চীন-ভারতের দ্বন্দ্ব : সামরিক শক্তির সামর্থ্য কার কতটুকু? -সরদার আবদুর রহমান

সাম্প্রতিক চীন-ভারত উত্তেজনার মুখে অন্যসব হিসাবের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছে চীনের সঙ্গে মোকাবিলায় ভারতের সামরিক ও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার বিষয়টি। দুই দেশের নানা প্রকার পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে এই বিষয়টি তেমন আলোচনায় আসতে দেখা যাচ্ছে না।
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে কাঁধের ওপর রেখে ভারতের নেতারা বরাবর বলে আসছেন যে পাকিস্তান নয়- চীন তাদের প্রধান শত্রু। বিশেষত ১৯৬২ সালের যুদ্ধে ভূখন্ড হারানোর পর থেকে তাদের এই উপলব্ধি হয়েছে। পঞ্চান্ন বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর দুই দেশই সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে অনেক পরাক্রম অর্জন করেছে। অতঃপর ২০১৭ সালে এসে সেই পরাক্রম তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে তুমুল উত্তেজনার রূপ নিয়েছে। ভারত চীনকে লক্ষ্য করে হুঁশিয়ারি দিচ্ছে, ‘এটা বাষট্টি সাল নয়।’ তার মানে ভারত সেই পরাজয়কে হাড়ে হাড়ে উপলব্ধিতে রেখেছে। আর চীনও মাঝে মধ্যেই ভারতকে বিতর্কিত এলাকা থেকে সৈন্য সরিয়ে নেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। এই পরিস্থিতির মধ্যে বিশ্লেষণ করা শুরু হয়েছে উভয় পক্ষের সামরিক সামর্থ্যরে।
প্রতিরক্ষাগত দিক দিয়ে দুই দেশই একটা দিকে সমান অবস্থানে আছে- সেটা হলো পারমাণবিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে। কার হাতে কয়টা পারমাণবিক বোমা রয়েছে- এই হিসাব গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেননা সংখ্যা নয়, এই বোমা উৎক্ষেপণের সামর্থ্য থাকাটাই যথেষ্ট মনে করা হয়। এর বিধ্বংসী ক্ষমতাকে কেউ খাটো করে দেখে না। কিন্তু হিসাবটা অন্যখানে। সত্যি সত্যি যদি যুদ্ধ বেধে যায় তাহলে (পারমাণবিক সক্ষমতার বাইরে) অন্যান্য ফ্যাক্টরগুলো কার জন্য কতোটা সহায়ক বা প্রতিবন্ধক হতে পারে- সেই আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। কেননা শুধু সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব নয়- কৌশলগত অবস্থানও এক্ষেত্রে জরুরি বলে মনে করা হয়।

বিরোধীয় এলাকাসমূহ
ভারত এযাবৎ চীনের কোন ভূখণ্ডের উপর কোন দাবি জানিয়ে আসছে বলে শোনা যায় না। কিন্তু চীন বরাবর বেশ কয়েকটি এলাকার ওপর তাদের দাবি সোচ্চার কণ্ঠে করে আসছে। এর মধ্যে সেভেন সিস্টারের অন্যতম রাজ্য অরুণাচলের প্রায় ৯০ হাজার বর্গমিটার এলাকা চীন তার বলে দাবি করে থাকে। অন্যদিকে ভারতের দাবি, চীন জম্মু-কাশ্মির সীমান্তে ভারতের প্রায় ৩৮ হাজার বর্গমিটার এলাকা দখল করে রেখেছে। আর আকসাই চীন নাম দিয়ে চীন একে নিজেদের বলে দাবি জানিয়ে আসছে। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ভিকে সিং উল্লেখ করেন, ১৯৬৩ সালের ২ মার্চ সম্পাদিত চীন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তান চীনকে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মির এলাকার ৫ হাজার ১৮০ বর্গ কিলোমিটার জায়গা ছেড়ে দিয়েছে।
এদিকে সিকিমের ভারতভুক্তিকে আজো মেনে নেয়নি চীন। ৭ হাজার বর্গকিলোমিটারের সিকিম ১৯৭৫ সালের ১৬ মে ভারতের ২২তম রাজ্য হিসেবে অধিভুক্ত হয়ে যায়। ইতোমধ্যে কয়েক দশক পেরিয়ে গেছে। চীনে প্রকাশিত মানচিত্রে সিকিমকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দেখানো হয়েছে কিছুদিন আগেও। চীন-ভারত সম্পর্কের নয়া মেরুকরণের লক্ষ্যে ২০০৩ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ি ও চীনের প্রেসিডেন্ট জিয়াং জেমিনের মধ্যে এ মর্মে সমঝোতা হয়, চীন সিকিমকে ভারতের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেবে, আর বিনিময়ে ভারত তিব্বতকে চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মেনে নেবে। তবে চীন যে এই অবস্থান মেনে নিয়েছে, তার কোনো প্রকাশ্য স্বীকৃতি মেলেনি আজো। বরং সিকিমের স্বাধীনতার বিষয়টি আকারে ইঙ্গিত বলার চেষ্টা করছে চীন। এরই মধ্যে সিকিমের সীমান্তের কাছে ভুটানের ডোকলাম এলাকায় চীনের সড়ক তৈরি নিয়ে বিরোধ শুরু হয় ভারতের সঙ্গে। চীনের এই বিরোধটি হওয়ার কথা ভুটানের সঙ্গে। কিন্তু এই স্থান থেকে ভারতের শিলিগুড়ি করিডোরের দূরত্ব খুবই অল্প হওয়ার প্রেক্ষিতে ভারত এই বিরোধের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছে। তারা সেখানে সৈন্য মোতায়েন করায় বিরোধ চরমে ওঠে। এদিকে ভারতের উত্তরাখন্ডের বারাহোতিতে লাইন অফ একচুয়াল কন্ট্রোল বা আন্তর্জাতিক সীমারেখায় চীনা সেনাবাহিনীকে দেখা গেছে বলে দাবি করে দেশটির কর্মকর্তারা। গত বছরও চামোলি জেলায় ভারতের প্রায় এক কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে পড়েছিলো চীনাবাহিনী।
বর্তমান পরিস্থিতি হলো, চীন ও ভুটান সীমান্তের ডোকলাম উপত্যকায় চীন ও ভারতের সামরিক বাহিনী মুখোমুখি অবস্থানে আছে প্রায় দুই মাস ধরে। ডোকলামে রাস্তা নির্মাণ নিয়ে উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে চীন ও ভারত নিজেদের অবস্থানে অনড়। সীমান্তে যুদ্ধ যুদ্ধ পরিস্থিতি। চীনা গণমাধ্যম এবং সরকারের কেউ কেউ প্রায় প্রতিদিনই নিয়ম করে মনে করিয়ে দিচ্ছে, তাদের সামরিক শক্তির কাছে ভারত কিছুই নয়। ভারতও পিছু হটার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না। এরই মাঝে ভারতের কাশ্মিরে প্রবেশের হুমকি দিয়েছে চীন। সীমান্ত থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নিতে ভারতকে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল চীন। কিন্তু তাদের সেই হুঁশিয়ারি আমলে নেয়নি ভারত। সেনা প্রত্যাহার না করায় ভারতকে হুমকি দিয়ে চীনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘আমরা যদি উত্তরাখন্ড বা কাশ্মিরে ঢুকে পড়ি তখন কী হবে?’ চীনের সীমান্ত ও মহাসাগর বিষয়ক উপমহাপরিচালক ওয়াং ওয়েনলি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভারতীয় পক্ষ নানান অজুহাত দাঁড় করাচ্ছে। যদি আমরা একই অজুহাত ব্যবহার করি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার কাশ্মির অঞ্চলে এবং উত্তরাখন্ডের কালাপানিতে প্রবেশ করি তখন কী হবে?।’ তিনি বলেন, ‘ওই অঞ্চল নিয়ে ভারত ও তাদের প্রতিবেশী পাকিস্তানের মধ্যে বিতর্ক আছে। উত্তরাখন্ডে কালাপানি নিয়ে নেপালের সঙ্গে সমস্যা আছে। তাই, অজুহাত ব্যবহার করে পানি ধরে রাখা যায় না। এটা শুধু ঝামেলার কারণ হবে।’ এভাবে দেখা যাচ্ছে, ভারতকে ‘দখলদার’ হিসেবে চিহ্নিত করার অবিরাম প্রয়াস চালিয়ে আসছে চীন। এতে চীনের দাবির বলিষ্ঠতা বৃদ্ধির কৌশল কাজে লাগানো হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে চীন ‘আক্রমণাত্মক’ অবস্থান গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। আর ভারতকে কেবল ‘আত্মরক্ষা’ করার অবস্থানে স্থির থাকতে হচ্ছে।

১৯৬২-এর অভিজ্ঞতা
ভারত-চীন যুদ্ধ ভারত ও চীনের মধ্যে ১৯৬২ সালে সংঘটিত একটি যুদ্ধ। সীমানা নিয়ে বিরোধ থেকে এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। যুদ্ধে চীনের কাছে ভারত পরাজিত হয়। চীন তিব্বত দখল করার পর ভারতের বর্তমান অরুণাচল প্রদেশ ও আকসাই চীনকে চীনের অন্তর্ভুক্ত এলাকা বলে দাবি করে। এভাবে যে সীমান্ত সমস্যার শুরু হয় তা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের সূচনা করে। যুদ্ধে ভারতের বিরুদ্ধে জয়ী হয়ে চীন একতরফা যুদ্ধবিরতি জারি করে, আকসাই চীন দখলে রাখে কিন্তু অরুণাচল প্রদেশ ফিরিয়ে দেয়। যুদ্ধের পর ভারত সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। ভারতের বিদেশনীতিও কিছু পরিমাণে পরিবর্তিত হয়। যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য ভারতকে সমর্থন করে। অন্যদিকে পাকিস্তান চীনের সঙ্গে মিত্রতা বাড়াতে সচেষ্ট হয়।

যদি যুদ্ধ বাধে….
শেষ পর্যন্ত যদি দুই দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে তাহলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কে কোন অবস্থানে থাকবে তার হিসাব মেলানোও জরুরি। আগেই বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুধু সমরাস্ত্রের শ্রেষ্ঠত্বের ওপরেই নির্ভর করে না। কৌশলগত অবস্থানও সমানাংশে গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের আয়তন প্রায় ৯৬ লক্ষ বর্গকিলোমিটার। চীনের উত্তরে রয়েছে মঙ্গোলিয়া; উত্তর পূর্বে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া; পূর্বে চীন সাগর; দক্ষিণে ভিয়েতনাম, লাওস, মিয়ানমার, ভারত, ভুটান, নেপাল; দক্ষিণ পশ্চিমে পাকিস্তান; পশ্চিমে আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, কিরগিজিস্তান ও কাজাকিস্তান। এই ১৪টি দেশ বাদে চীনের পূর্বে পীত সাগরের পাশে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান; দক্ষিণ চীন সাগরের উল্টো দিকে আছে ফিলিপাইন। চীনের স্থলসীমার দৈর্ঘ্য প্রায় ২২ হাজার ৮ শো কিলোমিটার। আর অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে জাতিগত দিক দিয়েও বড় রকম বিভাজন কম। শান্ত প্রকৃতির এক মুসলিম জনগোষ্ঠী আছে যারা অন্য সম্প্রদায়ের থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। এ ছাড়া বাকিদের মধ্যে জাতিগত বিভেদ তেমন তীব্র নয়। অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসী-চরমপন্থী তৎপরতাও তেমন লক্ষ্যযোগ্য নয়। আর সীমান্তবর্তী দেশের সংখ্যা বেশি হলেও এক ভারত ছাড়া অন্য কারো সঙ্গে ভূমি নিয়ে কোন জোরালো বিবাদের কথা জানা যায়নি।
অন্যদিকে ভারতের আয়তন ৩২ লক্ষ ৮৭ হাজার ২৬৩ বর্গকিলোমিটার। ভারতের উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তার ৩ হাজার ২১৪ কিলোমিটার এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমের বিস্তৃতি ২ হাজার ৯৯৩ কিলোমিটার। ভারতের পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তান, উত্তর-পূর্বে চীন, নেপাল ও ভুটান এবং পূর্বে বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও অদূরবর্তী সীমান্তে মালয়েশিয়া অবস্থিত। এ ছাড়া ভারত মহাসাগরে অবস্থিত শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও ইন্দোনেশিয়া ভারতের নিকটবর্তী কয়েকটি দ্বীপরাষ্ট্র। দক্ষিণে ভারত মহাসাগর, পশ্চিমে আরব সাগর ও পূর্বে বঙ্গোপসাগর দ্বারা বেষ্টিত ভারতের উপকূলরেখার সম্মিলিত দৈর্ঘ্য ৭ হাজার ৫১৭ কিলোমিটার। আর স্থলভাগের পরিসীমা ১৫ হাজার ২০০ কিলোমিটার।
ভারত একাধারে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, জাতপাত, নকশালবাদ-মাওবাদ, সন্ত্রাসবাদ এবং জম্মু ও কাশ্মির, পাঞ্জাব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অভ্যুত্থানে জর্জরিত দেশ হিসেবে পরিচিত। ভারতে ৮০ কোটিরও বেশি (৮০.৫%) হিন্দু। অন্যান্য ধর্মসম্প্রদায়গুলোর মধ্যে রয়েছে মুসলমান (১৩.৪%), খ্রিস্টান (২.৩%), শিখ (১.৯%), বৌদ্ধ (০.৮%), জৈন (০.৪%), আরো আছে ইহুদি, পারসি ও বাহাই ধর্মাবলম্বী মানুষ। দেশে আদিবাসী জনসংখ্যা ৮.১%। এই বিপুল পরস্পরবিরোধী ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক অবস্থানের মধ্যে একটি বড়রকম যুদ্ধে ভারত কতটা ঝুঁকি গ্রহণে সক্ষম হবে- সেটা ভাবতে হবে।

ভারতে অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসী তৎপরতা
অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক বিভেদ-বিবাদ ছাড়াও এশিয়ার অন্যতম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে প্রায় ২০০টি সংগঠন সন্ত্রাসী, বিদ্রোহী ও চরমপন্থী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে সেখানকারই একটি সংস্থা। এসব সংগঠনের কোন কোনটি স্বাধীনতার জন্য, কোনটি স্বায়ত্তশাসনের জন্য এবং কোনটি দলীয় মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছে। এগুলোর কোন কোনটি সশস্ত্র সংঘাতের মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে চাচ্ছে। এর ফলে গত দু’দশকে লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ গেছে। আহত হয়েছে অসংখ্য। সম্পদের ক্ষতিও বিপুল। ভারতের সন্ত্রাস বিশেষজ্ঞ কেপিএন গিল পরিচালিত ‘সাউথ এশিয়ান টেরোরিজম’ নামের সংস্থার হিসাব থেকে জানা যায়, এরকম অস্থির রাজ্যগুলোর মধ্যে সন্ত্রাসী, বিদ্রোহী ও চরমপন্থী সংগঠন আসামে রয়েছে ৩৬টি, জম্মু ও কাশ্মিরে ৩৭টি, মনিপুরে ৪০টি, ত্রিপুরায় ৩০টি, অরুণাচলে ১৩টি, মেঘালয়ে ৪টি, নাগাল্যান্ডে ৩টি, মিজোরামে ২টি এবং পাঞ্জাবে ১২টি। এ ছাড়াও অন্ধ্রপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খন্ড, ছত্তিশগড়, পশ্চিমবঙ্গ প্রভৃতি রাজ্যে মাওবাদীসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের তৎপরতা উল্লেখযোগ্য। চীনের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে গিয়ে ভারতকে এসব গোষ্ঠীর দিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে এবং এজন্য তাকে বাড়তি শক্তি নিয়োজিত করার প্রয়োজন পড়বে।

সীমান্ত প্রহরায় জটিলতা
ভারতের জন্য বাড়তি সমস্যা তার সীমান্তবর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক। চির বৈরী দেশ পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সীমান্তের দৈর্ঘ্য ৩ হাজার ৩২৩ কিলোমিটার। উত্তর-পশ্চিম কাশ্মিরে আফগানিস্তানের সঙ্গে দেশের সীমান্তের দৈর্ঘ্য ১০৬ কিলোমিটার। এই অঞ্চলটি বর্তমানে পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মিরের অন্তর্গত। ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের ফলে চীনের সঙ্গে এবং ১৯৪৭, ১৯৬৫, ১৯৭১ ও ১৯৯৯ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত নিয়ে বিরোধ তীব্র হয়। এই দীর্ঘতম সীমান্তকে চিন্তার বাইরে রাখার কোন অবকাশই নেই ভারতের জন্য।
অপর দিকে চলতি বছর ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে প্রথমবারের মতো চীন নেপালের সঙ্গে যৌথভাবে সামরিক মহড়ার পরিকল্পনা করছে। চীনের এই যৌথ সামরিক মহড়ার প্রস্তাব এটাই প্রথম। এ প্রস্তাব গ্রহণও করে নিয়েছে নেপাল। ভারতের সঙ্গে ১৯৫০ সালে পিস অ্যান্ড ফ্রেন্ডশিফ চুক্তি হয় নেপালের। সেই চুক্তির কিছু কিছু অংশ নেপাল যখন সংশোধন বা পরিবর্তন আনার কথা বলছে তখনই চীন এমন প্রস্তাব দিয়েছে। ওই চুক্তিতে বলা হয়েছে, তৃতীয় কোনো দেশের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনার আগে ভারতকে জানাতে হবে অথবা ভারতের সম্মতি নিতে হবে নেপালকে। এখন চুক্তিটি সংশোধন করে এ সংক্রান্ত বিধিতে পরিবর্তন আনতে চাচ্ছে নেপাল। একই সঙ্গে তারা এর মাধ্যমে নিরাপত্তা সংক্রান্ত ইস্যুগুলোতে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে চাচ্ছে।
ভারত-নেপাল সীমান্তের দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৭৫১ কিলোমিটার। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই দীর্ঘ সীমান্তে সতর্ক প্রহরা রাখা ভারতের জন্য বাড়তি কাজ হয়ে পড়লো। আর চীনের বর্তমান অবস্থানের কারণে ভারত-ভুটান ৬৯৯ কিলোমিটার সীমান্তের প্রতি নজরদারি রাখাও ভারতের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ালো। মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের সীমান্তের দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার। এই সীমান্ত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত বরাবর প্রসারিত। এই সীমান্তে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ব্যাপক তৎপরতা থাকায় ভারতকে মিয়ানমার সীমান্তেও অতিরিক্ত শক্তি সমাবেশ রাখতে হচ্ছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ৯৭ কিলোমিটার। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ভালো থাকলেও ভারতই তা সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখতে চায় না।

ভারতকে ঘিরে চীনের প্রস্তুতি?
চীন কি ভারতকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলতে চাচ্ছে? এমন প্রশ্নের মুখে শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে চীন। এর ফলে চীনের কৌশলগত অবস্থান আরো শক্তিশালী হলো। ভারতের নানামুখী চাপ উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত হাম্বানটোটো বন্দরের নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে তুলে দিলো শ্রীলঙ্কা। এর মাধ্যমে ভারত মহাসাগরে চীনের উপস্থিতি আরো শক্ত হলো। কৌশলগত কারণে বঙ্গোপসাগর থেকে আরব সাগর পর্যন্ত মুক্তার মালার মতো বন্দর বানাচ্ছে চীন- এমন অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের। মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের গোয়াদরে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে দেশটি। বাংলাদেশেও একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে চীন আগ্রহ দেখিয়ে আসছে। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এসব বন্দরের নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে থাকলেও ভারতের আশঙ্কা- সামরিক প্রয়োজনে চীন এসব বন্দরকে ব্যবহার করবে। চীনের যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন এসব বন্দর ব্যবহারের সুযোগ পাবে। আরব সাগরের তীরে পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দর এবং ভারত মহাসাগরে হাম্বানটোটা বন্দরে চীনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কারণে চীনের কৌশলগত অবস্থান আরো শক্তিশালী হলো। গোয়াদর বন্দরের মাধ্যমে সরাসরি চীনের পশ্চিমাঞ্চলের জিনজিয়াংয়ের সাথে সড়ক ও রেল যোগাযোগ স্থাপন করা হচ্ছে। যা মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনের জ্বালানি সরবরাহের রুট হিসেবে ব্যবহার করা হবে। অপরদিকে হাম্বানটোটো বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে চীনের বন্দরগুলোতে পণ্য পরিবহন করা সহজ হবে। চীন ইতোমধ্যে বেল্ট ওয়ান পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বন্দর ও সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে। সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে স্থাপন করা হচ্ছে সড়ক ও রেল যোগাযোগ। যদিও এসব বন্দর বাণিজ্যিক কর্মকান্ডে ব্যবহৃত হওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তথাপি ভারতের জন্য এসব বন্দর কখনোই স্বস্তির কারণ হবে না।

যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার অবস্থান
চীন-ভারতের এই দ্বন্দ্বে এযাবৎ যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার অবস্থান সম্পর্কে কোন ধারণা মেলেনি। তবে এই দুই দেশ কোন পক্ষ নেয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ১৯৭১ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে চীন পাকিস্তানের পক্ষে মৌখিক অবস্থান গ্রহণ করলেও বাস্তবে কার্যকর কোন ভূমিকা নিতে পারেনি। এর প্রধান কারণ ভারতের পক্ষে সরাসরি সোভিয়েত রাশিয়ার অবস্থান গ্রহণ। সোভিয়েত ইউনিয়ন চীনকে হুমকি দেয় যে তারা যদি যুদ্ধে জড়ায় তাহলে চীন সীমান্তে হামলা চালানো হবে। এ জন্য তারা চীনের সীমান্তে সৈন্যও মোতায়েন করে। ফলে চীন এই বিবাদ থেকে নিষ্ক্রিয় থাকে। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জড়ানোর পরিবর্তে অনেকটা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় ছিলো। তারা মৌখিকভাবে পাকিস্তানের পক্ষ নিলেও ভারতের বিরুদ্ধেও মাঠে নামতে পারছিলো না।
কিন্তু চার দশক পর পরিস্থিতির বদল ঘটেছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেছে। এখন শুধুই রাশিয়া। সমাজতন্ত্র রফতানির বালাইও তাদের নেই। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও চীনের বিপক্ষে রাশিয়ার মাঠে নামার কোন সম্ভাবনা আদৌ নেই। বরং পূর্বের যে কোন সময়ের তুলনায় চীন-রাশিয়ার সম্পর্ক উন্নত। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বহুমুখী সম্পর্ক থাকলেও তাদের পক্ষে চীনের বিরুদ্ধে যাওয়ার সামর্থ্য নেই। তারা এমনিতেই উত্তর কোরিয়াকে নিয়ে বিপদের মধ্যে আছে। আর চীন পরোক্ষভাবে উত্তর কোরিয়াকে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীনের সহায়তা নিয়ে উত্তর কোরিয়ার উসকানি বন্ধের আশা করেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিমকে চাপে রাখার লক্ষ্যে সি চিন পিংয়ের সঙ্গে তার মতৈক্য হয়েছে। কিন্তু গত দুই মাসে এটা পরিষ্কার যে ট্রাম্প পূর্বসূরিদের মতো আবিষ্কার করেছেন, চীনারা উত্তর কোরিয়ার সরকার যাতে ভেঙে না পড়ে, সে ব্যাপারেই বেশি তৎপর। বাণিজ্য ও জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা দিয়ে উত্তর কোরিয়াকে বাগে আনার চেয়ে তারা তাকে রক্ষা করতেই বেশি আগ্রহী। বিরোধীয় চীন সাগর নিয়ে ডামাডোলের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যস্ত রাখতে চাচ্ছে চীন- এটা অনেকটাই পরিষ্কার।

সামরিক শক্তি বৃদ্ধির পরিকল্পনা
এদিকে এই পরিস্থিতির মধ্যে চীন তার সমর শক্তি বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা করছে। গত ৩০ জুলাই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, নিজেদের সামরিক শক্তি বাড়ানোর সময় এসে গেছে। পৃথিবী এখন নিরাপদ নয়। এখনই দ্রুততার সঙ্গে নিজের সামরিক শক্তি বাড়ানো প্রয়োজন। চীনের সেনা কুচকাওয়াজ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে এ কথা বলেন তিনি। সেখানে চীনের জেট ফাইটার ও ৪০ শতাংশ সামরিক অস্ত্র প্রদর্শন করা হয়। সেখানেই এই ঘোষণা দেন জিনপিং। এর কয়েক ঘণ্টা আগেই উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষা বন্ধে চাপ প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হওয়ায় চীনের সমালোচনা করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। উল্লেখ্য, গত দুই বছরে শি জিনপিংয়ের সময়ই চীনের সামরিক খাতে সবেচেয়ে বেশি পরিবর্তন আসে। ১৯৫০ সালের পর থেকে যা সর্বোচ্চ। আকাশ ও সমুদ্রপথে শক্তি বাড়িয়ে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে চীন। দক্ষিণ চীন সাগরের মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। দক্ষিণ চীন সাগরে বেইজিংয়ের কৃত্রিম দ্বীপে সামরিক স্থাপনার বিরোধিতা করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া উত্তর কোরিয়াকে আন্তঃমহাদেশীয় পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের উচ্চাকাক্সক্ষা থেকে নিবৃত্ত না করায় বেইজিংয়ের ওপর ক্ষুব্ধ ওয়াশিংটন।
অপরপক্ষে চীন-ভুটান সীমান্তের ডোকলাম উপত্যকায় চীন ও ভারতের সামরিক বাহিনী মুখোমুখি অবস্থানের মধ্যই জরুরি ভিত্তিতে সরকারের কাছে আরো ২০ হাজার কোটি রুপি বরাদ্দের দাবি জানায় ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য এই অর্থ ব্যয় করা হবে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ২ লাখ ৭৪ হাজার কোটি রুপি বরাদ্দ করা হয়েছিল। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব সঞ্জয় মিত্র সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে জরুরি ভিত্তিতে ২০ হাজার কোটি রুপি দেয়ার অনুরোধ করেছেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থের বেশির ভাগই খরচ হয়ে গেছে। বেতন-ভাতায় অনেক অর্থ যাচ্ছে। সমরাস্ত্র কিনতেও বিশাল অঙ্ক ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। ১৯৬২ সালে চীনের সঙ্গে যুদ্ধের পর এবারই প্রতিরক্ষা বাজেট মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সবচেয়ে কম অংশ। এর আগে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ১৩তম প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার (২০১৭-২০২২) অধীনে সেনবাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য প্রায় ২৭ লাখ কোটি রুপি চেয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। চীন ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা এবং ভারতের ভূকৌশলগত স্বার্থ সুরক্ষায় এই অর্থ প্রয়োজন বলে জানানো হয়েছে। ভারতের বর্তমান মজুদকৃত সামরিক সরঞ্জাম অনেকটা সেকেলে এবং সময়োপযোগী নয় বলে জানা যায়। অন্য দিকে অস্ত্র মজুদের পরিমাণও খুবই কম বলে অভ্যন্তরীণ সূত্রে প্রকাশিত হয়।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, সভাপতি, রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়ন

SHARE

Leave a Reply