ক্ষণকালে দীর্ঘ সময় -মুহাম্মদ আবদুল বাসেত

জন্মের পর থেকেই প্রত্যেক সৃষ্টির বয়স যেমনি বাড়ে, তেমনি তার আয়ু তথা বেঁচে থাকার বয়সও কমতে থাকে। ঘড়ির কাঁটার ধারাবাহিকতায় সময়গুলো দ্রুত পার হচ্ছে। এটুকু জীবনে কতটুকু সময় আরাম আয়েশ, ঘুম ও আড্ডায় কাটিয়েছি। এ জগৎ সংসারকে সাজাতেও নিজের জীবনকে পরিপাটি করতে কতটুকু সময় অতিবাহিত হয়েছে। এখন সময় এসেছে সময়ের সঠিক অঙ্কটি কষার। যে শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবনে অধিক খেলাধুলা, আড্ডা ও নিরর্থক অধিক সময় ব্যয় করেছে কর্মজীবনে সময়ের অঙ্কটি তার নতুন করে কষতে হয় না; স্বভাবতই আয়ত্ত হয়ে যায়। আবার কর্মজীবন শুরু হতে না হতেই অবসর ও বার্ধক্যের জীবনও চলে আসে। কর্মজীবনের শুরুটা যে যত বেশি প্রাণময় ও চাঞ্চল্যময় করে নিতে পারে; পুরো জীবনটাই তার তত কর্মময় ও সার্থক হয়ে ওঠে। যদিও বাস্তবে জীবন অনেক ক্ষুদ্র ও সঙ্কীর্ণ।
সৃষ্টিকুলের মাঝে একটি সৃষ্টিই রয়েছে যারা অন্য সৃষ্টিদের থেকে স্বতন্ত্র ও আলাদা। এ জগৎকে গোছাতে ও অন্য সৃষ্টিদেরকেও পরিচালনা করার গুরু দায়িত্ব যাদের ওপর বর্তায়; তাঁদের ক্ষমতা বা এখতিয়ার একজন শিল্পীর মতো। যিনি কাদামাটি দিয়ে যেমনি ইচ্ছে তেমনি শিল্প রচনা করতে পারেন। অন্য সৃষ্টিদের জগৎ ভাঙা-গড়া বা পরিপাটি করার কোনো ক্ষমতাই দেয়া হয়নি। মানুষ তাদেরকে বশ করে চলবে? আবার মানুষও যদি স্রষ্ঠাপ্রদত্ত নিয়মের বিপরীতে নিজেদের মনগড়া জগৎ পরিচালনা শুরু করে, সৃষ্টিকুলও মানুষের সাথে বৈরী আচরণ করতে বাধ্য হয়।
স্রষ্ঠার ঘোষণানুযায়ী তিনি মানুষকে দুর্বলভাবে সৃষ্টি করেছেন। সামান্য ঝড়ে যারা ভেঙে পড়ে। রোগে কাতরানো শুরু করে, বিপদে হেলে পড়ে। তাদের পক্ষে কিভাবে সম্ভব ক্ষণকালে দীর্ঘকালের পুঁজি সঞ্চয় করা।
আত্মপর্যালোচনায় নিয়ে আসা সময়ের চাকার সাথে নিজের জীবনের গতি কতটুকু ঘুরেছে। আজকের দিনটি গতকাল থেকে কতটুকু অগ্রসর হয়েছে। গত বছরের সাথে এ বছরের ভালো-মন্দ পার্থক্য। জীবনের দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়েছে আত্মকেন্দ্রিকতায়, শিশুকাল থেকেই হয়েছে যার প্রয়োগ শুরু। পড়ালেখা করার পেছনে উদ্দেশ্যে থাকে-ভালো চাকরি পাওয়া; গাড়ি-বাড়ি করে নিজেই সুখী হওয়া। বাবা-মায়ের উচিত মেধাবিকাশের সাথে সন্তানাদির চিন্তার জগৎকে প্রশস্ত করে দেয়া। নিজের বলতে কিছুই নেই এমন ভাবনা জাগিয়ে দেয়া। সঠিক শ্রমের পেছনে উদ্দেশ্যে থাকবে বৃহৎ মানবতার কল্যাণ সাধন। তাহলে কঠোর পরিশ্রমেও তৃপ্তি পাওয়া যাবে। জীবনটা হবে সার্থক ও সত্যিকার উপভোগ্য।
জগদ্বিখ্যাত দার্শনিক, গুণী ও সফলকামীদের জীবনী পর্যালোচনায় অনায়াসে ভেসে ওঠে শ্রম ও ত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সাধনার তৃপ্তি তাঁদেরকে এতটা বিভোর করে রেখেছিল খুবই স্বল্প সময়ের নিদ্রাতে একটুও তাঁরা পরিশ্রান্ত হননি। বর্তমানেও এমন ত্যাগী ও কর্মঠ ব্যক্তিত্বের সন্ধান ফুটে ওঠে। বিছানার আরামকে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে ও দীর্ঘকালের প্রস্তুতিস্বরূপ অনায়াসেই যাঁরা বিসর্জন দিয়েছেন।
অনেকেই দীর্ঘ পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। পরিকল্পিতভাবে ধীরে ধীরে পরিশ্রমের মাত্রা বাড়িয়ে নিজেদেরকে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন। উদ্দেশ্য ও গতিহীন জীবন যাপনে অভ্যস্ত যাঁরা। শুধু খাবার, নিদ্রা, ঘর-সংসার ইত্যাদি জীবনেই সীমাবদ্ধ তারা। ত্যাগী মহামানবদের দৃষ্টান্ত তাদের জন্য বিষফোঁড়।
শিশুকাল থেকে শুরু করে বাল্য, কৈশোর, যৌবন শিক্ষা ও বার্ধক্যকাল যেমনি একইসূত্রে গাঁথা। একককালের পরিশ্রম ও কর্মের ওপরই নির্ভর করে পরবর্তী কালের সফলতা ও ব্যর্থতা। মূলত এ ক্ষুদ্র কালগুলোর শ্রম ও প্রস্তুতির মধ্য দিয়েই সবচেয়ে দীর্ঘজীবন মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের প্রস্তুতি নিতে হয়। সেদিন স্রষ্ঠার তাঁর বান্দাকে অভিযোগ করে বলবেন, আমি তৃষ্ণার্ত, ক্ষুধার্ত ও শীতার্ত ছিলাম; কিন্তু তুমি আমার প্রয়োজনগুলো পরিপূর্ণ করনি। বান্দা বলবে কিভাবে সম্ভব, তুমিতো সকল প্রয়োজন থেকে মুক্ত।
বিকলাঙ্গ, রোগাগ্রস্ত, অভাবীরা যখন দু’হাত বের করে একমুঠো খাবারের জন্য সাহায্য চায়; শুধুমাত্র দু’পয়সা হাতে তুলে দিলেই তাদের প্রতি কর্তব্য শেষ হয়ে যায় না। প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ। অন্ন, বস্ত্র ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা। যে শহরে বাস করে সমাজের সবচেয়ে ধনাঢ্যশালী পরিবারগুলো, সে শহরের রাস্তার ধারে এমন অসংখ্য রোগাগ্রস্তকে পাওয়া যায় যাদের সমস্ত শরীরে পচন ধরার উপক্রম; কিন্তু তার চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণের নেই কেউ। যেখানে তাদের ডাকে সেবা করার মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে স্রষ্ঠারই সেবা করা হয়। স্রষ্ঠার সন্তুষ্টি ও অনন্তকালের সফলতার জন্য প্রয়োজন জাতীয় ও সংঘবদ্ধ কর্মপ্রচেষ্টা। যার ধারাবাহিকতায় তৈরি হতে পারে কিছু সমর্থক সংগঠন। যাতে পঙ্গু, রোগাগ্রস্ত ও উদ্বাস্তুদের অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা ও স্থায়ী পুনর্বাসনসহ সামাজিক পরিচয়ের ব্যবস্থা করা যায়।
আপনজন যার সাথে গতকালও আড্ডায় মেতে উঠেছিলেন, আজ সে দীর্ঘপথের যাত্রী। হয়তোবা একটু পরে আমাকেও অনেকেই হারিয়ে ফেলবে। ছোটবেলা থেকে এ যাবৎ কত স্থানে কত সংখ্যক মানুষের সাথে শুধু সাক্ষাৎ নয়, অন্তরঙ্গ সখ্যও হয়েছে। কে কোথায় কিরূপ আছে সবই জানা-শুনা ও দেখার বাইরে। অধিকাংশের সাথে জীবনে আর একবারও সাক্ষাৎ নাও হতে পারে। কত ছোট পরিমন্ডলে ক্ষুদ্র আয়ু নিয়ে আমাদের বাস।
মৃত্যু-পরবর্তী আরেকটি জীবন আছে শুনলে অনেকেই হাঁফিয়ে ওঠে। যুক্তির কষ্টিপাথরে নিজেদেরকে এমনভাবে বেঁধে রাখেন, স্রষ্ঠার ঘোষণানুযায়ী তাদের অন্তঃকরণকে মোহরাঙ্কিত করা হয়েছে। যাদের কান ভালো কথা শুনে না, চোখ সঠিক কিছু দেখে না, অন্তর সত্যকে অনুধাবন করতে পারে না। বড় বড় মজার বিষয়, তাঁরা পরকালের দীর্ঘ সময়কে স্বীকৃতি দিতে না পারলেও মৃত্যুকে এড়িয়ে যেতে পারে না। অথচ মৃত্যুই অনন্তজীবনের প্রথম ধাপ। পরকাল যদি নাই হয়ে থাকে, পার্থিব জগতের অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান কোথায় হবে? পার্থিব যে দোষীর সাজা না হলো বা দোষী ব্যক্তি সাক্ষ্য প্রমাণের অভাবে নির্দোষ প্রমাণিত হলো, তার বিচার কী হবে? ভুক্তভোগী অত্যাচারিত ব্যক্তির শেষ আশ্রয়স্থল কোথায় হবে?
তালিকা করে দেখুন পূর্বপুরুষদের কয়জন স্বেচ্ছায় পার্থিব জীবনকে আরো দীর্ঘ করার সুযোগ পেয়েছে। দুই চোখ বন্ধ হওয়ার দেরি, মাথার নিচের বালিশটাও কেড়ে নিতে দ্বিধাবোধ হয় না স্বজনদের। নিথর-নিস্তব্ধ শরীর ক্রমে ঠান্ডা বরফে পরিণত হয়। প্রিয়জনদের কান্নার গতি ধীরে হালকা হয়ে আসে, এমনকি মৃতদেহের কাছেও বেশিক্ষণ থাকতে নয় রাজি। কোথায় কিছুক্ষণ পূর্বের বালিশ-তোশক, কম্বলের প্রয়োজনীয়তা। নিমিষেই ম্লান হয়ে যায় সব। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে না হতেই নববধূকে বরপক্ষ চেষ্টা করে যতদ্রুত বাড়ি নিয়ে যেতে পারে। তেমনি মৃতদেহেরও গোসল, সাজ-সজ্জা ও জানাজার দেরি, একটু সময়ও কালক্ষেপণ করতে নয় প্রস্তুত। নববধূ বাপের বাড়ি ফিরার আশা থাকা সত্ত্বেও কান্নার রোল পড়ে যায়; অথচ দীর্ঘথের যাত্রী আর ফিরে আসে না। আপনজন হারানোর বেদনা অনেক কষ্টকর। তবুও কিছু দিন পর সে শোকটিও হারিয়ে যেতে বসে সকলে।
স্বভাবতই মনের জানালায় প্রশ্ন উঁকিঝুঁকি দেয়। কবরে রেখে আত্মীয়স্বজন বাড়ি ফিরেই এলো, কিন্তু মৃতব্যক্তি সেখানে কী করবে? তাঁর দেহ কি মাটির সাথে বিলীন হয়ে যাবে। পুনর্জন্মে বিশ্বাসী না, ক্ষণজীবনই যাঁদের সব। একটু চিন্তা করে দেখুন, পুনর্জন্মে বিশ্বাসী না হলে মানুষ আরো পাপাচারী ও হিংস্র হয়ে উঠতো। শ্রেষ্ঠ হিসেবে তাদের সাথে অন্য সৃষ্টির কোনো পার্থক্য থাকতো না। আসলে পৃথিবীটা এখন পর্যন্ত টিকে আছে বিশ্বাসীদের দ্বারাই। বিশ্বাসীর সংখ্যা যত কমবে পৃথিবী তত ধ্বংসের দিকে অগ্রসর হবে।
যেখানে পরকালে বিশ্বাস মানুষকে আরো অধিক আত্মপ্রত্যয়ী ও কর্মঠ করে তোলে। পরকালে বিশ্বাস পার্থিব জগতে যাবতীয় অত্যাচার ব্যভিচার ও সমাজগর্হিত কাজ থেকে মুক্ত থেকে সমাজ বিনির্মাণের প্রতি উৎসাহ জোগায়। জগতের ভালো মন্দ কর্মের পুণ্য ও শাস্তির নিশ্চয়তা প্রদান করে। অনন্ত জগতের বিশ্বাসীর সংখ্যা যত বাড়বে, ক্ষণজীবন-তথা পার্থিব জগৎকে সাজাতে ও সুন্দর করার মানবসংখ্যা তত বৃদ্ধি পাবে। সমাজ থেকে তাদের সংখ্যা আরো কমবে। যেহেতু দুনিয়ার ক্ষুদ্র জীবনই দীর্ঘজীবনের সফলতার কর্মক্ষেত্র।
সময়ের প্রতিটি ক্ষণকেই স্মরণীয় করে রাখার উদগ্রীব হওয়া চাই। বিশ্রাম, বিনোদন, আড্ডা ও খাবার গ্রহণেও যেটুকু সময় অতিবাহিত হবে, তা হবে জীবনের পরবর্তী স্তরের প্রস্তুতি স্বরূপ। তাহলে শিশুকাল থেকে পার্থিব জগতের প্রত্যেকটি স্তরে যেমনি সফল হওয়া যাবে। তেমনি এ ক্ষুদ্রজগতের যাবতীয় কর্ম সম্পাদনার মধ্য দিয়ে অনন্ত জীবনের প্রস্তুতিও সম্পন্ন হবে।
লেখক : কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply