ক্ষুধা ও অর্থনৈতিক সঙ্কট: ইসলামের অবস্থান -আলী আহমাদ মাবরুর

করোনা মহামারী চলাকালীন সময়ে এবং করোনা মহামারী- পরবর্তী পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় সঙ্কট আসতে যাচ্ছে তাহলো খাবার ও কর্মসংস্থানের সঙ্কট। জাতিসংঘ বলছে, করোনা-পরবর্তী সময়ে ১ শ’ কোটির বেশি মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়তে যাচ্ছে। দেশে দেশে অসংখ্য মানুষ বেকার ও কর্মহীন হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই ক্ষুধা-মন্দা এবং কর্মসংস্থানের সঙ্কটটি প্রকট হয়ে উঠছে। এমতাবস্থায় অনেকেই এই সঙ্কট মোকাবেলায় ইসলামের অবস্থান ও সুপারিশমালা সম্বন্ধে জানতে চাইছেন। এই বাস্তবতায় প্রথমেই বলা দরকার যে,
ইসলাম বরাবরই খাদ্যনিরাপত্তাকে একটি মূল্যবান নেয়ামত হিসেবে বিবেচনা করে।
ইসলাম উৎপাদনমুখী কার্যক্রমকে উৎসাহিত করে।
অযাচিত অপচয় এবং অযাচিত ভোগবাদিতাকে ইসলাম নিরুৎসাহিত করে।
আল্লাহ তায়ালার মনোনীত একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে ইসলাম যেভাবে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং সেইসাথে ক্ষুধার সঙ্কটকে নিবারণ করার জন্য ইসলাম যে সুপারিশমালা প্রণয়ন করে তা আমরা এই আলোচনায় জানার চেষ্টা করবো।

বৃক্ষরোপণ এবং কৃষিকাজকে প্রণোদনা প্রদান
হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সা.) বলেছেন, যদি কোনো মুসলিম একটি গাছ রোপণ করে, বা বীজ বপন করে আর তারপর সেই গাছ থেকে কোনো পাখি বা মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণী খাবার খায় তাহলে তা গাছ বপনকারী ব্যক্তির জন্য সাদাকাহ হিসেবে গণ্য হবে। (বুখারি)
হজরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সা.) বলেছেন, যদি কারো হাতে একটি গাছের চারা থাকে আর তখনি কিয়ামতের ক্ষণটি এসে উপস্থিত হয় তাহলে সে যেন গাছটি রোপণ করে দেয়। (আলবানি)

নেতা বা দায়িত্বশীলদেরকে জনগণের
ভোগান্তি শেয়ার করতে হবে
যারা ক্ষমতায় আছেন বা দায়িত্বপালনরত অবস্থায় আছেন তারা যদি সাধারণ মানুষের জীবন যাপনের সাথে নিজেদেরকে একাত্ম করতে পারেন তাহলে তারা জনগণের প্রয়োজন, বা কষ্ট অথবা ভোগান্তি সম্বন্ধে আরো বেশি সচেতন হতে পারবেন এবং এই সব সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারবেন।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সা.) এবং তার পরিবারের সদস্যরা রাতের পর রাত না খেয়ে থাকতেন। তারা মাঝে মাঝে যে রুটিটুকু পেতেন সেগুলোও খুব নিম্নমানের রুটি ছিল। (ইবনে মাজাহ এবং আলবানি)

জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে
একটি ইসলামী সরকারের দায়িত্ব হলো খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা। এই ধরনের কার্যকর উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে-

কৌশলী পরিকল্পনা:
সমস্যাকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করে এর সমাধানের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা ও কৌশল গ্রহণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মিশরের গভর্নর হিসেবে দেশটিকে সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষ থেকে বাঁচানোর জন্য হযরত ইউসুফ (আ) যে সকল কর্মপরিকল্পনা ও কৌশল নিয়েছিলেন আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে সূরা ইউসুফে তা উল্লেখ করেছেন। এই সূরায় নবী ইউসুফের (আ) সেই যোগ্যতাগুলোকে তুলে ধরা হয়েছে যা তাকে তৎকালীন মিশরের রাজভাণ্ডারের দায়িত্ব পালনের সুযোগ এনে দিয়েছিল। এই পর্যালোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, ক্ষুধার মতো একটি জটিল সঙ্কট মোকাবেলা করার জন্য সঠিক কর্মপরিকল্পনা এবং যোগ্যতম নেতৃত্ব-দুটোরই প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। সূরা আল ইউসুফে আল্লাহ বলেন,
“ইউসুফ তাদেরকে বললেন: তোমরা সাত বছর ভালোভাবে চাষাবাদ করবে। অতঃপর যা কাটবে, তার মধ্যে যে সামান্য পরিমাণ তোমরা খাবে তা ছাড়া অবশিষ্ট শস্য শীষসহ রেখে দেবে। এরপরে আসবে দুর্ভিক্ষের সাত বছর; তোমরা এ দিনের জন্য যা রেখেছিলে, তা খেয়ে যাবে, কিন্তু অল্প পরিমাণ রেখে দিবে, যা তোমরা ভবিষ্যতের জন্য তুলে রাখবে। এর পরেই আসবে এক বছর। এই বছর মানুষের ওপর বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং এই সময়টাতেই তারা জয়তুন ও আঙ্গুরের রস নিংড়াবে।” (সূরা ইউসুফ : ৪৭-৪৯)
এখানে মূল কথা শুধু সম্পদ নিয়ে নয়, বরং সম্পদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে। হযরত ইউসুফ (আ) আমাদেরকে দেখিয়ে গেছেন যে কিভাবে সম্ভাব্য ৭ বছরের খরাকে মোকাবেলা করার জন্য কিভাবে আগাম প্রস্তুতি নিতে হয়। আমরা ইউসুফ (আ) এর ঘটনা থেকে অনুধাবন করতে পারি যে কিভাবে সীমিত সম্পদ থাকলে তাকে পরিকল্পিতভাবে ব্যয় করতে হয় বা ব্যবহার করতে হয়। আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক দেশে পরিমাণে অনেক বেশি গরু থাকলেও তারা দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার উৎপাদনে ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায় পিছিয়ে আছে ইউসুফ (আ) এর মতো নেতৃত্ব না থাকার কারণে। তা ছাড়া এসব দেশে প্রশাসনিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনাতেও অনেক গলদ রয়েছে।
ইউসুফ (আ) উপরোক্ত আয়াতে খাবার রেশনিং এবং অতিরিক্ত খাদ্যকে সঞ্চয় করে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। এই সুপারিশমালার মধ্য দিয়ে তার অর্থনৈতিক জানাশোনা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা সম্বন্ধেও ধারণা পাওয়া যায়। এই আয়াতগুলো থেকে আমরা কিছু শিক্ষাও পাই। যেমন-
আল্লাহর অনুগত বান্দারা জনগণের কল্যাণ নিয়ে ভাবে। তাদের বিবেচনায় দীর্ঘমেয়াদি এবং স্বল্পমেয়াদি- দুই ধরনের পরিকল্পনাই থাকে।
যদি একটি ফসলকে শস্যকণা হিসেবে সংরক্ষণ করা যায় তাহলে তা বেশি সময় স্থায়ী হয়। কিন্তু যেহেতু তখন শস্যকণাকে সংরক্ষণ করার মতো উন্নত ব্যবস্থা বা প্রযুক্তি ছিল না, তাই ফসল জমিয়ে রাখাই ছিল তখনকার বাস্তবতায় প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
মানুষকে সব ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মহামারীর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আর প্রস্তুত থাকার মানে হলো সুষ্ঠু পরিকল্পনা করা এবং ভবিষ্যৎকে মাথায় রেখে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং আল্লাহর ফয়সালাকে মেনে নেয়ার সাথেই সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও উত্তম ব্যবস্থাপনার বিষয়টি জড়িত। তাই দুটোকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
একটি দুর্যোগ মানেই শুধু খারাপ কিছু নয়। অনেক সময় প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে আল্লাহ তার পছন্দের বান্দাদের উত্থানের সুযোগ করে দেন। হযরত ইউসুফের (আ) ক্ষেত্রে তাই হয়েছিল।
হযরত ইউসুফের (আ) পরামর্শে তারা এমন একটি সময়ে ফসল জমিয়ে রেখেছিল যখন তাদের খাদ্যের কোনো অভাব ছিল না। এই জমিয়ে রাখা ফসলই পরবর্তীতে তাদের জন্য নেয়ামতের কারণ হয়। তাই যখন আপনি সচ্ছলতায় থাকবেন, যখন আপনার হাতে সম্পদ থাকবে, অবহেলা করবেন না। আজকের অবহেলা ভবিষ্যতে আপনার জন্য বড় আকারের ভোগান্তির কারণও হতে পারে।
যেকোনো দেশের নেতৃত্ব ও প্রশাসনের জন্য, এমনকি ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সরকারের দায় এ ক্ষেত্রে বেশি কেননা সম্পদের উৎপাদন ও বণ্টনব্যবস্থা মূলত সরকারই নিয়ন্ত্রণ করে।
অনেক সময় অবিশ্বাসী বান্দাদেরকে দিয়েও বা তাদের স্বপ্নের মাধ্যমেও আল্লাহ তায়ালা ভবিষ্যতের কোনো ঘটনা ইঙ্গিত করতে পারেন।
স্বপ্নের ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে হযরত ইউসুফের (আ) জীবনে দুটো ঘটনা ঘটেছিল। প্রথমত মিশরের মানুষ এর মাধ্যমে খরা ও অনাহার থেকে মুক্তি পেয়েছিল আর দ্বিতীয়ত কারাগার থেকে হযরত ইউসুফের (আ) মুক্তির পথ সুগম করেছিল।
যদি আমাদের সামনে কোনো দুঃসময় আসে, আর অবিশ্বাসী বান্দারা আমাদের কাছে কোনো পরামর্শ চায় আর আমরা যদি সেই পরামর্শ দেয়ার অবস্থায় থাকি, তাহলে বিপদ থেকে উত্তরণকে অগ্রাধিকার দিয়ে সেই অবিশ্বাসী বান্দাদেরকেও সুপরামর্শ দেয়ার মানসিকতা রাখতে হবে। কারণ শরিয়ত মানুষের জীবন, অর্থ সম্পদ ও উত্তরাধিকার সংরক্ষণের মতো বিষয়গুলোকে বরাবরই গুরুত্ব দেয়।
একটি দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলার জন্য একটি সরকারকে বেশ কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করতে হয়। এগুলো হলো জনগণের আস্থা, কাজের ক্ষেত্রে একনিষ্ঠতা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সমন্বয়, দূরদর্শিতা এবং জনগণের আনুগত্য।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে আমরা দুটো মৌলিক নীতিমালা পেয়ে যাই। একটা হলো পরিকল্পনা করে চলার অভ্যাস করা আর দ্বিতীয় হলো সঞ্চয় করা। প্রথমে আর্থিক পরিকল্পনার বিষয়ে কিছু কথা বলা যায়। প্রতিটি মানুষের তার আর্থিক দায়বদ্ধতার বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। বিশেষ করে তার স্ত্রী, পরিবার বা পরিবারে থাকা অভিভাবকদের বিষয়ে তার যে দায়িত্ব তা নিয়ে সচেতন থাকা জরুরি। সেই সাথে নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনগুলো পূরণের জন্যও তার চিন্তা থাকা প্রয়োজন। সেই সাথে আমাদের ভবিষ্যতের সময়টাকে নিয়েও কিছু পরিকল্পনা রাখা যায়।
আমাদেরকে নিজেদের বর্তমান জীবনযাত্রাকে নিয়েও পর্যালোচনা করতে হবে। আমরা এখন কিভাবে চলছি? কতটা বিলাসিতা করছি? অপব্যয় হচ্ছে কি? প্রয়োজন পূরণে কিভাবে অর্থের জোগান ও সংস্থান করতে হয়, তা নিয়ে আমাদের কতটা ধারণা আছে? আমাদের অনেকেই ইচ্ছেমতো লোন নিয়ে সম্পদ তৈরি করে। পরে সেই লোন আর শোধ করতে না পেরে পথে বসে যায়। একটা সময়ে গিয়ে অনেকে মাথার ওপরের ছাদটাও হারিয়ে ফেলে।
ধার করা/ঋণ নেয়ার বিষয়ে আমাদেরকে বেশি সতর্ক হতে হবে। আমরা যেন দেনার ভারে জর্জরিত না হয়ে যাই। আর দেনা শোধ করতে গিয়ে আমরা যেন পরিবারের স্বার্থকে জলাঞ্জলি না দেই। নিজেদের মাসিক খরচ ও বাজেটকে নিয়ে চিন্তা করা দরকার। অনলাইনে হুটহাট পণ্য কিনে নিজেদের অর্থকে যেন আমরা অপচয় না করি। ততটুকুই কিনি যা না হলেই নয়।
দ্বিতীয়ত সঞ্চয়ের বিষয়ে আরেকটু সচেতন হতে হবে। যৎসামান্য হলেও প্রতি মাসে কিছু টাকা জমানোর অভ্যাস করা যায়। অনেকেই বলেন, সংসারের সব খরচ নির্বাহ করার পর হাতে টাকা থাকে না। সে ক্ষেত্রে মাসের শুরুতেই জমানোর জন্য সামান্য কিছু টাকা আলাদা করে রাখতে পারেন। সবার মধ্যে সহজাতভাবে জমানোর অভ্যাস থাকে না। তাই যতটুকু যা সুযোগ পাওয়া যায় তা থেকেই কিছু অর্থ জমিয়ে রাখা যায়। তবে, মনে রাখতে হবে, ইসলাম যেমন অপব্যয় বা অতিব্যয় অনুমোদন করে না, ঠিক তেমনি কিপটেমিটাও অনুমোদিত নয়।

মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করা
এমন কিছু কৌশল অবলম্বন করা যা মানুষকে কাজ করতে উৎসাহিত করে এবং নাগরিকদের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করে। দায়িত্বশীলরা কতটুকু সুবিধা নিতে পারবেন, তা নিয়ে নবীজির (সা.) নির্দেশনা রয়েছে। আল-মুসতাওরিদ ইবনু শাদ্দাদ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: যে আমাদের কর্মকর্তা নিযুক্ত হয়েছে সে যদি বিবাহিত না হয়, তাহলে তোমরা তার বিয়ের ব্যবস্থা করবে। সেবক না থাকলে সে যেন একটি সেবক সংগ্রহ করে এবং বাসস্থান না থাকলে সে যেন একটি বাসস্থান সংগ্রহ করে। যে ব্যক্তি এর অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করবে সে প্রতারক বা চোর গণ্য হবে। (আবু দাউদ-২৯৪৫)

দুর্নীতি দমন করা
দুর্নীতির কারণে একটি জাতির সম্পদ অপচয় হয়, রাষ্ট্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং দরিদ্রতা বৃদ্ধি পায়। প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন দুর্নীতির পথ রুদ্ধ করে। দুর্নীতি দমন করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। এ সম্পর্কে রাসূলের (সা.) হাদিসও রয়েছে।
আবু হুমাইদ আস-সাঈদী (রা) থেকে বর্ণিত। নবীজি (সা.) আয্দ গোত্রের একজন সদস্যকে জাকাত আদায়কারী নিয়োগ করেন। তার নাম ইবনুল লুতবিয়্যাহ। তবে ইবনুস সারহ বলেছেন তার নাম ইবনুল উতবিয়্যাহ। দায়িত্ব পেয়ে সে তার কর্মস্থলে চলে গেলো। কয়েকদিন পর সে কর্মস্থল হতে মদিনায় ফিরে এসে রাসূলুল্লাহকে (সা.) বললো, এগুলো আপনাদের, আর এগুলো আমাকে ব্যক্তিগতভাবে উপহার দেয়া হয়েছে। নবীজি (সা.) প্রথমে কিছু বললেন না। একটু পর তিনি মিম্বারে গিয়ে দাঁড়ালেন তারপর তাসবিহ ও তাহমিদ পড়লেন। এরপর তিনি বললেন, “আমাদের কর্মকর্তা কর্মচারীদের কী হয়েছে? আমরা তাদেরকে দায়িত্ব দিয়ে কোথাও প্রেরণ করি অথচ যখন তারা ফিরে আসে তখন বলে, এটা আপনাদের আর এটা আমাকে উপহার দেয়া হয়েছে। তার আবার উপহার কী? যদি সে দায়িত্ব পালনের সুযোগ না পায় তাহলে সে তার পিতা-মাতার ঘরে বসে দেখুক তাকে কেউ উপহার দেয় কি না? তোমাদের মধ্যে যে-ই এভাবে কোন কিছু গ্রহণ করবে তাকে সেই উপহার নিয়েই রোজ হাশরের দিন দাঁড়াতে হবে। যদি সেই উপহার উট, গাভী কিংবা বকরি হয়, সেদিন তারা চিৎকার করে তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। অতঃপর তিনি তাঁর দু’ হাত এতোটা উঁচু করেন যে, আমরা তার বগলের শুভ্রতা দেখলাম। তিনি বললেন: হে আল্লাহ! আমি কি আপনার বার্তা পৌঁছে দিয়েছি, হে আল্লাহ! আমি কি পৌঁছে দিয়েছি?” (আবু দাউদ-২৯৪৬)
দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাসূলের (সা.) বলিষ্ঠ অবস্থান জানা যায় নি¤েœাক্ত হাদিস থেকে। ‘আদি ইবনু ‘উমাইরাহ্ আল-কিন্দি (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি: আমরা তোমাদের মধ্যে যাকে আদায়কারী নিযুক্ত করি, আর সে একটি সুঁচ পরিমাণ বা তার চাইতেও কম মাল আমাদের কাছে গোপন করে, তাই আত্মসাৎ বলে গণ্য হবে এবং তা নিয়েই কিয়ামতের দিন সে উপস্থিত হবে।
রাবি বলেন, তখন একজন কৃষ্ণকায় আনসারি (সাহাবী) তাঁর দিকে অগ্রসর হলেন, আমি যেন তাঁকে দেখতে পাচ্ছি। তিনি আরজ করলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমাকে দেয়া দায়িত্বভার আপনি ফিরিয়ে নিন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমার কী হয়েছে? তিনি আরজ করলেন, আমি আপনাকে এরূপ এরূপ (কঠিন ভাষা) বলতে শুনেছি। তখন তিনি বললেন, আমি এখনও বলছি, তোমাদের মধ্যকার যাকেই আমি কর্মচারী নিযুক্ত করি আর সে অল্প বিস্তর যা-ই আদায় করে, তা যদি এনে উপস্থিত করে, তারপর তাকে যা দেয়া হয় তা-ই গ্রহণ করে এবং যা থেকে নিষেধ করা হয় তা থেকে বিরত থাকে, তাহলে তার জন্য ভয়ের কোনো কারণ নেই। (সহিহ মুসলিম ; ই.ফা.-৪৫৯১)
সর্বোপরি বেশ কিছু কৌশল আছে যার মাধ্যমে আমরা আমাদের রিজিক সংক্রান্ত ঝুঁকি কমিয়ে নিয়ে আসতে পারি। যেমন-
ঝুঁকি থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর ওপর আমাদের ঈমানকে আগে শক্তিশালী ও সুদৃঢ় করতে হবে। আল্লাহকে একমাত্র রিজিকদাতা হিসেবে মানতে হবে। যখন আমরা ঠিকমতো চাকরি করি, মাস শেষে বেতন পাই, তখন আমরা এই সত্যটা ভুলে যাই। আবার যখন বিপদে পড়ি তখন আবার আল্লাহর কাছে ফিরে আসি। এই ধরনের আচরণ কাম্য নয়। করোনার এই সঙ্কট আমাদেরকে যেন সঠিক বুঝ অর্জনে সাহায্য করে। আমিন।
দ্বিতীয় যে কৌশলটি অবলম্বন করে আমরা ঝুঁকি থেকে বাঁচতে পারি তাহলো ইসতিগফার ও তওবাহ। বারবার অনুতপ্ত হয়ে আমাদেরকে তওবাহ করতে হবে। এই ভাবনা নিয়ে তওবাহ করতে হবে, আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাদের ঝুঁকি দূর করে দেবেন। সেই সাথে আমাদের সম্মানও বৃদ্ধি করবেন।
তৃতীয় কৌশল হলো নামাজ। আল কুরআনে নবীজিকে (সা.) উদ্দেশ করে আল্লাহ বলেন, আপনি আপনার পরিবারের লোকদেরকে নামাজের আদেশ দিন এবং নিজেও এর ওপর অবিচল থাকুন। আমি আপনার কাছে কোন রিজিক চাই না। আমি আপনাকে রিজিক দেই এবং আল্লাহ ভীরুতার পরিণাম শুভ। (সুরা তোয়াহা : ১৩২)
চতুর্থ কৌশল হলো পরিবারের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করা। আত্মীয়তার বন্ধনকে মজবুত করা। আবু হুরায়রা (রা) বলেন, ‘আমি নবী করিম (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি তার রিজিক প্রশস্ত ও আয়ু বৃদ্ধি করতে চায়, সে যেন পরিবার ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে।’ (বুখারি-৫৫৫৯)
সর্বোপরি আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে হবে। নফল ইবাদত নফল নামাজ ও নফল রোজা পালন করে আল্লাহর কাছে সাহায্য কামনা করতে হবে।

আমরা শুধু আর্থিক দিকটিকে ঝুঁকি মনে করছি এবং এই বিষয়টিকে নিয়ে বেশি পেরেশানিতে আছি বলেই আরো অসংখ্য নেয়ামতকে আমরা বিবেচনায় নিতে পারি না। কিন্তু আমরা বর্তমান আর্থিক ঝুঁকির চেয়ে আরো বড়ো কোনো ঝুঁকিতে থাকতে পারতাম। আল্লাহ আমাদেরকে সে ক্ষেত্রে হেফাজত করেছেন। এই অনুভূতি আমাদের ভেতর লালন করা প্রয়োজন। যত বেশি আমরা কৃতজ্ঞ হবো, আল্লাহর কাছে শুধু নাই নাই করে নয়, বরং যা আছে তার জন্য শুকর করে চোখের পানি ফেলতে পারবো, আল্লাহ আমাদেরকে তত বেশি প্রতিদানে আর প্রাপ্যে ভরিয়ে দেবেন ইনশাআল্লাহ।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও অনুবাদক

SHARE

Leave a Reply