চলমান ইতিহাস -সালাহউদ্দিন আইউবী

করোনা ফোবিয়ায় আক্রান্ত বিশ্ব ভুলতে বসেছে কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া দিল্লির ভয়াবহ বিপর্যয়ের কথা, কোন মিডিয়ায় আর খবর আসছে না নির্যাতিত ভারতীয় মুসলমানদের। তারা ঘরে ফিরতে পারলো কিনা তাও অজানা আমাদের। হয়তোবা আবার কোন নির্যাতনের খবর ছাপা হলেই আমরা জানতে পারবো তাদের অবস্থা। মাশরিক থেকে মাগরিব পর্যন্ত সমগ্র বিশ্বে এভাবেই খবরের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে মুসলিম নিধনের চিত্রগুলো। ভুলে যাওয়া বিশ্বকে একটু খোঁচা দেয়ার মানসে দুই কলম লেখার চেষ্টা।
মুসলিমনিধন আর ইসলামবিদ্বেষের অন্যতম হাতিয়ার ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ। রাষ্ট্রীয়ভাবে যুগে যুগে ইসলামকে চিরতরে মুছে দেয়ার যত ষড়যন্ত্র হয়েছে, প্রায় সবগুলোর পেছনে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। সব ধর্মের জন্য সমান অধিকারের স্লোগান নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ প্রচার করা হলেও ইসলামবিদ্বেষই মূলত এই চিন্তার ধারকদের প্রধান কাজ। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের ধোয়া তুলে ইসলামের নাম নিশানা মুছে দেয়া হয়েছিল তুরস্ক থেকে, মুসলমানদের জন্য মৃত্যুপুরীতে পরিণত করা হয়েছিল তিউনিসিয়াকে, ঠিক একই কায়দায় রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের চর্চার কথা বলে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও চলছে নির্বিচারে মুসলিম নিধন।
ধর্মনিরপেক্ষতা বা সেক্যুলারিজম শব্দটি ১৮৫১ সালে ব্রিটিশ লেখক জর্জ এলিয়ট প্রথম ব্যবহার করেন। এই মতবাদের প্রবক্তারা কখনো নিজেদের রাষ্ট্রে মুসলিম নিধনে ইন্ধন জুগিয়েছে আবার যখনই সুযোগ পেয়েছে তখনই কোন মুনাফিক মুসলিম শাসকের ঘাড়ে চেপে বসেছে।
ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান বিন আফফান (রা)-এর সময় মিশরের গভর্নর আবদুল্লাহ বিন সারহ্-এর নেতৃত্বে স্বেতলা যুদ্ধে (ইধঃঃষব ড়ভ ঝঁভবঃঁষধ) জয়ের মাধ্যমে আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়ার উত্তর কেন্দ্রে অবস্থিত শেতলা শহরে ইসলামের বিজয় দিয়ে যাত্রা শুরু করেন মুসলমানরা। এ যুদ্ধে মুসলমানদের পক্ষে প্রধান সেনাপতি আবদুল্লাহ বিন সাদ ছাড়াও আরো ছয়জন সেনাপতি ছিলেন, তাদেরও নাম ছিল আবদুল্লাহ। তারা হলেন: আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা), আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা), আবদুল্লাহ বিন জাফর (রা), আবদুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আস (রা), আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) ও আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা)। এ কারণে এই যুদ্ধকে আবদুল্লাহদের যুদ্ধ বলা হয়। স্বর্ণযুগের সেরা মানুষদের পবিত্র রক্তের বিনিময়ে ইসলামের এই যাত্রাকে রুখে দেয়ার ষড়যন্ত্র করে ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৫ শে জুলাই তিউনিসিয়ার ক্ষমতায় আসীন হওয়া ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদে বিশ্বাসী শাসক হাবিব বুরগিবা। তিনি ক্ষমতায় আসীন হয়েই এই দেশকে ধর্মনিরপেক্ষতার কেন্দ্রে পরিণত করার জন্য প্রচেষ্টা ব্যয় করেন। তিনি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের আধ্যাত্মিক প্রেতাত্মায় রূপান্তরিত হোন এবং ইসলামবিরোধী সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েন।
তিউনিসিয়ায় ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী প্রকল্প বাস্তবায়নে তিনি তার সকল প্রচেষ্টা ও সমর্থন ব্যয় করেন; তার সমস্ত প্রতিভা ও মানসিক শক্তি খরচ করেন। একইভাবে তার বক্তৃতার কারিশমা, মেধা ও শক্তিশালী ব্যক্তিত্বকেও কাজে লাগান। এই উদ্দেশ্যে তিউনিসিয়ার শিক্ষাব্যবস্থার প্রত্যেক বিভাগে সামগ্রিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা বিস্তারের জন্য বৃহৎ উদ্যোগ গ্রহণ করেন। যাবতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা কেন্দ্রে ইসলামী শিক্ষা-দীক্ষার পাঠ্যসূচির পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এই উদ্যোগের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করেন। তিউনিসিয়ায় আরবি ভাষা ও ইসলামী শিক্ষার যে প্রবণতা ও অনুরাগ ছিল তাও ধ্বংস করার জন্য তিনি সর্বশক্তি ব্যয় করেন। তিনি আলেম-ওলামা ও ইসলাম প্রচারকদের বিতাড়িত করেন, সব ধরনের ইসলামী দলকে নিষিদ্ধ করেন। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের পাকড়াও করেন, তাদের ঘরছাড়া করেন, তাদের অপমান-অপদস্থ করেন, তাদের কঠিন ও নিকৃষ্ট শাস্তি দেন।
তিনি তার নিউ দস্তুর বাNew Constitutional Liberal Party-এর কর্মীদের সার্বক্ষণিকভাবে এই কাজের জন্য নিয়োজিত করেন। এমনকি হাবিব বুরগিবা নিজেই রাস্তায় নামেন এবং তার দুই হাত দিয়ে তিউনিসিয়ার নারীদের হিজাব খুলে নেন… এবং হিজাব নিষিদ্ধ করে আইন প্রণয়ন করেন। এই আইনে বলা হয় যে, হিজাব একটি সাম্প্রদায়িক পোশাক, তা সমাজের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টিতে মানুষকে প্ররোচিত করে। হাবিব বুরগিবা তরুণীদের সঙ্গে যুবকদের মেলামেশার জন্য সব ধরনের সুবিধা ও সব ধরনের পন্থা ও পদ্ধতি সহজীকরণে তার সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যয় করেন। তিনি বেশ্যালয় খোলেন, পানশালা (মদের বার) অনুমোদন দেন। তিনি কুরআনকে বিতাড়িত করেন, মুসল্লিদের ওপর নজরদারি শুরু করেন, দ্বীনদারির ঝর্ণাগুলোকে শুকিয়ে ফেলেন। ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদে বিশ্বাসী হাবিব বুরগিবা ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন; ইসলামের আখলাক-শিষ্টাচার, মূল্যবোধ, আদর্শ ও মূলনীতি ও ইসলামিক কার্যাবলির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। তিনি তিউনিসিয়ার ইসলামী পরিচয় মুছে দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। তিনি নিজেকে মহান আল্লাহর প্রতিদ্বন্দ্বী ঘোষণা করেন। তিনি স্পষ্টভাবে দাবি করেন যে, কোরআন বৈপরীত্যপূর্ণ স্ববিরোধ বিষয় দ্বারা পরিপূর্ণ। নবী করিম (সা.)কে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রপ ও ঠাট্টা-তামাশা করেন।


১৯৬৫ সালে হাবিব বুরগিবা তিউনিসিয়ার জনগণের জন্য রোজা নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানান। এমনকি রমজান মাসেও রোজা নিষিদ্ধ করতে বলেন। তার দাবি ছিল রোজা উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে এবং তিউনিসিয়ার অগ্রযাত্রা ও উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। তার সরকার নামাজকেও অগ্রহণযোগ্য মনে করে। তারা নামাজকে এবং নামাজের প্রতি আহ্বান করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ ঘোষণা করেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে আইন করা হয় যে, শুক্রবারের পরিবর্তে শনিবার হলো সাপ্তাহিক ছুটি। তিউনিসিয়ার নাগরিকেরা তাদেরকে জুমার নামাজ থেকে বঞ্চিত করার ফলে অসুবিধা ও যন্ত্রণার শিকার হন। ফতোয়া জারি করা হয় যে, জুমার নামাজ ও আসরের নামাজ একত্রীকরণ জায়েজ আছে অর্থাৎ আসরের নামাজের সঙ্গে জুমার নামাজ আদায় করা যাবে। জুমার সমস্ত খুতবা সরকারের পক্ষ থেকে লিখিত আকারে বিলি করা হতো এবং সব মসজিদে একই খুতবা পঠিত হতো। খতিবদের জন্য আবশ্যক ছিল এই খুতবা পাঠ করা। অন্যথায় তাদের জবাবদিহি করতে হতো। তিউনিসিয়ার সব মসজিদ আরও একটি ভয়ঙ্কর আইনের শিকার হয়। এই আইনের আওতায় মসজিদগুলোকে কেবল নামাজের সময় মুসল্লিদের জন্য খুলে দেয়া হতো এবং নামাজের পর পরই বন্ধ করে দিতে হতো। যারা এই আইন বাস্তবায়নে নিয়োজিত ছিলো তারা কোনো মুসল্লিকে নামাজের পর মসজিদের ভেতরে সামান্যতম বসারও সুযোগ দিত না। একইভাবে মসজিদের অভ্যন্তরে যেকোনো ধরনের মজলিস বা সমাবেশ তা যে-নামেই হোক আর যে-কারণেই হোক তা নিষিদ্ধ ছিল। এমনকি কিছু কিছু মসজিদকে ভাণ্ডার ও মজুদাগারে রূপান্তরিত করা হয়।
১৯৮১ সালে হাবিব বুরগিবা একটি আইন জারি করেন। এই আইন ‘সার্কুলার নং ১০৮’ নামে পরিচিত ছিল। এই আইনে হিজাবকে সাম্প্রদায়িক পোশাক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ঘোষণা করা হয় যে, হিজাব ও পর্দা দ্বীনে ইসলামের কিছুই নয়। শতকরা ৯৮ ভাগ মুসলমানের এই দেশে বলা হয় সাম্প্রদায়িক পোশাক হিসেবে হিজাব সমাজে বিভেদ ও বৈষম্য সৃষ্টি করবে। তিউনিসিয়ার ধর্মমন্ত্রী আবু বকর আল আখযুরি হিজাবকে আক্রমণ করে বলেন, হিজাব তিউনিসিয়ার সমাজে অনুপ্রবেশকারী ও অস্বাভাবিক সতীত্বপ্রবণ সাম্প্রদায়িক পোশাক। তিনি ঘোষণা দেন- যে নারী হিজাব পরিধান করবে সে পরিচিত ও স্বাভাবিক রীতিনীতি থেকে বেরিয়ে যাবে। পুলিশ সদস্যরা রাস্তা থেকে হিজাব পরিহিতা নারীদেরকে বিতাড়িত করতে উঠে পড়ে লেগে যায়। যেসব নারী হিজাব পরিধান করেন তাদেরকে সরকারি কর্মক্ষেত্রে নিষিদ্ধ করা হয়। ঘরে বা পরিবারে কোন হিজাব পরিধানকারী মেয়ে বা নারী থাকলে স্বামীদের ও বাবাদের জবাবদিহি করতে হতো। এমনকি হিজাব পরিহিতা নারীর সরকারি হাসপাতালগুলোতে সন্তান প্রসব করতে পারত না। এই আইন লঙ্ঘনের ফলে শত শত দ্বীনদার নারী ও তরুণীকে গ্রেফতার করে অমানুষিক জুলুম নির্যাতন করা হয়, বছরের পর বছর কারাগারে আটকে রাখা হয়।
বিশেষ আইনের মাধ্যমে তিউনিসিয়ায় শরয়ী বিচারব্যবস্থা নিষিদ্ধ করা হয়। শরিয়া মোতাবেক পরিচালিত দফতরগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। তিউনিসিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় জামিয়া আয্ যাইতুনা বন্ধ করে দেয়া হয়। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী শিক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়। জামিয়া যাইতুনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলেমগণের জন্য ওয়াকফকৃত সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জায়নবাদী আন্দোলন ও ইহুদি ধর্মে দীক্ষিতকরণ উৎসাহ ও প্রণোদনা পায়। সর্বস্তরের মানুষের জন্য সকল শহরে, মফস্বলে, গ্রামে-গঞ্জে নারী-পুরুষের যৌথ ড্যান্স ক্লাব খোলা হয়। জাদুবিদ্যা, মায়াবিদ্যা ও ইসলামবিরোধী ভাগ্যগণনা ইত্যাদির ব্যাপক প্রচার প্রসার ঘটানো হয়।
কামাল আতাতুর্ক ১৯২৩ সালের ২৯ অক্টোবর ক্ষমতাসীন হয়ে গায়ের জোরে তুরস্কে ধর্মনিরপেক্ষতা চালু করেন। বন্দুকের মুখে প্রতিষ্ঠিত এই ধর্মনিরপেক্ষতার বিরোধিতা করতে গিয়ে শত শত ধর্মপ্রাণ মানুষ শাহাদাতবরণ করেন। ১২৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ওসমানীয় খেলাফত ১৯২৪ সালে বিলুপ্ত করেন। কামাল আতাতুর্ক ওসমানীয় খেলাফত বিলুপ্ত করে তুরস্ককে পশ্চিমা ধাঁচে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেন। ১৯২৫ সালে তিনি ইসলামভিত্তিক শরিয়াহ আদালত বাতিল করেন। ১৯২৬ সালে ওসমানীয় সাম্রাজ্য প্রবর্তিত ও ইসলামী বিধানের পরিবর্তে সুইস সিভিল ও ইতালিয়ান দণ্ডবিধি চালু করেন। তুর্কি সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামও বাদ দেয়া হয়। ১৯২৮ সালের ১ নভেম্বর তুরস্কের পার্লামেন্ট বিদ্যমান আরবি বর্ণমালার স্থলে ল্যাটিন বর্ণমালা প্রবর্তন করেন। কামাল আতাতুর্ক ‘পবিত্র কুরআন’ তুর্কি ভাষায় অনুবাদ করে নতুন বর্ণমালায় তা প্রকাশ করার আদেশ দেন। তবে তুর্কি ভাষায় আজান এবং নামাজ আদায়ের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেও তিনি ব্যর্থ হন। তুর্কি ভাষায় কোনো দিনই মুসলমানদের নামাজ আদায় করাতে পারেননি। দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-ওলামা, মুফতিদের দুটি জাহাজে বোঝাই করে ভূমধ্যসাগরে তাদের মর্মান্তিক ইন্তেকাল নিশ্চিত করা হয়। পুরুষ ও মহিলাদের পোশাক-পরিচ্ছদ পরিবর্তন, মক্তব বিলুপ্তি এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিন হিসেবে শুক্রবারের পরিবর্তে রোববার করা হয়। পীর, ফকির ও দরবেশদের আস্তানা ও খানকাহ বন্ধ করে দেয়া হয়।
কামাল আতাতুর্ক ওসমানীয় খেলাফত কর্তৃক প্রণীত পাঠ্যপুস্তক থেকে ইসলামী ভাবধারার প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও গল্প-কবিতা বাদ দিয়ে পাঠ্যপুস্তকে নাস্তিক্যবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী ভাবাদর্শের রচনা, গল্প ও কবিতা প্রতিস্থাপন করেন। শিশুদের ইসলামী শিক্ষা বন্ধ করে দেয়া হয়। ধর্ম মন্ত্রণালয়, মাদরাসা-মসজিদ বন্ধ করে দেয়া হয় এবং হজ ওমরাহ পালন নিষিদ্ধ করা হয়। মুসলমানদের জন্য ধর্মীয় উৎসবকে বর্জনীয় ঘোষণা করা হয়। বড় বড় মসজিদ বন্ধ করে দিয়ে সেগুলোকে জাদুঘর হিসেবে উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। তুরস্কের সর্ববৃহৎ মসজিদ ‘আয়া সুফিয়া’কে রূপান্তরিত করা হয় সরকারি জাদুঘরে।
এছাড়াও তুরস্কে আরবি হরফের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। আরবিতে কুরআন তিলাওয়াত, নামাজ আদায় ও আজান দেয়া নিষিদ্ধ হয়। তুর্কি ভাষা আরবি হরফে না লিখে ল্যাটিন হরফে লেখা হতো। সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবারের পরিবর্তে রোববার নির্ধারণ করা হয়। তুরস্কের অধিবাসীদের ইসলামী পোশাক বাদ দিয়ে ইউরোপীয় পোশাক পরিধানে বাধ্য করা হয়। তুরস্কের অধীন আজারবাইজানকে রাশিয়ার কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। বক্তৃতা ও বিবৃতিতে ইসলাম ও ইসলামী পরিভাষাসমূহ নিয়ে মিথ্যাচার ও কুৎসা রটনা করে সেগুলো বর্জনের জন্য সরকারি নির্দেশনা জারি করা হয়। সরকারি লোকদের জামাতে নামাজ আদায় নিষিদ্ধ করা হয়। ইসলামী নিয়মকানুন অনুযায়ী ‘সালাম-কালাম’ নিষিদ্ধ করা হয় এবং এর পরিবর্তে সুপ্রভাত সম্মোধন চালু করা হয়। আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ ও দরবেশদের পাগড়ি-জুব্বা প্রভৃতি ইসলামী পোশাক পরিধান নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। হিজরি সনের পরিবর্তে চালু করা হয় খ্রিষ্টীয় সন। ইসলামী নাম রাখাও নিষিদ্ধ করা হয়। আলেম-ওলামাদের প্রতিষ্ঠিত সব প্রতিষ্ঠান ভেঙে দেয়া হয় এবং আলেমদেরকে প্রজাতন্ত্রের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
১৯২৪ সালে রেজা শাহ রাজপদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর ইরানে ধর্মনিরপেক্ষতা একটি রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রকাশ্য প্রদর্শন বা অভিব্যক্তি, যেমন মহিলাদের হিজাব ও চাদর পরিধান এবং পুরুষদের মুখের লোম (গোঁফ ব্যতীত) রাখাকে অবৈধ ঘোষণা করেন। জনসাধারণের ধর্মীয় অনুষ্ঠান (যেমন মুহররম ও আশুরা) উদ্যাপন নিষিদ্ধ করা হয়। ইসলামিক ধর্মগুরুদের প্রকাশ্যে ধর্মপ্রচার করাকে নিষিদ্ধ করা হয়। মসজিদকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে নিয়ন্ত্রণ ও সীমাবদ্ধ করা হয়।
যুগে যুগে ইসলামবিদ্বেষী ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের ধ্বজাধারী শাসকগোষ্ঠীর মত সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ চর্চার নামে চলছে নির্বিচারে মুসলিম নিধন। কয়েকদিন আগেই বিশ্ব অবাক হয়ে দেখল কিভাবে অসহায় নিরস্ত্র মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নির্মমভাবে নিঃশেষ করে দেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে ভারতীয় শাসকগোষ্ঠী। স্বাধীনতার তিন দশক পর ১৯৭৬ সালে ইন্দিরা গান্ধীর সময়ে ভারতের সংবিধানে ৪২তম সংশোধনীর মাধ্যমে সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটি প্রারম্ভিক স্তবকে জুড়ে দেয়া হয়।
ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক অধিকারের তালিকায় সকল নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকারকে মান্যতা দিয়েছিলেন যা এই নিম্নলিখিত ধারাগুলোতে ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার হিসেবে উল্লেখ আছে-
২৫ নং ধারা- প্রত্যেক নাগরিককে তাদের নিজেদের বিবেক অনুযায়ী যে কোনও ধর্মমত গ্রহণ, ধর্মপালন ও নিজেদের ধর্মমত প্রচারের অধিকার দেয়া হয়ছে।
২৬ নং ধারা- ধর্মীয় ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও তা রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার দেয়া হয়েছে প্রতি ধর্মকে।
ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান অনুযায়ী সকল ধর্মের অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করার জন্য কাগজে-কলমে নানান কথা বলা হলেও ভারত প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই নানাভাবে চেষ্টা চালিয়েছে মুসলিম নিধনের। পূর্ববর্তী সরকারগুলো কিছুটা রাখঢাক করে এই কাজ করলেও বর্তমান মোদি সরকার কোন ধরনের রাখঢাক ছাড়াই প্রকাশ্যে মুসলিমনিধনের ঘোষণা দিয়ে মাঠে নেমেছে। একে একে প্রায় সব আয়োজন সম্পন্ন করেছে মুসলিম জাতিকে ভারতমুক্ত করার। ‘গো’রক্ষার নামে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে শত শত মুসলিম ভাইকে। ইতোমধ্যেই বাতিল করা হয়েছে কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা, বাবরি মসজিদের স্থানে নির্মাণ করা হচ্ছে রামমন্দির, চলছে মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের বিতাড়নের নামে মুসলমানদের ভারতছাড়া করার রক্তক্ষয়ী প্রচেষ্টা। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট বা সিএএ) এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জির (ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস বা এনআরসি) মাধ্যমে বাতিল করা হয়েছে লক্ষ লক্ষ মুসলিম নাগরিকের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে। শুধুমাত্র ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত এই অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে সমগ্র বিশ্ব। পিছিয়ে নেই ভারতীয় সাধারণ জনগণ। খোদ রাজধানী নয়াদিল্লিতেই লাখো মানুষ এ অন্যায়ের প্রতিবাদে রাস্তায় নামে। নানাভাবে চেষ্টা করা হয় জনতার প্রতিরোধ থামানোর। সকল চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে বেছে নেয়া হয় ঘৃণ্য সন্ত্রাসী পদ্ধতি। অতর্কিত হামলা চালানো হয় দিল্লির মুসলমানদের ওপর। নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে হয় প্রায় অর্ধশতাধিক মুসলমানকে। আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয় হাজার হাজার ঘরবাড়ি। সরকারের মদদপুষ্ট হিন্দু জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের সাথে সরাসসি অংশগ্রহণ করে ইন্ডিয়ান পুলিশ। স্লোগান উচ্চারিত হতে থাকে ‘ইয়ে গর্ব কি বাত হ্যায়/ পুলিশ হামারা সাথ হ্যায়’। এর আগে আমরা দেখেছি জামিয়া মিলিয়ায় পুলিশের ঘৃণ্য আক্রমণ। ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’ বলতে বলতে হামলা চালায় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জঙ্গি সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস) ও বিজেপি। তারা ‘হিন্দুয়ো কা হিন্দুস্তান’, ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিয়ে মহল্লার পর মহল্লা আগুনে ছারখার করছে দিল্লিতে। দৈত্যের মতো তাণ্ডব চালিয়ে মসজিদে ভাঙচুর এই হায়েনারা।
ধর্মনিরপেক্ষ ভারত সরকার মুসলিম নিধনের হাজার চেষ্টা করলেও তারা সফল হবে না। তিউনিসিয়া, তুরস্ক আর ইরানের ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারীরা আজ ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ঠিক তেমনি ভারতীয় সন্ত্রাসীরা মুসলমানদের রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে ইনশাআল্লাহ।
লেখক : সম্পাদক, প্রেরণা

SHARE

Leave a Reply