গণতন্ত্রের জন্য অশনিসঙ্কেত ভোটে আগ্রহ হারাচ্ছে জনগণ । হারুন ইবনে শাহাদাত

গণতন্ত্রের জন্য অশনিসঙ্কেত ভোটে আগ্রহ হারাচ্ছে জনগণ । হারুন ইবনে শাহাদাতদেশের জনগণ ভোটের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। অবশ্য এই অবস্থা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। আওয়ামী লীগ ‘ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার’ অঙ্গীকার করে ক্ষমতায় এসে জনগণের ভোটাধিকার নিয়ে তাদের সাথে বার বার প্রতারণা করার কারণেই এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ক্ষমতার পালাবদল গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে স্বাভাবিক ঘটনা। জনগণের মতামতের ভিত্তিতে তাদের ভোটে নেতা নির্বাচন হবেন। সরকার গঠন হবে। সেই সরকার দেশ পরিচালনা করবে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। অবশ্য জনস্বার্থবিরোধী কাজের কারণে আস্থা হারালে সময়ের আগেও জনগণ সরকারের পদত্যাগ দাবি করতে পারে। উল্লেখিত প্রক্রিয়াগুলো শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে উদার গণতন্ত্র চর্চার বিকল্প নেই। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী পরও বাংলাদেশের গণতন্ত্র উদারতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতালিন্সাই এর অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। আধুনিক গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে জনগণের সেবা করা। কিন্তু বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক দলগুলোর অধিকাংশ নেতাই মনে করেন, রাজনীতি হলো ক্ষমতা দখলের মাধ্যম। ক্ষমতা দখল করার অর্থ জনগণের ওপর কর্তৃত্ব করার লাইসেন্স। এই মানসিকতার কারণে তারা একবার সরকার গঠনের সুযোগ পেলে আর তা ছাড়তে চান না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ক্ষমতার পালাবদলকে তারা অস্বীকার করেন। রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার করে জনগণের ওপর অত্যাচার নির্যাতন চালান। প্রতিদ্বন্দ্বী বিরোধী দলকে নির্মূল নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্রের নতুন নতুন ফাঁদ তৈরি করতে এতটাই ব্যস্ত হয়ে ওঠে যে দেশ জনগণের কল্যাণ চিন্তার সময় ও সুযোগ কোনটাই পান না। তাই ক্ষমতার পালাবদলের সময় এলে অস্থির হয়ে ওঠেন- এই ভেবে, ক্ষমতা ছাড়লে আর রক্ষা নেই। কর্মফল ভোগ করতে হবে। জনগণ ছাড়বে না। অতএব যে কোন মূল্যে জনগণকে ভোট থেকে দূরে রাখতে হবে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একতরফা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে এই দুষ্টচক্রে বন্দী হয়ে গেছে দেশ ও জনগণ। এরপর গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও অবাধ-সুষ্ঠু হয়নি জনগণ ভোটাধিকার ফিরে পায়নি। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার অবাধ ও নিরপেক্ষ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনকে ভয় পায় এই সত্য আজ দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। গত ১৩ মার্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরে যে রিপোর্ট প্রকাশ করছে, তার বড় অংশজুড়ে আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের আমেরিকান দূতাবাসের ওয়েবসাইটে পিডিএফ ফরম্যাটে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত ৫০ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশে গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি। এই নির্বাচনে ভোটবাক্সে ব্যালট ভরা, বিরোধী দলের পোলিং এজেন্ট ও সাধারণ ভোটারদের হুমকি দেওয়াসহ নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত আছে। কিন্তু কার্যত সব ক্ষমতাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে। গত ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে টানা তৃতীয়বারের মতো জয়লাভ করেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। কিন্তু এই নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে বিবেচনা করা হচ্ছে না। এই নির্বাচনে ভোটবাক্সে ব্যালট ভরা, বিরোধী দলের পোলিং এজেন্ট ও সাধারণ ভোটারদের হুমকি দেওয়াসহ নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাচনী প্রচার চলার সময় অনেক বিরোধী প্রার্থীকে হয়রানি, হুমকি দেওয়া, বিতর্কিত গ্রেফতার ও তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতার বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া গেছে। এর ফলে অনেক বিরোধীদলীয় প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের পক্ষে স্বাধীনভাবে নির্বাচনী প্রচার চালানো সম্ভব হয়নি। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি এবং বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যে পর্যবেক্ষকদের ভিসা দেওয়া হয়নি। নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য ২২টি এনজিওর মধ্যে মোটে ৭টিকে অনুমোদন দেওয়া হয়। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বলছে, ডিসেম্বরের নির্বাচনে বেসামরিক কর্তৃপক্ষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরো দেশজুড়েই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চালানো নির্যাতনের বিচার না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চালানো নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগের ক্ষেত্রে সরকার খুব কম পদক্ষেপই নিয়েছে।
এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সরকারের আইন-শৃঙ্খলা-বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বিরোধী দল বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর হাজার হাজার নেতা-কর্মী জেলহাজতে আছেন বলে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘খালেদা জিয়ার রায়ের সময় প্রায় ১৭৮৬ জন বিএনপি কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’ বিএনপির একজন মুখপাত্র হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানিয়েছিলেন, তাদের ও জামায়াতে ইসলামীর হাজার হাজার সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এ কথা উল্লেখ করেছেন। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট আরো বলেছে, বাংলাদেশে আরও কিছু ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে গুম, খুন, নির্যাতন, অযাচিত সেন্সরশিপ, সরকারের সমালোচনার কারণে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ব্লক করা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার লঙ্ঘন প্রভৃতি বিষয়। এ ছাড়াও স্বাধীনতা সাংবাদিকতা ও বাংলাদেশে বাকস্বাধীনতায়ও বাধা দেয়ার কথা বলা হয়েছে এ রিপোর্টে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, সাংবাদিকরা হয়রানির ভয়ে সেলফ-সেন্সরশিপের দিকে ঝুঁকছে। আইনে বলা আছে ঘৃণামূলক বক্তব্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে কিন্তু এ দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে তা ¯পষ্ট করা হয়নি। যেসব গণমাধ্যম সরকারের সমালোচনা করে থাকে তারা নানাভাবে সরকারের নেতিবাচক চাপের মুখে পড়ে। এ ছাড়া সাংবাদিকদের আক্রান্ত হওয়ার কথাও বলা হয় প্রতিবেদনে। রিপোর্টার উইদাউট বর্ডারের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে নিরাপদ সড়কের দাবিতে হওয়া আন্দোলনের সময় ২৩ জন সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছিলেন।
গণতন্ত্রের জন্য অশনিসঙ্কেত ভোটে আগ্রহ হারাচ্ছে জনগণ । হারুন ইবনে শাহাদাতপ্রতিবেদনে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়া প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘সন্ত্রাসবাদ থামাতে সরকার নানা অভিযান পরিচালনা করেছে। কিছু কিছু অভিযানে সন্দেহভাজনরা নিহত ও গ্রেফতার হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী প্রায়ই এ ধরনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে সন্দেহভাজনকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারে যাওয়ার কথা বলে থাকে। যেখানে তার সতীর্থদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে অভিযুক্ত নিহত হন। সরকার এই ঘটনাগুলোকে বন্দুকযুদ্ধ বা এনকাউন্টার বলে আখ্যায়িত করে থাকে। গণমাধ্যমও প্রায়ই একই আঙ্গিকেই খবর প্রকাশ করে থাকে। এ প্রসঙ্গে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমগুলো দাবি করেছে যে, বন্দুকযুদ্ধের অনেক ঘটনা আসলেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। দেশের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্টস সোসাইটি জানিয়েছে, গত বছর জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রায় ৪০০ বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে। অধিকার নামে আরেকটি মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে, জানুয়ারি থেকে অক্টোবরের মধ্যে মোট ৪১৫টি বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, এর আগের বছরের তুলনায় বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, প্রায় ২৩০ জন মাদক ব্যবসায়ীকে হত্যা করা হয়েছে। একইসঙ্গে গ্রেফতার করা হয়েছে আরো ১৭,০০০ জনকে। মানবাধিকার সংস্থা ও সুশীলসমাজ বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গ্রেফতার নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের দাবি, এদের মধ্যে অনেকেই নিরপরাধ। মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমের দেয়া তথ্যমতে গুম ও অপহরণের ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। এর বেশির ভাগের সঙ্গেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা জড়িত। এসব ঘটনা রোধ ও তদন্তে সরকারি উদ্যোগ তেমন ছিল না। অধিকার জানিয়েছে গত বছর জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৮৩টি গুমের ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশের সংবিধান সকল প্রকার নির্যাতন ও অন্যান্য অমানবিক আচরণ বা শাস্তিকে বেআইনি ঘোষণা করেছে। তারপরও গোয়েন্দা বাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা এ ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা সাধারণত সন্ত্রাসী ও বিরোধী দলের কর্মীদের থেকে তথ্য পাওয়ার জন্য নির্যাতন করে থাকে। অধিকার জানিয়েছে, গত বছরের প্রথম ১০ মাসে অন্তত ৫ জন নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতনে মারা গেছে। ছায়া ফটোগ্রাফার শহিদুল আলমকে গ্রেফতার ও আটকের বিষয়টি উল্লেখ করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বাংলাদেশের কারাগারের দুর্দশার কথাও তুলে ধরা হয়েছে এ প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার থেকে অতিরিক্ত আসামি রাখা হয়েছে, এগুলোতে বাংলাদেশের আমেরিকান দূতাবাসের ওয়েবসাইটে পিডিএফ ফরম্যাটে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত ৫০ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশে গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি। এই নির্বাচনে ভোটবাক্সে ব্যালট ভরা, বিরোধী দলের পোলিং এজেন্ট ও সাধারণ ভোটারদের হুমকি দেওয়াসহ নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত আছে। কিন্তু কার্যত সব ক্ষমতাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে। গত ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে টানা তৃতীয়বারের মতো জয়লাভ করেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। কিন্তু এই নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে বিবেচনা করা হচ্ছে না। এই নির্বাচনে ভোটবাক্সে ব্যালট ভরা, বিরোধী দলের পোলিং এজেন্ট ও সাধারণ ভোটারদের হুমকি দেওয়াসহ নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এই প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাচনী প্রচার চলার সময় অনেক বিরোধী প্রার্থীকে হয়রানি, হুমকি দেওয়া, বিতর্কিত গ্রেফতার ও তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতার বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া গেছে। এর ফলে অনেক বিরোধীদলীয় প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের পক্ষে স্বাধীনভাবে নির্বাচনী প্রচার চালানো সম্ভব হয়নি। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি এবং বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যে পর্যবেক্ষকদের ভিসা দেওয়া হয়নি। নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য ২২টি এনজিওর মধ্যে মোটে ৭টিকে অনুমোদন দেওয়া হয়। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বলছে, ডিসেম্বরের নির্বাচনে বেসামরিক কর্তৃপক্ষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরো দেশজুড়েই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চালানো নির্যাতনের বিচার না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চালানো নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগের ক্ষেত্রে সরকার খুব কম পদক্ষেপই নিয়েছে। সুযোগ সুবিধার নিশ্চয়তা নেই ও শৌচাগার সুবিধারও ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এ ধরনের পরিবেশে প্রায়ই মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছে কয়েদিরা। এই পরিবেশের কারণে গত বছর মোট ৭৪ কয়েদি মারা গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭৪ সালের স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ চাইলেই কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়াই যে কাউকে গ্রেফতার করতে পারবে। প্রায়ই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তাদের গ্রেফতারের পেছনে এ আইন দেখিয়ে থাকে। সংবিধান অনুযায়ী আটক কেউ তাকে গ্রেফতারের কারণের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। কিন্তু সরকার সাধারণত এ ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করে না। সুশীলসমাজ, মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমগুলো সরকারকে শুধুমাত্র সন্ত্রাসী নয় এমনকি সুশীলসমাজ ও বিরোধী নেতাদের জোরপূর্বক গুমের দায়ে অভিযুক্ত করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। রাজনৈতিক কারণে গ্রেফতার ও কারাদণ্ড দেয়ার দাবিও করা হয়েছে এ প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, রাজনৈতিক পরিচয়ও অনেক সময় গ্রেফতারের কারণ হিসেবে দেখানো হয়। আমেরিকার পররাষ্ট্র দফতরের এই প্রতিবেদন সম্পর্কে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক মানবাধিকার রিপোর্টে বাংলাদেশ নিয়ে যা বলা হয়েছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে আমাদের দেশের গণতন্ত্র নিয়ে বিশ্ববাসী উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, বিশ্বের সকল গণতান্ত্রিক দেশ নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করেছে। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সব মামলা মিথ্যা, দেশের নিরাপত্তা নিয়ে সরকার ছিনিমিনি খেলছে এসব বিষয় এই রিপোর্টে এসেছে। এতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ক্ষতি হয়েছে। তারা দেশের মানুষের মনের কথাগুলো বলেছে। এই রিপোর্টের মাধ্যমে বুঝতে পারছি যে বিশ্ববাসী আজকে বাংলাদেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন।

গণতন্ত্রের জন্য অশনিসঙ্কেত
দেশের গণতন্ত্রের এমন মরণদশা যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোও জমছে না। যতই দিন যাচ্ছে ভোটের হার কমছে। অনেকগুলো উপজেলায় সরকার দলীয়রা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী পর্যন্ত পায়নি। অনেক আদর্শ গণতান্ত্রিক দেশে শতকরা ৫০ শতাংশের কম ভোটার উপস্থিত হলে নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক ও বৈধ মনে করা হয় না। আমাদের দেশে এবারের উপজেলা নির্বাচনে সরকারের হিসেবেই ৪০ শতাংশের কম ভোটার উপস্থিত হয়েছে। বাস্তব অবস্থা তো আরও করুণ। ৫ থেকে ১০ শতাংশ ভোটারও আসলে কেন্দ্রে যায়নি। ৩১ মার্চ পর্যন্ত চার ধাপে যে ৪৪৫টি উপজেলার নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হয়েছে, সে নির্বাচনগুলোর মধ্যে ৩০টিতে কোনো ভোটাভুটির দরকার পড়েনি। কারণ, ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো অন্য কোনো দলের কোনো প্রার্থীই পাওয়া যায়নি। ছিলেন না কোনো বিদ্রেহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীও। ফলে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘নির্বাচিত’ হয়েছেন। এই ৩০টির বাইরে ২৪ শতাংশ উপজেলায় চেয়ারম্যান শুধু নয়, ৫০ জন ভাইস চেয়ারম্যান এবং ৫৯ জন মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানও একইভাবে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘নির্বাচিত’ হয়েছেন। একটি জাতীয় দৈনিকের খবরে জানানো হয়েছে, সব মিলিয়ে ৪৪৫টি উপজেলার মধ্যে ১০৭টিতেই চেয়ারম্যান ‘নির্বাচিত’ হয়েছেন ‘বিনাভোটে’! বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘আওয়ামী লীগের হাতে গণতন্ত্র, মানুষের ভোটের অধিকার কোন কিছুই নিরাপদ নয়। দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে।’ ভোটাধিকার হারিয়ে জনগণ যখন ভোটকেন্দ্রবিমুখ এমন অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখে বাকশাল নিয়ে আলোচনায় জনগণের হতাশা আরো বেড়ে গেছে। তারা গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ-চিন্তা উদ্বিগ্ন।
গণতন্ত্রের জন্য অশনিসঙ্কেত ভোটে আগ্রহ হারাচ্ছে জনগণ । হারুন ইবনে শাহাদাতগত ২৭ মার্চ বুধবার বিকেলে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত স্বাধীনতা দিবসের আলোচনা সভায় সভাপতিত্বকালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন। বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠন করে একটি প্লাটফর্ম করেন। এই কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ যেটাকে অনেকেই ‘বাকশাল’ হিসেবে বলে। এই বাকশাল ছিল কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগসহ দেশের সকল স্তরের মানুষ সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ সকলকে এক প্লাটফর্মে নিয়ে আসার একটি প্রক্রিয়া। প্রতিটি রাজনৈতিক দল, আমাদের সেনাবাহিনী-নৌবাহিনী-বিমানবাহিনী-পুলিশ বাহিনীসহ সকলকে একটি প্লাটফর্মে নিয়ে আর্থসামাজিক কাজে সম্পৃক্ত করে অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের জন্য তিনি জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলেছিলেন।’
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘শেখ হাসিনা আজীবন ক্ষমতায় থাকার খোয়াব দেখছেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের এক আলোচনা সভায় বলেছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রবর্তিত বাকশাল থাকলে নির্বাচন নিয়ে কোনো বিতর্ক থাকত না, প্রশ্ন উঠত না। বাকশাল ছিল সর্বোত্তম পন্থা। প্রধানমন্ত্রীর কথায় প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক বাকশাল পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের মতো বিনাভোটে, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আজীবন ক্ষমতায় থাকার খোয়াব দেখছেন শেখ হাসিনা। তিনি আগে-ভাগে জানিয়ে দেন তিনি কী করতে চাচ্ছেন। বাকশালের ভোট কোথায়? বাকশাল মানে তো একদলীয় ব্যবস্থা। তার মানে আওয়ামী সরকার ও তার যে প্রধান জনগণকে একেবারে বেকুব, একেবারে বোকা মনে করে। উনি মনে করেন, তার অবৈধ ক্ষমতার জোরে যা ইচ্ছা বলবেন, সেটাই মানুষ বিশ্বাস করবে। অথচ মানুষ এতো বেকুব নয়। মানুষ যদি বোকা হতো তাহলে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন এবং উপজেলা পরিষদের দুই দফা নির্বাচনে ভোট দিতে মানুষ ভোট কেন্দ্রে যেত। সরকারের বিরুদ্ধে অভিমান, ক্ষোভ ও বিদ্রোহে জনগণ অগ্নিগর্ভ হয়ে আছে। যেকোনো সময় জনতার বিস্ফোরণ শুরু হবে- যা কল্পনাও করতে পারছেন না।’
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, আওয়ামী লীগ একদলীয় শাসনের দিকে যেতে পারে এই সন্দেহ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে গণচীন কমিউনিস্ট পার্টির সাথে তাদের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের ঘটনা। কারণ এ কথা কারো জানা নয়, চীনকে ‘গণচীন’ বলা হলেও সেখানে কোন গণতন্ত্র নেই। সেদেশে কোন বিরোধী দল ও ভিন্নমত সহ্য করা হয় না। চীনের সাথে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সম্পর্ক অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে উচ্চমাত্রায়। যা কোন কোন ক্ষেত্রে ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে। তবে আশার কথা হলো দেশের জনগণ একদলীয় শাসনের বিপক্ষে। তারা গণতন্ত্র রক্ষায় জীবনবাজি রাখতে জানে। এই উপলব্ধি থেকেই আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলছেন, তারা বাকশাল নিয়ে কোন চিন্তা করছেন না। বাকশালী ব্যবস্থার ফিরে যাওয়ার কোন ইচ্ছে তাদের নেই। তারপও জনগণ ভরসা করতে পারছে না। কারণ তারা মনে করতে পারছে না যে দেশের প্রকৃত মালিকানা তারা ফিরে পেয়েছে। তাদের এই সন্দেহ দূর করতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন দ্রুত পুনঃনির্বাচনের দাবি করছেন। আওয়ামী লীগ যদি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করে তবেই হয়তো জনমনের এই সংশয় দূর হবে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সিনিয়র সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply