গুম আতঙ্কের জনপদ বাংলাদেশ যে কারণে নিয়ন্ত্রণে আসছে না এই আপদ -মো: কামরুজ্জামান (বাবলু)

বাংলাদেশের রূপের বর্ণনায় ছোটবেলায় আওড়ানো সেই শব্দগুলো যেন আজও রিমঝিম বৃষ্টির মতো কানে বাজে। সময়ের ব্যবধানে সেই সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা শব্দগুলো আজ বড়ই অপরিচিত লাগছে। এখন বাংলাদেশকে নিয়ে ভাবতেই যে শব্দগুলো মনের আয়নায় ভেসে ওঠে তা হলো হত্যা-ধর্ষণ-গুম-খুন-অপহরণ-ক্রসফায়ার। শুধু দেশের ভেতরেই নয়, দেশের গন্ডি পেরিয়ে আজ সারা দুনিয়া জেনে গেছে বাংলাদেশের এই দুর্দশার কথা। বিগত ৫ জানুয়ারি ২০১৪-এর একতরফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ দেশে যে ‘ফ্যাসিবাদী’ শাসন কায়েম করেছে তা আজ পরিষ্কার হয়ে গেছে বিশ্ববাসীর কাছে। ধুলায় মিশে গেছে বাংলাদেশের সুনাম-সুখ্যাতি। ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গোপন সেলে আটক ও নির্যাতন, অপহরণ, ধর্ষণ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও বিরোধী মতের প্রতি দমন-পীড়ন থেকে শুরু করে সব ধরনের অনাচার সহ্য করা যেন আজ দেশের মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় জনসাধারণ বিশেষ করে বিরোধী মতের লোকদের ওপর চালাচ্ছে অত্যাচারের স্টিম রোলার।
শেষমেশ বিরোধী মতের ওপর ধারাবাহিকভাবে চালানো নিপীড়নের শিকার হলেন লেখক ও কবি ফরহাদ মজহার। তার মতো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত বুদ্ধিজীবী ও অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকেও অপহরণের শিকার হতে হলো। অবশ্য বিষয়টি নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হলে অবশেষে সরকারের আইনশৃঙ্গলা বাহিনী অপহরণের ১৬ ঘণ্টা পর যশোর থেকে উদ্ধার করে বর্তমান সরকারের এই কড়া সমালোচককে। উদ্ধারের পর প্রথমে তাকে হাজির করা হয় আদালতে, সেখানে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে জবানবন্দী শেষে নিজ জিম্মায় ছেড়ে দেয়া হয় এই লেখককে। মানসিকভাবে প্রচন্ড বিপর্যস্ত মজহারকে রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এই লেখাটি সম্পন্ন করার সময় পর্যন্ত (১৮ জুলাই ২০১৭) তার অপহরণকারীদের ব্যাপারে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায়নি। তবে পুলিশের তদন্ত চলছে। এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপির মধ্যে নোংরা রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়ে গেছে। পরস্পরকে দোষারোপের রাজনৈতিক খেলায় মত্ত হয়ে উঠেছে দুই পক্ষই।
তবে এরই মধ্যে ফরহাদ মজহার অপহরণের খবরটি বেশ গুরুত্বের সাথে স্থান পায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। উদাহরণস্বরূপ বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী গণমাধ্যমের মধ্যে অন্যতম লন্ডনভিত্তিক ‘দ্য গার্ডিয়ান ((The Guardian)’ পত্রিকায় গত ১২ জুলাই ২০১৭ তারিখে প্রকাশিত একটি খবরের দিকে নজর দেয়া যেতে পারে। প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল “Bangladesh’s disappeared : Activist found on bus claims he was latest target, অর্থাৎ “বাংলাদেশে গুম : বাস থেকে উদ্ধার অপহৃতের নিজেকে সবশেষ টার্গেট দাবি”। এই প্রতিবেদন তৈরিতে গার্ডিয়ানের প্রতিনিধি ফরহাদ মজহারের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। গার্ডিয়ানের এক প্রশ্নের জবাবে সরকারের এই কড়া সমালোচক তাকে অপহরণের কাহিনী সংক্ষিপ্তাকারে জানান। তিনজন অপহরণকারী তাকে কিভাবে গুম করেছে তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণের পর এই সমালোচক সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, তিনি চুপ থাকবেন না। তার ওপর চালানো নির্যাতনের কথা তিনি সবাইকে জানাবেন এবং সার্বিকভাবে বাংলাদেশে যে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে সে ব্যাপারে তিনি আগের মতোই সরব থাকবেন।
হাসপাতালের বেডে চিকিৎসাধীন ফরহাদ মজহারের গার্ডিয়ানকে দেয়া সাক্ষাৎকারটি বিশেষভাবে গুরুত্বের দাবিদার। কারণ অপহরণের পর জীবিত ফেরত আসা কোন ব্যক্তির দেশী ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কথা বলার ঘটনা এই প্রথম। কারণ সচরাচর যেটি দেখা যায় তা হলো অপহৃত হওয়ার পর যাদের লাশ কোথাও পড়ে থাকতে দেখা যায় তাদের বিষয়টি হয় অগোচরে থেকে যায় অথবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গতানুগতিক ক্রসফায়ারের বিবরণ ছাপা হয় গণমাধ্যমে। আর গুটিকয়েক সৌভাগ্যবানদের মধ্যে যারা ফেরত আসতে সক্ষম হন তারা রহস্যজনক কারণে আর মুখ খোলেন না। অপর দিকে, অদ্যাবধি যাদের হদিস মেলেনি তাদের পরিবার কয়েকদিন দৌড়ঝাঁপ করে একই রহস্যময় ভঙ্গিতে নিশ্চুপ হয়ে যান পাছে আবার পরিবারের অপর কেউ গুম হয়ে যান কি না সেই ভয়ে।
যাই হোক, গত ১২ জুলাই ২০১৭ তারিখে দ্য গার্ডিয়ানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ফরহাদ মজহার বলেন, অপহরণকারীরা তার সাথে দুর্ব্যবহার করেছে, তার মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে যায় এবং চোখ বেঁধে ফেলে। মিনিবাসে নিয়ে যাওয়ার সময় তাকে লাথি মেরে ফ্লোরে বসিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু অপহরণকারীদের তিনি চিনতে পারেননি। মজহার বলেন, ওই দিন সকালে তিনি চোখের ওষুধ কেনার জন্য বের হয়েছিলেন। হঠাৎ করে তিনজন লোক পাশ থেকে তার দিকে আসে এবং তাকে একটি সাদা মিনিবাসে জোর করে তুলে নেয়।
তবে এরই মধ্যে ফরহাদ মজহার তার স্ত্রীকে ফোন দিয়েছিলেন। আর সেই প্রসঙ্গে তিনি গার্ডিয়ানকে আরো বলেন, I managed to fish his mobile from my pocket and call my wife. It was a short call. I whispered: They are taking me away, they will kill me. I spoke to her for just a few seconds before they noticed it.” অর্থাৎ “আমি কোনমতে আমার পকেট থেকে মোবাইলটি হাতে নিলাম এবং আমার স্ত্রীকে ফোন দিলাম। এটা ছিল একটি সংক্ষিপ্ত কল। আমি ফিসফিস করে বললাম : তারা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে, তারা আমাকে হত্যা করবে। তারা বিষয়টি টের পাওয়ার আগে আমি মাত্র কয়েক সেকেন্ড কথা বলেছিলাম।”
ফরহাদ মজহারকে উদ্ধৃত করে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, “The men blindfolded Mazhar and took his phone. Believing if he called his wife again, police could track his location, he offered to pay the men a ransom to release him. They gave me the mobile and I spoke to my wife a few times on the issue. অর্থাৎ “লোকগুলো মজহারের চোখ বেঁধে দিলো এবং তার কাছ থেকে ফোনটি নিয়ে যায়। স্ত্রীকে ফের ফোন দিতে পারলে পুলিশ ট্র্যাক করে তার অবস্থান নিরূপণ করতে পারবে এমন বিশ্বাস থেকে সে (মজহার) তাদেরকে তার মুক্তির বিনিময়ে অর্থ প্রদানের প্রস্তাব দেয়। ‘এরপর তারা আমার মোবাইল ফেরত দেয় এবং আমি কয়েক বার এ বিষয়ে স্ত্রীর সাথে কথা বলি।’”
গার্ডিয়ানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি আরো বলেন, কয়েক ঘণ্টা মিনিবাসটি একনাগাড়ে চলতে থাকে। এ সময় তারা তার সাথে দুর্ব্যবহার করে, তাকে চড়-থাপ্পড় মারে এবং গালিগালাজ করে। প্রায় ১০-১২ ঘণ্টা পর তারা তাকে জানায় যে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে। গার্ডিয়ানে আরো লেখা হয়, “They took off the blindfold and dropped me at a secluded place when it was a little dark. They gave me a bus ticket and asked me to take the bus from Khulna city to go back to Dhaka. I walked some distance and reached a market in Khulna, where I had some food before boarding the bus at 9.15 pm. অর্থাৎ “তারা আমার চোখের বাঁধন খুলে দেয় এবং একটি নিরিবিলি স্থানে আমাকে ছেড়ে দেয়। এরই মধ্যে কিছুটা অন্ধকার নেমে আসে। তারা আমাকে একটি বাসের টিকেট দেয় এবং খুলনা থেকে ঢাকা ফেরত যেতে বলে। আমি কিছুদূর চলার পর খুলনায় একটি মার্কেটের কাছে পৌঁছাই। সেখানে কিছু খাবার খাই এবং রাত সোয়া ৯টায় বাসে উঠি।”
মজহার গার্ডিয়ানকে আরো জানান, “My abductors were in plain clothes. I don’t know who they were or which group they belonged to.” অর্থাৎ “আমার অপহরণকারীরা সাদা পোশাকে ছিলো এবং আমি তাদের চিনতে পারিনি। তারা আসলে কারা কিংবা কোন গ্রুপের সদস্য তাও আমি বুঝতে পারছি না।”
সবশেষ ক্ষুব্ধ ফরহাদ মজহার গার্ডিয়ানকে বলেন, “He was still experiencing heavy trauma’ and would need time to recover. But I am not afraid to reveal what happened to me. অর্থাৎ “এখনো তিনি প্রচন্ড মানসিক পীড়ায় ভোগছেন এবং এ অবস্থা থেকে কাটিয়ে উঠতে তার কিছুটা সময় লাগবে। কিন্তু আমার ওপর যা যা ঘটেছে তা প্রকাশ করতে আমি মোটেই ভীত নই।” গুম থেকে ফেরত আসা লোকেরা যে রহস্যজনকভাবে নিশ্চুপ থাকে সেদিকে ইঙ্গিত করে তিনি আরো বলেন, “When I return to work I will begin working on this issue. We have to end this culture of enforced disappearances.” অর্থাৎ “যখন আমি কর্মস্থলে ফিরবো, আমি এই বিষয়ে কাজ করবো। জোরপূর্বক নিখোঁজ করে দেয়া তথা গুমের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তা আমাদেরকে বন্ধ করতে হবে।”
গার্ডিয়ানকে দেয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ফরহাদ মজহারের সাক্ষাৎকার থেকে যা বোঝা গেল তা হলো তার অপহরণকারীদের ব্যাপারে তিনি সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলতে পারেন না। তবে বাংলাদেশে মানবাধিকারের লঙ্ঘন ও সরকারের ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে তার সোচ্চার ভূমিকাই এই অপহরণের নেপথ্যে থাকতে পারে বলে তার ধারণা। কারণ সাংবাদিক অঙ্গনে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় সমালোচক ‘দৈনিক আমার দেশ’-এর সম্পাদকের সঙ্গে এই ঘটনার মাত্র একদিন আগে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ফরহাদ মজহার। সেখানে তিনি দেশে সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য একটি অবাধ, অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি গরু খাওয়াকে কেন্দ্র করে ভারতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংসতারও কড়া সমালোচনা করেন মজহার।
এদিকে, ফরহাদ মজহারের গুম ও উদ্ধার হওয়া এবং বিষয়টি নিয়ে নানামুখী মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে দেশের বিশিষ্ট ২১ নাগরিক এক যুক্ত বিবৃতি দেন। গত ১২ জুলাই ২০১৭ তারিখে ওই বিবৃতিটি দেশের প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমে স্থান পায়। প্রভাবশালী ইংরেজি পত্রিকা “The Daily Star”-এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনটির শিরোনাম করে, “Farhad Mazhar Kidnap : Concern over bid to divert attention অর্থাৎ “ফরহাদ মজহার অপহরণ : ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহের আশঙ্কা”। প্রতিবেদনে গোয়েন্দা পুলিশের পশ্চিম ডিভিশনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার হাফিজ আল আসাদের বক্তব্যও দেয়া হয়। ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “They are investigating the case with professionalism. We did not find any evidence that he went to Khulna on a microbus. অর্থাৎ “তারা সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে এই মামলার তদন্তকাজ চালাচ্ছেন। তিনি মাইক্রোবাসে খুলনা গেছেন এই মর্মে আমরা কোন প্রমাণ পাইনি।” অর্থাৎ বলা যায় ঘটনার ৯ দিনের মাথায় পুলিশ ঘটনার কূলকিনারা করতে পারেনি এবং সত্যিকারের অপরাধীদের সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে পুলিশ তাদের ভাষায়, সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।
কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক- আইজিপি একেবারে রাজনীতিবিদদের মতো একটি একপেশে বক্তব্য দিলেন তদন্তকাজ শেষ হওয়ার আগেই। গত ১৮ জুলাই ২০১৭ তারিখে এই নিবন্ধটি লেখার সময়ও পুলিশের তদন্তকাজ চলছিল। অথচ এরও ৫ দিন আগে আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক খোদ মজহারকেই দায়ী করে উন্মুক্ত সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ফরহাদ মজহার নিজেই অপহরণের নাটক করেছেন। গত ১৩ জুলাই ২০১৭ তারিখে আইজিপির দেয়া এমন রাজনৈতিক ও সরকারকে তুষ্ট করার বক্তব্যটি বেশ গুরুত্বের সাথে সব গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করা হয়।
দৈনিক ইত্তেফাকে “ফরহাদ অপহৃত হননি, স্বেচ্ছায় খুলনা গিয়েছিলেন : আইজিপি”- এই শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, “পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) শহীদুল হক বলেছেন, ফরহাদ মজহার অপহৃত হননি। তিনি স্বেচ্ছায় খুলনা গিয়েছিলেন, অপহরণের কোনো ঘটনা সেখানে ঘটেনি। আইজিপি শহীদুল হক বলেন, পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ১৮ ঘণ্টা চেষ্টার পর ফরহাদ মজহারকে উদ্ধার করে। এই সময় তিনি মোবাইল ফোনে নিজের স্ত্রী ফরিদা আখতারের সঙ্গে ১০ বার ও তার ভক্ত অর্চনা রানীর সঙ্গে ছয়বার কথা বলেছেন।
শহীদুল হক বলেন, ৩ জুলাই সন্ধ্যার আগে ফরহাদ মজহার খুলনার একটি মার্কেটের দোকান থেকে অর্চনা রানীকে প্রথমে ১৩ হাজার ও পরে ২ হাজার টাকা রকেটের মাধ্যমে পাঠান। এ থেকে পুলিশ প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করছে, ওই নারীর টানেই তিনি বাসা থেকে বেরিয়ে যান। আইজিপি বলেন, অর্চনা রানীর সঙ্গে যোগাযোগের কথা ফরহাদ মজহারের স্ত্রী না-ও জানতে পারেন। সে জন্যই হয়তো ফরহাদ মজহার অপহরণের এই নাটক সাজিয়েছেন।”
দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বোচ্চ ব্যক্তির এমন বক্তব্য সত্যিই দুঃখজনক। একটি ঘটনার তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তিনি যেভাবে একজনকে দোষারোপ করে সরকারের খয়ের খাঁর ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন তা সত্যিই বিস্ময়কর। তদুপরি তিনি ফরহাদ মজহারের চরিত্র নিয়েও যে নোংরা ইঙ্গিত দিলেন তা রীতিমতো সব ভদ্রতার সীমা লঙ্ঘন করেছে। একবার বলছেন, সরকারকে বিব্রত করতে তিনি এটা করেছেন, আবার বলছেন স্ত্রী ছাড়া যে নারীকে তিনি ফোন দিয়েছিলেন তা স্ত্রী জানতেন না তাই এমন নাটক। কতটা ছেলেমানুষি বক্তব্য দিলেন একজন আইজিপি!
তা ছাড়া খুলনায় অপহরণকারীরা ছেড়ে দেয়ার পর কিছুদূর হেঁটে গিয়ে একটি মার্কেটে যান এবং খাবার খান বলে ফরহাদ মজহার নিজেই গার্ডিয়ানকে জানিয়েছিলেন যা এরই মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। অথচ খুলনায় তার ঘোরাফেরার সিসিটিভি ফুটেজের ব্যাপারেও সংবাদ সম্মেলনে আইজিপি নেতিবাচক মন্তব্য করেন। এদিকে, ফরহাদ মজহারের এনজিওকর্মী অর্চনা রানীর ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দিয়েছেন বলেও গত ১১ জুলাই ২০১৭ তারিখে দেশের গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। সেই জবানবন্দীতে ওই নারী জানান, ফরহাদ মজহার তাকে বিকাশ করে ১৫ হাজার টাকা দিয়েছেন।
যাই হোক, এভাবে সব দিক বিবেচনা করলে আমরা ফরহাদ মজহারের অপহরণকে ঘিরে বেশ কয়েক ধরনের তথ্য দেখতে পাই। সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সরাসরি দায়ী করে বিএনপির দেয়া বক্তব্যের কথা না হয় বাদই দিলাম। এই পরিস্থিতিতে যে কোনো বিবেকবান ও সচেতন মানুষ চাইবে যে এই ঘটনায় একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হোক এবং আসল খবরটি বেরিয়ে আসুক। কিন্তু তার আগেই ঘটনার রহস্য বের করার দায়িত্ব যাদের সেই বাহিনীরই প্রধান ন্যক্কারজনকভাবে একটি পক্ষে অবস্থান নিলে পরিস্থিতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে তারও প্রমাণ পাওয়া যায় সম্প্রতি প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (Human Rights Watch-HRW) এক প্রতিবেদন থেকে। গত ৬ জুলাই ২০১৭ তারিখে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনের বিষয়টি দেশী-বিদেশী অনেক গণমাধ্যমেই উঠে আসে।
ওই প্রতিবেদনের বিষয়ে দৈনিক প্রথম আলো শিরোনাম করে “হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন : গুম ও গুপ্ত বন্দিশালা বন্ধ করুন”। প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণে গত ৬ জুলাই ২০১৭ তারিখে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, “বাংলাদেশের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো ২০১৩ সাল থেকে বিরোধী দলের কর্মীসহ কয়েক শ’ ব্যক্তিকে অবৈধভাবে আটক করেছে। তাদের গোপন স্থানে লুকিয়ে রেখেছে। গুম করার এই প্রবণতা অবিলম্বে বন্ধ করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে নিউইয়র্কভিত্তিক এইচআরডব্লিউ। একই সঙ্গে অভিযোগের দ্রুত নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত, নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারগুলোকে জবাব এবং এ ধরনের গুরুতর অধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী নিরাপত্তা বাহিনীর বিচার করতে বলা হয়েছে।
‘তিনি আমাদের কাছে নেই: বাংলাদেশে গোপনে আটক ও গুম’ শিরোনামের ৮২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালেই কমপক্ষে ৯০ ব্যক্তি গুমের শিকার হয়েছেন। যদিও গোপনে আটকে রাখার কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে তাদের আদালতে হাজির করা হয়। কিন্তু এইচআরডব্লিউর কাছে থাকা তথ্যানুযায়ী, আটক হওয়া ২১ জনকে পরে হত্যা করা হয়েছে। আর ৯ জনের অবস্থা অজানা। এইচআরডব্লিউ বলছে, ২০১৭ সালের প্রথম পাঁচ মাসে ৪৮টি নিখোঁজের অভিযোগ পাওয়া গেছে। গোপন হেফাজতে নির্যাতন ও রূঢ় আচরণের অভিযোগ আছে।
এইচআরডব্লিউর এশিয়াবিষয়ক পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেছেন, নিখোঁজের বিষয়ে যথার্থ তথ্য থাকা সত্ত্বেও সরকার আইনের তোয়াক্কা না করে এই ভয়ঙ্কর চর্চা চালিয়ে যাচ্ছে। ব্র্যাড অ্যাডামস বলেছেন, লোকজনকে আটক, তাদের দোষ ঠিক করা, শাস্তি নির্ধারণ, তাদের বাঁচিয়ে রাখা-না রাখার সিদ্ধান্তের পূর্ণ স্বাধীনতা যেন বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দেয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বিএনপির ১৯ জন কর্মীর নিখোঁজের ঘটনার উল্লেখ আছে। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে ঢাকা ও সংলগ্ন এলাকা থেকে তাঁদের তুলে নেয়া হয়। প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য, প্রত্যক্ষদর্শীসহ মোট ১০০ জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছে এইচআরডব্লিউ। প্রতিবেদনে অভিযোগ ও আইনি কাগজপত্র যুক্ত করা হয়েছে। এইচআরডব্লিউ বলছে, অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ জবাব দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়, নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের গ্রেফতার করা হয়নি বলে বারবার দাবি করে আসছে আইনপ্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ। এই দাবিকে প্রায়ই সমর্থন দেন সরকারি কর্মকর্তারা। উল্টো তারা বলেন, নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিরা স্বেচ্ছায় গোপনে লুকিয়ে আছেন। এ ধরনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগও নেয় না পুলিশ।
গুম ছাড়াও রাষ্ট্রীয় গোপন হেফাজতে মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ার একটি প্রবণতা লক্ষ করা গেছে বলে জানায় এইচআরডব্লিউ। সংস্থাটি বলছে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতার’ প্রতিশ্রুতি দিয়ে আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসে। কিন্তু বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুম এখনো চলছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে মোট ৩২০টি নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে।
আশ্চর্যজনকভাবে এইচআরডব্লিউ-এর এই গবেষণাধর্মী প্রতিবেদনকে সামান্যতম গুরুত্ব না দিয়ে উল্টো সংস্থাটিকে একহাত দেখে নিলেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে দেয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন প্রতিক্রিয়া নিয়ে প্রথম আলোর আরেক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়, “এইচআরডব্লিউ গায়ে পড়ে কথা বলতে আসে কেন?” ওই প্রতিবেদনের খানিকটা নিম্নরূপ :
“বাংলাদেশে গুম এবং গুপ্ত বন্দিশালা-সংক্রান্ত এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময়ও আমাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা করেছে এই সংগঠনটি। তাদের বর্তমান প্রতিবেদনটিও সেই প্রচারণার অংশ।”
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের এমন বক্তব্যে কিছুটা অবাক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয় হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পক্ষ থেকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সংস্থাটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়া হয় সত্য বলার মানে নেতিবাচক প্রচারণা নয়। গত ৭ জুলাই (২০১৭) সংস্থাটির পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে এমন প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। বিবৃতিটির শিরোনাম ছিল “No, Bangladesh, The Truth is Not a Smear Campaignঅর্থাৎ “না বাংলাদেশ, সত্য বলার মানে ‘নেতিবাচক প্রচারণা’ নয়: এইচআরডব্লিউ”। সংস্থাটি বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রশ্নের জবাব দিয়েছে। তারা বাংলাদেশের বক্তব্যের সত্যতা অস্বীকার করে বলছে, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত শীর্ষ ব্যক্তি হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, জাতিসংঘ কখনও বাংলাদেশের কথিত গুমের ব্যাপারে কিছু বলেনি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দাবি, তাদের মতোই গুম-সংক্রান্ত বিষয়ে কাজ করা জাতিসংঘ ওয়ার্কিং গ্রুপের ক্ষেত্রেও বারবার অভিযোগগুলোর ব্যাপারে মন্তব্য করার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘ এ ব্যাপারে ‘কঠোর সতর্কতা’ জারি করেছে উল্লেখ করে সংস্থাটির প্রতিক্রিয়ায় বলা হয় :
Human Rights Watch has produced a detailed analysis of cases where individuals were picked up, often in front of witnesses or family members by security forces who identified themselves as members of the Rapid Action Battalion (RAB), Detective Branch (DB), or the administration.’ When these people were not produced in court within 24 hours, as required under Bangladeshi law, family members repeatedly approached police and other officials, who denied the person was detained. While many of these men were eventually produced in court, after a period of weeks or months of illegal detention, others were released with warnings to stay silent. Several were later found killed in so-called gunfights or cross-fire’, and scores remain disappeared.
অর্থাৎ “হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের প্রতিবেদনে উল্লিখিত প্রতিটি ঘটনার বিস্তারিত বিশ্লেষণ হাজির করেছে। ডিবি, র‌্যাব কিংবা প্রশাসনের নামে তাদের কোথা থেকে কখন কিভাবে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তার বিস্তারিত বিবরণ উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পর স্বজনদের পক্ষ থেকে এদের খোঁজ জানতে চাইলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের আটক রাখার কথা অস্বীকার করেছে। বিনা বিচারে দিনের পর দিন আটক রাখার পর এদের কাউকে কাউকে আদালতে হাজির করা হয়েছে, অনেককে আবার চুপ থাকার হুমকি দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। কেউ কেউ গুম বা ‘ক্রসফায়ার’-এর শিকার হয়েছেন।”
পরিশেষে বলা যায়, যেখানে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার এমন গবেষণাধর্মী প্রতিবেদনকেই কোন থোড়াই কেয়ার করে না বর্তমান সরকার সেখানে ফরহাদ মজহারের মতো সরকারের কড়া সমালোচকের অপহরণের সুষ্ঠু তদন্ত হবে সরকারের প্রতি এমন আস্থা অনেকেই রাখতে পারছেন না। বিশেষ করে সরকারেরই কোন বাহিনী এই ঘটনা ঘটিয়েছে এমন অভিযোগও যেখানে প্রবল। তবে, দেশের সুষ্ঠু গণতন্ত্রের স্বার্থে গুম-খুনের এই জঘন্য সংস্কৃতির অবসান হওয়া দরকার। একই সাথে ফরহাদ মজহারের ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত করে সরকার একটি ইতিবাচক নজির রাখবেন দেশবাসীর সামনে এমনটাই সবার কামনা।
লেখক : সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply