কোরবানির ঈদ মিল্লাতের সুবহে উম্মিদ -ড. কামরুল হাসান

বকরীদি করে ফরয়্যাদ, দাও দাও কোরবানী,
আল্লারে পাওয়া যায় না, করিয়া তাহার না-ফরমানি
– কাজী নজরুল ইসলাম
ঈদ।
মুসলমানদের চিরায়ত লোক-উৎসব। ইবাদতনির্ভর সামাজিকতার অনুপম প্রকাশ। শুধু ঈদ নয়, মুসলমানদের প্রতিটি উৎসবই হয়ে থাকে ইবাদতনির্ভর। ইসলামের কোনো উৎসবই ইবাদতকে বাদ দিয়ে নয়, হতে পারে না। কারণ মানবসৃষ্টির মৌল রহস্য এখানেই প্রোথিত। মানুষের কোনো কাজই ইবাদতের বাইরে নয়। হোক তা আচার, লোকাচার কিংবা উৎসব ।
সামাজিকতার অনন্য সব গুণাবলিতে সমুজ্জ্বল, সমন্বিত ও সার্বজনীন এমনই এক উৎসবের নাম ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। মুসলিম জীবনের বিশেষ আনন্দঘন দিন হিসেবেই এই দিনের পরিচিতি। জিলকদ মাসের দশম তারিখ এই ইবাদত ও উৎসবের জন্য নির্ধারিত। এ উৎসবের শুরু হয় আল্লাহর দরবারে সিজদার মধ্য দিয়ে, তারপর চলে আত্মত্যাগের নজরানা পেশের সম্মিলিত মহড়া, আল্লাহর তুষ্টি লাভের অনন্য প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক দায় ও কর্তব্য পালনের একনিষ্ঠ উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে শেষ হয় এ দিনের কার্যক্রম। এ দিনের ইতিহাস মুসলিমসমাজে সুবিদিত। সুবিদিত নানা কারণেই। ঘটনার চমৎকারিত্ব, আত্মত্যাগের মহানত্ব, কৃতজ্ঞতার সারল্য ইত্যাদি কারণে। সর্বোপরি আল্লাহর অভিপ্রায় এমনই যে তিনি তার সৎকর্মশীলদের পার্থিব পুরস্কার এভাবেই দিয়ে থাকেন। তিনি বলেন, আমি তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখি তৎপরবর্তীদের মাঝে। অন্যত্র বলেন, তাদের স্মরণকে আমি সমুন্নত করি। মহান রবের সৃষ্টির অমোঘ বিধান যে, তিনি সত্যানুসন্ধানী, শুভকর্মে অগ্রগামী, প্রভুর প্রতি অনুগত বান্দাদের পুরস্কার উভয় জগতেই দিয়ে থাকেন।
ঈদুল আজহা তথা এ দিনের কোরবানির প্রসঙ্গটি সদা সহনশীল ও অনুগত দু’জন আল্লাহর বান্দা ও নবীর সাথে সম্পৃক্ত। তারা হলেন যথাক্রমে- মুসলিম মিল্লাতের পিতা হজরত ইবরাহিম ও তৎপুত্র হজরত ইসমাইল (আ)। এ পিতা-পুত্রের পারস্পরিক আনুগত্য, সহনশীলতা, ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা, ঔদার্য, ঐশী বাণীর প্রতি প্রগাঢ় আস্থা ইত্যাদির অনুপম বর্ণনা কোরআন, হাদিস, তাফসির ও ইতিহাসের পাঠ থেকে আমরা সচেতন মুসলিম মাত্রই সম্যক অবগত। আমাদের আজকের আলোচনা সেদিকে প্রলম্বিত না করে বরং কোরবানির সামাজিক আবেদন-নিবেদন, সামাজিক নিরাপত্তা বিধানে এর কার্যকর ভূমিকা, পরার্থরতা ও আত্মিক উৎকর্ষে কোরবানি ইত্যাদি বিষয়ে কিঞ্চিৎ দৃকপাতের প্রয়াস পাবো।
দশ জিলহজ তারিখে সামর্থ্যবান মুসলিম মাত্রই কোরবানি করে থাকেন। অর্থাৎ পশু জবাই করে তার আত্মত্যাগের মনোবৃত্তির সুস্পষ্ট জানান দিয়ে থাকেন। আমাদের কোরবানি হওয়া চাই একনিষ্ঠ ও একাগ্র। ইখলাসমিশ্রিত কোরবানিই কেবল আল্লাহর নিকট গৃহীত ও বিদিত হবে। বস্তুতপক্ষে কোরবানি হচ্ছে অন্তরের বিশুদ্ধতার এক সাক্ষাৎ পরীক্ষা। অন্তরের বিশুদ্ধতাই কোরবানির প্রকৃত রহস্য। কোরবানি সম্পর্কে ইসলামের ঘোষণা এমন- আল্লাহর কাছে কোরবানির রক্ত কিংবা গোশত পৌঁছায় না। বরং তার কাছে আমাদের অন্তরের তাকওয়াটুকুই পৌঁছায়। অর্থাৎ কোরবানির আকার, আয়তন, মূল্যমান ইত্যাদি নয়, এখানে কোরবানিদাতার একাগ্রতা, একনিষ্ঠতা ও তাকওয়াই একমাত্র বিবেচ্য বিষয়। তাই আমরা বলতে পারি কোরবানিতে প্রদর্শনী থাকতে পারে তবে কোনোভাবেই প্রদর্শনেচ্ছা থাকতে পারবে না। ইসলামে সকল ইবাদতের পূর্বশর্ত হচ্ছে ইখলাস বা একনিষ্ঠতা। সেজন্যই কোরবানির পশু জবেহের পূর্বেই যাবতীয় অশুভ মনোবৃত্তি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে হবে। তবেই সার্থক হবে কোরবানির আদর্শ, পূর্ণতা পাবে কোরবানির উদ্দেশ্য। সেদিকেই ইঙ্গিত করে কবি বলেন-
মনের পশুরে কর জবাই / পশুরাও বাঁচে, বাঁচে সবাই।
কোরবানির প্রকৃতি ও প্রচলনের ধারাবাহিকতা আমাদেরকে এ কথা জানিয়ে দেয় যে, ইসলাম একটি সামাজিক জীবনদর্শন। ইসলামী জীবনদর্শনের গোড়ার কথাই হলো সামাজিকতা। ব্যক্তি বা ব্যক্তিজীবন উপেক্ষিত নয় ইসলামে। তবে তা নিয়ন্ত্রিত ও পরিমিত। বরং সামগ্রিকতা ও সামাজিকতাই ইসলামের মৌল ভাবনার বিষয়। জীবনাদর্শ হিসেবে ইসলাম সামগ্রিকতাকে প্রাধিকার দিয়েছে এজন্য যে- সামষ্টিক উন্নয়নই দেশ ও জাতির সামগ্রিক উন্নয়নের উৎসভূমি। এদিক বিবেচনায় রেখেই ইসলামে কোরবানির মতো বিধান প্রচলন করা হয়েছে। কারণ পূর্ব মধ্যাহ্নে সামাজিকভাবে সবাই মিলে এক আনন্দমুখর পরিবেশে সম্পন্ন করা হয় কোরবানির কার্যক্রম। গোপনে চাতুর্যের সাথে, একাকী ঘরের কোণে সস্পাদিত কোনো ইবাদত কোরবানি নয়। বরং প্রকাশ্যে জনসম্মুখে অনবদ্য পারস্পরিকতায় এক সম্মিলিত প্রয়াসের নাম কোরবানি। যার মাধ্যমে তৈরি হয় এক ধরনের সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী। যেখানে সমাজের প্রতিটি সদস্য তার মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের নিশ্চয়তা পায় পূর্ণমাত্রায়। কোরবানিতে আমরা কী করি? সালাত সমাপনান্তে আমরা পশু জবাই করি এবং একে অপরের সহযোগী শক্তি হিসেবে গোশত প্রস্তুতের কাজ সম্পন্ন করি। তারপর জবাইকৃত পশুর গোশত তিন ভাগ করি। কেন করি? করি আমরা সামাজিক দায় থেকে, মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে। সর্বোপরি আল্লাহর বিধান পালনার্থে আমি কোরবানির গোশত তিন ভাগ করে এক ভাগ সমাজের দুস্থ- নিরন্ন, (গরীব- মিসকীনদের ) মাঝে বণ্টন করে দেই। ফলে ধনী-দরিদ্রের মাঝে নির্মিত হয় সুদৃঢ় সামাজিকতার অনন্য সেতুবন্ধ। দ্বিতীয় ভাগ বিলিয়ে দিই প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে। এ অংশ শুধু বিতরণ করি না, অন্যদের এ অংশ থেকে প্রাপ্তও হই। ফলে এ লেনদেনে প্রবৃদ্ধি লাভ করে সামাজিক হৃদ্যতা। পারস্পরিকতায় গড়ে ওঠে সখ্যসৌধ। যে সৌধের ইট, পিলার, কংকর বিশ্বমুসলিমের প্রতিটি সদস্য। এখানে যেন বিশ্বমুসলিম একটি পরিবারের মতো। বরং একটি দেহের মতো। এ যেন রাসূল (সা)-এর উক্তিরই প্রতিধ্বনি। রাসূল বলেন: মুসলিমদের পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত হলো যেন তারা একই দেহভুক্ত। ফলে দেহের কোনো অংশে ব্যথা পেলে গোটা শরীরেই তা অনুভূত হয়। জ্বরা ও নির্ঘুম তাকে পেয়ে বসে।
মুসলমানদের মহান আদর্শ উৎসব কোরবানির ঈদ নিতান্ত পার্থিবতায় ¤্রয়ি হয়ে যাওয়া কোনো বিষয় নয়। বরং তা ঐশী আচার পরিপালনের মাধ্যমেই নিশ্চিত করে কোনো দেশ বা সমাজের সহাবস্থান, অস্থির ও অস্থিতিলীল পৃথিবীকে করে বাসযোগ্য। কোরবানির আদর্শ বলে সাধারণ্যে যা প্রচলিত আছে তা নিতান্তই কোনো আপ্তবাক্য নয়। বরং তা কোনো সমুন্নত আদর্শের মহান স্মারক হিসেবে স্থিত হয় যখন দেখি একজন মানুষ স্বীয় অর্থে কোরবানির পশু জবাই করে তার গোশত নিরন্ন-দুঃখীদের মাঝে অকাতরে বিলি করে। আত্মতৃপ্তির ঢেকোর তোলেন। তখনই সার্থকতা পায়, বিশ্বমানবতার জীবনের অর্থ খুঁজে পায় যুদ্ধবিধ্বস্ত অসহায় জনগোষ্ঠী। এই পৃথিবী যেন আবারো বাসযোগ্য হয়ে উঠতে চায় কোরবানির সুকোমল স্পর্শে। বিশ্বমনন উদ্বেল হয় নব সঞ্জীবনীতে। সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠে কোরবানির আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতা।
জিলহজ মাস হিজরি বছরের শেষ মাস। এ মাসেই উদযাপিত হয় কোরবানির ঈদ। পুরো বছরের আচরণগত ত্রুটি-বিচ্যুতির পরিশুদ্ধির এক মোক্ষম সুযোগ এনে দেয় কোরবানি। ক্লেদ, ক্লেশ, মূঢ়তা ইত্যাদি বিসর্জন দিয়ে একজন মুমিন কোরবানির নির্দেশ পালনে ব্রতী হোন এবং আচরণিক পরিশুদ্ধতা অর্জনের সুযোগ গ্রহণ করেন। সালাত আদায়, পশু জবেহ, গোশত বণ্টন, নিজ খাবারে অন্যের সম্পৃক্তি ইত্যাদি সামাজিক স্তরভেদকে নিয়ে যায় শূন্যের কোঠায়। মুসলিম মানবতা পরিশুদ্ধ আচরণের সবক নিয়ে এগিয়ে চলে সম্মুখপানে। সত্যিই কোরবানির আদর্শ সমাজের জন্য বড়ই শিক্ষাপ্রদ! বিপন্ন মানবতার জন্য বড়ই উপাদেয়!
কোরবানি একই সাথে দৈহিক ও আর্থিক ইবাদত। যেমন তা ধর্মীয় ও সামাজিক ইবাদত। আবার তা নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ইবাদতও। ইসলামে ইবাদতের শ্রেণিবিন্যাসে এমন বহুমুখিনতা ও সর্বগুণে বিভূষিত ইবাদত একেবারেই হাতেগোনা। তবে চেতনা ও চেতনার স্থায়ীকরণে কোরবানি এক অসামান্য মর্যাদা ও মহত্ত্বের অধিকারী। মূলত চেতনা একটি জাতির বেঁচে থাকার প্রেরণা। সামনে চলার প্রেষণা। চেতনা ছাড়া কোনো জাতি তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে না। শুধু তাই নয়, ক্রমশ সে জাতি কালের অতলে মিইয়ে যায়। মুসলিম জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে তাই কোরবানির চেতনা অপরিহার্য। যে চেতনা থেকে আমাদের কোরবানি করা তা সত্যিই অনবদ্য। এখানে রয়েছে ঐতিহ্য- যা মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহিম (আ) থেকে পাওয়া। এখানে রয়েছে- সহনশীলতার উদগ্র সবক, যা ইসমাইল (আ)-এর প্রতিটি পদক্ষেপ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। এখানে রয়েছে- আনুগত্যের অনুশীলন, যা পিতা-পুত্রের মহান রবের প্রতি আত্মসমপর্ণের সম্মিলিত প্রয়াসে আমরা দেখি। এখানে রয়েছে- আল্লাহনির্ভরতা, যা মা হাজেরার মক্কায় অবস্থানকালীন আমরা প্রত্যক্ষ করি। এখানে রয়েছে- কল্যাণ চিন্তা, যা ইবরাহিম, ইসমাইল, হাজেরার নানাবিধ কর্মকান্ডে প্রতিফলিত। এখানে রয়েছে- আল্লাহর সন্তুষ্টি যা আমরা কোরবানি-পরবর্তী কার্যক্রমে দেখেছি। ঐতিহ্য, সহনশীলতা, আনুগত্য, আল্লাহনির্ভরতা, কল্যাণচিন্তা, আল্লাহতুষ্টি ইত্যাদি আমাদের চেতনাকে প্রতিনিয়ত স্থায়ী করে। চেতনার সংরক্ষণ ও চেতনা লালনে আগ্রহী করে। মুসলিম জাতীয়তা রক্ষায় অতি প্রয়োজনীয় যে চেতনা তার স্থায়ী সংরক্ষণের জন্যই কোরবানির শিক্ষা ও আদর্শের প্রতি আমাদের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আবশ্যক।
আলোচনার শেষ স্তবকে বলতে চাই আমাদের কোরবানির মূল শিক্ষা হলো- আমাদের সকল কাজের মাপকাঠি হবে দ্বীন। সবকিছুর ওপর প্রাধান্য হবে আখিরাতের। ভাবনার জায়গাটা হলো হজরত ইবরাহিম (আ) কেন তার পুত্র হজরত ইসমাইল (আ)-কে কোরবানি করতে উদ্যোগী হলেন, ইসমাইল (আ) কেন তার বাবার আহ্বানে সাড়া দিলেন, কেন মা হাজেরা নিরন্ন সম্বলহীন অবস্থায় শিশু ইসমাইলকে নিয়ে জনমানবহীন মরু প্রান্তরে থাকতে সম্মত হলেন, কেন তারা এমন কাজের ঝুঁকি নিতে পেরেছিলেন? এমন প্রশ্নের একটাই উত্তর- তারা ভাবতেন সবার ওপর দ্বীন, সর্বাগ্রে আল্লাহর সন্তুষ্টি, আখিরাতের চেয়ে বড় সফলতা আর কিছু নেই। তাই তারা এভাবে নিজেদেরকে আল্লাহর সমীপে সমর্পণ করতে পেরেছিলেন। কোরবানির কেন্দ্রীয় শিক্ষা এটাই। আমার সালাত, কোরবানি, জীবন-মরণ সবই আল্লাহর রাহে নিবেদিত। কুরবানির চাহিদা এটিই যে- প্রতিটি মুসলিম ইবরাহিম (আ)-এর চরিত্রে বিভূষিত হবে। আল্লাহর আনুগত্য আখেরাত ও দ্বীনকে সকল কাজের ওপর প্রাধান্য দেবে। তারই মতো প্রিয় সম্পদ এমনকি প্রিয় পুত্রকে আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করতে সদা নির্বিঘ্ন হবে। কবি নজরুলের কি মায়াময় উচ্চারণ!
ডুবে ইসলাম, আসে আঁধার / ইব্রাহিমের মত আবার /
কোরবানী দাও প্রিয় বিভব। / জাবীহুল্লাহ ছেলেরা হোক /
থাক সবকিছু- মত্য রোক / মা হাজেরা হোক মায়েরা সব।
মা হাজেরার মত মা, ইবরাহিমের মত বাবা আর ইসমাইলের মত সৎপুত্রের অভাব পূরণই পারে আজকের সমাজকে পঙ্কিলতামুক্ত করে শান্তি-সুখের সমাজ গড়তে। জেগে উঠুক বিশ্বমুসলিম এই উম্মিদে- এবারের এই ঈদে।
সবাই খোরাক পাইবে ক্ষুধার আসিবে ঈদের খুশী
লুট করে নে রে আল্লাহর দান কেউ হবে না রে দুষী।
লেখক : অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

SHARE

Leave a Reply