গড পার্টিকল জানা-অজানা দশ কথা

গোলাপ মুনীর

গডস পার্টিকল’ বা ‘ঈশ্বরকণা’

সুদীর্ঘকাল থেকে সাধক বিজ্ঞানীরা এক রহস্যের পেছনে ছুটছেন। সে রহস্যের নাম ম্যাটার বা পদার্থ। বিজ্ঞানীরা অনবরত চেষ্টা-সাধ্য চালিয়ে যাচ্ছেন এ পদার্থের নানা রহস্য উদঘাটনে। এই পদার্থের সধংং বা ভর আছে। এই ভরের কারণেই বস্তু ভারী হয়, বস্তুর ওজন হয়। বস্তুর ভর না থাকলে বিশ্বজগতের চেহারা এমনটি হতো না, যেমনটি আমরা দেখছি, উপলব্ধি করছি। পদার্থ হচ্ছে কণার পিণ্ড। পদার্থের ভর না থাকলে কণারা আলোর গতিতে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করতো। আমরা পেতাম না পদার্থের কোনো পিণ্ড। বস্তু আকারে পেতাম না কিছুই। বিজ্ঞানীরা বলেন, বিশ্বজগৎ সৃষ্টির শুরুতে ছিল শুধুই এনার্জি বা শক্তি। এই এনার্জি থেকে আমরা পেলাম কণা। কণা পেল এর ভর। কণারা মিলে তৈরি করলো পদার্থের পিণ্ড। বিশ্বজগৎ নিরাকার থেকে পেল আকার, যা আজকের আমাদের বিশ্বজগৎ।
কিন্তু একটি কণা কিভাবে এর ভর পেল? একটি কণাকে ভারী বানায় যে কণা তারই নাম হিগস বোসন। এটিকেই বলা হচ্ছে গডস পার্টিকল বা ঈশ্বর-কণা। এই হিগস বোসন বা ঈশ্বর কণার অস্তিত্ব প্রমাণ করতে বিজ্ঞানীদের অনেক পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। এই নতুন রহস্যময় হিগস বোসন কণার আবিষ্কার ঘোষণা করা হয়েছে গত ৪ জুলাই, ২০১২-তে। সুইজারল্যান্ডের জেনেভার কাছের ‘ইউরোপিয়ান অরগানাইজেশন ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ’ (সার্ন)-এ ও অন্যান্য গবেষণাগারে গত চল্লিশ বছর ধরে গবেষণা শেষে বিজ্ঞানীরা এই এনার্জি পার্টিকলটির অস্তিত্ব আবিষ্কারের ঘোষণা দিতে সক্ষম হন। বলা হচ্ছে, এই হিগস বোসন কণা আবিষ্কারের ফলে মহাবিশ্ব সৃষ্টি রহস্য উদঘাটনে বিজ্ঞানীরা অনেক দূর এগিয়ে গেছেন। গোটা জুলাই মাসজুড়ে আমাদের পত্রপত্রিকা ও অন্যান্য গণমাধ্যমে এই হিগস আবিষ্কারের বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোকপাত করা হয়েছে। ছাত্র সংবাদের আগস্ট সংখ্যায় এ লেখকের ‘সার্নের গবেষণায় ঈশ্বর কণার সন্ধান’ শীর্ষক একটি লেখা ছাপা হয়েছে। এবারের বক্ষ্যমাণ এ লেখায় হিগস বোসন সম্পর্কে এমন দশটি বিষয় জানানোর প্রয়াস পাবো, যা সম্ভবত আপনি এখনো জানার সুযোগ পাননি।

এক.
‘বোসন’ নামটি এসেছে ভারতীয় বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন বোসের নামানুসারে। কণাগুলো আসে দুটো আকারে : বোসন ও ফারমিয়ন। হিগস পার্টিকল পড়ে বোসন শ্রেণীতে। সত্যেন বোস ও আইনস্টাইন যৌথভাবে কাজ করে দাঁড় করেন বোস-আইনস্টাইন স্ট্যাটিসটিকস, যা এক শ্র্রেণীর কণার আচরণ ব্যাখ্যা করে। এই শ্রেণীর কণা হচ্ছে বোসন কণা। একই গুণাবলির দু’টি বোসন কণা একই সময়ে একই স্থানে থাকতে পারে। কিন্তু দু’টি ফারমিয়ন কণা তা পারে না। এ জন্যই ফোটন নামের বোসন কণা ঘন লেজাররশ্মির ভেতর দিয়ে এক সাথে প্রবাহিত হতে পারে। কিন্তু ইলেকট্রনগুলো ফারমিয়ন কণাশ্রেণীর হওয়ায় একটি অপরটি থেকে অবশ্যই আলাদা থাকতে হবে। এ থেকে ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, কোন ইলেকট্রনগুলো পরিভ্রমণ করে অ্যাটমের ভিন্ন ভিন্ন অরবিটে। এ ক্ষেত্রে সত্যেন বোসের অনন্য অবদান থাকলেও তিনি কখনোই নোবেল পুরস্কার পাননি, এমনকি তিনি ডক্টরেট ডিগ্রিও অর্জন করেননি। কিন্তু নোবেল কমিটি ঈশ্বরকণা সম্পর্কিত ধারণা সৃষ্টির জন্য অন্যান্য বিজ্ঞানীদের নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করেছে। কেন নোবেল কমিটি সত্যেন বোসের প্রতি এই বিরূপ আচরণ করেছে, সেটি থেকে গেছে বরাবরের একটি বড় প্রশ্ন।
সত্যেন বসু ১৯১৫ সালে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন কলকাতা বিজ্ঞান কলেজে। সেখানে তিনি বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার সঙ্গে মিশ্রগণিত ও পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন পরিসংখ্যান বিভাগের রিডার হিসেবে। ১৯২৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বসু ক্লাসিক্যাল পদার্থবিজ্ঞানের সাহায্য ছাড়াই পাঙ্কের কোয়ান্টাম তেজস্ক্রিয় নীতি প্রতিপাদন করে একটি প্রবন্ধ রচনা করেন এবং সদৃশ কণার সাহায্যে দশার সংখ্যা গণনার একটি চমৎকার উপায় উদ্ভাবন করেন। এই নিবন্ধটা ছিল মৌলিক ও কোয়ান্টাম পরিসংখ্যানের ভিত রচনাকারী। প্রবন্ধটি প্রকাশের প্রাথমিক প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে সত্যেন বসু তা সরাসরি আইনস্টাইনের কাছে পাঠান। আইনস্টাইন তা জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেন এবং বসুর পক্ষে তা একটি পত্রিকায় প্রকাশ করেন। এ স্বীকৃতির সূত্র ধরে বসু ভারতের বাইরে গবেষণার সুযোগ পান। দুই বছর তিনি ইউরোপে কাজ করেন লুই ডি ব্রগলি, মেরি কুরি ও আইনস্টাইনের সাথে। এরপর ১৯২৭ সালে ফিরে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরই মধ্যে অধ্যাপক পদে উন্নীত হয়ে দায়িত্ব নেন বিভাগীয় প্রধানের। ১৯৪৫ সালে যোগ দেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে অবসর নেন ১৯৫৬ সালে। বিশ্বভারতীর উপাচার্য ছিলেন ১৯৫৬ থেকে ’৫৮ সাল পর্যন্ত। ১৯৫৯ সালে ভারত সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেয়।
দুই.
হিগসই একমাত্র পদার্থবিজ্ঞানী ছিলেন না, যারা কণাগুলোর ভর পাওয়ার ধারণা সৃষ্টিতে অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। এর তাত্ত্বিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে কমপক্ষে এক ডজন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী কোনো না কোনোভাবে এতে অবদান রাখেন। এই তাত্ত্বিক অবকাঠামো সূত্রেই ১৯১০ সালে হিগস পার্টিকলের কথা আমরা জানলাম। অ্যামেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটি ছয়জন পদার্থবিজ্ঞানীকে ১৯৬৪ সালে এ বিষয়ে প্রবন্ধ লেখার জন্য জে জে সাকুরাই পুরস্কার দেয়। কিন্তু অন্যান্য তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীরাও একই ধারণা তুলে ধরেছিলেন এবং তারও আগে প্রকাশিত লেখাগুলো এ ক্ষেত্রে বাধা অপসারণে সহায়ক প্রমাণিত হয়েছিল। কিন্তু সবাইকে তো আর নোবেল পুরস্কার কমিটি পুরস্কার দিতে পারে না। কারণ সুযোগ ছিল বেশির পক্ষে ৩ জনকে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ঘোষণা, যারা তখনো দুনিয়াতে বেঁচে ছিলেন। হিগস মেকানিজম উঠে এলো ‘স্পনটেনিয়াম সিমেট্রি ব্রেকিং’ ধারণা থেকে। এ মেকানিজমের প্রথম প্রস্তাব আসে ১৯৬২ সালে নোবেল বিজয়ী পি ডব্লিউ এন্ডারসনের কাছ থেকে। এ মেকানিজমের তুলনামূলক সম্প্রসারণ ঘটে ১৯৬৪ সালে তিনটি আলাদা বিজ্ঞানীগোষ্ঠীর মাধ্যমে। সেখানে যেসব বিজ্ঞানী ছিলেন, হিগস বোসন আবিষ্কারে তাদের অবদান কম নয়। বিশেষ করে জেফারি গোল্ডস্টোন, আবদুস সালাম ও স্টিফেন ওয়েলবাস ইলেকট্রো ম্যাগনেটিজম ও দুর্বল পারমাণবিক শক্তি একীভূত করে যে মডেল তৈরি করেন, তাই শেষ পর্যন্ত ‘স্ট্যান্ডার্ড মডেল’ হিসেবে সুপরিচিতি পায়।
তিন.
ঈশ্বরকণা সম্পর্কিত পিটার হিগসের সুবিখ্যাত গবেষণা প্রবন্ধটি প্রাথমিকভাবে বাতিল করা হয়েছিল। কিন্তু এ গবেষণা প্রবন্ধটিই ছিল রহস্যময় ও গুরুত্বপূর্ণ। এই ঈশ্বরকণা আবিষ্কারের একটি উৎস দলিল। মূল প্রবন্ধটি ফেরত আসার পর হেগস তাতে আরেকটি অনুচ্ছেদ যোগ করেন, যাতে তিনি হিগস পার্টিকলের কথা উল্লেখ করেন। ১৯৬৪ সালে হিগস লিখেন দু’টি গবেষণা প্রবন্ধ। দু’টি প্রবন্ধই ছিল মাত্র দুই পৃষ্ঠা দৈর্ঘ্যরে। প্রবন্ধগুলো হিগস ফিল্ড বিষয় নিয়ে। ‘ফিজিক্স লেটারস’ নামের জার্নাল প্রথমটি ছাপার জন্য মনোনীত করলেও দ্বিতীয়টি ফেরত পাঠায়। দ্বিতীয় প্রবন্ধটি মূল্যায়ন করেছিলেন সুবিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী ইউইবিরো ন্যাম্বো। তার পরামর্শ মতে, হিগস এতে তার তত্ত্বের তাত্ত্বিক প্রভাব ব্যাখ্যা করে আরেকটি অনুচ্ছেদ যোগ করেন। এ অনুচ্ছেদে হিগস উল্লেখ করেন, সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো হিগস ফিল্ড সৃষ্টি করবে নতুন ধরনের এক কণা। এর পর নতুন করে লেখা প্রবন্ধটি পাঠিয়ে দেন প্রতিদ্বন্দ্বী জার্নাল ফিজিক্যাল রিভিউ লেটারসে। এ জার্নালে লেখাটি ছাপা হয়।
চার.
যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানবিষয়ক মন্ত্রী একবার হিগস পার্টিকলের সর্বোত্তম ব্যাখ্যার জন্য জাতীয় প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন। হিগস মডেল অনুসারে, প্রাথমিক কণাগুলো ভরপ্রাপ্ত হয় একটি অদৃশ্য ও সর্বত্র বিরাজমান (ইনভিজিবল অমনিপ্রেজেন্ট) ক্ষেত্রের সাথে আন্তঃক্রিয়া করে। একটি কণা হিগস ফিল্ডের সাথে যত বেশি আন্তঃক্রিয়া করবে, এর ওজনও তত বেশি হবে। ১৯৩৩ সালের দিকে বিজ্ঞানীরা এই হিগস ফিল্ডের ব্যাখ্যা ব্রিটিশ সরকারের কাছে তুলে ধরতে মুশকিলে পড়েন। যুক্তরাজ্যের তৎকালীন বিজ্ঞানমন্ত্রী উইলিয়াম ওয়াল্ডেগ্রেভ বিজ্ঞানীদের কাছে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন সরকারের কাছে হিগস ফিল্ড সম্পর্কে ১ পৃষ্ঠার একটি সেরা বর্ণনা লিখে পাঠানোর জন্য। বিজ্ঞানমন্ত্রী ওয়াল্ডেগ্রেভ সেরা বর্ণনাকারীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণও করেছিলেন। পুরস্কার বিজয়ীদের মধ্যে ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানী ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ড্যাভিড মিলার। মিলার হিগস ফিল্ডকে তুলনা করেছিলেন একটি রাজনৈতিক দলের কর্মীদের একটি মিলনায়তনে জড়িত হওয়ার সাথে। কিভাবে হিগস ফিল্ডে একটি কণা ভর পায়, তা সাধারণ মানুষকে কম কথায় বোঝানোর জন্য তিনি এই উপমা হাজির করেন মিলার তার এ ব্যাখ্যায়। তিনি বললেন, কল্পনা করুন একটি হলঘর। সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছেন কিছু পার্টির কর্মী ও সাধারণ মানুুষ। এ সময় হলঘরে ঢুকলেন কোনো দলের একজন তারকা নেতা। তিনি হলঘরে ঢোকা মাত্র তার চার পাশে এসে ভিড় জমাবেন হলঘরে থাকা সাধারণ সব মানুষ। তিনি এদিক-ওদিক গেলে সাধারণ মানুষের ভিড়ও তাকে অনুসরণ করবে। এটাই হলো ওই তারকা নেতার ভারী হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া। সাধারণ মানুষ হলো সেই আমাদের রহস্য কণা আর তা ভারী করে তুলেছে তারকা নেতা নামের কণাকে। এভাবেই তিনি ব্যাখ্যা তুলে ধরেন অন্য কণাকে ভারী করে তোলে যে কণার বিজ্ঞানীদের কাছে এর পরিচয় হিগস বোসন কণা নামে।
পাঁচ.
হিগস মেকানিজমের মাধ্যমে মহাবিশ্বের ভরের এক ক্ষুদ্র অংশের ব্যাখ্যা পাওয়া যায় মাত্র। বেশির ভাগ জনপ্রিয় বিজ্ঞানবিষয়ক লেখায় হিগস মডেলকে বড় মাপের অবদান হিসেবে দেখানো হয় মহাবিশ্বের সব কিছুর ভর সৃষ্টির জন্য। কিন্তু আসলে হিগস ফিল্ডের অবদান হচ্ছে কিছু প্রাথমিক কণারÑ যেমন কোয়ার্ক ও ইলেকট্রনের ভর সৃষ্টির পেছনে। আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্বের বেশির ভাগই তৈরি হয়েছে কিছু কম্পোজিট পার্টিকল দিয়ে, যেমন প্রোটন ও নিউট্রন দিয়ে যার মধ্যে রয়েছে কোয়ার্কও। প্রোটন ও নিউট্রনের ভরের পরিমাণ এর ভেতরের কোয়ার্কের তুলনায় বেশি। যে শক্তিশালী পারমাণবিক শক্তি কোয়ার্কগুলোকে একত্রে ধরে রাখে, তা বেশি অবদান রাখে ভারী করে তোলার প্রক্রিয়ায়।
ছয়.
হিগস বোসনের একটি ডাকনাম ‘গডস পার্টিকল’ বা ‘ঈশ্বরকণা’। পদার্থ বিজ্ঞানী লিওন লেজারম্যান এই হিগস বোসন নিয়ে একটি বই লিখেন। তিনি বইটির নাম দেন দ্য গড পার্টিকলস। সেই থেকে হিগস বোসন কণা ‘গড পার্টিকল’ নামে সুপরিচিত হয়ে ওঠে। লেজারম্যান একবার মজা করার জন্য কৌতুক করে বলেছিলেন, আমি আসলে বইটির নাম দিতে চেয়েছিলাম ‘এড়ফফধসহ চধৎঃরপষব’ অর্থাৎ ঈশ্বরের অভিশপ্ত কণা হিসেবে। কারণ এ কণা খুঁজে পাওয়া ছিল খুবই কঠিন।
সাত.
হিগস পার্টিকল আবিষ্কারের পরও ‘স্ট্যান্ডার্ড পার্টিকল থিওরি’ অপূর্ণ থেকে যাবে। হিগস বোসন হচ্ছে সর্বশেষ অনাবিষ্কৃত কণা, যার পূর্বাভাস রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড মডেলে। এই মডেল হচ্ছে পদার্থবিদদের জন্য একটি সুন্দর গাণিতিক কাঠামো যার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণার আন্তঃক্রিয়া বিশ্লেষণ করতে পারেন। জানতেও পারেন কী করে কণাগুলোর মধ্যে আন্তঃক্রিয়া চলে। পরীক্ষার ফলাফল থেকে বারবার প্রমাণিত হয়েছে এই মডেলে অন্যান্য পূর্বাভাসও। কিন্তু হিগস বোসনের আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে কণা পদার্থবিদ্যা বা পার্টিকল ফিজিকসের সবকিছু জানার সমাপ্তি ঘটবে না। স্ট্যান্ডার্ড মডেল মৌল শক্তিগুলোÑ যথা ইলেকট্রোম্যাগনেটিজম ও শক্তিশালী পারমাণবিক বলÑ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিলেও গ্র্যাভিটি সম্পর্কে এ মডেল ব্যাখ্যা উপস্থাপন করতে পারেনি। গ্র্যাভিটি ফোর্স অন্যান্য ফোর্সের তুলনায় অনেক দুর্বল। এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হচ্ছে গ্র্যাভিটি ফোর্সের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র আমরা অনুভব করি। কারণ এর বেশির ভাগই গোপন অজানা দিকে প্রয়োগ হয়।
আট.
হিগস পার্টিকলের অস্তিত্ব থাকলে, এর আত্মীয় কণারও অস্তিত্ব থাকতে পারে। অনেক পদার্থবিজ্ঞানী চেষ্টা করেছেন জানা কণা ও এর ভর ব্যাখ্যা করেছেন হিগস বোসন ছাড়াই। কিন্তু এখনো কেউ এ ক্ষেত্রে একটি সার্থক মডেল উপস্থাপন করতে পারেননি। একটি জনপ্রিয় তত্ত্ব রয়েছে, যার নাম সুপারসিমেট্রি। এ তত্ত্বের পূর্বাভাস হচ্ছেÑ পাঁচটি হিগস পার্টিকলের অস্তিত্ব রয়েছে। অন্যরা বলছেন, পাঁচটি নয় তার চেয়েও বেশি। এখন ইউরোপের লজি হেড্রন কলাইডার এবং যুক্তরাষ্ট্রের টেভাট্রন কলাইডারের দায়িত্ব হচ্ছে পরীক্ষা সূত্রে বাকিটা প্রমাণের। এই দুই কলাইডারে এ নিয়ে চলছে নানা পরীক্ষা- নিরীক্ষা। এসব পরীক্ষা তথ্য-উপাত্ত এখনো প্রকাশের অপেক্ষায়।
নয়.
বিজ্ঞানীরা সম্ভবত এক দশক আগেই হিগস বোসন কণা দেখতে পেয়েছিলেন। ২০০০ সালে সার্নের ফ্লাগশিপ এক্সিলারেটর দ্য লজি ইলেকট্রন পজিট্রন কলাইডার (এলইপি) এগার বছর সার্থকভাবে চালু রাখার পর বন্ধ করে দেয়ার কথা ছিল। তখন রহস্যজনক একটা কিছু ঘটছিল। এই এলইপি পরীক্ষায় দেখা মিললো এমন কিছু কণার যা দেখতে হিগস বোসন কণার মতো। আর এর ভর ১১৫ Gev (Giga a billion electro volt)। যার ভর আয়োডিন অণুর ভবের প্রায় সমান। এতে বিস্মিত হন বিজ্ঞানীরা। তাদের অণুকোষ সার্ন ম্যানেজমেন্ট এলইপি কলাইডার আরো ৬ সপ্তাহ চালু রাখার সুযোগ দেন, তা পর্যবেক্ষণের জন্য। এই ছয় সপ্তাহ আগে এলইপি কলাইডার বন্ধ করে দেয়ার কথা ছিল। এই সময় তারা আরো হিগস পার্টিকলের অস্তিত্ব খুঁজে পান। বিজ্ঞানীরা কলাইডার বন্ধ করে দেয়ার সময় দ্বিতীয়বার সময় বাড়ানোর অনুরোধ জানান। তাদের প্রত্যাশা ছিল আরো কিছু পর্যবেক্ষণে উল্লেখযোগ্য কিছু আবিষ্কার হয়তো সম্ভব হবে। কিন্তু এই কলাইডার আর চালু রাখা হয়নি। তবে লজি হেড্রন কলাইডারের সর্বশেষ তথ্য প্রকাশ করা হয় ২০১১ সালের ডিসেম্বরে, যেখানে হিগস পার্টিকলের ইঙ্গিত ছিল।
দশ.
নতুন কণার আবিষ্কারের অপর অর্থ অন্যান্য অধ্যায়ের সূচনা করা, এই কণা আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানীদের দায়িত্ব হচ্ছে এর গুণাগুণ পরীক্ষা করা। সুনিশ্চিত জানতে হবে নতুন এই বোসন কণা স্ট্যান্ডার্ড মডেলে বর্ণিত হিগস বোসন কি না, যা অন্য কণার সাথে আন্তঃক্রিয়া করে সে কণার ভর সৃষ্টি করে। ১৯৯৮ সালে বিজ্ঞানীরা জানালেন, গ্রহ-তারা-গ্যালাক্সি বিশ্বজগতের মাত্র ৪ শতাংশ। বাকি ৯৬ শতাংশই এখনো আমাদের অজানা। নতুন ঈশ্বরকণা হয়তো দুয়ার খুললো বাকি ৯৬ শতাংশ মহাজগৎ উন্মোচনের।
লেখক : সাংবাদিক ও বিজ্ঞান লেখক

SHARE

Leave a Reply