ঘটনাবহুল ব্রাদারহুড

রক্তপাতহীন বিপ্লবের মাধ্যমে মোবারকের দুর্গ ভেঙে খান খান করে দিলো ব্রাদারহুড।? আবার বছরের মাথায় সেই সেনা ছাউনিতে বন্দি দলটি। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন আসে কী এই ব্রাদারহুড? কী তার ক্যারিশমা? কিভাবে অসম্ভবকে সম্ভব করে আবারো পতনের ধারায় আসলো তারা? কঠিন এসব প্রশ্নের সহজ-সরল উত্তর-মুসলিম ব্রাদারহুড একটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক গ্রুপ। ইসলাম শুধু সাধারণ ধর্ম নয়, পুর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা এমন আদর্শ বাস্তবায়নের তাগিদে দলটি গঠিত হয়। এটাতেই উজ্জীবিত হয়ে আজকে ব্রাদারহুডের সারা বিশ্বে ইসলামী আন্দোলনের আইকন হয়ে ওঠা।
দলটির সমর্থকরা ধর্মনিরপেক্ষতার বিপরীতে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে কুরআনের আদর্শে নিজেদের গড়ে তুলতে চায়। আর এসব কাজে সহায়তা দিতেই মুসলিম ব্রাদারহুড। লক্ষ্যে পৌঁছাতে দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে যে কোনো ধরনের সহিংসতাকে সব সময় বর্জন করে এসেছে। যদিও অতীতে মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন ইসলামী জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে বারবারই তাদের যোগসূত্র তৈরির চেষ্টা হয়েছে। তবে সব কিছুই তারা সামলেছে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর ধৈর্য দিয়ে।
প্রায় ৮০ বছর আগে মিসরের রাজনৈতিক বাস্তবতায় মুসলিম ব্রাদারহুড গঠিত হয়। ১৯২৮ সালে হাসান-আল বান্না এটি গঠন করেন। পেশায় শিক্ষক বান্না এবং তার অনুসারীরা প্রাথমিকভাবে মিসর থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিতাড়নে দলটি গঠন করেন। এরপর দেশটি থেকে দুর্নীতিসহ পাশ্চাত্যের অশুভ প্রভাব দূর করে জনগণের মাঝে সচেতনতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কাজ করে চলে ব্রাদারহুড।
এরপরের কয়েক বছর সংগঠনটি দেশটির ধর্ম, শিক্ষা এবং সামাজিক সেবাখাতের প্রতি মনোযোগ দেয়। এতে দারুণভাবে সাড়া মেলে এবং সদস্য সংখ্যা বাড়তে থাকে। এরপরই তারা রাজনৈতিক অঙ্গণে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, মিশর সরকারের নানা অপকর্মের বিরুদ্ধে গড়ে তোলে আন্দোলন-বিক্ষোভ।
এতেই সরকারের রোষানল পড়ে। ষড়যন্ত্র শুরু হয় ব্রাদারহুডের বিপক্ষে। স্বয়ং রাষ্ট্রযন্ত্র উঠে-পড়ে লাগে তাদের বিরুদ্ধে। এরই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ১৯৪০ সালে ব্রাদারহুডের সামরিক শাখার বিরুদ্ধে দেশটির আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়। আর দেশটির প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ ফাহমি আল-নাকরাশি হত্যার অভিযোগ দিয়ে ১৯৪৮ সালে এক আদেশে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয় মুসলিম ব্রাদারহুড।
এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দলটির প্রধান হাসান আল বান্নাকেও জড়িত করা হয়। এক পর্যায়ে তাঁকেও হত্যা করে রাষ্ট্রযন্ত্র। তাঁর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভে ব্যাপক ধরপাকড় চালায় সরকার। দলের শীর্ষ নেতারা জেলে গেলে ব্রাদারহুড ১৯৫০ সালে আন্ডারগ্রাউন্ড বা আত্মগোপনে চলে যায়। কারাগারে থাকা বেশ কয়েকজন নেতা পরে ছাড়া পেলেও বেশিরভাগের জেল দেওয়া হয়।
এরপর দীর্ঘ সময় পরে ১৯৮০ সালে আবারো ইসলামের আদর্শকে সামনে রেখে জেগে ওঠে ব্রাদারহুড। ২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করলে এর বিরোধিতা করে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সংগঠনটি। আর আস্তে আস্তে মিসরের রাজনৈতিক অঙ্গণে প্রপ্রভাব বিস্তার করতে থাকে।
এক পর্যায়ে দেশটির সবচেয়ে পুরাতন এবং বড় বিরোধী দলে পরিণত হয়। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রাণের এই সংগঠন মিসরের গণ্ডি ছাড়িয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের সমর্থন আদায় করে নিতে সমর্থ হয়। বিভিন্ন দেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই নানা ধরনের সংগঠন পরিচালনা বাড়তে থাকে ব্রাদারহুডের নামে।
আর ২০১০ সাল পর্যন্ত মিসরে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির কারণে অন্য ইসলামিক দলের সঙ্গে ব্রাদারহুডও নিষিদ্ধই ছিল। কিন্তু নিয়তির নিয়মে ২০১১ সালের ডিসেম্বরেই তারা সংসদ নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি আসনে বিজয়ী হয়ে আধিপত্য বিস্তার করে।
মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ব্রাদারহুডের প্রভাব ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যায়। তারা যে জনপ্রিয়তার প্রমাণ মিসর ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য, সুদান, সিরিয়া, সৌদি আরবসহ উত্তর এবং পূর্ব আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে মুসলিম ব্রাদারহুড কাজ করছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রেও তাদের একটি শাখা সক্রিয় রয়েছে।
তবে মিশরের বাইরের দেশে ব্রাদারহুডকে অনেকক্ষেত্রে রক্ষণশীল বলে বিবেচনা করা হয়। যেমন- তাদের কুয়েত শাখা দেশটির মহিলাদের ভোটাধিকারের বিরোধিতা করে আসছে।
এছাড়া মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য সাইয়েদ কুতুব ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকে সংগঠনে ইসলামী আন্দোলনের ‘জিহাদ’ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে আনেন। আর এর প্রতি বিশ্বাসী সংগঠন বলে ফিলিস্তিনের হামাসকে ধারণা করা হয়ে থাকে। ফিলিস্তিনের মুসলিম ব্রাদারহুড হামাস ইসরাইলবিরোধী জিহাদে সক্রিয় ভূমিকা রেখে চলেছে।
হাসান-আল বান্না, সাঈদ কুতুবের হাত ধরে ব্রাদারহুড এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম দেশগুলোতে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এদের মধ্যে পাকিস্তানে মাওলানা আবুল আ’লা মওদূদী (রহ) অন্যতম। ব্রাদারহুডের ধারণায় গড়া জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান ছাড়াও বাংলাদেশের রাজনীতির ক্ষেত্রে একটি বড় অংশ দখল করে আছে।

SHARE

Leave a Reply