গণমাধ্যমের শেকড়ে তারুণ্যের নির্যাস -মুজাহিদুল ইসলাম

মনে পড়ে? ঠিক কবে টেলিভিশনের পর্দায় বয়সের ছাপ পড়া সাংবাদিকের সংবাদ পরিবেশনা দেখেছেন? খানিক সময়ের জন্য চোখ বন্ধ করুন। এরপর একটার পর একটা চ্যানেল ঘোরাতে থাকুন। দেখবেন নিউজ চ্যানেলসহ প্রায় সব চ্যানেলে তরুণরাই সংবাদপাঠ, প্রতিবেদন তৈরি ও সরাসরি সম্প্রচারে আপনার চোখের সামনে এসে হাজির হয়েছে। বয়স ৫০ এর ঘরের দিকে এগোলেই সাংবাদিক হয়েও মনের মধ্যে তৈরি হয় অতিমাত্রায় বিবেচনাবোধ। বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রতি টান, অফিস পলিসি, নানান লাভ-ক্ষতির হিসাব কষতে গিয়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয় সমাজ। যা ঘটে যাচ্ছে ঘটনার অন্তরালে, একমাত্র তরুণরাই পারে তা সবচেয়ে কম সময়ে নির্লোভ হয়ে কাক্সিক্ষত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে। দেশে চব্বিশটি টিভি চ্যানেল, শত শত প্রিন্ট মিডিয়া আর অগণিত অনলাইন গণমাধ্যমের প্রাণশক্তি হলো তারুণ্য। বদলে যাচ্ছে সমাজ, ক্রমাগত পরিবর্তন হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ধরন। নিজের সমাজকে বদলে দেশকে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে সঠিকভাবে উপস্থাপনের শক্তি আছে একমাত্র তরুণদেরই।
আপনি সাংবাদিকতা নিয়ে পড়েননি। সাংবাদিকতার ওপরে বিশেষ কোনো প্রশিক্ষণও নেই। ভাবছেন আগের ও পরের কথাগুলো আপনার জন্য নয়। তাই আপনাকেই বলছি, এখনও গণমাধ্যমে সাংবাদিকতার প্রথম সারির অধিকাংশের সাংবাদিকতার ওপর পড়াশোনা বা বিশেষ কোন প্রশিক্ষণ নেই। সাংবাদিকতাকে দেখতে, বুঝতে ও ভালোবাসতে গিয়ে অজান্তেই হয়ে গেছেন কর্ণধার। তবে অবশ্যই এর সাথে ছিল তাদের কঠোর পরিশ্রম, সততা আর মনের মধ্যে নির্ভেজাল স্বপ্নের লালন। মেলামেশার যোগ্যতা, ভাষার শুদ্ধতা আর বাক্যগঠনের খানিকটা কৌশল জানা থাকলে এ পথ আপনারই জন্য। যদিও বাক্যগঠনের কৌশলটা খুব ভালোভাবে আমাদের শেখাচ্ছে ফেসবুক। একটা কথা মনে রাখা দরকার, ভাষার শুদ্ধতা আর যোগাযোগের সবটুকু যোগ্যতা অর্জন করেই সবাই গণমাধ্যমে আসেন না। বরং আসার পরেই একটু একটু করে পৌঁছায় শুদ্ধতার শিখরে। আজ মানববন্ধন, কাল মন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন, পরশু আগুনের লাইভ, তার পরের দিন দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি। এভাবেই প্রতিদিন নতুন নতুন তথ্যে সমৃদ্ধ হয় জীবন আর বাড়তে থাকে জানার ক্ষুধা। নিয়মিত নিজ হাতে লাখো মানুষের সুখ দুঃখ, সফলতা ব্যর্থতার ইতিহাস নির্মাণ করতে যেয়ে সাংবাদিকরা হয়ে যান ইতিহাসের সাক্ষী। সাথে সাথে মোবাইল ও ফেসবুক পাতায় ধীরে ধীরে জায়গা হয় সমাজ বিনির্মাণে অংশ নেয়া সামনের ও পেছনের কারিগরদের নাম। সত্যিই তখন সমাজটাকে খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করা যায়। নিজ চর্মচক্ষু দিয়ে দেখা যায়, সত্যিকার অর্থে কারা নিরলসভাবে প্রিয় মাতৃভূমিকে সামনের দিকে টানছেন। আর কারাইবা ছদ্মবেশে আমাদের সোনার বাংলাকে ক্রমাগতভাবে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন অন্ধকারের ছন্দহীন গলিতে। এভাবেই একদিন সত্যিকার সাংবাদিকতায় নাম লেখার এক মানসেই মন বুঝে যায় কত উচ্চতায় তখন মনের বসবাস।
বিসিএস ক্যাডার থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের কর্মক্ষেত্রে কর্মরতদের পৃথিবীটা একটা নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ। আর একজন সাংবাদিকের জন্য প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে দেশ ও দেশের বাইরের সবগুলো দরজা উন্মুক্ত। তাই হাসতে হাসতে আমার এক সহকর্মী বলেছিল, ক্ষমতাবান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বন্দুকের দিকে জনসাধারণ যতবার তাকায় তার চেয়েও বেশি দৃষ্টি দেয় টিভি সাংবাদিকের বুম অর্থাৎ মাইক্রোফোনের দিকে। ঘুরে ফিরে সাংবাদিকদের নিয়ে একটি কথা শোনা যায়, তাদের রাত নেই দিন নেই। নেই ঘুম নেই অবসর। সত্যি বলতে কি, গণমাধ্যমকর্মীর ব্যস্ততাটুকু সবার চোখে খুব দৃশ্যমান। অথচ আমাদের চারপাশে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাংকার, শিক্ষকরা একঘেয়ে কাজ করতে করতে মরে গেলেও সে দিকটা কারো খেয়ালে নেই। প্রতি মাসেই কতগুলো দিন কাজ না পেয়ে বিরক্তের ঘণ্টা কাটিয়ে বাসায় ফিরতে হয় তার কষ্ট কেবল সাংবাদিকেরই জানা।
সততা, মানবতাবোধ ও দেশপ্রেমের মানসিকতা নিয়ে খবরের ফেরিওয়ালা হবার আহ্বান রইল তরুণদের প্রতি। শুধু সমাজ ও দেশ নয়, গণমাধ্যমের গৎবাঁধা সংজ্ঞা বদলে সত্যিকারের গণমানুষের মাধ্যম বানানোর কারিগর হতে পারে কেবল তরুণরাই। আবারও বলছি, আমার এ লেখা তরুণদের জোর করে সাংবাদিকতা গেলানোর জন্য নয়। তরুণরা নিজেকে ব্যস্ত রাখুক এমন এক পেশায়, যার ব্যাপ্তি কখনোই যেন সীমাবদ্ধ না হয়ে যায় নির্দিষ্ট কোন সমাজ, গোষ্ঠী বা মানুষের কাছে।
লেখক : শিল্পী ও সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply