গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া জনগণের মুক্তি আসবে না । হারুন ইবনে শাহাদাত

দেশে বিরাট রাজনৈতিক শূন্যতা চলছে। শাসক দল আওয়ামী লীগ মনে করছে, তারা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের ব্যবহার করে বিরোধী দলকে দাবিয়ে রেখে একক রাজত্ব গড়ে বড় সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু বিরোধী দলকে রাজনীতির মাঠ ছাড়া করার মধ্যে কোনো সফলতা নেই, বরং ব্যর্থতা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের সাফল্য নির্ধারণ করা হয় গণতান্ত্রিক সূচকগুলোর উন্নয়নের মাপকাঠির আলোকে। এই সূচকগুলো হলো: বিরোধী দলের সাথে সরকারের গণতান্ত্রিক আচরণ, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা, সংবাদমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সর্বোপরি সরকার গঠনে জনগণের অংশগ্রহণ অর্থাৎ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনব্যবস্থা। উল্লিখিত সূচকগুলো বিবেচনা করে রাজনীতি বিশ্লেষক ও রাষ্ট্রচিন্তকরা গণতান্ত্রিক সরকারের সফলতা ব্যর্থতা নির্ধারণ করেন। একটি দেশের রাজনৈতিক ও মানবিক উন্নয়ন বিচারেও উল্লিখিত বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়া হয়। এক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে এককেন্দ্রিক স্বৈরশাসক দীর্ঘায়িত হয়। কোন এক ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় পড়ে। সেই এক ব্যক্তি যত ভালো মানুষই হোক না কেন, তার দু’চোখকে ফাঁকি দিয়ে অঘটনের পাল্লা ভারী হয়ে জনদুর্ভোগ বাড়তে থাকে। সুযোগসন্ধানী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর স্বার্থান্ধতা শুধু দেশ ও জনগণেরই ক্ষতি করে না, নিজ দল এমনকি এক সময় নিজেরও ধ্বংস ডেকে আনে। উল্লিখিত দিকগুলো বিচার করলে বর্তমান শাসক দল আওয়ামী লীগকে সফল বলার সুযোগ নেই। তারা বিগত দশ বছর ধরে ভোটারবিহীন নির্বাচনের নাটক মঞ্চস্থ করে দখলদার হিসেবে ক্ষমতায় আছে। দখলদারিত্ব পাকাপোক্ত করতে প্রকৃত বিরোধী দল বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিশ দলীয় জোটকে রাজনীতির মাঠ ছাড়া করতে একের পর এক ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত অব্যাহত রেখেছে। অপরদিকে নিজেদেরকে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বলে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে নিজেদের পকেটের কিছু দলকে গৃহপালিত বিরোধী দল হিসেবে মাঠে নামিয়ে প্রতারণার এক চরম খেলায় মেতে উঠেছে। কিন্তু এক্ষেত্রে তারা ব্যর্থ। কারণ তাদের এই প্রতারণাও বিশ্ববাসীর চোখে ধরা পড়ে গেছে।

ফাঁকি দেয়ার অপচেষ্টা ব্যর্থ
পৃথিবীটা এখন একটা ছোট্ট গ্রামের মতো। কারো চোখ ফাঁকি দিয়ে কিছুটা করলে ধরা পড়বে না, এমনটা যারা ভাবেন তারা বোকার স্বর্গে বসবাস করেন। কারণ তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে সেটা প্রায় অসম্ভব। আওয়ামী লীগ সরকারের কয়েক বছরের শাসনে যে দেশ থেকে নির্বাচন নির্বাসনে গেছে এবং গণতন্ত্র গত হয়েছে তা আর কারো জানতে বাকি নেই। এ বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে ইকোনোমিস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘গণতান্ত্রিক দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই।’ ফলে বাংলাদেশকে এখন আর সভ্য দুনিয়া গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে গণ্য করছে না। এমনকি ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবেও না। যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘গণতান্ত্রিক’ কিংবা ‘ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক’ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই। গত এক দশক ধরে স্বৈরতান্ত্রিক ও ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক অবস্থার মাঝামাঝি ‘হাইব্রিড রেজিম’ তালিকায় দেশটি অবস্থান করছে। তবে বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচকে ২০১৮ সালে বাংলাদেশের স্কোর আগের বছরের তুলনায় ০.১৪ বেড়েছে। ফলে ২০১৭ সালে যেখানে দেশটির অবস্থান ছিলো ৯২তম, পরের বছর হয়েছে ৮৮তম। ইআইইউ প্রতিটি দেশকে গণতন্ত্র সূচক পরিমাপ করতে পাঁচটি মানদণ্ড ব্যবহার করে। সেগুলো হলো- নির্বাচনী ব্যবস্থা ও বহুদলীয় অবস্থান, নাগরিক অধিকার, সরকারে সক্রিয়তা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ। প্রত্যেকটি মানদণ্ডকে ০ থেকে ১০ স্কোরের মধ্যে হিসাব করে গড় করা হয়। প্রাপ্ত স্কোরের ভিত্তিতে দেশগুলোকে চারটি ক্যাটেগরিতে ভাগ করা হয়; স্বৈরতন্ত্র, হাইব্রিড রেজিম, ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র এবং পূর্ণ গণতন্ত্র।

ইকোনমিস্টের গণতন্ত্র সূচক
স্কোর অনুযায়ী ক্যাটাগরি ৯-১০ পূর্ণ গণতন্ত্র, ৭-৮ ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র, হাইব্রিড রেজিম ৫-৬, স্বৈরতন্ত্র ০-৪ এই হিসাব অনুযায়ী, একটি দেশকে ‘পূর্ণ গণতান্ত্রিক’ অবস্থায় যেতে হলে গণতান্ত্রিক সূচকে ৯ থেকে ১০ স্কোর করতে হয়। যেসব দেশের স্কোর ৭ থেকে ৮ সেসব দেশকে ‘ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র’ বলা হয়েছে। তবে এর নিচের অবস্থান ‘হাইব্রিড রেজিম’-এ তালিকাভুক্ত দেশগুলোর স্কোর ৫ থেকে ৬ এবং ‘স্বৈরতান্ত্রিক’ দেশগুলোর স্কোর ০ থেকে ৪ এর মধ্যে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের হিসাব মতে বিশ্বের ১৬৭টি দেশের মধ্যে মাত্র ২০টি দেশ গণতন্ত্রের তালিকায়। ৫৫টি দেশ ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশের তালিকায়। ৩৯টি দেশ হাইব্রিড রেজিমের তালিকায় এবং ৫৩টি দেশ স্বৈরতান্ত্রিক দেশের তালিকায় রয়েছে।

‘হাইব্রিড রেজিম’-এর বৈশিষ্ট্য কী?
‘ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র’ এবং ‘স্বৈরতন্ত্রের’ মাঝামাঝি অবস্থান ‘হাইব্রিড রেজিম’। এটি আসলে কী? একটি দেশের কোন্ কোন্ বৈশিষ্ট্যের জন্য এই তালিকায় পড়ে- ইআইইউ-এর গবেষণা পদ্ধতিতে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে যা বলা হয়েছে তা হলো- নির্বাচনে বেশ অনিয়মের ঘটনা ঘটে, যা নির্বাচনের সুষ্ঠুতা ও নিরপেক্ষতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। বিরোধী দল এবং প্রার্থীর ওপরে সরকারি চাপ খুবই সাধারণ ঘটনা; রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সরকারের সক্রিয়তা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বিষয়ে মারাত্মক দুর্বলতা দেখা যায়, যা ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকেও বেশি। দুর্নীতির বিস্তার প্রায়ই সর্বত্র এবং আইনের শাসন খুবই দুর্বল; সিভিল সোসাইটি দুর্বল; সাধারণত, সাংবাদিকরা সেখানে হয়রানি ও চাপের মুখে থাকে এবং বিচারব্যবস্থাও স্বাধীন নয়।
জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্যার্টেল্সমান ফাউন্ডেশনের অপর এক গবেষণা প্রতিবেদনে বিশ্বের নতুন পাঁচটি ‘স্বৈরতান্ত্রিক দেশের’ তালিকায় বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। বিশ্বের ১২৯টি উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে গবেষণা করে প্রতিষ্ঠানটি ৫৮টি দেশকে স্বৈরতন্ত্রের অধীন এবং ৭১টি দেশকে গণতান্ত্রিক বলে উল্লেখ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, এবার ‘ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্স ২০১৮’ সূচকে নিচে নেমে যাওয়া ১৩টি দেশের মধ্যে ৫টি দেশ আর গণতন্ত্রের ন্যূনতম বৈশিষ্ট্যও ধারণ করে না। এগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ, লেবানন, মোজাম্বিক, নিকারাগুয়া ও উগান্ডা। এই পাঁচটি দেশে গণতান্ত্রিক চর্চা বছরের পর বছর ধরে উপেক্ষিত হয়েছে। ফলে দেশগুলোতে এখন স্বৈরতান্ত্রিক শাসন চলছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন ব্যবস্থা এই পরিস্থিতি তৈরির একটি কারণ হিসেবেও উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। একটি দেশ গণতান্ত্রিক না স্বৈরতান্ত্রিক তা নির্ধারণে জার্মান অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটি ৫টি মূল বিষয় বিবেচনা করেছে। এগুলো হলো রাজনৈতিক ও সামাজিক সমন্বয়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রসুলভ বৈশিষ্ট্য। প্রসঙ্গত, ১২৯টি দেশের গণতন্ত্রের অবস্থা নিয়ে যে সূচক এই গবেষণার ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের অবস্থান ৮০ নম্বরে। একই অবস্থানে আছে রাশিয়া। আর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানের অবস্থান অবশ্য বাংলাদেশেরও নিচে, ৯৮ নম্বরে। মিয়ানমার ১০৪ নম্বরে। ভারতের অবস্থান বেশ উপরের দিকে, ২৪ নম্বরে। আর শ্রীলংকা ৪১ নম্বরে। ব্যার্টেল্সমান ফাউন্ডেশন ২০০৬ সাল থেকে এই ‘ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্স’ প্রকাশ করে আসছে।
দেশের রাজনীতি বিশ্লেষকরাও মনে করেন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি এবং ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশটি আর গণতান্ত্রিক ধারায় চলছে না। উল্লেখ্য, একমাত্র ভারত ছাড়া আর কোন দেশ উপরোক্ত দু’টি জাতীয় নির্বাচনকে স্বীকৃতি দেয়নি। ভারতের এই স্বীকৃতির কারণও দেশবাসীর অজানা নয়, ভারত এদেশে তাদের অনুগত সরকার চায়। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ তাদের সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। কিন্তু বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলো ভারতের সাথে মিত্রতার হাত বাড়ালেও তারা দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে বন্ধুত্ব চায় না। তারা মনে করেন, এমন মিত্রতা আসলে ভারতের প্রভুত্বকে মেনে নেয়া। যা একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের জন্য অপমানজনক। দেশ ও জনগণকে এই অপমান থেকে বাঁচিয়ে আত্মযর্মাদায় ফিরিয়ে নিতে জীবন দিতে সরকারের জুলুম নির্যাতনকে উপেক্ষা করে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা।

দেশ ও জনণের স্বার্থে আপসহীন
বর্তমান সরকারের চরম অত্যাচার নির্যাতনের স্টিমরোলারকে তুচ্ছ জ্ঞান করে দেশ ও জনগণের স্বার্থে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট নেতাকর্মীরা আপসহীন সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন। বিএনপির চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় কারাগারে আছেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে নির্বাসিত আছেন। জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জোট সরকারের সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লা, নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলী ফাঁসির মঞ্চে জীবন দিয়েছেন। কারাগারে আছেন নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও মাওলানা আবদুস সুবহান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুল ইসলামসহ ২০ দলীয় জোটের হাজারও নেতাকর্মী। এ ছাড়াও আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন, গুম হয়েছেন অসংখ্য নেতাকর্মী। এ প্রসঙ্গে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর থেকে এখন পর্যন্ত সারাদেশে গুম হওয়া মানুষের সংখ্যা ১ হাজার ২০৯ জন। গুমের শিকার পরিবারের সদস্যরা এখনও পথ চেয়ে বসে আছেন, ছোট্ট শিশুরা অপেক্ষা করছে, বাবা ফিরে আসবে সেই আশায়, সন্তানের দুশ্চিন্তায় অনেকের বাবা-মা দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। নিখোঁজ সুমনের মা চোখের পানি ফেলতে ফেলতে অন্ধ হয়ে গেছেন। গুমের শিকার প্রতিটি পরিবারের কান্না-আহাজারি আর প্রতীক্ষার দিবানিশি শেষ হচ্ছে না। বাংলাদেশে বর্তমানে গুমের ধারাবাহিকতা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, যা শুরু হয়েছিল ১৯৭২ থেকে ৭৫ সালে। গণতন্ত্রের অকাল প্রয়াণ ঘটানোর জন্যই গুমের মতো অমানবিক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে ক্ষমতাসীনরা। গণতন্ত্র হত্যায় রাষ্ট্রের এই নিষ্ঠুর চেহারা দেখে জনগণ শোক জানাতেও ভয় পাচ্ছে। গুম একটি ভয়ঙ্কর মানবতাবিরোধী অপরাধ।’
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘বর্তমান সরকার জনগণের নির্বাচিত নয়। কাজেই দেশের জনগণের প্রতি তাদের কোন দায়বদ্ধতা নেই। জনগণের সুখ-শান্তির কথা সরকার মোটেই ভাবে না। সরকার লুটপাট ও গদি রক্ষায় ব্যস্ত। বর্তমান গণবিরোধী সরকার জনগণের দুর্ভোগ বাড়িয়ে নিজেরা গায়ের জোরে অন্যায়ভাবে ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকতে চায়। এই সরকার দেশ পরিচালনায় সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। এই ব্যর্থ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়ার জন্য তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।’

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া স্বাধীনতার লক্ষ্য পূরণ হবে না
রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ। সরকার মানে জনগণের শাসক নন তারা সেবক। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনে ভোট দিয়ে জনগণ রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সরকার নির্বাচিত করেন। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তারা দায়িত্ব পান। নির্বাচিত হওয়ার পর জনগণের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হলে সরকারের পদত্যাগ চাওয়ার অধিকার জনগণের আছে। দক্ষতার সাথে জনগণের সেবা করার পর মেয়াদ হলে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের ব্যবস্থা করারও সরকারের দায়িত্ব। এক্ষেত্রে ব্যর্থতার বিচারের ব্যবস্থাও সভ্য দুনিয়ায় আছে।
১৯৭১ সালে এদেশের মুক্তিকামী মানুষ অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন কেন, সে ইতিহাস কারো অজানা নয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে শক্তির জোরে ক্ষমতা দখলে রাখার ষড়যন্ত্র শুরু করেছিল। তাদের এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেই এদেশের মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। গণতন্ত্র আর জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার জীবনের অনেক মূল্যবান বসন্ত কাটিয়েছেন কারাগারের অন্ধকারে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও আন্দোলন করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার রাজনৈতিক জীবনে ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাভোগ করেছেন। এর মধ্যে স্কুলের ছাত্র অবস্থায় ব্রিটিশ আমলে সাত দিন কারাভোগ করেন। বাকি ৪ হাজার ৬৭৫ দিন তিনি কারাভোগ করেন পাকিস্তান সরকারের আমলে। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলার পরিকল্পনা করেছিলেন বলে তাঁর একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহচর তোফায়েল আহমেদ উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের ১৪টি বছর কারাগারে ছিলেন। তিনি ১৯৩৮ সালে প্রথম কারাগারে যান। এরপর ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত তিনি পাঁচ দিন কারাগারে ছিলেন। একই বছর ১১ সেপ্টেম্বর আটক হয়ে মুক্তি পান ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি। এ দফায় তিনি ১৩২ দিন কারাভোগ করেন। এরপর ১৯৪৯ সালের ১৯ এপ্রিল আবারও কারাগারে গিয়ে ৮০ দিন কারাভোগ করে মুক্তি পান ২৮ জুন। ওই দফায় তিনি ২৭ দিন কারাভোগ করেন। একই বছরের ২৫ অক্টোবর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৩ দিন এবং ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯৫২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি টানা ৭৮৭ দিন কারাগারে ছিলেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পরও বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে যেতে হয় বলে তোফায়েল আহমেদ জানান। তিনি বলেন, সে সময়ে বঙ্গবন্ধু ২০৬ দিন কারাভোগ করেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারির পর বঙ্গবন্ধু ১১ অক্টোবর গ্রেফতার হন। এ সময়ে টানা ১ হাজার ১৫৩ দিন তাঁকে কারাগারে কাটাতে হয়। এরপর ১৯৬২ সালের ৬ জানুয়ারি আবারও গ্রেপ্তার হয়ে মুক্তি পান ওই বছরের ১৮ জুন। এ দফায় তিনি কারাভোগ করেন ১৫৮ দিন। এরপর ’৬৪ ও ’৬৫ সালে বিভিন্ন মেয়াদে তিনি ৬৬৫ দিন কারাগারে ছিলেন। ছয় দফা দেওয়ার পর জাতির পিতা যেখানে সমাবেশ করতে গেছেন, সেখানেই গ্রেপ্তার হয়েছেন। ওই সময়ে তিনি ৩২টি জনসভা করে বিভিন্ন মেয়াদে ৯০ দিন কারাভোগ করেন। এরপর ৬৬ সালের ৮ মে আবারও গ্রেফতার হয়ে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুক্তি পান। এ সময় তিনি ১ হাজার ২১ দিন কারাগারে ছিলেন।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই পাকিস্তান সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে। এ দফায় তিনি কারাগারে ছিলেন ২৮৮ দিন। (সূত্র : প্রথম আলো, ৭ মার্চ ২০১৭)। অথচ আজ তাঁরই আদর্শের সৈনিক বলে দাবিদাররা গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার হরণকারী হিসেবে জনগণের কাঠগড়ার আসামি। এ প্রসঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রবীণ রাজনীতিবিদ এবং আওয়ামী লীগের মিত্র হিসেবে পরিচিত গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ব্যাপারে বলেন, ‘যারা নিজের ভাগ্য তৈরি করতে জনগণকে দেশের মালিকানা ও ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে বঙ্গবন্ধুর ছবি ও নামের অপব্যবহার করছেন তারাই সবচেয়ে বড় অপরাধী। তারা লুট-পাটের রাজত্ব কায়েম করেছে।’ ড. রওনক জাহান মনে করেন, ‘সরকার গঠন বিভিন্নভাবে হতে পারে। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রক্রিয়া একই রকম। গণতন্ত্রের কয়েকটি মৌলিক ভিত্তি আছে। তা সবখানেই একই রকম। প্রথমত সেখানে সামরিক শাসন নেই। জনপ্রতিনিধিরাই দেশ শাসন করছেন। নিরপেক্ষ নির্বাচনের মারফতে এসব জনপ্রতিনিধি বাছাই করা হয়। সেটা ওয়েস্ট মিনিস্টারই হোক আর আমেরিকাই হোক; স্বাধীন, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসতে হবে। দ্বিতীয়ত সবখানেই চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের একটা ব্যাপার আছে। যেমন প্রশাসন ও সংসদের মধ্যে একটা চেক অ্যান্ড ব্যালান্স থাকতে হবে। বিচার বিভাগ স্বাধীন হতে হবে। গণতন্ত্রের তৃতীয় মৌলিক ভিত হচ্ছে ব্যক্তিস্বাধীনতা। আইনের শাসন গণতন্ত্রের আরেকটি ভিত। গণতন্ত্র একেক দেশে একেক রকম বিষয়টি ঠিক সে রকম নয়। গণতন্ত্রের কিছু নীতি আছে। সব গণতান্ত্রিক দেশেই তা মেনে চলা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এর কোনো নিয়মই মেনে চলা হচ্ছে না।’

তবেই সংগ্রামী জনতার জোয়ার নামবে
জনগণ মুক্তি চায়। সরকারের অত্যাচার নির্যাতনে কোমাগ্রস্ত জনগণকে জাগাতে সকল গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ছোটখাটো মতপার্থক্য ভুলে দেশ ও জনগণের স্বার্থকে সবার ওপরে স্থান দিতে হবে। দেশের ভিতরের ও বাইরের আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলো শক্তিশালী ভূমিকা নেয়ার সাহস রাখে জনমনে এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। জনগণ দুঃসময়ের তিমির কাটিয়ে সোনালি সূর্য আনার সংগ্রামে শরিক হতে চায়। এ জন্যও চায় ঐক্যবদ্ধ শক্তিশালী নেতৃত্ব। বিরোধী দলগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসলে জনতার জোয়ার নামবে রাজপথে। যে জোয়ার সামাল দেয়ার শক্তি ও সাহস কোন আগ্রাসী লুটেরা শক্তির নেই।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সিনিয়র সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply