গ্রানাডা ট্র্যাজেডি ও এপ্রিল ফুল ইতিহাসের মর্মান্তিক অধ্যায় । সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

গ্রানাডা ট্র্যাজেডি ও এপ্রিল ফুল ইতিহাসের মর্মান্তিক অধ্যায় । সৈয়দ মাসুদ মোস্তফাজাজিরাতুল আরবের সীমানা পেরিয়ে ইসলামী রাষ্ট্রের পরিধি দিগন্তপ্রসারী হয়ে উঠেছিল সেই সোনালি যুগেই। ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে হযরত আলী (রা)-এর শাহাদাতের পর উমাইয়া খিলাফতের গোড়াপত্তন হয়। সে সময় মুসলমানরা ব্যাপকভাবে সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ করে এবং ইউরোপের প্রতাপশালী ও অত্যাচারী শাসক রডারিককে পরাজিত করে স্পেন দখল করে নেয়। স্পেন হয়ে যায় ইউরোপের মুসলিম রাষ্ট্র। স্পেনের প্রজা উৎপীড়ক রাজা রডারিক ক্ষমতায় এসেছিলেন তার পূর্বসূরি শাসক ইউটিজাকে হত্যা করে। এ সময় সিউটা দ্বীপের শাসক ছিলেন কাউন্ট জুলিয়ান। জুলিয়ান তার কন্যা ফোরিন্ডাকে রাজকীয় রসম-রেওয়াজ, আদব-কায়দা শেখাতে রডারিকের কাছে প্রেরণ করেন। কিন্তু রডারিক ফোরিন্ডার সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। উইটিজা ছিলেন জুলিয়ানের শ্বশুর। শ্বশুর হত্যা ও কন্যার সম্ভ্রমহানির প্রতিশোধ নিতে জুলিয়ান মুসলিম বীর মুসাকে আমন্ত্রণ জানান স্পেন দখলের জন্য।
স্পেনের আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থা যখন অত্যন্ত শোচনীয়, তখনই মুসাকে স্পেন আক্রমণের আহবান জানানো হয়। তদানীন্তন মুসলিম বিশ্বের খলিফা ছিলেন ওয়ালিদ। মুসা খলিফার অনুমতি নিয়ে সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদকে পাঠান স্পেন অভিযানের জন্য। মুসা পরে এসে তার সাথে যোগ দেন। সেনাপতি তারিক ১২ হাজার সৈন্য নিয়ে রডারিকের ১ লক্ষ ২০ হাজার সৈন্যের মোকাবিলায় এগিয়ে আসেন। সৈন্যসংখ্যার বিশাল ব্যবধান তাকে মোটেও বিচলিত করতে পারেনি। তিনি বিশ্বাস করতেন তাদের শক্তি লোকবল নয় বরং ঈমানের দ্যুতিই আসল শক্তি। কিন্তু এই সংখ্যাধিক্য সাধারণ সৈন্যদের মনে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে। সেনাপতি তারেক তা উপলব্ধি করে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। তিনি সকল সৈন্যকে সমবেত করে তাদের বাহন জাহাজগুলো আগুনে পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। তিনি তার সাথীদের উদ্দেশ্যে এক ঐতিহাসিক ভাষণে বলেন-
‘হে মুজাহিদগণ! তোমরা পালাবে কোথায়? তোমাদের পেছনে সাগর, আর সামনে শত্রু। তোমাদের আছে কেবল সাহস আর ধীশক্তি। মনে রেখ এদেশে তোমরা সেই এতিমদের চেয়েও বেশি অসহায়, যাদের লোভী মালিকদের সাথে টেবিলে বসতে হয়। তোমাদের সামনে শত্রু যাদের সংখ্যা অসংখ্য। তাদের বিপরীতে তোমাদের তলোওয়ার ব্যতীত আর কিছুই নেই। তোমরা বেঁচে থাকতে পারবে যদি শত্রুদের হাত থেকে নিজেদের জীবনকে ছিনিয়ে আনতে পার। ভেবো না আমি তোমাদের সাথে থাকব না। আমি সবার সামনে থাকব এবং আমার বাঁচার সম্ভাবনা সবচেয়ে কম।’
সেনাপতি তারেকের এই ভাষণে মুসলিম বাহিনী উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। ৭১১ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ এপ্রিল ‘ওয়াদি লাস্কের’ নামক স্থানে ভিসিগোথ বাহিনীর সাথে মুসলিম বাহিনীর তুমুল লড়াই হয়। যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করে। রডরিক পালাতে গিয়ে নদীতে ডুবে মারা যায়। তারেক আরো অগ্রসর হন এবং একের পর এক শহর নিজের করায়ত্তে নিতে থাকেন। সে ধারাবাহিকতায় ৭১১ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবরে কর্ডোভা বিজিত হয়। এভাবেই সমস্ত হিসপাহানিয়া তথা স্পেন মুসলমানদের আধিপত্যে চলে আসে।

গ্রানাডা ট্র্যাজেডি ও এপ্রিল ফুল ইতিহাসের মর্মান্তিক অধ্যায় । সৈয়দ মাসুদ মোস্তফাতারপর মুসা বিন নুসাইর পিরিনিজ পর্বতে দাঁড়িয়ে সমগ্র ইউরোপ জয়ের স্বপ্ন আঁকছিলেন আর স্পেন থেকে বিতাড়িত ‘গথ’ সম্প্রদায়ের নেতারা পিরিনিজের ওপারে স্পেন পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা আঁটছিলেন। তাদের সঙ্গে যুক্ত হন ইউরোপের খ্রিষ্টান নেতারা। মুসলমানরা পিরেনিজ অতিক্রম করে ফ্রান্সের অনেক এলাকা জয় করেন। কিন্তু অ্যাকুইটেনের রাজধানী টুলুর যুদ্ধে ভয়াবহতার সম্মুখীন হয়ে তারা বুঝতে পারলেন যে, অসির পরিবর্তে মসির যুদ্ধের মাধ্যমেই ইউরোপ জয় করা সহজতর। এরপর মুসলমানদের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হলো জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ও বিস্তারে। তারা সেই যুদ্ধে সফল হন এবং প্রণিধানযোগ্য ইতিহাস তাদের বিজয়কে স্বীকৃতি দিয়েছে। অপরদিকে খ্রিস্টীয় শক্তি পুরনো পথ ধরেই হাঁটতে থাকে। ৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ মে মাসারার যুদ্ধের পর থেকে স্পেনের ওপর তাদের নানামুখী আগ্রাসন ও সন্ত্রাস চলতে থাকে। ফলে স্পেনের নিরাপত্তা হয়ে পড়ে হুমকির সম্মুখীন।
স্পেনে ইসলামের বিজয় ছিলো সাধারণ মানুষের বহুল আকাঙ্ক্ষিত ও প্রত্যাশিত। আর এ জন্যই মুসলমানদের এই বিজয় সহজ হয়েছিল। স্পেনবাসী জ্ঞান-বিজ্ঞান-আদল-ইনসাফ, সাম্য- সৌহার্দ্য-ভ্রাতৃত্ব, সভ্যতা ও সংস্কৃতির এক নতুন দিগন্তে পদার্পণ করেছিল মুসলিম শাসনামলে। মুসলিম শাসনের সময় স্পেনের রাজধানী ছিলো গ্রানাডা এবং অপর প্রধান শহর ছিলো কর্ডোভা। গ্রানাডা গড়ে ওঠে মুসলিম সভ্যতার একটি তীর্থস্থান হিসেবে।
সেখানকার আলহামরা প্রাসাদ, গ্র্যান্ড মসজিদ আজো বিশ্ববাসীর কাছে বিস্ময়কর ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য। কর্ডোভায় গড়ে উঠেছিল প্রভূত সংখ্যক জ্ঞান-বিজ্ঞানের শীর্ষকেন্দ্র। বাগদাদের নিজামিয়া বিশ্বদ্যিালয়ের চেয়েও বড় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে ওঠে কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়। সমগ্র ইউরোপ থেকে দলে দলে শিক্ষার্থীরা আসতেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে পরিচিত হতে। আধুনিককালে যেমন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষার্থীরা হার্ভার্ড কিংবা অক্সফোর্ডে যান, তখন যেতেন কর্ডোভায়।
মুসলিম শাসন আমলে স্পেনের ঘরে ঘরে ইসলামের বিস্তার ঘটেছিল। প্রতিটি জনপদে গড়ে তোলা হয়েছিল দৃষ্টিনন্দন মসজিদ। দুই সভ্যতার মিলনকেন্দ্র স্পেনে দীর্ঘ মুসলিম শাসনামল ছিলো শিক্ষা-সংস্কৃতি, সভ্যতার চরম উৎকর্ষের কাল। ধর্মীয় সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের লালন ও বিকাশের সময়। এ সময়ে স্পেনীয় মুসলমানগণ সমগ্র ইউরোপের সামনে সভ্যতা ও সংস্কৃতির মডেল হিসেবে চিহ্নিত হয়। ১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দে ক্রিস্টোফার কলম্বাস প্রথম আমেরিকা আবিষ্কারের দাবি করলেও স্পেনের মুসলমানরা তার অনেক আগে থেকেই আমেরিকানদের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। স্পেনের মুসলিম সভ্যতাকে ইউরোপীয়রা স্বীকৃতি দিয়েছে ‘মরুসভ্যতা’ হিসেবে। সে সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লোকেরা স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য নিয়মিত গোসল করতেও অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি। অথচ মুসলমানরা রাস্তার রাস্তায় গড়ে তুলেছিলেন হাম্মামখানা। সেখানে শুধু অজু-গোসলের ব্যবস্থাই থাকতো না বরং থাকতো সুগন্ধি, প্রসাধন ও সাবানের ব্যবস্থা।
স্পেনের পূর্ব নাম হিসপাহানিয়া। মুসলিম বিজয়ের পর নতুন নামকরণ করা হয় আন্দালুসিয়া। রাজধানী স্থানান্তরিত হয় কর্ডোভায়। বিজয়ী মুসলমানরা আন্দালুসিয়ায় অনেক স্থাপনা নির্মাণ করেন। মুসলমানরা প্রকৃত পক্ষেই শিক্ষানুরাগী। সমস্ত ইউরোপ যখন মূর্খতা, কুসংস্কার আর অন্ধবিশ্বাসে নিমজ্জিত ছিল সেখানে মুসলমানেরা আন্দালুসিয়ায় ৮০০টি শিক্ষা কেন্দ্র, ৭০০টি মসজিদ, ৭০টি লাইব্রেরি স্থাপন করেছিল। লাইব্রেরিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় লাইব্রেরিটিতে প্রায় ৬ লক্ষাধিক গ্রন্থাদি স্থান পেয়েছিল। এ ছাড়া ৯ শ পাবলিক গোসল খানা, ৬০ হাজার প্রাসাদ এবং প্রভূত সংখ্যক রাস্তাঘাট নির্মিত হয় মুসলিম শাসনামলে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় মুসলমানদের পদচারণা ছিল চোখে পড়ার মত।
মুসলিমদের স্পেন বিজয় ও সভ্যতার বিবর্তন খ্রিষ্টীয় শক্তি স্বাভাবিকভাবে নেয়নি বরং তারা শুরু থেকেই মুসলমানদের অগ্রযাত্রা রোধে নানাবিধ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। বিশ্বব্যাপী মুসলমানরা যখন অপ্রতিরোধ্য, রোম-পারস্যসহ সমগ্র পরাশক্তি যখন মুসলিম শাসনের অধীনে চলে আসে, ঠিক তখনি ইউরোপের খ্রিষ্টান সম্প্রদায় নতুনভাবে জেগে উঠলো ক্রুসেডীয় চেতনায়। তারা সমস্ত খ্রিষ্টান রাজন্যবর্গ ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের কাছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যের ডাক দেয়। সে ডাকের মূলমন্ত্রই ছিল-মুসলমানদের পরাজিত করে ইসলামের অগ্রযাত্রাকে ঠেকানো। এর নাম দেয়া হয় ‘ক্রুসেড’ বা ‘ধর্মযুদ্ধ’। সমগ্র ইউরোপ জুড়ে ক্রুসেডের আহ্বানে সাড়া দেয় সম্মিলিত খ্রিষ্টীয় শক্তি। নিজেদের বিভেদ ভুলে তারা মুসলিম শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। শুরু হয় ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের।
৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর (রা) বিনাযুদ্ধে জেরুজালেম দখল করে নিয়েছিলেন। কিন্তু ১০৯৯ সালে মুসলমানদের আন্তঃকলহের সুযোগে পোপ দ্বিতীয় আরবান প্রেরিত ইউরোপীয় খ্রিষ্টান বাহিনী জেরুজালেম দখল করে ৪৬১ বছরের একটানা মুসলিম আধিপত্যের অবসান ঘটায়। ১০৯৫ সালে এ যুদ্ধের আহবান জানানো হয়। ১০৯৭ সালে পোপের মূল বাহিনী ফ্রান্স থেকে রওয়ানা হওয়ার কথা থাকলেও মাঝখানে পিটার নামক এক ভবঘুরে ১০৯৬ সালে তার বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হয়ে পরাজিত হয়। ১০৯৭ সালে মূল ক্রুসেডাররা জেরুজালেমের কাছে গেলে সুলতান সুলায়মান তাদেরকে খুব শক্তিশালী মনে করেননি। ফলে তারা অনেকটা নির্বিঘ্নে এগিয়ে যেতে সমর্থ হয়।
এ সময় এশিয়া মাইনরের তুর্কি সুলতান, সিরিয়ায় আরব আর মিসরে ফাতেমীয় সুলতান পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হলে বিদেশী ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এগিয়ে আসেননি। ১০৯৭ তে ক্রুসেড বাহিনী এন্টিয়ক অবরোধ করে ৬০ জন বন্দী মুসলমানকে পুড়িয়ে হত্যা করে। খাদ্যভাবসহ নানা প্রতিবন্ধকতায় তখন ক্রুসেড বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছিল, তখন ফিরোজ নামক এক পারসিক বিশ্বাসঘাতক শত্রুদেরকে দুর্গে ঢোকার গোপনপথ দেখিয়ে দেয়।
১০৯৯ সালের মে মাসে ক্রুসেডাররা জেরুজালেম অবরোধ করে। জেরুজালেম যেহেতু মিসরীয় সুলতানের দখলে সেহেতু সিরীয় মুসলিম বাহিনী নিষ্ক্রিয় থাকে। হারতে হারতে জিতে যায় ক্রুসেডারা। শান্তির দূত বলে দাবিদার ক্রুসেডাররা নগরবাসীকে নিমর্মভাবে হত্যা করে। এমনকি ‘মসজিদুল আকসা-র’ আশ্রয় নেয়া মুসলমানদেরকেও সে সময় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
১১৪৪ সালে মসুলের সুলতান ‘আতাবেগ এডেসা’ দুর্গ ক্রুসেডারদের হাত থেকে দখল করে নেন। ১১৪৫ সালে পোপ তৃতীয় ইউজিনিয়াস দ্বিতীয় ক্রুসেডের ডাক দেন। ১১৪৮ সুলতান নুরুদ্দীনের হাতে সম্মিলিত ক্রুসেডারদের পতন হয়। ১১৮৭ সালে সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবী সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করে জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করেন এবং সেখানে জুমার নামাজ আদায় করেন। দ্বিতীয়বারের মতো জেরুজালেম দখল করলেও মুসলমানরা কোন রক্তপাত ঘটায়নি। ৮৬ বছর পূর্বে ক্রুসেডাররা জেরুজালেমে যে নৃশংসতার পরিচয় দিয়েছিলো মুসলমানরা এতদিন পর তার মধুর প্রতিশোধ নিলেন সব বন্দীকে মুক্ত করে দিয়ে।
এরপরও ক্রুসেড হয়েছে বারবার। ষষ্ঠ ক্রুসেডের সময় পর্যন্ত বারবার প্রতারণার আশ্রয় নেয় খ্রিষ্টান রাজন্যবর্গ ও ক্রুসেডাররা। ১০৯৫ থেকে দীর্ঘ ১৯৬ বছর পর্যন্ত এইসব ক্রুসেডের ফলে বহু নিরীহ মানুষকে জীবন হারাতে হয়। চূড়ান্তভাবে ১২৪৪ সালে জেরুজালেম মুসলমানদের দখলে আসে। ১২৪৪ থেকে ১৯১৯ পর্যন্ত একটানা ৬৭৫ বছর জেরুজালেম মুসলিম শাসনে থাকে। ১৯১৯ সালে ইংরেজ জেনারেল এলেনবাই জেরুজালেম শহরে সদলবলে ঢুকে ক্রুসেডের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
মূলত মুসলিম শাসকদের অদূরদর্শী নেতৃত্ব, জনগণের অসচেতনতা ও অনৈক্যের ফলে বিশ্বের নানা প্রান্তে মুসলিম জাতিকে দিতে হয়েছে চরম মূল্য। এই মাশুলেরই একটি হচ্ছে ঐতিহাসিক গ্রানাডা ট্র্যাজেডি, যা মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক বিভীষিকা ও দুঃসহ স্মৃতি।
স্পেনে মুসলমানদের শাসক তখন বাদশাহ হাসান। আবু আবদুল্লাহ ছিলেন সুলতান হাসানের ছেলে। খ্রিষ্টানরা হাসানের বিরুদ্ধে তার পুত্র আবু আবদুল্লাহকে বিদ্রোহী করে তোলে ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে। পিতার বিরুদ্ধে আবু আবদুল্লাহ বিদ্রোহ করলে তিনি ক্ষমতা ছেড়ে পলায়ন করেন এবং আবু আবদুল্লাহ ক্ষমতা গ্রহণের পরই শুরু হয় স্পেনের মুসলমানদের পতন। আবু আবদুল্লাহ দুর্বল নেতৃত্ব, নৈতিক অবস্থান ও মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ অনৈক্যের সুযোগ গ্রহণ করে সম্মিলিত খ্রিষ্টশক্তি। আর সে ষড়যন্ত্রকে মজবুত ভিত্তি দিতেই আরগুনের শাসক ফারডিনান্ড এবং কাস্তালিয়ার পুর্তগিজ রানি ইসাবেলা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
মূলত স্পেনে মুসলমানদের পতনের জন্য সম্মিলিত খ্রিষ্টীয় শক্তির ন্যক্কারজনক ষড়যন্ত্র ও নিজেদের আন্তঃকলহই প্রধানত দায়ী। আর সে ধারাবাহিকতায় ১৪৮৩ সালে আবু আবদুল্লাহ লুসান আক্রমণ করে পরাজিত ও বন্দি হন। পরবর্তীতে গ্রানাডার গভর্নরের সাথে তার গৃহযুদ্ধ বেধে যায় যা ছিল ফারডিন্যান্ডের ষড়যন্ত্র। এভাবে গৃহযুদ্ধের ফলে মুসলমানদের শক্তি কমতে থাকলে খ্রিস্টান বাহিনী গ্রানাডা অবরোধ করে। তখন মুসলমানদের পক্ষে খ্রিষ্টবাহিনীকে প্রতিরোধ করার মত মানসিক শক্তিও ছিল না। ফলে তারা প্রতিপক্ষের সাথে একটা আপসরফার সিদ্ধান্ত নেয় ১৪৯২ সালে ‘ক্যাপিচুলেশন অব গ্রানাডা’ চুক্তির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্দালুসিয়ায় মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। মুসলিমদের ধর্মীয়, ভাষাগত এবং অর্থনৈতিক সুবিধাই ছিল এ চুক্তির বিষয়বস্তু।
ফার্ডিন্যান্ড আবু আবদুল্লাহকে আশ্বস্ত করেন যে তারা যদি বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তাহলে তাদের জান-মালের নিরাপত্তা প্রদান করা হবে। দুর্বল রাজা ও তার সভাসদগণ অতীতের চুক্তিভঙ্গের রেকর্ড ভুলে গিয়ে ফার্ডিন্যান্ডের সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অনেক সাহসী সৈনিক আত্মসমর্পণের পরিবর্তে লড়াই করে শাহাদাতকে বেছে নিলেও অন্য সকলে গ্লানিকর আত্মসমর্পণের পথ গ্রহণ করে। শুরু হয় গণহত্যা ও ধ্বংষযজ্ঞ। খ্রিষ্টান সৈন্যরা মুসলমানদের শস্যক্ষেত্র জ্বালিয়ে দেয়। সমৃদ্ধিশালী গ্রামগুলো ধ্বংস করা হয়। গবাদিপশু তুলে নিয়ে যায়।
ফলে সহজেই ফার্ডিন্যান্ড গ্রানাডার রাজপথসহ পুরো শহর দখল করে নেয় ২৪ নভেম্বর ১৪৯১ সালে। এরপর শুরু হয় নৃশংস ও বর্বর হত্যাবজ্ঞ, লুণ্ঠন ও ধর্ষণ। এসব অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে উঠলে অনেক মুসলিমরা বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহ করেন। বিদ্রোহী এসব লোকজনকে হত্যা করার পাশাপাশি এক পর্যায়ে ফার্ডিন্যান্ড ও ইসাবেলার বাহিনী ঘোষণা করে যারা শান্তি চায় তারা যেনো সব মসজিদে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে।
সরল বিশ্বাসে, ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় হাজার হাজার মুসলিম আবালবৃদ্ধবনিতা নগরীর মসজিদগুলোতে আশ্রয় নেন। কিন্তু রাতের আঁধারে জ্বালিয়ে দেয়া হয় সমস্ত মসজিদ। প্রজ্বলিত আগুনের লেলিহান শিখা, নারী-পুরুষের আর্তনাদ আর ফার্ডিন্যান্ড-ইসাবেলার যুগপৎ অট্টহাসিতে গ্রানাডার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। এ ঘটনা ছিল ১৪৯২ সালের ১লা এপ্রিল। ইতিহাসের নিকৃষ্টতম প্রতারণা, নির্মমতা, নিষ্ঠুরতার ও নারকীয় বিয়োগান্ত ঘটনা সংঘটিত হয় সেদিন। হাসি তামাশাচ্ছলে এই দিনে ‘এপ্রিল ফুল’ তথা ‘এপ্রিলের বোকা’ উদযাপিত হলেও এটি মূলত মুসলমানদের জন্য এক ট্র্যাজেডির দিন।
এর পরের ইতিহাস অত্যন্ত ভয়াবহ ও মর্মান্তিক। ১৫০১ সালে এ চুক্তি ভঙ্গ করে আন্দালুসিয়ার খ্রিস্টান শাসক মুসলিম নাগরিকদের ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করা শুরু করেন। যারা ধর্মান্তরিত হতে অস্বীকৃতি জানায় তাদেরকে গণহারে হত্যা করা হতো। পরবর্তীতে তারা একটি পরিকল্পনা করে। খ্রিষ্টানরা ৩ দিনের মধ্যে মুসলমানদের স্পেন ছাড়ার নির্দেশ দেয়। তারা আরো ঘোষণা করে, যারা মুসলমান তারা যদি খ্রিস্টান জাহাজগুলোতে ওঠে তাহলে তাদের মুসলিম দেশগুলোতে পৌঁছে দেয়া হবে। এবারও মুসলমানরা প্রতারণা ও নির্মমতার শিকার হন। খ্রিষ্টান রাজা তাদের গভীর সমুদ্রে নিয়ে জাহাজগুলো ডুবিয়ে দেয়। আর এভাবেই শেষ হয় স্পেনে মুসলিম শাসনের সোনালি অধ্যায়।
এই নির্মম গণহত্যার পরও যেসব মুসলমান আন্দালুসিয়ায় রয়ে গিয়েছিলেন, তাদের ফার্ডিন্যান্ডের ছেলে তৃতীয় ফিলিপ সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় সমুদ্রপথে নির্বাসিত করেন। তাদের সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখেরও বেশি। তাদের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক লোকই জীবিত ছিলেন। বিপুলসংখ্যক মানুষ সমুদ্রের গহিন অতলে হারিয়ে যান চিরদিনের জন্য। এভাবেই মুসলিম আন্দালুসিয়া আধুনিক স্পেনের জন্ম দিয়ে ইতিহাসের দুঃখ হয়ে বেঁচে আছে।
মূলত ইউরোপে মুসলমানরা প্রবেশ করেছিলেন স্পেনের দরজা দিয়ে। ঐতিহাসিক রবার্ট ব্রিফল্ট ‘দ্য ম্যাকিং অব হিউম্যানিটি’ গ্রন্থে মুসলমানদের এ প্রবেশকে অন্ধকার কক্ষের দরজা দিয়ে সূর্যের আলোর প্রবেশ বলে অভিহিত করেছেন। রবার্ট ব্র্রিফল্টের বক্তব্য হলো ‘যেহেতু স্পেনে মুসলমানদের আগমনের ফলে শুধু স্পেন নয়, বরং গোটা ইউরোপ মুক্তির পথ পেয়েছিল এজ অব ডার্কনেস তথা হাজার বছরের অন্ধকার থেকে। এজ অব ডার্কনেস সম্পর্কে রবার্ট ব্রিফল্টের মন্তব্য হলো ‘সেই সময় জীবন্ত অবস্থায় মানুষ অমানুষিকতার অধীন ছিল, মৃত্যুর পর অনন্ত নরকবাসের জন্য নির্ধারিত ছিল।’
মুসলিম সেনাপতি তারেক-মুসার বীরত্বগাথায় মুসলমানরা আন্দালুসিয়া তথা স্পেনে ইসলামের বিজয় নিশান ওড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু খ্রিষ্টবাদী ষড়যন্ত্র, মুসলিমদের অনৈক্য ও শাসকগোষ্ঠীর ব্যর্থতার কারণেই স্পেন অনেক আগেই মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। কিন্তু মুসলমান ও ইসলামের বিরুদ্ধে ইহুদি-খ্রিষ্টবাদী ষড়যন্ত্র আজও বন্ধ হয়নি। সে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে ১ এপ্রিল গ্রানাডা ট্র্যাজেডির পাঁচ শ’ বছর উদযাপন উপলক্ষে স্পেনে আড়ম্বরপূর্ণ এক সভায় মিলিত হয়েছিল বিশ্ব খ্রিস্টান সম্প্রদায়। সভায় একচ্ছত্র খ্রিস্টান বিশ্ব প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় গ্রহণ করা হয়। বিশ্বব্যাপী মুসলিম জাগরণ ঠেকাতে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘হলি মেরি ফান্ড’।
সে ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় খ্রিষ্টীয় শক্তি নানা অজুহাতে ইরাক, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, লিবিয়াসহ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে একের পর এক আগ্রাসন চালায় এবং তা এখন পর্যন্ত সে ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে। সে ষড়যন্ত্রেরই নির্মম শিকার হয়েছে কাশ্মির, আরাকান, চেচনিয়া, চীনের উইঘুরসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের আজাদি প্রত্যাশী মুসলমানরা। ‘জাবাল আল তারেক’ সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ৭১১ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়া শাসনামলে মুসলমানরা তারেক-বিন জিয়াদের নেতৃত্বে ভূমধ্যসাগরের উত্তর তীরস্থ স্পেনকে রক্ষা করেছিল রডারিকের দুঃশাসন থেকে। মুসলিমবিদ্বেষী ইউরোপীয়রা এখন তার নাম বদলে রেখেছে ‘জিব্রাল্টার’। যা ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক ষড়যন্ত্রের অংশ।
স্পেনে মুসলমানদের গৌরবগাঁথা আর অবশিষ্ট নেই বরং ১৪৯২ সালের ১ এপ্রিল ঐতিহাসিক গ্রানাডা ট্র্যাজেডির মাধ্যমে তার অবসান হয়েছে। সেদিন খ্রিষ্টশক্তি মুসলমানদের নিরাপত্তার আশ্বাসে মসজিদে একত্রিত করে মুসলিম আবাল-বৃদ্ধ-বনিতাকে যেভাবে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছিল তা ইতিহাসের সকল নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতাকে হার মানিয়েছে। তারেক-মুসার স্পেন মুসলমানদের জন্য এখন অতীত স্মৃতি বৈ কিছু নয়।
স্পেন হয়ে আছে মুসলিম উম্মাহর শোকের স্মারক। ১ এপ্রিল আসে সেই শোকের বার্তা নিয়ে। ইহুদি-খ্রিষ্টবাদীরা ১ এপ্রিল ঐতিহাসিক গ্রানাডা ট্র্যাজেডি দিবসকে ‘অঢ়ৎরষ ঋড়ড়ষ’ তথা ‘এপ্রিলের নির্বোধ’ হিসেবে পালন করে। একশ্রেণির মুসলমানদেরকেও এই গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসাতে দেখা যায়, যা আত্মপ্রতারণা ও ঐতিহাসিক গ্রানাডা ট্র্যাজেডির শহীদদের সাথে পরিহাস ছাড়া কিছু নয়। তাই নিজেদের আত্মপরিচয় ফিরে পেতেই মুসলমানদেরকে এই অশুভ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply