চেতনায় ২৮ শে অক্টোবর

শাহ মাহফুজুল হক

Chhatrasangbad২৮ শে অক্টোবর মানবতার ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক দিন। এই দিন আওয়ামী হায়েনারা খুনের নেশায় মত্ত হয়ে  জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ ও দেশের সংবিধান স্বীকৃত শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করার অধিকার কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে একটি দলকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার হীন উদ্দেশ্যে মেতে উঠে। খুনী চক্র সেদিন পরিকল্পিত ভাবে লগি বৈঠা, ট্রাকভর্তি ইট আর বস্তা ভর্তি মরনাস্ত্র নিয়ে সকাল সাড়ে দশটার সময় বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেইটে মঞ্চ প্রস্তুত কাজে ব্যস্ত নিরীহ জামাত শিবির কর্মীদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। আকস্মিক আক্রমনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে আমাদের নেতাকর্মীরা। পরক্ষনেই আল্লাহর উপর ভরসা করে শাহাদাতের তামান্না নিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় আমরা,বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনের ওভারব্রীজকে বেইস করে প্রতিরোধ বুহ্য রচনা করা হয়। চলতে থাকে প্রচন্ড সংঘর্ষ। বাতিলের সশস্ত্র আক্রমনের মুখে  খালি হাতে তাদের পক্ষ থেকে ছুড়ে মারা ইট আর লগি-বৈঠা সংগ্রহ করে আবার তাদের দিকে ছুড়ে মারা এই যেন উহুদের প্রান্তরের কাফেরদের সকল রণ প্রস্তুতির বিপক্ষে রাসুল সা: এর সাহাবীদের হালকা তরবারী, গাছের ডাল আর বালি ছিটিয়ে কাফেরদের বিপক্ষে বিজয়ী হওয়ার নতুন চেতনা। চলে কাঠ বা স্কেল দিয়ে টিনে আঘাত করে বাতিলের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করার প্রয়াস। এই সময় নুরুল ইসলাম বুলবুল, ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, মুজিবুর রহমান মঞ্জু ভাইসহ বর্তমান ও সাবেক দায়িত্বশীল ভাইদের ভূমিকা, দিকনির্দেশনা আর পাহাড়সম হিম্মত জনশক্তিকে প্রেরণা যোগায় গুলির মুখে বুক পেতে  দিয়ে শত্রুর বুহ্য ভেদ করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার। আমাদের পার্শ্ব দিয়ে মুজাহিদুল ইসলাম ভাই কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে সামনে এগিয়ে যান কিন্তু বাতিলরা তাকে আর ফিরতে দেয়নি।  মানুষরূপী হায়েনাদের লগি বৈঠার নির্মম আঘাতে  স্পটেই শাহাদাত বরণ করেন তিনি। মুজাহিদ ভাইয়ের শাহাদাতের পর হিন্দার উত্তরসূরীরা  খুনের নেশায় আরও উন্মত্ত হয়ে উঠে। তারা প্রোগ্রামের মঞ্চ, শিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যালয় আর জামায়াতের মহানগর অফিস গুড়িয়ে দিয়ে জামায়াত শিবিরকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার হীন উদ্দেশ্যে পল্টনের চর্তুপার্শ্বের গলি দিয়ে পরিকল্পিত কমান্ডো আক্রমন শুরু করে। এই সময় আমাদের ভাইয়েরা জীবন বাজি রেখে শত্রুর হাত থেকে আমাদের প্রেরনার মিনারগুলোকে রক্ষার জন্য নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও  বাতিলের মোকাবেলায় সামনে  এগিয়ে আসেন। এ সময় কস্তুরী হোটেলের গলিতে ড. রেজাউল করিম ভাই সহ কয়েকজন ভাই গুলিবিদ্ধ হন। শিপন ভাই সহ বেশ কয়েকজন ভাই মারাতœক আহত হন। মূমুর্ষূ অবস্থায় তাদেরকে হাসপাতালে নেয়া হয়।  ইতোমধ্যে মারাতœক আহত হওয়ার কারণে আমাকে ও ময়দান থেকে জামায়াত অফিসের ৫ম তলায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গিয়ে দেখি আরেক কারবালা। অসংখ্য আহত পঙ্গুত্ববরণকারী ভাইদের রক্ত আর করুণ আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠে। প্রতিমূহুর্তে আর ও নতুন নতুন ভাইয়েরা এসে যোগ হচ্ছিলেন আহতের সারিতে। অন্যদিকে বিভিন্ন মেডিকেলের স্বেচ্ছাসেবক ভাইয়েরা প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে টেক্সি, প্রাইভেটকার ও এম্বুলেন্স যুগে আহত ভাইদেরকে ঢাকা শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন। এই অবস্থায় দেখতে পাই ইয়ারমুকের যুদ্ধের পানি পানি করে চিৎকার আর পানি আসার পর একে অপরকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করার সেই সোনালী ইতিহাস। কোন একজন ভাইকে হাসপাতালে নিতে চাইলে বা চিকিৎসা দিতে চাইলে তিনি বলছেন আগে উমুক ভাইকে পাঠান  কারণ তিনি আমার  চেয়ে বেশি আহত যা ইসলামী আন্দোলন ছাড়া দুনিয়াবী কোন আন্দোলনের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে কল্পনাও করা যায়না। প্রায় ৩০ মিনিট পর হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানে দেখি আরেক হৃদয় বিদারক অবস্থা। হাসপাতালের জরুরী বিভাগে আহত ও পঙ্গুত্ববরনকারীদরে এত দীর্ঘ সারি যে ডাক্তার চিকিৎসা দিয়ে শেষ করতে পারছিলেননা। আমার সামনেই চিকিৎসা কেন্দ্রে শাহাদাত বরণ করেন শহীদ শিপন ভাই যে দৃশ্য আজও আমাকে খুববেশি নাড়াদেয়।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইদের সেবাযতœ,ডাক্তার ও নার্সদরে আপন ভাইয়ের মত নিবিড় তত্ববধান আর উর্ধ্বতন দায়িত্বশীলদের সান্নিধ্য মারাত্মক আহতদের যন্ত্রনাকে অনেকাংশে লাঘব করে দ্রুত সুস্থ হতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।বিশষে করে আজকের দিনে খুব বেশি স্মরন করি যালিমের ষড়যন্ত্রের শিকার আমাদের প্রিয় নেতৃবৃন্দকে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মো: কামারুজ্জামান, শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা, এটিএম আজহারুল ইসলাম ও মীর কাশেম আলী ভাইকে যারা অনেক বড় দায়িত্বশীল হওয়ার পরও হাসপাতালে আমাদের মত নগন্য কর্মীদেরকে দেখতে গিয়েছিলেন এবং বেডের পার্শ্বে দাঁড়িয়ে আমাদের সুস্থতার জন্য কান্নাবিজড়িত কন্ঠে দীর্ঘ দোয়া করেছিলেন। যা আমাদের নিকট ছিল কল্পনাতীত এবং সারা জীবনের সেরা প্রাপ্তি।
প্রকৃতপক্ষে ২৮শে অক্টোবের ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি নীতি-নির্ধারনী দিন। কারণ এর পূর্বে আওয়ামীলীগ বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ বাদীরা এবং সমাজতন্ত্রের ধ¦জাধারী নাস্তিকেরা ভাবতো তারা পেশী শক্তি দিয়ে ইসলামী আন্দোলন তথা জামায়াতে ইসলামীকে এদেশের রাজনীতি থেকে বিতাড়িত করতে পারবে কিন্তু আল্লাহর একান্ত অনুগ্রহে আমাদের ১৩ জন ভাইয়ের শাহাদাত আর অসংখ্য ভাইয়ের রক্তের বিনিময়ে অস্্ের সুসজ্জিত হায়নাদের মোকাবেলায় ওমর, আলী, খালেদ সাইফুল্লাহ,তারেক বিন জিয়াদ ও সালাউদ্দিন আইয়্যুবীর  উত্তরসূরীদের শাহাদাতের তামান্না আর পরিস্থিতি বিরোচিত মোকাবেলার কারণে দিন ব্যাপী সংর্ঘষের পর সন্ধ্যায় যখন তারা পিছু হটতে বাধ্য হলো তখন তারা বুঝতে পারলো সম্মুখ সংর্ঘষে কিংবা শক্তি প্রয়োগ করে তারা জামায়াত শিবির কে দমন করতে পারবেনা। তাই আমাদের পতিপক্ষ বন্ধুরা ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের খোলসে মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দিনের সামরিক শাসনের সময় সা¤্রাজ্যবাদী শক্তির প্রত্যক্ষ্য মদদে জামায়াত শিবিরকে মোকাবেলা করার জন্য ঘৃন্যতাম পথ বেছে নেয়।বেছে নেয় দেশ গড়ার জন্য অন্যতম পূর্বশর্ত জাতীয় ঐক্যের পরিবর্তে জাতিকে স্থায়ীভাবে বিভক্ত করার পথ।ধোয়া তুলে ৪০ বছর পূর্বে শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে নিষ্পন্ন যদ্ধাপরাধ বিচারের ইস্যু।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নীল নকশার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মোহাজোট সরকার নতুন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে। জামায়াত শিবির দমনের নামে চিরুনী অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার মিথ্যা মামলায় দূর্নীতিমুক্ত ও দেশপ্রেমিক জাতীয় নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করে।গ্রহন করে অনুগত বিচারক,সাজানো স¦াক্ষী ও বিচার চলাকালীন বারবার আইন পরিবর্তন করে তাদের ইচ্ছামাফিক রায়ের মাধ্যমে জামায়াতকে নেতৃত্বশূন্য করার ঘৃন্য প্রয়াস। সরকার নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া,ভাড়াটিয়া বুদ্বিজীবী এবং সরকারী পৃষ্টপোষকতায় গড়ে উঠা শাহবাগের নাস্তিক-মুরতাদ চক্র গোয়েবলোসীয় কায়দায় অপপ্রচার চালিয়ে জনগনকে জামাত-শিবিরের বিরোদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা করে।  কিন্তু ২৮ শে অক্টোবরের ন্যায় এক্ষেত্রেও আওয়ামীলীগের সকল ষড়যন্ত্র প্রায় ব্যর্থ হয়েছে। কোরানের পাখি আল্লামা দেলোওয়ার হোসাইন সাঈদীকে দেলু শিকদার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গোল্ডমেডেলধারী আব্দুল কাদের মোল্লাকে কসাইকাদের সাজিয়ে নিরপরাধ ব্যক্তিদেরকে সাজা দেওয়ার কারণে জনগনের নিকট যুদ্ধাপরাধ বিচারের  আড়ালের ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলন নির্মূলের দূরভিসন্ধি  পরিষ্কার হয়ে গেছে।বরং অতিমাত্রায় দমনপীড়ন চালানোর কারণে জামায়াত-শিবির জনগনের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। বিগত উপজেলা নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি সত্ত্বেও জনগন যেখানে সুযোগ পেয়েছে জামায়াতের প্রার্থীদেরকে বিজয়ী করে জামায়াত শিবিরের প্রতি তাদের সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে।
ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে জামায়াত শিবিরকে অন্যায়ভাবে নির্মূল করতে গিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী, স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বপ্রদানকারী, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ৩০০ আসনের ২৯৭টি আসনে বিজয়ী আওয়ামীলীগ আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে ঘৃনিত ও গণধীকৃত দলে পরিনত হয়েছে। জনগন কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন না দিয়ে ভোটার বিহীন, প্রার্থী বিহীন, একদলীয় প্রহসনের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসে আজীবন ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করছে। আর এই ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য মুসলিনী,আইয়্যুবখান,ইয়াহিয়াখান ও বাশার আল আসাদের মত গুম,খুন, অপহরণ ও বন্দুকের নলের মাধ্যমে ভিন্নমত দমনের ঘৃন্য পথ বেছে নিয়েছে।আইনপ্রনয়ন ও দলীয়করণের মাধ্যমে একে একে ধ্বংস করে পেলছে মিডিয়া,আইন-আদালত,নির্বাচন কমিশন ,দুরনীতি দমন কমিশন ,মানবাধিকার কমিশন সহ গনতান্ত্রিক স্তম্ভগুলো।
অন্যদিকে আওয়ামী অপশাসন থেকে জনগনকে মুক্তি দেওয়ার আন্দোলনে প্রধান বিরোধীদল হিসেবে বিএনপির সীমাহীন ব্যর্থতা ও আপোষকামীতা জনগনকে হতাশ করছে। এরশাদের সুবিধাবাদী রাজনীতি আর বহুরুপতার কারণে জাতীয় পার্টির দূর্গখ্যাত রংপুরেই এই দলটি আজ অস্তিত্ব সংকটে। এমন রাজনৈতিক বাস্তবতায় জামায়াত শিবির তথা ইসলামী আন্দোলন মানুষের একমাত্র আস্থার ঠিকানায় পরিনত হয়েছে।
এমতাবস্থায় আমরা যদি আমাদের  জনশক্তিকে ইসলামী চরিত্র ও দুনয়িাবী যোগ্যতায় পারদর্শি করে  গড়ে তোলে সূদুরপ্রসারী পরিকল্পনার মাধ্যমে জনগনকে সংগঠিত করে সর্বাত্মক আন্দোলনের মাধ্যমে ২৮শে অক্টোবরের খুনী হাসিনা সরকারের পতন নিশ্চিত করতে পারি। তবেই অল্প সময়ের মধ্যেই এদেশে একটি পরিপূর্ণ ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ২৮ অক্টোবর সহ সকল শহীদ, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী ভাইদের প্রতি ফোটা রক্তের বদলা নিতে পারব ইনশাল্লাহ। আল্লাহ আমাদেরকে সেই তৌফিক দান করুন। (আমীন)।

লেখক : কেন্দ্রীয় মানবাধিকার সম্পাদক,
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply