খাশোগি হত্যা এবং তুরস্কের রাজনীতি । ফাহিম ফয়সাল

খাশোগি হত্যা এবং তুরস্কের রাজনীতিসরকার কর্তৃক বিচারবহির্ভূত হত্যা করে তা আবার স্বীকার করা সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত বটে! সৌদি রাজতান্ত্রিক সরকার জামাল খাশোগির হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে সেই কাজটিই করেছে। জামাল খাশোগি সৌদি নাগরিক এবং পেশায় সাংবাদিক। একদা তিনিও সৌদি রাজপরিবারের সাথে কাজ করেছেন। কিন্তু বর্তমান বাদশা সালমান বিন আবদুল আজিজ এবং যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ক্ষমতায় এলে তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনায় মুখর হন সাংবাদিক জামাল খাশোগি। সৌদি সরকার সমালোচকদের ওপর দমন পীড়ন শুরু করে। জেলে পাঠানো, ফাঁসি দেয়া এমনকি বিচারবহির্ভূত হত্যার বিস্তর অভিযোগ আসা শুরু হয়। জামাল খাশোগি সরকারের রোষানল থেকে বাঁচতে আমেরিকা চলে যান। সেখানে তিনি ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় কলাম লেখক হিসেবে কাজ করছিলেন।
সেপ্টেম্বর মাসে তুর্কি নাগরিক হ্যাতিস সেনজিসকে বিয়ের উদ্দেশ্যে তুরস্কে যান জামাল খাশোগি। আগের স্ত্রীকে তিনি তালাক দিয়েছিলেন। নতুন বিয়ে করতে আগের স্ত্রীর সাথে বিয়ে ছাড়াছাড়ির তালাকনামা দরকার ছিল। দেশে গিয়ে এসব কাগজপাতি সংগ্রহ করতে গেলে গ্রেফতার হতে হবে বিধায় তিনি তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে অবস্থিত সৌদি কনস্যুলেটে যান। উল্লেখ্য, রাজধানীতে অন্যদেশের অফিস থাকাকে এম্বাসি বা দূতাবাস বলে। আর অন্য শহরে ভিন দেশের অফিসকে কনস্যুলেট বলে।
খাশোগি হত্যা এবং তুরস্কের রাজনীতি ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে ২৮ সেপ্টেম্বর প্রথম যান সাংবাদিক জামাল খাশোগি। সেদিন তাকে জানানো হয় কাগজপাতি সংগ্রহ করতে ২ অক্টোবর আবার আসতে হবে। সৌদি সরকারের কঠোর সমালোচক হওয়ায় তার সাথে কেমন ব্যবহার করা হতে পারে এই নিয়ে তিনি শঙ্কিত ছিলেন। কিন্তু ২৮ সেপ্টেম্বর তিনি কনস্যুলেট অফিস থেকে ভালো ব্যবহার পান। ২ অক্টোবর কাগজপাতি নিতে সরল বিশ্বাসে তিনি বাগদত্তা হ্যাতিস সেনজিসকে সাথে নিয়ে সেখানে যান। সেনজিস কনস্যুলেটের বাইরে গাড়িতে অপেক্ষায় থাকেন। খাশোগি তার মোবাইলটা সেনজিসের কাছে রেখে যান। আর বলে যান, একান্তই তিনি যদি না ফেরেন তাহলে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোগানের এক উপদেষ্টাকে যেন বিষয়টি তিনি জানান। সেই উপদেষ্টার নম্বর দিয়ে যান সেনজিসকে।
বেলা সোয়া ১টায় তিনি কনস্যুলেটে প্রবেশ করেন। এসময় তার হাতে এ্যাপলের স্মার্ট ঘড়ি ছিল। তিনি ভেতরে ঢোকার পরপরই সৌদি গোয়েন্দাদের একটি দল তাকে জাপটে ধরে। খাশোগি তাদের সাথে বাগবিতণ্ডায় লিপ্ত হন। গোয়েন্দারা অল্প সময়ের মধ্যে খাশোগিকে হত্যা করে। এমনকি জ্যান্ত অবস্থায় তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এসময়ের সকল কথা রেকর্ড হয় খাশোগির হাতে থাকা এ্যাপলের স্মার্ট ঘড়িতে এবং সাথে সাথে সেই অডিও রেকর্ড চলে যায় তার গাড়িতে সেনজিসের হাতে থাকা মোবাইলে। এরপর খাশোগির টুকরো লাশ এসিডে গলানো হয়। এরপর সুটকেসে ভরে সেটা কনস্যুলেটের বাইরে কোথাও সরিয়ে ফেলে সৌদি গোয়েন্দারা।
খাশোগি দীর্ঘক্ষণ না ফেরায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন তার বাগদত্তা হ্যাতিস সেনজিস। তিনি কনস্যুলেটের গেটে এসে খাশোগি সম্পর্কে জানতে চান। গেট থেকে জানানো হয় খাশোগি কনস্যুলেটের পেছনের গেট দিয়ে বের হয়ে গেছেন। হ্যাতিস সেনজিস বিষয়টা প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সেই উপদেষ্টার মাধ্যমে তুর্কি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন।
আমেরিকায় স্বেচ্ছা নির্বাসিত জামাল খাশোগি তুরস্কে এসে সৌদি কনস্যুলেট থেকে নিখোঁজ হবেন সেটা তুরস্ক সরকার গুরুত্বের সাথে নেয়। এছাড়া তুরস্কের সাথে সৌদি আরবের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিলো না। বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে ঠুকোঠুকি লেগেই ছিল। খাশোগির বাগদত্তা হ্যাতিস সেনজিস তুর্কি নাগরিক হওয়ায় দেশটির সরকার খাশোগির সন্ধানে উঠে পড়ে লাগে। কিন্তু সমস্যা হয় সৌদি কনস্যুলেটে অনুমতি ছাড়া তুর্কি কর্তৃপক্ষের প্রবেশ নিষেধ। কূটনৈতিক আইন অনুযায়ী সৌদি সরকারের অনুমতি ছাড়া তুর্কি সরকার কনস্যুলেটে অনুসন্ধান করতে পারে না। তুরস্ক সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি চাইলেও ১০ দিন পর সেই অনুমতি মেলে।
খাশোগি হত্যা এবং তুরস্কের রাজনীতি যাইহোক তুরস্ক সরকার বসে থাকেনি। তারা খাশোগির মোবাইল ঘাঁটতে শুরু করে। এ ছাড়া কনস্যুলেটের আশপাশে যত সিসিক্যামেরা আছে সেগুলোর ফুটেজ অনুসন্ধান শুরু করে। এছাড়া ইস্তাম্বুল শহরের বিমান, রেল ও বাসস্ট্যান্ডের সিসিফুটেজ ও যাত্রীদের তথ্যানুসন্ধান শুরু করে। তুরস্কের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে যে ১৫ জন সৌদি নাগরিক দুটি ব্যক্তিগত বিমানে করে খাশোগি নিখোঁজের দিন অর্থাৎ ২ অক্টোবর সকালে ইস্তাম্বুলে আসে এবং ওই দিনই আবার ফিরে যায়। তাদের অনেকে ওই দিন কনস্যুলেটে প্রবেশ করে।
সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য বেরিয়ে আসে খাশোগির মোবাইলে থাকা ওই অডিও রেকর্ডে। তুরস্কের গোয়েন্দারা ওই অডিও রেকর্ড পেয়ে হতবাক হয়ে যান। অডিওতে আরবিতে কথোপকথন ছিল। ধস্তাধস্তি, খাশোগির চিৎকার চেঁচামেচি এবং করাতের শব্দ তারা শুনতে পান।
খাশোগি হত্যা এবং তুরস্কের রাজনীতি খাশোগি হত্যা এবং তুরস্কের রাজনীতি তবে তুরস্ক সরকার এসব তথ্য অফিসিয়ালি প্রকাশ করেনি। এই তথ্যগুলো তারা গণমাধ্যমে প্রকাশ করে। আমেরিকার দৈনিক পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্ট নিউজ করে যে, খাশোগিকে কনস্যুলেটে হত্যা করে লাশ টুকরো টুকরো করা হয়েছে। তারা তুরস্কের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বরাত দেয়। এতে সারাবিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সবার নজর গিয়ে পড়ে সৌদি, তুরস্ক এবং আমেরিকার রাষ্ট্রপ্রধানদের ওপরে। তবে এ ঘটনার জন্য তুরস্ক এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম তীব্রভাবে দায়ী করতে তাকে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে। কারণ সৌদি যুবরাজই দেশটির ডি-ফ্যাক্টো লিডার বা আসল নেতা। তার কথা অনুযায়ী দেশ চলে। দাপটের সাথে দেশ চালাতে গিয়ে আগে থেকেই ব্যাপক সমালোচনার মুখে ছিলেন ৩৩ বছর বয়সী সৌদি যুবরাজ।
সৌদি সরকার শুরু থেকে কয়েকবার করে তাদের বক্তব্য পরিবর্তন করে। শুরুতে তারা নিখোঁজ বা হত্যার কথা অস্বীকার করে। খাশোগি ওই দিন কাজ শেষে কনস্যুলেট থেকে বেরিয়ে গেছেন বলে বিবৃতি দিয়েছিল। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান সৌদির এ বক্তব্যের প্রেক্ষিতে প্রশ্ন করেন যে, খাশোগির কনস্যুলেট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ফুটেজ কোথায়? তবে সৌদি সরকার খাশোগির বেরিয়ে যাওয়ার ফুটেজ দিতে পারেনি।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান যে, তিনি সৌদি বাদশা ও যুবরাজের সাথে টেলিফোনে কথা বলেছেন। তারা নাকি খাশোগি হত্যার কিছুই জানেন না। পরবর্তীতে ট্রাম্প বলেন, গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী মনে হচ্ছে কনস্যুলেটেই খাশোগিকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে আমেরিকার ধর্মযাজক এন্ড্রু ব্রানসনকে মুক্তি দেয় তুরস্কের আদালত। ব্রানসন মুক্তি পেয়ে আমেরিকায় গমন করেন। উল্লেখ্য, এন্ড্রু ব্রানসনকে আটক করার কারণে দুই বন্ধু দেশ আমেরিকা ও তুরস্কের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়ে রেষারেষি শুরু হয়েছিল।
এদিকে খাশোগি ইস্যুতে প্রবল চাপ তৈরি করে তুরস্ক, আমেরিকাসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। আর তুরস্ক সরকার খাশোগি সম্পর্কিত গোয়েন্দা তথ্য গণমাধ্যমে আনঅফিসিয়ালি দিতে থাকে। এর মধ্যে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও সৌদি আরব সফরে যান। সেখানে সৌদি বাদশা ও যুবরাজের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এরপর সৌদি থেকে তিনি ঝটিকা সফরে যান তুরস্কে। সেখানে প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সাথে সাক্ষাৎ করেন।
অবশেষে ঘটনার ১৮ দিন পর ২০ অক্টোবর মধ্যরাতে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক বিবৃতি পড়ে খাশোগি হত্যার স্বীকারোক্তি করে দেশটির সরকার। বিবৃতিতে বলা হয়, ২ অক্টোবর সাংবাদিক জামাল খাশোগি সৌদি কনস্যুলেটের ভেতর গোয়েন্দাদের সাথে ‘ধস্তাধস্তি’তে নিহত হয়েছেন। তবে তার লাশ কোথায় সে তথ্য বিবৃতিতে ছিল না। বিবৃতিতে আরো জানানো হয়, ওই ঘটনার জন্য সৌদি সরকার ১৮ জনকে গ্রেফতার করেছে এবং দেশটির উপগোয়েন্দা প্রধানকে বহিষ্কার করেছে। ১৮ জনের পরিচয় বিবৃতিতে উল্লেখ না থাকলেও এরদোগানের বক্তব্যে জানা যায়, ২ অক্টোবর তুরস্কের ইস্তাম্বুলে প্রবেশ করা ঘাতক দলের ১৫ জন গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে রয়েছে। উল্লেখ্য, ওই ১৫ জনের নাম পরিচয় ও ছবি তুরস্কের সংবাদমাধ্যমে আগেই প্রকাশিত হয়েছিল।
‘ধস্তাধস্তিতে নিহত’ সৌদ আরবের এমন বক্তব্যে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। তুমুল সমালোচনা শুরু হয় গণমাধ্যমে। এ ছাড়া বিশ্বনেতারাও সৌদি সরকারের নিন্দায় লিপ্ত হন। এমনকি সৌদি আরবের বন্ধুরাষ্ট্র আমেরিকা, জার্মানি, ফ্রান্স সমালোচনায় মুখর হয়। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খাশোগি নিহতের ঘটনাকে অগ্রহণযোগ্য আখ্যা দেন, তবে স্বীকারোক্তিকে ভালো পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেন। এ ছাড়া বিবৃতিতে যেসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা থেকে গেছে সেগুলো প্রকাশের দাবি আসতে থাকে গণমাধ্যমে এবং রাষ্ট্রনেতাদের বক্তব্য-বিবৃতিতে। যেমন, নিহত খাশোগির লাশ কোথায়? এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা কে? ইত্যাদি। ২৫-২৬ অক্টোবর সৌদি আরবে দুই দিনব্যাপী ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ বিষয়ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় দেশটির যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে। এই সম্মেলন বর্জন করে সৌদির বন্ধুরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যম এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ীরা খাশোগি নিহতের ঘটনায় সৌদির তীব্র সমালোচনার পাশাপাশি সম্মেলন বর্জন করে।
প্রেসিডেন্ট এরদোগান বারবার বলে এসেছেন, তুরস্কের কাছে সব তথ্য রয়েছে। সময় মতো সেগুলো প্রকাশ করা হবে। তুরস্ক চেয়েছে সৌদি আরব এই হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে নিজেরাই স্বীকারোক্তি দিক। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মাধ্যমে প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছেন এরদোগান। একবারে সব তথ্য প্রকাশ না করে একটা একটা করে তথ্য প্রকাশ করে সুবিধা আদায় করেছেন তিনি। কেননা সৌদি আরব ও আমেরিকা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সৌদি আরব বিপদে পড়ায় তার রেশ পড়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ওপরেও। আমেরিকা সব সময় চায় মধ্যপ্রাচ্যের নেতৃত্ব দিক সৌদি আরব ও ইসরাইল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে তুরস্ক এবং ইরান। খাশোগি হত্যার ইস্যুতে আন্তর্জাতিক বিশ্বে আর কী কী ঘটে সেটাই এখন দেখার বিষয়।
লেখক : বিশিষ্ট কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply