নিরসনে আমরা কোনো কার্যকর ব্যবস্থা প্রণয়নে সক্ষম হবো না। সতর্কতার নামে প্রপাগান্ডা ছেড়ে ধৈর্য-সহিষ্ণুতা আর ঈমানের শিক্ষা দিতে হবে। মহা-মহিম আল্লাহর অতাৎক্ষণিক নির্দেশে কারণ সংঘটন সাপেক্ষে সংস্পৃষ্ট প্রায় সকলেই যেমন আক্রান্ত হতে পারে, আবার তাৎক্ষণিক নির্দেশে রোগীর সং¯্রব-সংস্পর্শ ছাড়াও আক্রান্ত হওয়া এবং আক্রান্ত সকাশে সন্নিহিত-সন্নিবিষ্ট হয়েও সংক্রমিত না হওয়ার সম্ভাবনা ও সমূহ প্রমাণ বিদ্যমান। আবার সংক্রমিত হলেই যে অনিবার্যভাবে সবাই রোগাক্রান্ত হবে বিষয়টি এমন নয়, এবং রোগাক্রান্ত হলেই যে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী তাও নয়। তাই নির্ভয়ে নিঃশঙ্কচিত্তে ঈমানের দৃঢ়তায় সুন্নাহ অনুযায়ী সকল জাগতিক ও বাস্তব উপায় অবলম্বন করেই আমাদেরকে অধিকতর মানবিক হওয়ার পরামর্শ দিতে হবে। শুধু তাই নয় শবযাত্রা-শবানুগমনসহ মৃতের গোসল, জানাজা, দাফন-কাফনেও বিশ্বাসপুষ্ট নির্বিশঙ্ক প্রাতিষ্ঠানিকতা প্রতিস্থাপন করার অবকাশ আছে। দরকার শুধু বিশ্বাস আর বাস্তবতার সমন্বয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য যথার্থ পদক্ষেপ।
৪. বিশ্বমহামারীর এ আপদঘন অবস্থায় ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র অনুক্রমিকভাবে সকল পর্যায় থেকেই সাধারণ দান সদকা বাড়াতে হবে, এবং পরহিতৈষণায় দ্বিগুণ উৎসাহে এগিয়ে আসতে হবে। ফলে সকল প্রকার শঙ্কা, ভয় ও দুশ্চিন্তা হবে বিদূরিত-নির্বাসিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন- যারা আল্লাহর পথে ধনৈশ্বর্য ব্যয় করে অতঃপর খোঁটা ও গঞ্জনা দিয়ে বেড়ায় না, মহান প্রতিপালকের কাছে রয়েছে তাদের জন্য যথাযথ পুরস্কার। আর তারা অবশ্যই নিঃশঙ্ক ও নিশ্চিন্ত জীবনের অধিকারী হবে। (সূরা আল-বাকারা : ২৬২) উপরন্তু যারা সকল প্রকার স্বার্থপরতা মুক্ত হয়ে পরার্থপরতায় নিয়োজিত হয়, স্বয়ং অল্লাহ তায়ালা তাদের স্বার্থ-সুরক্ষায় সমবস্থ ও সমাগত হন। আবু হুরায়রা (রা) থেকে হাদিস বর্ণিত হয়েছে আল্লাহ তায়ালা ততক্ষণ পর্যন্ত বান্দা-সংস্থানে ব্যাপৃত থাকেন যতক্ষণ বান্দা ভ্রাতৃসংস্থানে নিবেদিত থাকে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৬৯৯)
রমজান অত্যাসন্ন সুতরাং করোনা পরিস্থিতিতে অসহায় হয়ে পড়া শ্রমজীবী, দিনমজুর, ছিন্নমূলসহ সকল অনানুষ্ঠানিক কর্মজীবী মানুষের প্রতি সদয় ও সিদ্ধহস্ত হবার এখনই শ্রেষ্ঠ সময়। তবে দানের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের আনুপূর্বিকতা নির্ণয়ে অবশ্যই আল-কুরআনের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন যে সম্পদ তোমরা ব্যয় করবে তা পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতিম, মিসকিন এবং মুসাফিরদের জন্য কর। (সূরা আল-বাকারা : ২১৫) এছাড়াও রয়েছে যাকাতের নির্দিষ্ট গ্রহীতা বা প্রাপ্যজন। আল্লাহ তায়ালা বলেন সাদাকা তো কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত ও তৎসংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জন্য, যাদের চিত্তাকর্ষণ করা প্রয়োজন তাদের জন্য, দাসত্ব থেকে মুক্তি প্রার্থী দাসের জন্য, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর রাস্তায় ও মুসাফিরদের জন্য। (সূরা আত-তাওবা : ৬০) যাকাতের অর্থ এই আট শ্রেণির প্রাপনীয় ব্যতিরেকে অন্য কাউকে দেওয়া বিধেয় নয়।
৫. এ আজাব থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদেরকে স্বকৃত অন্যায় এবং অপর কর্তৃক সংঘটিত অন্যায়ের প্রতি নির্লিপ্তির অপরাধ থেকে একনিষ্ঠ তাওবা করতে হবে। তাওবা অর্থ কৃত অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা এবং একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি আর কখনো ঘটবে না মর্মে আল্লাহর সাথে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া। ব্যক্তি থেকে বিশ্বময় সর্বত্র সুদ-ঘুষ, চুরি-ডাকাতি, মদ-জুয়া, জুলুম-নিপীড়ন, ধর্ষণ-অশ্লীলতা স্বাভাবিক ও সাবলীল রূপ পরিগ্রহ করায় এই ধ্বংসোন্মুখ পৃথিবীর সম্মুখে দাঁড়িয়েও হত-দরিদ্র মানুষের ক্ষুন্নিবারণের জন্য সরকারি ত্রাণের চাল ও তেল চুরির মতো অবিমৃশ্যকারিতার পাশাপাশি আমাদেরকে হত্যা, ধর্ষণের লোমহর্ষক সংবাদও দেখতে হচ্ছে। এই বিপর্যস্ত পরিস্থিতির সুযোগে গ্রামে গ্রামে বেড়ে গেছে মহাজনী সুদ-ব্যবসার প্রকোপ। এক দরিদ্রই অপর দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের কাছে নিতে চাচ্ছে বাড়তি সুযোগ। মানবীয় সুকুমারবৃত্তিগুলো যেন ধ্বংসাভিমুখী অভিযাত্রায় নিয়ত ধাবমান। এর কারণ অনুসন্ধিৎসায় আমাদের সমাজ কারিগরদের সংবিৎশক্তিকে এখনই পূর্ণমাত্রায় কাজে লাগাতে হবে। বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিককে কাক্সিক্ষত মানের মু’মিন হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে করোনার মতো হাজার দুর্যোগ মোকাবেলা করাও কঠিন হবে না। তাই গঠনমূলক এবং দমনমূলক কর্মসূচির আওতায় এখনই সকল অন্যায় অনিয়ম কঠোর হস্তে প্রতিহত করতে না পারলে মহা বিপর্যয় থেকে আমরা কেউই রক্ষা পাবো না।
পরিশেষে বলতে চাই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যারা আছেন, এই মুহূর্তে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ-উত্তাল-সমুদ্রের দক্ষ নাবিকের মতো দৃঢ় হাতে দেশের হালটা ধরতে না পারলে মহা ধ্বংসযজ্ঞের কবলে নিপাতিত হব আমরা। ইউরোপ, আমেরিকার তুলনায় আমরা শূন্যহস্ত। ঢাল-তলোয়ার ছাড়াই আমরা যুদ্ধে অবতীর্ণ। খোদ ডাক্তাররাই করোনাক্রান্তির এক মাস দশ দিন পরও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সামগ্রী না পেয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সমীপে সংক্ষুব্ধতা প্রকাশ করেছেন। বাজারে পাঁচ টাকার একবার ব্যবহার্য সার্জিক্যাল মাস্ক বিশ থেকে ত্রিশ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মেডিক্যাল হ্যান্ড স্যানিটাইজার দূরে থাক যাপিত জীবনের দৈনিকতায় ব্যবহার্য লাইফবয়, স্যাভলনই বাজার থেকে উধাও। সরকারের হুমকি-ধমকি, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি উপেক্ষা করে চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর দাম ঊর্ধমুখী এরই মধ্যে চাল চুরি, তেলচুরির হিড়িক। সাবধান থাকতে হবে এই মতলববাজ গোষ্ঠী কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে বছরটাকে যেন দুর্ভিক্ষের বছরে পরিণত না করে।
শিক্ষিত, অশিক্ষিত, স্বল্প-শিক্ষিত, অর্ধ-শিক্ষিত নির্বিশেষে; শহর, গ্রাম অভেদে নিয়ম মানার যে ভঙ্গুর চিত্র, তাতে বাংলাদেশে বিজ্ঞানের সকল সূত্র ব্যর্থ। আল্লাহ ছাড়া আমাদের কোনো ত্রাণকর্তা নাই, তাই সকল দম্ভ-অহম পরিত্যাগ করে এই প্রলয়ঙ্কর দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা পেতে সর্বদা তাঁরই কাছে আশ্রয় চাইতে হবে। সকল প্রচার মাধ্যমে দেশের নাগরিকবৃন্দকে আল্লাহমুখী হতে প্রণোদিত করতে হবে। আসন্ন রমজান আমাদের জন্য এক বিশাল ও বহুমুখী সুযোগের সমাগম। ন্যায়নিষ্ঠ শাসক, রোজাদার আর মাজলুমের প্রার্থনা আল্লাহ ফিরিয়ে দেন না। (সুনানু ইবনে মাজা, হাদিস নং ১৮৫২) আশা করা যায় আসন্ন রমজানেই দেশবাসী পাবে করোনা থেকে মুক্তির জান্নাতি আস্বাদ ইনশাআল্লাহ।
লেখক : প্রফেসর, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

SHARE

Leave a Reply