গৃহদাহ থেকে দেশকে বাঁচাতে হবে

 সোলায়মান আহসান#

dabalahoক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা অবস্থায় শাসকের পরামর্শকের কোন অভাব হয় না। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যেমন চারিধারে পরামর্শ দেয়ার জন্য ঘুর ঘুর করে প্রচুর লোক, তেমনি দলীয়-নির্দলীয় অনেক হিতাকাক্সক্ষী পরামর্শক ভিড় করে। নানা উদ্দেশ্য থাকে এদের। এ ক্ষেত্রে শাসককে বেছে চলার নীতি গ্রহণ করা উচিত। পরামর্শক যতো বড় মাপের ব্যক্তিই হন। কাছে ভিড়েছেন যখন পরামর্শ গ্রহণের বিষয়টি আমলে আনতে হয় এমন হওয়া উচিত নয়। এ ক্ষেত্রে নিজের বিচার বুদ্ধির আলোকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা শাসকের বিচক্ষণতার পরিচায়ক।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় শাসককুল অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুল পথে পরিচালিত হয়। বড় বড় শাসক স্থপতি অনেক স¤্রাট বাদশাহ এই পরামশর্কদের (স্তাবক) খপ্পরে পড়ে চিন্তাশীল দার্শনিকদের ফর্মুলা মেনে চলতে গিয়ে মারাত্মক ভুলের মধ্যে পড়েছেনÑ এঁদের পরিণতি হয়েছে দুঃখজনক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হিটলারের কথা আমরা জানি। তাঁর সুযোগ্য তথ্যমন্ত্রী জোসেফ গোয়েবলস হিটলারের বিশ্বস্ত পরামর্শক ছিলেন। তা ছাড়া প্রচার প্রোপাগান্ডার আড়ালে সত্যকে ঢেকে রাখার কাজটি করতেন তিনি। মিডিয়ার কণ্ঠকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন যে হিটলার সর্বত্র তার মাথা আর জয়ের কাহিনী দেখতে পেতেন। গোয়েবলসের থিউরি ছিল মিথ্যাকে সত্য বলে বারবার প্রচার করলে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
আমরা ‘দ্য প্রিন্স’ গ্রন্থের ম্যাকিয়েভেলির কথাও জানি। তিনি হিটলার তৎকালীন রাজার কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখার শলা-পরামর্শ দিয়ে স্বৈর কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখার কায়দা কানুন এ গ্রন্থে বাতলে দিয়েছেন। পরবর্তীতে ঐ গ্রন্থটি অনেক স্বৈরশাসকের পকেট বইয়ে পরিণত হয়। শুনেছি পাকিস্তান ভাঙার শেষ শাসক ফিল্ড মার্শাল আইউব খানের বালিশের নিচে ‘দ্য প্রিন্স’ গ্রন্থটি থাকতো। কিন্তু আইউব খান এবং পাকিস্তানের পরিণতি কী, এই গ্রন্থ এবং পরামর্শকরা  ঠেকাতে পেরেছিল? বরং মৌলিক গণতন্ত্র (ইধংরপ ফবসড়পৎধপু) হিসেবে গণতন্ত্রের ধারা থেকে বিচ্যুত হওয়া পাকিস্তানের দুই ভাগে বিভক্ত হওয়াকে ত্বরান্বিত করেছিল।
তার গণতন্ত্র আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় যতটা গ্রহণ যোগ্যতা পাক এ নিয়ে অতীতেও যেভাবে মতভেদ ছিলো আজও দেশে দেশে রয়েছে নানা বিতর্ক। সক্রেটিসের যোগ্য শিষ্য ‘দ্য রিপাবলিক’ গ্রন্থের প্রণেতা দার্শনিক প্লেটো (৪২৭ খ্রি: পূ:) গণতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন না। সমালোচকরা প্লেটোর শ্রেণীচরিত্রকে এর জন্য দায়ী করেন। প্লেটো ছিলেন এথেন্সের এক অভিজাত বংশের লোক। ৪০৪ খ্রি: পূ: অব্দের অভিজাত বিদ্রোহের ফলে যে সংস্কার সাধনের সম্ভাবনা দেখা দেয় তাতেও তিনি ছিলেন ভূমিকাহীন। পরে এথেন্সবাসী সীমিত গণতন্ত্রের হাওয়া প্রত্যাখ্যান করে প্লেটোর রাজনৈতিক বিশ^াসকে সত্য বলে প্রমাণ দেয়। অ্যারিস্টটলও যিনি প্লেটোর অন্যতম শিষ্য) গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি মনে করতেন, সমাজের স্বাভাবিক গতি হচ্ছে একটি অভিজাত শ্রেণী শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে অপর একটি অংশ থাকবে শাসিত। তিনি দাস প্রথারও সমর্থক ছিলেন। থিউরি কিংবা দর্শন হিসেবে তাঁদের মতের সমালোচনার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে কিন্তু গণতন্ত্রের নামে অভিজাতের শাসন এবং অবাধ পুঁজিতন্ত্রের নামে শ্রেণী বৈষ্যম্যের নি¤œস্তর দাসপ্রথা একটি বাস্তবতা। পৃথিবীতে এ দু’টিকে তাড়াতে আরেকটি মতাদর্শের বিপ্লব হয়েছিল কার্ল মাকর্সীয় চিন্তার আলোকে বলশেভিক বিপ্লব (১৯১৭)। তাও মার্র্কসের ‘ডাস ক্যাপিটাল’ গ্রন্থের তত্ত্ব মোতাবেক নয়। মার্কস মনে করতেন বিপ্লব (শ্রেণী বিপ্লব) আসবে পুঁজিবাদী ও শিল্পে উন্নত বিশ^ থেকে। কিন্তু তা হয়নি। পুঁজিবাদকে সাপোর্ট দিয়ে চলে এসেছে আধুনিক গণতন্ত্রের ধারণা। মানুষের সম্মতিতে শাসনব্যবস্থা। সেই গণতন্ত্রে চলছে এখন নানা ছলচাতুরীতে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একটা মন্তব্য আছে ঢ়ড়বিৎ পড়ৎৎঁঢ়ঃং ঢ়ড়বিৎ ধহফ ধনংড়ষঁঃব ঢ়ড়বিৎ পড়ৎৎঁঢ়ঃং ধনংড়ষঁঃবষু. অর্থাৎ (ক্ষমতা ক্ষমতাকে কলুষিত করে। নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কলুষিত করে নিরঙ্কুশ ভাবেই। কারণ মানুষ প্রকৃতিগতভাবে আত্মকেন্দ্রিক। নিজের স্বার্থের মোহে আচ্ছন্ন থাকে। ক্ষমতা মানুষের আজন্ম আকাক্সক্ষা। ক্ষমতার এক মোহনীয় আকর্ষণ আছে। মানুষ তাতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লে শুভাশুভ। ন্যায়-অন্যায় বোধ বিলুপ্ত হয়। ‘অর্থবিত্ত’ আরেক মোহ। ক্ষমতার সঙ্গে যার সম্পর্ক। তাই এ দু’টির মোহে আবদ্ধ হলে মানবিক গুণাগুণও বিলোপ পায়। মানুষ চিরসুন্দর ‘মনুষ্যত্ব’ হারিয়ে বসে।
পশু-সমাজে পশুত্ব বিসর্জন দিলে তাকে বধ করা হয়।
যেমন কুকুর পাগল হলে কিংবা সংহারক বলে প্রতীয়মান হলে ইনজেকশন পুশ করে মারা হয় মানবসমাজকে নিরাপত্তা দিতে। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে? তেমনটা করা হয় না। করাও যায় না।
মানুষ যখন ক্ষমতা ও অর্থের মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে তখন আত্মস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য চারিধারে জুটে যায় পরামর্শক। এদের ঝুড়ি ঝুড়ি পরামর্শ গ্রহণ করে শাসক হয়ে পড়েন ক্রমান্বয়ে স্বৈরাচার, জনবিচ্ছিন্ন। কিন্তু সরকারি বেসরকারি স্তাবক জনের দ্বারা পরিবেষ্টিত থেকে আঁচ করতে পারেন না জনপ্রিয়তার ব্যারোমিটারটা। যেখানে যান মানুষের মাথা আর মাথা। এই মাথাগুলো নিজের মাথা বাঁচাতে হাজির হয় শাসক তা জানতে পারেন না।
তাই কোন জনমত জরিপের রিপোর্ট বিশ্বাস করতে চান না শাসক। স্তাবকরাও এমনভাবে কথা বলেন যাতে শাসক প্রকৃত সত্যটি জানতে পারেন না। এভাবে একটা সময় আসে যখন শাসকের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যায়। দেশী-বিদেশী বন্ধুদের আশ^াস শক্তি ও শক্তি প্রয়োগের এজেন্সিদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের নাতিদীর্ঘ ইতিহাসের দিকে তাকালে এমন অনেক ঘটনা উঠে আসবে যা আমাদের অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। সেই অন্ধকার অধ্যায়ের কারণ যদি বিশ্লেষণ করি তবে তেমন কারণ বর্তমান সময়েও খুঁজে পাবো। যেমন শেখ মুজিবুর রহমানের কথা স্মরণ করি। তাঁর মতো জনপ্রিয় জাতীয়তাবাদী নেতার আবির্ভাব পৃথিবীতে বেশি সংখ্যক ঘটেনি। যার অঙ্গুলি হেলানে সেদিন সাড়ে সাত কোটি বাঙালি উঠবস করেছে। ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মরণপণ মুক্তিযুদ্ধে নেতার অনুপস্থিতিতেই। সেই অবিসংবাদিত জনপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবের ১৯৭২-এ পাকিস্তান থেকে এসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে (প্রথমে প্রেসিডেন্ট) জনপ্রিয়তার ধস নামতে বেশিদিন লাগেনি। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শেখ মুজিবুর রহমানের জনসভায় লোক সমাগম ঘটাতে ট্রাক দিয়ে আদমজী জুট মিল থেকে শ্রমিক আমদানি করেও পারা যায়নি পল্টন ময়দানে ভেঙে যাওয়া ছাত্রলীগ (৩১-১০-১৯৭২) (বর মিরাজ) আয়োজিত ছাত্র গণজমায়েতের বিপুল সমাবেশের তুলনায় বেশি ঘটাতে। সেদিন শেখ মুজিব বুঝতে পেরেছিলেন তার জনপ্রিতার পারদ নামতে শুরু করেছে। জনগণ আর তার কথায় বিশ্বাস করে না। তিনি বামদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। বলেছিলেন লাল ঘোড়া দাবড়িয়ে দেয়ার কথাও। রক্ষীবাহিনী গঠন করে নির্যাতন নিপীড়ন চালিয়ে পারা যায়নি জনরোষকে নিয়ন্ত্রণ করা। ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলসহ বামদলের ওপর চালানো হয় স্টিম রোলার। ২৫-৩০ হাজার ভিন্নমতাবলম্বী (বাম চিন্তার) নেতাকর্মীর হত্যার অভিযোগ নিয়ে শেখ মুজিবকে ক্ষমতার মসনদে টিকে থাকার শেষ চেষ্টা হিসেবে বাকশাল প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছিল। ‘এক নেতা এক দেশ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে সোভিয়েট ইউনিয়নের আদলে বামদের সঙ্গে মিতালি করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের কবর রচনা করে যে সংবিধানের গায়ে কাঁচি চালানো হলো (ভিন্নার্থে কলম) চতুর্থ সংশোধন হিসেবে তাও পারেনি বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে। এরপর ১৯৭৫-এর বেদনামন্থির ইতিহাস থেকে যায় একুশ বছরের জন্য আওয়ামী লীগের।
অথচ প্রায় প্রতিদিন তৎকালীন পত্রপত্রিকায় কলাম লিখে বিবেকবান সাংবাদিক সমাজ মুজিবের ভ্রান্তনীতির অনেক সতর্ক ও সমালোচনা করলেও এসব গ্রহণযোগ্য হয়নি তাঁর কাছে। বরং দৈনিক ইত্তেফাকের খন্দকার আব্দুল হামিদ (স্পষ্টভাষী) কে শাসিয়ে, দৈনিক সংবাদের জহুর আহমদ চৌধুরী (দরবার’ই জহুর) কে ধমকে, দৈনিক জনপদের সম্পাদক আব্দুল গাফফার চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা অবশেষে দেশান্তরী আর দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক কবি আল মাহমুদকে পাঠানো হয় জেলে। এভাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ করে প্রকৃত সত্যকে ধামাচাপা দেয়ার অপপ্রয়াস চালানো হয়।
শেখ মুজিবকে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন মহল থেকেই সতর্ক করা হয়েছিল। এমনকি পররাষ্ট্র দফতরের সম্প্রতি গোপনীয়তা ভাবমুক্ত রেকর্ড থেকে জানা যায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার এক বছর আগে সে দেশের পররাষ্ট্র দফতর থেকে শেখ মুজিবকে হত্যা করা হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু শেখ মুজিব তা আমলে নেননি তাঁর বিশ্বাস ছিল দেশের জনগণ তাকে ভালবাসে, এমন দুষ্কর্ম তারা করতে পারে না। আসলে শেখ মুজিব এমন সব লোকের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েছিলেন প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে তাঁর জানার কোন সুযোগই ছিলো না। একইভাবে ভারতের অবিসংবাদিত নেত্রী জওহরলাল নেহরু তনয়া মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর ঘটনা যদি পর্যালোচনা করি তবে দেখি, জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বিভাগের সর্বোচ্চ স্থল থেকে সতর্ক করা হয়েছিল যাতে প্রধানমন্ত্রী স্বীয় দেহরক্ষীর স্কোয়াড থেকে শিখ সম্প্রদায়ের সদস্যদের বাদ দেন। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী সেই উপদেশ কর্ণপাত করেননি। অখন্ড ভারতের প্রতিভূ ইন্দিরা বিশ্বাস করতেন পাঞ্জাবে অপারেশন ‘ব্লু স্টার’ নামে শিখদের স্বর্ণ মন্দিরে (৪ঠা ১৯৮৪) যে অভিযান চালানো হয়েছে তা ভারতের স্বার্থেই বা শিখদের স্বার্থেই, তাই এ ঘটনা কোন প্রতিহিংসার জন্ম দেবে না। কিন্তু মাত্র ৫ মাসের ব্যবধানে ১৯৮৪-র ৩১ অক্টোবর ইন্দিরা হত্যার ঘটনা প্রমাণ করল তাঁর আত্মবিশ^াস ভুল ছিলো। ঐদিন সকালে ইন্দিরা গান্ধী যাচ্ছিলেন তাঁর বাসভবন (১ নম্বর সফদরজঙ্গ রোড) থেকে অদূরে কর্মস্থল (১ নম্বর আকবর রোড) অভিমুখে। অতি সুরক্ষিত সে ভবন। সেখানে একটি দুষ্ট মাছিরও যেন প্রবেশের সুযোগ নেই। সেই নিরাপদ পথে যাত্রাকালে ইন্দিরা আক্রান্ত হলেন স্বীয় শিখ দেহরক্ষী বিয়ান্ত সিং ও যসবন্ত সিংয়ের সেমি অটোমেটিক রাইফেলের ছোড়া গুলিতে।
ইন্দিরার সেদিনের আকস্মিক মৃত্যু গোটা ভারতের জন্য মহা দুর্যোগ ডেকে এনেছিল। কারণ গোটা ভারতে সে সময় বিছিন্নতাবাদী আন্দোলনে প্রবল আকার ধারণ করেছিল বিভিন্ন প্রদেশে। ভারতের অখন্ডতার প্রশ্নে জাতীয় সংহতি রক্ষার্থে ইন্দিরা গান্ধী এবং কংগ্রেসের নেতৃত্ব ছিলো একটি অনিবার্য বিষয়। তাই, ইন্দিরার এই মৃত্যু ঘটনাকে ভারতের জনগণ বিছিন্নতার এক চরমপত্র মনে করতে থাকে। কারণ ১৯৪৭ এর ভারতের স্বাধীনতার পর ১৯৭৭ পর্যন্ত একাধারে ৩০ বছর মাঝে কিছুদিন বাদে) নেহরু ইন্দিরা শাসন (ভিন্নার্থে কংগ্রেসীয় শাসন) আবার ১৯৮০ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত কয়েক বছর জনতা সোচ্ছার শাসন বাদ দিলে কোনো না কোনোভাবে একদিকে নেহরু পরিবার এবং জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে দেশটি শাসিত হয়ে আসছে।
ইন্দিরা মৃত্যুর পর উদ্ভূত ধাক্কা সামলাতে অরাজনৈতিক ব্যক্তি রাজীব গান্ধীকে এনে বসানো হলো প্রধানমন্ত্রীর তখতে। রাজীবের মৃত্যুর পর আবারও নেহরু পরিবার থেকে বেছে নেয়া হলো রাজীব পত্মী সোনিয়া গান্ধীকে। যিনি জন্মগত ভারতীয় ননÑ ইতালিয়ান। ধর্মে হিন্দু নন ক্যাথলিক খ্রিস্টান।
কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে ভারতকে এসব দুর্যোগ থেকে বাঁচিয়েছে গণতন্ত্রের প্রতি ভারতীয় জনগণের প্রবল আস্থা। নেতৃবৃন্দের নির্মোহ জনসেবা ও দেশপ্রেম, ভিন্নার্থে ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠে জনগণের কল্যাণ চিন্তায় আত্মনিবেদনের সদিচ্ছা। অথচ আমরা এই নিকট প্রতিবেশী দেশের কাছ থেকে এতো কিছু আমদানি করতে পারলেও গণতন্ত্রের এই ভালো বিষয়টি নিজেদের চরিত্রে আনতে পারলাম না। বরং অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আমরা ইতিহাসের উল্টোপথে হাঁটতে শুরু করেছি।
আজ দেশে যে রাজনৈতিক সঙ্কট ঘনীভূত হয়েছে তা মূলত গণতন্ত্রের প্রতি সুবিচার না করার জন্য। গণতান্ত্রিক আদর্শ নিয়ে যতো সমালোচনাই করা যাক গণতন্ত্রের বিকল্প বর্তমান আধুনিক সমাজ জীবনে রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে অন্য কোনোটি নেই। গণতন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে সরকার ব্যবস্থা টিকে থাকতে পারে না। যদিও কিছু সময়ের জন্য বিকল্প পথে টিকে যাওয়া সম্ভব কিন্তু সেটা দেশের বৃহত্তর স্বার্থে কল্যাণবহ নয়। কারণ একটি সমাজ গণতন্ত্রের সামান্য স্বার্থ পেলে ভিন্ন কোন কিছু গ্রহণ করতে রাজি হয় না। এ জন্য দেখা যায় বহু দেশে অতর্কিত সঙ্কট নেই জীবনমান উন্নয়নে সরকার প্রভূত অবদান রেখে চলেছে তথাপি একচ্ছত্র শাসন কর্তৃত্বকে মেনে নেয়নি। যেমনভাবে আমাদের দেশের অনেক বয়োবৃদ্ধকে বলতে শুনি পাকিস্তান আমলে অনেক ভালো ছিলাম। এই ভালো, থাকা বলতে তারা সামাজিক জীবনে শান্তিময় পরিবেশ অর্থনৈতিক জীবনে সুস্থির ও স্বাভাবিকতা অপরাধহীনতা ইত্যাদিকে নির্দেশ করেন। তারপরও আমরা স্বাধীনতা চেয়েছিলাম কেন। নিশ্চয় একটা চাওয়া-পাওয়া ছিলো। সেটা ছিলো রাজনৈতিক স্বাধীনতা।
অর্থনৈতিক বিষয়টা যুক্ত হয়েছিল আমাদের স্বাধীনতার দাবিকে জোরালো করার জন্য। আর সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা আমরা হারিয়েছি তা হলো আমরা আমাদের দেশের সবকিছুকে নিজেদের ইচ্ছে মতো চালানো। আজ আমাদের পরমুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হচ্ছে। এক সময় বিশ্বব্যাংক, আইএসএফ, এডিবি, জাইকাসহ নানা আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আমাদের অর্থনীতিকে পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করতো। আর আজ দেখছি আমাদের দেশের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে বা করতে সচেষ্ট ভারত। আমেরিকা, রাশিয়া চীনসহ ইউরোপীয় দেশসমূহ। ছলে বলে নয়, একেবারে সরাসরি। এটা সম্ভব হচ্ছে আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতাদের রাজনৈতিক দুর্বলতার কারণে, এর পরিণাম দেশের জন্য ভয়াবহ। আমরা প্রস্তুত করে দিচ্ছি আমাদের প্রাঙ্গণকে ভিন দেশীদের খেলার মাঠ হিসেবে। আমরা আমাদের কতিপয়ের ব্যক্তিজীবনের আর্থিক উন্নয়নের স্বার্থে এসব করছি। এটা ধরা পড়ে গেছে জনগণের কাছে।
তাই বলছিলাম বর্তমান শাসকও বুঝিবা নানা পরামর্শকের খপ্পরে পড়ে দেশকে গণতন্ত্রের বিপরীত ধারায় নিয়ে যেতে চাচ্ছেন। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিতে চাচ্ছেন। আর তা কেড়ে নেয়া মানে মানুষের মনে ক্ষোভের আগুন প্রজ্বলিত করা। আজ সে আগুন তুষের তো জ¦লছে ঠিক বাতাস পেয়ে কখন দাউ দাউ সর্বগ্রাসী রূপ নেবে তা কিন্তু বলা যায় না। তখন দেশী-বিদেশী পরামর্শকরা দূর থেকে আমাদের গৃৃহদাহ দেখে আনন্দিত হবে, এ ছাড়া অন্য কিছু নয়। কারণ এটাই চায় ওরা। অন্যের গৃহ আগুনে আলু পুড়িয়ে খাওয়ার জন্য ওরা ওঁৎ পেতে বসে আছে সবসময়।
লেখক : কবি ও সাহিত্যিক

SHARE

Leave a Reply