কোমল পানীয় -উম্মে নাজিয়া

যে  কোন দিন, যে কোন সময়ে কিংবা উৎসব, মেহমান, পার্টিতে অথবা গরমের তৃষ্ণা- ক্লান্তি দূর করতে আমাদের কাছে অতি প্রিয় কোমল পানীয়। নামে কোমল হলেও আসলে কি কোমল?
দেশি-বিদেশিসহ প্রচুর সংখ্যক কোমল পানীয়, এনার্জি ড্রিংকস এবং জুস আমাদের দেশে অত্যন্ত সহজলভ্য। গ্রামগঞ্জ, হাটে-বাজারে সর্বত্র এর ব্যাপ্তি। শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলে এর দারুণ ভক্ত। গ্রামের কোন বাড়িতে কোমল পানীয় পরিবেশিত হওয়ার সঙ্গে মানসম্মান বৃদ্ধির যোগসূত্র রয়েছে। ছেলে- মেয়ে আধুনিক হয়েছে এ যেন তারই প্রতীক। অনেক ভদ্রলোকও এগুলো ঠান্ডা বলে নামকরণ দিয়ে থাকেন। খাবার শেষ হলে বলে ঠান্ডা আছে? কোমল, ঠান্ডা যে নামেই ডাকা হোক না কেন বিষয়টি কিন্তু মোটেও কোমল নয়। অত্যন্ত আশ্চর্য হলেও সত্য এ সকল পানীয়তে কোন উপকারী উপাদান তো দূরে থাক, উল্টো রয়েছে মারাত্মক ক্ষতিকর উপাদান; যা মানুষের দেহে ক্যান্সারসহ নানান রোগ ব্যাধি সৃষ্টি করে। এই সমস্ত পানীয় খেলে কী কী উপকার বা ক্ষতি হয় তা না জেনেই ক্রেতারা শুধু আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেখে এবং একটু স্বাদের জন্য এই সকল পানীয় পান করে থাকেন। এসব কোমল পানীয়তে যেসব রাসায়নিক উপাদান রয়েছে তা অত্যন্ত ক্ষতিকর যেমন- সোডিয়াম বাই কার্বনেট, সাইট্রিক এসিড, টারটারিক এসিড, গ্লু, সুগন্ধি রঙ, প্রিজারভেটিভ, চিনি বা স্যাকারিন, সরবিটল, ম্যান্টিল এবং কীটনাশক। দীর্ঘদিন গুদামজাত করে রাখলেও যাতে শেওলা না জন্মে অথবা বর্ণ পরিবর্তন না হতে পারে সেজন্য কীটনাশক দেয়া হয়ে থাকে।
সোডিয়াম বাই কার্বনেট শিশুরা সহজে হজম ও বিপাক করতে পারে না। ফলে যেসব শিশু সবসময় এসব পানীয় পান করে তারা অব্যাহতভাবে বিষাক্ত প্রতিক্রিয়ার শিকার হতে পারে। রঙিন পানীয়গুলোতে প্রচুর পরিমাণে ক্যাফেইন ব্যবহার করা হয়ে থাকে। অথচ ক্যাফেইন পচন রোধক যা ডাক্তাররা মরা লাশের পচন রোধে ব্যবহার করে থাকেন। ইদানীং বাবা-মা নিজ হাতে শিশুদেরকে এই সকল পানীয় খাওয়ান, এতে শিশুরা মোটা হয়ে যায়। শিশুর যকৃত, কিডনি, হার্ট এবং ব্রেনের নার্ভের ক্ষতি হয়। শিশুর শরীরে পুষ্টির পরিবর্তে চিনি এবং কার্বোহাইড্রেট জমে যায়। শিশুর অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারে রুচি কমে যায়, ঘুম কম হয়, লেখাপড়ায় মনোযোগ কমে যায় এবং শিশুর বুদ্ধিমত্তা হ্রাস পায়। বাচ্চাদের একবার এমন খাইয়ে লোভ ধরানোর পর সেখান থেকে ফিরে আসাও বাবা-মায়ের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকে তো চেষ্টাই করেন না।
বর্তমানে একটি সামাজিক সমস্যা হলো হাড়ের ক্ষয়রোগ। সাদা চিনি দিয়ে অতিরিক্ত চা খাওয়া এবং অধিক চিনিযুক্ত রঙিন পানীয় সেবনের কারণে হাড় থেকে ক্যালসিয়াম বের হয়ে যায়, ফলে হাড় আস্তে আস্তে ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। যা একজন মানুষের জীবনকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। শিশুদের জন্য এটি আরো ক্ষতিকর। এটি দাঁতের ক্ষয় করে। ক্যাভিটি সৃষ্টি করে। দেহের হাড় হালকা করে, যা ভবিষ্যতে তার জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।
সম্প্রতি ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের রিপোর্টে দেখা যায়, ভারতে প্রচলিত কোমল পানীয়তে নিম্নক্ত হারে কীটনাশক পাওয়া গেছে (সূত্র : ইন্টারনেট)
থামস আপ-৭.২%    পেপসি-১০.৯%
কোক-৯.৮%    ফানটা-২৯.১%
৭-আপ-১২.৫%    স্প্রাইট-৫.৩%
মিরিন্ডা-২০-৭%    ফ্রুটি-২৪.৫%
মোজো-১৯.৩%

এ ছাড়া ভারতের সরকারি প্রতিষ্ঠানে সেন্টার ফর সায়েন্সে এনভায়রনমেন্টের পরীক্ষাতে কোকাকোলা এবং পেপসি কোলাতে ক্ষতিকর বিষাক্ত ধাতু সীসা এবং ক্যাডমিয়াম পেয়েছে। সীসা এবং ক্যাডমিয়ামকে ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য দায়ী মনে করা হয়। কোমল পানীয়তে যে পরিমাণ চিনি আছে (যা এক বোতল বা ২৫০ সষ-এ ৬ চামচ চিনির সমপরিমাণ) তা শরীরের মেদ বাড়িয়ে দেয়, যা হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিসের দিকে ঠেলে দেয়। কার্বন ডাই অক্সাইড খুব বিষাক্ত। আমরা জানি, আমরা বাতাস থেকেCO2 নেই এবং বিষাক্ত CO2 ত্যাগ করে থাকি। কোমল পানীয়তে CO2মেশানো হয়। ১৯৯৯ সালে ভারতের দিল্লিতে বিশ্ব কোমল পানীয় খাবার প্রতিযোগিতা হয়। এতে এক ছাত্র এক সঙ্গে আট বোতল পানীয় খেয়ে স্পটেই মৃত্যু বরণ করেছিল। অতিরিক্ত CO2 রক্তের সঙ্গে মেশায় তার মৃত্যু হয়। ঠান্ডা পানীয়র তাৎক্ষণিক বিপদ হচ্ছে-গলায় শাসতন্ত্রের ক্ষতি। ফলে গলায় টনসিল গলবিলের প্রদাহ হয়।
কোমল পানীয়র স্বাদ বৃদ্ধি করার জন্য এতে মেশানো হয় ফসফরিক এসিড-যা দাঁত ও হাড়ের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এই পানীয় নিয়মিত খেলে শরীরের বিষাক্ত উপাদান জমা হয়ে শরীরে মারাত্মক সব ক্ষতি করতে পারে। অতিরিক্ত ঠান্ডায় যাতে না জমে যায় সে জন্য এতে ইথিলিন গ্লাইকল মেশানো হয়। ইথিলিন গ্লাইকল আর্সেনিকের চেয়ে ভয়ঙ্কর বিষাক্ত। এই রাসায়নিকের প্রভাবে লিভার কিডনি ধ্বংসসহ ক্লেইন টিউমার হতে পারে।
১৮৮৬ সালে জন, এস, পেম্পারটন প্রথম কোকাকোলা প্রস্তুত করেন। তারপর এটি আরও পরিবর্তিত হয়। কোকা-কোলা তৈরির অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে দদ৭ীদদ নামক উপাদান মেশানো থাকে কিন্তু দদ৭ীদদ কি এই রহস্য ১৯০৯ সালে আমেরিকার ফেডারেল সরকার দীর্ঘ ৯ বছর মামলা করেও জানতে পারেনি।
যা হোক কোমল পানীয়তে যে সকল ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেছে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে সেগুলো সব যদি না-ও থাকে তবু এতে যে পরিমাণ চিনি এবং CO2 আছে শুধু সেগুলো বিবেচনা করলেও এতে শরীরের কোনো উপকার হয় না, বরং সিগারেটের মতো টাকা পোড়ানো হয়। অতিরিক্ত চিনি এবংCO2 মানুষের জীবনকে স্থবিরতা দেয়া ছাড়া কার্যত কোনোই উপকার করে না। বিশেষজ্ঞদের মতে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে সেরা পানীয় লেবুর জুস, আখের রস, ওলিমের রস, টমেটো জুস ইত্যাদি। ইদানীং শিশু-কিশোররা ব্যাপকভাবে কোমল পানীয় পানে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে এবং তা ভয়াবহভাবে বাড়ছে। ডাক্তাররাও একই কথা বলছেন।
সময় আছে এখনও চিন্তা করার, একটি খাবারের গুণগত মান না জেনে শুধু স্বাদের জন্য যে কোন ধরনের খাবার গ্রহণ কখনোই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। অবশ্যই কী খাচ্ছেন জেনে বুঝে যাচাই করে খেতে হবে কারণ খাদ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাবার জীবন বাঁচাতেও পারে, পারে জীবন ধ্বংস করতেও।

SHARE