খুলুসিয়াত ইবাদত কবুলের শর্ত -মুহিউদ্দীন মাসুম

খুলুসিয়াত কী?
খুলুসিয়াত আরবি শব্দ। শব্দটিই খালাস শব্দ থেকে উৎসারিত। এর বাংলা অর্থ হলো আন্তরিকতা, একনিষ্ঠতা ও বিশুদ্ধতা। সূরা বায়্যিনাতের ৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলছেন, নিজেদের দ্বীনকে একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত করে একনিষ্ঠভাবে তার ইবাদত করার জন্যই তাদের আদেশ দেয়া হয়েছে।
হাদিসে খুলুসিয়াতের সমার্থক আরেকটি পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। তাহলো বিশুদ্ধ নিয়ত। বুখারি শরিফের প্রথম হাদিসে হযরত ওমর রা: বলেন, আমি রাসূল সা:-কে বলতে শুনেছি, ‘প্রত্যেক কাজ নিয়তের সাথে সম্পর্কিত। মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী ফল পাবে।’
খুলুসিয়াতের বিপরীত শব্দ হলো রিয়া বা প্রদর্শনেচ্ছা। সূরা মাউনের ৬ নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে, ধ্বংস হবে ওই সকল নামাজি, যাদের নামাজে রিয়া আছে। রিয়া অর্থ কোনো ভালো কাজ মানুষকে দেখানোর জন্য, দুনিয়ার স্বার্থের জন্য বা যশ-খ্যাতির জন্য করা।
খুলুসিয়াতহীন আমলকারীকে কুরআনে মুনাফিক বলা হয়েছে। সূরা নিসার ১৪২ নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে, ‘মুনাফিকরা মানুষকে দেখানোর জন্য নামাজ পড়ে।’

খুলুসিয়াত ইবাদত কবুলের শর্ত
একজন ঈমানদারের ইবাদত আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার জন্য দু’টি শর্ত রয়েছে। ১. খুলুসিয়াতের সাথে আমল করা। ২. রাসূল সা: দেখানো পদ্ধতিতে আমলটি করা। খুলুসিয়াত অর্থ হলো ইবাদত হতে হবে একমাত্র আল্লাহর জন্য, শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য, কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য কোনো ইবাদত করা হলে তা আল্লাহ কবুল করবেন না। নামাজ, জাকাত, হজ, রোজা, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, নফল ইবাদত, দান-সদকা ইত্যাদি শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য হতে হবে। ইকামাতে দীনের কাজ, মানুষের উপকার, সামাজিক কাজসহ সকল ভালো কাজ শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করতে হবে।
মানুষ আমাকে নামাজি মনে করবে, মানুষ আমাকে হাজি সাহেব বলবে, মানুষ আমাকে পরহেজগার মনে করবে, মানুষ আমাকে ভালো মানুষ মনে করবে ইত্যাদি ভেবে কাজ করলে তা কবুল হবে না। দুনিয়ার যশ-খ্যাতির জন্য, ক্ষমতার জন্য, সম্মানের জন্য ইবাদত ও মুয়ামিলাত সংক্রান্ত কোনো আমল করলে আল্লাহ তা কবুল করবেন না।

একজন মুমিনের চেতনা
আল্লাহ ও আখিরাতের ওপর ঈমান আনার দাবি হচ্ছে, মানুষ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করবে। একমাত্র আল্লাহর নিকট থেকে পুরস্কার লাভের আশা করবে। দুনিয়ার পরিবর্তে আখিরাতের ফলাফলের প্রতি দৃষ্টি রাখবে। মানুষের মূল্যায়ন, মানুষের সম্মান, মানুষের পুরস্কার ইত্যাদি তার উদ্দেশ্য হবে না। আল্লাহ তায়ালা সূরা আনআমের ১৬২ নম্বর আয়াতে বলেছেন, “বল, আমার নামাজ, আমার সকল ইবাদত, আমার জীবন, আমার মৃত্যু সবকিছু আল্লাহর জন্য যিনি বিশ্বজাহানের রব।” এটাই একজন মুমিনের চেতনা।

সাহাবীদের জীবনে ইখলাস
সাহাবীরা ছিলেন ইখলাসের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তারা সকল কাজ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই করতেন। তাদের গুণাবলি বর্ণনা করছেন আল্লাহ তায়ালা এভাবে, “তারা কাফেরদের বিপক্ষে আপসহীন, নিজেদের ব্যাপারে রহমদিল। তুমি তাদের দেখতে পাবে রুকু ও সিজদারত এবং আল্লাহর করুণা ও সন্তুষ্টি কামনায় সদা তৎপর।” (সূরা ফাত্হ : ২৯)
হজরত আবু বকর সিদ্দিক রা:-এর খিলাফতকালে তিনি সিরিয়া, ইরাক, পারস্যসহ বিভিন্ন স্থানে সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক করেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা:-কে। আবু বকর রা:-এর ইন্তেকালের পর হজরত ওমর রা: খেলাফতে অধিষ্ঠিত হন। তিনি গভীরভাবে লক্ষ্য করলেন, সৈনিকেরা খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা:-এর ওপর অনেক বেশি ভরসা করছে। তিনি চিন্তা করলেন, এভাবে চলতে থাকলে সৈনিকেরা আল্লাহর ওপর ভরসা ছেড়ে দেবে। আর খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা:-এর অনুপস্থিতিতে তারা জিহাদে অংশগ্রহণের মনোবল হারিয়ে ফেলবে। তাই তিনি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা:-কে সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়কের পদ থেকে সরিয়ে আবু উবাদা ইবনুল জাররা রা:-কে সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক মনোনীত করলেন।
এই সংবাদ শুনে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা: বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। তিনি ওমর রা.-এর সিদ্ধান্ত মেনে নিলেন। তিনি নতুন সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক আবু উবাদা ইবনুল জাররা রা.-কে বললেন, ‘আমি আপনার অধীনে একজন সৈনিক হিসেবে জিহাদে অংশগ্রহণ করবো। আপনি আমাকে নির্দেশ দিতে কোনো সংকোচ বোধ করবেন না। কারণ আল্লাহর কসম, আমি ওমরের জন্য জিহাদ করি না বরং ওমরের রব তথা আল্লাহর জন্য জিহাদ করি।”

ইখলাসপূর্ণ আমলের শক্তি অনেক বেশি
যে আমল খুলুসিয়াতের সাথে করা হয় তার শক্তি অনেক বেশি। এই আমলগুলো ব্যক্তিকে আখিরাতে জাহান্নাম থেকে বাঁচিয়ে দেবে ও জান্নাতে নিয়ে যাবে। শুধু আখিরাতে নয়; দুনিয়ায়ও ইখলাসপূর্ণ আমলের শক্তি অনেক বেশি। ইখলাসপূর্ণ আমলের কারণে আল্লাহ ব্যক্তিকে দুনিয়ার বালা-মুসিবত থেকে মুক্তি দেন।
একবার বনি ইসরাইলের তিন ব্যক্তি মুসাফির অবস্থায় একটি জঙ্গল দিয়ে পথ চলছিল। হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে তারা জঙ্গলের পাশে একটি গুহায় আশ্রয় নেয়। বৃষ্টির ফলে পাহাড়ের ওপর থেকে একটি বড় পাথরের খ- পড়ে গুহার মুখ আটকে যায়। তারা আর গুহা থেকে বের হতে পারছিলো না। এভাবে কয়েক দিন কেটে গেল। তাদের সাথে থাকা খাবার শেষ হয়ে গেলো। তারা তাদের জীবন সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়লো। তারা ভাবতে লাগলো, তাদেরকে এই গুহায় না খেয়ে মারা যেতে হবে। তখন তাদের একজনের মাথায় একটি বুদ্ধি এলো। সে বললো, এস আমরা স্মরণ করে দেখি, জীবনে আমরা কোনো ভালো আমল করেছি কিনা। এমন কোনো আমল আমরা করেছি কিনা, যা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য করা হয়েছিল। অন্য কোনো উদ্দেশ্য সেখানে ছিল না। সেই আমলের উসিলা দিয়ে আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করবো; তিনি যেন আমাদের বিপদ থেকে উদ্ধার করেন। স্মরণ করতে করতে তিনজনই তিনটি ইখলাসপূর্ণ আমল খুঁজে পেলো। প্রথম জন তার ইখলাসপূর্ণ আমলের উসিলা দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করলো। গুহার মুখের পাথর একটু সরে গেলো। দ্বিতীয় জন তার ইখলাসপূর্ণ আমলের উসিলা দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করলো। গুহার মুখের পাথর আরো একটু সরে গেলো। তৃতীয় জন তার ইখলাসপূর্ণ আমলের উসিলা দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করলো। গুহার মুখের পাথর পুরোটা সরে গেলো। তারা গুহা থেকে বের হয়ে এলো।

দুনিয়ার স্বার্থে ভালো আমল করলে আখেরাত বরবাদ
একটি হাদিসে রাসূল সা: তিন ব্যক্তির প্রসঙ্গে বলেছেন। তিনজন ব্যক্তি দুনিয়ায় ভালো আমল করেছিল। কিন্তু খুলুসিয়াত বা নিয়তের বিশুদ্ধতা না থাকার কারণে তাদেরকে জাহান্নামে যেতে হবে।
প্রথম ব্যক্তি ছিল কারি বা কুরআনের জ্ঞানে জ্ঞানী আলেম। আল্লাহ আখেরাতে তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, তুমি আজ আমার কাছে কী আশা করো? সে বলবে হে আল্লাহ, আমি দুনিয়ায় কুরআন তিলাওয়াত করেছি। মানুষের কাছে কুরআনের দাওয়াত দিয়েছি। অনেক মানুষ আমার উসিলায় ইসলাম গ্রহণ করেছে। অনেক মানুষ আমার উসিলায় ইসলাম সম্পর্কে জেনেছে ও আমল করেছে। আমি আপনার কাছে আজ জান্নাত আশা করি। আল্লাহ বলবেন, না, তুমি দুনিয়ায় কুরআনের যা যা খেদমত করেছো তা আমার জন্য করোনি। বরং এ জন্য করেছ যে, মানুষ তোমাকে আল্লামা বলবে, সম্মান করবে। তুমি দুনিয়াতে যা চেয়েছিলে আমি দুনিয়ায় তোমাকে তা দিয়েছি। আখিরাতে তোমার জন্য কিছুই নেই। তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করো।
দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিল একজন বড় দানশীল। আল্লাহ আখেরাতে তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, তুমি আজ আমার কাছে কী আশা করো? সে বলবে, হে আল্লাহ, আমি দুনিয়ায় অনেক দান-সদকা করেছি। মসজিদ-মাদরাসায় দান করেছি, যাকাত-ফিতরা দিয়েছি, গরিব-মিসকিন, ইয়াতিম-অসহায়দের সাহায্য করেছি। আমি আপনার কাছে আজ জান্নাত আশা করি। আল্লাহ বলবেন, না, তুমি দুনিয়ায় যত দান করেছ তা আখিরাতের জন্য করোনি। বরং করেছ এ জন্য যে, মানুষ তোমাকে অনেক বড় দানশীল বলবে, সম্মান করবে। তুমি দুনিয়াতে যা চেয়েছিলে আমি দুনিয়ায় তোমাকে তা দিয়েছি। আখিরাতে তোমার জন্য কিছুই নেই। তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করো।
তৃতীয় ব্যক্তি ছিল একজন মুজাহিদ। আল্লাহ আখেরাতে তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, তুমি আজ আমার কাছে কী আশা করো? সে বলবে, হে আল্লাহ, আমি দুনিয়ায় জিহাদ করেছি। কোনো লড়াই থেকে আমি পিছপা হইনি। অবশেষে আমি জিহাদ করতে করতে জীবন বিলিয়ে দিয়েছি। আমি আপনার কাছে আজ জান্নাত আশা করি। আল্লাহ বলবেন, না, তুমি যে জিহাদ করেছো তা আমার জন্য করোনি। বরং করেছ এ জন্য যে, মানুষ তোমাকে বীরবাহাদুর বলবে, বীরশ্রেষ্ঠ বলবে, শহীদ হিসেবে তোমার নাম স্মরণ করবে। তুমি দুনিয়াতে যা চেয়েছিলে আমি দুনিয়ায় তোমাকে তা দিয়েছি। আখিরাতে তোমার জন্য কিছুই নেই। তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করো।

কাজ একই কিন্তু নিয়ত ভিন্ন
রাসূল সা:-এর মদিনায় হিজরতের আগে ও পরে অনেক সাহাবী ইসলামের জন্য নিজেদের আত্মীয়-স্বজন, বাড়িঘর, সহায়-সম্পত্তি ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করেন। তখন এক ব্যক্তি উম্মে কায়েস বা কায়লা নামক এক মুহাজির মহিলাকে বিবাহ করার জন্য মদিনায় হিজরত করে। হিজরতের জন্য রাসূল সা:-এর নির্দেশ পালন তার উদ্দেশ্য ছিল না। বিষয়টি জানতে পেরে রাসূল সা: বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসূলের জন্য হিজরত করে, তার হিজরত আল্লাহ ও রাসূলের জন্যই গণ্য হবে। আর যে ব্যক্তি দুনিয়ার জন্য বা কোনো মহিলাকে বিবাহ করার জন্য হিজরত করবে তার হিজরত গ্রহণযোগ্য হবে না।” এই ঘটনায় আমরা দেখতে পাই, দুই ব্যক্তি একই ভালো কাজ তথা হিজরত করেছে। কিন্তু নিয়তের ভিন্নতার কারণে একজনের হিজরত গ্রহণযোগ্য হয়েছে। আর আরেক জনের হিজরত গ্রহণযোগ্য হয়নি।
আমাদের বাস্তব জীবনেও উভয় ধরনের লোক পাওয়া যাবে। একই নামাজ দুইজন পড়ছে, একই জাকাত দুইজন দিচ্ছে, একই হজ দুইজন করছে, একই রোজা দুইজন রাখছে, একই দাওয়াতি কাজ দুইজন করছে, একই ইকামতে দীনের কাজ দুই জনে করছে, একই সামাজিক কাজ দুইজন করছে, একই মসজিদের খেদমত দুইজন করছে; কিন্তু হয়তো নিয়তের কারণে একজনের আমল গ্রহণ করা হবে আর আরেক জনের আমল গ্রহণ করা হবে না।

ইখলাসহীন ব্যক্তির আমল
ইখলাসহীন ব্যক্তি কাজের চেয়ে বিজ্ঞাপনের চিন্তা করে বেশি। যে কাজের ঢাকঢোল পেটানো হয়, যেটি মানুষের প্রশংসা অর্জন করে, সেটিকেই সে কাজ মনে করে। যে নীরব কাজের খবর আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ রাখে না, সেটা তার কাছে কোনো কাজ বলে মনে হয় না। কোন কাজ করলে তা মানুষের কাছে প্রকাশ করার জন্য সুযোগ খুঁজতে থাকে।
আর এখন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে নিজের কাজ মানুষের কাছে প্রকাশ করা খুব সহজ হয়ে পড়েছে। ইতিকাফে বসে একটা পোস্ট দিলাম। বন্ধুরা! আমি ইতিকাফে বসেছি। হজ বা ওমরা করতে গিয়েছি। একটা সেলফি তুলে ফেসবুকে আপলোড দিলাম। ঈদ উপলক্ষে গরিবদের সাহায্য করে তার ছবি দিয়ে দিলাম। মিছিলের ছবি, মিটিংয়ের ছবি, ইফতার মাহফিলের ছবি; সবকিছুর ছবি তুলতে হবে। আর ছবি তুলে অবশ্যই তা ফেসবুকে দিতে হবে। ফেসবুকে কোনো ছবি বা পোস্ট দিয়ে কতটা লাইক পড়লো তার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকলাম। এই কাজগুলোতে আমাদের কতটুকু খুলুসিয়াত ছিল ভেবে দেখা দরকার। রাসূল সা: বলেন, “হাশরের ময়দানে ৭ ব্যক্তি আল্লাহর আরশের নিচে স্থান পাবে। তার মধ্যে এক ব্যক্তি হলেন, তিনি এতটা গোপনে আমল করেন যে, ডান হাত দিয়ে কিছু দান করলে বাম হাত তা টের পায় না।
তবে প্রয়োজনে ছবি বা পোস্ট দেয়া যাবে না তা আমি বলছি না। কিন্তু প্রয়োজন আদৌ ছিল কিনা বা প্রয়োজনের চেয়ে বাড়াবাড়ি ছিল কিনা তার জন্য আত্মসমালোচনা করা দরকার।

সামাজিক ও সাংগঠনিক পর্যায়ে ইখলাস
নিজের সকল কাজে ইখলাসকে লালন করা একটা জিহাদ। মানুষের নফস চায় টাকা, সম্মান, ক্ষমতা, মানুষের প্রশংসা, মানুষের মূল্যায়ন। আর কোনো কাজ খুলুসিয়াতের সাথে শুরু করা হলেও শয়তান তার মধ্যে প্রদর্শনেচ্ছা ঢোকাতে তৎপর থাকে। তাই এটাকে আমি বলব নাফস ও শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ। ব্যক্তিপর্যায়ে ইখলাসকে লালন করা সম্ভব হলেও সামাজিক ও সাংগঠনিক পর্যায়ে এটা অনেক কঠিন। কারণ সামাজিক ও সাংগঠনিক পর্যায়ে যখন আপনি ভূমিকা রাখবেন, তখন আপনার হাতে ক্ষমতা আসবে, মানুষ আপনাকে সম্মান করবে, মানুষ আপনাকে মূল্যায়ন করবে। সংগঠনের প্রয়োজনে আপনাকে স্টেজে উঠতে হবে, বক্তব্য দিতে হবে, ছবি তুলতে হবে। মানুষের মাঝে আপনি জনপ্রিয় ব্যক্তিতে পরিণত হবেন। আপনি সেলিব্রেটি হয়ে উঠবেন। আপনার শত শত ফ্যান তৈরি হবে।
এমতাবস্থায় ক্ষমতা, সম্মান, মূল্যায়ন, জনপ্রিয়তাকে টার্গেট না করে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে টার্গেট করে টিকে থাকা সত্যি খুব কঠিন। কাজের প্রদর্শনী থাকলেও প্রদর্শনেচ্ছা না থাকা, জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও তা লক্ষ্যে পরিণত না হওয়া, মানুষের প্রশংসাবাণী সত্ত্বেও তা অর্জনের চিন্তা না করা। এ জন্য কঠোর পরিশ্রম, প্রচেষ্টা ও সাধনা দরকার। সামান্য গাফিলতি হলেই শয়তান অন্তরে প্রবেশ করতে পারে।

ইখলাসহীনতার রোগ চিহ্নিত করা ও তার চিকিৎসা
আমাদের ব্যক্তি, সামাজিক ও সাংগঠনিক জীবনে অনেক কাজই মানুষের সম্মুখে করতে হয়। আপনাকে মানুষের অগোচরে কিছু আমল বা ভালো কাজ করতে হবে। তারপর তুলনা করে দেখতে হবে, কোন কাজের প্রতি আপনার আকর্ষণ বেশি। যদি প্রথম কাজের প্রতি আকর্ষণ বেশি হয়, তাহলে বুঝতে হবে আপনার ভেতর ইখলাসহীনতার বা প্রদর্শনেচ্ছার রোগ ঢুকেছে।

প্রদর্শনেচ্ছা রোগের আমরা কয়েকভাবে চিকিৎসা করতে পারি:
১. দুনিয়া ও আখিরাতের তুলনা
আখিরাতের চিন্তা প্রদর্শনেচ্ছা দূর করতে এবং ইখলাস সৃষ্টিতে ও বাড়াতে সাহায্য করবে। আখিরাতের তুলনায় দুনিয়া কত তুচ্ছ। হাশরের ময়দানে মানুষ মনে করবে, আমরা দুনিয়ায় ১০ দিন, ১ দিন অথবা কয়েক ঘণ্টা ছিলাম। (সূরা ত্বহা ১০৩ ও ১০৪, সূরা নাজিয়াত ৪৬) এই ক্ষণস্থায়ী, অল্প কয়দিনের জন্য সীমাহীন, অনন্ত আখিরাতকে বরবাদ করা বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়।
২. আখিরাতকে টার্গেট করা
আখিরাতকে সব কাজের টার্গেট বানালে দুনিয়া ও আখিরাত দুটোই পাওয়া যাবে। কারণ যারা আখিরাতের ফসল কামনা করে আল্লাহ তাদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জায়গায় ফসল বাড়িয়ে দেন। কিন্তু দুনিয়াকে টার্গেট বানালে শুধু দুনিয়াতে সামান্য কিছু পাওয়া গেলেও আখিরাতে কিছুই পাওয়া যাবে না। (সূরা বনি ইসরাইল ১৮, সূরা শুরা ২০)
৩. নিজেকে প্রশ্ন করা
ইমাম আহমদ রহ: বলেন, কোনো কাজ করার আগে নিজেকে জিজ্ঞাসা কর, আমি এই কাজটি কি আল্লাহর জন্য করছি নাকি দুনিয়ার জন্য করছি?
৪. মানুষের অগোচরে আমল করা
মানুষের অগোচরে ভালো আমল করার অভ্যাস গড়ে তোলা। এমন কিছু আমল নিয়মিত করা যেগুলো আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানতে পারবে না।
৫. আল্লাহর সাহায্য কামনা
আল্লাহ তায়ালা আমাদের ইখলাসের সাথে সকল আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : ইসলামী শিক্ষাবিদ

SHARE

Leave a Reply