ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে গ্রামীণ অর্থনীতি

মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ#

Orthonityঅব্যাহত রাজনৈতিক অস্থিতার কারণে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অনেকটাই ধস নেমেছে। পরিবহনব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় গ্রামীণ অর্থনীতির হালচাল নাজুক হয়ে পড়েছে। মূলত শহর থেকে গ্রামে এবং গ্রাম থেকে শহরে মানুষের স্বাভাবিক যাতায়াত ব্যাহত হওয়ার ফলে সব ব্যবসা-বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় হরতাল-অবরোধে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশেষ করে জেলা শহরগুলো ঢাকা থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হওয়ায় গ্রামীণ প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী এসব কারণে এক দিকে গ্রামে খাদ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্য দিকে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বাধাগ্রস্ত হওয়ায় গ্রামের মানুষের আয় কমে গেছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গ্রামে ব্যয় হয় ৬৫ শতাংশ আর শহরে ব্যয় হয় ৩৫ শতাংশ। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এডিপি বাস্তবায়ন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি ও পল্লীঋণ কর্মসূচির আওতায়ও গ্রামের অর্থের প্রবাহ থমকে গেছে। চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৩২ শতাংশ। গত বছরের জানুয়ারিতে কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণ করা হয়েছিল ৩ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা। এ বছরের জানুয়ারিতে বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৪১৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। আবার ২০১৪-এর ডিসেম্বরে স্বাস্থ্য উপখাতে মূল্যস্ফীতি হয়েছিল শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ, ২০১৫ জানুয়ারিতে বেড়েছে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এক মাসের ব্যবধানে কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণ কমেছে ৩৭০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। আদায় কমে গেছে ৮৪৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। হরতাল-অবরোধের কারণে কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। কাঁচা সবজির বৃহৎ একটি অংশ মাঠেই পচে যাচ্ছে। ফলে ঋণ প্রদান ও আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এর কারণ হিসেবে একমাত্র রাজনৈতিক সহিংসতাকে চিহ্নিত করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ও কৃষি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ।
লাগাতার অবরোধ-হরতালে নাশকতার ভয়ে মানুষের চলাচল কমে যাওয়ায় শহর থেকে গ্রামে এবং গ্রাম থেকে শহরে টাকার প্রবাহও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। উৎপাদন এলাকায় পণ্যের দাম কম এবং বিপণন এলাকায় দাম বেশি। এভাবে গ্রামীণ অর্থনীতি দিন দিন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতি আরো কিছুদিন বহাল থাকলে গ্রাম ও শহরের পণ্যমূল্যে ব্যাপক ব্যবধান দেখা দেবে। সেই সাথে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কাও রয়েছে।
দেশব্যাপী ২০ জোটের ডাকা টানা অবরোধে গ্রামীণ অর্থনীতিতে দুর্যোগ নেমে এসেছে। পরিবহনখরচ দ্বিগুণের বেশি হওয়ায় ও উৎপাদিত কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারজাত না হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকেরা। কাওরান বাজারের আড়তে বসার খরচ তুলতে না পেরে ও ঋণের সুদ পরিশোধ করতে না পেরে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
কাওরান বাজার ঘুরে জানা গেছে, বৃহত্তর কুমিল্লা, যশোর, বগুড়া, দিনাজপুর, রাজশাহীসহ সারা দেশে এ অবস্থা বিরাজমান। সারা বছর কৃষকেরা আশায় থাকেন শাক-সবজি চাষ করে নগদ টাকা আয় করবেন। এসব ফসল চাষ করার জন্য ধারদেনা থেকে শুরু করে হালের বলদ বিক্রি, ব্যাংকঋণ ও মহাজনের কাছ থেকে উচ্চসুদে ঋণ নিয়ে থাকেন অনেকে। তাদের প্রত্যাশা থাকে এসব অর্থকরী ফসল বিক্রি করে ধারদেনা শোধ করবেন।
কিন্তু চলতি বছরের ৪ ও ৫ জানুয়ারি থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে-বিপক্ষে কর্মসূচি ও ৬ জানুয়ারি থেকে টানা অবরোধ চলছে। এতে গ্রামীণ পর্যায়ে এসব জনপদ থেকে রাজধানীসহ সারা দেশের যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ঝুঁকি নিয়ে পণ্য পরিবহন করার সময় বিভিন্ন স্থানে কৃষিপণ্যবাহী গাড়ি হামলার শিকার হচ্ছে। এ দিকে পরিবহনব্যয় বেড়ে গেছে দ্বিগুণের বেশি। অন্য দিকে কৃষক উৎপাদিত সবজি নিয়ে বিক্রির আশায় স্থানীয় আড়তগুলোতে চাষিরা প্রতিদিন ভোর থেকে বসে থাকলেও দেখা মিলছে না পাইকারদের। কোথাও কোথাও দু-একজন ক্রেতা পেলেও দাম অর্ধেকের চেয়ে কম। পরিস্থিতি এমন যে, সবজি বাজারে আনার ও আড়তে বসার খরচই উঠছে না বলে জানিয়েছেন একাধিক চাষি। আবার পরিবহনখরচ এতবেশি বেড়েছে যে এক ট্রাক সবজির চেয়ে ট্রাকের ভাড়া ২-৩ গুণ বেশি হাঁকা হচ্ছে। ফলে অনেক কৃষকের সবজি ক্ষেতেই বিনষ্ট হচ্ছে। সময়মতো ক্ষেত খালি করতে না পারায় এবং চাষাবাদের খরচ জোগাতে না পেরে পরবর্তী ফসল চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না। এর নেতিবাচক প্রভাব বা বাজারে সবজির সরবরাহ আগামীতে চাহিদা অনুযায়ী কৃষকেরা জোগান দিতে না পারলে দামও চড়ে যাবে এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কৃষকদের ক্ষুদ্রঋণ দিতে খুব একটা আগ্রহী হয়ে নাও উঠতে পারে। কৃষি অর্থনীতিবিদরা বিষয়টিকে ভয়াবহ বলে অভিহিত করেছেন। কারণ অবস্থার পরিবর্তন না হলে এক দিকে চাষিরা ফসল চাষাবাদের আর্থিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছেন এবং অন্য দিকে বাজারে নিয়মিত সরবরাহ রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
কুমিল্লা থেকে আসা কৃষক মোস্তফা জানান, তাকে প্রতিদিনই লোকসান গুনতে হচ্ছে। তিনি বলেন, আড়তে বসার ভাড়া ৩০০ টাকা। তারপর সারা দিনে নিজেদের খরচ তো আছেই। দুইজন মানুষের খাওয়া দুইবেলায় ২০০ টাকা চলে যায়। মোস্তফা বলেন, আগে যেখানে ট্রাক ভাড়া ২ হাজার টাকা ছিল এখন তা বেড়ে ৬ হাজার টাকা হয়েছে। কোথা থেকে পূরণ করবো এই বাড়তি খরচ। তিনি বলেন, বেচা কেনা হচ্ছে না বলেই ধরা চলে। সবজি পচে যাচ্ছে কেনার মানুষ নেই। প্রতিদিন লোকসান গুনতে হয়েছে। এক ট্রাক মাল আনতে ১০ হাজার টাকার জায়গায় দিতে হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। তাও সহজে ট্রাকওয়ালারা ঝুঁকিতে আসতে চাচ্ছেন না।
এ দিকে, বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত বন্দরনগরী চট্টগ্রাম লাগাতার হরতালে অচল এবং সারা দেশ থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বৃহত্তর চট্টগ্রাম। দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থির পরিস্থিতিতে পুরোদমে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য। থমকে গেছে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন। দৈনিক কোটি কোটি টাকা লোকসান গুনতে বাধ্য হচ্ছে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহ। চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে নজিরবিহীন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। দিন দিন অবস্থা আরও নাজুক হচ্ছে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে ‘লালবাতি’ জ্বলার উপক্রম হয়েছেÑ এ কথা বলছে ব্যবসায়ীমহল। চট্টগ্রাম বন্দর ভেতরে সচল হলেও বাইরে বাস্তবে অচল। বন্দরে আমদানিকৃত কনটেইনারসহ খোলা সাধারণ পণ্যসামগ্রীর পাহাড় জমে উঠেছে। কেননা অবিরাম আমদানি পণ্য বা কনটেইনার খালাস হচ্ছে ঠিকই; কিন্তু বন্দরের বাইরে ডেলিভারি পরিবহন হচ্ছে খুবই সামান্যই। সামগ্রিক অস্থিরতার কারণে বন্দর হয়ে পণ্যসামগ্রীর আমদানি খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং বাড়তি খরচ পুষিয়ে নিতে আমদানিকারক, ব্যবসায়ীরা সবধরনেরই নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে আদায় করছেন। এতে করে বাজারে নিত্য ও ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে যথেচ্ছ হারে।
বন্দর অভিমুখে অপেক্ষমাণ পণ্য পরিবহনব্যবস্থাও অচল রয়েছে। বেসরকারি স্থল কনটেইনার ডিপোগুলোতে রফতানিমুখী ও খালি কনটেইনার জমছেই। জাহাজে কনটেইনার বহনক্ষমতার তুলনায় কম পণ্য নিয়ে রফতানি জাহাজীকরণ হচ্ছে। সময়মতো পণ্যবাহী কনটেইনার না পেয়ে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ খালি অবস্থায় বন্দর ছাড়ছে জাহাজ। এতে করে পণ্য বহনের সমানুপাতে জাহাজের পরিচালন খরচ বাড়ছে। যদিও এখন পর্যন্ত জাহাজের জট সৃষ্টি হয়নি; প্রায় শিডিউলের সময়মতোই বন্দর ত্যাগ করতে পারছে জাহাজ। তবে চলমান রাজনৈতিক অস্থির পরিস্থিতির যদি আরও অবনতি ঘটে তাহলে বন্দরে জাহাজের শিডিউল কতটুকু রক্ষা করা যায় তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে।
এ দিকে বন্দরনির্ভর সর্ববৃহৎ রাজস্ব প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে রাজস্ব আদায়ে ধস নেমেছে। আমদানি ও রফতানির ডকুমেন্ট দাখিলের হার ৩০ ভাগের নিচে নেমে গেছে। ব্যাংক-বীমায় পড়েছে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব। তদুপরি দেশের ইপিজেডসহ শিল্পাঞ্চলসমূহে বিশেষ করে উৎপাদিত পোশাকসামগ্রী প্রতিটি কারখানাতেই আটকে আছে। রফতানি চালান বন্দরে পাঠানোর উপায় নেই। সেই সাথে কাঁচামালের অভাবে শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় বিপুল হারে রফতানি অর্ডার বাতিল হওয়া এবং স্টক লটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান, কৃষি-খামারের অবস্থা আরও শোচনীয়। শহরের তুলনায় গ্রামে-গঞ্জে হরতালের প্রভাব বেশি হওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে।

SHARE

Leave a Reply