গ্লোবাল নলেজ ইনডেক্স ২০২০ বাংলাদেশ কোথায় এবং কেন? -আহসান হাবীব ইমরোজ

অনেককাল আগের কথা। ক্লাস টু পড়–য়া এক শিক্ষার্থীকে বড়রা প্রশ্ন করেছিল, বাবা তোমার রোল নম্বর কত? গরল নয় সরলরেখার মতোই সে বললো- দুই। কিন্তু যখন কেউকেটা কেউ প্রশ্ন করলেন ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রী কতজন? কিছু না ভেবেই সে বলে দিলো, দুইজন। তখন প্রশ্নকর্তারা কেউ হেসেছিলেন কেউবা লজ্জিতও হয়েছিলেন। ৬-৭ বছরের সেই শিক্ষার্থীর জন্য এটি বড় কোনো সমস্যা নয়, সে নিজেকে গড়ে আজকে বাংলাদেশের এক সফল কর্মকর্তা। কিন্তু একটি জেনারেশন যদি এমন হয়, তাহলে? যাদের নিয়ে লিখেছিলাম মাত্র দু’সপ্তাহ আগে; আই অ্যাম জিপিএ ফাইভ : যাচ্ছি কোথায়? যাবো কোথায়?

২০০১ সালে এসএসসিতে জিপিএ যুগ শুরু হয়েছিল মাত্র ৭৬ জন দিয়ে। মাত্র ২০ বছর পর ২০২০ সালে সে সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ১,৩৫,৮৯৮ জনে। এ ক্ষেত্রে স্বীকার করতেই হবে আমরা বাম্পার ফলন করেছি ১,৭৮৮ গুণ বেশি জিপিএ। চিন্তা করা যায়? পৃথিবীর (ইতিহাস, ভূগোল, পৌরনীতি) কোথাও কি কেউ কোনো কালে এমনটা পেরেছে?
কিন্তু মুশকিল হলো কোথাকার কোন নাকবোঁচা এক সাংবাদিক আমাদের জিপিএ উন্নয়নের সেই ঢাউস বেলুনকে ছোট্ট এক আলপিনের গুঁতোয় শেষ করে দিলেন। বেশরম! সেই ভদ্রলোক প্রশ্নবাণে সব ফাঁস করে দিলেন। ১৩ জন জিপিএ পাওয়া ছাত্র-ছাত্রীকে তিনি কিছু প্রশ্ন করেছেন,
বলোতো;
১. আমি জিপিএ-৫ পেয়েছি ইংরেজিতে কী হবে? ১৩ জন জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্র-ছাত্রী উত্তর দিয়েছে। কিন্তু কেউ পারেনি। আর সবচেয়ে মজার উত্তর; আই অ্যাম জিপিএ ফাইভ।
২. অপারেশন সার্চলাইট কী? উত্তর-অপারেশনের সময় যে লাইট জ্বালানো হয়।

বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস কবে জানে না। বর্তমান রাষ্ট্রপতির নাম জানে না। কম্পিউটার বিষয়ে জানে না। অথচ সারাদিন ফেসবুকে আটকে থাকে। আর নেপালের রাজধানী নাম বলেছে- নেপচুন।
কী বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, কী জাতীয় কোথাও কি এরা ভালো করতে পারবে?
তাইতো ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণফোনের একমাত্র বাংলাদেশী সিইও হচ্ছেন ইয়াসির আজমান। আর বাকিরা বিদেশী।

দুর্বল শিক্ষামান ও হতাশার কারণে আমাদের সোনার সন্তানরা সোনার হরিণ ইউরোপে পাড়ি দিতে থাইল্যান্ডের জঙ্গলে কঙ্কাল, লিবিয়ায় ব্রাশফায়ারে রক্তাক্ত লাশ এবং ভূমধ্যসাগরে ডুবে মরছে।
অপর দিকে বিশ্বের টপ প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটের সত্যেন নাদেলা গুগলের সুন্দর পিচাইসহ এমন ২০ জনের নাম বলা যাবে যারা প্রতিবেশী বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার।
যারা কিনা প্রতিবেশী দেশ ভারতের সন্তান; কি দৈহিক আকৃতি কিংবা আর্থিক অবস্থা কোনো দিকেই এরা এদেশের সন্তানদের তুলনায় শীর্ষে ছিলো না।
আমার এই লেখা পড়ে অনেকেই ফোড়ন কেটেছিলেন, মাছরাঙা টিভি বোকা পুঁটিমাছ শিকারের মতো করে তেরছা প্রশ্ন করেছে তাই আমাদের সোনার সন্তানরা উত্তর দিতে পারেনি। কিন্তু এবার গ্লোবাল নলেজ ইনডেক্সতো হাটে নয় বিশ্ব দরবারে হাঁড়ি ভেঙে দিলো।

তারা বলছে : জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি প্রকাশিত গ্লোবাল নলেজ ইনডেক্স ২০২০ এ বাংলাদেশ ১৩৮টি দেশের মধ্যে ১১২তম স্থান অর্জন করেছে।
সুইজারল্যান্ড র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে আমেরিকা দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। নেপাল, পাকিস্তান ১১০ ও ১১১তম অবস্থানে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রতিবেশী ভারত শীর্ষস্থানে ৭৫তম।
যে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ থেকে মেডিক্যাল পাস করেছেন সে দেশটিও ৯৪তম অবস্থানে রয়েছে। আর সবার তলানিতে আমাদের এই সোনারবাংলা। ভাবা যায়?
আমাদের প্রিয় দেশটি ৩৫.৯ স্কোর করেছে, যা বৈশ্বিক গড়ের ৪৬.৭ এর তুলনাও অনেক অনেক নিচে। মাত্র তৃতীয় শ্রেণীর মার্কস মাত্র ৩৩ এর সামান্য উপরে!

অথচ এদেশ বিশ্বব্যাপী খ্যাতিময় এফআর খান, জগদীশ চন্দ্র বসু, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সাইফুল আজম এবং জামাল নজরুল ইসলামের দেশ। এর পেছনে অন্যতম প্রধান গুমোর হচ্ছে জিপিএ বাম্পার ফলন নয় বরং দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মান। হয়তো পরিকল্পিতভাবেই আমরা এ ব্যবস্থা তৈরি করেছি। যার ফলে আমরা সর্বত্র চোর ও চামচা তৈরি করছি কিন্তু চৌকস নহে। কারণ চৌকসরা প্রশ্ন করে, গুমর ফাঁস করে কিন্তু পা চাটে না। চাইলেই হুটহাট আমরা সব চেঞ্জ করতে পারবো না। তবে নিজেকে, নিজের পরিমণ্ডলের অনেককেইতো বদলাতে পারি।

একবার না পারিলে দেখ শতবার

একজন হাফেজে কুরআন হেফজ করতে গিয়ে মোট কত হাজারবার একই বিষয় তিলাওয়াত করেন?
কোন কিছুর জন্য আমি আপনি কতবার চেষ্টা করেছি?
বয়স যখন ৩২ ততদিনে ৬৪ জেলা প্রদক্ষিণ শেষ। এরপর রিভিশন চলছে। ধান, নদী, খাল- এই তিনে বরিশাল বিভাগটি সবার আগে শেষ হয়েছিলো।

সেখানে একবার শিক্ষক প্রশিক্ষণে গিয়েছি, এডিসনের ১০,০০০ বার চেষ্টা নিয়ে আলোচনার ঝাঁপি খুলেছি।
সবাই আসমানের উপরে আর জমিনের ভিতরের আলোচনা পছন্দ করে। কিন্তু আমি বক্তা হিসেবে কমবখত। বারাবার শ্রোতাদের ভিতরের বিষয় নিয়ে আসার চেষ্টা করি। সেবারও ভুলটি করলাম, জানতে চাইলাম, আচ্ছা বলুনতো আপনাদের ভিতর একটি কাজের জন্য বহুবার চেষ্টা করেছেন এমন কে কে আছেন? গোটা পাঁচেক হাত উঠলো। কেউ ১০ বার, ২৫ বার বলে বলে হাত নামাচ্ছে। অবশেষে সর্বোচ্চ বার চেষ্টার জন্য হাত তোলা থাকলো একজন বোনের। খুব সম্ভব সে বলেছিল ১০৩ বা ১০৪ বার চেষ্টায় গণিতের একটি সমস্যা সমাধান করেছে। তুমুল করতালিতে কেঁপে উঠলে হলরুম।

প্রশ্ন হতেই পারে, এরকম কোনো কিছুর জন্য আমি আপনি কতবার চেষ্টা করছি? চলুন জীবনের ডায়েরিটা একবার চোখ বুলিয়ে আসি। বলবেন, আরে মশাই ডায়েরি লেখার সময় কই? যত্তোসব!
শ্রদ্ধেয়, হ্যাঁ আপনাকে বলছি, আপনার হয়তো সময় নেই; কিন্তু আপনার ডায়েরি অবশ্যই লেখা হচ্ছে; বসে নেই। ‘একবার না পারিলে দেখ শতবার’ এই কালোত্তীর্ণ জীবনমুখী কবিতাটি লিখেছেন; কালীপ্রসন্ন ঘোষ (১৮৪৩-১৯১০)। তিনি ছিলেন একজন নামকরা সাহিত্যিক ও সাংবাদিক। জন্ম বিক্রমপুরে। তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে এন্ট্রান্স ক্লাস পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। ১৮৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এ স্কুলে এর প্রতিটি ইটের ভাঁজে রয়েছে এ অঞ্চলের শিক্ষার গৌরবময় আলো ছড়িয়ে দেওয়ার অহঙ্কার। ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল ইংরেজ আমলে প্রতিষ্ঠিত উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রথম সরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল। এই স্কুলের বিখ্যাত ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান, বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু, মেঘনাথ সাহা, কবি বুদ্ধদেব বসু, মুনীর চৌধুরীর মতো অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব। ঢাকার নবাব খাজা আব্দুল গণি এ স্কুলের প্রথম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। প্রধান শিক্ষক রত্নামণি গুপ্তের (১৮৮৮-১৮৯৬) নয় বছরের দায়িত্বকালে স্কুলটি আটবার প্রবেশিকা পরীক্ষায় বাংলা, বিহার, আসাম অঞ্চলের ভিতর প্রথম হয়েছিল। ‘একবার না পারিলে দেখ শতবার’ এই প্রবাদটি প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ শান দেয়া হতো এই বিদ্যালয়ে।

বলছিলাম কালীপ্রসন্ন ঘোষের কথা; তিনি নিজ আগ্রহে ইংরেজি, ফারসি, সংস্কৃত ভাষায়ও পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। শুধু ফারসি নয়, তিনি মক্তবেও লেখাপড়া করেছেন। তিনি, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তসহ অনেক অমুসলিম কবিই সে সময় শেখ সাদী, রুমি, হাফিজের আলোয় আলোকিত ছিলেন।
আজকালকার বদনসিব বুদ্ধিজীবীরা কেন এ ব্যাপারে বখিল ও বকলম?

ইনশাআল্লাহ আমরা সফল হবো-
কিন্তু, আমাদের হৃদয় কন্দরে, ঘরের অন্দরে, বন্দরে, নগরে, সদরে, দেশে ও নির্বিশেষে শুধু সমস্যা আর সমস্যা।

কারণ?
– আমরা তাকাই কিন্তু দেখি না
– দেখি কিন্তু পর্যবেক্ষণ করি না
– পর্যবেক্ষণ করিতো অনুধাবন করি না
– আর অনুধাবন করলেও হৃদয়ঙ্গম করি না
– এমনকি হৃদয়ঙ্গম করলেও কর্মে যুক্ত হই না
– যুক্ত হলে লোভ মুক্ত হই না
– এমনকি এতে অনুতপ্তও হই না
– আর লোভ মুক্ত হলেও অনুরক্ত হই না
– তাই প্রভুর বরকতে অভিষিক্ত হই না।
– আর তাই সফলতা পাই না।

তাই সফলতা পেতে চাইলে আসুন নিজ থেকে শুরু করি, পরম প্রভুকে সর্বোচ্চ ভালোবাসি আর তার পন্থাই অনুসরণ করি। এটিই সাফল্যের একমাত্র পথ। সিরাতুল মুস্তাকিম।
যেটি প্রতিদিন নামাজিরা ৩০ থেতে ৩২ বার প্রার্থনা করে। আল্লাহর গ্যারান্টি ইনশাআল্লাহ আমরা সফল হবো।

লেখক : ক্যারিয়ার স্পেশালিস্ট ও মোটিভেশনাল স্পিকার

SHARE

Leave a Reply