গ্রানাডা থেকে দিল্লি মানবিক বিপর্যয়ের কালো অধ্যায় -ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

পহেলা এপ্রিল ঐতিহাসিক গ্রানাডা ট্র্যাজেডি দিবস, মুসলিম উম্মাহর শোকের দিন। অন্যদিকে ‘এপ্রিল ফুল’ অর্থাৎ এপ্রিলের বোকা একটি প্রতারণার নাম, খ্রিস্টানদের হাসি-ঠাট্টা, তামাশা আর মুসলমানদের প্রতি উপহাসের আনুষ্ঠানিকতার দিন। ১৪৯২ সালের পহেলা এপ্রিল স্পেনের রাজা ফার্ডিনান্ড-এর নেতৃত্বে খ্রিস্টানদের সম্মিলিত বাহিনী ঘৃণ্যতম প্রতারণার মাধ্যমে স্পেনের রাজধানী গ্রানাডাতে অসংখ্য মুসলমান নারী-পুরুষকে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে এবং পানিতে ডুবিয়ে মেরেছিল। বিশ্ব খ্রিস্টান সম্প্রদায় তাদের রচিত প্রতারণাকে স্মরণ করে রাখতে ১৫০০ সালের ১ এপ্রিল থেকে এই দিনকে ‘এপ্রিল ফুল’ হিসেবে হাসি, ঠাট্টা এবং মিথ্যা প্রেম দেয়া-নেয়ার দিন হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে সাড়ম্বরে পালন করে থাকে। মুসলমানদের লজ্জা দেয়া ও ইসলামকে হেয় করার জন্য মূলত এ দিবসটি প্রতি বছর পালন করা হয়।

স্পেনীয় ঐতিহ্যের ধারক মুসলমান
স্পেনকে আলোকিত করেছিল মুসলমানরাই। মুসলিম সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদ ভূমধ্যসাগরের উত্তাল তরঙ্গমালা পাড়ি দিয়ে ১২ হাজার সৈন্য নিয়ে রাজা রডরিকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। রাজা রডরিকের শাসনামল ছিল স্পেনের জন্যে এক দুঃস্বপ্নের কাল। জনগণ ছিল রডরিক ও গথ সম্প্রদায়ের উৎপীড়নের অসহায় শিকার। তারা তারিক বিন জিয়াদকে আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করে। ৭১১ সালের ৩০ এপ্রিল বৃহস্পতিবার রাজা রডরিক পলায়নের সময় গুয়াডেল কুইভারের পানিতে নিমজ্জিত হয়ে মারা যায়। জনগণের সহযোগিতায় মুসলমানরা একে একে অধিকার করলেন মালাগা, গ্রানাডা, কর্ডোভা, থিয়োডমির শাসিত সমগ্র আলজিরিয়াস। এদিকে আরেক সেনাপতি মুসা বিন নুসাইর পূর্বদিকের সমুদ্রপথ ধরে ৭১২ সালের জুন মাসে আবিষ্কার করেন সেভিল ও মেরিজ। তিনিও স্পেনের বিভিন্ন শহর অধিকার করে টলেডোতে গিয়ে মিলিত হলেন তারিকের সঙ্গে। তারপর তারা এগিয়ে যান আরাগনের দিকে। জয় করেন সারাগোসা, টারাগোনা, বার্সেলোনা এবং পিরিনেজ পর্বতমালা পর্যন্ত গোটা স্পেন। মুক্ত আকাশে পতপত করে উড়তে থাকে মুক্তিকামী মানুষের প্রাণের স্পন্দন ইসলামের বিজয় পতাকা।
স্পেনে মুসলিম শাসন শুরুর পর সমগ্র ইউরোপে খুব দ্রুত ইসলামের বিকাশ লাভ করতে থাকে। ৭১১ থেকে ১৪৯২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ৮০০ বছরের শাসনামলে মুসলমান স্পেনকে পরিণত করেছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক স্বর্গরাজ্যে। শিক্ষা-সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-বাণিজ্যে ইত্যাদির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল স্পেন। মুসলিম শাসনের সময় স্পেনের রাজধানী ছিল গ্রানাডা। সেখানকার আল হামরা প্রাসাদ, গ্র্যান্ড মসজিদ আজো মানুষদের কাছে বিস্ময়কর স্থাপত্য। স্পেনের কর্ডোভা মসজিদটি সে সময় মুসলমানদের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতা-সংস্কৃতির পাদপীঠ হিসেবে পরিগণিত হতো। এছাড়াও সারা স্পেনে তৈরি হয় হাজারো মসজিদ। শুধুমাত্র গ্রানাডা শহরেই ছিল ১৭০০ মসজিদ। কর্ডোভায় গড়ে ওঠে জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্রসমূহ। বিশ্বের অন্যতম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে ওঠে কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়। এ দীর্ঘ সময়ে মুসলমানেরা স্পেনের বর্বর চেহারা সম্পূর্ণ সভ্যতার আলোকে উদ্ভাসিত করেন। তাদের ন্যায়-ইনসাফ আর ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে মানুষ দলে দলে আশ্রয় নেয় ইসলামের ছায়াতলে। আধুনিক ইউরোপ যে সমস্ত আচার-আচরণ, রীতিনীতি বা সদগুণের জন্য বড়াই করে সেগুলো বহুলাংশে মুসলিম স্পেন থেকে আমদানি হয়েছে। কূটনীতি, মুক্ত-বাণিজ্য, খোলা-সীমান্ত, শিক্ষা-গবেষণা, নৃতত্ত্বের পদ্ধতি, আচরণ, ফ্যাশন, বিভিন্ন ধরনের ঔষধ, হাসপাতাল ইত্যাদি সবকিছু কর্ডোভা থেকে এসেছে। সারা ইউরোপ থেকে দলে দলে শিক্ষার্থীরা এসে এখানে জড়ো হয় মুসলিম জগতের সহায়তায় গড়ে ওঠা জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য। এ বাতিঘর থেকে আলোকিত হয়েই আধুনিক ইউরোপের শিল্প বিপ্লবের নায়কেরা নিজ নিজ দেশে শিল্প গবেষণা ও উন্নয়নের রেনেসাঁর সূচনা করেন।

ষড়যন্ত্রের ফাঁদে মুসলমান
স্পেন থেকে মুসলমানদেরকে চির উৎখাত করার লক্ষ্যে খ্রিস্টান গোষ্ঠী ষড়যন্ত্রে মরিয়া হয়ে ওঠে। খ্রিস্টান পাদ্রিরা রাজা ফার্ডিন্যান্ডকে পরামর্শ দেয় যে, মুসলমানদের ভিতর থেকে এমন কিছু মানুষকে খুঁজে বের করতে হবে যারা পার্থিব বিষয়ে খুবই চিন্তাশীল। রাজা ফার্ডিন্যান্ড সে মোতাবেক গোটা স্পেন থেকে কয়েকজন তথাকথিত আলিমসহ কিছু মুসলিমকে নানা কৌশলে করায়ত্ত করে ফেলে। তাদেরকে উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়। তাদের কাজ ছিল মুসলমানদের ঈমান নষ্ট করার জন্য কিছু ধর্মীয় কাজ সৃষ্টি করা এবং বাদশাহ আবুল হাসানের বিরুদ্ধে জনগণকে ক্ষেপিয়ে তোলা। সেই সাথে তারা বিচক্ষণ মুসলিম আলিমদের অপহরণ করে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করতো না। এমনকি খ্রিস্টান গোয়েন্দারা ইসলামের বিধিবিধানের প্রশিক্ষণ নিয়ে আলিম লেবাস ধরে বিভিন্ন মসজিদে ইমামতিও করেছে। তাদের কাজ ছিলো স্পেনের সমাজজীবনকে অস্থিতিশীল করে তোলা। রানি ইসাবেলা ও তার স্বামী রাজা ফার্ডিন্যান্ড মুসলিমদের হত্যা করার নিমিত্তে চক্রান্ত করলে অন্যান্য খ্রিস্টান রাজারাও তাদের সাহায্য-সহযোগিতায় হাত সম্প্রসারণ করে। ফার্ডিন্যান্ডের গুপ্তচরেরা বাদশার পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি করে। এভাবে দেশব্যাপী প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা ষড়যন্ত্রে স্পেনের মুসলমানদের ঈমান বিনষ্ট হয়ে যায়। স্পেনের সর্বশেষ নেতৃত্ব বাদশাহর ভাতিজা মুসা বিন আবি গাসসানকে গুম করে হত্যা করা হয়। মজবুত ঈমানের অধিকারী আলিম সম্প্রদায় জনগণকে বুঝাতে চাইলেও ফার্ডিন্যান্ডের ষড়যন্ত্র এতো বেশি বিস্তৃত ছিলো যে সকলের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।


বাদশাহ আবুল হাসানের পুত্র আবদুল্লাহ এবং তার মা রাজা ফার্ডিন্যান্ডের পাতা ফাঁদে না বুঝেই পা ফেলে। খ্রিস্টান ষড়যন্ত্রকারীরা বাদশাহ হাসান এর ছেলে আবু আব্দুল্লাহকে দিয়ে বিদ্রোহ করায়। বাবাকে গদিচ্যুত করলে তাকে ক্ষমতায় বসানো হবে আশ্বাস পেয়ে পিতার বিরুদ্ধে সে বিদ্রোহ করে। বাদশাহ হাসান ক্ষমতা ছেড়ে পলায়ন করলে আবু আব্দুুল্লাহর দুর্বল নেতৃত্ব, নৈতিক অবস্থান চিন্তা করে রাজা ফার্ডিন্যান্ড ও রানি ইসাবেলার যৌথ বাহিনী স্পেন আক্রমণ করে। আবু আব্দুল্লাহ আক্রমণ সামাল দিতে আলোচনার জন্যে দরবারে বিশেষ সভার আয়োজন করেন। ফার্ডিন্যান্ড আবু আব্দুল্লাহকে আশ্বাস দেয় যে তারা যদি বিনাযুদ্ধে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তাহলে তাদের জীবন ও সম্পদের কোন ক্ষতি করবে না। দুর্বল সুলতান আবদুল্লাহ ও তার সভাসদগণ অতীতের চুক্তিভঙ্গের রেকর্ড ভুলে গিয়ে ফার্ডিন্যান্ডের সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অবশেষে ১৪৯১ সালের ডিসেম্বর মাসে গ্রানাডার আত্মসর্মপণের শর্ত নির্ধারিত হয়। সেখানে বলা হয় যে, ছোট-বড় সব মুসলমানের জীবনের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়া হবে। তাদের মুক্তভাবে ধর্ম-কর্ম করতে দেয়া হবে। তাদের মসজিদ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান অক্ষত থাকবে। তাদের আদব-কায়দা, আচার-ব্যবহার, রাজনীতি, ভাষা ও পোশাক-পরিচ্ছদ অব্যাহত থাকবে। তাদের নিজেদের আইনকানুন অনুযায়ী তাদের প্রশাসকরা তাদের শাসন করবেন।’ সেনাপতি মুসা বিন আকিলসহ সৈনিকদের অনেকেই এ সিদ্ধান্তের সাথে দ্বিমত পোষণ করেন। মুসলিম সেনাপতি মূসা আত্মসমর্পণের চেয়ে সম্মুখ সমরে যুদ্ধ করে প্রাণ বিসর্জন দেয়াকেই অধিক সস্মানজনক মনে করেছিলেন। আবু আব্দুল্লাহ খ্রিস্টানদের কাছে আত্মসমর্পণ করে প্রাণে রক্ষা পাবেন বলে যে ধারণা করেছিলেন, শিগগিরই তা মিথ্যায় পর্যবসিত হয়। অচিরেই সহজেই রাজা পঞ্চম ফার্ডিন্যান্ড গ্রানাডার রাজপথসহ সমগ্র শহর দখল করে নেয়।

নির্মমতার ইতিহাসে বন্দি মুসলমান
ফার্ডিন্যান্ড ও ইসাবেলার বাহিনী শুরু করে নৃশংস ও বর্বর পন্থায় হত্যাযজ্ঞ, লুণ্ঠন ও ধর্ষণ। একপর্যায়ে মুসলমানগণ সকল শক্তি সামর্থ্য দিয়ে রাজা ফার্ডিন্যান্ড ও তাদের দলের লোকদের আক্রমণ প্রতিরোধের চেষ্টা চালায়। মুসলমান এবং খ্রিস্টানদের সাথে চলা তুমুল সংঘর্ষ বন্ধ হচ্ছে না দেখে রাজা ফার্ডিন্যান্ড তাদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে দু’টি প্রস্তাব করে। প্রথমত, তোমরা অস্ত্র ত্যাগ করে স্পেন তথা গ্রানাডার সকল বড় বড় মসজিদে অবস্থান কর তাহলে তোমরা সকলে নিরাপদে থাকবে কেউ তোমাদের উপর আক্রমণ করবে না। দ্বিতীয়ত, যারা ঘাটে রক্ষিত নৌজাহাজসমূহে আশ্রয় নিবে তাদেরকে নিরাপত্তার সাথে অন্য মুসলিম দেশে চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়া হবে। তাদের উপরও আমাদের কেউ আক্রমণ চালাবে না।
ষড়যন্ত্রকারী ইহুদি-খ্রিস্টানদের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য অসহায় মুসলিমগণ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে সরল বিশ্বাসে, ইচ্ছায় অনিচ্ছায় কেউ কেউ গ্রানাডার বড় বড় মসজিদে অস্ত্র ছাড়া আশ্রয় গ্রহণ করেন আবার কেউ কেউ সাগরের তীরে রাখা বড় বড় জাহাজে আশ্রয় নেন। তখনই রাতের আঁধারে মসজিদগুলো তালা লাগিয়ে দিয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়। আর যারা জাহাজে অবস্থান করছিলেন তাদেরকে জাহাজ ডুবিয়ে পানিতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সে সময় একসাথে সাত লক্ষ মুসলমানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তিনদিন পর্যন্ত চলে হত্যার নারকীয় তাণ্ডব। সেদিন অসহায় মুসলমানদের লাশে সাগরের পানি বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল। দাউদাউ করা আগুন, নারী-পুরুষের আর্তচিৎকার, নিরপরাধ মুসলমানের পুড়ে অঙ্গার হওয়া, পানিতে ডুবন্ত মানুষের মর্মান্তিকভাবে নিঃশব্দে মৃত্যু আর ফার্ডিন্যান্ড-ইসাবেলার হাসি একাকার হয়ে যায় ইউরোপের আকাশে-বাতাসে। হত্যাপর্ব শেষ হওয়ার পর খ্রিস্টান রাজা ফার্ডিন্যান্ড ও তার স্ত্রী ইসাবেলা আনন্দে আত্মহারা হয়ে চিৎকার করে বলছিল, ‘হে মুসলমানগণ! তোমরা কতইনা বোকা জাতি।’ এ গণহত্যার পরও প্রায় পাঁচ লাখেরও বেশি মুসলমান আন্দালুসিয়ায় রয়ে গিয়েছিলেন, তাদেরকে সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় সমুদ্রপথে নির্বাসিত করা হয়। তাদের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক লোকই জীবিত ছিলেন।
এতো অত্যাচরের পরেও যে কয়জন মুসলমান স্পেনের মাটিকে কামড়ে পড়ে ছিলেন তাদের ধর্মচ্যুত করার পাঁয়তারা চলে ফার্ডিন্যান্ডের আমলে। মুসলিমদের আরবি পড়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। আরবীয় পোশাক পরা ছিল আইন পরিপন্থী। বাধ্য করা হয় মুসলিমদের খ্রিস্টান স্কুলে ভর্তি হতে। এতে যারা খ্রিস্টানধর্ম গ্রহণ করত, তাদের জন্য ছিল বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা। পুড়ে যাওয়া সুদৃশ্য মসজিদগুলোকেও গির্জা আর জাদুঘরে রূপান্তরিত করা হয়। একসময় যে মসজিদ আল্লাহু আকবর ধ্বনিতে মুখরিত ছিলো সেই মসজিদেই আজ খ্রিস্টানদের ঘন্টা বাজে। তারিক বিন জিয়াদের স্মৃতি বিজড়িত পর্বতটি ‘জাবাল আত তারিক’ থেকে এখন জিব্রাল্টায় পরিণত হয়েছে। আজ মুসলিম ইতিহাস ঐতিহ্য এবং শৌর্যবীর্য যেন পড়ে থাকা অপঠিত ইতিহাস।

দিল্লি : গ্রানাডার স্লো পয়জন
গ্রানাডায় মুসলমানদের নিঃশেষ করা হয়েছে এক ষড়যন্ত্রের বীভৎসতায়। কিন্তু পৃথিবীর অনেক দেশই আছে, যেখানে তারা ইতিহাসের সেই নির্মতার সাক্ষী হতে না চাইলেও অন্তরে পোষণ করে মুসলিম বিনাশের হিংসাত্মক স্বপ্ন। ভারতের হিন্দু সম্প্রদায়ের কোন কোন গোষ্ঠীও এমনটাই কল্পনা করে থাকে। অথচ ভারতকে সমৃদ্ধ করেছে মুসলমান শাসকেরাই। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি সর্বত্রই মুসলমানদের অবদান লেপ্টে আছে আজও। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে মুখ্যভূমিকা পালন করেছে মুসলমান শাসকগণই। বর্ণবৈষম্যের কালো অধ্যায়ের মাঝে হাজারো অলিয়ে কামিল এবং ইসলাম প্রচারক মুসলমানগণ মানবতাবাদের আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন ভারতের মাটিতে। মুহম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের মাধ্যমে আলো আরো বেশি বেগবান হয়েছে। সুলতানি এবং মুগলসহ সামগ্রিক মুসলিম শাসনে মানবতাবাদ ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক অনন্য নজির সৃষ্টি হয়েছিলো। অথচ ব্রিটিশের কালো থাবা সে ইতিহাসে কালিমা লেপন করেছে। আধুনিক সভ্যতার আলোতেও সে অন্ধকার দূরীভূত হচ্ছে না। বরং ধর্মীয় উন্মাদনার নামে হিন্দু নামধারী কিছু কিছু উগ্রগোষ্ঠী মুসলিম সভ্যতা শুধু নয়, মুসলমানদের নির্মূল করার স্বপ্নে অমানবিকতার বীজ বুনে চলেছে। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যকার ভ্রাতৃত্ববোধের সম্পর্ককে শত্রুতার আদলে গড়ে তুলছে। এটা শুধু মুসলমানদের জন্যই নয়, গোটা ভারবর্ষের জন্য অকল্যাণ বয়ে আনবে।
সম্প্রতি ভারতে ‘জয় শ্রীরাম’ এবং ‘গো মাতা কি জয়’ শ্লোগানটি মুসলমানদের মুখে উচ্চারণ করানোর মধ্য দিয়ে এক ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তৃত করার পাঁয়তারা চালানো হচ্ছে। এ শ্লোগান দিতে বাধ্য করায় ভারতজুড়ে তোলপাড় চলছে। বিজেপি সরকারের ‘এক দেশ, এক জাতি, এক ধর্ম’ দর্শনই ধর্মনিরপেক্ষ ভারতকে বেসামাল করে তুলেছে। ২০১৯ সালের ৩০ মে নরেন্দ্র মোদির শাসনের দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রথমেই শুরু হয় ‘পাবলিক লিঞ্চিং’। বাস, ট্রেন বা রাস্তায় সংখ্যালঘু মুসলমানদের ধরে নির্যাতনের মাধ্যমে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করা হয়। ‘জয় শ্রীরাম’ বা ‘গো মাতা কি জয়’ শ্লোগান না দিলে পাবলিক লিঞ্চিংয়ের তীব্রতায় বেদম প্রহার করা হয়। ভারতের মুসলিম নেতা তাজউদ্দিন আহমেদ ২০১৯ সালের ২ জুন দেশ পত্রিকায় ‘ঊষা-দিশাহারা নিবিড় তিমির আঁকা’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘গো-রক্ষকদের তাণ্ডবে ভারতে কত সংখ্যালঘু মানুষের প্রাণ গেছে তার ইয়ত্তা নেই। আহার নিদ্রার মতো স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে ‘পাবলিক লিঞ্চিং’।
মুসলিম নির্যাতনের ঘটনাসমূহকে পত্র-পত্রিকায় ‘হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা’ কিংবা ‘ধর্মীয় সহিংসতা’ বলে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। এ কৌশলী শব্দপ্রয়োগের শিক্ষা এসেছে ব্রিটিশের নিকট থেকে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে কোনো ধরনের নির্যাতনমূলক অ্যাকশনকে তারা এ ধরনের শব্দ দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করতো যে এতে হিন্দু-মসলিম উভয়ই জড়িত। স্বাধীন ভারতবর্ষে এ ধারাবাহিকতা আজো বহমান। ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ৬৯৩৩টি ঘটনায় হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ১০,০০০ এরও বেশি মুসলমান নিহত হয়েছে।
ব্রিটিশ আমল থেকে ভারতের ইতিহাসে মুসলিম নিধন কর্মসূচি শুরু হয়। ১৮৫৮ সালের ৩-৪ এপ্রিল ঝানশিতে ব্রিটিশ সেনা কমান্ডার হুগরোজ এর নেতৃত্বে প্রায় ৫,০০০ মানুষ হত্যা করা হয়। ১৮৭২ সালের ১৭-১৮ জানুয়ারি মালেরকোটলাতে ৬৫ জনকে হত্যা করে তারা। এরপর ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল ভারতের অমৃতসরে দখলদার ব্রিটিশ পুলিশ ওপেন ফায়ার করে প্রায় ১,০০০ শিখ, মুসলিম ও হিন্দু হত্যা করে। ১৯৩০ সালের ২৩ এপ্রিল পেশওয়ারে ব্রিটিশ পুলিশরা আরো ১১০০ লোক হত্যা করে যাদের ভেতরে ৪০০ হিন্দু ও ৭০০ মুসলিম ছিলো।
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পরপরই ভারতের পাঞ্জাবে প্রায় ১০ লক্ষ শিখ-হিন্দু-মুসলিম হত্যাকাণ্ড ঘটে যার পঁচাত্তর ভাগই ছিলো মুসলিম। ঠিক পরের বছরেই ১৯৪৮ সালে ভারতের হায়দ্রাবাদে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তায় হিন্দুরা বিপুল পরিমাণে মুসলমানকে হত্যা করে। ১৯৬৯ সালে হিন্দুরা মুসলিমদের উপরে আক্রমণ চালায়। এতে ৪৩০ জন মুসলিম নিহত হয়। ১৯৭৬ সালে ভারতীয় পুলিশ বাহিনী মুসলিমদের উচ্ছেদ করার লক্ষ্যে গুলি করে আরো ১৫০ জন মুসলিম নাগরিক হত্যা করে। ১৯৭৯ সালের ৩১ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গে আবার ১,০০০ লোককে হত্যা করা হয়। ১৯৮০ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশে পুলিশ ও হিন্দুদের যৌথ আক্রমণে প্রায় ২,৫০০ মুসলিম নিহত হয়। ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩ সালে ভারতের আসামে প্রায় ২২,০০ মুসলিম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। ১৯৮৭ সালের ২২ মে উত্তর প্রদেশে আরো ৪২ জন মুসলিমকে হত্যা করা হয়।
ভারতের বিহার রাজ্যের ভাগলপুরে ১৯৮৯ সালের ২২ অক্টোবর থেকে শুরু করে ২৩শে নভেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ একমাস ব্যাপী মুসলমানদের গণহত্যা চালানো হয়। হিন্দুদের ‘রামশীলা শোভা-যাত্রা’ থেকে সাম্প্রদায়িক উসকানি এবং মুহুর্মুহু মুসলিমবিরোধী শ্লোগান দিয়ে উগ্রবাদী হিন্দুরা হামলে পড়েছিল নিরীহ মুসলমানদের উপর। সে সময় তারা গুজব রটিয়ে দেয়- মুসলমানরা হোস্টেল থেকে কোনো হিন্দু মেয়েকে অপহরণ করেছে। আরো রটিয়ে দেয়া হয়- পানির ট্যাঙ্কে বিষ মিশিয়ে দিয়েছে মুসলমানরা। এ সময় লোগিয়ন নামক গ্রামে ১০৮ জন মুসলমানকে হত্যা করে মাটি চাপা দিয়ে প্রমাণ লুকাতে ওই গণকবরকে পরিণত করা হয় ফুলকপি ক্ষেতে। অমরপুর নামক এক এলাকাতেও মুসলমানদের হত্যা করে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয় এবং গণকবরের উপর তৈরি করা হয় রসুন ক্ষেত। ভাগলপুর দাঙ্গায় তারা নিরীহ নিষ্পাপ মুসলিম শিশুদের হত্যা করেছিল জবাই করে; আর মহিলাদের হত্যা করেছিল তাদের শরীরের বিশেষ অঙ্গসমূহ কর্তন করে। ভারতের সরকারি হিসেবে ভাগলপুর দাঙ্গায় নিহত মুসলমানের সংখ্যা ১০৭০ জন বলা হয়েছে। তবে প্রকৃত হিসেবটা ছিল আরো অনেক অনেক বেশি। ভাগলপুর দাঙ্গায় ১৯৫টি মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামের সাড়ে এগারো হাজার বাড়িঘর লুট করে সেগুলো আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিলো। এ সময় শরণার্থীতে পরিণত হয় লক্ষাধিক মুসলমান। ৬৮টি মসজিদ এবং ২০টি মাজার সম্পূর্ণরূপে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় তারা। এলাকাটিতে প্রচুর পরিমাণে রেশমি বস্ত্র উৎপাদন হতো, যা তৈরিকারী হস্ত ও বিদ্যুৎচালিত তাঁতগুলির শতকরা ৭৫ ভাগের মালিকানা ছিল মুসলমানদের হাতে। দাঙ্গার সময় তারা মুসলিম নিয়ন্ত্রিত শিল্পকেও ধ্বংস করে দেয়। জ্বালিয়ে দেয়া হয় ৬০০টি বিদ্যুৎ চালিত ও ১৭০০টি হস্তচালিত তাঁত। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে মুম্বাই রায়টে ৫৭৫ জন মুসলিম মারা যায়। ২০০২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি গুজরাট দাঙ্গায় আহমেদাবাদে নিহত হয় ৭৯০ জন মুসলিম। একই সময়ে হিন্দুদের একটি দল গুলবার্গে আক্রমণ করে ৫৯ জন মুসলিমকে হত্যা করে। ঐ একই দিনে আহমেদাবাদের নারোদাতেও আরো ৯৭ জন মুসলিমকে হত্যা করা হয়।
বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর গরুর গোশত খাওয়ার অপরাধে বেশ কয়েকজন মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া সে দেশে স্বাভাবিক ঘটনা। গরুর গোশত খাওয়া নিয়ে মুসলিম হত্যার প্রতিবাদে প্রখ্যাত লেখিকা অরুন্ধতী রায় বলেছেন, ‘ভারতে নারী হয়ে জন্ম না নিয়ে গরু হয়ে জন্ম নেয়া অনেক সম্মানের’। এমনকি আসামে জাতীয় নাগরিক পঞ্জির (এনআরসি) নামে ৪০ লাখ মুসলিম তাড়ানোর ফন্দিফিকির করা হয়েছে। এখন তেলেঙ্গানাসহ বিজেপি শাসিত কয়েকটি রাজ্যের মুসলমানদের বিতাড়নের নতুন নীল নকশা হচ্ছে। মুসলমানদের দেশ হারানোর শঙ্কা তীব্রতর হচ্ছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নাগরিকদের মধ্যে বিভাজন করেছেন ধর্মের ভিত্তিতে। মুসলমান হওয়ার কারণে ১৯৯৯ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কারগিল যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হয়ে লড়াই করা অনারারি লেফটেন্যান্ট মোহাম্মদ সানাউল্লাহকে আসাম পুলিশ গ্রেফতার করেছিল বিদেশী নাগরিক তকমা দিয়ে। ইতিহাস নতুন করে লেখা হচ্ছে। মুসলিম অনুষঙ্গ ঐতিহাসিক স্থানের নাম বদলে যাচ্ছে। ভারতে মুসলিম জাতির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বিনাশ করার মাধ্যমে মুসলমানদের জাতিগতভাবে নির্মূল করার অপচেষ্টা চলছে। ভারতের পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে ‘নাগরিকত্ব সংশোধন বিল’- সিএবি তারই অন্যতম পদক্ষেপ। বাবরি মসজিদের রায়, এনআরসি, কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন বাতিল, তিন তালাক নিষিদ্ধকরণ, অভিন্ন দেওয়ানি আইন প্রবর্তনের অপচেষ্টা এসব একই সূত্রে গাঁথা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, মুসলিম নিধনে বিজেপি সরকার ‘গ্রানাডার মডেল’ অনুসরণ করতে চায়।
বিজেপিসহ উগ্রবাদী হিন্দুনামধারী সন্ত্রাসীদের অমানবিক মুসলিম গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে ব্যর্থ দেশটির বিরোধী দল কংগ্রেস। নেহরু-গান্ধীর হাতে গড়া কংগ্রেসের এখন ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ অবস্থা। বামদলগুলো শক্তিহীন পঙ্গু। তবে সে দেশের বিবেকবান মানুষেরা এ ঘৃণ্য নিষ্ঠুরতার প্রতিবাদ করছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো যেন নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। দিল্লি অখুশি হয় ক্ষমতাসীন দল এমন কিছু করতে নারাজ। সংসদের বিরোধী দলের অভিনয়ে মেরুদণ্ডহীন জাতীয় পার্টি কার্যত ক্ষমতাসীনদের ‘পাপেট’। জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিও রহস্যজনকভাবে নীরবতা অবলম্বন করছে। মানবতার রাজনীতি করার দাবিদার দলগুলোর কেউই প্রতিবেশী দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রতিবাদ করছেন না। আর বুদ্ধিজীবী, সুশীলসমাজ, পেশাজীবী, শিক্ষাজীবীরা যেন বিজেপির কাছে ‘বিবেক বন্ধক’ রেখেছেন। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবীরা এখনো উটপাখির মতো বালুতে মুখ লুকিয়ে রেখেছেন।
পরিশেষে বলা যায়, পহেলা এপ্রিল ‘এপ্রিল ফুল’ উৎসব আর নয়। বর্তমানেও মুসলিম নামধারী একশ্রেণীর বিশ্বাসঘাতকদের সাথে চলছে ইহুদি-খ্রিস্টান চক্রের যোগসাজশ। সারাবিশ্বে মুসলিম সংস্কৃতির বিপরীতে অংশীবাদী সংস্কৃতির বিস্তৃতিতে ব্যস্ত সমস্ত মিডিয়া। সেইসাথে জঙ্গিবাদের উত্থান ও প্রসারে নতুন নতুন কৌশল প্রয়োগ হচ্ছে। মনের অজান্তেই আমাদেরকে নিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের অতল গহ্বরে। ভারতবর্ষের প্রতিটি অঞ্চলেই চলছে মুসলমান নিধনে নানাবিধ কর্মসূচি। এ সময় মুসলমানদের ঈমান-আকিদা ঠিক রেখে যুগের সাথে পাল্লা দিয়ে নিজেদের রক্ষার কৌশল খুঁজতে না পারলে মুসলমানদের অবস্থা যে স্পেন ও ভারতবের্ষর চেয়েও ভয়াবহ হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই আর কোন ‘এপ্রিল ফুল’ নয়, চেতনার গ্রানাডায় পরিণত করা দরকার। সেইসাথে হিন্দু-মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধের মধ্য দিয়ে মুসলমানদের স্বকীয় আলোয় পথনির্ণয় এখন সময়ের দাবি।

লেখক: কবি ও গবেষক; প্রফেসর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply