চকচকে ইউরোপীয় সভ্যতায় মুসলমানদের অবদান সালাহউদ্দিন আইউবী

সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা। আজকে বলবো অকৃতজ্ঞ ইউরোপীয় সভ্যতার ভিত তৈরিতে মুসলমানদের অবদানের গল্প। এইতো কিছুদিন আগে বর্তমানে বাংলাদেশের মূর্তি/ভাস্কর্য বিরোধী আন্দোলনের মতো ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিল সমগ্র মুসলিম বিশ্ব। মুসলমানদের বিরুদ্ধে ফ্রান্সের এই আচরণের কারণে আমরা নতুন প্রজন্ম জানতে পারছি ইউরোপীয়রা মুসলমানদের সাথে যুগ যুগ ধরে কিরূপ আচরণ করেছেন। ইউরোপে Islamophobia and Anti Muslim Hate crime চলছে দীর্ঘদিন ধরে। তারই ধারাবাহিকতায় সমসাময়িক আলোচিত নির্যাতনের শহর হলো প্যারিস। যেখানে ফ্রান্সে অবস্থানরত মুসলমানদের প্রায় ৩০% বাস করেন। অথচ প্যারিস শহর ইউরোপের এই ঝকঝকে শহর ও নগর প্রতিষ্ঠায় মুসলমানদের অবদান ছিলো অনন্য। মুসলমানদের ধার করা আলো ব্যবহার করে ধবধবে ইউরোপিয়ানরা সেই মুসলমানদের আজকে অন্ধকারের কীট বলে আখ্যা দিচ্ছে। তবে ইউরোপের কোথাও কোথাও তার ব্যতিক্রমও আছে।

মুহাম্মদ সা. এর সময় বিশ্বে দুই পরাশক্তি ছিল: ১. রোম ও ২. পারস্য। রোম বর্তমান ইতালির রাজধানী। তবে সে সময় রোম সা¤্রাজ্য বলতে বাইজেন্টাইন সা¤্রাজ্যকেই বোঝানো হতো। মুহাম্মদ সা. কর্তৃক দিহইয়া কালবি নামক সাহাবীর দ্বারা রোম স¤্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে দাওয়াতি চিঠি প্রেরণ এর মাধ্যমেই ইউরোপের একটি অংশে ইসলামের পৌঁছে। যে কারণে ইউরোপের সাথে মুসলিম দুনিয়ার সম্পর্ক সেই খলীফাতুল মুসলিমীনদের সময় থেকেই। তবে ইসলামের ইতিহাস অনুযায়ী তুরস্কে আবু আইয়ুব আনসারী রা. এবং সাইপ্রাসে উম্মে মিলহান রা.-সহ কতিপয় সাহাবা ইসলামের সুমহান আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ইউরোপে আসেন বলে জানা যায়। ৭১১ খ্রিস্টাব্দে তারিক বিন যিয়াদের নেতৃত্বে স্পেনে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সুদীর্ঘ আট শত বছর ইউরোপ শাসন করেছে মুসলিমরা। ৮৩১ খ্রিস্টাব্দে ইতালিতে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা হয় এবং তা ২৬০ বছর প্রতিষ্ঠিত ছিল। উসমানী খেলাফতকালে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ইসলামের বিস্তার ঘটে। বসনিয়া সহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে মুসলিম শাসন কিংবা মুসলিমদের প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ ও ফ্রান্সের কোলোনি রাজ্যসমূহ থেকে শ্রমিক হিসেবে এবং বিভিন্ন পেশায় চাকরিজীবী হিসেবে কিছু মুসলিম ইউরোপে আসেন। এ কারণে ইসলামের শুরু থেকেই ইউরোপ গঠনে মুসলমানরা অবদান রাখেন। ইতালির রেনেসাঁয় ইবনে সিনা, আল-কিন্দি আল খারিজমী সহ মুসলিম বিজ্ঞানীদের বিরাট অবদান রয়েছে। মুসলিম বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন গ্রন্থ ল্যাটিন ও রোমান ভাষায় অনূদিত হয়। আরব শাসনের স্থাপত্যকীর্তি আজও পালেরমোতে বিদ্যমান রয়েছে। ইউরোপের পর্যটকদের জন্য এসব স্থাপত্যকীর্তি অন্যতম আকর্ষণ। মুসলমানদের ইউরোপে উপস্থিতি ও এসকল অবদানের কথা অকপটে স্বীকার করে Nethalie Clayer তাঁর Islam in inter- war in Europe বইতে উল্লেখ করেন যে, The presence of Islam and Muslims in Europe is phenomenon restricted to the 20 century. Muslim rule in Spain (from the eights century till the fall of Granada in 1492) and in Sicily (from the ninth to the 11th century) is well known, even if often romanticised in the myth of an Andalusian Golden Age.

জ্ঞান বিজ্ঞানে মুসলিমদের অবদান
বর্তমানে ইউরোপ জ্ঞান বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তিতে অনেক উন্নত। তারা গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ছুটছে। নতুন নতুন গ্রহ উপগ্রহ আবিষ্কার করছে। তাদের আবিষ্কারের সুবাদে পুরো পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয়। ইউরোপীয়দের এই গানের হাতেখড়ি হয়েছিল মুসলমানদের ইউরোপে পদচারণার মধ্য দিয়ে। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে কে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় মুসলিমরা শীর্ষে ছিল এবং সমাজ সভ্যতা বিনির্মাণে তারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এই প্রসঙ্গে Muslim heritage in in our world  Professor Salim T S Al Hasani লিখেন, Great Muslim man and women of the past-mathematicians, astronomers, chemists, physicians, architects, engineers, economists, sociologists, artists, artisans and educators- expressed they are religiosity through beneficial contributions to society and humanity. They did so with open mindedness and, in many instances, positively and constructively worked alongside non-Muslims. This track record of cooperation over the centuries, although deeply rooted within early Muslim society, seems to have been forgotten.
‘অতীতের গ্লানি মুসলিম ব্যক্তিত্বরা- যার মধ্যে আছেন গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ, রসায়নবিদ, চিকিৎসাবিদ, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, স্থাপত্যবিদ, অর্থনীতিবীদ, সমাজবিজ্ঞানী, শিল্পী এবং শিক্ষাবিদ- তারা সমাজ ও মানবতার প্রতি দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তাদের ধর্মীয় চেতনার স্বাক্ষর রেখেছেন। তারা মুক্ত মনের অধিকারী ছিলেন। অনেক ক্ষেত্রে অমুসলিমদের সাথে ইতিবাচক এবং সহযোগীতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করেছেন। প্রথম দিককার মুসলিম সমাজের নিহিত সহযোগিতার এই প্রমাণিত রেকর্ড আজ হারিয়ে গেছে।’

মুসলিমদের অতীত গৌরবময় ইতিহাস অনেক মুসলিমও জানেন না। কচিতে ইউরোপ মুসলিমদের কাছ থেকে জ্ঞান ও সভ্যতার আলো নিয়েছিল। ইউরোপ যে মুসলিমদের কাছে ঋণী এই সত্য HHR Prince Charles ১৯৯৩ সালের ২৭ অক্টোবর Oxford Gi Scheldonian Theatre এ অনুষ্ঠিত Islam and the West শীর্ষক সেমিনারে এইভাবে প্রকাশ করেন, If there is much misunderstanding in the west about the nature of Islam, there is also much ignorance about the dept our own culture and civilization owe to the Islamic world. It is a failure, which stems, I think from the straight jacket of history, which we have inherited. The mediaeval Islamic world, from Central Asia to 2D shorese of the Atlantic, was a world where is scholars and man of learning flourished. But because we have tended to see in Islam as the enemy of the west, as an alien culture, society and system of belief, we have tended to ignore or erase it’s great relevance to our own history.
‘পশ্চিমে ইসলামের প্রকৃতি সম্পর্কেই যে ভুল ধারণা আছে কেবল তা নয়, বরং আমাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিনির্মাণে ইসলাম কী কার্যকর ভূমিকা রেখেছে সে সম্পর্কেও আমরা বেখবর। আমি মনে করি এটি আমাদের একটি বড় ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতা আমরা ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছি। মধ্য এশিয়া থেকে শুরু করে আটলান্টিকের উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত মধ্যযুগের ইসলামী দুনিয়ায় পণ্ডিত আর বিজ্ঞজনেরা বিস্মিত হয়েছিলেন। কিন্তু আমরা ইসলামকে পশ্চিমের শত্রু হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, এটিকে একটি অচেনা সমাজ, সংস্কৃতি, ব্যবস্থা ও ধর্মীয় বিশ্বাস বলে মনে করি। সে কারণে আমরা এর মহান অবদানগুলোকে হয় অবজ্ঞা করে আসছি অথবা ইতিহাস থেকে ইসলামের অবদান গুলো মুছে ফেলছি।’

ইউরোপ-আমেরিকার সমাজ সভ্যতা বিনির্মাণে মুসলিমরা অতীতে অসামান্য অবদান রেখেছে। বিশেষভাবে ৭১১ থেকে ১৪৯২ শতাব্দি পর্যন্ত স্পেনে মুসলিম শাসন চালু থাকার সময় গ্রানাডা-কর্ডোভার মুসলিম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অধ্যায়নের জন্য পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশ থেকে অমুসলিমরা ভিড় জমাতো। স্পেন জ্ঞান চর্চার জন্য এত বেশি খ্যাত ছিল যে পৃথিবীর কোথাও কোন বই প্রকাশিত হলে উক্ত বই সেখানে বিক্রি না হলে প্রকাশকগণ বইটি বিক্রির জন্য ছুটে আসতেন। সেই সময় ইউরোপ-আমেরিকায় স্পেন অথবা মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সমৃদ্ধ কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিলোনা। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ২০০৯ সালে কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া বক্তব্যে মুসলিম সভ্যতার এই অবদানের কথা তুলে ধরে বলেন, as a student of history, I also know civilizations dept to Islam. It was Islam- at places like Al Azhar University- death carried the light of learning throw so many centuries, paving the way for Europe’s Renaissance and enlightenment. It was innovation in Muslim communities that developed the order of of algebra; our magnetic compass and tools of navigation; our mastery of pens and printing; our understanding of of how disease spreads and how it can be healed. Islamic culture has given us majestic arches and soaring spires; timeless poetry and cherished music; elegant calligraphy and places of of peaceful contemplation. And throughout history, Islam has demonstrated through words and deeds the possibilities of of religious tolerance and racial equality.

‘ইতিহাসের একজন ছাত্র হিসেবে আমি জানি বর্তমান সভ্যতা কতটা ইসলামের কাছে ঋণী। আল আজহারের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বহু শতাব্দী জ্ঞানের আলো বিতরণ করে এসেছে। ইউরোপের পুনর্জাগরণে এবং আলোকিত হবার ক্ষেত্রে যা রেখেছে মুখ্য ভূমিকা। মুসলিমরাই বীজগণিত, ম্যাগনেটিক কম্পাসের মত যন্ত্র, কাগজ ও ছাপার যন্ত্র, রোগের কারণ এবং তা নিরাময়ের উপায় শিখিয়েছে। ইসলামিক সংস্কৃতি আমাদেরকে অতুলনীয় স্থাপত্য, আর সময়োত্তীর্ণ কাব্য, সঙ্গীত এবং আত্মিক পূর্ণতার পদ উপহার দিয়েছে। ইতিহাসের সব বাঁকেই ইসলাম কথা ও কাজের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং জাতি গোষ্ঠী সমূহের সমানাধিকারের উদাহরণ তৈরি করেছে।

মূলত মধ্যযুগীয় ইউরোপে মুসলিমদের অসংখ্য অবদান রয়েছে। একাদশ শতক থেকে ত্রয়োদশ শতকে পর্যন্ত ইসলামী সভ্যতা থেকে ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছে ইউরোপ। ইউরোপীয় সভ্যতার এই অবদানের কথা বর্ণনা দিতে গিয়ে বর্তমান যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী, তৎকালীন লন্ডনের মেয়র বরিস জনসন বলেন- The word trafalgar has Arabic roots, coming from taraf Al-Ghar in south west Spain where a a British fleet led by Nelson scored a a victory over the French in 1805. The fact that great square in Central London has a name derived from Arabic is ‘a sign of the way our cultures and our history are oven together. The more understanding of our common history, then the less prejudice there is.
‘ট্রাফালগার শব্দটি এসেছে আরবী থেকে। পশ্চিম স্পেনের তারাফ আল ঘার বন্দরে নেলসন ১৮০৫ সালে ফরাসি নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করেন। লন্ডনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্কয়ারের নাম আরবী থেকে আসাটাই প্রমাণ করে যে আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমরা আমাদের ইতিহাসের একক সূত্র সম্পর্কে যত জানতে পারবো ততই আমাদের মধ্যকার অহমিকা কমে আসবে।

তিনি আরও বলেন, You may or may not know this or believe it, but exactly hundred years ago, in in 1908, my father’s came to south London. He was a Muslim and he knew the Quran off by heart in Arabic, or at least large chunks of it. He would be utterly amazed to discover that these great- grandson head become Mayor of London. I am proud of them.
‘আপনারা হয়তো জানতে পারেন, কিংবা নাও জানতে পারেন যে, আমার পরদাদা ১৯০৮ সালে দক্ষিণ লন্ডনে এসেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন মুসলিম এবং কুরআনে হাফেজ ছিলেন, অন্তত কুরআনের একটা বড় অংশ তার মুখস্থ ছিল। তিনি নিশ্চয় এখন খুবই অবাক হতেন জেনে যে তার প্রপৌত্র আজ লন্ডনের মেয়র। আমি এর জন্য গর্বিত।’
এই প্রসঙ্গে মুসলিম কাউন্সিল অব বৃটেনের সেক্রেটারি জেনারেল ডক্টর আব্দুল বারী বলেন, Muslims have been with Britain in good times and bad; contributing to its welfare, standing and defence, and protecting the values of justice and freedom that makes these country what it is today.

মুসলিমরা বৃটেনের সুখ দুঃখের সাথী। এর উন্নতি, প্রতিরক্ষা এবং মূল্যবোধ ও ন্যায়বিচারের সুরক্ষা করে আসছে তারা। আজকের ব্রিটেনের তাদের সে প্রচেষ্টারই ফল।

স্পেনের কর্ডোভা- গ্রানাডায় মুসলিম স্থাপত্য শিল্পের অনেক নিদর্শন আজও বিদ্যমান এবং সেসব নিদর্শন মুসলিমদের গৌরবদীপ্ত অতীতের সাক্ষ্য দেয়। কর্ডোভার বিখ্যাত মসজিদের পাশেই রয়েছে একটি জাদুঘর। সেখানে মুহাম্মদ ইবনে আরাবী, আল্লামা শাওকানীসহ অনেক মুসলিম দার্শনিক, চিন্তাবিদ ও তাফসিরকারকের জীবনী সংরক্ষিত আছে। মূলত এসব মুসলিম চিন্তাবিদই ইউরোপে জ্ঞানের মশাল জ্বালাতে বিরাট অবদান রাখেন। বিশেষত তাতারদের দ্বারা বাগদাদে মুসলিম সভ্যতার পতন ঘটলে মুসলিমরা স্পেনের কর্ডোভা কেন্দ্রিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। কর্ডোভা শহরে একটু ঘুরলেই এটা সহজেই অনুধাবন করা যায় যে অতীতে একসময় এটা ‘জ্ঞান ও সভ্যতার রাজধানী’ ছিল।

মুসলিম বিজ্ঞানীরা ইউরোপের জ্ঞান বিজ্ঞানে উৎকর্ষতা সাধনের ক্ষেত্রে পথিকৃৎ ছিলেন। ইউরোপের জ্ঞান বিজ্ঞানে অতীতে যেসব মুসলিম গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন নি¤েœ তাদের কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হলো-
১. আল খাওয়ারিজমী- অ্যালজেবরার জনক। জিরো, ডিসিমাল সিস্টেম এবং পৃথিবীর প্রথম মানচিত্র তিনিই উদ্ভাবন করেন।
২. জাবির ইবনে হাইয়ান রসায়ন শাস্ত্রের জনক।Calcination and reduction in chemistry-র আরোও অনেক মূলনীতি তিনি উদ্ভাবন করেন। তিনি ১০০টির চেয়ে বেশি রচনা করে জ্ঞান বিজ্ঞানে অমূল্য অবদান রাখেন।
৩. ইবনে সিনা চিকিৎসাশাস্ত্রের জনক। তার লিখিত ‘কিতাব আশ-শিফা’ চিকিৎসাবিজ্ঞানের অমূল্য সম্পদ। তিনিই প্রথম গ্লোব এর ধারণা প্রদান করেন এবং ভূমিকম্প, পানির উৎস, মিনারেল, মেঘ ও বৃষ্টি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তত্ব প্রদান করেন।
৪. আল কিন্দী ইবনে ইসহাক ফিজিক্স-এর অন্যতম জনক। তিনি ২৬৫- এর চেয়ে বেশি গ্রন্থ রচনা করেন।
৫. আলবেরুনি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কিবলার ডাইরেকশন প্রদান করেন। তিনি ১৫০-এর মত গ্রন্থ রচনা করেন।
৬. আলজাহরাবী, আধুনিক সার্জারির জনক। তাঁর লিখিত ‘কিতাব আল তাসরিফ’ ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত।
৭. আল হাইসাম আল হাযেন, তাঁকে Father of modern optics বলা হয়। তিনি দুই শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তার লিখিত ‘কিতাব আল মানাজির’- Optica The Saurus ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
৮. মুসলিম বিজ্ঞানী আবুল হাসান টেলিস্কোপ আবিষ্কার করেন।
৯. কুতুবি প্রথম ঘড়ি আবিষ্কার করেন।
১০. ইউসুফ ইবনে ওমর ৭৯৪ সালে প্রথম কাগজের কারখানা আবিষ্কার করেন।
১১. উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ ৭০৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথম হাসপাতাল স্থাপন করেন। গ্রানাডা শহরে ১৩৬৬ খ্রিস্টাব্দে আন্দালুস হাসপাতাল স্থাপিত হয়। মুসলিমরা এই সর্বপ্রথম হাসপাতলে নারী-পুরুষের জন্য পৃথক ওয়ার্ড ও নার্স নিয়োগ করেন এবং উন্নত সেবা নিশ্চিত করার জন্য রোগীদের রেকর্ড সংরক্ষণ সিস্টেম চালু করেন।

শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে অবদান
ইউরোপের শিক্ষা ও সংস্কৃতির উন্নয়নে মুসলিমদের অবদান রয়েছে। মুসলিমরা স্পেনে প্রথম মেডিকেল স্কুল প্রতিষ্ঠা করে। এছাড়া স্পেনে মুসলিম শাসনামলে মুসলিমদের উদ্যোগে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। The University of Cordova, The University of Granada, Di University of Seville, the University of Salerno in Southern Italy মুসলিমরাই স্থাপন করেন। এইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইউরোপের সকল অঞ্চল থেকেই উচ্চশিক্ষার জন্য ছাত্র-ছাত্রীরা ভিড় জমাতো। গরিব ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য কর্ডোভাতে মুসলিমরাই প্রথম ফ্রী স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া স্পেন ও সিসিলিতে ইসলামিক ইন্সটিটিউট স্থাপন করে ইউরোপের শিক্ষার উন্নয়নে মুসলিমরা অবদান রাখেন। এ জন্য তৎকালীন লন্ডনের মেয়র, বর্তমান যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী Boris Johnson বলেছেন, ‘London’s diversity and tolerance is the reason for our economic success, international position and cultural vibrancy. Islamic finance is contributing to the economy by changing the the Londoners invest, save, borrow and spend. Muslims are at the the heart of every aspect of our society. Muslim police officers, doctors, scientists, and teachers are an essential part of the the fabric of London. Their contribution is is something that all Londoners benefit from.
লন্ডনের বহুজাতিক কথা এবং সহনশীলতা এর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক অবস্থান এবং সাংস্কৃতিক বর্ণাঢ্যতার কারণ। লন্ডনবাসীর বিনিয়োগ, সঞ্চয় আর ঋণ গ্রহণের ধারা বদলে দিয়ে ইসলামিক অর্থব্যবস্থা এর অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। মুসলিমরা আমাদের সমাজের সকল দিকেরই অংশীদার। মুসলিম পুলিশ কর্মকর্তা, শিক্ষক, বিজ্ঞানী সকলের লন্ডনের গাঠনিক অংশ। তাদের অবদান থেকে সকল লন্ডনবাসী উপকৃত হচ্ছেন।

ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান
ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেও মুসলিমরা ইউরোপে অসামান্য অবদান রাখেন। বিশেষত প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর ইউরোপ পুনর্গঠনে মুসলিমরা বিরাট অবদান রাখেন। ইউরোপীয় নাগরিকরা যেসব কাজ করতে সম্মত হতো না অনেক দেশ থেকে আগত শ্রমিকেরা সেসব কাজ করে ইউরোপের সমাজ ও অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন। বিশেষভাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শ্রমিক হিসেবে অনেকেই চাকরি করতে এসে ইউরোপের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিরাট অবদান রাখেন। এছাড়া মিশর, আলজেরিয়া, লিবিয়া, ইন্ডিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে মুসলিম স্থাপত্য কলার অনেক প্রাচীন নিদর্শন ব্রিটেনসহ ইউরোপের অনেক মিউজিয়ামে রয়েছে। যেসব স্থাপত্যকলা দেখার জন্য অনেক ভিজিটর এখনো ভিড় জমায় এবং এর মাধ্যমেও প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হচ্ছে। ইসলামিক ব্যবসা পদ্ধতি ও ব্যাংকিং সিস্টেম ইউরোপের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে যে ভূমিকা রাখছে তা Economics ressession এর পোপ গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন The Daily vitican newspaper, L Osservatore মন্তব্য করেছে যে, The Islamic banking system to overcome global crisis…. The ethical principles on which Islamic finance is based may bring banks closer to their clients and to the true spirit which should mark every financial service.
চলমান বিশ্বমন্দা মোকাবেলায় ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থা সহায়তা করতে পারে। যে নৈতিক মূল্যের উপর ইসলামী অর্থব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে তা ব্যাংকগুলোকে তাদের ক্লায়েন্টদের আরো কাছাকাছি নিয়ে আসবে। আসল কথা হচ্ছে এটি সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান আদর্শ হওয়া উচিত।
এছাড়াও ইউরোপের নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা, সামাজিক অপরাধ দমনে অবদান, বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনীতে সামরিক ক্ষেত্রে অবদান, আদর্শ পরিবার গঠনে অবদানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইউরোপের আজকের আকাশচুম্বী যেই উন্নতির শিখরে তার পেছনে মুসলিম সভ্যতার এক অনবদ্য অবদান রয়েছে। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে ইসলামের উপর জুলুম অত্যাচার ও নির্যাতন সেই ইউরোপের কলকাঠিতেই নড়ছে। ইসলাম ও মুসলিমদের এই সকল অবদানকে ইতিহাস থেকে মুছে দিতে। তাদের এই ইতিহাস মুছে দেয়ার অপচেষ্টার কথা শুনবো আগামী কোন এক সংখ্যায় ইনশাআল্লাহ।
লেখক : সম্পাদক, প্রেরণা

তথ্যসূত্র-
১. Interview about crisis in France- Islam under attack / sheikh Dr Yasir qadhi and Marwan Muhammad
২. ইউরোপে ইসলাম ও মুসলিম
৩. Speech of Barack Obama at Cairo University in 2009.
৪. Muslim heritage in our world by professor Salim TS Al Hasani

SHARE

Leave a Reply