ক্রসফায়ার ও গুমের শেষ কোথায় এবার মুখোমুখি র‌্যাব-পুলিশ -মো: কামরুজ্জামান (বাবলু)

পেট্রলপাম্পের অদূরে একটি পরিত্যক্ত চাতালে সাফিনসহ একদল সন্ত্রাসী গোপন বৈঠক করছিল- এমন খবর পেয়ে রাত ৩টার দিকে র‌্যাবের একটি টহল দল সেখানে অভিযান চালায়। এ সময় সন্ত্রাসীরা র‌্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। র‌্যাবও পাল্টা গুলি ছোড়ে। একসময় সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। পরে সেখান থেকে গুলিবিদ্ধ সাফিনকে উদ্ধার করে জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালে নেয়া হলে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল ও তিনটি গুলি উদ্ধার করে র‌্যাব।
গত ২৫ অক্টোবর রাত ৩টার দিকে জয়পুরহাট-আক্কেলপুর সড়কের দাদড়াজন্তি গ্রামের ঘটনা এটি। বাংলাদেশের প্রায় সকল শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমেই এই খবরটি প্রকাশিত হয়। অবশ্য সাফিনের পরিবারের অভিযোগ, সাফিনকে ২৮ দিন আগে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করেছিল র‌্যাব। তবে পরিবারের এ অভিযোগ নাকচ করে দেয় বাংলাদেশের এই এলিট ফোর্স-র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।
ক্রসফায়ার বা এনকাউন্টারের নামে বাংলাদেশে এভাবে একের পর এক ঘটতে থাকা প্রতিটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাতেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে এ ধরনের একটি বিবৃতি দেয়া হয় বা সংবাদ সম্মেলন করে এমন বক্তব্য দেয়া হয়। আর বাংলাদেশের সব গণমাধ্যম সেই বিবৃতি বা কথিত বক্তব্যের আলোকে সংবাদ প্রকাশ করে থাকে।
বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী বাংলা জাতীয় দৈনিক ‘প্রথম আলো’র ইংরেজি অনলাইন ভার্সনে  গত ২৬ অক্টোবর ২০১৬ 7 killed in ‍gunfights, 5 bullet-hit bodies recovered in 10 months in Jhenaidah-এই শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধুমাত্র দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা ঝিনাইদহেই বিগত ১০ মাসে অন্তত ১২টি এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সাতজনই মারা যায় পুলিশের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে। বাকি পাঁচজনের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়।
প্রথম আলোর ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বিগত ১০ মাসে ক্রসফায়ার বা এনকাউন্টারে নিহত এই ১২ জনই দেশটির প্রধান ইসলামী সংগঠন ও বিরোধী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও এর অঙ্গসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন।
দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর পক্ষ থেকে এক্ষেত্রেও সেই একই বিবরণ দেয়া হয়। অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ এরা নিহত হয়েছেন। অথচ নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে বন্দুকযুদ্ধের নামে তাদের স্বজনদের হত্যা করা হয়েছে। আর এই হত্যার বেশ কিছুদিন আগেই তাদেরকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধরে নিয়ে যায়।
যদিও দেশের মানুষের কাছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর এই গতানুগতিক বিবৃতি অনেকটাই গা-সওয়া হয়ে গেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ক্রসফায়ারে নিহত দুই শীর্ষস্থানীয় জঙ্গিকে নিয়ে এলিট ফোর্স র‌্যাব ও পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধিতা ও বিপরীতমুখী তথ্য সরবরাহের ঘটনায় অনেকের মনেই এখন নতুন করে প্রশ্ন দানা বাঁধতে শুরু করেছে- এ যাবৎ কথিত ‘ক্রসফায়ার’-এর ঘটনায় যে শত শত লোক নিহত হলেন তারা কি আসলেই ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হয়েছেন নাকি ‘টার্গেট কিলিং’-এর শিকার হয়েছেন?
ঢাকার অদূরে আশুলিয়ায় র‌্যাবের এক অভিযান চলাকালে চার তলা থেকে লাফিয়ে পড়ার কয়েক ঘণ্টা পর গত ৮ই অক্টোবর, ২০১৬ সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিহত হন জঙ্গি সংগঠন জেএমবির শীর্ষ নেতা শায়খ আবু ইবরাহিম আল-হানিফ ওরফে সারোয়ার জাহান। আর তাকে নিয়েই এই বিতর্কের সূত্রপাত। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় ইতালির নাগরিক চেজারে তাভেলা হত্যাকাণ্ডে সারোয়ারের সম্পৃক্ততা এবং ‘নব্য জেএমবি’ ইস্যুকে ঘিরে এলিট ফোর্স র‌্যাব ও পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের মধ্যকার এই মতবিরোধ অনেকটাই প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে।
গত ২১ অক্টোবর ২০১৬ এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেছিলেন, আব্দুর রহমানই নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা শায়খ আবু ইবরাহিম আল-হানিফ, যার প্রকৃত নাম সারোয়ার জাহান। ইতালির নাগরিক চেজারে তাভেলাসহ সারাদেশে ২২টি হামলায় নতুন জেএমবির হাত রয়েছে বলেও মন্তব্য করেছিলেন তিনি।
র‌্যাবের মহাপরিচালকের এমন বক্তব্যের মাত্র চার দিন পর ২৬ অক্টোবর, ২০১৬ আরেক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি আশুলিয়ায় নিহত জঙ্গি সারোয়ার জাহান জেএমবির তৃতীয় সারির নেতা, শীর্ষ নেতা নয়।
শুধু তাই নয়, নারায়ণগঞ্জের অভিযানের সময় নিহত আরেক জঙ্গি নেতা তামিম চৌধুরী সম্পর্কে র‌্যাব মহাপরিচালক বলেছিলেন, সারোয়ার জাহানের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন তামিম। কিন্তু র‌্যাবের এই দাবিও উড়িয়ে দেন মনিরুল।
অথচ র‌্যাবের প্রধান গত ২১ অক্টোবরের সংবাদ সম্মেলনে তামিম ও সারোয়ারের মধ্যকার কথাবার্তার রেকর্ড সুনির্দিষ্ট টাইমসহ উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেন, গত ২৭ আগস্ট, ২০১৬ নারায়ণগঞ্জে নিজের আস্তানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক অবরুদ্ধ হওয়ার পর তামিম সারোয়ারের সাথে যোগাযোগ করেছিল। দুই জঙ্গির মধ্যে রাত ২টা ২৩ মিনিট থেকে রাত ৩টা ৩৯ মিনিট পর্যন্ত কথা হয়।
Rab claims it identified Abu Ibrahim Al-Hanif”-এই শিরোনামে ২২ অক্টোবর, ২০১৬ ‘ডেইলি স্টার’ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব প্রধান বলেন, ২৭ আগস্ট রাত ৩টা ২ মিনিটে তামিমের মেসেজের জবাব দেয় সারোয়ার। সেখানে সারোয়ার তামিমকে তার কাছে থাকা কম্পিউটারগুলোর হার্ড ডিস্ক ধ্বংস করার জন্য বলেছিলো। তামিমের কাছে গ্রেনেড আছে কিনা তাও জানতে চেয়েছিল সারোয়ার। গ্রেনেডগুলো ছুড়ে দিয়ে যুদ্ধ শুরু করার জন্য তামিমকে সারোয়ার নির্দেশ দিয়েছিল বলেও জানান র‌্যাব প্রধান।
অনেকের কাছেই এখন এটা এক বিস্ময়কর ব্যাপার- যেখানে র‌্যাব প্রধান এমন সুনির্দিষ্টভাবে বক্তব্য দিলেন সেটা কিভাবে প্রত্যাখ্যান করলেন পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম? তাহলে একের পর এক বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ক্রসফায়ারের নামে হত্যার পর যেই গতানুগতিক বক্তব্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বছরের পর বছর দিয়ে আসছেন তা কী করে বিশ্বাস করবেন দেশের মানুষ?
আবার নব্য জেএমবির সদস্য সংখ্যা এখন ২১ এবং তাদের সব অস্ত্রই উদ্ধার করা হয়েছে বলে র‌্যাব মহাপরিচালক সংবাদ সম্মেলনে যে তথ্য দিয়েছিলেন, সেটিও গ্রহণ করেননি মনিরুল ইসলাম।
অপরদিকে, পুলিশের রিপোর্ট অনুযায়ী ইতালির নাগরিক চেজারে তাভেলা হত্যাকাণ্ডের মামলায় বিএনপির একজন নেতাসহ কয়েকজন আসামি রয়েছেন। ডিবি পুলিশ এরই মধ্যে ঢাকা মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার এম এ কাইয়ুম ও তার ভাইসহ সাতজনকে আসামি করে তাবেলা হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দিয়েছে। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম দাবি করেন, ইতালির নাগরিক চেজারে তাভেলা হত্যাকাণ্ডে তারা যথাযথ তদন্ত করেছেন এবং তার ভিত্তিতেই বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। আর এই বিচারাধীন মামলা নিয়ে র‌্যাব মহাপরিচালকের কোনো বক্তব্য দেয়ার এখতিয়ার নেই বলেও জানান মনিরুল।
দুই শীর্ষ জঙ্গি নিয়েই যখন এলিট ফোর্স র‌্যাব ও পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের মধ্যে এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্য প্রকাশ্যে চলে আসে তখন দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের বিগত সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় ধরে জঙ্গিবিরোধী অপারেশনের নামে যে শত শত লোককে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হলো তা কতটা গ্রহণযোগ্য?
জঙ্গিবিরোধী অভিযান কিংবা এ সম্পর্কিত কার্যক্রম নিয়ে পুলিশেরই এই দুই বিভাগের এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থানে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিচালক নুর খান লিটন। তিনি নিয়মিত জঙ্গিকার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে থাকেন। তার মতে, দু’টি বাহিনী থেকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য যখন জনসম্মুখে চলে আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের সমন্বয়হীনতার বিষয়টি সামনে চলে আসে।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা অবশ্য বলেন, সমন্বয়নহীনতা জাতীয় কথাবার্তা একটা প্রশাসনিক বিষয়। এটি আদালতের দেখার বিষয় নয়। ফৌজদারি অপরাধের চূড়ান্ত পরিণতি হবে আদালতের মাধ্যমে।
শুধু এটাই নয়, পুলিশ ও র‌্যাবের মধ্যকার বিরোধ এখন এতটাই ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে যে র‌্যাবের ব্যাপারে পুলিশের বাড়াবাড়ির ৬টি অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে পুলিশ সদরদপ্তর। গত ৯ই অক্টোবর পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক (মিডিয়া অ্যান্ড প্ল্যানিং) এ কে এম শহিদুর রহমানকে প্রধান করে এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে যত দ্রুত সম্ভব প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বলা হয়। গত ২৬ অক্টোবর, ২০১৬ “Police probing ‘excesses’ on Rab personnel”-এই শিরোনামে এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রভাবশালী ইংরেজি  দৈনিক ‘দি ডেইলি স্টার’ এসব তথ্য জানায়।
ডেইলি স্টারের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ স্বরাষ্ট্রসচিব মোজাম্মেল হক খানের কাছে র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ লিখিতভাবে ওই অভিযোগ দাখিল করেন। এতে তিনি বলেন, পরিচয় জানার পরও বিভিন্ন সময় র‌্যাব সদস্যদের নাজেহাল করেছে পুলিশ সদস্যরা। এমনকি কয়েকটি ঘটনায় লাঠি ও রাইফেল দিয়ে র‌্যাবের সদস্যদের আঘাত করেছে পুলিশ।
পুলিশ সদরদপ্তরের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ডেইলি স্টারের ২৬ অক্টোবরের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, র‌্যাবের পক্ষ থেকে দায়ের করা ছয়টি অভিযোগের মধ্যে দু’টির তদন্ত এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। আর তাতে র‌্যাব ও পুলিশ উভয় বাহিনীর সদস্যদেরই দোষ প্রমাণিত হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জনগণের জানমালের হেফাজতে নিয়োজিত দুইটি বাহিনীর নৈতিক মানের কতটা অবনতি হলে এবং একের প্রতি অপরের শ্রদ্ধাবোধ কতটা তলানিতে পৌঁছালে এমন ঘটনা ঘটে তা নিয়ে জনমনে রয়েছে বিস্তর প্রশ্ন। আর এই দুই বাহিনীরই কর্তাব্যক্তিরা যখন শীর্ষ জঙ্গিদের ব্যাপারে দুই ধরনের তথ্য উপস্থাপন করেন তখন দেশবাসী কার কথা বিশ্বাস করবেন? আর বিগত কয়েক বছরে এই দুই বাহিনীর হাতে যে শত শত বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ক্রসফায়ারে নিহত হলেন তা নিয়ে গতানুগতিক বিবৃতিই বা কতটা গ্রহণযোগ্যতা পাবে দেশবাসীর কাছে?
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিচালক নুর খান বলেন, বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জঙ্গিবিরোধী অভিযান নিয়ে এরই মধ্যে জনমনে ব্যাপক সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে বিষয়টি বেশ ভালোভাবেই ফুটে উঠেছে। সবশেষ দুই বাহিনীর এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্য মানুষের সংশয়কে আরো ঘনীভূত করেছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়াবিষয়ক পরিচালক ব্রাড অ্যাডামস এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশে ক্রসফায়ারের নামে বিরোধী সদস্যদের হত্যার বিষয়টি উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ সরকারের প্রয়োজন নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর সঠিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা এবং এসব হত্যাকাণ্ডের স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের নির্দেশ দেয়া। ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা নিয়ে উদ্বেগ হিউম্যান রাইটস ওয়াচের’-এই শিরোনামে দৈনিক সমকালে ২০১৪ সালের ২৯ জানুয়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অ্যাডামসের এই বিবৃতিটি ছাপা হয়।
আর এমনই পটভূমিতে চলতি বছরের ২২ জুন দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় ‘প্রতিটি ক্রসফায়ারের তদন্ত করার নির্দেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের’-শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিটি বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারের ঘটনার তদন্ত করার জন্য নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পুলিশ, ডিবি, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে বা ক্রসফায়ারে নিহত ঘটনাগুলো তদন্ত করা হচ্ছে।
বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে জনকণ্ঠের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, চলতি, ২০১৬ বছরের জুন মাস পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ৭৫ জন নিহত হয়েছেন। যারা নিহত হয়েছেন তারা জঙ্গি, সন্ত্রাসী, ডাকাত, দুর্বৃত্ত বলে অভিহিত করেছে পুলিশ। এছাড়া বিগত সাড়ে ৩ বছরে এ ধরনের বন্দুকযুদ্ধে আরো ৪৫৬ জন নিহত হয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
পুলিশ সদর দফতর সূত্রের বরাত দিয়ে জনকণ্ঠ জানায়, ২০১৬ সালের ২০ জুন পর্যন্ত বন্দুকযুদ্ধে বা পুলিশ হেফাজতে নিহত হয়েছে ৭৫ জন। আগের বছর ২০১৫ সালে নিহত হয়েছে ১৮৩ জন, তার আগের বছর ২০১৪ সালে নিহত হয়েছে ১২৮ জন। এর আগের বছর অর্থাৎ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রথম মেয়াদের শেষ বছর ২০১৩ সালে পুলিশ হেফাজতে নিহত হয়েছে ৭২ জন। এভাবে বিগত সাড়ে তিন বছরে কথিত বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ার এবং পুলিশের হেফাজতে ৪৫৬ জন নিহত হয়েছে।
আর এমনই বাস্তবতায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত ঘোষণার পরও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। বিগত ২০১৬ সালের জুনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই ঘোষণার পরের মাস অর্থাৎ জুলাই মাসেও ক্রসফায়ারে অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন বলে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার (বিএমবিএস) মাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়। এর মধ্যে পুলিশের হাতে নিহত হন ১৮ জন এবং র‌্যাবের হাতে ২ জন।
শুধু তাই নয়, বিএমবিএস’র প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০ জনকে ক্রসফায়ারের নামে হত্যার পাশাপাশি জঙ্গি ও সন্ত্রাসী দমন অভিযানের নামে জুলাই মাসে গণগ্রেফতার করা হয় ৮৩৫ জনকে। এ ছাড়া এই মাসে নিখোঁজ হয়েছে আরো ৫৮ জন। নিহত ও গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের প্রায় সবাই বিরোধী রাজনৈতিক দল জামায়াত-শিবির ও বিএনপির নেতাকর্মী।
পরের মাস আগস্টেও পরিস্থিতির এতটুকু উন্নতি হয়নি। মনে হয় যেন এটাই এখন দেশের স্বাভাবিক অবস্থা। মানবাধিকার সংগঠন বিএমবিএস’র বরাত দিয়ে বাংলা জাতীয় দৈনিক ইনকিলাব ‘আগস্টে দেশে ক্রসফায়ারে নিহত ১৯ জন : খুন ৯০ ধর্ষণের শিকার ২৯ নারী’Ñএই শিরোনামে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে ২ সেপ্টেম্বর ২০১৬।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, আগস্ট মাসে দেশে ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন ১৯ জন, খুন হয়েছেন ৯০ জন এবং ২৯ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ক্রসফায়ারে নিহত ১৯ জনের মধ্যে পুলিশের হাতে নিহত হন ১০ জন এবং র‌্যাব কর্তৃক নিহত হন ৮ জন ও যৌথ বাহিনীর হাতে ১ জন।
মানবাধিকার সংগঠন বিএমবিএস-এর বরাত দিয়ে  দৈনিক আমাদের সময়ে গত ৩রা অক্টোবর ২০১৬ ‘বিএমবিএসের তথ্য সেপ্টেম্বরে ১০৮ খুন ৩১ নারী-শিশু ধর্ষিত’- এই শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সেপ্টেম্বরে ক্রসফায়ারে মৃত্যু হয়েছে ১০ জনের। এর মধ্যে পুলিশের হাতে নয় জন এবং র‌্যাবের অভিযানে নিহত হন একজন। এ ছাড়া ভারতীয় সীমান্তবাহিনীর গুলিতে নিহত হন পাঁচজন, আহত সাতজন।
সবশেষ অক্টোবর মাসে এসে পরিস্থিতির যেন আরো অবনতি ঘটে। ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাত্রা যেন পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। মানবাধিকার সংগঠন বিএমবিএস’র মাসিক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বাংলা জাতীয় দৈনিক সকালের খবরে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনে অক্টোবরে নিহত ৫৯১ জন’- এই শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্রসফায়ারের নামে অক্টোবরে বিচারবহির্ভূতভাবে ২২ জনের মৃত্যু হয়। এছাড়া ভারতীয় সীমান্তবাহিনীর হাতেও এক বাংলাদেশী নিহত হন।
নভেম্বর মাসেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। সমান গতিতেই ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলতে থাকে। মানবাধিকার সংগঠন বিএমবিএসের নভেম্বর মাসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্রসফায়ারে নিহত হয় ১২ জন। এদের মধ্যে পুলিশের হাতে ৬ জন ও র‌্যাবের হাতে ৬ জন। তাছাড়া ভারতীয় সীমান্তবাহিনী কর্তৃক নিহত হয় ৪ জন এবং আহত হয় ৪ জন।
বিজয়ের মাস ডিসেম্বরেও থেমে নেই বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা। শুরুতেই ১লা ডিসেম্বর দৈনিক প্রথম আলোতে ‘পুলিশ হত্যা করেছে বলছে পরিবার, অস্বীকার পুলিশের’-এই শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়:
‘যশোর সদর উপজেলার পাঁচবাড়িয়া এলাকা থেকে মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রিপন হোসেন গাজী (২৮) নামে এক যুবকের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গত ৩০ নভেম্বর ২০১৬ দিবাগত রাত একটার দিকে লাশটি যশোর জেনারেল হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়।
রিপনের পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ ধরে নিয়ে রিপনকে গুলি করে হত্যা করে হাসপাতালে লাশ রেখে গেছে। পুলিশের দাবি, দুষ্কৃতকারীদের দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলিতে রিপন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন।
‘তিন যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ, সন্দেহ র‌্যাবকে’-এই শিরোনামে গত ৫ ডিসেম্বর ২০১৬ দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়: ‘দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে গুলিবিদ্ধ তিন যুবকের লাশ উদ্ধার করেছে থানা-পুলিশ। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) পরিচয়ে ওই তিন যুবককে তুলে নেয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন নিহত এক যুবকের মা। নিহত যুবকেরা হলেন নাটোরের আবদুল্লাহ আকন্দ (২৮), রেদোয়ান সাব্বির (২৬) ও সোহেল রানা (২৭)।’
দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জঙ্গি বা সন্ত্রাস দমনের নামে বর্তমান সরকারের আমলে যাদেরকে আটক, গুম ও ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হচ্ছে তাদের অধিকাংশই দেশের সবচেয়ে বড় ইসলামী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী।
যেখানেই পুলিশ অভিযান চালায় সেখানেই ক্রসফায়ার এবং হত্যা। এটাই এখন রীতি হয়ে গেছে। অথচ শীর্ষ জঙ্গিসংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ-জেএমবি’র প্রতিষ্ঠাতা ও আধ্যাত্মিক নেতা শায়খ আব্দুর রহমান, শূরা কমিটির প্রধান সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাই ও অপারেশন কমান্ডার আতাউর রহমান সানীসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ জঙ্গিকে আটক করে বিচারের মাধ্যমে ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছিল চারদলীয় জোট সরকারের আমলে। এখন প্রথম সারি তো দূরের কথা তৃতীয় ও চতুর্থ সারির কোনো জঙ্গিকেও জীবিত ধরতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কাউকে জীবিত ধরা সম্ভব হলেও তাকে নিয়ে অভিযানের নামে বাইরে বের হয়ে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হচ্ছে।
একদিকে ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা, অপরদিকে গুম। যেন এক আতঙ্কের নগরীতে বাস করছেন বাংলাদেশের মানুষ। গত ১০ ডিসেম্বর ২০১৬ ইংরেজি দৈনিক দি ডেইলি স্টার “HUMAN RIGHTS DAY TODAY: Fear, despair over disappearances” অর্থাৎ ‘মানবাধিকার দিবস আজ: গুমকে ঘিরে আতঙ্ক ও হতাশা’-এই শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয় : “At least 300 disappeared since 2013; fingers pointed at law enforcers in many cases” অর্থাৎ ‘২০১৩ সাল থেকে অন্তত ৩০০ জনকে গুম করা হয়েছে; অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযোগের তীর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকে।’
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসেক)-এর বরাত দিয়ে ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়: “চলতি ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত অন্তত ৮৯ জনকে গুম করা হয়। ২০১৫ সালে এই সংখ্যা ছিল অন্তত ৫৫। এছাড়া ২০১৪ সালে ৮৮ জনকে এবং ২০১৩ সালে ৬৮ জনকে গুম করা হয়।’
বাংলাদেশের এই বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুম নিয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন উদ্বেগ জানিয়ে এলেও সরকার যেন নির্বিকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্তের নির্দেশনার পরও কোন ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এখন স্বাভাবিকভাবেই অনেকের মনে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সরকার কি তাহলে বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করতেই জঙ্গিদমন ও সন্ত্রাস নির্মূলের নামে ক্রসফায়ারের নাটক করে দেশ থেকে বিরোধী শক্তিকে নির্মূল করার এক ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক খেলায় মেতে উঠেছে?
লেখক : সাংবাদিক

SHARE