গরিবের জন্য সুখবর -অধ্যাপক মুজিবুর রহমান

ইন্নাল হামদা লিল্লাহ আসসালাতু আসসালামু আলা রাসূলিল্লাহ ওয়া আলা আলিহি ওয়া আসহাবিহি আজমাইন।

মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ধনী হতে চায়। কোন মানুষ গরিব থাকতে চায় না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মানুষকে পরীক্ষার জন্য ধনীও করেন গরিবও করেন। আখেরাতে ধনী মানুষের চাইতে গরিব মানুষ বেশি জান্নাতে প্রবেশ করবে। হাদিসে যেমনটি বলা হয়েছে, গরিব লোক ধনী লোকের ৫০০ বছর আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। গরিব লোকেরা দুনিয়ায় অল্প কয়দিন কষ্ট পেলেও এর পরিণামে তাদের গুনাহ মাফ হয়ে যাবে এবং তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে কিন্তু বেশির ভাগ ধনী লোকেরা তাদের মালের হিসাব দিতে দিতে আটকে যাবে। সে জন্য আখেরাতে অনেক ধনী লোক আফসোস করে বলবে আল্লাহ যদি আমাকে দুনিয়ায় ধনী না করে গরিব করতেন, সুখী না রেখে দুঃখী করতেন, ক্যাঁচি দ্বারা শরীরের চামড়া কেটে নিতেন- তাহলে কষ্টের কারণে আমার গুনাহ মাফ হয়ে যেত এবং আমার হিসাব লাগতো না। হিসাব ছাড়াই জান্নাতে যাওয়া সহজ হয়ে যেত। রাসূল সা. বলেন, মাল সম্পদ যার বেশি আছে সে ব্যক্তি ধনী নয় বরং প্রকৃত ধনী হচ্ছে সেই যার নাফস (আত্মা) ধনী। ধনী লোকেরাই আসল অভাবী-তাদের একটা অভাব পূরণ হলে একাধিক অভাবের জন্ম হয়।
২০২১ সালে নতুন বছরে গরিব লোকদের শুভকামনা করে তাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং রাসূল সা.-এর পক্ষ থেকে যে শুভসংবাদ দেওয়া হয়েছে আজকে সেই বিষয় নিয়ে আলোচনা। আলোচনার বিষয় হলো গরিব মানুষ। গরিব মানুষের জন্য কী সুখবর আছে? ধনীদের জন্য বিপদের খবর প্রচুর আছে। ধনীরা যে সব বিপদে পড়ে গরিবদেরকে এসব বিপদ স্পর্শই করতে পারবে না। কয়েকটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে বলে আশা করা যায়।

কয়েকটা উদাহরণ
১. সফরে যাবার সময় লাগেজ (ব্যাগ, পোটলাপুঁটলি) বেশি থাকে, একা বহন করা যায় না। তার জন্য কুলি বা সাহায্যকারী দরকার হয়। কোথাও অন্য কোন সাহায্যকারী না পেলে হয় তার গাড়ি ফেল হয়। নয় লাগেজ ফেলেই মনের যন্ত্রণা নিয়ে চলে যেতে হয়। কিন্তু যে গরিব যার তেমন কোন সম্পদ নেই, পোটলাপুঁটলি নেই, অত্যন্ত আরামের সাথে চলতে থাকে- ছোট একটা ব্যাগ হাতে নিলেই হয়ে যায়, যাতে একটা রুটি, এক বোতল পানি ও একটা চাদর থাকে।
২. হিসাব দেয়ার যত ঝামেলা সব ধনী লোকদের, গরিব লোকের হিসাব দেয়ার মত তেমন কোন সম্পদ থাকে না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন, “যেদিন তোমাদের (পৃথিবীর সব) নিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সূরা তাকাসুর ৮)
৩. ধনী লোকের চোর ডাকাতের ভয় থাকে। গরিব লোকের এ ব্যাপারে কোন ভয় নেই। ধনী লোকেরা ঠিকমত বাসায় ঘুমাতে পারে না। অথবা এসব চিন্তায় ঘুম আসে না।
৪. ধনী লোকের তৃপ্তি নেই। একটা পূরণ হলে অন্য একটা চাহিদা বাড়তেই থাকে। অতৃপ্তির কামনার আগুনে সব সময় জ্বলতে থাকে। গরিব লোকের অল্পেই তৃপ্তি। (আলগিনা গিনান্নাফস) মনের তৃপ্তিই আসল তৃপ্তি। (হাদিস)
৫. ধনী লোকেরাই বেশি খেয়ে বেশি অসুস্থ হয়। হাসপাতাল গুলোতে ধনী রোগীর সংখ্যাই বেশি। গরিব রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম।

ইয়াতিম, মিসকিনদের মর্যাদা
১. রাসূল সা. বলেন, আমি ও ইয়াতিমের তত্ত্বাবধায়ক জান্নাতে এভাবে থাকব (এ কথা বলে) তিনি নিজের তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল দিয়ে ইঙ্গিত করলেন এবং আঙুল দু’টার মাঝে ফাঁক করলেন। (বুখারি- সাহল ইবনে সাদরা)
২. রাসূল সা. বলেন, বিধবা ও মিসকিনদের (উপকারের) জন্য চেষ্টা তদবিরকারী আল্লাহর পথে জিহাদকারীর সমতুল্য। (বর্ণনাকারী বলেন) আমার ধারণা তিনি এ কথাও বলেছেন। সে নিরলস নামাজ আদায়কারী ও অবিরত রোযাদার ব্যক্তির সমতুল্য। (বুখারি, মুসলিম, আবু হুরায়রা রা.)
৩. রাসূল সা. বলেন, সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট খানা হল সে অলিমার খানা যাতে ধনীদের দাওয়াত দেয়া হয়, আর গরিবদের পরিত্যাগ করা হয়। (বুখারি, মুসলিম- আবু হুরায়রা রা.)
৪. আয়েশা রা. বলেন, এক দরিদ্র মহিলা তার দু’টি কন্যাসন্তানসহ আমার নিকট এলো। আমি তাদেরকে তিনটি খেজুর খেতে দিলাম। সে তার মেয়ে দুটোকে একটা করে খেজুর দিলো এবং একটি খেজুর নিজে খাবার জন্য তার মুখের দিকে তুলল। অতঃপর এ খেজুরটিও তার মেয়েরা খেতে চাইল। যে খেজুরটি সে নিজে খাবার ইচ্ছা করে ছিল তাও দু’ভাগ করে তার মেয়ে দু’টিকে দিয়ে দিল। ব্যাপারটি আমাকে অবাক করল। সে যা করল আমি তা রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে আলোচনা করলে তিনি বললেন, এর বিনিময়ে মহান আল্লাহ তার জন্য জান্নাত নির্ধারণ করে দিয়েছেন বা এর বিনিময়ে তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়েছেন। (মুসলিম)
৫. রাসূল সা. বলেন, হে আল্লাহ আমি দুই দুর্বল অর্থাৎ ইয়াতিম ও নারীর অধিকার যে ব্যক্তি বিনষ্ট করে আমি সে ব্যক্তির জন্য অন্যায় ও গুনাহ নির্দিষ্ট করে দিলাম। (নাসাঈ- আবু সুরাইহ খুয়াইলিদ রা.)
৬. রাসূল সা. বলেন, তোমরা কেবল তোমাদের দুর্বলদের কারণেই সাহায্য প্রাপ্ত হও। (বুখারি- মুসআব ইবনে সা’দ রা.)
৭. রাসূল সা. বলেন, তোমরা আমাকে নিঃস্ব দুর্বলদের মধ্যে অন্বেষণ কর। কারণ তোমরা তোমাদের দুর্বলদের কারণেই সাহায্য ও রিজিক প্রাপ্ত হও। (আবু দাউদ- আবু দারদা রা.)
৮. রাসূল সা. দোয়া করতেন- আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা ফি’লাল খাইরাতে অতারকাল মুনকারাতি অহুব্বাল মাসাকিন- হে আল্লাহ আমি তোমার কাছে ভালো কাজ করার, মন্দ কাজ থেকে দূরে থাকার ও মিসকিনদেরকে ভালোবাসার জন্য সাহায্য চাই।

ক্ষুধার্ত ও অভাবীদের মর্যাদা
রাসূল সা. সাহাবায়ে কিরামকে নিয়ে নামাজ আদায় করতেন। তাঁর পিছনে দাঁড়ানো কিছু লোক ক্ষুধার তাড়নায় মাটিতে ঢলে পড়ে যেতেন। আর তারা আসহাবে সুফ্ফার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। বেদুইনরা তাদের পাগল বলে আখ্যায়িত করত। নামাজ শেষ করে তাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, ‘তোমরা যদি জানতে যে আল্লাহর নিকট ক্ষুধা ও অভাব এর জন্য তোমাদের কী মর্যাদা ও সামগ্রী মওজুদ আছে তবে তোমরা আরো বেশি ক্ষুধার্ত ও অভাবী হওয়া পছন্দ করতে। (তিরমিজি)

ঝাড়–দারের সম্মান
এক কালো মহিলা অথবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) এক যুবক মসজিদে নববীতে ঝাড়ু দিতো। রাসূল সা. তাকে দেখতে না পেয়ে তার সম্পর্কে (সাহাবায়ে কেরামকে) জিজ্ঞেস করেন। তারা বলেন- সে মারা গেছে। তিনি বললেন- তোমরা আমাকে জানাওনি কেন? (সম্ভবত তারা এটাকে তুচ্ছ ব্যাপার মনে করেছিলেন)। তিনি বললেন, তোমরা আমাকে তার কবর দেখিয়ে দাও। অতঃপর তারা তাকে তার কবর দেখিয়ে দিলেন। তিনি তার ওপর জানাজার নামাজ পড়ে বললেন। এ কবরবাসীদের কবরগুলো অন্ধকারে আচ্ছন্ন থাকত। তাদের জন্য আমার নামাজ পড়ার কারণে আল্লাহ তায়ালা তাদের কবরগুলোকে আলোকিত করে দিয়েছেন। (বুখারি, মুসলিম- আবু হুরায়রা রা.)
রাসূল সা. বলেন- এরূপ অনেক লোক আছে যাদের (মাথার চুল) উশকো-খুশকো এবং (পা দুটো) ধূলিধূসরিত তাদেরকে (মানুষের) দরজাসমূহ থেকে ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয়া হয়। যদি তারা আল্লাহর নামে কসম করে। তাহলে আল্লাহ তাদের কসম অবশ্যই পূর্ণ করেন। (মুসলিম- আবু হুরায়রা রা.)
জান্নাতে গরিব লোকেরাই বেশি যাবে- জান্নাতের গেটে দাঁড়িয়ে রাসূল সা. দেখলেন জান্নাতের মধ্যে গরিব ও নিঃস্ব ব্যক্তিগণ প্রবেশ করেছে। আর ধনী সম্পদশালীদেরকে গেটে আটকিয়ে রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে জাহান্নামিদেরকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। (বুখারি ও মুসলিম)
উল্লেখ্য যে মহিলারা জাহান্নামের মধ্যে বেশি প্রবেশ করবে কারণ বেশি অভিশাপ দেয়া আর অকৃতজ্ঞতার জন্য।

আদর্শ গরিব আসহাবে সুফ্ফা
হযরত মোহাম্মদ সা.-এর সময়ে দ্বীনি শিক্ষা লাভের জন্য এবং প্রয়োজনে জিহাদে শরিক হওয়ার জন্য মদিনায় মসজিদে নববীর সংলগ্ন সর্বদা অবস্থান করতেন। দ্বীনি শিক্ষার জন্য যারা ঘরবাড়ি ছেড়ে আত্মনিয়োগ করেছে, তারা অভাবী, তারাও দান-সাদকা পাওয়ার অধিকারী।
অভাবীদের সাথে আল্লাহর সম্পর্ক সম্বন্ধে মহানবী সা. বলেছেন; আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন বলবেন, ‘হে আদমসন্তান! আমি পীড়িত হয়েছিলাম, তুমি আমার সেবা করোনি।’ বান্দা উত্তর করবে, ‘হে প্রভু! আপনি বিশ্বের প্রতিপালক, আমি কিরূপে আপনার সেবা করতাম?’ আল্লাহ বলবেন, আমার অমুক বান্দা পীড়িত হয়ে সাহায্য কামনা করেছিল, তুমি তার সেবা করোনি। যদি তার সেবা করতে আমাকে তার নিকটে পেতে।’ তিনি পুনরায় বলবেন, ‘হে আদমসন্তান! আমি তোমার নিকট ক্ষুধার্ত হয়ে খাদ্য চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি দাওনি।’ বান্দা বলবে, ‘হে প্রভু! আপনি তো বিশ্বের সকলেরই খাদ্যদাতা, আমি আপনাকে কিরূপে খাদ্য দিতাম?’ তিনি বলবেন, ‘আমার অমুক বান্দা ক্ষুধার্ত হয়ে তোমার নিকট খাদ্য চেয়েছিল, তুমি সঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও তাকে খাদ্য দাওনি। যদি দিতে, তবে সে খাদ্য আমার নিকট পৌঁছত।’ তিনি আবার বলবেন, ‘হে আদমসন্তান! আমি পিপাসার্ত হয়ে তোমার নিকট পানি চেয়েছিলাম, তুমি দাওনি।’ বান্দা বলবে, ‘বিশ্বের প্রতিপালক প্রভু আমার! আমি কিরূপে আপনার পিপাসায় পানি দিতে পারতাম?’ আল্লাহপাক বলবেন, ‘আমার অমুক বান্দা তোমার নিকট পিপাসায় কাতর হয়ে পানি চেয়েছিল, তুমি দাওনি। যদি দিতে, তবে সে পানির বদলে আজ জান্নাতের সুস্নিগ্ধ বারিধারা পান করতে।’ (মুসলিম, মেশকাত)
এই হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়ানো এবং পিপাসার্তকে পানি পান করানো এর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়।
আবু হুরায়রা রা. বলেন, আমি সত্তর জন আসহাবে সুফ্ফাকে দেখেছি তাদের কারো গায়েই চাদর ছিল না। কারো হয়ত একটি লুঙ্গি ছিল। করো হয়ত একটি কম্বল ছিল। তারা কম্বলটি নিজেদের গলায় বেঁধে রাখতেন। লজ্জাস্থান হেফাজতের জন্য হাত দিয়ে এটাকে ধরে রাখতেন।

রাসূলুল্লাহ সা.-এর দরিদ্রতা
রাসূল সা.-এর পরিবারের নয়টি ঘর ছিল। তাঁর পরিবারের জন্য সকাল ও সন্ধ্যায় এক সা পরিমাণ খাদ্য মিলত না। (বুখারি-৫০৬)
১. হযরত নুমান বিন বশীর রা.-এর বর্ণনায় বলা হয়েছে, হযরত উমর রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা.কে দেখেছি, সারাদিন তিনি অভুক্ত থাকতেন, অথচ এ পেট ভরার জন্য কোন নিম্নমানের খেজুর ও তিনি পেতেন না। (মুসলিম)
রাসূল সা.-এর ওফাতের সময় তার বর্মটি জনৈক ইহুদির কাছে ৩০ সা যবের পরিবর্তে বন্ধক ছিল। (বুখারি ও মুসলিম)
২. মৃত্যুর সময় (ক) একটি খচ্চর (খ) তরবারি (গ) মুসাফিরদের জন্য সদকাকৃত কিছু জমি ব্যতীত কোন দিনার, দিরহাম, দাস-দাসী বা অন্য কোন সম্পদ রেখে যাননি।
রাসূল সা.-এর বিছানা ছিল চামড়ার যার ভিতরে খেজুর গাছের ছাল ভরা ছিল। (বুখারি)
৩. একদিন চাটাইয়ের দাগ শরীরে দেখতে পেয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বললেন, আপনাকে একটা তোশক বানিয়ে দিই। তিনি বলেন, পৃথিবীর সাথে আমার সম্পর্ক কী? আমি তো পৃথিবীতে একজন আরোহী মুসাফির, যে গাছতলায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে তা ছেড়ে চলে যায়। (তিরমিযি)
৪. আয়েশা রা. বলেন রাসূল সা.-এর ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত তার পরিবারে একাধারে দুদিন পেট ভরে যবের রুটিও খেতে পায়নি। (বুখারি ও মুসলিম) অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে তাঁর মদিনায় আগমনের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তার পরিবারের লোকজন একাধারে তিন রাতও পেট ভরে গমের রুটি খেতে পায়নি।
৫. আয়েশা রা. তার ভাগ্নে উরওয়া রা.-কে বলেন হে ভাগ্নে আমরা দু’মাসে একের পর এক তিনটি চাঁদ দেখে ফেলতাম- অথচ এ দীর্ঘ সময়ে রাসূল সা.-এর ঘর সমূহে আগুন জ্বালানো হতো না। ভাগ্নে জিজ্ঞাসা করেন, ‘খালা আম্মা, তবে কিভাবে আপনাদের জীবন ধারণ হতো? তিনি বললেন, দুটি কালো বস্তু- খেজুর আর পানি দ্বারা।
তবে হ্যাঁ রাসূল সা.-এর কয়েকজন আনসার প্রতিবেশী ছিল যারা তাদের দুগ্ধবতী উটনী থেকে তাঁর খেদমতে কিছু দুধ পাঠাতেন। এরপর তিনি তা আমাদের পান করাতেন। (বুখারি ও মুসলিম)
৬. আবু হুরাইরা রা.-কে একদিন একটি ভাজা বকরির গোশত খেতে আহ্বান করলে তিনি তা খেতে অস্বীকার করে বসলেন। রাসূলুল্লাহ সা. পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন অথচ তিনি কখনো পেট ভরে যবের রুটিও খাননি। (বুখারি)
৭. আনাস রা. বলেন, রাসূল সা. মৃত্যু পর্যন্ত কখনো পাতলা চাপাতি রুটিও খাননি। (বুখারি)
৮. নুমান ইবনে বশীর রা. বলেন, রাসূল সা. নিজের পেট ভর্তি করার জন্য নিম্নমানের খেজুরও পেতেন না। (মুসলিম)
৯. চালুনি চালা ব্যতীত যব খেতেন কিভাবে? জবাবে বলা হলো- আমরা তা চাককিতে পিষতাম ও ফুঁ দিতাম। যা উড়ে যাবার উড়ে যেত আর অবশিষ্ট আটা দিয়ে খামির তৈরি করতাম। (বুখারি)
মৃত্যুর সময় রাসূলের পোশাক- মুসা আশআরী রা. বলেন, আয়েশা রা. আমাদের সামনে একটি কম্বল ও একটি মোটা লুঙ্গি বের করে বলেন, এ দু’টি পরিহিত অবস্থায় রাসূল সা.-এর ওফাত হয়েছে। (বুখারি ও মুসলিম)
আবু হুরায়রা রা. বলেন, আমি রাসূল সা.-এর মিম্বার ও আয়েশা রা.-এর কক্ষের মাঝখানে ক্ষুধার জ্বালায় বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকতাম। লোকেরা কেউ কেউ এসে আমাকে পাগল মনে করে আমার ঘাড়ের ওপর পা রাখত। (বুখারি)
তাদের জুতা, মুজা, টুপি ও জামা ছিল না- হযরত ওমর রা. বলেন- আমরা দশ জনেরও কিছু বেশি লোক রাসূল সা.-এর সাথে হযরত সাদ’ ইবনে উবাদা রা.-কে দেখতে গেলাম কিন্তু আমাদের কারো সাথে জুতা, মোজা, টুপি ও জামা ছিল না। এমতাবস্থায় আমরা অনাবাদি মাঠ পার হয়ে সা’দ ইবনে উবাদা রা.-এর কাছে এসে পৌঁছলাম। (মুসলিম)

গরিবের অনুভূতি
গরিব লোক জান্নাতে গিয়ে দুনিয়ার সব অভাব অনটনের কথা ভুলে যাবে। গরিব লোক ধনীদের পাঁচশত বছর আগে জান্নাতে যাবে। দুনিয়ায় একজন দুর্দশাগ্রস্ত অভাবী লোক যে জান্নাতবাসী হয়েছে তাকে ডেকে বলা হবে দুনিয়াতে তুমি কি কখনো অভাব অনটন দেখেছিলে? সে বলবে না, আল্লাহর কসম আমি কখনো তেমন অভাব অনটন দেখিনি, আর আমার উপর কোন দুর্দশাও অতিবাহিত হয়নি। (মুসলিম)
দুনিয়ার সুখী মানুষগুলোকে ডেকে বলা হবে দুনিয়াতে তুমি কি কখনো সুখ-শান্তি দেখেছিলে? তখন সে বলবে না, আল্লাহর কসম আমি কখনো সুখ-শান্তি দেখিনি, আর আমার উপর কোন আরামের সময়ও অতিবাহিত হয়নি। মানুষের মৃত্যুর সাথে সাথে তার কিয়ামত (কবর হবে জান্নাত অথবা জাহান্নামের টুকরা) শুরু হয়ে যায়।

রাসূলকে ভালোবাসলে দরিদ্রতাকে বরণ করতে হবে
এক ব্যক্তি রাসূল সা.কে বললেন আমি আপনাকে ভালোবাসি। জবাবে রাসূল সা. বলেছিলেন তুমি যা বলছ তা ভালো করে চিন্তা করে দেখ। লোকটি তিনবারই বলল আমি আপনাকে ভালোবাসি। তখন তিনি বললেন তাহলে তুমি দরিদ্রতাকে বরণ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও। বন্যার পানির চেয়েও দ্রুতগতিতে দরিদ্রতা পৌঁছে যায়। (তিরমিজি)

ক্ষুধার জ্বালায় বাড়ি থেকে বের হলেন
আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : একদা আবু বকর রা. ও উসমান রা. বসেছিলেন। এমন সময় রাসূলুল্লাহ সা. তাদের কাছে এসে বললেন : এখানে বসে আছো কেন? উত্তরে তারা বললেন : যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! ক্ষুধা আমাদেরকে ঘর হতে বের করে এনেছে। রাসূলুল্লাহ সা. তখন বললেন : যিনি আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! ক্ষুধা আমাকেও বের করে এনেছে। তারপর রাসূলুল্লাহ সা. দু’জনকে সঙ্গে নিয়ে এক আনসারীর বাড়িতে গেলেন। আনসারী বাড়িতে ছিলেন না। রাসূলুল্লাহ সা. আনসারীর স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার স্বামী কোথায়? মহিলা বলল : তিনি আমাদের জন্য মিষ্টিপানি আনার জন্য বাইরে গেছেন। ইতোমধ্যে ঐ আনসারী পানির মশক নিয়ে চলে আসল। রাসূলুল্লাহ সা. ও সাহাবীদের দেখে আনসারী আনন্দে আটখানা হয়ে গেলেন। তিনি বললেন : আমার বাড়িতে আজ রাসূলুল্লাহ সা. তাশরিফ এনেছেন, সুতরাং আমার মত ভাগ্যবান আর কেউ নেই। পানির মশক ঝুলিয়ে রেখে আনসারী বাগানে গিয়ে তাজা তাজা খেজুরের কাঁদি নিয়ে আসলেন। রাসূলুল্লাহ সা. বললেন : বেছে বেছে আনলেই তো হতো। আনসারী বললেন : ভাবলাম যে, আপনি পছন্দ মতো বাছাই করে গ্রহণ করবেন। তারপর আনসারী একটি ছুরি হাতে নিলেন (মেষ যবাই করার জন্য)। রাসূলুল্লাহ সা. বললেন : দেখো, দুগ্ধবতী মেষ জবাই করো না। অতঃপর আনসারী তাদের জন্য একটি মেষ জবাই করলেন এবং তাঁরা সেখানে আহার করলেন। তারপর সাহাবীদের লক্ষ্য করে বললেন : দেখো তোমরা ক্ষুধার্ত অবস্থায় তোমাদের ঘর থেকে বেরিয়েছিলে অথচ এখন পেট পূর্ণ করে ফিরে যাচ্ছো। এ নেয়ামত সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে। (সহীহ মুসলিম, পানি অধ্যায়, হা. ১৪০)
নবী সা. বলেন : কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা বলবেন : হে আদমসন্তান! আমি তোমাকে ঘোড়ায় ও উটে আরোহণ করিয়েছিলাম, নারীদের সাথে বিয়ে দিয়েছি, তোমাকে হাসি-খুশি ভাবে আনন্দ-উজ্জ্বল জীবন যাপনের সুযোগ দিয়েছি। এবার বল : এগুলোর শুকরিয়া কোথায়? (আহমাদ ২/৪৯২, সনদ সহিহ)

গাছের পাতা খেয়ে জীবনধারণ
বসরার গভর্নর উতবা ইবনে গাওয়াম রা. ভাষণ দেয়ার শেষ পর্যায়ে বললেন, আমি রাসূল সা.-এর সাথে ৭ জন ব্যক্তির মধ্যে সপ্তম জন হিসেবে দেখেছি “গাছের পাতা ছাড়া আমাদের নিকট আর কোনো খাদ্য ছিল না। তা খেতে খেতে আমাদের চোয়াল ক্ষত হয়ে গিয়েছিল।”
আমি একটা চাদর পেয়েছিলাম সেটা দুভাগ করে আমি ও সা’দ ইবনে মালিক রা. ভাগ করে নিলাম। এর অর্ধেকটা দিয়ে আমি লুঙ্গি বানালাম আর বাকি অর্ধেকটা দিয়ে সা‘দ লুঙ্গি বানালেন। আমি নিজেকে বড় মনে করা ও আল্লাহর নিকট ছোট হওয়া থেকে মহান আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি। (মুসলিম)

পায়খানা বকরির লাদির মত
রাসূল সা.-এর তীরন্দাজ সাহাবী সা’দ ইবনে ওয়াক্কাস রা. বলেন, রাসূল সা.-এর সাথে এমতাবস্থায় জিহাদে অংশগ্রহণ করেছিলাম যে আমাদের নিকট নাগেশ্বর আর বাবলা গাছের পাতা ব্যতীত কোন খাদ্যই ছিল না। এমনকি আমাদের লোকেরা ছাগলের লাদির ন্যায় পায়খানা করত, একটা আরেকটার সাথে মিশত না। (বুখারি ও মুসলিম)
রাসূল সা. দোয়া করতেন ‘আল্লাহুম্মাহ আ’তি রিযকা আলে মুহাম্মাদিন কুতান অর্থাৎ হে আল্লাহ মুহাম্মদ সা.-এর পবিরারকে ক্ষুধা নিবারণ উপযোগী রিযিক প্রদান করুন।’ (বুখারি ও মুসলিম)

দুর্বল ও শক্তিহীন লোক জান্নাতি
রাসূল সা. বলেন, কোন ধরনের লোক জান্নাতি হবে আমি কি তোমাদের জানাব না? তারা হলো প্রত্যেক দুর্বল ব্যক্তি যাকে লোকে শক্তিহীন ও তুচ্ছ মনে করে। সে যদি আল্লাহর উপর ভরসা করে কসম করে তাহলে আল্লাহ তা পূর্ণ করবেন। কোন ধরনের লোক জাহান্নামে যাবে তা সম্পর্কে আমি কি তোমাদের জানাব না? তারা হলো প্রত্যেক অবাধ্য, উদ্ধত ও অহংকারী ব্যক্তি যারা জাহান্নামে যাবে। (বুখারি, মুসলিম- হারিসা বিন ওহাব রা.)

ছড়ি পড়ে গেলেও চাইত না-বায়াত শেষে রাসূল সা. চুপিসারে একটি কথা বলে দিলেন, ‘আর মানুষের কাছে কিছুই চাইবে না। বর্ণনাকারী আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রা. বলেন, আমি নিজে এ দলের কয়েক জনকে দেখেছি যে তাদের কারো চাবুক (হাতের লাঠি) মাটিতে পড়ে গেলেও তারা অন্য কাউকে তা উঠিয়ে দিতে বলতেন না। (মুসলিম)

লেখক : ইসলামী চিন্তাবিদ ও
সাবেক সংসদ সদস্য

SHARE

Leave a Reply