চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলায় এখনো যা অন্ধকারে -মো: কামরুজ্জামান বাবলু

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নিকষ কালো দিবস। নির্মমতা ও নৃশংসতার এক নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছিল এই দিনে। একসময় যারা ছিলেন সাধারণ মানুষের আশা আর ভরসার কেন্দ্রবিন্দুতে, সেই র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র‌্যাব একই সাথে সাতজনকে অপহরণের পর ঠান্ডা মাথায় হত্যা করেছিল। দেশের এই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীটির এমন নৃশংসতায় শিউরে উঠেছিল দেশের সর্বস্তরের মানুষ। নারায়ণগঞ্জ হয়ে ওঠে আতঙ্ক ও কান্নার নগরী।
একের পর এক নানা নাটকীয়তা ও জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষে চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি আলোচিত ওই সাত খুনের মামলায় পাঁচ বাহিনীর সাবেক ১৬ কর্মকর্তা ও সদস্যসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয় স্থানীয় আদালত। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে আছেন নারায়ণগঞ্জের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেন ও তাঁর অপরাধজগতের ৯ সহযোগী। এ ছাড়া ওই সব বাহিনীর আরও ৯ সাবেক সদস্যকে বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়।
সাজাপ্রাপ্ত ২৫ জন সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও আনসার বাহিনী থেকে প্রেষণে র‌্যাবে আসেন। অপরাধ সংঘটনের সময় তাঁরা সবাই র‌্যাব -১১তে কর্মরত ছিলেন। সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ১১ জন সেনাবাহিনী থেকে, ২ জন নৌবাহিনী থেকে, ৩ জন বিজিবি, সাতজন পুলিশ ও ২ জন আনসার থেকে র‌্যাবে যোগ দিয়েছিলেন। সাত খুনের মামলার পর তাঁদের নিজ নিজ বাহিনী থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত জনাকীর্ণ এজলাসে এই রায় ঘোষণা করেন। সংক্ষিপ্ত রায়ে তিনি বলেন, অপহরণ, হত্যা, লাশগুম ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২৬ জনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অপহরণ ও আলামত অপসারণে যুক্ত থাকায় বাকিদের ১০ বছর ও সাত বছর করে সাজা দেওয়া হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় গ্রেফতার থাকা ২৩ আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়।
আলোচিত এই হত্যা মামলার রায় উচ্চ আদালতেও যেন বহাল থাকে এবং আসামিদের বিরুদ্ধে এই রায় দ্রুত কার্যকর করা হোক সেটাই কামনা করেন দেশের মানুষ। আর একটি দেশের স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও আইনের শাসনের জন্য এটা খুবই বেদনাদায়ক যে এরকম একটি ব্যাপক আলোচিত হত্যা মামলার রায়ও শেষ পর্যন্ত কার্যকর হবে কি না অথবা আসামিরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে যাবে কি না তা নিয়ে দেশের নানা স্তরের মানুষের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক সংশয়। রায় ঘোষণার পরপরই বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে।
তবে, শত অপরাধ করেও প্রভাবশালীদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার যেই সংস্কৃতি বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার নজির এই রায়ের মধ্য দিয়ে স্থাপিত হয়েছে বলেও অনেকে মন্তব্য করেছেন। অবশ্য এই ইতিবাচক পরিবর্তন সত্যিকারার্থে বাস্তবায়িত হলো কি না তা রায় কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হবে। কেননা বিপুল অর্থ খরচ করে সিনিয়র আইনজীবীর মাধ্যমে উচ্চ আদালতে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করে প্রভাবশালী খুনিদের রেহাই পাওয়ার ভূরি ভূরি নজির যেমন আমাদের দেশে রয়েছে, তেমনি সর্বোচ্চ আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার পরও বহু খুনিকে রাষ্ট্রপতির মার্জনা নিয়ে ফাঁসির সেল থেকে বুক ফুলিয়ে বেরিয়ে আসার নজিরও নেহাত কম নয়। এই তো আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের চিত্র।
এমনই বাস্তবতায় অনেকের মনে এখনো নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের বিষয়ে আরো কিছু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কিছু বিষয় সেই শুরু থেকেই অন্ধকারেই রয়েছে। শীতলক্ষ্যা নদীতে লাশ ভেসে ওঠার পর সাত খুনের ঘটনা জনসম্মুখে প্রকাশিত হবার পর অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল এই খুনের নেপথ্যে নারায়ণগঞ্জের দীর্ঘদিনের গডফাদার শামীম ওসমানের সম্পৃক্ততার বিষয়টি। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের জনপ্রিয় মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী শামীম ওসমানকে ইঙ্গিত করে বক্তব্য দেয়ার পর বিষয়টি আরো জোরালো হয়।
আইভীর এমন বক্তব্য নিয়ে ২০১৪ সালের ১১ আগস্ট বাংলা নিউজ ২৪.কমে “সাত খুনের ঘটনায় গড ফাদাররা জড়িত”Ñ এই শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনের খানিকটা হলো: “নারয়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর অপহরণ ও সাত খুনের ঘটনায় গড ফাদাররা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত বলে মনে করেন সিটি মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। নারায়ণগঞ্জে এখনও স্বস্তি ফিরে আসেনি, মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তবে কারা গডফাদার তা স্পষ্ট করে বলার প্রয়োজন নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, কারা গডফাদার সবাই তা জানেন। হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত সরকারের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির কাছে সোমবার (১১ আগস্ট ২০১৪) সচিবালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন।”
দেশের প্রথম অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিডিনিউজ ২৪.কমে একই দিনে অর্থাৎ ২০১৪ সালের ১১ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, “৭ খুনের পেছনে নারায়ণগঞ্জের গডফাদাররা: আইভী।” ওই প্রতিবেদনের খানিকটা হলো: “নারায়ণগঞ্জের ‘গডফাদাররা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে’ চাঞ্চল্যকর সাত খুনের সঙ্গে জড়িত বলে মন্তব্য করেছেন সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। এ মামলার প্রধান আসামি সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নূর হোসেনকে ভারত থেকে ফিরিয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করারও দাবি জানিয়েছেন তিনি। সাত খুনের ঘটনায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন আইভী। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের গডফাদাররাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ওই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত। এই ‘গডফাদার’ কারা জানতে চাইলে আইভী বলেন, নারায়ণগঞ্জে কারা ‘গডফাদার’ তা দেশের সবাই জানে। এ বিষয়ে নির্দিষ্ট করে বলার কিছু নেই।”
এদিকে, আইভীর এমন বক্তব্যের পর উল্টো আইভীকে দোষারোপ করে বক্তব্য দেন শামীম ওসমান। আইভী কাউকে বাঁচাতে চায় এমন মন্তব্য করে শামীম ওসমান খুনিদের সাথে আইভীর সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ করেন। “আইভী কাউকে না কাউকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন”- এমন শিরোনামে ২০১৪ সালের ১২ আগস্ট দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে: “নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুনের ঘটনায় ওই এলাকার সরকারি দলের সাংসদ শামীম ওসমান অভিযোগ করে বলেছেন, সেলিনা হায়াৎ আইভী ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে না কাউকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।
আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি শামীম ওসমানের বক্তব্য নেয়। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত কমিটি শামীমের বক্তব্য নেয়। পরে সাংবাদিকদের কাছে শামীম ওসমান বক্তব্য তুলে ধরেন। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রধান আসামি নূর হোসেনকে নিজের লোক নয় বলে দাবি করেন শামীম ওসমান। তিনি বলেন, ‘নূর হোসেন ঘটনার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত। নূর হোসেন আমার লোক হলে আইভী তাকে বড় বড় পদ দেন কেন?’ নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনা উচিত বলে মন্তব্য করে শামীম ওসমান বলেন, ‘আমার হাতে ক্ষমতা থাকলে কালকেই নূর হোসেনকে নিয়ে আসতাম।’”
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও একই দলের পক্ষ থেকে নির্বাচিত সিটি মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর এই পাল্টাপাল্টি দোষারোপের বিষয়টি আজও ধামাচাপা রয়েই গেল। সাত হত্যার সাথে সরাসরি জড়িত র‌্যাব সদস্য ও নারায়ণগঞ্জের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেনের মতো লোকদের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় দেয়া হলো অথচ এর পেছনের আসল হোতা কারা তা এখনো অন্ধকারেই থেকে গেল। শামীম ওসমান ও আইভীর পাল্টাপাল্টি দোষারোপের ইস্যুতে নিরপেক্ষ তদন্ত চালালেই হয়তো নেপথ্যের কুশীলবদের ধরার একটা পথ পাওয়া যেতে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেটা হয়নি।
এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে দেখা যায় শামীম ওসমান জোর দিয়ে বলছেন নূর হোসেন তার লোক নয়। নূর হোসেনকে তিনি আইভীর লোক বলেও অভিযোগ করেন। এমনকি তার হাতে ক্ষমতা থাকলে নূর হোসেনকে তিনি পরদিনই খুঁজে বের করে নিয়ে আসতেন। অথচ আমরা পরবর্তীতে দেখতে পেলাম নূর হোসেনকে পালিয়ে যেতে শামীম ওসমানই সহায়তা করেছেন। এমনকি ফাঁস হয়ে যাওয়া ফোনালাপে নূর হোসেন নিজের বাপ বলে শামীম ওসমানকে সম্বোধন করেন। দেশের প্রায় সব গণমাধ্যমেই শামীম ওসমান ও নূর হোসেনের ফোনালাপের খবরটি ফলাও করে প্রচার করা হয়। এমনকি এখনো ইউটিউবে সেই ফোনালাপের অডিও শোনা যায়।
“শামীম ওসমান ও নূর হোসেনের সেই ফোনালাপ”- এই শিরোনামে ২০১৫ সালের ১৪ নভেম্বর দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ফোনালাপটি হুবহু তুলে ধরা হয়। তারই খানিকটা এখানে উল্লেখ করলাম :
“নূর হোসেন : ভাই, আমার কোনো দোষ নাই। আমি লেখাপড়া জানি না। আমার অনেক ভুল আছে ভাই। আপনি আমার বাপ লাগেন, ভাই। ভাই, আপনাকে আমি অনেক ভালোবাসি ভাই। আমার কোনো দোষ নাই।
শামীম ওসমান : খবরটা পাইছিলা …?
নূর হোসেন : হ, ভাই। জীবনটা আপনাকে দিয়া দিমু ভাই। আপনি আমার বাপ লাগেন ভাই।
শামীম ওসমান : সময় নাও। আরে তুমি এত চিন্তা করো না। সময় নাও।
নূর হোসেন : ভাই আমি লেখাপড়া জানি না। আমারে মাফ করে দিয়েন।
শামীম ওসমান : একটু সময় নাও। আর তুমি পারলে একটু গহুর দার কাছে যাও। এখন কোনো সমস্যা হবে না। আর তোমার ওখানে সিল নাই।
নূর হোসেন : না ভাই, আছে ভাই। কিন্তু যামু কেমনে? সব জায়গায় বলে অ্যালার্ট? প্রব্লেমে পড়লে, এখন রাত।
শামীম ওসমান : না কিছু নাই। মনে হয় না।
নূর হোসেন : ভাই তাইলে একটু খবর নেন না। আবার একটু ফোন দেই?
শামীম ওসমান : না আগাইতে থাকো।
নূর হোসেন : আমি লেখাপড়া জানি না। আমার অনেক ভুল আছে ভাই।
শামীম ওসমান : তুমি শুধু ওই জায়গাটাতে যাও। কিচ্ছু হবে না। চিন্তা করো না। তুমি অপরাধ কর নাই।”
দু’জনের মধ্যে এই ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার আগে শামীম ওসমান বলেছিলেন নূর তার লোক নয়, নূর ওই হত্যায় জড়িত থাকতে পারে, তার ক্ষমতা থাকলে নূরকে হাজির করতেন, ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু পরিতাপের বিষয় শামীম ওসমানের এই মিথ্যাচারের বিষয়েও কোন তদন্ত হয়েছে বলে আমার জানা নাই। ফোনালাপের সেই গহুর দাটাই বা কে? ক্ষমতাসীন দলের গড ফাদার বলে কথা। শুধু ফোনালাপই নয়, শামীম ওসমানের সহায়তায়ই নূর হোসেন পালিয়েছিল বলে দেশের প্রভাবশালী গণমাধ্যমে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে একাধিক। উদাহরণস্বরূপ দৈনিক প্রথম আলোতে “শামীমের সহায়তায় পালান নূর হোসেন?”- এই শিরোনামে ২০১৪ সালের ২৩ মে প্রকাশিত প্রতিবেদনের খানিকটা হুবহু তুলে ধরছি:
“নারায়ণগঞ্জের ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ ও খুনের মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনকে বিদেশে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সরকারি দলের সাংসদ শামীম ওসমান। তদন্তসংশ্লিষ্ট উচ্চ পর্যায়ের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে ।
মামলা তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সংস্থার দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের কাছে তথ্যপ্রমাণ আছে, অপহরণের দুই দিন পর ২৯ এপ্রিল রাত সাড়ে নয়টার দিকে শামীম ওসমানকে ফোন করেন নূর হোসেন। দুই মিনিটের মতো কথা হয় তাঁদের মধ্যে। এই কথোপকথনের রেকর্ড তাঁদের হাতে আছে। শামীম ওসমানকে ফোন করার সময় ধানমন্ডি ৪ নম্বর সড়কের আশপাশে ছিল নূর হোসেনের অবস্থান।”
শুধু শামীম ওসমানই নয়, চাঞ্চল্যকর সাত খুনের ঘটনায় র‌্যাবের আরেক শীর্ষ কর্মকর্তার নাম উঠে আসে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তার বিষয়ে আর কোনো নড়চড় লক্ষ্য করা যায়নি। ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউনে ২০১৪ সালের ৬ জুন “Zia’s identity now seems key to solving N’ganj 7-murder case- অর্থাৎ “নারায়ণগঞ্জে সাত খুন মামলার জট খোলার মূল চাবিকাঠি ভাবা হচ্ছে জিয়াকে”- এই শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেখানে দেখা যায় জিজ্ঞাসাবাদে আটক র‌্যাব কর্মকর্তা রানা সুস্পষ্টভাষায় বলেন, জিয়ার নির্দেশেই তারা ওই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। প্রকাশিত প্রতিবেদনের খানিকটা হুবহু তুলে ধরা হলো:
“Lt Commander (retd) MM Rana, a former RAB 11 official from the navy, who lost his job after the seven murders in Narayanganj, has revealed in his confessional statement that the crime had been committed on the instruction of the forces high official named Zia. Md Sakhawat Hossain Khan, chief of the local lawyers’ association, told this to journalists based on information he gathered from different sources about the statement. Rana confessed to his involvement in the killings before the court of Senior Judicial Magistrate KM Mohiuddin of Narayanganj yesterday.
অর্থাৎ “নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চাকরিচ্যুত র‌্যাব-১১’র সাবেক কর্মকতা নৌবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এমএম রানা তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন, জিয়া নামে র‌্যাবের আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশনা অনুযায়ীই হত্যার পুরো ঘটনাটি সংঘটিত হয়। নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. সাখাওয়াত হোসাইন খান বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিত হয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। গতকাল নারায়ণগঞ্জের একটি আদালতে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কেএম মহিউদ্দীনের সামনে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন রানা।”
ঢাকা ট্রিবিউনের এই প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ৬ জুন ২০১৪ সালে বাংলা অনলাইন নিউজ পোর্টাল নতুনবার্তা.কম “৭ খুনের নেপথ্যে র‌্যাবের জিয়া!”- এই শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেই প্রতিবেদনের খানিকটা তুলে ধরছি:
“আইনজীবী সাখাওয়াত বলেন, ‘আরিফ ও রানা নিজেরা যে বাহিনীর হয়ে কর্মরত ছিলেন সেই নির্দিষ্ট বাহিনীটিরই একটি শীর্ষ পদে কর্মরত এক কর্মকর্তার নামও উল্লেখ করেছেন তারা। ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নাম জিয়া বলে জানিয়েছেন তারা এবং অপহরণ ও হত্যার আদেশও এই জিয়াই তাদের দিয়েছিলেন।” ‘নির্দিষ্ট বাহিনী’ বলতে কী বোঝাচ্ছেন জিজ্ঞেস করা হলে সাখাওয়াত জানান, নির্দিষ্ট বাহিনী বলতে তিনি র‌্যাবকেই বুঝিয়েছেন। কারণ গ্রেফতারকৃত সাবেক তিন কর্মকর্তা ওই বাহিনীটিতেই কর্মরত ছিলেন।
একটি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে সাখাওয়াত জানান, গ্রেফতারকৃত ওই তিন কর্মকর্তা বারবারই একথা বলে আসছিলেন যে, অপহরণ ও হত্যার ওই আদেশ শীর্ষ পদে কর্মরত এমন একজন কর্মকর্তার কাছ থেকে তারা পেয়েছিলেন যা অগ্রাহ্য করা তাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল।
তবে এতকিছু জানালেও জিয়া নামের ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার র‌্যাংক ও পদবি কী তা নির্দিষ্ট করে জানাননি সাখাওয়াত। কিন্তু বেশ কয়েক সপ্তাহ আগে গত ২৭ এপ্রিল যখন এই অপহরণ ও হত্যার ঘটনা ঘটে, তারপরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর মধ্যে এলিট ফোর্স হিসেবে খ্যাত র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) অতিরিক্ত মহাপরিচালক এডিজি কর্নেল জিয়াউল আহসান সাত ব্যক্তিকে হত্যার এই ভয়াবহ ও লোমহর্ষক ঘটনা নিয়ে তার কিছু মন্তব্যের কারণে ব্যাপক আলোচিত হয়েছিলেন।
র‌্যাবের অতিরিক্ত ডিজি কর্নেল জিয়াউল আহসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে গতকাল রাতে ফোনে তিনি বলেন, কোনো অপরাধী কার্যকলাপ ঘটিয়ে ফেলার পরে অপরাধীরা নিজেদের বাঁচানোর জন্য নিজেদের দোষ চাপাতে অন্য যেকোনো ব্যক্তির নামই উল্লেখ করতে পারে। সবকিছু যাচাই-বাছাই করার পর তদন্ত কর্মকর্তারাই সত্য উদঘাটন করবেন।”
কিন্তু রহস্যজনকভাবে এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় এই ইস্যুটিও হালে পানি পায়নি। আসলে শুরু থেকেই এই হত্যা মামলা নিয়ে এক ধরনের ইঁদুর-বিড়াল খেলা চলতে থাকে। বিষয়টি পরিষ্কার করতে এখানে শুধু ২০১৪ সালের ১৭ মে ইংরেজি দৈনিক দি নিউ এজ পত্রিকায় “N’GANJ MURDER: April 27 CCTV footage lost” -অর্থাৎ “নারায়ণগঞ্জ হত্যা: ২৭ এপ্রিলের সিসিটিভি ফুটেজ হাওয়া”Ñ এই শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয় ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল সাতজনকে অপহরণের দিনে ঘটনাস্থলের সড়কে সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজ পুলিশ হারিয়ে ফেলে। প্রতিবেদনের খানিটা তুলে ধরছি :
“The police did not preserve the April 27 footage of closed-circuit television cameras installed in the Narayanganj city when Rapid Action Battalion personnel are alleged to have picked up seven people from the Dhaka–Narayanganj link road. Investigators found that no footage for the day was preserved. The police had installed the CCTV cameras on 16 locations, many of which went out of order recently.
অর্থাৎ “নারায়ণগঞ্জে স্থাপিত ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ২৭ এপ্রিলের ফুটেজ পুলিশ সংরক্ষণ করেনি। ওই দিন ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের লিংক রোড থেকে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র‌্যাব সদস্যরা সাতজনকে অপহরণ করেছিল। তদন্ত কর্মকর্তারা দেখতে পান ওইদিনের কোন ফুটেজই সংরক্ষণ করা হয়নি। এরকম ১৬টি স্থানে পুলিশ ওই সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো স্থাপন করেছিলেন যার অনেকগুলোই এরই মধ্যে অকেজো হয়ে গেছে।”
আসলে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে কিংবা ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে খুনিদের সাথে আপসরফা করার ইতিহাস বাংলাদেশে নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক দল ও এর শীর্ষ নেতাদেরকে এমন সমঝোতা ও আপসরফা করতে দেখা গেছে। সবার জ্ঞাতার্থে শুধু একটি উদাহরণ দিতে চাই। সাবেক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ছিলেন ১৯৭১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনী পরিচালিত ট্রাইব্যুনালের সদস্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থানকারী বহু সেনাকর্মকর্তাকে সেই ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। আর এই এরশাদকেই দেশ স্বাধীন হবার পর সেনাবাহিনীতে পুনরায় নিয়োগ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অথচ এরশাদের শুরুতেই ফাঁসি কিংবা মার্শাল লতে বিচার হওয়ার উচিত ছিল।
শুধু কি তাই. নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে এই এরশাদই হলেন বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত। অথচ এই এরশাদ শুধু স্বাধীনতাবিরোধীই নয়, বঙ্গবন্ধু হত্যার অন্যতম নেপথ্যের নায়ক হিসেবেও তার বিরুদ্ধে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। একাত্তরে রণাঙ্গনের কিংবদন্তি মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল শাফায়াত জামিল (অব.) তার “একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, রক্তাক্ত মধ্য-আগস্ট ও ষড়যন্ত্রের নভেম্বর” গ্রন্থের ১২০ পৃষ্ঠায় লিখেছেন: “২৪ আগস্ট (১৯৭৫) সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে সেনা উপপ্রধান জিয়া আমাকে তাঁর অফিসে ডেকে পাঠালেন। আমাকে কিছুক্ষণ বসিয়ে রাখলেন তিনি। তাঁর টেবিলে একটা রেডিও দেখলাম। একটু পরে জিয়া সেটটি অন করলেন। তখন খবর হচ্ছিল। খবরে জানানো হলো, সেনাপ্রধান শফিউল্লাহকে প্রেষণে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছে। সেনাপ্রধান করা হয়েছে উপপ্রধান জিয়াকে। তাঁর স্থলে উপপ্রধান হয়েছেন তখন দিল্লিতে অবস্থানরত ব্রিগেডিয়ার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ঐদিনই রাতারাতি মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করা হয় তাঁকে। নিতান্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশের বাইরে অবস্থানরত এরশাদের এই দু’দুটো বিধিবহির্ভূত পদোন্নতি এবং উপপ্রধান পদ লাভের সঙ্গে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটা প্রশ্ন সাপেক্ষ।”
এই বইয়ের ১২০-১২১ পৃষ্ঠায় লেখক আরো লিখেছেন: “পনেরো আগস্টের অভ্যুত্থানকারীদের সঙ্গে এরশাদের ঘনিষ্ঠতা ও তাদের প্রতি তার সহমর্মিতা লক্ষণীয়। পরবর্তী সময়ের দুটো ঘটনা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রথমটি, খুব সম্ভবত, মেজর জেনারেল জিয়ার সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেয়ার পরবর্তী দ্বিতীয় দিনের ঘটনা। আমি সেনাপ্রধানের অফিসে তাঁর উল্টো দিকে বসে আছি। হঠাৎ রুমে ঢুকলেন সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত ডেপুটি চিফ মেজর জেনারেল এরশাদ। এরশাদের তখন প্রশিক্ষণের জন্য দিল্লি থাকার কথা। তাকে দেখামাত্র সেনাপ্রধান জিয়া তাকে বেশ রূঢ়ভাবে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি বিনা অনুমতিতে কেন দেশে ফিরে এসেছেন। জবাবে এরশাদ বললেন, তিনি দিল্লিতে অবস্থানরত তার স্ত্রীর জন্য একজন গৃহভৃত্য নিতে এসেছেন। এই জবাব শুনে জিয়া অত্যন্ত রেগে গিয়ে বললেন, আপনার মতো সিনিয়র অফিসারদের এই ধরনের লাগামছাড়া আচরণের জন্যই জুনিয়র অফিসাররা রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করে দেশের ক্ষমতা দখলের মতো কাজ করতে পেরেছে। জিয়া তার ডেপুটি এরশাদকে পরবর্তী ফ্লাইটেই দিল্লি ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। তাকে বঙ্গভবনে যেতেও নিষেধ করলেন। এরশাদকে বসার কোনো সুযোগ না দিয়ে জিয়া তাকে একরকম তাড়িয়েই দিলেন। পরদিন ভোরে এরশাদ তার প্রশিক্ষণস্থল দিল্লিতে চলে গেলেন ঠিকই, কিন্তু সেনাপ্রধান জিয়ার নির্দেশ অমান্য করে রাতে তিনি বঙ্গভবনে যান। অনেক রাত পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থানরত অভ্যুত্থানকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর থেকেই মনে হয় এরশাদ আসলে তাদের সঙ্গে সলাপরামর্শ করার জন্যই ঢাকায় এসেছিলেন।”
একই বইয়ের ১২১ পৃষ্ঠায় লেখক এমনও বলেছেন: “ঘটনাপ্রবাহ থেকে এ কথা মনে করা মোটেই অযৌক্তিক নয় যে ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান ও হত্যাকাণ্ডের পেছনে এরশাদের একটি পরোক্ষ কিন্তু জোরালো ভূমিকা ছিল।”
বইয়ের আরো বেশ কয়েক জায়গায় এরশাদকে নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন লেখক। যাই হোক সেই এরশাদই এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত। সবই সম্ভব এই দেশে! নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায়ও এরকম অনেক কিছুই ঘটতে পারে। মূল হোতারা হয়তো আজীবন ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকবেন। আরো বড় বড় রাষ্ট্রীয় দায়িত্বও হয়তো পালন করবেন। তবে, আর যাই হোক আদালত যেই ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে অন্তত তাদের বিরুদ্ধে যেন রায় কার্যকর করা হয় সেটাই দাবি দেশের সর্বস্তরের মানুষের।
লেখক : সাংবাদিক

SHARE