গণবিক্ষোভের সাঁড়াশি অভিযান প্রস্তুতি

সাদেক খান
পয়লা আগস্ট বাংলাদেশের হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ প্রজাতন্ত্রের সাংবিধানিক সংজ্ঞার খেলাফ তথা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রথম ভাগের সপ্তম অনুচ্ছেদের সাথে বৈষম্যের দায়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণার জন্য প্রার্থিত একটি রিট আবেদনের রায় ঘোষণা করেছে। বিভক্ত রায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ অভিমতের ভিত্তিতে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধনকে অবৈধ সাব্যস্ত করা হয়েছে। উচ্চ আদালত এখন দীর্ঘ অবকাশে। ছুটির মধ্যে চেম্বার জজের কাছে জামায়াতে ইসলামী দলের পক্ষ থেকে ওই রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ জারির প্রার্থনা করলে জজ সাহেব ওই দিনের কাজের সময় পার হয়ে গেছে বলে কোনো আদেশ দেননি, তথা তাৎক্ষণিক স্থগিতাদেশ জারি হয়নি। তবে তিনি স্থগিতাদেশ চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদনের অনুমতি দেন বলে দাবি করেন জামায়াতে ইসলামি দলের আইনজীবীরা। তদনুযায়ী উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় রায়ের স্থগিতাদেশ চেয়ে মামলা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট খুললে প্রথমে স্থগিতাদেশ জারির আবেদন, তারপর রায় বাতিলের আপিল শুনানি হবে বলে জানান বিবাদি পক্ষের আইনজীবীরা। এক কথায়, বিষয়টা ঝুলে রইল।
সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন দানের নির্বাহী ও বিচারিক উভয় ক্ষমতার অধিকারী যে নির্বাচন কমিশন, এই রায়ে তার সরল প্রতিক্রিয়া: ‘রায় দেখে ব্যবস্থা নেবে ইসি।’ রায়ের পর সিইসি বা প্রধান নির্বাচন কমিশনার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আদালতের রায়ে কী বলা আছে, তা আমরা এখনো জানি না। তাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, না কি নিবন্ধন বাতিলের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, তা রায়ের কপি পর্যালোচনা করে বলা যাবে। আদালতের আদেশ অনুযায়ী রায়ের কপি হাতে পেলে কমিশন দ্রুত অ্যাকশন নেবে। তারপরই বোঝা যাবে দলটি আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে কি পারবে না। নিবন্ধন বাতিল হলে জামায়াত দলগতভাবে আর নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। তবে ব্যক্তিগতভাবে স্বতন্ত্র প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া যাবে। নিবন্ধন বাতিল হলে আবারো নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে পারবে কি না, সিদ্ধান্ত নেয়ার পর এ বিষয়ে বলা যাবে।’
জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্র জাতিরাষ্ট্রের সংবিধানের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে ওই দলের নিবন্ধনে সংক্ষুব্ধ বাদি নির্বাচন কমিশনেই নিবন্ধন বাতিল চেয়ে আবেদন করলেন না কেন এবং কেনোই বা হাইকোর্ট নির্বাচন কমিশনে বাদির প্রার্থিত প্রতিকারের বিচারিক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও একলাফে উচ্চ আদালতে নিম্নতর প্রশাসনিক বা বিচারিকপ্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই বাদির নৈর্ব্যক্তিক অভিযোগ সরাসরি বিচারের জন্য গৃহীত হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই রায় প্রসঙ্গে এক বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন। তাই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি বহুমাত্রিক বহুদলীয় গণতন্ত্রের একনিষ্ঠ অনুসারী। রাষ্ট্রীয় সংবিধানেও বহুদলীয় গণতন্ত্রের বিধান স্বীকৃত।’ রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিল আইনিপ্রক্রিয়া বা আদালত কর্তৃক নির্ধারিত হওয়া সঙ্গত নয় বলে মনে করে বিএনপি।
‘রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও সংবিধানবর্ণিত বিধানকে মান্যকারী রাজনৈতিক সংগঠনের অস্তিত্ব নির্ভর করে জনগণের ইচ্ছার ওপর। রাষ্ট্রীয় সংবিধানের প্রতি সম্মান প্রদর্শনকারী যেকোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও রাজনৈতিক অভিমত ব্যক্ত করতে পারে। সরকারি নীলনকশায় রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডকে সীমিত বা রদ করা বাকশালী অপশাসনের দিকেই এগিয়ে যাওয়া। সরকারের এই অশুভ পরিকল্পনা সংবিধানের মৌলিক মানবাধিকার পরিপন্থী।’
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদের তরফে প্রচারিত এক সংবাদবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘সরকার রাজনৈতিকভাবে জামায়াতকে মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়ে উচ্চ আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূলে উঠে পড়ে লেগেছে। তারা নিজেরাই আইন সংশোধন করে যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দিচ্ছে যাতে তারা নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন। সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার ও মানবধিকার লঙ্ঘন করে ট্রাইব্যুনালের রায়কে ভিত্তি ধরে এখন হাইকোর্টকেও ব্যবহার করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এক দিকে সরকার যেমন গণতন্ত্রকে ধ্বংস করছে তেমনি উচ্চ আদালতকেও বিতর্কিত ও জনগণের শেষ আশ্রয়স্থলও ধ্বংসের অপচেষ্টায় নেমেছে। আমরা সরকারের এমন গণতন্ত্র ও দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র বন্ধ করে সবার গণতান্ত্রিক ও মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। সেই সাথে কোনো মহলই যেন আদালতকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে সেজন্য সংশ্লিষ্ট সব মহলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’
রায় প্রসঙ্গে বিশিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, রায়ে হাইকোর্টের তিনজন বিচারপতি একমত হতে পারেননি। সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বিভক্ত এই রায় দেয়া হয়েছে। সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই রায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি আপিলের সুযোগ দেয়া হয়েছে, যে কারণে মামলাটি এখনো বিচারাধীন। আপিল বিভাগে এ মামলা চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি না হওয়ার আগে এই রায়ের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না, এটাই রায়ের কার্যকরী ফলাফল। এ ছাড়া সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জামায়াতে ইসলামী দল হিসেবে সভা-সমাবেশসহ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবে।
একটি ‘নতুন ধারার’ সস্তা দৈনিকে সংবাদভাষ্যে বলা হয়েছে : ‘সরকার চলে ডালে ডালে, জামায়াত পাতায় পাতায়। হাইকোর্ট জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন। ইসি বলেছে, রায়ের কপি হাতে পেলেই ব্যবস্থা। এ অবস্থায় জামায়াত নিষিদ্ধ হওয়া সময়ের ব্যাপারমাত্র। কিন্তু এতে মোটেও চিন্তিত নয় দলটির নেতাকর্মীরা। তবে আদালতের রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। ১২ ও ১৩ আগস্ট ডেকেছে লাগাতার ৪৮ ঘণ্টা হরতাল। অনুমান হরতালের উদ্দেশ্য নেতাকর্মীদের মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখা এবং মানুষের কাছে হরতালের আবেদন পর্যবেক্ষণ করা। এ ছাড়া সরকার ও সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপরও নজর রাখছে দলটির হাইকমান্ড। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে দলীয় সূত্র। হরতালের পর কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’
প্রকারান্তরে সরকার, যুদ্ধাপরাধী বিচারের ট্রাইব্যুনাল, হাইকোর্ট আর ক্ষমতাসীন জোটের একটা উগ্রবাদী অংশের মধ্যে নয়া বাকশালী নীলনকশার একটা যোগসাজশের অকপট ইঙ্গিত রয়েছে ওই সংবাদভাষ্যে। ইতঃপূর্বে ট্রাইব্যুনালের একটি রায়ে অভিযুক্তের অপরাধের মাত্রা বিচারের বাইরে গিয়ে এক রকম অযাচিতভাবেই মন্তব্য জুড়ে দেয়া হয়েছিল যে, জামায়াতে ইসলামী দল হিসেবেই একটা ‘অপরাধী চক্র’। তার ধারাবাহিকতায় হাইকোর্টের রায় প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের মন্তব্য : ‘জামায়াতের এ দেশে থাকার কোনো অধিকার নেই। সংবিধানের সাথে জামায়াতের নীতির সংঘর্ষ আছে বলেই তাদের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করেছেন আদালত। এখন জামায়াত এ দেশে রাজনীতি করার নৈতিক অধিকার হারিয়েছে।’ মহাজোটভুক্ত ১৪ দলীয় জোটে আওয়ামী লীগ প্রতিনিধি মোহাম্মদ নাসিমসহ উৎফুল্ল অন্যান্য বামনেতা সমস্বরে বলেছেন: এ রায় জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার প্রথম ধাপ। হাইকোর্টের দেয়া রায়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। যারা চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধী, নৈরাজ্যমূলক কাজ করছে, তাদের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষিত হওয়ায় জনগণ আনন্দিত। এ রায় সঠিক। এই রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, জামায়াতে ইসলামী একটি যুদ্ধাপরাধী, সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী দল। এই রায়ে জনপ্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেছে আর জামায়াত সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক অধিকার হারিয়েছে।
অবশ্য দুই দিন বাদে ৩ আগস্ট এক ব্যাখ্যায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ বলেছেন: ‘এই মুহূর্তে কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধের কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। জামায়াত শর্ত পূরণ না করার কারণে আদালত তাদের নিবন্ধনকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। তারা যদি নির্বাচন কমিশন ও আদালতের শর্ত পূরণ করতে পারে এবং নির্বাচন কমিশন ও আদালতকে বোঝাতে সক্ষম হয় তবে তারা আবারো নিবন্ধন ফিরে পেতে পারে।’ নির্বাচনে অংশগ্রহণ ছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও অবাধে জামায়াতে ইসলামী চালিয়ে যেতে পারবে বলে ব্যাখ্যা দেন সরকারের আইনপ্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম।
জামায়াতকে নিয়ে ক্ষমতাসীন মূল দলের নেতাদের এমন নরম-গরম কথাবার্তা ‘হেঁয়ালিপূর্ণ’ আর ‘রহস্যজনক’ বলে সাব্যস্ত করেছেন কোনো কোনো রাজনৈতিক ভাষ্যকার। বিশেষ করে শাহবাগি জাগরণ মঞ্চের উগ্র ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী নায়ক ও তাদের পৃষ্ঠপোষকেরা সংশয় ব্যক্ত করেছেন, সরকারপ্রধান তলে তলে জামায়াতের সাথে একটা গোপন রফায় উপনীত হওয়ার জন্য সচেষ্ট কি না, যাতে যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত জামায়াত নেতাদের দণ্ড দান স্থগিত রেখে এবং ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতির ক্ষমার প্রতিশ্র“তি দিয়ে জামায়াতকে প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচনানুষ্ঠানের ‘সক্রিয়’ বিরোধিতা থেকে বিরত রাখা যায়। তাহলে বিএনপিকে বাদ দিয়ে একটা ‘পাতানো’ নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে মনে করছেন এই থিওরির ঢাকিরা। তবে বাস্তববাদিতার দাবিদার অনেক ভাষ্যকার মনে করছেন, জামায়াত বনাম ১৪ দলীয় জোটের দীর্ঘকালের দ্বন্দ্বজনিত হিংসা-প্রতিহিংসা এখন যে চরমপর্যায়ে পৌঁছেছে, সেখান থেকে কোনো পক্ষই পিছু হটতে পারবে না। এই দ্বন্দ্ব আর প্রতিহিংসাই এ দেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটের প্রধান উপসর্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ দিকে সাধারণ মানুষের জন্য হরতালের আগেই, এমনকি ঈদের আগেই মাথাব্যথা আর আতঙ্কাবস্থা শুরু হয়ে গেছে। হাইকোর্টের রায়ের পরপরই রাজধানীসহ সারা দেশে যানবাহন ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, ককটেল বিস্ফোরণ ও মহাসড়ক অবরোধ করে দলটির নেতাকর্মীরা। কয়েকটি স্থানে পুলিশের সাথে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সারা দেশে ভাঙচুর করা হয়েছে অর্ধশতাধিক যানবাহন। নাশকতার অভিযোগে সারা দেশে গ্রেফতার করা হয়েছে ৩৫ জনকে। রায় প্রত্যাখ্যান করে ১২-১৩ আগস্ট লাগাতার হরতালের ডাক দিয়ে ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান এক বিবৃতিতে বলেন, ‘কোনো দলের নিবন্ধন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচন কমিশন জামায়াতের নিবন্ধনসংক্রান্ত কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার আগেই আদালত নিবন্ধন বাতিল করায় আমরা বিস্মিত। আমরা মনে করি এটা আইনের শাসন, গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার ও সংবিধানপরিপন্থী।’ ৩ আগস্ট জামায়াতের বিক্ষোভ দিবস একইভাবে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে।
অন্যান্য ইসলামপন্থী দল বলেছে, আদালতের এই রায় শুধু জামায়াতে ইসলামীকে অবৈধ ঘোষণার পাঁয়তারা নয়, সব ইসলামী দলকেই নিষিদ্ধ ঘোষণার প্রাথমিক পদক্ষেপ। যে অজুহাতে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে তাতে আপিল বিভাগে এই রায় বহাল থাকলে অন্য ইসলামি দলগুলোরও উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ রয়েছে। কারণ সব ইসলামি দলের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রায় অভিন্ন। আশা করি আপিল বিভাগ সেটা করবে না। এই রায় দেশের পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলবে। খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা জাফর উল্লাহ খান বলেন, জামায়াতের সাথে এ দেশের আলেম-ওলামাদের অনেক মতপার্থক্য থাকলেও জামায়াত একটি ইসলামি রাজনৈতিক দল এতে কোনো সন্দেহ নেই। ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে একটি ইসলামি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিল কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মূলত দেশে যাতে ইসলাম না থাকে সেই প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল চূড়ান্ত করতে পারলে তারা একই অজুহাতে অন্য সব দলের নিবন্ধনও বাতিল করবে। ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে কেউ ইসলাম তথা আল্লাহর সার্বভৌমত্বের কথা বলে রাজনীতি করতে পারবে নাÑ এটা এ দেশের জনগণ মেনে নেবে না। জামায়াত দেশে দীর্ঘ দিন রাজনীতি করে আসছে। সংসদে তারা প্রতিনিধিত্ব করে আসছে। এভাবে একটি দলের নিবন্ধন বাতিল করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যদি আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্বের কথা জামায়াতের সংবিধানে থাকার কারণে নিবন্ধন বাতিল করা হয়ে থাকে তবে সেটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। আল্লাহর সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস না থাকলে ঈমানই থাকবে না।
অন্য দিকে সৌদি আরবে ওমরাহ পালন করে সেখান থেকে টেলিকনফারেন্সে বাংলাদেশে হেফাজত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা আহম্মদ শফী ঘোষণা দিয়েছেন, ১৩ দফার আন্দোলন চলবেই। বলেছেন, কাউকে ক্ষমতা দেয়া বা ক্ষমতা থেকে নামানোর জন্য তাদের আন্দোলন নয়। তাদের আন্দোলন এ দেশে ইসলামের মর্যাদা ও বিধান রক্ষার জন্য। এ জন্যে ঈদের পরপরই ঘোষণা করা হবে আন্দোলনের কঠোর কর্মসূচি। দেশে উপস্থিত হেফাজত নেতারা বলেছেন, আল্লামা আহম্মদ শফী সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরার পরপরই চূড়ান্ত করা হবে সরকারবিরোধী আন্দোলনের কর্মসূচি। কৌশলগত কারণে এই মুহূর্তে তারা ১৮ দলীয় জোটের সাথে একাত্ম হয়ে কোনো কর্মসূচি দেবে না। তবে সব কিছু নির্ভর করবে পরিবর্তিত পরিস্থিতির ওপর।
সৌদি আরবে প্রবাসী বাংলাদেশীদের কাছে আল্লামা আহম্মদ শফী বর্তমান সরকারকে জালিম আখ্যায়িত করে বলেছেন, ‘এই সরকারের হাতে ইসলাম নিরাপদ নয়। ইসলাম এবং ঈমান আকিদা রক্ষার জন্যে তিনি প্রত্যেক ঈমানদার মুসলমানকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। ঢাকায় হেফাজত নেতারা সাংবাদিকদের কাছে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তারা যখন ১৩ দফা নিয়ে আন্দোলন শুরু করেন তখন প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। কাউকে ক্ষমতায় বসানো বা কাউকে ক্ষমতা থেকে সরানো তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। সম্প্রতি মিডিয়াগুলো তাদের হুজুরকে নিয়ে যে ‘ডিজিটাল’ অপপ্রচার চালাচ্ছে, আর সরকারের নেতৃস্থানীয়রা যেভাবে তাতে ইন্ধন জোগাচ্ছেন, তার ফলে হেফাজতকর্মীরা আর চুপ করে বসে থাকতে পারে না।
‘এ জন্য আমরা চাচ্ছি এর উপযুক্ত জবাব দিতে। সেই জবাবের ভাষা হবে সরকার পতনের আন্দোলন। এক দফা।’
পূর্ব ঘোষণা মোতাবেক সংসদীয় বিরোধী দলনেতা ও ১৮ দলীয় জোটনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও ঈদের পর থেকে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনানুষ্ঠানের দাবিতে সর্বাত্মক আন্দোলনের প্রস্তুতির নির্দেশ দিয়েছেন জোটের নেতাকর্মীদের প্রতি। এক কথায়, সরকারের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভের একটা সাঁড়াশি অভিযানের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। সরকারপ্রধান যেন জিদ করে বা ভুল করে নিজেই উসকে দিচ্ছেন বিভিন্ন সঙ্ঘশক্তির সম্মিলিত এসব ক্রোধানলের দাবদাহ। তার আঁচের জ্বালাপোড়া মহাজোটের দোদুল্যমান দুই নম্বর শরিক জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদেরও গায়ে লাগছে। ৩ আগস্ট চট্টগ্রামে দলীয় কর্মীদের ক্ষোভ আর সমালোচনার ধাক্কায় জাতীয় পার্টি প্রধান জাঁদরেল এরশাদও বলেছেন, ‘কোনো পাতানো নির্বাচনে অংশ নেবে না জাতীয় পার্টি। দেশবাসী একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়। আগামী নির্বাচন আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কি না, এ নিয়ে দেশবাসীর মনে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশন বিতর্কিত ও জনগণের আস্থা হারিয়েছে। আমি বারবার বলেছি, নির্বাচন কমিশনের শক্তিশালীকরণ চাই। কিন্তু সরকার আমাদের কথা শোনেনি। এ নির্বাচন কমিশন বিতর্কিত, অযোগ্য। এ নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো দলই নির্বাচনে অংশ নিতে সাহস করবে না।’
ইতিমধ্যে আরেকটা উসকানি। আপিল বিভাগের চেম্বার জজ ইতঃপূর্বে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর তরফে স্থগিতাদেশ প্রার্থনার আর্জি না শুনলেও অকস্মাৎ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে তার শুনানি করেছেন এবং স্থগিতাদেশ নামঞ্জুর করেছেন। জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা হাইকোর্টের রায় দেয়ার দিনই রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে একটি আবেদন করেছিলাম। ওই দিন চেম্বার বিচারপতি শোনেনি। এরপর আমরা আর আবেদন করিনি। ৫ আগস্ট সোমবার জানতে পেরেছি আমাদের আপিল তালিকায় এসেছে। আমরা এটা তালিকায় আনার কোনো আবেদন করিনি। নিয়ম অনুযায়ী যারা সিএমপি ফাইল করেন তারাই তালিকায় আনার জন্য আবেদন করেন। এ জন্য আমরা শুনানিতে আবেদনটি তালিকা থেকে বাদ দেয়ার অনুরোধ করেছি। আমরা বলেছি, সুপ্রিম কোর্টের অবকাশের কারণে আমাদের সিনিয়র আইনজীবী বাইরে রয়েছেন। এ কারণে আবেদনটি তালিকা থেকে বাদ দেয়া হোক। এ ছাড়া রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও আবেদনটি আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে পাঠানোর অনুরোধ জানান। কিন্তু আমাদের অনুরোধ নাকচ করে দিয়ে আবেদনটি খারিজ করে দেন আদালত।
‘হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় এখনো প্রকাশ করা হয়নি। হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর আমরা রেগুলার আপিল দায়ের করব। তখন আমরা হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে আবেদন করতে পারব। আমাদের সে সুযোগ থাকবে। একইভাবে রায় প্রকাশের পর নির্বাচন কমিশনও সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।’
ও দিকে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিলের ব্যাপারে ইসির মধ্যেই মতানৈক্য রয়েছে। যে কারণে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের কথা উঠেছে ঠিক একই কারণে নিবন্ধিত অন্য ইসলামি দলগুলোর নিবন্ধন বাতিল নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। তা ছাড়া জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল সহজ বিষয় নয়। তারা ইসির দেয়া চিঠি অনুযায়ী সাড়া দিয়ে অনেক কিছুই সংশোধন করেছে। আদালতের রায় না হলে তাদের নিবন্ধন বাতিলের প্রশ্ন ওঠে না।
এভাবে একের পর এক যে রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধির কারণ ঘটেই চলেছে, তার একই সুরের প্রতিক্রিয়া বিশ্বমাধ্যমেও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। বৈদেশিক মিডিয়া এক বাক্যে বলে চলেছে, অভ্যন্তরীণ সহিংসতা ও সংঘর্ষের এক কঠিন সময় অতিবাহিত করছে বাংলাদেশ; শান্তিপূর্ণ নির্বাচনানুষ্ঠানের সম্ভাবনা ক্ষীণ। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিও স্থবির হয়ে পড়ছে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে; সম্প্রতি বিপর্যয়ের সম্মুখীন এ দেশের তৈরী পোশাকশিল্প প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পুনর্গঠনের কাজে অগ্রসর হতে পারছে না।
ভারতীয় মিডিয়া এখনো সে দেশের সরকারকে পরামর্শ দিয়ে চলেছে, শেখ হাসিনা যাতে আরেক দফা বাংলাদেশে ক্ষমতায় বহাল থাকতে পারেন সে জন্য দ্বি-পক্ষীয় সমস্যাগুলোর সমাধানের কিছু দর্শনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে। কিন্তু দিল্লি সে দিকে তেমন মনোযোগ দিচ্ছে না বা দিতে পারছে না। শুধু বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের পক্ষে এ দেশে এবং বিদেশে প্রচার, লবি ও গোয়েন্দা সমর্থন দিয়ে চলেছে।
ভারতীয় মিডিয়ার কোনো কোনো অংশ বাংলাদেশ সরকারকেও কিছু সদুপদেশ দিয়ে চলেছে। যেমন ৩ আগস্ট কলকাতার জনপ্রিয় আনন্দবাজার পত্রিকা তার সম্পাদকীয় কলামে লিখেছে: ‘বাংলাদেশের ধর্মাশ্রিত রাজনৈতিক দল জামাতে ইসলামির ভোটে দাঁড়াইবার অধিকার কাড়িয়া লইল ঢাকা হাইকোর্ট। এই দলের শীর্ষ নেতাদের প্রায় সকলেই মুক্তিযুদ্ধের সময় (হুকুমের আসামী হিসাবে) গণহত্যা ও গণধর্ষণে জড়িত থাকার দায়ে হয় মৃত্যুদণ্ড নতুবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত। দলের নবতীপর সর্বাধিনায়ক গোলাম আযম তো নব্বই বছরের কারাদণ্ড পাইয়াছেন। এখন আবার ঢাকা হাইকোর্ট ওই দলের ভোটে লড়িবার অধিকারও রদ করিয়া দিল। পরবর্তী পদক্ষেপ সম্ভবত জামাতে ইসলামিকে নিষিদ্ধ করা। এই মর্মে ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের নানা মহল হইতে দাবি উঠিয়াছে।
বর্তমানে দেশের প্রধান বিরোধী দল বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি এই জামাতপন্থীদের সহযোগী। এই দুই দল কেবল একসঙ্গে নির্বাচনই লড়ে নাই, বেগম জিয়া যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী, তখন জামাতিরা তাঁহার সরকারে একাধিক মন্ত্রিত্বও হাসিল করিয়াছেন। বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অদূরেই, সেই পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি’র সহিত জামাতের সম্পর্ক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই দল নির্বাচনে যোগ দিতে না পারিলে বা নিষিদ্ধ হইলে বিএনপি’র ভোট-বাক্সে তাহার প্রভাব পড়িবার সম্ভাবনা প্রবল। সেই প্রভাব দেশের ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির অনুকূল হইবে বলিয়া মনে হয় না। এই সূত্রেই একটি মৌলিক প্রশ্ন ওঠে। কোনও রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের মত পছন্দ না করিলে বা তাহাকে অন্যায় মনে করিলে নিষেধাজ্ঞাই কি যথাযথ উপায়? ইতিহাসের সাক্ষ্য ইহার বিপরীত। দমন-পীড়ন, নিষেধাজ্ঞা রাজনৈতিক দলকে আত্মগোপন করিতে বাধ্য করে বটে, কিন্তু নিষিদ্ধ দলের নেতা-কর্মীরা জনসাধারণের চোখে বীরের কিংবা নিহত হইলে শহিদের মর্যাদা পান। তাহাতে তাঁহাদের জনপ্রিয়তা, প্রাসঙ্গিকতা আরও বৃদ্ধি পায়। গোপনে, লোকচক্ষুর অন্তরালে, সরকারি নজরদারি ও প্রহরা এড়াইয়া নিষিদ্ধ দলটি সমাজে দ্রুত বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করিতে থাকে। দেশে দেশে বিপ্লবী কিংবা মৌলবাদী ধর্মীয় সংগঠনগুলি এ ভাবেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করিয়া শাসকদের ঘুম কাড়িয়া লইয়াছে। বাংলাদেশে জামাতে ইসলামিকে নিষিদ্ধ করিলেও তাহার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়াইয়া দেওয়া হইবে। জামাতে ইসলামির মতামত বা ক্রিয়াকলাপের মোকাবিলা যদি করিতে হয়, তবে গণতান্ত্রিক পথেই তাহা করণীয়, সে জন্য তাহাকে প্রকাশ্যে রাজনীতি করিতে দেওয়া উচিত। সে ক্ষেত্রে জামাতপন্থীদের তত্ত্ব, মতাদর্শ ও নীতি-কর্মসূচির সহিত ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির প্রকাশ্য বিতর্ক ও আলোচনার সুযোগ থাকিবে। এ ধরনের তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনা গণতন্ত্রের প্রাণস্বরূপ। ইহার সুযোগ বন্ধ হইয়া গেলে সব দিক দিয়াই স্বৈরতন্ত্র মাথা চাড়া দিতে পারে।’
কিন্তু ঈদের পর থেকেই সরকার পতনের (কিংবা বিরোধী শক্তিগুলোর দাবির কাছে আংশিকভাবে হলেও নতিস্বীকারে সরকারকে বাধ্য করার) যে সাঁড়াশি অভিযান ইতোমধ্যেই গতিবেগ সঞ্চয় করতে শুরু করেছে, সেটা রোধ করে মোড় ঘোরানোর প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক মনোবল অন্তর্দ্বন্দ্বকাতর সরকারপক্ষ বজায় রাখতে পারবে কি?
লেখক : প্রবীণ সাংবাদিক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply